ধর্মের নামে মব, বিচারের নামে বর্বরতা
সৌদি আরবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার সিতির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বাংলাদেশে অনেকেই মর্মাহত। কিন্তু এ তো শরিয়া আইনেরই প্রয়োগ। যারা এই যুক্তিতে দেশে তৌহিদী জনতার নামে পিটিয়ে মারা জায়েজ মনে করেন, তাদের এই কান্না ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। শরিয়া আইনের বীভৎস রূপ দেখে হাহুতাশ করলে তো আর পুরো শরিয়া মানা হলো না। এমন মৃত্যুদণ্ড সৌদিতে অহর্নিশ হচ্ছে। সেখানে গড়ে বছরে ৩০০ জনের বেশি মানুষের শিরোচ্ছেদ হয়। তারপরও অপরাধ কমে না। এতে প্রমাণিত, প্রকাশ্য বীভৎস শাস্তি অপরাধ কমায় না।আমরা সৌদির শিরোচ্ছেদে মৃত্যুদণ্ডে কাঁদছি, কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরে আমরা কী করছি? তৌহিদী জনতার নামে মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে, বস্তাবন্দি করে হত্যা করছি। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর এই জোশ আরও বেড়েছে। সর্বশেষ বলি সাতক্ষীরার দেবহাটার ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। ধর্ম অবমাননার একটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে প্রথম দফায় মারধর করা হয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে রাত সাড়ে আটটায় সেখানেও ঢুকে দ্বিতীয় দফায় পিটুনি দেওয়া হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেলে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের ভাষ্য, এটি পরিকল্পিত হত্যা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্স-মাস্টার্স করা, দুই শিশু সন্তানের জনক শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে কলহের কথোপকথন রেকর্ড করে ছড়ানো হয়। স্থানীয় জামায়াত অফিসে সংগঠিত হয়ে হামলা করা হয়। আর নিজেকে মুফতি পরিচয় দেওয়া ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভে ডেকে মব তৈরি করেন।আমরা এখন প্রতিদিনই এমন বস্তাবন্দি লাশ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর। টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, ঢাকায় এক সমাবেশে চরমপন্থীরা সরকারকে হুমকি দিয়েছে—ধর্ম অবমাননাকারীকে সরকার মৃত্যুদণ্ড না দিলে তারা নিজেরাই তা দেবে। এটি আইএস-আল-কায়েদার ভাষা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেক মিছিলে আইএসের পতাকা দেখা গেছে। রংপুরের তারাগঞ্জে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ হয়েছে এক হুজুরের হুমকিতে। ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের সব সরকারই প্রশ্রয় দিয়েছে। টাইমের মতে, আওয়ামী লীগ একই সঙ্গে দমন ও তুষ্ট করেছে, ভোটের জন্য কওমি মাদ্রাসা ছড়িয়ে দিয়েছে, ব্লগার হত্যায় প্রথমে উদাসীন ছিল। আবার এই কঠোর অবস্থানের বিরোধিতা করেছে বিএনপি, এমনকি হলি আর্টিজানকেও নাটক বলেছে। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত আমলে বাংলা ভাইয়ের উত্থান আমরা দেখেছি। প্রকাশ্যে হাত-পা বেঁধে উল্টো ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। ৩২টি লাশের পরিচয় মিলেছিল। সহায়তা করেছিল পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতারা। তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন বাবর।আমাদের ধর্মীয় শিক্ষায় গলদ আছে কি না, ভাবতে হবে। অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠলেই মানুষ এত হিংস্র হয় কেন? বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কথা শুনলেই রাস্তায় নেমে পড়ে। অথচ ব্যক্তিজীবনে ধর্মকর্মে একনিষ্ঠ নয়। আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শাস্তি আছে, কিন্তু ‘অনুভূতি’র কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই, দেওয়াও সম্ভব নয়। এই অস্পষ্টতার সুযোগেই চলছে হত্যার উৎসব। তালিকাটি দীর্ঘ। বাগেরহাটে ছয় বছরের শিশু মুসলিমার বস্তাবন্দি গলাকাটা লাশ, কুষ্টিয়ায় সুফি পীর শামীম রেজাকে পিটিয়ে হত্যা, ভালুকায় হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ মহাসড়কে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া, গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পোড়ানো, পটিয়ায় পার্থ বিশ্বাস, পাটগ্রামে মানসিক ভারসাম্যহীন জুয়েলকে ৪২০ মিটার টেনে পুড়িয়ে হত্যা—যেখানে ৬৫ শতাংশ ছিল কিশোর।এই মবের চেহারা দেখুন। দরবার ভাঙচুর ও হত্যায় অংশ নেওয়াদের মধ্যে শিশু, কিশোর, যুবক—দু-একজন ছাড়া কারও মুখে দাড়ি-টুপি নেই। বেশির ভাগ হাফপ্যান্ট আর লুঙ্গি পরা। তবে এদের যারা উত্তেজিত করে, তারা ভিন্ন জগতের মানুষ। তাদের বলা হয় ‘তৌহিদী জনতা’। এই বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি প্রচলিত আইন মানে না, প্রশাসন মানে না। ধর্ম নিয়ে বিতর্ককারীদের হত্যায় তারা স্বর্গীয় সুখ পায়। জিহাদের উত্তেজনায় জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারে, কবর থেকে লাশ তুলে উল্লাস করে। মানুষ পোড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এটাকে তারা ধর্ম অবমাননা মনে করে না। এমন জনগোষ্ঠী বেশি দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে। বাংলাদেশে ভোট হারানোর ভয়ে বাম-ডান সব দল এই উগ্রতাকে সমীহ করে। তাই গণতান্ত্রিক নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তুলছে।এখানেই গাজীপুরের আউচপাড়ার ঘটনাটি প্রাসঙ্গিক। সাত বছরের ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেহ উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ‘চুমু’র কথা স্বীকার করতেই স্বজনরা চড় মেরে গণপিটুনি দেন। এরপর আলেম সমাজ বলতে শুরু করেছে, ‘আইন নিজের হাতে নেবেন কেন, শিক্ষক অপরাধ করলে আইন আছে।’ অথচ এই আলেম সমাজই এত দিন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল। ন্যায্য ক্ষোভ থেকে যখন মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়, তখন বিচার থাকে না, থাকে শুধু মব। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর—এই নয় মাসে মব সহিংসতায় ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান সাইদুর রহমান ২০২৫ সালের মূল্যায়নে বলেছিলেন, ‘সমাজে অভূতপূর্ব নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। সরকার মব সহিংসতা বন্ধে কোনো উদ্যোগই নেয়নি।’ উত্তরায় ছিনতাইকারীকে পিটিয়ে ঝুলিয়ে রাখা, টঙ্গীতে তরুণকে পিটিয়ে হত্যা তারই ধারাবাহিকতা।ইসলামে মুরতাদের শাস্তি নিয়ে হাদিস আছে—‘যে দ্বীন পরিবর্তন করবে, তাকে হত্যা করো’ (বুখারি ৬৯২২)। সূরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতে অশান্তি সৃষ্টিকারীর জন্য মৃত্যুদণ্ড, শূলবিদ্ধ করা বা হাত-পা কাটার কথা আছে। কিন্তু সেখানে তওবার সুযোগ, বিচারকের রায়, সাক্ষ্য-প্রমাণের বাধ্যবাধকতাও আছে। সৌদি রাষ্ট্র যখন সেই প্রক্রিয়া না মেনে তাজিরের নামে শিরোচ্ছেদ করে, তখন তা যেমন বর্বরতা, তেমনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া তৌহিদী জনতা যখন পিটিয়ে, ঝুলিয়ে, পুড়িয়ে মারে, তখন তা আরও বড় বর্বরতা। সৌদিতে রাষ্ট্র কল্লা কাটে, বাংলাদেশে মব কল্লা কাটে—পার্থক্য শুধু তলোয়ার কার হাতে। দুটোই দেখিয়ে দেয়, ধর্মকে যখন বিচারের বদলে প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন অপরাধ কমে না, শুধু লাশের সংখ্যা বাড়ে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]