সংবাদ

বগুড়া বিয়ামে শিক্ষককে ছাত্রের প্রহার, আমাদের করণীয়


শাহানূর শাহিন
শাহানূর শাহিন
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

বগুড়া বিয়ামে শিক্ষককে ছাত্রের প্রহার, আমাদের করণীয়

বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে প্রহার করেছে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্র। খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদপত্রে আমরা দেখেছি। যা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একজন ছাত্রের জীবনে শিক্ষকের ভূমিকা আধ্যাত্মিক গুরু বা বাবা-মায়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যে শিক্ষকের হাত ধরে একটি শিশু বর্ণমালা শেখে, সেই শিক্ষককে আমরা পিতৃতুল্য সম্মান করি। অথচ সেই শিক্ষকের গায়ে ছাত্রের হাত ওঠা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের একটা ভয়াবহ সতর্ক সংকেত।

সেই ঘটনার পর অনেকেই দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন—‘জেন-জি উচ্ছন্নে গেছে’। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, একটি প্রজন্মকে এভাবে ট্যাগ দেওয়ার আগে আমাদের গভীরে গিয়ে কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। আজকের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রটি জেন-আলফা ও জেন-জির সন্ধিক্ষণে যে প্রযুক্তির কোলে বড় হয়ে উঠছে তা নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের অপ্রত্যাশিত এমন আচরণের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গভীর কারণ।

প্রথমত, পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চার অভাব: আগে যৌথ পরিবারে দাদা-দাদী, বাবা-মা, চাচা-চাচীরা মিলে একটি শিশুকে শাসন ও আদর দিয়ে বড় করতেন। এখন একক পরিবারে বাবা-মা দুজনেই কর্মব্যস্ত। সন্তানকে সময় না দিয়ে তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দামি মোবাইল। সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার মানসিক বিকাশ কেমন হচ্ছে—তার খবর রাখার সময় আমাদের নেই। আমরা মনে করছি, ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই সন্তান মানুষ হবে। কিন্তু পারিবারিক শিক্ষাই যে প্রাথমিক ও প্রধান শিক্ষা, তা আমরা ভুলে যাচ্ছি।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের নৈতিক স্খলন: দেশে যে কেবল শিক্ষা বা শিক্ষাঙ্গনের পতন ঘটেছে তা-ই নয়, পতন ঘটেছে শিক্ষাঙ্গনের সবচেয়ে বড় স্তম্ভটির—যার নাম শিক্ষক। শিক্ষকের নৈতিক স্খলন কচিমনের শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে পারে না। তারা তাদের শিক্ষককে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে দেখতে চায়।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তির অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: আজকের কিশোরের হাতে ইন্টারনেট মানে গোটা পৃথিবী। কিন্তু এই পৃথিবীর ভালো-মন্দ বাছাই করার বোধ তার এখনো তৈরি হয়নি। টিকটক, রিলস, ইউটিউবে ভায়োলেন্স, গালাগালি, শিক্ষককে অপমান করে মজা করা—এসব কনটেন্ট ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা তাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা তৈরি করছে যে, উদ্ধত আচরণই হলো স্মার্টনেস। তারা বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতের পার্থক্য করতে পারছে না।

চতুর্থত, শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অতিরিক্ত আদর: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের শাসন করার অধিকার প্রায় কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একটু শাসন করলেই অভিভাবক এসে শিক্ষককে হুমকি দিচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা করছেন। ফলে শিক্ষকেরা ভয়ে ছাত্রদের অন্যায়কেও এড়িয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে পরিবারে এক-দুটি সন্তান হওয়ায় আমরা তাদের কোনো ‘না’ বলছি না। সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতির একমাত্র কিশোর সন্তানের খুনের নেপথ্যে দামি বাইক ও আইফোন—সন্তানদের সব আবদার পূরণ করতে গিয়ে আমরা তাদের সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছি।

পঞ্চমত, সামাজিক অবক্ষয় ও আদর্শের সংকট: শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা যখন দেখে রাজনীতিতে, সমাজে, টেলিভিশনে বড়রা একে অপরকে অসম্মান করছে, গালাগালি করছে, শক্তি প্রদর্শন করছে, তখন তারাও মনে করছে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের সমাজে এখন আর বিনয়, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতাকে বড় গুণ হিসেবে দেখা হয় না।

তাহলে প্রতিকার কী? এই প্রজন্মকে কি আমরা গালমন্দ করবো, বখে যাওয়া বলে উপেক্ষা করবো? না, তা করা যাবে না। তাদের পথ দেখাতে হবে।

১. পরিবারকে ফিরতে হবে তার ভূমিকায়: সন্তানকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিতে হবে বাবা-মায়ের। প্রতিদিন অন্তত একবেলা একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, সন্তানদের বন্ধুদের সম্পর্কে জানা। সন্তানের সামনে শিক্ষক ও বড়দের সম্মান করে কথা বলা। মোবাইল ফোন ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও সময় বেঁধে দেওয়া।

২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার পুনরুজ্জীবন: বিয়াম স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু ‘এ প্লাস’ নয়, মূল্যবোধের শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে গল্পের মাধ্যমে শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ধৈর্যের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সামাজিক-পারিবারিক মেলবন্ধন ও মানবিক দিক জাগ্রত হয় এমন সিনেমা স্কুলে দেখানোর সুযোগ করে দিতে হবে। শিক্ষকদের হাতে যৌক্তিক শাসনের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে, তবে তা অবশ্যই শারীরিক নির্যাতন নয়।

৩. কাউন্সেলিং ও মেন্টারিং: প্রতিটি স্কুলে একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর থাকা জরুরি। যে ছাত্রটি শিক্ষককে প্রহার করেছে, সে হয়তো ভেতরে ভেতরে কোনো মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা বা পারিবারিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য কলহ প্রায় প্রতিটি পরিবারেই লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্তানরা বাবা-মায়ের ঝগড়া-মারামারি দেখে বেড়ে উঠছে, ফলে তারা দিন দিন অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছে। 

বিয়াম স্কুলের এই ছাত্রটিকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ও স্কুল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারই কি এর সমাধান? এই ছাত্রটি এখন কোন স্কুলে ভর্তি হবে, তার মানসিক অবস্থা কী হবে? নতুন বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে? তাই এসব নতুন করে ভাবতে হবে। বহিষ্কার নয়, তার কাউন্সেলিং প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও কাউন্সেলিং প্রয়োজন।

৪. প্রযুক্তি ইতিবাচক ব্যবহার শেখানো: প্রযুক্তিকে শত্রু  না বানিয়ে বন্ধু বানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের গণিত অলিম্পিয়াড, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক, আবৃত্তি, উপস্থাপনা, চিত্রাঙ্কন, প্রোগ্রামিং, কোডিংয়ের মতো সৃজনশীল কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা ফালতু টিকটক দেখার সময় না পায়।

বগুড়ার এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি ‘ওয়েক-আপ কল’। আসুন, আমরা জেন-জিকে দোষারোপ না করে তাদের হাত ধরে সঠিক পথ দেখাই। কারণ এই প্রজন্মের কাছেই আমরা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে রেখে যাব। এই প্রজন্মই আগামীর বাংলাদেশ। তাদের যদি আমরা সঠিক পথে পরিচালিত করতে না পারি, তবে সেই দায় আমাদেরই নিতে হবে। 

কবি হেলাল হাফিজের ভাষায় বলতে হয়— মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক, এরকম দুঃসময়ে আমরা যদি আমাদের সন্তানকে সঠিক পথ দেখাতে না পারি, তাহলে উত্তরপুরুষে ভীরু, স্বার্থপর, কাপুরুষের উপমা হব। এমন দুর্দিনে সন্তান মানুষ না করে যদি শুধু আমরা সম্পদের পাহাড় গড়ি, তবে লাভ নেই। শিক্ষক-ছাত্রের এই পবিত্র সম্পর্ককে রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬


বগুড়া বিয়ামে শিক্ষককে ছাত্রের প্রহার, আমাদের করণীয়

প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে প্রহার করেছে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্র। খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদপত্রে আমরা দেখেছি। যা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একজন ছাত্রের জীবনে শিক্ষকের ভূমিকা আধ্যাত্মিক গুরু বা বাবা-মায়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যে শিক্ষকের হাত ধরে একটি শিশু বর্ণমালা শেখে, সেই শিক্ষককে আমরা পিতৃতুল্য সম্মান করি। অথচ সেই শিক্ষকের গায়ে ছাত্রের হাত ওঠা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের একটা ভয়াবহ সতর্ক সংকেত।

সেই ঘটনার পর অনেকেই দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন—‘জেন-জি উচ্ছন্নে গেছে’। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, একটি প্রজন্মকে এভাবে ট্যাগ দেওয়ার আগে আমাদের গভীরে গিয়ে কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। আজকের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রটি জেন-আলফা ও জেন-জির সন্ধিক্ষণে যে প্রযুক্তির কোলে বড় হয়ে উঠছে তা নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের অপ্রত্যাশিত এমন আচরণের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গভীর কারণ।

প্রথমত, পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চার অভাব: আগে যৌথ পরিবারে দাদা-দাদী, বাবা-মা, চাচা-চাচীরা মিলে একটি শিশুকে শাসন ও আদর দিয়ে বড় করতেন। এখন একক পরিবারে বাবা-মা দুজনেই কর্মব্যস্ত। সন্তানকে সময় না দিয়ে তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দামি মোবাইল। সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার মানসিক বিকাশ কেমন হচ্ছে—তার খবর রাখার সময় আমাদের নেই। আমরা মনে করছি, ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই সন্তান মানুষ হবে। কিন্তু পারিবারিক শিক্ষাই যে প্রাথমিক ও প্রধান শিক্ষা, তা আমরা ভুলে যাচ্ছি।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের নৈতিক স্খলন: দেশে যে কেবল শিক্ষা বা শিক্ষাঙ্গনের পতন ঘটেছে তা-ই নয়, পতন ঘটেছে শিক্ষাঙ্গনের সবচেয়ে বড় স্তম্ভটির—যার নাম শিক্ষক। শিক্ষকের নৈতিক স্খলন কচিমনের শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে পারে না। তারা তাদের শিক্ষককে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে দেখতে চায়।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তির অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: আজকের কিশোরের হাতে ইন্টারনেট মানে গোটা পৃথিবী। কিন্তু এই পৃথিবীর ভালো-মন্দ বাছাই করার বোধ তার এখনো তৈরি হয়নি। টিকটক, রিলস, ইউটিউবে ভায়োলেন্স, গালাগালি, শিক্ষককে অপমান করে মজা করা—এসব কনটেন্ট ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা তাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা তৈরি করছে যে, উদ্ধত আচরণই হলো স্মার্টনেস। তারা বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতের পার্থক্য করতে পারছে না।

চতুর্থত, শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অতিরিক্ত আদর: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের শাসন করার অধিকার প্রায় কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একটু শাসন করলেই অভিভাবক এসে শিক্ষককে হুমকি দিচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা করছেন। ফলে শিক্ষকেরা ভয়ে ছাত্রদের অন্যায়কেও এড়িয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে পরিবারে এক-দুটি সন্তান হওয়ায় আমরা তাদের কোনো ‘না’ বলছি না। সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতির একমাত্র কিশোর সন্তানের খুনের নেপথ্যে দামি বাইক ও আইফোন—সন্তানদের সব আবদার পূরণ করতে গিয়ে আমরা তাদের সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছি।

পঞ্চমত, সামাজিক অবক্ষয় ও আদর্শের সংকট: শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা যখন দেখে রাজনীতিতে, সমাজে, টেলিভিশনে বড়রা একে অপরকে অসম্মান করছে, গালাগালি করছে, শক্তি প্রদর্শন করছে, তখন তারাও মনে করছে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের সমাজে এখন আর বিনয়, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতাকে বড় গুণ হিসেবে দেখা হয় না।

তাহলে প্রতিকার কী? এই প্রজন্মকে কি আমরা গালমন্দ করবো, বখে যাওয়া বলে উপেক্ষা করবো? না, তা করা যাবে না। তাদের পথ দেখাতে হবে।

১. পরিবারকে ফিরতে হবে তার ভূমিকায়: সন্তানকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিতে হবে বাবা-মায়ের। প্রতিদিন অন্তত একবেলা একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, সন্তানদের বন্ধুদের সম্পর্কে জানা। সন্তানের সামনে শিক্ষক ও বড়দের সম্মান করে কথা বলা। মোবাইল ফোন ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও সময় বেঁধে দেওয়া।

২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার পুনরুজ্জীবন: বিয়াম স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু ‘এ প্লাস’ নয়, মূল্যবোধের শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে গল্পের মাধ্যমে শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ধৈর্যের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সামাজিক-পারিবারিক মেলবন্ধন ও মানবিক দিক জাগ্রত হয় এমন সিনেমা স্কুলে দেখানোর সুযোগ করে দিতে হবে। শিক্ষকদের হাতে যৌক্তিক শাসনের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে, তবে তা অবশ্যই শারীরিক নির্যাতন নয়।

৩. কাউন্সেলিং ও মেন্টারিং: প্রতিটি স্কুলে একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর থাকা জরুরি। যে ছাত্রটি শিক্ষককে প্রহার করেছে, সে হয়তো ভেতরে ভেতরে কোনো মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা বা পারিবারিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য কলহ প্রায় প্রতিটি পরিবারেই লক্ষ করা যাচ্ছে। সন্তানরা বাবা-মায়ের ঝগড়া-মারামারি দেখে বেড়ে উঠছে, ফলে তারা দিন দিন অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছে। 

বিয়াম স্কুলের এই ছাত্রটিকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ও স্কুল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারই কি এর সমাধান? এই ছাত্রটি এখন কোন স্কুলে ভর্তি হবে, তার মানসিক অবস্থা কী হবে? নতুন বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে? তাই এসব নতুন করে ভাবতে হবে। বহিষ্কার নয়, তার কাউন্সেলিং প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও কাউন্সেলিং প্রয়োজন।

৪. প্রযুক্তি ইতিবাচক ব্যবহার শেখানো: প্রযুক্তিকে শত্রু  না বানিয়ে বন্ধু বানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের গণিত অলিম্পিয়াড, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক, আবৃত্তি, উপস্থাপনা, চিত্রাঙ্কন, প্রোগ্রামিং, কোডিংয়ের মতো সৃজনশীল কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা ফালতু টিকটক দেখার সময় না পায়।

বগুড়ার এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি ‘ওয়েক-আপ কল’। আসুন, আমরা জেন-জিকে দোষারোপ না করে তাদের হাত ধরে সঠিক পথ দেখাই। কারণ এই প্রজন্মের কাছেই আমরা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে রেখে যাব। এই প্রজন্মই আগামীর বাংলাদেশ। তাদের যদি আমরা সঠিক পথে পরিচালিত করতে না পারি, তবে সেই দায় আমাদেরই নিতে হবে। 

কবি হেলাল হাফিজের ভাষায় বলতে হয়— মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক, এরকম দুঃসময়ে আমরা যদি আমাদের সন্তানকে সঠিক পথ দেখাতে না পারি, তাহলে উত্তরপুরুষে ভীরু, স্বার্থপর, কাপুরুষের উপমা হব। এমন দুর্দিনে সন্তান মানুষ না করে যদি শুধু আমরা সম্পদের পাহাড় গড়ি, তবে লাভ নেই। শিক্ষক-ছাত্রের এই পবিত্র সম্পর্ককে রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত