সংবাদ

‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ জয় বাংলা’ স্লোগান!


আনোয়ারুল হক
আনোয়ারুল হক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ জয় বাংলা’ স্লোগান!
সিপিবি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মব হামলা

“জয় বাংলা বলতে মনরে আমার এখনো কেন ভাবো/আমার হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাবো/অন্ধকারে পুবাকাশে উঠবে আবার দিনমণি”। —মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এ গান শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নয়, গোটা দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করত স্বাধীনতার মরণপণ লড়াইয়ে। মুক্তিযুদ্ধ তো শুধু স্বাধীনতার যুদ্ধ নয়, আমাদের কাছে এক আবেগময় অনুভূতিও বটে। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি জয় বাংলা স্লোগানও আমাদের ভালোবাসার ও অতি আপন স্লোগান।

১৯৭০ সালে ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আবুল খায়ের ছয় দফার আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ হাসান ইমাম ও কবরী অভিনীত ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। গীতিকার ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। চলচ্চিত্রটি সে বছর সেন্সরে জমা পড়লেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার চলচ্চিত্রটির মুক্তি আটকে দিলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তা মুক্তি পায়। কিন্তু ‘৭০ সালেই এ সিনেমার জন্য রেকর্ড করা শাহনাজ রহমতুল্লাহ এবং মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কণ্ঠে কালজয়ী গান “জয় বাংলা বাংলার জয়/হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়/কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে/নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়...” প্রকাশ পেলে তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনাসংগীত হিসেবে প্রচারিত হতো।

জয় বাংলা, বাংলার জয়—মিশে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। জয় বাংলা স্লোগানের প্রতীকী শক্তিকে তুলে ধরতে একটি কৌতুকের প্রচলন হয়েছিল। গল্পটি এমন—১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী চুল কাটাচ্ছেন। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান! ভয়ে তাঁর চুল খাড়া হয়ে গেল। নাপিত তখন মুচকি হেসে বললেন, ‘স্যার, আমি যখনই জয় বাংলা বলি, আপনার চুল খাড়া হয়ে যায়, আর আমার চুল কাটতে সুবিধা হয়!’ এটি নিছক একটি রম্য গল্প বা কাল্পনিক কৌতুক হলেও এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রতীকী শক্তি এবং একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য।

এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় যে, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বা দেশের সংবিধানে ঘোষিত মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ বা বিরোধী গোষ্ঠী তথা জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকার-আলবদর বাহিনীর বর্তমান সংস্করণ যারা আছেন, তাদের এ স্লোগানে গাত্রদাহ হয়। কিন্তু বিএনপির কেন গাত্রদাহ হতে যাবে? জয় বাংলা তো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বা বাংলাদেশ চিরজীবী হোক স্লোগানকে নাকচ করে না। বা এর সঙ্গে বিরোধাত্মকও নয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কোনো এক মিছিল থেকে নাকি জয় বাংলা ধ্বনি শোনা গেছে। এ অভিযোগে বিএনপির নাম ব্যবহার করে সিপিবি অফিসের সামনে গভীর রাতে মব করা হলো। কয়েকজনকে মারধর করা হলো। সিপিবি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া দল। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় সিপিবির কোনো কর্মী এ স্লোগান উচ্চারণ করতেই পারে। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংযোগ বা সংশ্লিষ্টতা নেই, সংশ্লিষ্টতা আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের। মুক্তিযোদ্ধার দাফনে জামায়াত-শিবির বাধা প্রদান করলে বা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ওপর হামলা হলে এবং তার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হতে হলে ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারিত হতেই পারে। যদিও সিপিবির মূল রণধ্বনি এটা নয়, আবার এ স্লোগান পরিত্যক্তও নয়। যতটুকু জানি, স্বাধীন দেশে সিপিবির মূল স্লোগান—ভাত, কাপড়, জমি, কাজ। তবে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাই যদি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, স্লোগানও তো পরিবর্তিত হতে পারে।

এটাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে বাংলার মানুষ জয় বাংলাকে কিন্তু শুধু স্লোগান হিসেবেই দেখেনি। জয় বাংলার মাঝে খুঁজে পেতে চেয়েছে শোষণমুক্তি, গণতন্ত্র, সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা। ভালোবাসার রত্নকে মানুষ যত্রতত্র ব্যবহার করে না। তাতে রত্ন তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। ঠিক তেমনি আমাদের ভালোবাসার মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনিও সারাক্ষণ জপ করার বিষয় নয়। বিশেষত, যদি কোনো শাসকদল তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, কর্তৃত্ববাদী শাসন, জবরদস্তি ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা, আর্থিক খাতে লুণ্ঠন ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন ইত্যাদি গণবিরোধী কর্মকাণ্ডকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ও চেতনাকে হরহামেশা জপ করে থাকেন, তখন আর মুক্তিযুদ্ধ ও তার রণধ্বনি মানুষের মাঝে, বিশেষত বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে গভীর আবেদন সৃষ্টি করে না।

বাংলাদেশের গৌরবময় জন্ম-ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ সময় যাবৎ যে একঘেয়ে রেকর্ড বাজানো হয়েছে এবং ইতিহাসকে অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, তা তরুণ প্রজন্মের মাঝে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাসও ঠিক ষাটোর্ধ্ব প্রজন্মের ন্যায় আজকের তরুণদের মনে একই ধরনের আবেগ সৃষ্টি করে না। অথচ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণে মোট কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ সমাজ। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতন্ত্রের চশমা পরে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে চায়। এসব চাহিদা পূরণ না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুও তাদের কাছে অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সেই তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষায় যদি রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করা না যায়, কথায় কথায় জয় বাংলা বলে মনের ঝাল মেটানো হয়তো যাবে, কিন্তু রাজনীতিটা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই আজ যারা দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাসহ দেশের ইতিহাসকেই মুছে ফেলতে চায়, তাদের পরাভূত করতে হলে রাজনীতিটাকে পাথরের মতো স্থির হিসেবে না দেখে সৃজনশীলতার সঙ্গে তা নতুন ভাষায়, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

আবার অপব্যবহার হয়েছে বলেই কি মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি পরিত্যাগ করতে হবে? নিশ্চয়ই নয়। তবে ফাঁপা বুলি হিসেবে না জপে অসমাপ্ত জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আর বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে। সেটাই সৃজনশীলতা। এ ক্ষেত্রে লেজুড়বৃত্তির জুজু দেখলে বিচ্ছিন্নতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

এটা তো স্পষ্ট যে ২০২৪-এর রক্তাক্ত ঘটনাবলির পরে এমন এক উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান হয়েছে, তারা মুখে যা-ই বলুক, তাদের আক্রোশ কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা রেজিমের চেয়ে ’৭১-এর ওপরই বেশি। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারছে না, ’৭১-এর আগেই ভালো ছিলাম। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিএনপি কর্মীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সিপিবি অফিসে মব হামলা করবে, এটা বিশ্বাস হতে চায় না। ধারণা করি, দেশকে আরও অস্থিতিশীল করতে চায়, এমন শক্তি এ ঘটনার পেছনে থাকতে পারে।

অস্থিতিশীলতার বিপদকে মোকাবিলা করতে হলে বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে, তাদের দলকে সমর্থন করেন না, এমন বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার দেশ পরিচালনা করবেন। দেশের জন্মযুদ্ধবিরোধী শক্তির কাছে এবার অন্তত নত হবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগের মতো একতরফা বয়ান না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সামরিক নেতৃত্বকে মর্যাদা দেওয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বিএনপিকে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেটা বিএনপি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলে বিভাজনের শক্তি ও উগ্রপন্থা পরাজিত হবে। কিন্তু বিএনপি ইতিমধ্যে ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের’ ইউনূসীয় ভূতে আচ্ছন্ন। এখন ‘জয় বাংলা স্লোগানের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করে’ কি বিএনপি অস্থিতিশীলতার শক্তির পাতা ফাঁদে পা দেবে?

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬


‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ জয় বাংলা’ স্লোগান!

প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

“জয় বাংলা বলতে মনরে আমার এখনো কেন ভাবো/আমার হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাবো/অন্ধকারে পুবাকাশে উঠবে আবার দিনমণি”। —মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এ গান শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নয়, গোটা দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করত স্বাধীনতার মরণপণ লড়াইয়ে। মুক্তিযুদ্ধ তো শুধু স্বাধীনতার যুদ্ধ নয়, আমাদের কাছে এক আবেগময় অনুভূতিও বটে। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি জয় বাংলা স্লোগানও আমাদের ভালোবাসার ও অতি আপন স্লোগান।

১৯৭০ সালে ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আবুল খায়ের ছয় দফার আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে প্রখ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ হাসান ইমাম ও কবরী অভিনীত ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। গীতিকার ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। চলচ্চিত্রটি সে বছর সেন্সরে জমা পড়লেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার চলচ্চিত্রটির মুক্তি আটকে দিলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তা মুক্তি পায়। কিন্তু ‘৭০ সালেই এ সিনেমার জন্য রেকর্ড করা শাহনাজ রহমতুল্লাহ এবং মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কণ্ঠে কালজয়ী গান “জয় বাংলা বাংলার জয়/হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়/কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে/নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়...” প্রকাশ পেলে তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনাসংগীত হিসেবে প্রচারিত হতো।

জয় বাংলা, বাংলার জয়—মিশে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। জয় বাংলা স্লোগানের প্রতীকী শক্তিকে তুলে ধরতে একটি কৌতুকের প্রচলন হয়েছিল। গল্পটি এমন—১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী চুল কাটাচ্ছেন। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান! ভয়ে তাঁর চুল খাড়া হয়ে গেল। নাপিত তখন মুচকি হেসে বললেন, ‘স্যার, আমি যখনই জয় বাংলা বলি, আপনার চুল খাড়া হয়ে যায়, আর আমার চুল কাটতে সুবিধা হয়!’ এটি নিছক একটি রম্য গল্প বা কাল্পনিক কৌতুক হলেও এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রতীকী শক্তি এবং একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য।

এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় যে, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বা দেশের সংবিধানে ঘোষিত মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ বা বিরোধী গোষ্ঠী তথা জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকার-আলবদর বাহিনীর বর্তমান সংস্করণ যারা আছেন, তাদের এ স্লোগানে গাত্রদাহ হয়। কিন্তু বিএনপির কেন গাত্রদাহ হতে যাবে? জয় বাংলা তো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বা বাংলাদেশ চিরজীবী হোক স্লোগানকে নাকচ করে না। বা এর সঙ্গে বিরোধাত্মকও নয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কোনো এক মিছিল থেকে নাকি জয় বাংলা ধ্বনি শোনা গেছে। এ অভিযোগে বিএনপির নাম ব্যবহার করে সিপিবি অফিসের সামনে গভীর রাতে মব করা হলো। কয়েকজনকে মারধর করা হলো। সিপিবি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া দল। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় সিপিবির কোনো কর্মী এ স্লোগান উচ্চারণ করতেই পারে। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংযোগ বা সংশ্লিষ্টতা নেই, সংশ্লিষ্টতা আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের। মুক্তিযোদ্ধার দাফনে জামায়াত-শিবির বাধা প্রদান করলে বা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ওপর হামলা হলে এবং তার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হতে হলে ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারিত হতেই পারে। যদিও সিপিবির মূল রণধ্বনি এটা নয়, আবার এ স্লোগান পরিত্যক্তও নয়। যতটুকু জানি, স্বাধীন দেশে সিপিবির মূল স্লোগান—ভাত, কাপড়, জমি, কাজ। তবে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাই যদি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, স্লোগানও তো পরিবর্তিত হতে পারে।

এটাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে বাংলার মানুষ জয় বাংলাকে কিন্তু শুধু স্লোগান হিসেবেই দেখেনি। জয় বাংলার মাঝে খুঁজে পেতে চেয়েছে শোষণমুক্তি, গণতন্ত্র, সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা। ভালোবাসার রত্নকে মানুষ যত্রতত্র ব্যবহার করে না। তাতে রত্ন তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। ঠিক তেমনি আমাদের ভালোবাসার মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনিও সারাক্ষণ জপ করার বিষয় নয়। বিশেষত, যদি কোনো শাসকদল তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, কর্তৃত্ববাদী শাসন, জবরদস্তি ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা, আর্থিক খাতে লুণ্ঠন ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন ইত্যাদি গণবিরোধী কর্মকাণ্ডকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ও চেতনাকে হরহামেশা জপ করে থাকেন, তখন আর মুক্তিযুদ্ধ ও তার রণধ্বনি মানুষের মাঝে, বিশেষত বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মাঝে গভীর আবেদন সৃষ্টি করে না।

বাংলাদেশের গৌরবময় জন্ম-ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ সময় যাবৎ যে একঘেয়ে রেকর্ড বাজানো হয়েছে এবং ইতিহাসকে অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, তা তরুণ প্রজন্মের মাঝে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক ইতিহাসও ঠিক ষাটোর্ধ্ব প্রজন্মের ন্যায় আজকের তরুণদের মনে একই ধরনের আবেগ সৃষ্টি করে না। অথচ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণে মোট কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশ হচ্ছে তরুণ সমাজ। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও গণতন্ত্রের চশমা পরে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে চায়। এসব চাহিদা পূরণ না হলে মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুও তাদের কাছে অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সেই তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষায় যদি রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করা না যায়, কথায় কথায় জয় বাংলা বলে মনের ঝাল মেটানো হয়তো যাবে, কিন্তু রাজনীতিটা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই আজ যারা দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাসহ দেশের ইতিহাসকেই মুছে ফেলতে চায়, তাদের পরাভূত করতে হলে রাজনীতিটাকে পাথরের মতো স্থির হিসেবে না দেখে সৃজনশীলতার সঙ্গে তা নতুন ভাষায়, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

আবার অপব্যবহার হয়েছে বলেই কি মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি পরিত্যাগ করতে হবে? নিশ্চয়ই নয়। তবে ফাঁপা বুলি হিসেবে না জপে অসমাপ্ত জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আর বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে। সেটাই সৃজনশীলতা। এ ক্ষেত্রে লেজুড়বৃত্তির জুজু দেখলে বিচ্ছিন্নতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

এটা তো স্পষ্ট যে ২০২৪-এর রক্তাক্ত ঘটনাবলির পরে এমন এক উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান হয়েছে, তারা মুখে যা-ই বলুক, তাদের আক্রোশ কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা রেজিমের চেয়ে ’৭১-এর ওপরই বেশি। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারছে না, ’৭১-এর আগেই ভালো ছিলাম। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিএনপি কর্মীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সিপিবি অফিসে মব হামলা করবে, এটা বিশ্বাস হতে চায় না। ধারণা করি, দেশকে আরও অস্থিতিশীল করতে চায়, এমন শক্তি এ ঘটনার পেছনে থাকতে পারে।

অস্থিতিশীলতার বিপদকে মোকাবিলা করতে হলে বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে, তাদের দলকে সমর্থন করেন না, এমন বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার দেশ পরিচালনা করবেন। দেশের জন্মযুদ্ধবিরোধী শক্তির কাছে এবার অন্তত নত হবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগের মতো একতরফা বয়ান না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সামরিক নেতৃত্বকে মর্যাদা দেওয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বিএনপিকে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেটা বিএনপি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলে বিভাজনের শক্তি ও উগ্রপন্থা পরাজিত হবে। কিন্তু বিএনপি ইতিমধ্যে ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের’ ইউনূসীয় ভূতে আচ্ছন্ন। এখন ‘জয় বাংলা স্লোগানের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করে’ কি বিএনপি অস্থিতিশীলতার শক্তির পাতা ফাঁদে পা দেবে?

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত