নতুন এক বুদ্ধিবৃত্তিক মতলবি বয়ানের মুখোমুখি হয়েছেন দেশবাসী। ফেসবুক তোলপাড়; জিন্নাহ, জিন্নাহর কিসসা! গত ৫৬ বছরেও এমন হয়নি। হঠাৎ এ বছরে কেন এই জিন্নাহ গীতির এত দরকার হলো?
দুই বছর আগের আগস্ট মাসে দেশে একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। প্রাণহানিসহ বহু বিধ্বংসী ঘটনা তাতে দেখতে হয়েছিল। তো, নাটক তা নিয়ে কম হয়নি। অবশেষে মাত্র ৬ মাস আগে নির্বাচিত নতুন এক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সংসদে বিরোধী দল নামে জামায়াতে ইসলামী আর কিংস পার্টি খ্যাত এনসিপি সরকারের বিরোধিতায় সকাল-বিকেল সরব। যেন এগুলো করাই তাদের একমাত্র কাজ। তবে ছায়া বাজেট, ছায়া মন্ত্রিসভার কথাও শোনা যায়; যা নিয়ে বুঝমান পাবলিক তুমুল হাসাহাসি করে।
এই যে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত, তারা একাত্তর সালে এই বাঙালির জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে স্বজাতির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। গড়ে তুলেছিল কুখ্যাত খুনি সংগঠন রাজাকার, আলবদর, আলশাম নামের নির্মম ঘাতক বাহিনী। যদিও সে অতীত কৃতকর্মের জন্য এরা কখনো অনুশোচনার ধার ধারেনি। বরং জাতিকেই নানা ঘোরপ্যাঁচে ফেলতে সব সময় মুখিয়ে থেকেছে। এই অবস্থায়, হঠাৎ চাগাড় দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক জিন্নাহ গীতির কারণ কী?
বিগত চব্বিশের তথাকথিত ৩৬ জুলাই সফল হলে এই জামায়াতি হার্মাদরাই জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সমান্তরালে নতুন মতলবি বয়ান হাজির করেছিল। তাদের ভাষায়—চব্বিশ, জুলাই যুদ্ধ এবং জুলাই যোদ্ধা। এইটাকে তারা ব্র্যান্ডিং করার আপ্রাণ চেষ্টা করে এসেছে। তবে সাময়িক বিভ্রম জাগালেও গণরোষের মুখে ওই বয়ান ক্রমেই অচল। বরং জুলাই বললেই এখন পাবলিকের ধুম পিটুনি মিস হয় না!
কারণ দীর্ঘ ১৮ মাস এই জুলাই নামের সংঘবদ্ধ অনাসৃষ্টি দেখেছে দেশবাসী। ফলে জামায়াতীরা বুঝে গেছে, এই দেশের আপাত নিরীহ শান্ত মানুষেরা জুলাই যুদ্ধ খাবে না; লাগবে কোনো নতুন আইটেম। তাই বাজারে এনেছে তাদের ‘মরহুম ফাদারে মিল্লাত’ জিন্নাহ নামের ফেলে দেওয়া গীতিকাব্য।
এবার, ইতিহাসের ইমানদারিতে জিন্নাহ কাব্যটা খতিয়ে দেখা যাক! এই বাংলা ভূখণ্ড ১৯৪৭ সালেই এক স্বাধীন সত্তায় বিকশিত হতে পারত, যদি না দৃশ্যপটে জিন্নাহ থাকত! ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ ও নির্যাতন; একাত্তরে শতাব্দীর নির্মম গণহত্যা, গণধর্ষণ এই বাঙালি জাতিকে সইতে হতো না।
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে তখনকার নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন বসেছিল। সেই অধিবেশনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রস্তাব করেছিলেন—ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের জন্য কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে এবং রাষ্ট্রগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম থাকবে।
বস্তুত, এইটি ছিল তখনকার প্রকৃত বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর গণমানুষের মনের কথা। এটিই পরে লাহোর প্রস্তাব নামে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে। সেই স্মৃতি লাহোরে নির্মিত মনুমেন্টের গায়ে বহু ভাষায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে। প্রস্তাবটি তখনকার মুসলিম লীগের প্রধান নেতা ফাদারে মিল্লাত ব্যারিস্টার জিন্নাহ বদলে ফেলেন। তিনি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস’-এর ‘এস’ কেটে শুধু ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেট’ বানিয়ে উপস্থাপন করেন।
এ ঘটনায় শেরেবাংলার সঙ্গে তখন জিন্নাহর তুমুল বিরোধ হয়। তিনি ক্ষোভে-দুঃখে মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা থেকে মুসলিম লীগকে বের করে দেন এবং জোট করেন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে করেন অর্থমন্ত্রী। মনে রাখা দরকার, সেই লাহোর প্রস্তাবের প্রণেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির সভাপতি হিসেবে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম লীগও সেই জোট সরকারের অংশ ছিল। যদিও এই ঘটনায় পরে সে জোট ভেঙে যায়।
উল্লেখ্য যে, তখনকার আরেক জনপ্রিয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লাহোর সম্মেলনে যোগ দেননি। তার দাবি ছিল, দুই বাংলা মিলে একটি স্বাধীন যুক্তবাংলা করা। অর্থাৎ ১৯৪০ সালেই স্বাধীন ও সুবৃহৎ বাংলা নামের দেশ গড়ার সুযোগ এবং সম্ভাবনা এসেছিল। যা বিনষ্ট করেছে জিন্নাহ এবং তার অনুসারীরা।
জিন্নাহ বুঝেছিলেন, ভারতের দুই দিকে একাধিক মুসলিমপ্রধান স্বাধীন রাষ্ট্র হলে বাঙালিদের নেতৃত্বে পূর্ব এলাকা হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। আর পূর্ব-পশ্চিম এক রাষ্ট্র বানালে ক্ষমতা থাকবে পশ্চিমের হাতে, যার কেন্দ্র হবে করাচি। সহজ কথায়, তখনকার পরিস্থিতিতে, জিন্নাহ হলো স্টেটস-এর এস কেটে স্টেট বানানোর মুখ্য খেলোয়াড়; কংগ্রেসি নেহরু সেই খেলার সুযোগ করে দেওয়া ধূর্ত বানর এবং অর্ধ-উলঙ্গ বাপুজি গান্ধী ছিল দৃশ্যত এক নিমরাজি রেফারি!
সেই একটি ‘এস’ শব্দ পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ বুঝতে সক্ষম দূরদর্শী শেরেবাংলা ফজলুল হক তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তারই ফলশ্রুতি পরবর্তী ২৪ বছরের পাকিস্তানি জুলুম, নির্যাতন, দুঃশাসন; এবং শেষে একাত্তরে বাঙালির প্রাণঘাতী মুক্তিযুদ্ধ।
এক নজরে—এই হলো মরহুম জিন্নাহ গীতি, যা হঠাৎ করে সামনে আনার কারণটা বোধগম্য। সবাই বোঝেন, চব্বিশের জামায়াতি পুঁজি এই যে জুলাই, তা আদতে কোনো যুদ্ধ নয়, স্রেফ সরকারবিরোধী স্থানীয়, স্বতঃস্ফূর্ত একটি গণঅভ্যুত্থান মাত্র। এমন হয়েছে এ দেশে আগেও একাধিকবার।
সেগুলো কেউ যুদ্ধ বলেনি। পক্ষান্তরে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিশ্ব কাঁপানো আন্তর্জাতিক ঘটনা; যাতে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো ভয়ংকরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল একে অপরের বিরুদ্ধে। জুলাই তেমন কিছু নয় মোটেই। মুক্তিযুদ্ধে বিলোনিয়ার এক যুদ্ধের সঙ্গে গোটা জুলাই এক করলে আংশিক সমতাও আসবে না। ওটা জানেন জুলাই ব্যবসার তালেবরগণ। তবু মুক্তিযুদ্ধ খাটো করতে জুলাই যুদ্ধ সামনে আনার এত আয়োজন।
দেখা যাচ্ছে, জুলাইয়ের দাপুটেরা এখন একে একে ‘জুলাই কৃতিত্ব’ অস্বীকারে লাইন ধরেছে। খোদ জাতিসংঘে ইউনূস কর্তৃক পরিচয় করিয়ে দেওয়া কথিত ‘জুলাই মাস্টারমাইন্ড’ উপদেষ্টা মাহফুজ সেই খেতাব নিতে নারাজ। দুঃস্বপ্নের ১৮ মাস যার দাপটে ধরণী কেঁপেছে, সেই উপদেষ্টা সজিব ভূঁইয়া এখন ছিপি পার্টি থেকে ভাগতে চাইছে। বহু হাজার কোটি টাকা লুট ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অন্যরাও খামোশ; তড়পানি আর নেই। কেউ আর জুলাইযুদ্ধের দায় নিতে চাইছে না।
ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তো প্রকাশ্যেই দায় অস্বীকার করেছে; লুটপাটের সকল দায় সে চাপিয়েছে আসিফ, হাসনাত, মাহফুজ, নাহিদ এবং অন্য আরও জুলাইয়াদের ঘাড়ে। এমন ক্ষেত্রে আসলে এমনই ঘটে থাকে। কেউ আর দায় নিতে চায় না। এক মহা ধড়িবাজ আন্তর্জাতিক ঘোড়েলের সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল কিছু না খেতে পাওয়া চুনোপুঁটির আন্ডারা!
জামায়াতি ঘোড়েল টাকিগুলো ভালো করেই জানে, জুলাইয়ে সংঘটিত কায়েমি অনাসৃষ্টির দায় তাদের সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক দল বিএনপি ১৬ বছরব্যাপী আন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাইকে একটি মোক্ষম আন্দোলন বিবেচনা করেছিল। কিন্তু এতে জড়িত অন্যদের ধান্দা ছিল ভিন্ন; যা তারা ঘটিয়েছে দেশবাসীর চোখের সামনে। তাদের রাজনীতিবিযুক্ত আক্রমণের চাপ বিএনপিকেও সইতে হয়েছে। এখন জুলাইয়ের বিধ্বংসী জামায়াতি দায়গুলো একে একে সামনে আসছে। তা থেকে নিষ্কৃতি পেতে, ভুক্তভোগী মানুষের নজর ভিন্ন খাতে সরাতে অতএব শুরু হয়েছে জিন্নাহ ক্যারিকেচার। আহা, যেন জিন্নাহ কত বড় ইমানদার ছিল! হায়, কোল্যাটারাল ড্যামেজ কন্ট্রোল; সমান্তরাল ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক]

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নতুন এক বুদ্ধিবৃত্তিক মতলবি বয়ানের মুখোমুখি হয়েছেন দেশবাসী। ফেসবুক তোলপাড়; জিন্নাহ, জিন্নাহর কিসসা! গত ৫৬ বছরেও এমন হয়নি। হঠাৎ এ বছরে কেন এই জিন্নাহ গীতির এত দরকার হলো?
দুই বছর আগের আগস্ট মাসে দেশে একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। প্রাণহানিসহ বহু বিধ্বংসী ঘটনা তাতে দেখতে হয়েছিল। তো, নাটক তা নিয়ে কম হয়নি। অবশেষে মাত্র ৬ মাস আগে নির্বাচিত নতুন এক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সংসদে বিরোধী দল নামে জামায়াতে ইসলামী আর কিংস পার্টি খ্যাত এনসিপি সরকারের বিরোধিতায় সকাল-বিকেল সরব। যেন এগুলো করাই তাদের একমাত্র কাজ। তবে ছায়া বাজেট, ছায়া মন্ত্রিসভার কথাও শোনা যায়; যা নিয়ে বুঝমান পাবলিক তুমুল হাসাহাসি করে।
এই যে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত, তারা একাত্তর সালে এই বাঙালির জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে স্বজাতির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। গড়ে তুলেছিল কুখ্যাত খুনি সংগঠন রাজাকার, আলবদর, আলশাম নামের নির্মম ঘাতক বাহিনী। যদিও সে অতীত কৃতকর্মের জন্য এরা কখনো অনুশোচনার ধার ধারেনি। বরং জাতিকেই নানা ঘোরপ্যাঁচে ফেলতে সব সময় মুখিয়ে থেকেছে। এই অবস্থায়, হঠাৎ চাগাড় দেওয়া উদ্দেশ্যমূলক জিন্নাহ গীতির কারণ কী?
বিগত চব্বিশের তথাকথিত ৩৬ জুলাই সফল হলে এই জামায়াতি হার্মাদরাই জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সমান্তরালে নতুন মতলবি বয়ান হাজির করেছিল। তাদের ভাষায়—চব্বিশ, জুলাই যুদ্ধ এবং জুলাই যোদ্ধা। এইটাকে তারা ব্র্যান্ডিং করার আপ্রাণ চেষ্টা করে এসেছে। তবে সাময়িক বিভ্রম জাগালেও গণরোষের মুখে ওই বয়ান ক্রমেই অচল। বরং জুলাই বললেই এখন পাবলিকের ধুম পিটুনি মিস হয় না!
কারণ দীর্ঘ ১৮ মাস এই জুলাই নামের সংঘবদ্ধ অনাসৃষ্টি দেখেছে দেশবাসী। ফলে জামায়াতীরা বুঝে গেছে, এই দেশের আপাত নিরীহ শান্ত মানুষেরা জুলাই যুদ্ধ খাবে না; লাগবে কোনো নতুন আইটেম। তাই বাজারে এনেছে তাদের ‘মরহুম ফাদারে মিল্লাত’ জিন্নাহ নামের ফেলে দেওয়া গীতিকাব্য।
এবার, ইতিহাসের ইমানদারিতে জিন্নাহ কাব্যটা খতিয়ে দেখা যাক! এই বাংলা ভূখণ্ড ১৯৪৭ সালেই এক স্বাধীন সত্তায় বিকশিত হতে পারত, যদি না দৃশ্যপটে জিন্নাহ থাকত! ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ ও নির্যাতন; একাত্তরে শতাব্দীর নির্মম গণহত্যা, গণধর্ষণ এই বাঙালি জাতিকে সইতে হতো না।
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে তখনকার নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন বসেছিল। সেই অধিবেশনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রস্তাব করেছিলেন—ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের জন্য কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে এবং রাষ্ট্রগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম থাকবে।
বস্তুত, এইটি ছিল তখনকার প্রকৃত বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর গণমানুষের মনের কথা। এটিই পরে লাহোর প্রস্তাব নামে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে। সেই স্মৃতি লাহোরে নির্মিত মনুমেন্টের গায়ে বহু ভাষায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে। প্রস্তাবটি তখনকার মুসলিম লীগের প্রধান নেতা ফাদারে মিল্লাত ব্যারিস্টার জিন্নাহ বদলে ফেলেন। তিনি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস’-এর ‘এস’ কেটে শুধু ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেট’ বানিয়ে উপস্থাপন করেন।
এ ঘটনায় শেরেবাংলার সঙ্গে তখন জিন্নাহর তুমুল বিরোধ হয়। তিনি ক্ষোভে-দুঃখে মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা থেকে মুসলিম লীগকে বের করে দেন এবং জোট করেন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে করেন অর্থমন্ত্রী। মনে রাখা দরকার, সেই লাহোর প্রস্তাবের প্রণেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির সভাপতি হিসেবে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম লীগও সেই জোট সরকারের অংশ ছিল। যদিও এই ঘটনায় পরে সে জোট ভেঙে যায়।
উল্লেখ্য যে, তখনকার আরেক জনপ্রিয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লাহোর সম্মেলনে যোগ দেননি। তার দাবি ছিল, দুই বাংলা মিলে একটি স্বাধীন যুক্তবাংলা করা। অর্থাৎ ১৯৪০ সালেই স্বাধীন ও সুবৃহৎ বাংলা নামের দেশ গড়ার সুযোগ এবং সম্ভাবনা এসেছিল। যা বিনষ্ট করেছে জিন্নাহ এবং তার অনুসারীরা।
জিন্নাহ বুঝেছিলেন, ভারতের দুই দিকে একাধিক মুসলিমপ্রধান স্বাধীন রাষ্ট্র হলে বাঙালিদের নেতৃত্বে পূর্ব এলাকা হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। আর পূর্ব-পশ্চিম এক রাষ্ট্র বানালে ক্ষমতা থাকবে পশ্চিমের হাতে, যার কেন্দ্র হবে করাচি। সহজ কথায়, তখনকার পরিস্থিতিতে, জিন্নাহ হলো স্টেটস-এর এস কেটে স্টেট বানানোর মুখ্য খেলোয়াড়; কংগ্রেসি নেহরু সেই খেলার সুযোগ করে দেওয়া ধূর্ত বানর এবং অর্ধ-উলঙ্গ বাপুজি গান্ধী ছিল দৃশ্যত এক নিমরাজি রেফারি!
সেই একটি ‘এস’ শব্দ পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ বুঝতে সক্ষম দূরদর্শী শেরেবাংলা ফজলুল হক তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তারই ফলশ্রুতি পরবর্তী ২৪ বছরের পাকিস্তানি জুলুম, নির্যাতন, দুঃশাসন; এবং শেষে একাত্তরে বাঙালির প্রাণঘাতী মুক্তিযুদ্ধ।
এক নজরে—এই হলো মরহুম জিন্নাহ গীতি, যা হঠাৎ করে সামনে আনার কারণটা বোধগম্য। সবাই বোঝেন, চব্বিশের জামায়াতি পুঁজি এই যে জুলাই, তা আদতে কোনো যুদ্ধ নয়, স্রেফ সরকারবিরোধী স্থানীয়, স্বতঃস্ফূর্ত একটি গণঅভ্যুত্থান মাত্র। এমন হয়েছে এ দেশে আগেও একাধিকবার।
সেগুলো কেউ যুদ্ধ বলেনি। পক্ষান্তরে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিশ্ব কাঁপানো আন্তর্জাতিক ঘটনা; যাতে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো ভয়ংকরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল একে অপরের বিরুদ্ধে। জুলাই তেমন কিছু নয় মোটেই। মুক্তিযুদ্ধে বিলোনিয়ার এক যুদ্ধের সঙ্গে গোটা জুলাই এক করলে আংশিক সমতাও আসবে না। ওটা জানেন জুলাই ব্যবসার তালেবরগণ। তবু মুক্তিযুদ্ধ খাটো করতে জুলাই যুদ্ধ সামনে আনার এত আয়োজন।
দেখা যাচ্ছে, জুলাইয়ের দাপুটেরা এখন একে একে ‘জুলাই কৃতিত্ব’ অস্বীকারে লাইন ধরেছে। খোদ জাতিসংঘে ইউনূস কর্তৃক পরিচয় করিয়ে দেওয়া কথিত ‘জুলাই মাস্টারমাইন্ড’ উপদেষ্টা মাহফুজ সেই খেতাব নিতে নারাজ। দুঃস্বপ্নের ১৮ মাস যার দাপটে ধরণী কেঁপেছে, সেই উপদেষ্টা সজিব ভূঁইয়া এখন ছিপি পার্টি থেকে ভাগতে চাইছে। বহু হাজার কোটি টাকা লুট ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অন্যরাও খামোশ; তড়পানি আর নেই। কেউ আর জুলাইযুদ্ধের দায় নিতে চাইছে না।
ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তো প্রকাশ্যেই দায় অস্বীকার করেছে; লুটপাটের সকল দায় সে চাপিয়েছে আসিফ, হাসনাত, মাহফুজ, নাহিদ এবং অন্য আরও জুলাইয়াদের ঘাড়ে। এমন ক্ষেত্রে আসলে এমনই ঘটে থাকে। কেউ আর দায় নিতে চায় না। এক মহা ধড়িবাজ আন্তর্জাতিক ঘোড়েলের সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল কিছু না খেতে পাওয়া চুনোপুঁটির আন্ডারা!
জামায়াতি ঘোড়েল টাকিগুলো ভালো করেই জানে, জুলাইয়ে সংঘটিত কায়েমি অনাসৃষ্টির দায় তাদের সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক দল বিএনপি ১৬ বছরব্যাপী আন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাইকে একটি মোক্ষম আন্দোলন বিবেচনা করেছিল। কিন্তু এতে জড়িত অন্যদের ধান্দা ছিল ভিন্ন; যা তারা ঘটিয়েছে দেশবাসীর চোখের সামনে। তাদের রাজনীতিবিযুক্ত আক্রমণের চাপ বিএনপিকেও সইতে হয়েছে। এখন জুলাইয়ের বিধ্বংসী জামায়াতি দায়গুলো একে একে সামনে আসছে। তা থেকে নিষ্কৃতি পেতে, ভুক্তভোগী মানুষের নজর ভিন্ন খাতে সরাতে অতএব শুরু হয়েছে জিন্নাহ ক্যারিকেচার। আহা, যেন জিন্নাহ কত বড় ইমানদার ছিল! হায়, কোল্যাটারাল ড্যামেজ কন্ট্রোল; সমান্তরাল ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ!
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক]

আপনার মতামত লিখুন