সংবাদ

মতামত

গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা

শিক্ষা একটি জাতির আত্মপরিচয়, অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ব্যক্তির জ্ঞান, বিবেক, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়ে তাকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু শিক্ষা যখন কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা, মুখস্থবিদ্যা অর্জন এবং সনদ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ এখানেই।বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে; প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন, অর্থনীতি ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। অথচ আমাদের শিক্ষার একটি বড় অংশ এখনো মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা ও প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে আবদ্ধ। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব জীবন ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কোন বিকল্প নেই। আধুনিক অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদকে অধিক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।গতানুগতিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির পরিবর্তে স্মৃতিশক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে ভালো নম্বর পাওয়া শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থী কেন একটি বিষয় শিখছে, সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কীভাবে প্রয়োগ করবে কিংবা কোনো সমস্যার নতুন সমাধান কীভাবে বের করবে—এসব প্রশ্ন অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুসন্ধিৎসা, যুক্তিবোধ ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা যথেষ্ট বিকশিত হয় না। পরীক্ষার পর মুখস্থ করা তথ্যের বড় অংশ ভুলে গেলেও পরীক্ষার ফলাফলই তার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রধান পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা মূলত শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের সংকীর্ণ ধারণার ফল।শিক্ষা যদি কেবল সনদ, নম্বর ও চাকরির প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে একটি জাতি দক্ষতার কিছু সূচক অর্জন করলেও সৃজনশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারবে না। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করবে, অনুসন্ধান করবে, ভুল থেকে শিখবে, নতুন ধারণা তৈরি করবে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে। শিক্ষা হবে জীবনের প্রস্তুতি, শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার মান, উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতার ওপর। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার কিংবা সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং একজন মানুষকে জ্ঞানী, দক্ষ, দায়িত্বশীল, মানবিক ও যুক্তিবাদী নাগরিকে পরিণত করার প্রধান উপায়। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে শিক্ষা। বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও “সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা”কে তার অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে অগ্রগতি হলেও শিক্ষার গুণগত মান, বৈষম্য, শিক্ষকতার মান, মুখস্থনির্ভরতা, পরীক্ষা-কেন্দ্রিকতা, দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা নতুন নয়।  তাই শিক্ষা সংস্কারকে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, জাতীয় অস্তিত্ব ও উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা দারিদ্র‍্য, বেকারত্ব, অসুস্থতা বা অন্য কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত না হয়। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী-নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান কর্মসূচি, শিক্ষাবৃত্তি এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য শুধু দরিদ্র মানুষের মধ্যে অর্থ বা খাদ্য বিতরণ নয়; বরং তাদের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা দারিদ্র‍্য ও বৈষম্য কমাতে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বিপুল জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র‍্য ও বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ক্রমেই বাড়ানো হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু মানুষের দুর্দশা লাঘব করে না; বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে।বর্তমান বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; বরং এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি সঠিক ও ভুলের পার্থক্য নির্ণয় করতে শেখানো না হয় এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে সততা ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়ার শিক্ষা না দেওয়া হয়, তবে কোনো দুর্নীতি দমন কমিশন, কোনো আইনগত সংস্কার কিংবা কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা একাই দুর্নীতি নির্মূল করতে পারবে না। এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু কতজন স্নাতক তৈরি হলো তার ওপর নয়; বরং তারা সমাজে কী ধরনের মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং আদর্শ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে তার ওপর। তাই মূল্যবোধভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু মানবসম্পদে বিনিয়োগ নয়; এটি জাতির নৈতিক পুঁজিতে বিনিয়োগ। শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য পরীক্ষার খাতায় কত নম্বর পাওয়া গেল, তার মধ্যে নয়; বরং একজন শিক্ষার্থী কতটা যুক্তিবাদী, দক্ষ, সৃজনশীল, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠল—তার মধ্যেই শিক্ষার আসল সার্থকতা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অতীতের মতো আবারও এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক কাজটা অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে সম্পন্ন করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে একটা বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরে যে আলাপ চলছে, সেখানে শিক্ষা একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে হাজির আছে। আলাপ উঠেছে শিক্ষা সংস্কারেরও। শিক্ষা সংস্কারে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে? গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা ও আমাদের করণীয় শীর্ষক বিভিন্ন সভা, সেমিনার এবং কর্মশালার মাধ্যমে একটি গণ আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা বিমোচনে শিক্ষা সংস্কার এর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা সংস্কার ছাড়া মানব সম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা সম্ভব নয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

গতানুগতিক শিক্ষার বিড়ম্বনা