নজরুলের গান: একটি আখ্যানগদ্য
‘কেন কাঁদে পরাণ কী বেদনায় কারে কহি’ অরিন্দম খালিদ, সবাই তাকে অবশ্য ওই ৩/৪ বছরের ছোট ছেলেটিকে চেনে বুলবুল নামে। কাজী নজরুল ইসলামের খুব আদরের মেজ ছেলে এই বুলবুল। কেন খুব আদরের! গ্রামোফোন কোম্পানির অগ্রেমান্য প্রশিক্ষক ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খা সাহেব আর নজরুলের খুব ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় যখন নজরুল চুক্তিবদ্ধ হলেন ওই রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে। হুগলি ও কৃষ্ণনগর হয়ে নজরুল তখন বাসা নিয়েছিলেন কলকাতার পান বাগান লেনে। সময়টা ১৯২৮। ওস্তাদ জমিরউদ্দীনের কাছে নজরুল রাগ সংগীতে তালিম নিতে শুরু করেছিলেন। খাঁ সাহেব ছিলেন বিখ্যাত গায়ক, সুরকার এবং ঠুংরী অঙ্গে তাঁর পারদর্শিতা ছিল খুব উঁচু মানের। তবে জমির উদ্দীন খাঁ ছাড়াও নজরুল ওস্তাদ কাদের বখ্স, মঞ্জু সাহেব, মাস্তান গামা প্রমুখ বিশিষ্ট পণ্ডিতের কাছেও রাগ সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন বিচ্ছিন্নভাবে। সহজে এবং দ্রুত আত্মস্থ করে নিতে পারতেন নজরুল। পান বাগান লেনের বাড়িতে নজরুল গান করছেন খাঁ সাহেবের সঙ্গে, পাশে আসন দিয়ে বসে আছে বুলবুল, যা শোনে তাই যেন ক্ষুদে বুলবুল শিখে ফেলে, বা গাইতে পারে সঠিকভাবে। সবাই খুব আশ্চর্য হয় শিশুর এই অসাধারণ ক্ষমতায়। বাবার মতোই সে প্রতিভাবান। নজরুলের অনেক স্বপ্ন এই বুলবুলকে ঘিরে। নিয়তি তখন অলক্ষ্যে হাসে। শিশু বুলবুলের বয়স তখন পুরোপুরি চার বছরও হয়নি। ১৯৩০ সালের ৮ মে বসন্তরোগের আক্রমণে বুলবুল মারা যান। জন্মেছিল ৯ অক্টবর ১৯২৬ সালে। ভয়াবহ এই শোক, শোকের আকস্মিকতায় নজরুল কেমন স্তিমিত হয়ে গেলেন। ‘বিদ্রোহী’ নজরুল, অগ্নিগর্ভ কবিতা ও গানের ফুর্তিবাজ মানুষটি, প্রাণোচ্ছ্বসে সদা চঞ্চল নজরুলের জীবনে শোক গভীর পরিবর্তন এনে দিল। এক প্রকারের আধ্যাত্মিকতায় তিনি নিমজ্জিত হলেন। শুরু করলেন যোগ সাধনা। ঠিক এমনি, তুলনীয় ঘটনা রবীন্দ্রনাথের জীবনেও ঘটেছিল! গুরুদেবের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রতিভা ও স্বভাবে বাবার মতো। লোকে রবি ঠাকুরের মতো করে ওঁকে বলত শমী ঠাকুর। আত্মস্থ করার ও মনে রাখার অসাধারণ ক্ষমতাধর শমী ১৯০৭ সালে অনতিক্রান্ত কৈশরে কলেরায় মারা গেলেন। শোকে বিহ্বল ও স্তিমিত হয়ে পড়েছিলেন গুরুদেবও, কয়েক দিন নিজেকে ঘরে আটকে রেখেছিলেন। কথা বলতেন না। একা একা পায়চারি করতেন ছাদে। সেই সময়কালে গুরুদেবের মনে দুঃখকষ্ট শোক মৃত্যু জীবন ধর্ম নিয়ে নানা বোধের জন্ম নেয়। চিন্তা বোধ ও আধ্যাত্মিক ভাবনায় এক নতুন উপলব্ধির উদয় হয়। এই উপলব্ধি নৈবেদ্যর বিশ্বাসের জগত থেকে আলাদা, আরও মহাজাগতিক— গীতাঞ্জলির গান, কবিতার রচনা তখন থেকেই। নজরুলের ‘কেন কাঁদে পরাণ’-এর বহু আগে শোকগ্রস্ত গুরুদেব গেয়ে উঠেছিলেন মানবিক বেদনার স্পর্শে অতলস্পর্শী উচ্চারণে— অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে নির্মল করো উজ্জ্বল করো সুন্দর করো হে ॥ জাগ্রত করো উদ্যত করো সুন্দর করো হে। মঙ্গল করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে ॥শোক দুঃখ জর্জর মনকে জয় করতে তাঁর অন্তরতর কাছে আর্ত নিবেদন পেশ করলেন, ব্যক্তিগত দুঃখের ঊর্ধ্বে মনকে নির্মল উজ্জ্বল সুন্দর করার আর্তি ভৈরবী রাগে গাইলেন। এই দুই মনীষীর শোক দুঃখের মতো কঠিন বেদনা আমিও সয়ে বেড়াচ্ছি। আমার আলো নেই, আমার পাশে সে কোথায়? চারদিকে অন্ধকার। গুরুদেবের সুর বাণীতে মনকে শান্ত করার প্রয়াশ চালিয়ে যাই, কিন্তু মনকে তো জাগ্রত উদ্যত সুন্দর করে তুলতে পারছি না। শমী ও বুলবুলের মতো আলোও আমার ছিল। ছিল আমারই মতো। আমার কষ্টের এই নীল শিখা নিভে যাওয়ার নয়, কারণ আলো তো অপর লোকের যাত্রী হয়নি। ওর ইহজীবন ইহলোকেই আছে। শুধু ক্ষুদ্র সংকীর্ণ বুদ্ধির দোষে আলো আমার ঘর ছাড়া। আলো বেঁচে আছে, কিন্তু আমার জীবনের অন্ধকার থেকে অনেক দূরে। সংসারের ভেদবুদ্ধি ধর্মবুদ্ধি আলোকে দূরে সরিয়ে রেখে আমাকে স্তিমিত, মূক ও উদ্যমহীন করে রেখেছে। আমার সময়, একান্ত সময়ে আলোর সঙ্গে কথা হয়, অথবা আমাদের পঁচিশ বছরের কত কথা— তারই স্মৃতি মন্থন চলে। আলোর গানের শিক্ষক যেমন শুদ্ধভাবে গানটি গাইতে শিখিয়েছেন, তেমনি পড়িয়েছেন সংগীত বিষয়ে নানা বই। রাগরাগিণী, তান, তাল, স্বর, স্বরের নানা স্বরান্তর সংগীতের এই বিষয়গুলো বোঝাতে সব সময় নজরুলের গানকেই দৃষ্টান্ত হিসেবে বেছে নিতেন। নজরুল সংগীতও খুব ভাল শিখেছিল। একবার আমার একটা আব্দার শুনে আলোর গুরু বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের গানের শুধু কাঠামোটি নয়, সুর তাল নয়, এর সঙ্গে গানের গভীর ভাবটিও ফুটিয়ে তুলতে হবে। মানে বাণীর মাহাত্মটুকু ভালভাবে আত্মস্থ করা প্রয়োজন। অল্প বয়সের অভিজ্ঞতাহীন জীবনে তেমন উপলব্ধির জগতটা তৈরি হয় না। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের সংগীত ও ভাব প্রকাশের উপযোগী বিশেষ গায়কীরও প্রয়োজন। আলো নিশ্চয়ই একদিন রবীন্দ্রসংগীত করবে। আগে সংগীতের ভিত্তি-জ্ঞানটুকু সরগর হয়ে উঠুক। তা ঠিক। মাস্টার মশায় তার মতো ঠিকই বলেছেন, কিন্তু আলো আমার মেয়ে, ওর বোধ উপলব্ধির ক্ষমতা অন্যদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আমার তো গান সেভাবে হলো না। কিন্তু নিজের জন্য, পরিবারে জন্যও আমি গাই। সব সময় গাই। আলোকে ধরে ধরে অনেক গুরুদেবের গান শিখিয়ে দিয়েছিলাম। সেই শিক্ষার জোরে ওকে রবীন্দ্রসংগীতেরই একজন হয়ে উঠতে হলো। মাস্টার মশায়দের শিক্ষা সংগীতটা শিখতে খুব কাজ করেছে। সেই শিক্ষায় নির্ভর করে গানকে উপলব্ধির স্তর থেকে গাইতে হবে কেমনে সেই শিক্ষাটা আমার। নজরুলের গান আমিও অনেক করেছি। শুরুতে মার্গ সংগীতের তালিম নিতে হয়েছিল। তখন আধুনিক গানে রাগ রাগিণীর ব্যবহার প্রয়োগে নজরুলের অতুলনীয় গানগুলি আমি গেয়েছি, শিখেছি। তবে আলোর মতো লম্বা সময় ধরে নয়। আমার ক্ষেত্রে একটা কারণ হয়তো এমন যে, আমার পড়ার অভ্যাস। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বিশেষ করে তাঁর কবিতা কাব্য নাটক গীতি নাট্য এবং গান বিয়য়ে গুরুদেবের কথা লেখা আমাকে নেশায় পেয়ে বসেছিল। ফলে সহজেই গুরুদেবের গানের মানবিক বেদনার অনুদ্বেল শব্দ ব্যবহার, মনসিক নির্ভরতা, উপলব্ধির মায়াময় জগত আমাকে চুম্বকের মতো টানত, আজও ওই একই নির্ভর আমার। নজরুল আমার কাছে এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর প্রতিভার সেরা সৃষ্টি সম্পদই সংগীত। কত বিচিত্র বিষয়ে কত সহজেই বহুবর্ণ রাগরাগিণীর প্রয়োগে গান লিখেছেন, সুর করেছেন এবং গেয়েছেনও। বৈচিত্র্য ও বিপুলতা নজরুল সংগীতের প্রতিভার একটি দিক। গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে ১৯২৮ সালে যুক্ত হওয়ার পর থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত বিপুল ও বিচিত্রগানের সৃষ্টি জোয়ার ছিল বিস্ময়কর। গ্রামোফোন কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার ঘটনাও সহজভাবে ঘটেনি। রেকর্ড কোম্পানিগুলো নজরুলের গান রেকর্ড করার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখিয়ে আসছিল নজরুলের বৃটিশবিরোধী মনোভাবের জন্য। সেই সময় তখনকার বিখ্যাত গায়ক হরেন্দ্র ঘোষ নজরুলের ২টি গানে সুর দিয়ে রেকর্ডে গেয়েছেন। রেকর্ডখানি খুব বিক্রিও হয়। গ্রামোফোন কোম্পানি সে কথা জানতে পেরে খুশি হয়েই নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাঁকে ওই দুটি গানের যোগ্য রয়েলটি পাঠিয়ে দেয় এবং সেই সঙ্গে নজরুলকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে যুক্ত হয়ে গান রচনার জন্য আমন্ত্রণ করে। সেই থেকে কবি নজরুল ওদের হয়ে গুরুগম্ভীর ধ্রুপদ, আধুনিক গান থেকে চপল ও হাল্কা হাসির গান, বিদেশী গানের অনুকরণে বিদেশী সুর বসিয়ে রচনা করেছেন অনেক গান এবং শুরু থেকেই তাঁর গানে কাব্যে ভাষার চাতুর্যময় ব্যবহার যার কোন তুলনা নেই বাংলা সাহিত্যে। সহজ সৃষ্টিশীলতায় তিনি আরবি ফার্সি শব্দ বাংলা গানে ও কবিতায় এমনভাবে মিশিয়ে দিলেন— যা ছিল শুধু অভিনব নয়, শিল্প নৈপুণ্যে উজ্জ্বল।গ্রামোফোন কোম্পানি ছাড়াও নাটকে ও চলচ্চিত্রে তাঁর ব্যস্ততা বাড়ল ওই সংগীত সৃষ্টি ও পরিচালনায়। সিরাজদ্দৌলা, মহুয়া, সাবিত্রী, কারাগার, রক্তকমল, শ্যামলীর স্বপ্ন, জাহাঙ্গীর, ব্লাক আউট ইত্যাদি নাটকের জন্য গান রচনার পাশাপাশি পাতালপুরী, গোরা, ধ্রুব চলচ্চিত্রে সংগীত রচনা পরিচালনা করেন। গান রচনা করেন নন্দিনী, চট্রগ্রাম অস্ত্রগার লুণ্ঠন, শ্রী শ্রী তারকেশ্বর দিকশূল, সাপুড়ে, চৌরঙ্গী, বিদ্যাপতি ছবির জন্য। ধ্রুবসহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেন। আবার বিদ্যাপতি, সাপুড়ে ছবির কাহিনীও তাঁর লেখা। গ্রামোফোন কোম্পানির পর বিখ্যাত সংগীতশাস্ত্রী সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগযোগের সূত্রে যুক্ত হলেন কলকাতা বেতারে। সময়টা ১৯৩৮ সালের প্রথম ভাগ, কলকাতা বেতারে নজরুল তিনটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। তাছাড়া বেতারের জন্য গান রচনা তো ছিলই। অনুষ্ঠান তিনটি হলো— হারামণি, নবরাগ মালিকা এবং গীতি বিচিত্রা। হারামণি অনুষ্ঠানে নজরুল অপ্রচলিত এবং লুপ্তপ্রায় রাগে গান রচনা করে প্রচার করতেন। অনুষ্ঠানটি হতো মাসে একবার। হারামণির শুরুর দিকে সুরেশ চক্রবর্তী রাগ সম্পর্কে বলতেন আর নজরুল ওই রাগে রচিত গানটি নিজেই গাইতেন। অনুষ্ঠানটি শুনেছি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। নতুন নতুন রাগ রচনা করে তাতে রচিত গান প্রচার করতেন নবরাগ মালিকা অনুষ্ঠানে। গীতিবিচিত্রা অনুষ্ঠানটি ছিল আলেখ্যমূলক। নজরুলের রচিত আলেখ্যের মধ্যে কাফেলা, কাবেরী তীরে, ছন্দসী প্রধান। এই গীতি বিচিত্রানুষ্ঠানে একটি বিষয় বা আলেখ্য ঠিক করে তার ওপর ছয়টি করে গান পরিবেশন করা হতো। যাই হোক, কত ধরনের কাজ নজরুল ওই অল্প সময়ের মধ্যে করেছেন! উদ্যম, পরিশ্রম এবং প্রতিভার শক্তিতে বাংলা আধুনিক গানকে একদিকে জনপ্রিয় অন্যদিকে শুদ্ধ সংগীত সংস্কৃতির প্রবাহ সৃষ্টি করেছিলেন। আধুনিক গান রচনায় নজরুল কেন আগ্রহী হয়েছিলেন। তার কারণ হিসেবে নজরুল বলেছিলেন, আলো বলেছিলেন নজরুলের কথাটি, মনে আছে এখনও! ‘আধুনিক (মডার্ন) গানের সুরের মধ্যে আমি যে অভাবটি সবচেয়ে বেশি অনুভব করি তা হচ্ছে ‘সিমিট্রি’ (সামঞ্জস্য) বা ‘ইউনিফরমিটি’-র (সমতা) অভাব। কোন রাগ বা রাগিণীর সঙ্গে অন্য রাগ বা রাগিণীর মিশ্রণ ঘটাতে হলে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শাস্ত্রে যে সূক্ষ্ম জ্ঞান বা রসবোধের প্রয়োজন তার অভাব আজকালকার অধিকাংশ সুরের মধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে...।’রবীন্দ্রযুগের মহাবলয়ের ভিতর নজরুল কত স্পষ্ট স্বতন্ত্র হয়ে উঠলেন সংগীতে এবং কবিতায়। অন্যদিকে নজরুল কিন্তু পছন্দ করতেন গুরুদেবের গান, গাইতেন, প্রচুর তাঁর মুখস্থ ছিল। নিজের গানের বাইরে একান্ত নিরালায় তিনি গুরুদেবের গানই গাইতেন। কখনো কখনো আলোর সঙ্গে আমার মৃদু তর্ক হতো। আলো নজরুলের গানের বৈচিত্র্য সুর ঋজুতার কথা বলে বিদ্রোহী কবির মহিমাকে তুলে ধরত। সেসব আলো ঠিকই বলত, কিন্তু আমার বলার কথাটি অন্য, আলো হয়তো পরে বুঝতে পেরেছে। না হলে গুরুদেবের গানে ও এমন আত্মহারা হলো কী করে! আলোর প্রথম এ্যালবাম আমাকে উৎসর্গ করলেও কবিগুরুর চরণে প্রথম অর্ঘ্যটি নিবেদন করে নেয় অন্তরের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। উৎসর্গে আলো লিখেছে শিল্পী লীলাময়ী, আমার গুরু। এরপর আরও অনেক গানের এ্যলবাম প্রকাশ হলেও আলোর ২য় এ্যালবামটি ছিল নজরুলের গান নিয়ে। গানগুলোর বিশিষ্টতা হলো সবগুলো গানই নজরুলের বিদেশী সুর অবলম্বন করে সৃষ্টি গান, অনেকে আমরা জানিও না এই জনপ্রিয় গানগুলো বিদেশী সুরে দেশী কথায় স্বরে তালে একেবারে বাংলা গানের ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। আলোর এ্যালবামের কয়েকটি গান এমন। ইজিপ্সিয়ান ডান্সের সুরে—মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে নেচে যায়আরবি সুরে—রুমঝুম ঝুমঝুম খেজুর পাতার নূপুর পায়েকিউবান ডান্সের সুরে— দূর দ্বীপবাসিনী, চিনি তোমারে চিনি ইউরোপীয় অর্কেস্ট্রার সুরে— খেলিছে জলদেবী, সুনীল সাগর জলেএবং পারস্য গজলের বিষানুষঙ্গে রচিত অনুবাদকৃত গজল—করুণ কেন অরুণ আাঁখি, দাও গো সাকী দাও শরাব... ইত্যাদি। আর একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ্যের অনিবার্যতা এড়াতে পারছি না। তা হলো গজল রীতির গান, বাংলায় গজল রীতির গান প্রচলন করে নজরুল জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। করাচির ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে ছিলেন একজন পাঞ্জাবী মৌলবী। তখনকার হাবিলদার নজরুল ইসলাম মৌলবী সাহেবের কাছে ফার্সিটা ভালো করে শিখেন। পরবর্তীকালে তাঁর প্রিয় কবি হাফিজ এবং অন্য ফার্সি কবিদের মূল লেখা পাঠ ও ফার্সি ভাষার অনুকরণে গজল রচনায় সফল হয়েছিলেন। ওই রেজিমেন্টের হাবিলদার নিত্যানন্দ দে ভাল অর্গান বাজাতে পারতেন। তাঁর কাছে নজরুল শিখলেন অর্গান বাজাতে। সৈনিক গোপী ভাল ক্ল্যারিওনেট বাজাতেন, নজরুল শিখলেন ক্ল্যারিওনেট। বাল্যকালে মক্তবের শিক্ষা, দুটি স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা, আসানসোলের চা রুটি দোকানের কর্মচারী করাচীর রেজিমেন্ট থেকে ফিরে সংগীত ও সাহিত্যের আকাশে রবীন্দ্রবলয়ের উজ্জ্বল আলোর পাশে ভিন্ন, নতুন এক স্বতন্ত্র নক্ষত্রের আবির্ভাবই ১৯ বছরের নজরুল, কবি কাজী নজরুল ইসলাম। জীবন, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পারিবারিক পরিচয় ধর্ম নানা বিশিষ্টতায় নজরুল তৈরি হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে গুরুদেব কেন অন্য কেউ তুলনীয় নন। মাত্র ২২টি বছর তাঁর সৃষ্টির জীবন।গুরুদেবের থেকে সংখ্যায় নজরুলের গান অনেক বেশি। সাধারণভাবে লোকে বলে সাড়ে তিন হাজারের বেশি গান তিনি লিখেছিলেন। নজরুল নাকি নিজেই মুজফ্ফর আহ্মদকে বলেছিলেন তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ৩১৬৩টি গানের সমগ্র। নজরুল সংগীত সমগ্রের সম্পাদকের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে কবির আরও অনেক গান উদ্ধার হবে। নজরুলের সৃষ্টি ২২ বছরের বেশি নয়। ঠিকঠাক দিন তারিখ গ্রন্থ বিষয় ধরে খোঁজ নিতে গেলে দেখা যাবে ১৯৩৪ সালের পর তাঁর আর কোন গীতিকাব্য প্রকাশ হয়নি। প্রকাশ হয়েছে ১৯৪২ সালে যখন তিনি নির্বাক অসুস্থ। অসুস্থতা ওই ৩০ দশকের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। শেষদিকের কবিতায় আছে পুনরাবৃত্তি। সচেতন উজ্জ্বল নজরুলের তুলনায় ধর্মভাবাপন্ন রচনায় বিশেষ মনোযোগ, এবং শিল্পমানে নজরুলের মর্যাদা ঠিকভাবে রক্ষিত হয়নি সেইসব রচনায়। অল্প সময়ের মধ্যে নজরুল অনেক লিখেছেন সত্য, কিন্তু সেই সব আধুনিক বাংলা গানে শেষ পর্যন্ত নজরুলের দর্শন প্রত্যয় বা একজন শিল্পী মনের গভীর তলদেশের মনভূমি কোথাও মিলে! নাটক সিনেমা গ্রামোফোন কোম্পানির হয়ে গান লিখেছেন যেমন তেমন ব্যক্তিগত অনুরোধেও লিখেছেন। শিল্পীদের অনুরোধেও গান লিখে দিয়েছেন। তাঁর গানের সুর করেছেন অনেকে। এক কমল দাশ গুপ্ত নিজেই করেছেন প্রায় চারশ। নজরুলের গানে অন্যরা তাদের মতো সুর বসিয়ে রেকর্ড করেছেন। মঞ্চে সিনেমায় গেয়েছেন। সব সময় গীতিকার নজরুলের স্বীকৃতিও মেলে নি। এমনকি নজরুলের নিজের সুর করা গানে কি সেই সুর সঠিকভাবে মেনে চলা হয়! সেখানেও ছড়িয়েছে বিভ্রান্তি। নজরুল যখন লিখছেন গাইছেন সুর করছেন তখন থেকেই এক রকমের এলোমেলো অবস্থা। তাঁর সুর বাণী সঠিক রক্ষা করা হচ্ছে কিনা এমন কোন তদারকি বা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান কোন কালেই ছিল না। বাংলাদেশের নজরুল ইনস্টিটিউট এই পথে কাজ করার চেষ্টা করছে— মূল সুর, স্বরলিপি, কথা সংগ্রহ করছে। কিন্তু অনুমোদন বা রেকর্ড বন্ধ করার ক্ষমতা তাদের নেই। অন্য কথায় বাণী ও সুরের কপি রাইট সংরক্ষিত নয় বা খবরদারির আইনি অধিকার নজরুল ইন্সটিটিউটের নেই। নজরুলের গানের নির্ভরযোগ্য স্বরলিপির অভাব— এক্ষেত্রে তাঁর গান ইচ্ছা স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পিছনে আর একটি কারণ। এইসব দিক ছাড়াও, অথবা আমার কাছে এই নেইগুলোর গুরুত্ব তত নয়। যতটা একজন ব্যক্তির নানা মানবিক মুহূর্তে, দুঃখ আনন্দ গভীর অনুভূতি আলোড়িত সময়ে যে গান সুর মনের প্রশান্তি স্বস্তি এনে দিতে পারে, যে গানের সুর বাণী মনের ভিতর গেয়ে ওঠে, নজরুলের গানের তেমন বিশিষ্টতা প্রায় নেই। গুরুদেবের গানে মনের আধারটুকু আছে, যে প্রশান্তির আশ্রয় আছে তার অভাব নজরুলের ক্ষেত্রে রয়েছে। একথা বলতে চাই না যে তাঁর গানে কাব্যে প্রজ্ঞা ও মননের অভাব আছে। অনেকে যদিও বলে, ‘ইতিহাস চেতনা ও আধুনিক জীবন বীক্ষণের তেমন গূঢ়চিহ্ন নজরুলের গানে নেই। গানের সুর, গায়ন ভঙ্গি হাল্কা ও চটুল। আর্টের বিচারে তা সবার কাছে সমানভাবে ছাড়পত্র পায় না।’ আমার নিজের কাছে এমন মন্তব্য বলব, ব্যক্তিগত মত, অবশ্যই আপেক্ষিক এবং সবচেয়ে বড় কথা ইতিহাস চেতনা বা আধুনিকতার গূঢ় চিহ্ন জাতীয় পর্যবেক্ষণ সংগীত বা সুরের ক্ষেত্রে কি প্রয়োজন? আমি শুধু বলতে চাই ব্যক্তির মনে তার আবেদনটুকু কত! ওইসব মাপকাঠিতে সংগীতের রস বিচার করতে গেলে রবীন্দ্রনাথের গানও কাঠগড়ায় উঠতে বাধ্য। তবে আজও আমরা গুরুদেবের গানে, কাব্যে ভাবনায় নিত্যনব উন্মোচন, ভাবের নানা তরঙ্গে নতুন নতুন উদঘাটন, বহুতর অর্থের ব্যঞ্জনা আবিষ্কার করে চলেছি। বাংলা আধুনিক গানের রূপ কেমন হয় সুকুমার রায় সে সম্পর্কে যা লিখেছেন নজরুলের গান তার ব্যতিক্রম নয়— ‘যে গান কথা রচনায় জীবনকে প্রত্যক্ষ করতে সাহায্য করে এবং বাস্তবতা যার বিষয়বস্তুতে স্পষ্ট এবং যে রীতিতে সুর প্রয়োগের কায়দা প্রতি অংশেই বিশিষ্ট ভাব প্রকাশ করে এবং যে গানে বিচিত্রধর্মী সুর কলি প্রযুক্ত হতে পারে, যে গানের সুর রচনায় মূলগত উদ্দেশ্য থাকে ভাব প্রতীকের গ্রন্থন এবং বিচিত্র ও বিভিন্নধর্মী স্বরসঙ্গতি সৃষ্টিতে শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য সাধন, সবশেষে যে গড়নে যন্ত্র সংগীতের সহযোগিতা তাৎপর্যমূলক তাকেই আধুনিক গান বলে বর্ণনা করা যেতে পারে।’ নজরুল তাঁর সমকালে অন্তত গানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের থেকেও জননন্দিত ছিলেন। বিনোদনের অভাব মিটিয়েছে তাঁর গান। নজরুলের সাহিত্য আজকে তাঁর সমকালের মতো প্রাসঙ্গিক নয়। যদিও আমরা এখনও তীব্রভাবেই নানারকম ভেদবুদ্ধি, ধর্মের অসৎ ব্যবহার, নানা অনাচারে জর্জরিত, তবুও আমরা বারবার নজরুলকে উদ্বৃত করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসাহিত নই। নজরুলের সৃষ্টির উপরিকাঠামোর তলদেশে গভীরতার অভাবই কি এর কারণ! এ বিষয়টি গবেষকদের হাতে ছেড়ে দেই! আমি শুধু একজন সুর রসিক হিসেবে বুঝে উঠতে চাই। তবে তাঁর সংগীত যে অবহেলা উপেক্ষা এবং কিছুটা অবমূল্যায়নের স্বীকার হয়েছে এখনো হচ্ছে সে কথাও ঠিক। যেমন নজরুলের প্রায় সমবয়সি রবীন্দ্র নজরুলের পর প্রধান সাহিত্য কর্তা এবং নজরুলের ঘনিষ্ঠ বুদ্ধদেব বসুর পাঠের সঙ্গে আমি একমত নই। নজরুলের সৃষ্টিকে শুধু গুণগত বিচারে নয়, শ্রেণিগত বিচারে নিচুস্তরের— এমন ভাবনা প্রতিষ্ঠার সচেতন চেষ্টা হয়তো আছে। বুদ্ধদেব বসু মনে করেন কাব্যক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পর নজরুলের অবস্থান। বাংলা সাহিত্যের একজন ছাত্র হিসেবে এবং ব্যক্তিগত পাঠাভ্যাসের কারণে ওঁদের লেখা আমি অনেক পড়েছি। অন্ত্যমিল, পদ্যছন্দ, ছন্দের ঝঙ্কার ইত্যাদির ক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সহজ মুন্সিয়ানা আছে। কিন্তু নজরুলের কাব্য তাঁর সমকালের প্রাসঙ্গিকতা, ছন্দ প্রয়োগ বৈচিত্র্যময় ও ব্যতিক্রমী। বিশেষ করে অসাধারণ ভাষা চাতুর্য যেখানে তাঁর তুল্য বাংলা সাহিত্যে আমার বিবেচনায় ২য় জন নেই। বাংলা ভাষায় তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিনম্র অন্তর্গত নিচুস্বরের পাশে নজরুল যেন ধ্বনি ঝঙ্কারে বিপ্লব করেছেন, তাঁর কাব্য সত্যিই সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কেঁপে উঠেছে। বৈচিত্র্যময় বিষয় ও সাহসী অনুষঙ্গে তাঁর কবিতা রবীন্দ্রযুগে এক বিপুল বিস্ময়, সাড়া জাগানো ঘটনা। স্মৃতি থেকে এমন কয়েকটি পংক্তি এই ডায়রিতে উল্লেখ করতে চাই এই জন্য যে অসম্প্রদায়িক নজরুলের মতো কণ্ঠস্বরের আজকে বড় অভাব। ধর্মীয় ভেদ বুদ্ধির বলি আমি, আমার আলো। ধর্মান্তরিত না হলে আলোকে গ্রহণ করবে না মুসলমান শ্বশুরালয়। তাঁদের ছেলে নিজেই ধর্মমুক্ত মানুষ। আলোকে সে ভালবেসে গ্রহণ করেছে। আলোও ধর্মমুক্ত সংস্কারমুক্ত। আলো তার স্বামীকে নিয়ে সংসার করছে কিন্তু তারা আমাদের কাছে এবং তাদের কাছে ব্রাত্য হয়ে রইল। তরুণ নজরুল লিখেছিলেন প্রায় শত বৎসর আগে একের পর এক বিস্ময়কর কবিতা। তার কিছু পংক্তি এমন, খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়াউঠিয়াছি চির— বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!... আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,আমি স্রষ্টা-সুদন, শোক-তাপহানা খেয়ালী বিধির বক্ষকরিব ভিন্ন!...জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়!ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া!হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি— ভাবলি এতেই জাতির জান,তাইত বেকুব করলি তোরা এক জাতিকে একশ’-খান।...‘ও’ কা’রা কোরান, বেদ বাইবেল চুম্বিছে মরিমরি!ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরেপূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল! — মূর্খরা সব শোনো, ...অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ,কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ!“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ঐ জিজ্ঞাসে কোন্ জন?কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!...মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুমহিন্দু মুসলমানমুসলিম তার নয়ণমণিহিন্দু তাহার প্রাণ। নানা গদ্য রচনা ও অভিভাষণেও নজরুল গোঁড়াপন্থিদের সমালোচনা করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় অনেক আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছেন। গুরুদেবের অসম্প্রাদায়িক মন ও রচনাও ছিল নজরুলের প্রেরণা। গোঁড়া মুসলমান ও হিন্দুদের তিনি আক্রমণের স্বীকার হয়েছেন। তাকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও শনিবারের চিঠি’র কর্তা ব্যক্তিরা নারাজ ছিলেন। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর সমকালীন এক পত্রিকায় এক মুসলমান বড় আহত হৃদয়ে লিখেছিলেন,“কবি নজরুল এছলামের খাঁটি কবি প্রতিভার উন্মেষ দেখিয়া আমরা বড়ই আশান্বিত হইয়াছিলাম। কিন্তু বিদ্রোহী কবিতা লিখিয়া তিনি আমাদিগকে একেবাইে নিরাশ করিয়াছেন। তাঁহার এই কবিতায় দু’একটি মোছলমানী শব্দ থাকিলেও উহার ভিতরের সব জিনিসটা বলিতে গেলে উহার কাঠামো হইতে আরম্ভ করিয়া বাহিরের সাজসজ্জা পর্যন্ত সবই হিন্দু ধর্মের আদর্শে অনুপ্রাণিত। কবি নজরুল এছলামের এই সাহিত্যিক প্রচেষ্টা আমাদিগকে শঙ্কান্বিত করিয়াছে।”নজরুলের সাহিত্যে ও গানে হিন্দু দেবদেবির নাম ও পৌরাণিক কাহিনির বর্ণনায় গোঁড়া মুসলমান যেমন ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তেমনি উর্দু, আরবী, তুর্কী শব্দ, ইসলাম ধর্মের পৌরণিক কাহিনির উল্লেখে গোঁড়া হিন্দুরাও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এসব অভিযোগের উত্তরে অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁকে নজরুল বলেছিলেন,“বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতের দুহিতা না হলেও পালিতা কন্যা। কাজেই তাতে হিন্দু ভাবধারা এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে ও বাদ দিলে বাংলা ভাষার অর্ধেক ফোর্স নষ্ট হয়ে যাবে। ইংরেজি সাহিত্য হতে গ্রীক পুরাণের ভাব বাদ দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। বাংলা সাহিত্য হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই সাহিত্য। এতে হিন্দু দেবদেবীর নাম দেখলে মুসলমানের রাগ করা যেমন অন্যায় হিন্দুরও তেমনি মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে নিত্য প্রচারিত মুসলমানী শব্দ তাদের লিখিত সাহিত্যে দেখে ভুরু কোঁচকানো অন্যায়। আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের এই সংস্কারে আঘাত দেবার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেবদেবীর নাম নিই।”আর নজরুল ইসলাম তাঁর ‘হিন্দু-মুসলমান যুদ্ধ’ প্রবন্ধের শুরুতে লেখেন,“একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেন: দেখ, যে ল্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ল্যাজকে কাটবে কে?হিন্দু মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমার বারে বারে গুরুদেবের ঐ কথাটিই মনে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে, এ ল্যাজ গজালো কি করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ঐ সঙ্গে এটাও মনের হয়, ল্যাজ যাদেরই গজায়— তা ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক— তারাই হয়ে ওঠে পশু।” ‘হিন্দু মুসলমান’ প্রবন্ধে নজরুল আরেক জায়গায় লিখেছেন— “প্রশ্ন করেছিলাম, এই যে, ভিতরের ল্যাজ, এর উদ্ভব কোথায়? আমার মনে হয় টিকিতি ও দাড়িতে। টিকিপুর ও দাড়িস্থানই বুঝি এর আদি জন্মভূমি। পশু সাজবার মানুষের একি ‘আদিম’ দুরন্ত ইচ্ছা।’...এই প্রসঙ্গের সঙ্গে গুরুদেবের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বয়ান থেকে উদ্ধৃতির প্রয়োজন এড়াতে পারছি না, “জনশ্রুতি এই যে, ভৈরব রাগ মহাদেবের বাঙ্গলা গানের জন্যেই প্রবর্তিত, আর শুনলেই বুঝা যায়, মিঞা মল্লার বাদশাহী আসরের ফরমাসেই রূপ নিয়েছে। কিন্তু তবুও ভৈরব বা ভৈরবী হিন্দু নয়, আর মুসলমান নয় মিঞা মল্লার। ওরা সম্প্রদায়ের অতীত। তেমনি হোমারের ইলিয়ড বা মিল্টনের প্যারাডাইস্ লস্ট মুখ্যত পৌত্তলিকও নয়, অপৌত্তলিকও নয়— ওরা সাহিত্য। ওদের গ্রহণ-বর্জন সম্বন্ধে বিচার করবার সময় একমাত্র রসের দিকে থেকেই বিচার কর্তব্য, ধর্মমতের দিক দিয়ে নয়, লজ্জা হয় এই সাদা কথাটারও ব্যাখ্যা করতে।” আমার “কথা ও কাহিনী”-তে “বিচারক” নামক কবিতার একস্থানে আছে, মরাঠি রঘুনাথ রাও মুসলমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রাকালে বলছেন— “চলেছি করিতে যবন নিপাতজোগাতে যমের খাদ্য।”“যবন” শব্দটা কালক্রমে হয়তো শ্রুতিকটু হয়েছে। তাই সাধারণত নিজের জবানীতে মুসলমানদের সম্বন্ধে ঐ শব্দ কখনই ব্যবহার করিনে। কিছুকাল হলো পাঠ্য নির্বাচন বিভাগের মুসলমান পক্ষ থেকে আদেশ এল ঐ “যবন” শব্দটা তুলে দিতে হবে, বিস্মিত হলেম। দুর্ব্বল পক্ষ আমরা, ভাবলেম এই হতভাগ্য দেশ ছাড়া আর কোথাও এমন উৎপাত সম্ভব হোতে পারত না। মার্চেন্ট অফ ভেনিসে খৃস্টান বারে বারে ইহুদিকে কুকুর বলে গাল দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সমস্ত বই খানাতেই ইহুদির পরে অবজ্ঞা ফুটে উঠেছে, তা না হোলে ওর নাটকীয় বাস্তবতার অপলাপ হোত। তৎসত্ত্বেও লর্ড রেডিং যখন এখানে ভাইসরয় ছিলেন তখন ঐ বইটাকে বিদ্যালয়ের পাঠ্য শ্রেণী থেকে সরাবার জন্যে পরোয়ানা জারি করেন নি। আর ডিজরেলির মতো প্রখর বক্তা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এ সম্বন্ধে নির্বাক ছিলেন। অথচ কাব্যে মরাঠি পাত্রের মুখে উচ্চারিত সামান্য একটা “যবন”শব্দের জন্য বাংলা সাহিত্য যদি লাঞ্ছিত হোতে পারে, তাহ’লে এই মাথাগণতির দিনে কার দরজায় দোহাই পাড়ব। সমস্ত কবিতটিতে রঘুনাথ রাওকে আদর্শ পুরুষ ব’লেও খাড়া করা হয় নি, তার বিপরীত “যবন” শব্দ ব্যবহারের দ্বারা মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি যদি অন্যায় সূচিত হয়ে থাকে সে অন্যায় কবির মধ্যেও নেই, কাব্যের মধ্যেও নেই, বস্তুত সে অন্যায় সাহিত্যকে স্পর্শও করেনি। এই সঙ্গে সঙ্গে রঘুনাথ রাও যমের খাদ্য জোগার কথা বলেছে, ওটাও তো সাধুলোকের যোগ্য কথা নয়; ঐ পংক্তিটাও বর্তমান অবস্থায় আমার পক্ষে উদ্বেগের কারণ হয়ে রইল। সাহিত্য বিচার নিয়ে এই রকম অদ্ভুত বুদ্ধিবিকার আমার হিন্দু ভ্রাতাদের মধ্যেও উগ্র হয়ে উঠতে পারে, আমি হতভাগ্য তার প্রমাণ পেয়েছি। “ঘরে বাইরে” নামক একখানা উপন্যাস অশুভলগ্নে লিখে ছিলেম। তার মধ্যে বর্ণিত সন্দীপ নামক এক দুবৃত্তের মুখে সীতার প্রতি অসম্মানজনক কিছু আলোচনা ছিল। বলা বাহল্য সন্দীপের চরিত্র চিত্র পরিস্ফুট করা ছাড়া এই আলোচনার মধ্যে অন্য কোনো অসৎ অভিপ্রায় ছিল না। হঠাৎ আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কলরব উঠল সীতাকে স্বয়ং আমিই অপমান করেছি। কবি বাল্মীকি অযোধ্যার প্রজাদের মুখের দুর্বাক্যকে দুম্মুখের মুখ দিয়ে ব্যক্ত করিয়ে নিরপরাধ সীতার নির্বাসন সম্ভব করেছেন। কেউ তা ত্রেতাযুুগের কবির প্রতি দোষারোপ করেন নি। আর কলি যুগের কবির মাথায় হিন্দু-মুসলামন উভয় পক্ষই একই শ্রেণীর অপরাধ চাপিয়ে যদি তার অখ্যাতিকে দুর্ভর করে তোলেন, তবে কি এই বাংলাদেশের পঙ্কিল মাটিকেই দায়ী করব? প্রাকৃতিক কারণ ছাড়া কোন রকম নৈতিক কারণ অনুমান করতে সাহস করিনে।”ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষ যে এখনও চরম অপমান ও দুঃখ পায় এবং দুঃখ দেয় তার নজির তো এখন আমার মেয়ে এবং আমি। আলোর শাশুড়ি কড়া আদেশ বা দিব্যি দিয়েছে ছেলেকে— তোর বউ মুসলমান না হওয়া পর্যন্ত ওর গর্ভে যেন আমাদের পরিবারের সন্তান জন্ম না নেয়। যদি জন্ম নেয় তোকে ত্যাজ্য পুত্র করবই শুধু নয়, আমার অভিশাপে তোরা শেষ হয়ে যাবি। আমার কষ্ট থেকেই এতসব কথা এল।যাইহোক, বুদ্ধদেব বসুর কথা এখন বলি, প্রথমত তিনি নজরুলের গান বিষয়ে যে কথাগুলো বলেছেন সেখানে তাঁর সংগীতবোধের অভাব পীড়াদায়ক। সাংগীতিক কাঠামো, সুর তাল স্বর রাগ ঠাটের কথা নয়, দৃষ্টান্তহীনভাবে অমার্জিত শব্দ, রুচির দোষ, স্থুল স্পর্শ তিনি পেয়েছেন! “সাধারণভাবে বলা যায় যে তাঁর গান তার কবিতার চেয়ে বেশি তৃপ্তিকর— গানের ক্ষুদ্র আকারে তাঁর অতিকথনের দোষ প্রশ্রয় পেতে পারেনি— ‘বুলবুল’ ও ‘চোখের চাতকে’ কিছু কিছু রচনা পাওয়া যাবে, যাকে অনিন্দ্য বললে অত্যন্ত বেশি বলা হয় না। আরো বেশি গান যে অনিন্দ্য হয়নি, তার কারণ নজরুলের দূরতিক্রম্য রুচির দোষ। কত গান সুন্দর আরম্ভ হযেছে, সুন্দর চলে এসেছে, কিন্তু শেষ স্তবকে কোনো একটা অমার্জিত শব্দ প্রয়োগে সমস্ত জিনিসটিই গেছে নষ্ট হয়ে। তাঁর প্রেমের গান সরস, কমনীয়, চিত্রবহুল: কিন্তু তার আবেদন আমাদের মনে যখনই ঘন হয়ে আসে তখনই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে, কোনো স্থুল স্পর্শে মোহ ভেঙে যায়। গীতরচয়িতার অন্য সমস্ত গুণ তাঁর ছিলো— শুধু যদি এই দোষ না থাকতো, শুধু যদি তাঁর রুচি হতো পরিশীলিত, তাহলে তাঁর মধ্যে একজন মহৎ গীতকারকে আমরা বরণ করতে পারতাম।”‘অমার্জিত শব্দ’, ‘স্থুল স্পর্শ’, ‘রুচির দোষ’ কী, কোথায় কীভাবে ঘটল তার কোন নজির দেখাবার দায়িত্ববোধ করলেন না বুদ্ধবাবু, যেমন তিনি মত প্রকাশ করেন শুধু— সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের চেয়ে নজরুল নিচুমানের কবি। যাইহোক, নজরুলের সংগীত ও সৃষ্টি যে পরিস্থিতি ও অবহেলার স্বীকার, উচ্চমনাদের দৈন্যতা এবং সর্বপরি নজরুলের অস্থির চঞ্চল অসংগঠিত ভাবনা ও যাপন সঠিক ধারায় নজরুল সংগীত চর্চা পথের অন্তরায় হয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে সুধীর চক্রবর্তীর মতটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।“তাঁর গান প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত এলিটিস্টদের ততটা মনোযোগ পায় নি। সংগীতের যাঁরা সারদর্শী— যেমন রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও অমিয়নাথ সান্যাল, তাঁদের লেখনী নজরুলের গান বিষয়ে কিছু উচ্চারণ করে নি। নজরুলের গান ভালো করে যাঁরা শিখেছিলেন এবং শিখিয়েছিলেন তাঁরা একে একে প্রয়াত হয়েছেন। কমল দাশগুপ্ত, সুবল দাশগুপ্ত, চিত্ত রায়, ধীরেন দাস, জগৎ ঘটক, নিতাই ঘটক, আব্বাসউদ্দিন, শচীন দেববর্মণ, গিরীন চক্রবর্তী, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আঙুরবালা, ইন্দুবালা সকলেই প্রয়াত। এখনও গাইছেন প্রবীণা ফিরোজা বেগম বা সুপ্রভা সরকার— কিন্তু তারপরে যাঁরা নজরুলের গান রেকর্ড করেছেনে শ্রোতৃসমাজ ও সংগীত গবেষেকরা তাঁদের সম্পর্কে সংশয়ী। কোনো কোনো গায়ক নানা কাল্পনিক সুরে, আবার কোনো কোনো গায়ক তাঁর নিজের রাগদারী সংগীত পরিবেশনের দক্ষতা নজরুলের গানের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।প্রকৃতপক্ষে, দুই বাংলায় এই মুহূর্তে নজরুলের গানের সমাদর ও জনপ্রিয়তা যথেষ্ট কিন্তু তাঁর গান নিয়ে নানারকম সমস্যা, সংকট ও প্রশ্ন উঠেছে যা নিরাকরণ করা কঠিন। প্রশ্নাকারে সমস্যাগুলি হল— সত্যি সত্যি নজরুলের গান সংখ্যায় কত? তার সব কি সংকলিত হয়েছে, না ছড়িয়ে আছে ইতস্তত পত্র-পত্রিকায়? তাঁর নামে প্রচলিত সব গানই কি মৌলিক, না অন্যের লেখা গান তাতে মিশে গেছে? মিশ্রিত গানগুলি চিহ্নিত করার উপায় কী? নজরুলগীতির কোনো নির্ভরযোগ্য স্বরলিপি গ্রন্থ আছে কি? তাঁর গানের যে অজস্র সংখ্যক রেকর্ড এক সময়ে বেরিয়েছিল, সেগুলি কি সংগৃহীত হয়েছে? একই নজরুলগীতি একাধিক শিল্পীর একাধিক সুরে, এমন কি আলাদা তালে রেকর্ড করা হয়েছে এবং হচ্ছে, তার কোন্টি নতুন শিক্ষার্থীর পক্ষে গ্রহণীয়? রবীন্দ্রনাথের যেমন বিশ্বভারতী, নজরুলের গানের জন্য তেমনই কি একটি একাডেমি খোলা যায় না— যার কর্তৃত্ব সবাই মেনে নেবেন? এই সব— কটি প্রশ্নের, বা সংশয়-সংকটের কোনো ইতিবাচক জবাব আমাদের জানা নেই।”সুধীর বাবুর এই কথাগুলোয় চিহ্নিত মূল সমস্যার সমাধান আমরা এখনও দেখতে পায়নি। যদিও নজরুল ইন্সটিটিউট এমনসব সংকট নিরসনেই কাজ করছে বলে বিশ্বাস করি। ফিরোজা বেগম আর এই পৃথিবীতে নেই। আমাদের আরও একটু ভেবে দেখতে হবে যে, সংগীতের আবেদন বিশেষভাবে আমাদের হৃদয়ে অনুভবে। কারণ গান— গল্প বা নাটকের মতো কাহিনী চরিত্র ও সামাজিকতা দিয়ে তার আবেদন সৃষ্টি করে না। কান তার প্রধান ইন্দ্রীয়। ওই গানের সুরও বাণীতে যদি চিরকালীনতার আবেদন না থাকে তবে সমকালেই বিনোদিত করে শ্রোতার মন থেকে চলে যেতে পারে। গান যখন পারফরমিং কলারূপে গৃহীত হয়, তখন সমকালের শ্রোতা দ্বারাই তার গ্রহণ বর্জন প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত হয়। ভাবীকালে আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকে না। সমকালের রুচির ওপর তার আয়ু, রুচি বদলাবেই, এই বদলে শুধু সেইটুকুই চিরকালের থেকে যায় যেটুকুর আবেদন একান্ত ব্যক্তির মনে চিরন্তন মানবীয় অনুভূতির স্পন্দনে স্পন্দিত হয়। বাণী প্রধান গান যদি শ্রোতা মুখাপেক্ষীই হয়ে থাকে তাহলে ভাবীকালের শ্রোতার নতুন রুচির গান তৈরি হবে। নিধুবাবুর টপ্পা, পালাকীর্তন, কবিরগান ইত্যাদি এখন শহর গ্রাম কোথাও আগের মত জনসমাদরে গৃহীত হয় না।সংগীতে বাণী ও কাল নিরপেক্ষ যে সুর, রাগরাগিণীর বিমূর্ত রূপ তা শুধু সমকালের শ্রোতার মুখাপেক্ষী নয়। তাই সুর রাগরাগিণীর অস্তিত্ব কখনও হারিয় যাবে না। বাণীময় গানের সুর গঠনে, অথবা রাগরাগিণী নিজেই নিজের মহিমায় বেঁচে থাকে। তবে, গুরুদেবের গান নির্জন এককের গান। নিজের মনের নানা ভাব ব্যকুলতায় তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে অথবা প্রশান্তি ও স্বস্তির জন্য গানের ওপর ভরসা করেছেন। সেই গানের বাণীতে সুরে মানব মনের সেই চিরকালীন মানবীয় অনুভূতির অনুরণ আছে বলেই তার ক্ষয় নেই। শত বৎসর পরেও রবীন্দ্রনাথের গান আরও বহুজনের অন্তরের কথা হয়ে উঠছে। প্রিয়নাথ সেনকে কবি লিখেছিলেন... ওগুলি (গানগুলো) আমার একান্তই অন্তরের কথা— অতএব কারও না কারও অন্তরের কোনো প্রয়োজন মিটতে পারে—... ।