সংবাদ

খাদ্যে ভেজাল: নীরব বিপর্যয়


মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ
মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ
প্রকাশ: ১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০৮ এএম

খাদ্যে ভেজাল:  নীরব বিপর্যয়
ছবি: সংগৃহীত

ভেজাল খাদ্য মানুষের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মানুষের নৈতিকতারও অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। আধুনিক সভ্যতায় ‘ভেজাল’ শব্দটি আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এটি এখন কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং মানবতার জন্য এক নীরব বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। অতিমুনাফালোভী কিছু মানুষের কারণে আজ আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মিশছে বিষ।

বর্তমানে চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূল ও দুগ্ধজাত পণ্য—সব ধরনের খাদ্যেই রাসায়নিক ও ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর অভিযোগ রয়েছে। ফরমালিন, কার্বাইড, বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত রং, ইউরিয়া এবং ক্ষতিকর সংরক্ষণকারী উপাদানের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে যকৃত ও কিডনির ক্ষতি, ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল পূর্ণ হওয়ার আগেই অনেকে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ, ভেজাল খাদ্যের এই আগ্রাসন মানুষের পার্থিব জীবনকে সংকুচিত করছে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আজকের দিনে বাজার থেকে নির্ভেজাল খাদ্যপণ্য কেনা যেন ভাগ্যের ব্যাপার। চাল পালিশ করে চকচকে করা থেকে শুরু করে ফলমূল, শাকসবজি ও মাছে ফরমালিন ও কার্বাইডের যথেচ্ছ ব্যবহার এখন বহুল আলোচিত বিষয়। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ডিটারজেন্ট ও ইউরিয়া, গুঁড়া মসলায় ইটের গুঁড়া ও বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত রং, এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও শিশুখাদ্যেও ভেজালের অভিযোগ পাওয়া যায়। ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে যকৃতের রোগ, কিডনি বিকল, হৃদ্‌রোগ এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আমরা পুষ্টির বদলে প্রতিনিয়ত শরীরে প্রবেশ করাচ্ছি দীর্ঘমেয়াদি বিষ।

ভেজাল খাদ্যের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে রয়েছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর চরম অনৈতিকতা এবং রাতারাতি ধনী হওয়ার অন্ধ লোভ। একশ্রেণির মানুষ অধিক মুনাফার জন্য অবলীলায় কোটি কোটি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই চক্র শুধু মানুষের পকেট কাটছে না, তাদের স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনও কেড়ে নিচ্ছে। যে সমাজ খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত জাঁকজমক অনেকটাই অর্থহীন।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যে ভেজালের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৭১৩টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৫৭১টি নমুনায়, অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ৩০ শতাংশে, ভেজাল, দূষণ কিংবা মানহীন উপাদান পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ৩০ শতাংশে পৌঁছায়। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস ও পানীয়, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা এবং মধুতে সবচেয়ে বেশি ভেজাল বা দূষণ পাওয়া গেছে বলে কর্তৃপক্ষের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও আইসিডিডিআরবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্যের অভাবে দেশে প্রতিবছর বহু মানুষ ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

খাদ্যে ভেজাল দেওয়া বা খাদ্য নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করাকে প্রায় সব বড় ধর্মেই গুরুতর অন্যায়, পাপ ও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। প্রধান ধর্মগুলোতে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও সততা ও মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়ে তাদের মধ্যে মিল রয়েছে।

খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়া রোধে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, নিয়মিত তদারকি এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের মাধ্যমে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজাল রোধ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর করতে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। ভেজাল খাদ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাজার তদারকি ও পরিদর্শন কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।

খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হয়। মাঝেমধ্যে জরিমানা বা কারখানা সিলগালা করার খবর আমরা গণমাধ্যমে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব শাস্তি অপরাধের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত এবং সাময়িক। নিয়মিত ও কঠোর তদারকির অভাব, দুর্নীতির সুযোগ এবং আইনের ফাঁকফোকর গলে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে অপরাধীরা বারবার একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। শুধু নামমাত্র জরিমানা করে এই সুসংগঠিত অপরাধচক্রকে দমন করা সম্ভব নয়। খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে এ ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে।

তবে শুধু সরকারের সদিচ্ছা বা আইনের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। নাগরিক সমাজকেও এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। ভোক্তা হিসেবে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃত্রিম উপায়ে চকচকে করা কিংবা অসময়ে বাজারে আসা ফলমূল কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে অসাধু ব্যবসায়ীদের বর্জন করতে হবে। রাসায়নিকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজকে উৎসাহিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্যের উৎস তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবি।

খাদ্য মানুষের জীবনধারণের জন্য, জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। অথচ ভেজাল খাদ্যের এই নীরব আক্রমণ আমাদের প্রতিনিয়ত অসুস্থতার দিকে এবং পরিণামে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটি সুস্থ ও সবল জাতি ছাড়া কোনো দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাজার থেকে বিষের আধিপত্য দূর করতে হবে। অন্যথায় খাদ্যের মোড়কে মোড়ানো এই বিষ আমাদের সবাইকে অসময়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে।

ভেজাল খাদ্য শুধু আমাদের সংক্ষিপ্ত জীবনের আয়ু কেড়ে নিচ্ছে না, মানুষের নৈতিকতাও নষ্ট করছে। যিনি খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছেন, তিনি মানবজীবনের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছেন। আর যিনি জেনেশুনে তা মুখ বুজে সহ্য করছেন, তিনিও এই সামাজিক অপরাধের বিস্তার রোধে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন না।

[লেখক: উপপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬


খাদ্যে ভেজাল: নীরব বিপর্যয়

প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

ভেজাল খাদ্য মানুষের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মানুষের নৈতিকতারও অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। আধুনিক সভ্যতায় ‘ভেজাল’ শব্দটি আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এটি এখন কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং মানবতার জন্য এক নীরব বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। অতিমুনাফালোভী কিছু মানুষের কারণে আজ আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মিশছে বিষ।

বর্তমানে চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূল ও দুগ্ধজাত পণ্য—সব ধরনের খাদ্যেই রাসায়নিক ও ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর অভিযোগ রয়েছে। ফরমালিন, কার্বাইড, বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত রং, ইউরিয়া এবং ক্ষতিকর সংরক্ষণকারী উপাদানের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে যকৃত ও কিডনির ক্ষতি, ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল পূর্ণ হওয়ার আগেই অনেকে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ, ভেজাল খাদ্যের এই আগ্রাসন মানুষের পার্থিব জীবনকে সংকুচিত করছে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আজকের দিনে বাজার থেকে নির্ভেজাল খাদ্যপণ্য কেনা যেন ভাগ্যের ব্যাপার। চাল পালিশ করে চকচকে করা থেকে শুরু করে ফলমূল, শাকসবজি ও মাছে ফরমালিন ও কার্বাইডের যথেচ্ছ ব্যবহার এখন বহুল আলোচিত বিষয়। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ডিটারজেন্ট ও ইউরিয়া, গুঁড়া মসলায় ইটের গুঁড়া ও বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত রং, এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও শিশুখাদ্যেও ভেজালের অভিযোগ পাওয়া যায়। ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে যকৃতের রোগ, কিডনি বিকল, হৃদ্‌রোগ এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আমরা পুষ্টির বদলে প্রতিনিয়ত শরীরে প্রবেশ করাচ্ছি দীর্ঘমেয়াদি বিষ।

ভেজাল খাদ্যের এই রমরমা ব্যবসার পেছনে রয়েছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর চরম অনৈতিকতা এবং রাতারাতি ধনী হওয়ার অন্ধ লোভ। একশ্রেণির মানুষ অধিক মুনাফার জন্য অবলীলায় কোটি কোটি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই চক্র শুধু মানুষের পকেট কাটছে না, তাদের স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনও কেড়ে নিচ্ছে। যে সমাজ খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত জাঁকজমক অনেকটাই অর্থহীন।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যে ভেজালের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৭১৩টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৫৭১টি নমুনায়, অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ৩০ শতাংশে, ভেজাল, দূষণ কিংবা মানহীন উপাদান পাওয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ৩০ শতাংশে পৌঁছায়। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস ও পানীয়, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা এবং মধুতে সবচেয়ে বেশি ভেজাল বা দূষণ পাওয়া গেছে বলে কর্তৃপক্ষের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও আইসিডিডিআরবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্যের অভাবে দেশে প্রতিবছর বহু মানুষ ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

খাদ্যে ভেজাল দেওয়া বা খাদ্য নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করাকে প্রায় সব বড় ধর্মেই গুরুতর অন্যায়, পাপ ও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। প্রধান ধর্মগুলোতে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও সততা ও মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়ে তাদের মধ্যে মিল রয়েছে।

খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়া রোধে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, নিয়মিত তদারকি এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের মাধ্যমে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজাল রোধ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর করতে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। ভেজাল খাদ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাজার তদারকি ও পরিদর্শন কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।

খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হয়। মাঝেমধ্যে জরিমানা বা কারখানা সিলগালা করার খবর আমরা গণমাধ্যমে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব শাস্তি অপরাধের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত এবং সাময়িক। নিয়মিত ও কঠোর তদারকির অভাব, দুর্নীতির সুযোগ এবং আইনের ফাঁকফোকর গলে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে অপরাধীরা বারবার একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। শুধু নামমাত্র জরিমানা করে এই সুসংগঠিত অপরাধচক্রকে দমন করা সম্ভব নয়। খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে এ ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে।

তবে শুধু সরকারের সদিচ্ছা বা আইনের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। নাগরিক সমাজকেও এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। ভোক্তা হিসেবে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃত্রিম উপায়ে চকচকে করা কিংবা অসময়ে বাজারে আসা ফলমূল কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে অসাধু ব্যবসায়ীদের বর্জন করতে হবে। রাসায়নিকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজকে উৎসাহিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্যের উৎস তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবি।

খাদ্য মানুষের জীবনধারণের জন্য, জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। অথচ ভেজাল খাদ্যের এই নীরব আক্রমণ আমাদের প্রতিনিয়ত অসুস্থতার দিকে এবং পরিণামে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটি সুস্থ ও সবল জাতি ছাড়া কোনো দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাজার থেকে বিষের আধিপত্য দূর করতে হবে। অন্যথায় খাদ্যের মোড়কে মোড়ানো এই বিষ আমাদের সবাইকে অসময়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে।

ভেজাল খাদ্য শুধু আমাদের সংক্ষিপ্ত জীবনের আয়ু কেড়ে নিচ্ছে না, মানুষের নৈতিকতাও নষ্ট করছে। যিনি খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছেন, তিনি মানবজীবনের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছেন। আর যিনি জেনেশুনে তা মুখ বুজে সহ্য করছেন, তিনিও এই সামাজিক অপরাধের বিস্তার রোধে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন না।

[লেখক: উপপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত