সংবাদ

স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজন সমন্বিত জনবল পরিকল্পনা


সমীর কুমার সাহা
সমীর কুমার সাহা
প্রকাশ: ৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ এএম

স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজন সমন্বিত জনবল পরিকল্পনা

একটি উপজেলা হাসপাতালের কথা ভাবুন। সেখানে একজন চিকিৎসক আছেন, কিন্তু রোগীকে ইনজেকশন দেওয়া, স্যালাইন চালানো, রক্তচাপ মাপা, পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা কিংবা এক্স-রে করার মতো পর্যাপ্ত কর্মী নেই। ফলে চিকিৎসককে নিজের কাজের বাইরেও অনেক দায়িত্ব সামলাতে হয়। আর রোগীকে দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। এটি কোনো একটি হাসপাতালের চিত্র নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিচিত বাস্তবতা। সমস্যার মূলে শুধু জনবলের ঘাটতি নয়, জনবলের অসম কাঠামোও রয়েছে।

১:৩:৭ অনুপাত কেন গুরুত্বপূর্ণ

স্বাস্থ্যসেবা কখনোই একক কোনো পেশার কাজ নয়। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। নার্স ও ধাত্রী রোগীর শয্যাপাশে সরাসরি সেবার বড় অংশ নিশ্চিত করেন। আর প্যারামেডিক ও সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীরা পরীক্ষাগার, রোগের চিত্রায়ণ, ওষুধ সরবরাহ, ফিজিওথেরাপি, জরুরি সেবা ও স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখেন।

বৈশ্বিক আলোচনায় সাধারণত প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স ও পাঁচজন সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীর কথা বলা হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবানির্ভর দেশে আমার প্রস্তাব, কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে চিকিৎসক:নার্স:প্যারামেডিক অনুপাত ১:৩:৭ নির্ধারণ করা। এতে চিকিৎসকের সময় বাঁচবে, সেবার মান বাড়বে এবং ব্যয়ও তুলনামূলক কমবে।

বাস্তব চিত্র: সংখ্যায় এগিয়েছি, কাঠামোয় পিছিয়ে

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মানবসম্পদবিষয়ক তথ্যপত্র ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার। এর মধ্যে সেবায় নিয়োজিত আছেন প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার। নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার। ২০১৯ সালের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রীর সম্মিলিত ঘনত্ব ২০১৯ সালে প্রতি ১০ হাজারে ৮ দশমিক ৩ জন থেকে বেড়ে ১৫ দশমিক ১৬ জনে পৌঁছেছে।

কিন্তু এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত মানদণ্ড প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে ৪৪ দশমিক ৫ জন। অর্থাৎ আমরা এখনো এই মানদণ্ডের অর্ধেকেরও অনেক নিচে রয়েছি।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো জনবলের অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স আছেন একেরও কম, প্রায় ০ দশমিক ৭৫ থেকে ১ দশমিক ১ জন। অথচ কাঙ্ক্ষিত অনুপাত তিনজন। সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও কাঙ্ক্ষিত পাঁচজনের তুলনায় দুইয়ের কম। ২০১৯ সালে পরিস্থিতি ছিল আরও করুণ। তখন অনুপাত ছিল ১:০.৬:০.৩। অর্থাৎ আমরা উন্নতি করেছি, কিন্তু গন্তব্য এখনো অনেক দূরে।

নিয়োগে ভারসাম্যহীনতা

সমস্যার একটি বড় কারণ জনবল নিয়োগ ও পদ সৃষ্টির প্রচলিত ধারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ প্রায় ৩৮ হাজার ২৫৫টি। অন্যদিকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে নার্স ও ধাত্রীর পদ প্রায় ৫০ হাজার ৮২৫টি। অর্থাৎ পদ কাঠামোতেই ১:৩ অনুপাতের ধারেকাছেও যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেছেন, অতীতে জনবল সংকট দেখা দিলে নিয়োগের ক্ষেত্রে মূলত চিকিৎসকদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজনীয় ভারসাম্য উপেক্ষিত থাকত।

এর সঙ্গে রয়েছে শূন্য পদের সমস্যা। ২০২৫ সালের মানবসম্পদবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের প্রায় ৪ হাজার ৩০৮টি এবং নার্সের প্রায় ১ হাজার ৬৫৩টি পদ শূন্য ছিল। পরবর্তী সময়ের তথ্যে অনুমোদিত পদ ও শূন্য পদের সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। চিকিৎসকের প্রায় ৯ হাজার ৯৯০টি এবং নার্সের ৪ হাজার ৮৭০টি পদ খালি রয়েছে। একদিকে পদ শূন্য, অন্যদিকে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত নার্স বেকার। এটি পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ।

চাহিদার হিসাব

২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার জন্য সরকারি খাতে প্রয়োজন প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার চিকিৎসক, ৩ লাখ ৫০ হাজার নার্স এবং ৫ লাখ ১৭ হাজার অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।

সহজ হিসাবেই বিষয়টি বোঝা যায়। বর্তমানে সেবায় নিয়োজিত প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার চিকিৎসকের জন্য ১:৩ অনুপাতে প্রয়োজন প্রায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার নার্স। অথচ আছেন প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার। অর্থাৎ ঘাটতি ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। একই চিকিৎসকসংখ্যার বিপরীতে ১:৭ অনুপাতে প্রয়োজন প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার প্যারামেডিক ও সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী। এই বিশাল ঘাটতি রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কৌশলগত পরিকল্পনা।

করণীয় কী

প্রথমত, জাতীয় স্বাস্থ্য জনবল পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল—প্রতিটি পর্যায়ের জন্য ১:৩:৭ অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে জনবলের কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। চিকিৎসক নিয়োগের সময়ই প্রয়োজনীয় নার্স ও প্যারামেডিকের পদ অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, নার্সিং ও প্যারামেডিক শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজে আসনসংখ্যা বাড়ানো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষাগার ও আবাসনসুবিধা নিশ্চিত করা এবং মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউটগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি। শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস না করে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, এসব পেশায় কর্মজীবনের আকর্ষণ বাড়াতে হবে। নার্স ও প্যারামেডিকদের জন্য স্পষ্ট পদোন্নতির কাঠামো, ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং দুর্গম এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। তা না হলে প্রশিক্ষিত জনবল দেশের বাইরে চলে যাবে অথবা পেশা ছেড়ে দেবে।

চতুর্থত, অপরিকল্পিত নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার জনবলসংক্রান্ত তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভান্ডারে আনতে হবে। কোথায় কত পদ শূন্য, কোথায় কতজন প্রশিক্ষিত কর্মী বেকার—এসব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া গেলে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক হবে।

পঞ্চমত, বেসরকারি খাতকেও এই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। দেশের স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই লাইসেন্স প্রদান ও মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সেখানেও ন্যূনতম নার্স ও কারিগরি স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত নিশ্চিত করা উচিত।

ষষ্ঠত, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রশিক্ষিত নার্স বা প্যারামেডিক যেসব কাজ নিরাপদে করতে পারেন, সেসব দায়িত্ব তাঁদের হাতে দিতে হবে। এতে চিকিৎসকেরা জটিল রোগীর চিকিৎসায় বেশি সময় দিতে পারবেন।

স্বাস্থ্যসেবা একটি দলগত কাজ। চিকিৎসক সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, কিন্তু একা তিনি সাফল্য নিশ্চিত করতে পারেন না। শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালে হাসপাতালের ভবন ও শয্যা পূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেবা পূর্ণতা পাবে না। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে জনবল পরিকল্পনায় সংখ্যার চেয়ে ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

১:৩:৭ অনুপাতকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা হলে আগামী এক দশকে আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যেখানে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানেই মানুষ সময়মতো মানসম্মত সেবা পাবেন।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজন সমন্বিত জনবল পরিকল্পনা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

একটি উপজেলা হাসপাতালের কথা ভাবুন। সেখানে একজন চিকিৎসক আছেন, কিন্তু রোগীকে ইনজেকশন দেওয়া, স্যালাইন চালানো, রক্তচাপ মাপা, পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা কিংবা এক্স-রে করার মতো পর্যাপ্ত কর্মী নেই। ফলে চিকিৎসককে নিজের কাজের বাইরেও অনেক দায়িত্ব সামলাতে হয়। আর রোগীকে দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। এটি কোনো একটি হাসপাতালের চিত্র নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিচিত বাস্তবতা। সমস্যার মূলে শুধু জনবলের ঘাটতি নয়, জনবলের অসম কাঠামোও রয়েছে।

১:৩:৭ অনুপাত কেন গুরুত্বপূর্ণ

স্বাস্থ্যসেবা কখনোই একক কোনো পেশার কাজ নয়। চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। নার্স ও ধাত্রী রোগীর শয্যাপাশে সরাসরি সেবার বড় অংশ নিশ্চিত করেন। আর প্যারামেডিক ও সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীরা পরীক্ষাগার, রোগের চিত্রায়ণ, ওষুধ সরবরাহ, ফিজিওথেরাপি, জরুরি সেবা ও স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখেন।

বৈশ্বিক আলোচনায় সাধারণত প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স ও পাঁচজন সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীর কথা বলা হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবানির্ভর দেশে আমার প্রস্তাব, কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে চিকিৎসক:নার্স:প্যারামেডিক অনুপাত ১:৩:৭ নির্ধারণ করা। এতে চিকিৎসকের সময় বাঁচবে, সেবার মান বাড়বে এবং ব্যয়ও তুলনামূলক কমবে।

বাস্তব চিত্র: সংখ্যায় এগিয়েছি, কাঠামোয় পিছিয়ে

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মানবসম্পদবিষয়ক তথ্যপত্র ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার। এর মধ্যে সেবায় নিয়োজিত আছেন প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার। নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার। ২০১৯ সালের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রীর সম্মিলিত ঘনত্ব ২০১৯ সালে প্রতি ১০ হাজারে ৮ দশমিক ৩ জন থেকে বেড়ে ১৫ দশমিক ১৬ জনে পৌঁছেছে।

কিন্তু এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত মানদণ্ড প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে ৪৪ দশমিক ৫ জন। অর্থাৎ আমরা এখনো এই মানদণ্ডের অর্ধেকেরও অনেক নিচে রয়েছি।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো জনবলের অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স আছেন একেরও কম, প্রায় ০ দশমিক ৭৫ থেকে ১ দশমিক ১ জন। অথচ কাঙ্ক্ষিত অনুপাত তিনজন। সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও কাঙ্ক্ষিত পাঁচজনের তুলনায় দুইয়ের কম। ২০১৯ সালে পরিস্থিতি ছিল আরও করুণ। তখন অনুপাত ছিল ১:০.৬:০.৩। অর্থাৎ আমরা উন্নতি করেছি, কিন্তু গন্তব্য এখনো অনেক দূরে।

নিয়োগে ভারসাম্যহীনতা

সমস্যার একটি বড় কারণ জনবল নিয়োগ ও পদ সৃষ্টির প্রচলিত ধারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ প্রায় ৩৮ হাজার ২৫৫টি। অন্যদিকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে নার্স ও ধাত্রীর পদ প্রায় ৫০ হাজার ৮২৫টি। অর্থাৎ পদ কাঠামোতেই ১:৩ অনুপাতের ধারেকাছেও যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেছেন, অতীতে জনবল সংকট দেখা দিলে নিয়োগের ক্ষেত্রে মূলত চিকিৎসকদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজনীয় ভারসাম্য উপেক্ষিত থাকত।

এর সঙ্গে রয়েছে শূন্য পদের সমস্যা। ২০২৫ সালের মানবসম্পদবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের প্রায় ৪ হাজার ৩০৮টি এবং নার্সের প্রায় ১ হাজার ৬৫৩টি পদ শূন্য ছিল। পরবর্তী সময়ের তথ্যে অনুমোদিত পদ ও শূন্য পদের সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। চিকিৎসকের প্রায় ৯ হাজার ৯৯০টি এবং নার্সের ৪ হাজার ৮৭০টি পদ খালি রয়েছে। একদিকে পদ শূন্য, অন্যদিকে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত নার্স বেকার। এটি পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ।

চাহিদার হিসাব

২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার জন্য সরকারি খাতে প্রয়োজন প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার চিকিৎসক, ৩ লাখ ৫০ হাজার নার্স এবং ৫ লাখ ১৭ হাজার অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।

সহজ হিসাবেই বিষয়টি বোঝা যায়। বর্তমানে সেবায় নিয়োজিত প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার চিকিৎসকের জন্য ১:৩ অনুপাতে প্রয়োজন প্রায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার নার্স। অথচ আছেন প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার। অর্থাৎ ঘাটতি ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। একই চিকিৎসকসংখ্যার বিপরীতে ১:৭ অনুপাতে প্রয়োজন প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার প্যারামেডিক ও সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী। এই বিশাল ঘাটতি রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কৌশলগত পরিকল্পনা।

করণীয় কী

প্রথমত, জাতীয় স্বাস্থ্য জনবল পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল—প্রতিটি পর্যায়ের জন্য ১:৩:৭ অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে জনবলের কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। চিকিৎসক নিয়োগের সময়ই প্রয়োজনীয় নার্স ও প্যারামেডিকের পদ অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, নার্সিং ও প্যারামেডিক শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজে আসনসংখ্যা বাড়ানো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষাগার ও আবাসনসুবিধা নিশ্চিত করা এবং মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউটগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি। শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস না করে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, এসব পেশায় কর্মজীবনের আকর্ষণ বাড়াতে হবে। নার্স ও প্যারামেডিকদের জন্য স্পষ্ট পদোন্নতির কাঠামো, ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং দুর্গম এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। তা না হলে প্রশিক্ষিত জনবল দেশের বাইরে চলে যাবে অথবা পেশা ছেড়ে দেবে।

চতুর্থত, অপরিকল্পিত নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার জনবলসংক্রান্ত তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভান্ডারে আনতে হবে। কোথায় কত পদ শূন্য, কোথায় কতজন প্রশিক্ষিত কর্মী বেকার—এসব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া গেলে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক হবে।

পঞ্চমত, বেসরকারি খাতকেও এই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। দেশের স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই লাইসেন্স প্রদান ও মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সেখানেও ন্যূনতম নার্স ও কারিগরি স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত নিশ্চিত করা উচিত।

ষষ্ঠত, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রশিক্ষিত নার্স বা প্যারামেডিক যেসব কাজ নিরাপদে করতে পারেন, সেসব দায়িত্ব তাঁদের হাতে দিতে হবে। এতে চিকিৎসকেরা জটিল রোগীর চিকিৎসায় বেশি সময় দিতে পারবেন।

স্বাস্থ্যসেবা একটি দলগত কাজ। চিকিৎসক সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, কিন্তু একা তিনি সাফল্য নিশ্চিত করতে পারেন না। শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালে হাসপাতালের ভবন ও শয্যা পূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেবা পূর্ণতা পাবে না। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে জনবল পরিকল্পনায় সংখ্যার চেয়ে ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

১:৩:৭ অনুপাতকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা হলে আগামী এক দশকে আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যেখানে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানেই মানুষ সময়মতো মানসম্মত সেবা পাবেন।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত