সংবাদ

উচ্চশিক্ষার সংস্কার: সমতা, জবাবদিহি ও আধুনিকায়ন জরুরি


ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ
ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১০ পিএম

উচ্চশিক্ষার সংস্কার: সমতা, জবাবদিহি ও আধুনিকায়ন জরুরি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা গভীর কাঠামোগত স্থবিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সনদকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়েছিল। বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গেও এর তেমন সংযোগ ছিল না। ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ করা উচিত। তবে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর আমাদের শিক্ষা বাজেট জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২৬ু২৭ অর্থবছরে তা ২ শতাংশে উন্নীত করা হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এটি এখনো সর্বনিম্ন। ইউনেসকোর বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বারবার বাজেটের এই সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তা ছাড়া, এই বরাদ্দের বড় অংশ অবকাঠামো ও প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হয়। উদ্ভাবন ও গবেষণায় এর অবদান সামান্য।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘ সময় পরও উপযুক্ত কর্মসংস্থান পেতে ব্যর্থ হয়। এর প্রধান কারণ শিল্প খাতের ব্যবহারিক চাহিদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগেও আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো দুই দশক আগের পাঠ্যসূচি আঁকড়ে ধরে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। ঔপনিবেশিক শাসনামলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা মূলত পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একধরনের ঐতিহাসিক সামাজিক চুক্তির ফল ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর যে রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল আংশিকভাবে একটি প্রতিকারমূলক উদ্যোগ। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

প্রকৃতপক্ষে, এটি সুবিধাভোগীদের জন্য নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই অর্থে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সামাজিক অগ্রগতির একটি প্রতিষ্ঠান। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি গ্রামীণ কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা এবং সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান সোপান হিসেবে কাজ করেছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান কি এখন নতুন ধরনের বৈষম্যকে বৈধতা দেয়, এমন নীতি গ্রহণ করবে?

বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাধারা বা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার বিষয়টি জুলাই-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য একটি নৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীদের জন্য সাম্প্রতিক ভর্তি মানদণ্ড এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) বলেছিলেন, ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক শর্ত হলো একই ধরনের পরিস্থিতিতে একই নীতি প্রয়োগ করা। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদনকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড চালু করা হলে ন্যায়বিচারের এই সর্বজনীন নীতি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মার্কিন দার্শনিক জন রলসের (১৯২১-২০০২) ‘এ থিওরি অব জাস্টিস’ গ্রন্থ অনুযায়ী, বৈষম্য কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উপকারে আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন প্রশ্ন হলো, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা কি সেই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন? প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, দেশীয় ও বিদেশি উভয় পাঠ্যক্রম অনুসরণকারী ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অভিজাত শিক্ষাধারাগুলোর একটি। এই ধারার শিক্ষার্থীরা সাধারণত তুলনামূলকভাবে উন্নত ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং বৈশ্বিক শিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। অবশ্যই এর ব্যতিক্রম রয়েছে। কিন্তু নীতি প্রণয়ন করতে হয় সামগ্রিক বাস্তবতার ভিত্তিতে, ব্যতিক্রমের ভিত্তিতে নয়। সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে কোথাও বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হলে তা হওয়া উচিত তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য। ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক কল্পনা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোরও অংশ। এর ইতিহাস সাধারণ মানুষের ইতিহাস। এর অর্জন সামাজিক অগ্রগতির প্রতিফলন। আর এর নৈতিক শক্তি নিহিত রয়েছে মেধার প্রতি অঙ্গীকারের মধ্যে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, অন্যান্য শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং সাফল্য অর্জনের সুযোগ থাকতে হবে। তবে সেই সাফল্য আসতে হবে সমান প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে নয়।

কারণ, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থী নির্বাচন করা নয়। সমাজকে এই নৈতিক বার্তা দেওয়াও তার দায়িত্ব যে, সব শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সমান। তবে স্বীকৃতি অর্জন করতে হবে ব্যক্তিগত মেধা, কঠোর পরিশ্রম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। অতএব, আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রশ্ন একটাই: বিশ্ববিদ্যালয়টি কি তার শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ, সামাজিক ন্যায়বিচারের ঐতিহ্য এবং জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অর্জিত মর্যাদা সংরক্ষণ করবে? নাকি দেশের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের অসুবিধায় ফেলে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে?

প্রশ্ন উঠছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৩ সালের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে? এই আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালিত হওয়ার কথা। আইনে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে কি উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে? বিভিন্ন পর্যায়ে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি নিজের পরিচালনাসংক্রান্ত আইন মেনে চলতে না পারে, তাহলে সমসাময়িক চাহিদা পূরণের জন্য সেই আইন আধুনিকায়ন করা উচিত নয় কি? এ ধরনের আধুনিকায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি?

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষকদের ব্যাপক স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হন না। কখনো কখনো কেবল তাঁদের ইচ্ছা না হওয়ার কারণেই ক্লাসে যান না। অনেক শিক্ষক সময়মতো পাঠ্যসূচি শেষ করতে পারেন না। এতে সেশনজট তৈরি হয়। শিক্ষকদের মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রতিও তাঁদের যথেষ্ট মনোযোগ নেই। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সুনাম বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করতে হবে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল না মিলিয়ে কেবল মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করা কোনো সুবিবেচনাপ্রসূত পদ্ধতি নয়। ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও অর্থবহ গবেষণা—দুই ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা আশা করি, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগরসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসৃত পদ্ধতি গ্রহণ করবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে এবং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে—এটাই প্রত্যাশা।

প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন বুঝতে পেরেছে যে, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্পন্ন একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা অসম্ভব, তখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই বাস্তবতা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে, কেবল মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে পেশাদারত্বের সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব নয়।

সাহসিকতার সঙ্গে উদ্যোগ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম উপাচার্য শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংশোধিত বিধিমালা অনুমোদন করান। এরপর মৌখিক সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা, উপস্থাপনা, প্রদর্শনীমূলক ক্লাসসহ অন্যান্য পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও একই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ শুরু করে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি।

বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ভুলে গেলে চলবে না যে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এক ডজনেরও বেশি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। অথচ জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য কোনো কমিশন গঠন করেনি। ফলে সংবিধান, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের মতো ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া এখনো চলছে। কিন্তু ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি।

বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নস্তরে, বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার জন্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকার যদি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের সংস্কার করতে চায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনৈতিক আনুগত্যের চর্চা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক মান উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে ১৯৭৩ সালের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আইন আধুনিকায়ন করতে হবে। সরকার চাইলে তা করতে পারে, কারণ বর্তমান সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

শিক্ষা কোনো দাতব্য অনুদান নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। সততা ও নৈতিকতাবিহীন এবং দুর্নীতিতে জর্জরিত শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির ওপর শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা অসম্ভব। ২০২৪ সালের তরুণ প্রজন্ম তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। তারা পরিবর্তনের একটি নতুন পথ উন্মুক্ত করেছে। এখন তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব। নতুন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার হয়ে উঠুক এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, যা তরুণদের আনুগত্যের পরিবর্তে স্বাধীন চিন্তা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬


উচ্চশিক্ষার সংস্কার: সমতা, জবাবদিহি ও আধুনিকায়ন জরুরি

প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা গভীর কাঠামোগত স্থবিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সনদকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়েছিল। বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গেও এর তেমন সংযোগ ছিল না। ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ করা উচিত। তবে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর আমাদের শিক্ষা বাজেট জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২৬ু২৭ অর্থবছরে তা ২ শতাংশে উন্নীত করা হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এটি এখনো সর্বনিম্ন। ইউনেসকোর বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বারবার বাজেটের এই সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তা ছাড়া, এই বরাদ্দের বড় অংশ অবকাঠামো ও প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হয়। উদ্ভাবন ও গবেষণায় এর অবদান সামান্য।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘ সময় পরও উপযুক্ত কর্মসংস্থান পেতে ব্যর্থ হয়। এর প্রধান কারণ শিল্প খাতের ব্যবহারিক চাহিদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগেও আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো দুই দশক আগের পাঠ্যসূচি আঁকড়ে ধরে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। ঔপনিবেশিক শাসনামলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা মূলত পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একধরনের ঐতিহাসিক সামাজিক চুক্তির ফল ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গের মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর যে রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল আংশিকভাবে একটি প্রতিকারমূলক উদ্যোগ। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

প্রকৃতপক্ষে, এটি সুবিধাভোগীদের জন্য নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই অর্থে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সামাজিক অগ্রগতির একটি প্রতিষ্ঠান। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি গ্রামীণ কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা এবং সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান সোপান হিসেবে কাজ করেছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান কি এখন নতুন ধরনের বৈষম্যকে বৈধতা দেয়, এমন নীতি গ্রহণ করবে?

বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাধারা বা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার বিষয়টি জুলাই-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য একটি নৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীদের জন্য সাম্প্রতিক ভর্তি মানদণ্ড এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) বলেছিলেন, ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক শর্ত হলো একই ধরনের পরিস্থিতিতে একই নীতি প্রয়োগ করা। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদনকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড চালু করা হলে ন্যায়বিচারের এই সর্বজনীন নীতি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মার্কিন দার্শনিক জন রলসের (১৯২১-২০০২) ‘এ থিওরি অব জাস্টিস’ গ্রন্থ অনুযায়ী, বৈষম্য কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উপকারে আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন প্রশ্ন হলো, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা কি সেই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন? প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, দেশীয় ও বিদেশি উভয় পাঠ্যক্রম অনুসরণকারী ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অভিজাত শিক্ষাধারাগুলোর একটি। এই ধারার শিক্ষার্থীরা সাধারণত তুলনামূলকভাবে উন্নত ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং বৈশ্বিক শিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। অবশ্যই এর ব্যতিক্রম রয়েছে। কিন্তু নীতি প্রণয়ন করতে হয় সামগ্রিক বাস্তবতার ভিত্তিতে, ব্যতিক্রমের ভিত্তিতে নয়। সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে কোথাও বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হলে তা হওয়া উচিত তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য। ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক কল্পনা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোরও অংশ। এর ইতিহাস সাধারণ মানুষের ইতিহাস। এর অর্জন সামাজিক অগ্রগতির প্রতিফলন। আর এর নৈতিক শক্তি নিহিত রয়েছে মেধার প্রতি অঙ্গীকারের মধ্যে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, অন্যান্য শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং সাফল্য অর্জনের সুযোগ থাকতে হবে। তবে সেই সাফল্য আসতে হবে সমান প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে নয়।

কারণ, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থী নির্বাচন করা নয়। সমাজকে এই নৈতিক বার্তা দেওয়াও তার দায়িত্ব যে, সব শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সমান। তবে স্বীকৃতি অর্জন করতে হবে ব্যক্তিগত মেধা, কঠোর পরিশ্রম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। অতএব, আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রশ্ন একটাই: বিশ্ববিদ্যালয়টি কি তার শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ, সামাজিক ন্যায়বিচারের ঐতিহ্য এবং জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অর্জিত মর্যাদা সংরক্ষণ করবে? নাকি দেশের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের অসুবিধায় ফেলে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাধারার শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে?

প্রশ্ন উঠছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৩ সালের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে? এই আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালিত হওয়ার কথা। আইনে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে কি উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে? বিভিন্ন পর্যায়ে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি নিজের পরিচালনাসংক্রান্ত আইন মেনে চলতে না পারে, তাহলে সমসাময়িক চাহিদা পূরণের জন্য সেই আইন আধুনিকায়ন করা উচিত নয় কি? এ ধরনের আধুনিকায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি?

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষকদের ব্যাপক স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হন না। কখনো কখনো কেবল তাঁদের ইচ্ছা না হওয়ার কারণেই ক্লাসে যান না। অনেক শিক্ষক সময়মতো পাঠ্যসূচি শেষ করতে পারেন না। এতে সেশনজট তৈরি হয়। শিক্ষকদের মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রতিও তাঁদের যথেষ্ট মনোযোগ নেই। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সুনাম বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করতে হবে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল না মিলিয়ে কেবল মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করা কোনো সুবিবেচনাপ্রসূত পদ্ধতি নয়। ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও অর্থবহ গবেষণা—দুই ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা আশা করি, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগরসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসৃত পদ্ধতি গ্রহণ করবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে এবং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে—এটাই প্রত্যাশা।

প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন বুঝতে পেরেছে যে, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্পন্ন একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা অসম্ভব, তখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই বাস্তবতা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে, কেবল মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে পেশাদারত্বের সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব নয়।

সাহসিকতার সঙ্গে উদ্যোগ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম উপাচার্য শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংশোধিত বিধিমালা অনুমোদন করান। এরপর মৌখিক সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা, উপস্থাপনা, প্রদর্শনীমূলক ক্লাসসহ অন্যান্য পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও একই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ শুরু করে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি।

বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ভুলে গেলে চলবে না যে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এক ডজনেরও বেশি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। অথচ জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য কোনো কমিশন গঠন করেনি। ফলে সংবিধান, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের মতো ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া এখনো চলছে। কিন্তু ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি।

বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নস্তরে, বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার জন্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকার যদি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের সংস্কার করতে চায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনৈতিক আনুগত্যের চর্চা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক মান উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে ১৯৭৩ সালের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আইন আধুনিকায়ন করতে হবে। সরকার চাইলে তা করতে পারে, কারণ বর্তমান সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

শিক্ষা কোনো দাতব্য অনুদান নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। সততা ও নৈতিকতাবিহীন এবং দুর্নীতিতে জর্জরিত শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির ওপর শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা অসম্ভব। ২০২৪ সালের তরুণ প্রজন্ম তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। তারা পরিবর্তনের একটি নতুন পথ উন্মুক্ত করেছে। এখন তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব। নতুন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার হয়ে উঠুক এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, যা তরুণদের আনুগত্যের পরিবর্তে স্বাধীন চিন্তা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত