মাত্র একটি রাত। আর সেই এক রাতেই যেন বদলে গেছে পুরো কাঁচাবাজারের হিসাব।গতকাল যে কাঁচামরিচ রাজধানীর বাজারে বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়, আজ সেটিই বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়।কোথাও কোথাও দাম আরও বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হলো উৎপাদনে কোনো বড় সংকট নেই, মাঠে ফসলও রয়েছে পর্যাপ্ত।তাহলে মাত্র এক রাতের ব্যবধানে এই দ্বিগুণ মূল্যবৃদ্ধির কারণ কী? এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, কৃষক কত টাকায় মরিচ বিক্রি করছেন, আর ভোক্তা কত টাকায় কিনছেন? অনুসন্ধানে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন উৎপাদন এলাকায় কৃষকরা কাঁচামরিচ বিক্রি করছেন প্রতি কেজি ২৫ থেকে ৩৫ টাকা দরে।কোথাও ভালো মানের মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা পর্যন্ত।অথচ সেই একই মরিচ জেলা আড়তে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দাম দাঁড়াচ্ছে ৪৫ থেকে ৬০ টাকা। রাজধানীর বড় আড়তে এসে তা বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৮০ টাকায়।আর খুচরা বাজারে ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কোথাও তারও বেশি। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত মুল্যের ব্যবধান: প্রায় ৫০ থেকে ৭০ টাকা। অর্থাৎ, যে কৃষক কয়েক মাস পরিশ্রম করে মরিচ উৎপাদন করছেন, তিনি পাচ্ছেন সবচেয়ে কম দাম। অন্যদিকে ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে প্রায় তিনগুণ মূল্য।মাঝখানের এই বিশাল ব্যবধানই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, ফসল উৎপাদনের খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ।বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ এবং শ্রমিকের খরচ মিটিয়ে তারা কাঙ্ক্ষিত লাভ তো দূরের কথা, অনেক সময় মূলধন তুলতেও হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ বাজারে একই পণ্যের উচ্চমূল্যের সুবিধা পাচ্ছেন না তারাই। খুচরা বিক্রেতারা অবশ্য দায় চাপাচ্ছেন পাইকারি বাজারের ওপর।তাদের দাবি, বড় আড়ত থেকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে।পরিবহন খরচ, শ্রমিক খরচ এবং নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি যোগ করে বাড়তি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কিন্তু আড়তে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র।একই দিনে, একই বাজারে, একই ধরনের মরিচের দাম একেক আড়তে একেক রকম। কোথাও ৬০ টাকা,কোথাও ৭৫,আবার কোথাও ৮০ টাকা। তার মানে বাজারে কোনো নির্দিষ্ট মূল্য কাঠামো নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো যদি সরবরাহে বড় কোনো সংকট না থাকে,তাহলে রাতারাতি দাম দ্বিগুণ হওয়ার যৌক্তিক কারণ কী? বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মূল সিন্ডিগেট সাধারণত কৃষক পর্যায়ে নয়, বরং স্থানীয় সংগ্রাহক, বড় পাইকার এবং আড়ত পর্যায়ের মধ্যবর্তী অংশে গড়ে ওঠে। কারণ, কৃষক সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারেন না। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারাও অধিকাংশ সময় বড় আড়তের দামের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বেশি সুযোগ থাকে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। সিন্ডিগেটের স্তর: কৃষক - ফড়িয়া/সংগ্রাহক - স্থানীয় পাইকার - আড়ত - বড় পাইকার - খুচরা বিক্রেতা - ভোক্তা সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয়: ফড়িয়া ও সংগ্রাহক পর্যায়ে বড় আড়ত ও পাইকারি বাজারে কৃত্রিম সংকট বা মজুদের মাধ্যমে রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকেই প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শত শত মণ কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। কিন্তু উৎপাদনে বড় কোনো সংকট না থাকলেও রাতারাতি মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।কৃষক বলছেন তারা দাম পাচ্ছেন না,ভোক্তা বলছেন তারা অতিরিক্ত দাম দিচ্ছেন,আর মাঝখানের স্তরগুলো একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে। তাই প্রকৃতপক্ষে সরবরাহ ব্যবস্থার কোন স্তরে অতিরিক্ত মুনাফা যোগ হচ্ছে এবং কোথায় তৈরি হচ্ছে সিন্ডিকেট সেটি খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিবেশজ্ঞরা বলছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন ১ কৃষক থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের মূল্যতালিকা প্রকাশ, ২ নিয়মিত বাজার তদারকি, ৩ মজুদ ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ৪ এবং কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা। নইলে, ক্ষেতে কম দামে বিক্রি করা কৃষক আর বাজারে বেশি দামে কেনা ভোক্তার মাঝখানে লাভের পাহাড় গড়ে উঠবে শুধুই মধ্যস্বত্বভোগীদের।