সংবাদ

নজরুল প্রয়াণ দিবস শ্রদ্ধাঞ্জলি

নজরুলের গান


সাদ কামালী
সাদ কামালী
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:২১ এএম

নজরুলের গান
কাজী নজরুল ইসলাম / জন্ম: ২৪ মে ১৮৯৯ (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬; মৃত্যু: ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (১২ ভাদ্র ১৩৮৩)


আখ্যানপ্রবন্ধ

‘কেন কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি’

অরিন্দম খালিদ, সবাই অবশ্য ওই ৩/৪ বছরের ছোট ছেলেটিকে চেনে বুলবুল নামে। কাজী নজরুল ইসলামের খুব আদরের মেজ ছেলে এই বুলবুল। কেন খুব আদরের! গ্রামোফোন কোম্পানির অগ্রেমান্য প্রশিক্ষক ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খাঁ  সাহেব আর নজরুলের খুব ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় যখন নজরুল চুক্তিবদ্ধ হলেন ওই গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে। হুগলি ও কৃষ্ণনগর হয়ে নজরুল তখন বাসা নিয়েছিলেন কলকাতার পান বাগান লেনে। সময়টা ১৯২৮ সাল। ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁ-র কাছে নজরুল রাগ সংগীতে তালিম নিতে শুরু করেছিলেন। খাঁ সাহেব ছিলেন বিখ্যাত গায়ক, সুরকার এবং ঠুংরী অঙ্গে তাঁর পারদর্শিতা ছিল খুব উঁচু মানের। তবে জমিরউদ্দীন খাঁ ছাড়াও নজরুল ওস্তাদ কাদের বখ্স, মঞ্জু সাহেব, মাস্তান গামা প্রমুখ বিশিষ্ট পণ্ডিতের কাছেও রাগ সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন বিচ্ছিন্নভাবে। সহজে এবং দ্রুত আত্মস্থ করে নিতে পারতেন নজরুল। পান বাগান লেনের বাড়িতে নজরুল গান করছেন খাঁ সাহেবের সঙ্গে, পাশে আসন দিয়ে বসে আছে বুলবুল, যা শোনে তাই যেন ক্ষুদে বুলবুল শিখে ফেলে, বা গাইতে পারে সঠিকভাবে। সবাই খুব আশ্চর্য হয় শিশুর এই অসাধারণ ক্ষমতায়। বাবার মতোই সে প্রতিভাবান। নজরুলের অনেক স্বপ্ন এই বুলবুলকে ঘিরে। নিয়তি তখন অলক্ষ্যে হাসে। শিশু বুলবুলের বয়স তখন পুরোপুরি চার বছরও হয়নি। ১৯৩০ সালের ৮ মে বসন্তরোগের আক্রমণে বুলবুল মারা  যায়। জন্মেছিল ৯ অক্টবর ১৯২৬ সালে। ভয়াবহ এই শোক, শোকের আকস্মিকতায় নজরুল কেমন স্তিমীত হয়ে গেলেন। ‘বিদ্রোহী’ নজরুল, অগ্নিগর্ভ কবিতা ও গানের ফূর্তিবাজ মানুষটি, প্রাণোচ্ছ্বাসে সদা চঞ্চল নজরুলের জীবনে শোক গভীর পরিবর্তন এনে দিল। এক প্রকারের আধ্যাত্মিকতায় তিনি নিমজ্জিত হলেন। শুরু করলেন যোগ সাধনা।    

ঠিক এমনি, তুলনীয় ঘটনা রবীন্দ্রনাথের জীবনেও ঘটেছিল! গুরুদেবের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রতিভা ও স্বভাবে বাবার মতো। লোকে রবি ঠাকুরের মতো করে বলত শমী ঠাকুর। আত্মস্থ করার ও মনে রাখার অসাধারণ ক্ষমতাধর শমী ১৯০৭ সালে অনতিক্রান্ত কৈশরে কলেরায় মারা গেলেন। শোকে বিহবল ও স্তিমিত হয়ে পড়েছিলেন গুরুদেবও, কয়েকদিন নিজেকে ঘরে আটকে রেখেছিলেন। কথা বলতেন না। একা একা পায়চারি করতেন ছাদে। সেই সময় কালে গুরুদেবের মনে দুঃখ কষ্ট শোক মৃত্যু জীবন ধর্ম নিয়ে নানা বোধের জন্ম নেয়। চিন্তা, বোধ ও আধ্যাত্মিক ভাবনায় এক নতুন উপলব্ধির উদয় হয়। এই উপলব্ধি নৈবেদ্যর বিশ্বাসের জগত থেকে আলাদা, আরও মহাজাগতিক- গীতাঞ্জলির গান, কবিতার রচনা তখন থেকেই। নজরুলের ‘কেন কাঁদে পরান’ এর বহু আগে শোকগ্রস্ত গুরুদেব গেয়ে উঠেছিলেন মানবিক বেদনার স্পর্শে অতলস্পর্শী উচ্চারণ—

           অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে

           নির্মল করো উজ্জ্বল করো সুন্দর করো হে॥

           জাগ্রত করো উদ্যত করো সুন্দর করো হে।

           মঙ্গল করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে॥

শোক  দুঃখ জর্জর মনকে জয় করতে তাঁর অন্তরতর কাছে আর্ত নিবেদন পেশ করলেন, ব্যক্তিগত দুঃখের ঊর্ধ্বে মনকে নির্মল উজ্জ্বল সুন্দর করার আর্তি ভৈরবী রাগে গাইলেন। এই দুই মনীষীর শোক দুঃখের মতো কঠিন বেদনা আমিও সয়ে বেড়াচ্ছি। আমার আলো নেই, আমার পাশে সে কোথায়? চারদিকে অন্ধকার। গুরুদেবের সুর বাণীতে মনকে শান্ত করার প্রয়াশ চালিয়ে যাই, কিন্তু মনকে তো জাগ্রত উদ্যত সুন্দর করে তুলতে পারছি না। শমী ও বুলবুলের মতো আলোও আমার ছিল। ছিল আমারই মতো। আমার কষ্টের এই নীল শিখা নিভে যাওয়ার নয়,  কারণ আলো তো শমী বুলবুলের মতো অপর লোকের যাত্রী  হয়নি। ওর ইহজীবন ইহলোকেই আছে। শুধু ক্ষুদ্র সংকীর্ণ বুদ্ধির দোষে আলো আমার ঘর ছাড়া। আলো বেঁচে আছে, কিন্তু আমার জীবনের অন্ধকার থেকে অনেক দূরে। সংসারের ভেদবুদ্ধি ধর্মবুদ্ধি আলোকে দূরে সরিয়ে রেখে আমাকে স্তিমিত, মূক ও উদ্যমহীন করে রেখেছে। আমার সময়, একান্ত সময়ে আলোর সঙ্গে কথা হয়, অথবা আমাদের পচিশ বছরের কত কথা— তারই স্মৃতি মন্থন চলে।

নজরুলের গান প্রসঙ্গে কথা বলতে বারবার গুরুদেবের কথা মনে চলে আসে। বিশেষকরে আলো এবং আমিও গুরুদেবের গভীর অনুভূতির পূজাপর্বের গানগুলি বা তাঁর অধ্যাত্মবোধের গানই করি। গুরুদেবের ‘নৈবেদ্য’র পর ধীরে ধীরে গীতাঞ্জলি পর্বে  অধ্যাত্মচেতনার অনেক গভীর, বিমূর্ত, বিষন্ন-সৌন্দর্যের রস সেইসব গানে। স্ত্রী, মেয়ে, পিতা, ছোট ছেলের অল্প সময়ের ব্যবধানে ব্যবধানে এত মৃত্যু গুরুদেবের  মনে জীবন মৃত্যু জগৎ ঈশ্বর সম্পর্কে মহাজাগতিক উপলব্ধি গভীরতর হয়ে ওঠে। প্রিয় ছেলে ৩/৪ বছরের অরিন্দম খালিদ বুলবুল বসন্ত রোগে মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে নজরুলের ভিতরও অধ্যাত্মচেতনার প্রকাশ ঘটতে থাকে। এর পিছনে ছোট একটি স্মৃতি আছে, নজরুলের অবচেতন থেকে সচেতন মনে সজিব হয়ে ওঠে সেই স্মৃতি, ছাত্রজীবনে স্বপ্নে দেখেছিলেন যোগীরাজ বরদাচরণ মজুমদার মহাশয়কে। যোগীরাজের প্রেরণায় নজরুল যোগ সাধনায় আত্মশক্তি জাগিয়ে পরমেশ্বরের অনুভব নিজের মধ্যে সজিব করে তুলতে চান। বুলবুলের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে এই যোগ সাধনায় তিনি আরও নিমগ্ন হন। কিন্তু প্রিয় ছেলে বুলবুলের মৃত্যু বিমর্ষ বিষন্ন করে তুললেও জীবন ও সৃষ্টির জোয়ারে তাকে ব্যস্ত হয়ে থাকতে হয়। সে সময় তিনি গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির প্রধান কম্পোজার হিসেবে নানা স্বাদের বিচিত্র ধরণের সঙ্গীত রচনা করে চলেছেন, তার সঙ্গে কিছু গদ্য, শিউলীমাল গ্রন্থেও কিছু গল্প এমনকি বিশ্বসাহিত্য নিয়ে তাকে প্রবন্ধও লিখতে হয়, বৈচিত্র্যপূর্ণ ওই সৃষ্টির মধ্যে কিছু সাধারণ ইসলামি গান অনুরুদ্ধ হয়ে লিখলেও দেখা যায় সে সময়ে লেখা তার শ্যামা কীর্তনের মধ্যেই মনের ব্যাকুলতা, পরমেশ্বরের জন্য আর্তি শ্যামার জগৎমাতা বা কৃষ্ণের ভজনার মধ্যে নিজের প্রেমিক মনকেই কাব্য ও সঙ্গীতগুণে সমৃদ্ধ সৃষ্টিকে অবিরল প্রকাশ করে গেছেন। শ্যামার মধ্যে জগৎমাতা রূপান্তরিত হয়ে যায় দেশ মাতায়। কৃষ্ণ প্রেমে মানুষের প্রেম বা মঙ্গল কামনা করুণ রসের সুরে জড়িয়ে যায়। একবার নজরুল তাঁর গুরু বরাদাচরণের কাছে জানতে চাইলেন শান্তির মোক্ষ কোন পথে মিলবে। যোগীরাজের কাছ থেকে সেই পথের নির্দেশ এল, ‘শক্ত দৃঢ় পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাও। আত্মশক্তির ওপরে বিশ্বাস রেখে আগুয়ান হও ক্রমে নিত্যানন্দের আলোকস্পর্শে- স্পন্দনে সমাধিলাভ হবে।’ যোগীরাজ বরদাচরণ মজুমদার মহাশয়ের লেখা যোগসাধন পথের নির্দেশিকার মত গ্রন্থ ‘পথ হারার পথ’ বইটির ভূমিকায় নজরুল এই সাধন পথে নিজের মনের একান্ত কথা আবেগভরে লেখেন। সেখানে তাঁর মৃত ছেলেসহ, সাধনার পথ, শান্তির পথ, অধ্যাত্মচেতনার অনেকটাই নিরাভরণ আর্ত্মস্বরে প্রকাশ করেন, বলেন যোগীরাজের দেখা পাওয়া থেকে নির্দেশিত পথ ও সম্পর্কের কথা। নজরুলের অধ্যাত্মবোধ বুঝতে এই ভূমিক নিবন্ধের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য,

‘সহসা একদিন তাঁহাকে দেখিলাম, নিমতিতা গ্রামের বিবাহ সভায়। সকলে বর দেখিতেছে আমার ক্ষুধাতুর আঁখি দেখিতেছে আমার প্রলয় সুন্দর সারথিকে। সেই বিবাহ সভায় আমার বধূরূপিনী আত্মা তাহার চিরজীবনের সাথীকে বরণ করিল .../ তাঁহারই চরণতলে বসিয়া যিনি আমার চিরকালের ধ্যয় তাঁহার জ্যোতিরূপে দেখিলাম। তিনি আমার হাতে দিলেন যে অনির্বাণ দীপশিখ, সেই দীপশিখা হাতে লইয়া আজ বার বৎসর ধরিয়া পথ চলিতেছি— আর আগে চলিতেছেন তিনি পার্থ সারথিরূপে। .../ আমার ব্রহ্মক্ষুধা আজও মিটে নাই। কিন্তু সে ক্ষুধা এই জীবনেই মিটিবে সে বিশ্বাস স্থিত হইতে পারিয়াছি আমি আমার আনন্দ রস ঘন স্বরূপকে দেখিয়াছি।.../ আমি ধন্য হইলাম, বাঁচিয়া গেলাম। আমি অসত্য হইতে সত্যে আসিলাম।’ এই গদ্যেও অনুভবের মধ্যে নজরুলের পরিণত মনের যেমন পরিচয় পাই, তেমনি আশ্চর্যভাবে এই ব্রহ্মক্ষুধা, মৃত্যুর ভিতর অমৃতের খোঁজ, ছোট গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর মহাজাগতিক বোধে আলোড়িত হওয়া সব কেমন গুরুদেবের ভাবনার স্বর অন্যকবির স্বরে উচ্চারিত, ‘... নিত্য ঝড়ে জলে ধুলায় কাদায় মলিন ‘ছোট আমি’ অন্তরের ‘বড় আমির’ সঙ্গে মিলনাভিসার করে চলেছে জনমে জনমে— যুগে যুগে। মিলন সম্পূর্ণ হইলেই অখণ্ড ব্রহ্মের আশ্রয় লাভ করা— তাঁর সান্নিধ্যে চিদানন্দ রসে ডুবে যাওয়া’—

‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

পরাণ সখা বন্ধু হে আমার।

নজরুলের সাধনার ব্রহ্ম, পরমেশ্বর গুরুদেবের থেকে কখনও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে যখন তিনি পরাধীন মানুষের ওপর শক্তিমানের নিগ্রহ দেখে গেয়ে ওঠেন,

মেলি শতদিক শত লেলিহান রসনা

জাগো বহ্নিশিখা স্বাহা দিনাবসনা

এসো ক্ষুধা হয়ে নিরস্ত্র রিক্ত ঘরে

লোটো লক্ষ¥ীর ভাণ্ডার হা হা স্বরে’ অথবা


শান্তি কোথায়, শান্তি কোথায় কেউ জানি না

মাগো তোর ঐ দনুজ দলন সংহারিণী মূর্তি বিনা।জগন্মাতা, দেশমাতা ও বিশ্বজননী— গর্ভধারিণী একাকার হয়ে যায় তাঁর শ্যামা বন্দনায়। দীর্ঘদিন অনশনে মৃতপ্রায় নজরুলের সামনে এসে দাঁড়ালেন নজরুলের অনশনে সহযাত্রী— ১৩ দিন ধরে অনশনে থাকা বিরজাসুন্দরী দেবী মাতৃ মমতা ভালোবাসার আবেগ নিয়ে। নজরুল মমতাময়ীর মন নিংড়ানো অনুরোধ রক্ষা করে তাঁর হাতে লেবুর শরবত খেয়ে অনশন ভাঙলেন চল্লিশ দিন পর। তারপর নজরুল লিখলেন

সেই অপরূপ মায়ের বন্দনা— বিরজাসুন্দরী মিলিয়ে গেলেন মা ভবানীর রূপে—

‘মাগো আমরা বেঁচে আছি তোরই প্রসাদ পেয়ে

দুঃখে শোকে বিপদ বাড়ে

বাঁচাস মা তুই বক্ষে ধরে

দয়াময়ী নাই কেহ মা

ভবানী তোর চেয়ে।’

বরদাচরণের সাধনাপথের সাধক নজরুল পরে লিখলেন কত সব শ্যামা, কীর্তন, ইসলামি ভাবধারার গান—

‘শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে

জপি আমি শ্যামার নাম

মা হলেন মোর মন্ত্রগুরু

ঠাকুর হলেন রাধাশ্যাম।’

অথবা ‘মা হবি না মেয়ে হবি উমা বলে

তুই আমারে কোল দিবি না আমিই নেব কোলে।’

অথবা ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন

রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব, যার হাতে মরণ বাঁচন

ধর্মীয় গোঁড়ামির অনেক উর্ধ্বে, সকীর্ণসীমা বা ভেদবুদ্ধির উর্ধ্বে সাধক নজরুল, সমন্বেয়ের নজরুল, গুরুদেবের ভাষায় সংস্কৃতির সমন্বয়ের সাধক নজরুল ভারত-সংস্কৃতির পূর্ণ উপলব্ধির শক্তিতে শ্যামা, কীর্তনের পাশে, ইসলামি গান, গল্প লিখেছেন। অল্প বয়সে যেমন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লিখবার সময়ে লেখেন শাতিল আরব, মোহরমের কবিতা। শ্যামা লিখবার পর, বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সময় তিনি আব্বাসউদ্দীন প্রমুখের কণ্ঠে তুলে দেন ‘ইসলামি গান’— ‘নামাজী তোর নামাজ হল রে ভুল’ ‘বাহিরে কোথায় খুঁজিস খোদারে’, ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলরে দুনিয়ায়, খোদার প্রেমের শরাব পেয়ে’ ইত্যাদি।

আলোর গানের শিক্ষক যেমন শুদ্ধভাবে গানটি গাইতে শিখিয়েছেন, তেমনি পড়িয়েছেন সংগীত বিষয়ে নানা বই। রাগরাগিণী, তান, তাল, স্বর, স্বরের নানা স্বরান্তর সংগীতের এই বিষয়গুলো বোঝাতে সব সময় নজরুলের গানকেই দৃষ্টান্ত হিসেবে বেছে নিতেন। নজরুল সংগীত ও খুব ভাল শিখেছিল। একবার আমার একটা আব্দার শুনে আলোর গুরু বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের গানের শুধু কাঠামোটি নয়, সুর তাল নয়, এর সঙ্গে গানের গভীর ভাবটিও ফুটিয়ে তুলতে হবে। মানে বাণীর মাহাত্মটুকু ভালভাবে আত্মস্থ করা প্রয়োজন। অল্প বয়সের অভিজ্ঞতাহীন জীবনে তেমন উপলব্ধির জগতটা তৈরি হয় না। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের সংগীত ও ভাব প্রকাশের উপযোগী বিশেষ গায়কীরও প্রয়োজন। আলো নিশ্চয়ই একদিন রবীন্দ্রসংগীত করবে। আগে সংগীতের ভিত্তি-জ্ঞানটুকু সরগর হয়ে উঠুক। তা ঠিক। মাস্টার মশায় তার মতো ঠিকই বলেছেন, কিন্তু আলো আমার মেয়ে, ওর বোধ উপলব্ধির ক্ষমতা অন্যদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আমার তো গান সেভাবে হলো না। কিন্তু নিজের জন্য, পরিবারে জন্যও আমি গাই। সব সময় গাই। আলোকে ধরে ধরে অনেক গুরুদেবের গান শিখিয়ে দিয়েছিলাম। সেই শিক্ষার জোরে ওকে রবীন্দ্রসংগীতেরই একজন হয়ে উঠতে হল। মাস্টার মশায়দের শিক্ষায় সংগীতের ভিত্তি-জ্ঞানটুকু খুব কাজ করেছে। সেই শিক্ষায় নির্ভর করে গানকে উপলব্ধির স্তর থেকে গাইতে হবে কেমনে সেই শিক্ষাটা আমার। নজরুলের গান আমিও অনেক করেছি। শুরুতে মার্গ সংগীতের তালিম নিতে হয়েছিল। তখন আধুনিক গানে রাগ রাগিণীর ব্যবহার প্রয়োগে নজরুলের অতুলনীয় গানগুলি আমি গেয়েছি, শিখেছি। তবে আলোর মতো লম্বা সময় ধরে নয়। আমার ক্ষেত্রে একটা কারণ হয়তো এমন যে, আমার পড়ার অভ্যাস। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বিশেষ করে তাঁর কবিতা কাব্য নাটক গীতিনাট্য এবং গান বিয়য়ে গুরুদেবের কথা লেখা আমাকে নেশায় পেয়ে বসেছিল। ফলে সহজেই গুরুদেবের গানের মানবিক বেদনার অনুদ্বেল শব্দ ব্যবহার, মানসিক নির্ভরতা, উপলব্ধির মায়াময় জগত আমাকে চুম্বুকের মতো টানত, আজও ওই একই নির্ভর আমার।   

নজরুল আমার কাছে এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর প্রতিভার সেরা সৃষ্টি সম্পদই সংগীত। কত বিচিত্র বিষয়ে কত সহজেই বহুবর্ণ রাগরাগিণীর প্রয়োগে গান লিখেছেন, সুর করেছেন এবং গেয়েছেনও। বৈচিত্র্য ও বিপুলতা নজরুল সংগীতের একটি দিক। গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে ১৯২৮ সালে যুক্ত হওয়ার পর থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত বিপুল ও বিচিত্রগানের সৃষ্টি জোয়ার ছিল বিস্ময়কর। গ্রামোফোন কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার ঘটনাও সহজভাবে ঘটেনি। রেকর্ড কোম্পানিগুলো নজরুলের গান রেকর্ড করার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখিয়ে আসছিল নজরুলের বৃটিশবিরোধী মনোভাবের জন্য। সেই সময় তখনকার বিখ্যাত গায়ক হরেন্দ্রনাথ দত্ত  নজরুলের ২টি গানে সুর দিয়ে রেকর্ডে গেয়েছেন (১৯২৬)। রেকর্ডখানি খুব বিক্রীও হয়। গ্রামোফোন কোম্পনি সে কথা জানতে পেরে খুশি হয়েই নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাঁকে ওই দুটি গানের যোগ্য রয়েলটি পাঠিয়ে দেয় এবং সেই সঙ্গে নজরুলকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে যুক্ত হয়ে গান রচনার জন্য আমন্ত্রণ করে। সেই থেকে কবি নজরুল ওদের হয়ে গুরুগম্ভীর ধ্রুপদ, আধুনিক গান থেকে চপল ও হাল্কাহাসির গান, বিদেশী গানের অনুকরণে বিদেশী সুর বসিয়ে রচনা করেছেন অনেক গান এবং শুরু থেকেই তাঁর গানে কাব্যে ভাষার চাতুর্যময় ব্যবহার যার কোন তুলনা নেই বাংলা সাহিত্যে। সহজ সৃষ্টিশীলতায় তিনি আরবী ফার্সি শব্দ বাংলা গানে ও কবিতায় এমনভাবে মিশিয়ে দিলেন যা ছিল শুধু অভিনব নয়, শিল্প নৈপুণ্যে উজ্জ্বল।

গ্রামোফোন কোম্পানি ছাড়াও নাটকে ও চলচ্চিত্রে তাঁর ব্যস্ততা বাড়ল ওই সংগীত সৃষ্টি ও পরিচালনায়। সিরাজদ্দৌলা, মহুয়া, সাবিত্রী, কারাগার, রক্তকমল, শ্যামলীর স্বপ্ন, জাহাঙ্গীর, ব্লাক আউট ইত্যাদি নাটকের জন্য গান রচনার পাশাপাশি পাতালপুরী, গোরা, ধ্রুব চলচ্চিত্রে সংগীত রচনা ও পরিচালনা করেন। গান রচনা করেন নন্দিনী, চট্টগ্রাম অস্ত্রগার লুণ্ঠন, শ্রী শ্রী তারকেশ্বর, দিকশূল, সাপুড়ে, চৌরঙ্গী, বিদ্যাপতি ছবির জন্য। ধ্রুব- সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেন। আবার বিদ্যাপতি, সাপুড়ে ছবির কাহিনীও তাঁর লেখা। গ্রামোফোন কোম্পানির পর বিখ্যাত সংগীতশাস্ত্রী সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগযোগের সূত্রে যুক্ত হলেন কলকাতা বেতারে। সময়টা ১৯৩৮ সালের প্রথম ভাগ, কলকাতা বেতারে নজরুল তিনটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। তাছাড়া বেতারের জন্য গান রচনা তো ছিলই। অনুষ্ঠান তিনটি হলো— হারামণি, নবরাগ মালিকা এবং গীতি বিচিত্রা। হারামণি অনুষ্ঠানে নজরুল অপ্রচলিত এবং লুপ্তপ্রায় রাগে গান রচনা করে প্রচার করতেন। অনুষ্ঠানটি হত মাসে একবার। হারামণি’র শুরুর দিকে সুরেশ চক্রবর্তী রাগ সম্পর্কে বলতেন আর নজরুল ওই রাগে রচিত গানটি নিজেই গাইতেন। অনুষ্ঠানটি শুনেছি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। নতুন নতুন রাগ রচনা করে তাতে রচিত গান প্রচার করতেন নবরাগ মালিকা অনুষ্ঠানে। গীতি বিচিত্রা অনুষ্ঠানটি ছিল আলেখ্যমূলক। নজরুলের রচিত আলেখ্যের মধ্যে কাফেলা, কাবেরী তীরে, ছন্দসী প্রধান। এই গীতি বিচিত্রানুষ্ঠানে একটি বিষয় বা আলেখ্য ঠিক করে তার ওপর ছয়টি করে গান পরিবেশন করা হত। যাইহোক, কত ধরণের কাজ নজরুল ওই অল্প সময়ের মধ্যে করেছেন! উদ্যম, পরিশ্রম এবং প্রতিভার শক্তিতে বাংলা আধুনিক গানকে একদিকে জনপ্রিয় অন্যদিকে শুদ্ধ সংগীত সংস্কৃতির প্রবাহ সৃষ্টি করেছিলেন। আধুনিক গান রচনায় নজরুল কেন আগ্রহী হয়েছিলেন। তার কারণ হিসেবে নজরুল বলেছিলেন, আলোই বলেছিল নজরুলের এই কথাটি, মনে আছে এখনও!  

‘আধুনিক (মডার্ন) গানের সুরের মধ্যে আমি যে অভাবটি সবচেয়ে বেশী অনুভব করি তা হচ্ছে ‘সিমিট্রি’ (সামঞ্জস্য) বা ‘ইউনিফরমিটি’-র (সমতা) অভাব। কোন রাগ বা রাগিণীর সঙ্গে অন্য রাগ বা রাগিণীর মিশ্রণ ঘটাতে হলে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শাস্ত্রে যে সূক্ষ্ম জ্ঞান বা রসবোধের প্রয়োজন তার অভাব আজকালকার অধিকাংশ সুরের মধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে....।’

রবীন্দ্র মহাবলয়ের ভিতর নজরুল কত স্পষ্ট স্বতন্ত্র হয়ে উঠলেন সংগীতে এবং কবিতায়। অন্যদিকে নজরুল কিন্তু পছন্দ করতেন গুরুদেবের গান, গাইতেন, প্রচুর তাঁর মুখস্ত ছিল। নিজের গানের বাইরে একান্ত নিরালায় তিনি গুরুদেবের গানই গাইতেন। কখনো কখনো আলোর সঙ্গে আমার মৃদু তর্ক হত। আলো নজরুলের গানের বৈচিত্র্য সুর ঋজুতার কথা বলে বিদ্রোহী কবির মহিমাকে তুলে ধরত। সেসব আলো ঠিকই বলত, কিন্তু আমার বলার কথাটি অন্য, আলো হয়তো পরে বুঝতে পেরেছে। না হলে গুরুদেবের গানে ও এমন আত্মহারা হলো কী করে!

আলোর প্রথম এ্যালবাম আমাকে উৎসর্গ করলেও কবিগুরুর চরণে প্রথম অর্ঘ্যটি কিন্তু তাঁর গানেই নিবেদন করে নেয় অন্তরের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দিয়ে । উৎসর্গে আলো লিখেছে, শিল্পী লীলাময়ী, আমার গুরু। এরপর আরও অনেক গানের এ্যলবাম প্রকাশ হলেও আলোর ২য় এ্যালবামটি ছিল নজরুলের গান নিয়ে। গানগুলোর বিশিষ্টতা হলো সবগুলো গানই বিদেশী সুর অবলম্বন করে সৃষ্টি গান, অনেকে আমরা জানিও না এই জনপ্রিয় গানগুলো বিদেশি সুরে দেশি কথায় স্বরে তালে একেবারে বাংলা গানের ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। আলোর এ্যালবামের কয়েকটি গান এমন,

ইজিপ্সিয়ান ডান্সের সুরে—

মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে নেচে যায়

আরবি সুরে—

রুমঝুম ঝুমঝুম খেজুর পাতার নূপুর পায়ে

কিউবান ডান্সের সুরে— দূর দ্বীপবাসিনী, চিনি তোমারে চিনি

ইউরোপিয় অর্কেষ্টার সুরে— খেলিছে জলদেবী, সুনীল সাগর জলে

এবং পারস্য গজলের বিষানুষঙ্গে রচিত অনুবাদকৃত গজল—

করুণ রবীন্দ্রনাথের গানের কেন অরুণ আাঁখি, দাও গো সাকী দাও শরাব, ইত্যাদি।  

আর একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ্যের অনিবার্যতা এড়াতে পারছি না, তা হল- গজল রীতির গান, বাংলায় গজল রীতির গান প্রচলন করে নজরুল জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। করাচির ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে নজরুলের সঙ্গে ছিলেন একজন পাঞ্জাবী মৌলবি। তখনকার হাবিলদার নজরুল ইসলাম মৌলবি সাহেবের কাছে ফার্সিটা ভালো করে শেখেন। পরবর্তীকালে তাঁর প্রিয় কবি হাফিজ এবং অন্য ফার্সি  কবিদের মূল লেখা পাঠ ও ফার্সি ভাষার অনুকরণে গজল রচনায় সফল হয়েছিলেন। ওই রেজিমেন্টের হাবিলদার নিত্যানন্দ দে ভাল অর্গান বাজাতে পারতেন। তাঁর কাছে নজরুল শিখলেন অর্গান বাজাতে। সৈনিক গোপী ভাল ক্ল্যারিওনেট বাজাতেন, নজরুল শিখলেন ক্ল্যারিওনেট। বাল্যকালে মক্তবের শিক্ষা, দুটি স্কুলে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা, আসানসোলের চা রুটি দোকানের কর্মচারী এবং করাচীর রেজিমেন্টের সৈনিক জীবন থেকে ফিরে সংগীত ও সাহিত্যের আকাশে রবীন্দ্রবলয়ের উজ্জ্বল আলোর পাশে ভিন্ন, নতুন এক স্বতন্ত্র নক্ষত্রের আবির্ভাবই ১৯ বছরের নজরুল,কবি কাজী নজরুল ইসলাম। জীবন, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পারিবারিক পরিচয় ধর্ম নানা বিশিষ্টতায় নজরুল তৈরি হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে গুরুদেব কেন অন্য কেউ তুলনীয় নন। মাত্র ২২টি বছর ছিল তাঁর সৃষ্টির জীবন।

গুরুদেবের থেকে সংখ্যায় নজরুলের গান অনেক বেশি। সাধারণভাবে লোকে বলে সাড়ে তিন হাজারের বেশি গান তিনি লিখেছিলেন। নজরুল নাকি নিজেই মুজাফ্ফর আহমেদকে বলেছিলেন তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ৩১৬৩টি গানের সমগ্র। নজরুল সংগীত সমগ্রের সম্পাদকের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে কবির আরও অনেক গান উদ্ধার হবে। নজরুলের সৃষ্টি ২২ বছরের বেশি নয়। ঠিক ঠাক দিন তারিখ গ্রন্থ বিষয় ধরে খোঁজ নিতে গেলে দেখা যাবে ১৯৩৪ সালের পর তাঁর আর কোন গীতিকাব্য প্রকাশ হয়নি। প্রকাশ হয়েছে ১৯৪২ সালে যখন তিনি নির্বাক অসুস্থ। অসুস্থতা ওই ৩০ দশকের শেষদিক থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। নজরুলের শেষদিকের কবিতায় আছে পুনরাবৃত্তি। সচেতন উজ্জ্বল নজরুলের তুলনায় ধর্মভাবাপন্ন রচনায় বিশেষ মনোযোগ,  এবং শিল্পমানে নজরুলের মর্যাদা ঠিকভাবে রক্ষিত হয়নি সেইসব রচনায়।  

অল্প সময়ের মধ্যে নজরুল অনেক লিখেছেন সত্য, কিন্তু সেই সব আধুনিক বাংলা গানে শেষ পর্যন্ত নজরুলের দর্শন প্রত্যয় বা একজন শিল্পী মনের গভীর তলদেশের মনভূমি কোথাও মেলে! নাটক সিনেমা গ্রামোফোন কোম্পানির হয়ে গান লিখেছেন যেমন তেমন ব্যক্তিগত অনুরোধেও লিখেছেন। শিল্পীদের অনুরোধেও গান লিখে দিয়েছেন। তাঁর গানের সুর করেছেন অনেকে। এক কমল দাশ গুপ্ত নিজেই করেছেন প্রায় চারশ। নজরুলের গানে অন্যরা তাদের মতো সুর বসিয়ে রেকর্ড করেছেন। মঞ্চে সিনেমায় গেয়েছেন। সব সময় গীতিকার নজরুলের স্বীকৃতিও মেলেনি। এমনকি নজরুলের নিজের সুর করা গানে কী সেই সুর সঠিকভাবে মেনে চলা হয়! সেখানেও ছড়িয়েছে বিভ্রান্তি। নজরুল যখন লিখছেন গাইছেন সুর করছেন তখন থেকেই এলোমেলো অবস্থা। তাঁর সুর বাণী সঠিক রক্ষা করা হচ্ছে কিনা এমন কোন তদারকী বা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান কোন কালেই ছিল না। বাংলাদেশের নজরুল ইনস্টিটিউট এই পথে কাজ করার চেষ্টা করছে— মূল সুর, স্বরলিপি, কথা সংগ্রহ করছে। কিন্তু অনুমোদন বা রেকর্ড বন্ধ করার ক্ষমতা তাদের নেই। অন্য কথায় বাণী ও সুরের কপি রাইট সংরক্ষিত নয়, বা খবরদারির আইনি অধিকার নজরুল ইন্সটিটিউটের নেই। নজরুলের গানের নির্ভরযোগ্য স্বরলিপির অভাব- এক্ষেত্রে তাঁর গান ইচ্ছা স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পিছনে আর একটি কারণ। এইসব দিক ছাড়াও, অথবা আমার কাছে এই নেইগুলোর গুরুত্ব তত নয়।

যতটা একজন ব্যক্তির নানা মানবিক মুহূর্তে, দুঃখ আনন্দ গভীর অনুভূতি আলোড়িত সময়ে যে গান সুর মনে প্রশান্তি স্বস্তি এনে দিতে পারে, যে গানের সুর বাণী মনের ভিতর গেয়ে ওঠে, অর্থাৎ নির্জন এককের গান, নজরুলের গানের তেমন বিশিষ্টতা প্রায় নেই। গুরুদেবের গানে মনের আধারটুকু আছে, যে প্রশান্তির আশ্রয় আছে তার অভাব নজরুলের ক্ষেত্রে রয়েছে। একথা বলতে চাই না যে তাঁর গানে কাব্যে প্রজ্ঞা ও মননের অভাব আছে। অনেকে যদিও বলে, ‘ইতিহাস চেতনা ও আধুনিক জীবন বীক্ষণের তেমন গূঢ়চিহ্ন নজরুলের গানে নেই। গানের সুর, গায়ন ভঙ্গি হাল্কা ও চটুল। আর্টের বিচারে তা সবার কাছে সমানভাবে ছাড়পত্র পায় না।’ আমার নিজের কাছে এমন মন্তব্য বলব, ব্যক্তিগত মত, অবশ্যই আপেক্ষিক এবং সবচেয়ে বড় কথা ইতিহাস চেতনা বা আধুনিকতার গূঢ় চিহ্ন জাতীয় পর্যবেক্ষণ সংগীত বা সুরের ক্ষেত্রে কী প্রয়োজন? আমি শুধু বলতে চাই ব্যক্তির মনে তার আবেদনটুকু কত! ওইসব মাপকাঠিতে সংগীতের রস বিচার করতে গেলে রবীন্দ্রনাথের গানও কাঠগড়ায় উঠতে বাধ্য। তবে আজও আমরা গুরুদেবের গানে, কাব্যে ভাবনায় নিত্যনব উন্মোচন, ভাবের নানা তরঙ্গে নতুন নতুন উদঘাটন, বহুতর অর্থের ব্যঞ্জনা আবিষ্কার করে চলেছি।

বাংলা আধুনিক গানের রূপ কেমন হয় সুকুমার রায় সে সম্পর্কে যা লিখেছেন নজরুলের গান তার ব্যতিক্রম নয়—

‘যে গান কথা রচনায় জীবনকে প্রত্যক্ষ করতে সাহায্য করে এবং বাস্তবতা যার বিষয়বস্তুতে স্পষ্ট এবং যে রীতিতে সুর প্রয়োগের কায়দা প্রতি অংশেই বিশিষ্ট ভাব প্রকাশ করে এবং যে গানে বিচিত্রধর্মী সুর কলি প্রযুক্ত হতে পারে, যে গানের সুর রচনায় মূলগত উদ্দেশ্য থাকে ভাব প্রতীকের গ্রন্থন এবং বিচিত্র ও বিভিন্নধর্মী স্বরসঙ্গতি সৃষ্টিতে শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য সাধন, সবশেষে যে ধরনের যন্ত্র সংগীতের সহযোগিতা তাৎপর্যমূলক তাকেই আধুনিক গান বলে বর্ণনা করা যেতে পারে।’    

নজরুলের লেখা গান তাঁরই রচিত সুরে, কখনও তাঁর পরিচালনায় সুর-শিল্পীরা সর্বত্র গাইছেন। সঙ্গীতে তিনি তখন প্রতিষ্ঠিত বলা যায়। বিশেষ করে বাংলা গানের নতুন রূপ আনলেন বাংলা গজল গানে। কিন্তু গ্রামোফোন কোম্পানি বা অন্য কোন রেকডিং কোম্পানি তাঁর গান রেকর্ডে বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছেনা। সে তার বৃটিশবিরোধী ইমেজের জন্য হোক অথবা ধর্ম পরিচয়ের জন্য হোক। রেকর্ডি কোম্পানিগুলো যেহেতু ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠান তাই শেষ পর্যন্ত তাঁর দিকে মনোযোগী হতে বাধ্য হলো সঙ্গীতে নজরুলের জনপ্রিয়তার জন্য। তাছাড়া তখনকার বিখ্যাত গায়ক হরেন্দ্রনাথ দত্ত নজরুলের একটি গান এবং রজনীকান্ত সেনের একটি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে রেকর্ড করিয়েছিলেন এবং রেকর্ডটি বিক্রিও ভালো হয়।  প্রসঙ্গত কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের নজরুল স্মৃতি গ্রন্থেও কিছু তথ্য এইক্ষেত্রে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছিল। মুজাফ্ফর সাহেব যেমন বলেছিলেন নজরুলের লেখা দুটি গান হরেন্দ্রনাথ ‘ঘোষ’ নজরুলের নাম গোপন করে রেকর্ড করেছিলেন ১৯২৬ সালে। রেকর্ড বাংলা গান নিয়ে গবেষণায় খ্যাতি অর্জন করেছেন কল্যাণবন্ধু ভট্টা”ার্য। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, রেকর্ড হয়েছিল ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বও মাসে। হরেন্দ্রনাথ ঘোষ নয় দত্ত দুটি গান রেকর্ড করলেও তাঁর একটি ছিল নজরুলের। গান নয়, তাঁর কবিতা ‘জােিতর নামে বজ্জাতি’ কবিতায় হরেন্দ্রনাথ ও নিজেই সুর দিয়ে গেয়েছিলেন। অন্য গানটি ছিল কান্ত কবির ‘মায়ের ঘরের শুধু ভাত ...’। আর একটি মজার কথা কল্যাণবন্ধ জানিয়েছেন, গ্রামোফেন কোম্পানি কাজী নজরুলের ইসলামের নাম ঠিকই জানত। এইচ, এম, ভি’র গানের রেকর্ডেও তালিকায় পষ্কিার লিখা ছিল, শ্রীযুক্ত হরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় এবারেও দু’খানি গান রেকর্ডে দিয়েছেন। প্রথম গানখানিতে দেশের জিনিসের ব্যবহার করিতে উপদেশ দেওয়া হইয়াছে। দ্বিতীয়খানি ছুঁতমার্গ পরিহার সম্বন্ধে সুপ্রসিদ্ধ কবি কাজী নজরুল ইসলাম দ্বারা রচিত। সুতরাং রচনার সৌন্দর্যে ও মনোহারিত্বে অতিশয় প্রশংসনীয়।’ মুজাফ্ফর সাহেবের ওই রকম তথ্য পরবর্তীকালের অনেক লেখক পুনরাবৃত্তি করে ভুলের প্রজন্ম সৃষ্টি করে চলেছে। বিশেষকরে খুব সমাদৃত গ্রন্থ নজরুল পরিক্রমার লেখক আব্দুল আজীজ আল্ আমান এবং করুণাময় গোস্বামীর নিজ নিজ গবেষণায় মুজাফ্ফর আহমেদ সাহেবের ব্যবহৃত তথ্য অন্য লেখক পাঠক পুনারাবৃত্তি করে চলেছেন। নজরুলের বিয়ে, সাহিত্যকৃতি ইত্যাদি প্রসঙ্গেও মুজাফ্ফর আহমেদের তথ্য প্রকৃত তথ্য বা ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যাইহোক প্রসঙ্গটি ভিন্ন।

আমার বুদ্ধিমান মেয়ে আলো সঙ্গীতের রসটুকুতেই আনন্দ খুঁজে নিতে পারে। তথ্য তার জন্য জরুরি নয়। দুঃখজনক হলো শুদ্ধ, রসগুণপূর্ণ উঁচুমানের সঙ্গীত হওয়া সত্ত্বেও নজরুলের গান সমকালে বা আজও যোগ্য সমান মর্যাদা অনেক মহাজন সুর রসিকদের কাছ থেকে পায়নি, পাচ্ছেনা। আজও পশ্চিমবঙ্গে, আকাশবাণী কেন্দ্রগুলোতে নজরুল সঙ্গীত নজরুলগীতি হয়েই থাকল। সহস্রাধীক গানের গীত, সুর, রাগ-রাগিনী তালের স্রষ্টা শুধু গীতিকারই থেকে গেলেন। শুরুতে আধুনিক গানের বিভাগে নজরুলের গান পরিবেশন হত, উপস্থাপকের ঘোষণায় জানা যেত আধুনিক গানটির গীতিকার কাজী নজরুল ইসলাম। আর মুখে মুখে ছিল কাজীদার গান। কাজীদার গান ‘নজরুলগীতি’র ক্যাটাগরিতে নজরুলের নিজের লেখা নিজের সুরে বাঁধা, নিজের প্রশিক্ষণে বড় বড় গানের শিল্পীরা জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। নজরুলের গান তখন জনপ্রিয়তার নিরিখে রবীন্দ্রনাথের গান থেকেও জনসমাদৃত হয়ে উঠেছিল। অথচ তাঁর সৃষ্টি সমস্ সঙ্গীত নজরুল সঙ্গীত হিসেবে তো নয়ই, নজরুলগীতির ক্যাটগরিতে প্রচার করার জন্যই আবেদন নিবেদন করতে হচ্ছিল। মহাজ্ঞাতি সদনে ১৯৬০ সালে নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যে কমিটি তৈরি হয়েছিল তার সদস্য ছিলেন মুজাফ্ফর আহমেদ, বিচারপতি শঙ্করপ্রসাদ মিত্র, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, ডঃ শ্রীকুমার বন্দোপাধ্যায়, মৈত্রেয়ী দেবী, অমিয় কুমার বসু প্রমুখ, কমিটির সাধারণ সম্পাদক কল্পতরু সেনগুপ্ত। এই কমিটির সদস্যরা দিল্লীতে আবেদন করেছিলেন নজরুলের গানকে আলাদা ক্যাটাগরির মর্যাদা দিতে। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওহরলাল নেহেরু, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্র ডাঃ কেশকার। এরপর ১৯৬৩ সাল থেকে নজরুলের গানকে নজরুলগীতি বলা শুরু হলো।

গজল গানের মতো নজরুল বাংলা গানে আরও একটি ধারা সঙ্গীতের ধারা সৃষ্টি করেছিলেন প্রথম, সেটি হলো ইসলামি গান! সাধারণভাবে একথা সবার কাছে সত্য মনে নাও হতে পারে, কিন্তু ব্যাকরণসঙ্গত এবং সঙ্গীত ধর্মে এই কথা মেনে নিতে হবে শুদ্ধ ইসলামি সঙ্গীত নজরুল ইসলামের হাতেই তৈরি, তিনিই এই ধারার পথিকৃত। নজরুলপূর্ব বাংলা গানের স্বাশত ধারায় অনেক লোককবির বাঁধা গানে নানা রূপ ইসলামি অনুষঙ্গ বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, গানের শ্রেণিতে তা ‘ইসলামি’ অভিধায় চিহ্নিত না হয়ে বাউল, মুর্শিদী, ফকিরী, মারফতি এমন সাধারণ অভিধায় পরিচিত। এই সব গানের লোক কবি গিতীকারদের গানের বাণীর ভর কেন্দ্রে শুধু ধর্ম ইসলাম নয়, মানবধর্মের তথা সর্বজনীন বাণীর সবল প্রতীকী আবরণে লম্বা লয়ে গাওয়া। তাঁর সুর কাঠামো, স্বরলিপি বা সঙ্গীত ধর্মের শুদ্ধতা নির্মাণকে বাজায় রাখার দায় নেই। সাধারণভাবে তাকে ‘গান’ বলা হলেও গানের সবটুকু নিয়ে সৃষ্ট সঙ্গীত নয়, অন্তত আমার তাই মনের হয়, এক্ষেত্রে নজরুরেল ইসলামি গান ইসলাম ধর্মেরই গান হওয়ার পর তার অন্য অন্য স্তর বিভার আলোচনা হতে পারে, তাই নজরুলের এই ঘরনার গান অনেক সময়ই একরৈখিক, নির্দিষ্ট; তাঁর সৃষ্টি বাংলা ঠুমরি, গজল, কীর্তন, শ্যামা বা প্রেমের গানের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ বহুস্তরীয় না হলেও সঙ্গীত ধর্মে তা সঙ্গীতই। ধ্বনি, ছন্দ, সুর, বাণী, তাল লয় মিলিয়েই সঙ্গীত।

আল্লাতে যাঁর পূর্ণ ঈমান

বিশ্ব দুলালী নবী নন্দিনী

হে নামাজী নামাজ পড়

ও মন রমজানের এই রোজার শেষে এল

আল্লাহকে যে পাইতে চায়

মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই

ইত্যাদি গানের কথার ওপর কান না চড়িয়েও সুরের আনন্দটুকু অনির্বচনীয় মনে হয়। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না ইসলামি গান নজরুলের বৈচিত্র্যপূর্ণ সঙ্গীত ধারার একটি সাধারণ ধারা মাত্র এবং যতটা তিনি স্বতপ্রণোদিত হয়ে এই গানগুলো রচনা করেছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি সব রেকর্ড কোম্পানির চহিদা এবং তাঁর চারপাশের মুসলমান বন্ধুদের পরামর্শে রচিত। বন্ধুদের ধারণা ছিল কিছু ভারি ভারি আলেম-ফাজেল-মৌলানা-মোহাদ্দেসগণের দৃষ্টিতে নজরুল ইসলাম যেভাবে বে-দাত, বে-দ্বীন, বে-শরিয়ত, কাফের, মুনাফেক, না ফরমান, জাহেল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়েছিলেন তার কিছু হলেও ইসলামি গান রচনা করে প্রশমিত করতে পারবে। যদিও সাধারণ মুসলমান বাঙালির কাছে তাঁর মুসলমানিত্বের শুদ্ধতা নিয়ে মাথা ব্যাথা ছিল না। নজরুল যতই শ্যামা কীর্তন লিখুক, তথাকথিত হিন্দু দেবীর নাম তার সাহিত্যে যতই থাকুক, তিনি ব্রাহ্ম সমাজের নারেিক মুসলিম না করেই আহ্হেলি কেতাবের তরিকামতে বিয়ে করুন না কেন তাতে কবি নজরুল, সঙ্গীতের নজরুল ম্লান না হয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিলেন। 

নজরুল তাঁর সমকালে অন্তত গানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের থেকেও জননন্দিত হয়ে ছিলেন। বিনোদনের অভাব মিটিয়েছে তাঁর গান। নজরুলের সাহিত্য আজকে তাঁর সমকালের মত করে প্রাসঙ্গিক নয়। যদিও আমরা এখনও তীব্রভাবেই নানারকম ভেদবুদ্ধি, ধর্মের অসৎ ব্যবহার, নানা অনাচারে জর্জরিত, তবুও আমরা বারবার নজরুলকে উদ্ধৃত করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসাহিত নই। নজরুলের সৃষ্টির উপরিকাঠামোর তলদেশে গভীরতার অভাবই কি এর কারণ! এ বিষয়টি গবেষকদের হাতে ছেড়ে দেই! আমি শুধু একজন সুর রসিক হিসেবে বুঝে উঠতে চাই। তবে তাঁর সংগীত যে অবহেলা উপেক্ষা এবং কিছুটা অবমূল্যায়নের স্বীকার হয়েছে এখনো হচ্ছে সে কথাও ঠিক। যেমন নজরুলের প্রায় সমবয়সি রবীন্দ্র নজরুলের পর প্রধান সাহিত্য কর্তা এবং নজরুলের ঘনিষ্ঠ বুদ্ধদেব বসুর পাঠের সঙ্গে আমি একমত নই। নজরুলের সৃষ্টিকে শুধু গুণগত বিচারে নয় শ্রেণিগত বিচারে নীচুস্তরের- এমন ভাবনা প্রতিষ্ঠার সচেতন চেষ্টা হয়তো আছে। বুদ্ধদেব বসু মনে করেন কাব্যক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পর নজরুলের অবস্থান। বাংলা সাহিত্যের একজন ছাত্র হিসেবে এবং ব্যক্তিগত পাঠাভ্যাসের কারণে ওঁদের লেখা আমি অনেক পড়েছি। অন্ত্যমিল, পদ্যছন্দ, ছন্দের ঝঙ্কার ইত্যাদির ক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সহজ মুন্সিয়ানা আছে। কিন্তু নজরুলের কাব্য তাঁর সমকালের প্রাসঙ্গিকতা, ছন্দ প্রয়োগ বৈচিত্র্যময় ও ব্যতিক্রমী। বিশেষ করে অসাধারণ ভাষা চাতুর্য যেখানে তাঁর তুল্য বাংলা সাহিত্যে আমার বিবেচনায় ২য় জন নেই। বাংলা ভাষায় তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিনম্র অন্তর্গত নিচুস্বরের পাশে নজরুল যেন ধ্বনি ঝঙ্কারে বিপ্লব করেছেন, তাঁর কাব্য সত্যিই সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কেঁপে উঠেছে। বৈচিত্র্যময় বিষয় ও সাহসী অনুষঙ্গে তাঁর কবিতা রবীন্দ্রযুগে এক বিপুল বিস্ময়, সাড়া জাগানো ঘটনা। স্মৃতি থেকে এমন কয়েকটি পংক্তি এই ডায়ারিতে উল্লেখ করতে চাই এইজন্য যে অসম্প্রদায়িক নজরুলের মত কণ্ঠস্বরের আজকে বড় অভাব। ধর্মীয় ভেদ বুদ্ধির বলি আমি, আমার আলো। ধর্মান্তরিত না হলে আলোকে গ্রহণ করবে না মুসলমান শ্বশুরালয়। অথচ তাঁদের ছেলে রজব নিজেই ধর্মমুক্ত মানুষ। আলোকে সে ভালবেসে গ্রহণ করেছে। আলোও ধর্মমুক্ত সংস্কারমুক্ত। আলো তার স্বামীকে নিয়ে সংসার করছে কিন্তু তারা আমাদের কাছে এবং তাদের কাছে ব্রাত্য হয়ে রইল। তরুণ নজরুল লিখেছিলেন প্রায় শত বৎসর আগে একের পর এক বিস্ময়কর কবিতা। তার কিছু পংক্তি এমন,  

         খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া

উঠিয়াছি চির— বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!

...

          আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,

আমি স্রষ্টা-সুদন, শোক-তাপহানা খেয়ালী বিধির

বক্ষকরিব ভিন্ন!

...

জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া!

ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া!

হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি— ভাবলি এতেই জাতির জান,

তাইত বেকুব করলি তোরা এক জাতিকে একশ’-খান।

...

‘ও’ কা’রা কোরান, বেদ বাইবেল চুম্বিছে মরিমরি!

ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,

যাহারা আনিল গ্রন্থ— কেতাব সেই মানুষেরে মেরে

পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল!— মূর্খরা সব শোনো,

...

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ,

কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ!

“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ঐ জিজ্ঞাসে কোন্ জন?

কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!

...

মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম

হিন্দু মুসলমান

মুসলিম তার নয়ণমণি

হিন্দু তাহার প্রাণ।

নানা গদ্য রচনা ও অভিভাষণেও নজরুল গোঁড়াপন্থিদের সমালোচনা করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় অনেক আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছেন। গুরুদেবের অসম্প্রাদায়িক মন ও রচনাও ছিল নজরুলের প্রেরণা। গোঁড়া মুসলমান ও হিন্দুদের তিনি আক্রমণের স্বীকার হয়েছেন। তাকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও ‘শনিবারের চিঠি’র কর্তা ব্যক্তিরা নারাজ ছিলেন। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর সমকালীন এক পত্রিকায় এক মুসলমান বড় আহত হৃদয়ে লিখেছিলেন,

‘কবি নজরুল এছলামের খাঁটি কবি প্রতিভার উন্মেষ দেখিয়া আমরা বড়ই আশান্বিত হইয়াছিলাম। কিন্তু বিদ্রোহী কবিতা লিখিয়া তিনি আমাদিগকে একেবারেই নিরাশ করিয়াছেন। তাঁহার এই কবিতায় দু’একটি মোছলমানী শব্দ থাকিলেও উহার ভিতরের সব জিনিসটা বলিতে গেলে উহার কাঠামো হইতে আরম্ভ করিয়া বাহিরের সাজসজ্জা পর্যন্ত সবই হিন্দু ধর্মের আদর্শে অনুপ্রাণিত। কবি নজরুল এছলামের এই সাহিত্যিক প্রচেষ্টা আমাদিগকে শঙ্কান্বিত করিয়াছে।’  

নজরুলের সাহিত্যে ও গানে হিন্দু দেবদেবীর নাম ও পৌরাণিক কাহিনির বর্ণনায় গোঁড়া মুসলমান যেমন ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তেমনি উর্দু, আরবী, তুর্কী শব্দ, ইসলাম ধর্মের পৌরাণিক কাহিনির উল্লেখে গোঁড়া হিন্দুরাও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এসব অভিযোগের উত্তরে অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁকে নজরুল বলেছিলেন,

 ‘বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতের দুহিতা না হলেও পালিতা কন্যা। কাজেই তাতে হিন্দু ভাবধারা এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে ও বাদ দিলে বাংলা ভাষার অর্ধেক ফোর্স নষ্ট হয়ে যাবে। ইংরেজি সাহিত্য হতে গ্রীক পুরাণের ভাব বাদ দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। বাংলা সাহিত্য হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই সাহিত্য। এতে হিন্দুদেবদেবীর নাম দেখলে মুসলমানের রাগ করা যেমন অন্যায় হিন্দুরও তেমনি মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের মধ্যে নিত্য প্রচারিত মুসলমানী শব্দ তাদের লিখিত সাহিত্যে দেখে ভুরু কোঁচকানো অন্যায়। আমি হিন্দু- মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের এই সংস্কারে আঘাত দেবার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেবদেবীর নাম নিই।’


আর নজরুল ইসলাম তাঁর ‘হিন্দু- মুসলমান যুদ্ধ’ প্রবন্ধের শুরুতে লেখেন,

‘একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেনঃ দেখ, যে ল্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ল্যাজকে কাটবে কে?

হিন্দু মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমার বারে বারে গুরুদেবের ঐ কথাটিই মনে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে, এ ল্যাজ গজালো কি করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ঐ সঙ্গে এটাও মনে হয়, ল্যাজ যাদেরই গজায়— তা ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক— তারাই হয়ে ওঠে পশু।’

‘হিন্দু মুসলমান’ প্রবন্ধে নজরুল আরেক জায়গায় লিখেছেন— ‘প্রশ্ন করেছিলাম (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে), এই যে, ভিতরের ল্যাজ এর উদ্ভব কোথায়? আমার মনে হয় টিকিতি ও দাড়িতে। টিকিপুর ও দাড়িস্থানই বুঝি এর আদি জন্মভূমি। পশু সাজবার মানুষের একি ‘আদিম’ দুরন্ত ইচ্ছা।’ ...

এই প্রসঙ্গের সঙ্গে গুরুদেবের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বয়ান থেকে উদ্বৃত্তির প্রয়োজন এড়াতে পারছি না,

‘জনশ্রুতি এই যে, ভৈরব রাগ মহাদেবের বাঙ্গলা গানের জন্যেই প্রবর্তিত, আর শুনলেই বুঝা যায়, মিঞা মল্লার বাদশাহী আসরের ফরমাসেই রূপ নিয়েছে। কিন্তু তবুও ভৈরব বা ভৈরবী হিন্দু নয়, আর মুসলমান নয় মিঞা মল্লার। ওরা সম্প্রদায়ের অতীত। তেমনি হোমারের ইলিয়ড বা মিল্টনের প্যারাডাইস্ লস্ট মুখ্যতঃ পৌত্তলিকও নয়, অপৌত্তলিকও নয়—  ওরা সাহিত্য। ওদের গ্রহণ-বর্জন সম্বন্ধে বিচার করবার সময় একমাত্র রসের দিকে থেকেই বিচার কর্তব্য, ধর্মমতের দিক দিয়ে নয়, লজ্জা হয় এই সাদা কথাটারও ব্যাখ্যা করতে।

আমার “কথা ও কাহিনী” তে “বিচারক” নামক কবিতার একস্থানে আছে, মরাঠি রঘুনাথ রাও মুসলমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রাকালে বলছেন—

“চলেছি করিতে যবন নিপাত

জোগাতে যমের খাদ্য।”

“যবন” শব্দটা কালক্রমে হয়তো শ্রুতিকটু হয়েছে। তাই সাধারণত নিজের জবানীতে মুসলমানদের সম্বন্ধে ঐ শব্দ কখনই ব্যবহার করিনে। কিছুকাল হোলো পাঠ্য নির্বাচন বিভাগের মুসলমান পক্ষ থেকে আদেশ এল ঐ “যবন” শব্দটা তুলে দিতে হবে, বিস্মিত হলেম। দুর্ব্বল পক্ষ আমরা, ভাবলেম এই হতভাগ্য দেশ ছাড়া আর কোথাও এমন উৎপাত সম্ভব হোতে পারত না। মার্চেন্ট অফ ভেনিসে খৃস্টান বারে বারে ইহুদিকে কুকুর বলে গাল দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সমস্ত বই খানাতেই ইহুদির পরে অবজ্ঞা ফুটে উঠেছে, তা না হোলে ওর নাটকীয় বাস্তবতার অপলাপ হোত। তৎসত্ত্বেও লর্ড রেডিং যখন এখানে ভাইসরয় ছিলেন তখন ঐ বইটাকে বিদ্যালয়ের পাঠ্য শ্রেণী থেকে সরাবার জন্যে পরোয়ানা জারি করেন নি। আর ডিজরেলির মতো প্রখর বক্তা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এ সম্বন্ধে নির্বাক ছিলেন। অথচ কাব্যে মরাঠি পাত্রের মুখে উচ্চারিত সামান্য একটা “যবন” শব্দের জন্য বাংলা সাহিত্য যদি লাঞ্ছিত হোতে পারে, তাহ’লে এই মাথাগণতির দিনে কার দরজায় দোহাই পাড়ব। সমস্ত কবিতটিতে রঘুনাথ রাওকে আদর্শ পুরুষ ব’লেও খাড়া করা হয় নি, তার বিপরীত “যবন” শব্দ ব্যবহারের দ্বারা মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি যদি অন্যায় সূচিত হয়ে থাকে সে অন্যায় কবির মধ্যেও নেই, কাব্যের মধ্যেও নেই, বস্তুত সে অন্যায় সাহিত্যকে স্পর্শও করেনি। এই সঙ্গে সঙ্গে রঘুনাথ রাও যমের খাদ্য জোড়াাবার কথা বলেছে, ওটাও তো সাধুলোকের যোগ্য কথা নয়; ঐ পংক্তিটাও বর্তমান অবস্থায় আমার পক্ষে উদ্বেগের কারণ হয়ে রইল।

সাহিত্য বিচার নিয়ে এই রকম অদ্ভুত বুদ্ধিবিকার আমার হিন্দু ভ্রাতাদের মধ্যেও উগ্র হয়ে উঠতে পারে, আমি হতভাগ্য তার প্রমাণ পেয়েছি। “ঘরে বাইরে” নামক একখানা উপন্যাস অশুভলগ্নে লিখে ছিলেম। তার মধ্যে বর্ণিত সন্দীপ নামক এক র্দুবৃত্তের মুখে সীতার প্রতি অসম্মানজনক কিছু আলোচনা ছিল। বলা বাহল্য সন্দীপের চরিত্র চিত্র পরিস্ফুট করা ছাড়া এই আলোচনার মধ্যে অন্য কোনো অসৎ অভিপ্রায় ছিল না। হঠাৎ আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কলরব উঠল সীতাকে স্বয়ং আমিই অপমান করেছি। কবি বাল্মীকি অযোধ্যার প্রজাদের মুখের দুর্বাক্যকে দুর্ম্মুখের মুখ দিয়ে ব্যক্ত করিয়ে নিরপরাধ সীতার নির্বাসন সম্ভব করেছেন। কেউ তা ত্রেতাযুুগের কবির প্রতি দোষারোপ করেন নি। আর কলি যুগের কবির মাথায় হিন্দু- মুসলামান উভয় পক্ষই একই শ্রেণির অপরাধ চাপিয়ে যদি তার অখ্যাতিকে দুর্ভর করে তোলেন, তবে কি এই বাংলাদেশের পঙ্কিল মাটিকেই দায়ী করব? প্রাকৃতিক কারণ ছাড়া কোনো রকম নৈতিক কারণ অনুমান করতে সাহস করিনে।’

ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষ যে এখনও চরম অপমান ও দুঃখ পায় এবং দুঃখ দেয় তার নজির তো এখন আমার মেয়ে এবং আমি। আলোর শাশুড়ি কড়া আদেশ বা দিব্যি দিয়েছে ছেলেকে-তোর বউ মুসলমান না হওয়া পর্যন্ত ওর গর্ভে যেন আমাদের পরিবারের সন্তান জন্ম না নেয়। যদি জন্ম নেয় তোকে ত্যাজ্য পুত্র করবই শুধু নয়, আমার অভিশাপে তোরা শেষ হয়ে যাবি। আমার কষ্ট থেকেই এতসব কথা এল।

যাইহোক, বুদ্ধদেব বসুর কথা এখন বলি, প্রথমত তিনি নজরুলের গান বিষয়ে যে কথাগুলো বলেছেন সেখানে তাঁর সংগীতবোধের অভাব পীড়াদায়ক। বসুবাবু এও মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির কাব্যগুলো সুরে গাওয়ায় চিত্তবিক্ষেপ ঘটতে পারে। সুর বসানো কাব্য-গীতগুলো কাব্য হিসেবে হৃদয়ের অন্তঃস্থলে অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারলেও সংগীত হিসেবে নাকি হৃদয়ের কাছে তার আবেদন ভুলে থাকাই ভাল। তাঁর কাথাটাই পড়ে দেখি। গীতাঞ্জলি প্রসঙ্গে তাঁর মতটি এমন,

‘গীতাঞ্জলি’ — পর্যায়ের রচনাগুলি সত্যিকার কবিতা এবং ছন্দশিল্পেরও উজ্জ্বল উদাহরণ; অর্থাৎ তারা কবিতা হিসেবেই               নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। গীত হবার জন্যে বাংলাদেশে তাদের জনপ্রিয়তা আজ অসামান্য, কিন্তু তাতে তাদের আন্তরিক মূল্য বৃদ্ধি পায়নি। বরং তাদের অন্তঃস্থলে পৌঁছতে হ’লে গান হিসেবে তাদের ভুলে থাকা ভালো; সুর যেমন স্নায়ুতন্ত্রীকে আনন্দ দেয়, তেমনি তা চিত্তবিক্ষেপও ঘটাতে পারে, আর ‘গীতাঞ্জলি’র মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ রচনা পেলে আমরা তাতে আরো কিছু যোগ করতে চাই না, ...।’ মানে সুর বসিয়ে সঙ্গীতাকারে শুনতে চাই না। তাতে বুদ্ধদেব বাবুর চিত্তবিক্ষেপ ঘটতে পারে! আমরা যারা গানের মানুষ, গান যাদের মনে প্রাণে কানে,বলার কথাটি ওই সুরেই বসিয়ে নেই, তাদের কাছে ‘গীতাঞ্জলি’র গভীর অনুভব, ধ্যান, আর বিষাদ সৌন্দর্যের অভিঘাত সুরেই বাক্সময় ও রহস্যময় হয়ে ওঠে। কবি বুদ্ধদেব সংগীত স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের সংগীত বিষয়ে বীজকথাটি বুঝতে পারেননি,

রবীন্দ্রনাথেরই কথা, কবিতা যেখানে শেষ, গানের সেখানে শুরু। কবিতার বাণীকে সুর নানা ভঙ্গিতে ইঙ্গিতে নানাভাবে ভরে তুলতে পারে। সংগীতে সুরের ভাষা বিচিত্র ভাবের ভাষা হয়ে গানকে বা গান-কাব্যকে  বহুমাত্রিক রূপ দিতে পারে। ছন্দগতি এবং তালের বিন্যাসও সুরের ভাবকে নতুন ব্যঞ্জনা দেয়। রবীন্দ্রনাথের মতে-‘সংগীত সুরের রাগরাগিনী নহে, সংগীত ভাবের রাগরাগিনী।’

সাংগীতিক কাঠামো, সুর তাল স্বর রাগ ঠাটের কথা নয়, নজরুলের গানে দৃষ্টান্তহীনভাবে অমার্জিত শব্দ, রুচির দোষ, স্থুল স্পর্শ তিনি পেয়েছেন! নজরুলের গান প্রসঙ্গে তাঁর মতটি এমন,

“সাধারণভাবে বলা যায় যে তাঁর গান তার কবিতার চেয়ে বেশি তৃপ্তিকর— গানের ক্ষুদ্র আকারে তাঁর অতিকথনের দোষ প্রশ্রয় পেতে পারেনি— ‘বুলবুল’ ও ‘চোখের চাতকে’ কিছু কিছু রচনা পাওয়া যাবে,  যাকে অনিন্দ্য বললে অত্যন্ত বেশি বলা হয় না। আরো বেশি গান যে অনিন্দ্য হয়নি, তার কারণ নজরুলের দুরতিক্রম্য রুচির দোষ। কত গান সুন্দর আরম্ভ হয়েছে,সুন্দর চলে এসেছে, কিন্তু শেষ স্তবকে কোনো একটা অমার্জিত শব্দ প্রয়োগে সমস্ত জিনিষটিই গেছে নষ্ট হয়ে। তাঁর প্রেমের গান সরস, কমনীয়, চিত্রবহুল: কিন্তু তার আবেদন আমাদের মনে যখনই ঘন হয়ে আসে তখনই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে, কোনো স্থূল স্পর্শে মোহ ভেঙে যায়। গীতরচয়িতার অন্য সমস্ত গুণ তাঁর ছিলো— শুধু যদি এই দোষ না থাকতো, শুধু যদি তাঁর রুচি হতো পরিশীলিত, তাহলে তাঁর মধ্যে একজন মহৎ গীতকারকে আমরা বরণ করতে পারতাম।”

‘অমার্জিত শব্দ’, ‘স্থূল স্পর্শ’, ‘রুচির দোষ’ কী, কোথায় কীভাবে ঘটল তার কোন নজির দেখাবার দায়িত্ববোধ করলেন না বুদ্ধবাবু, যেমন তিনি মত প্রকাশ করেন শুধু— সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের চেয়ে নজরুল নিচুমানের কবি। যাইহোক, নজরুলের সংগীত ও সৃষ্টি যে পরিস্থিতি ও অবহেলার স্বীকার, সে কথা ঠিক, তাছাড়া স্বঘোষিত উচ্চমনাদের দৈন্যতা এবং সর্বপরি নজরুলের অস্থির চঞ্চল অসংগঠিত ভাবনা ও যাপন সঠিক ধারায় নজরুল সংগীত চর্চা পথের অন্তরায় হয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে সুধীর চক্রবর্তীর মতটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

‘তাঁর গান প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত এলিটিস্টদের ততটা মনোযোগ পায় নি। সংগীতের যাঁরা সারদর্শী— যেমন রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও অমিয়নাথ সান্যাল, তাঁদের লেখনী নজরুলের গান বিষয়ে কিছু উচ্চারণ করে নি। নজরুলের গান ভালো করে যাঁরা শিখেছিলেন এবং শিখিয়েছিলেন তাঁরা একে একে প্রয়াত হয়েছেন। কমল দাশগুপ্ত, সুবল দাশগুপ্ত, চিত্ত রায়, ধীরেন দাস, জগৎ ঘটক, নিতাই ঘটক, আব্বাসউদ্দিন, শচীন দেববর্মন, গিরীন চক্রবর্তী, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আঙুরবালা, ইন্দুবালা সকলেই প্রয়াত। এখনও গাইছেন প্রবীণা ফিরোজা বেগম বা সুপ্রভা সরকার— কিন্তু তারপরে যাঁরা নজরুলের গান রেকর্ড করেছেনে শ্রোতৃসমাজ ও সংগীত গবেষেকেরা তাঁদের সম্পর্কে সংশয়ী। কোনো কোনো গায়ক নানা কাল্পনিক সুরে, আবার কোনো কোনো গায়ক তাঁর নিজের রাগদারী সংগীত পরিবেশনের দক্ষতা নজরুলের গানের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে, দুই বাংলায় এই মুহূর্তে নজরুলের গানের সমাদর ও জনপ্রিয়তা যথেষ্ট কিন্তু তাঁর গান নিয়ে নানারকম সমস্যা, সংকট ও প্রশ্ন উঠেছে যা নিরাকরণ করা কঠিন। প্রশ্নাকারে সমস্যাগুলি হল— সত্যি সত্যি নজরুলের গান সংখ্যায় কত? তার সব কি সংকলিত হয়েছে, না ছড়িয়ে আছে ইতস্তত পত্র-পত্রিকায়? তাঁর নামে প্রচলিত সব গানই কি মৌলিক, না অন্যের লেখা গান তাতে মিশে গেছে? মিশ্রিত গানগুলি চিহ্নিত করার উপায় কী? নজরুলগীতির কোনো নির্ভরযোগ্য স্বরলিপি গ্রন্থ আছে কি? তাঁর গানের যে অজস্র সংখ্যক রেকর্ড এক সময়ে বেরিয়েছিল, সেগুলি কি সংগৃহীত হয়েছে? একই নজরুলগীতি একাধিক শিল্পীর একাধিক সুরে, এমন কি আলাদা তালে রেকর্ড করা হয়েছে এবং হচ্ছে, তার কোন্টি নতুন শিক্ষার্থীর পক্ষে গ্রহণীয়? রবীন্দ্রনাথের যেমন বিশ্বভারতী, নজরুলের গানের জন্য তেমনই কি একটি একাডেমি খোলা যায় না— যার কর্তৃত্ব সবাই মেনে নেবেন? এই সব- কটি প্রশ্নের, বা সংশয়-সংকটের কোনো ইতিবাচক জবাব আমাদের জানা নেই।’

সুধীর বাবুর এই কথাগুলোয় চিহ্নিত মূল সমস্যার সমাধান আমরা এখনও দেখতে পায়নি। যদিও নজরুল ইন্সটিটিউট এমনসব সংকট নিরসনেই কাজ করছে বলে বিশ্বাস করি। ফিরোজা বেগম আর এই পৃথিবীতে নেই। আমাদের আরও একটু ভেবে দেখতে হবে যে, সংগীতের আবেদন বিশেষভাবে আমাদের হৃদয়ে, অনুভবে। কারণ গান- গল্প বা নাটকের মত কাহিনী চরিত্র ও সামাজিকতা দিয়ে তার আবেদন সৃষ্টি করে না। কান তার প্রধান ইন্দ্রীয়। ওই গানের সুর ও বাণীতে যদি চিরকালীনতার আবেদন না থাকে তবে সমকালেই বিনোদিত করে শ্রোতার মন থেকে চলে যেতে পারে। গান যখন পারফরমিং কলারূপে গৃহীত হয়, তখন সমকালের শ্রোতাদ্বারাই তার গ্রহণ বর্জন প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত হয়। ভাবীকালে আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকে না। সমকালের রুচির ওপর নির্ভর করে তার আয়ু, রুচি বদলাবেই, এই বদলে শুধু সেইটুকুই চিরকালের থেকে যায় যেটুকুর আবেদন একান্ত ব্যক্তির মনে চিরন্তন মানবীয় অনুভূতির স্পন্দনে স্পন্দিত হয়।   

বাণী প্রধান গান যদি শ্রোতা মুখাপেক্ষীই হয়ে থাকে তাহলে ভাবীকালের শ্রোতার নতুন রুচির গান তৈরি হবে। নিধুবাবুর টপ্পা, পালাকীর্তন, কবিগান ইত্যাদি এখন শহর গ্রাম কোথাও আগের মত জনসমাদরে গৃহীত হয় না। অন্তত জনপ্রিয় সংগীতের ধারায় এই ঐতিহ্যবাহী গানের ফর্মগুলো আগের মতো আর নেই।

গুরুদেবের এই গদ্যছন্দ কথ্যভঙ্গির বিন্যাস আজকের কবি রজব আলীদের মতো নয়। গুরুদেব আধুনিক নয়! ওরা আধুনিক। এতটাই আধুনিক যে আমার মনের এমন ব্যাকুল বিপন্ন পরাজিত বোধটি প্রকাশের জন্য আধুনিক কবিতার বুকে আশ্রয় পায় নি। আধুনিক কবিতা কি তবে আশ্রয় দেয় না! বরং আশ্রয় কেড়ে নেয়! প্রশান্তি বয়ে আনে না, অশান্তিতে তলিয়ে দেয়! ভরসা নয়, উদ্বিগ্ন করে। জীবনানন্দের পর বিনয়, শক্তি খুব বেশি হলে তিন চারজন কবি আমাদের হৃদয়ের তেমন পংক্তি উচ্চারণ করেছেন। যে কবিতা বা তার অবিনাশী পংক্তি নানা মানবীয় ভাব উদ্বেগ উত্তেজনায় স্বতস্ফূর্তভাবে উচ্চারণ করি। সহস্র আধুনিক কবিদের রচনার আবেদন হয়ত ভবিষ্যত হৃদয়ের জন্য অপেক্ষা করছে! শত বৎসরের পুরনো কবি রবীন্দ্রনাথের পংক্তি তাঁর ভবিষ্যতের পাঠক আমরা যেমন উচ্চারণ করছি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা মানে শুধু সঞ্চয়িতা নয়; গীতবিতানের দুই সহস্রাধিক গানও কাব্যবাচ্য, তাঁর নাটক, গীতি- নৃত্য- কাব্য নাটকও কবিতা। ছিন্নপত্র এমনকি গল্পগুচ্ছও গদ্য কবিতা।

রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কবিদের নিয়ে যিনি বেশি দাদাগিরি করেছেন, দেখিয়ে দিয়েছেন কে আধুনিক, কে নয়, সেই বুদ্ধদেব বসুর কবিতা আজ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে! আজকের আধুনিক কবিও কি তাকে পাঠ করে! সাধারণ পাঠক এমন কি কবি ও লেখকেরা পড়ে তিথিডোর, তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থসমূহ এমন কি তাঁর করা অসাধারণ অনুবাদের বোদলেয়ার, রিলকে, কালীদাস। এই বসু কবি অত্যন্ত জোরালভাবে লিখে জানিয়েছেন, ভাষণে শুনিয়েছেন- কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ‘কাব্য কলার কোন অনন্য আদর্শে আত্মসমর্পণ করেননি— যেমন করেছিলেন বোদলেয়ার ও ভের্লেন, ইয়েটস ও এলিয়েট, পরবর্তীকালে সুধীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ।’ ‘বিচ্ছিন্নভাবে প্রীতিজনক’, ‘একটি মাত্র মনোভঙ্গি যথেষ্ট’; ‘ধ্বনি সংঘাতহীন’, ‘বিসংবেদী সুর নেই’, পংক্তি হাতুড়ীর মতো আঘাত করে না।’ এমন অজস্র মন্তব্যের সঙ্গে কিছু প্রশংসা সূচক মন্তব্য। এর কোন একটি সত্য হলে অন্য মন্তব্যটি অর্থহীন হয়ে পড়ে। রবীন্দ্র বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর বিস্তর আলোচনার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মন্তব্যটি হলো গীতবিতান বিষয়ে। তাঁর মনে হয়েছে সমগ্র রবীন্দ্ররচনাবলীর মধ্যে গীতবিতানই সবচেয়ে রাবীন্দ্রীক। গীতবিতান মানে প্রায় আড়াই হাজার গান- কাব্য, যেখানে অন্তর্ভুক্ত গীতিনাট্য নৃত্যনাট্য কাব্যনাটকের গানগুলোও। তাহলে গীতবিতান রবীন্দ্রনাথের রচনার অনেকটা অংশ নিয়েই।

কবি নজরুল ইসলামকেও তিনি ‘কিশোর কবি’ ‘প্রতিভাবান বালক’ এবং ‘স্বভাবকবি’র তকমা এঁটে দিয়েছেন অসাধারণ একাধিক গদ্যভাষ্যে। খুব আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বুদ্ধবসু কথা বলেন, ওঁর কথার ওপর কথা চলে না। আমাদের কবি রজব আলীর মধ্যেও এমন একটি প্রত্যয় ঘোষিত হতে প্রায় দেখেছি। বুদ্ধদেব নির্ভুলভাবে নজরুল ইসলামকেও ‘স্বভাবকবি’ হিসেবে বিবেচনা করেন। তো স্বভাবকবি বলতে তিনি কি বোঝাতে চান? ‘স্বভাবকবি বলতে শুধু এটুকু বোঝায় না যে ইনি স্বভাবতই কবি— সে কথা না বললেও চলে, বোঝায় সেই কবিকে, যিনি একান্তই হৃদয়নির্ভর, প্রেরণায় বিশ্বাসী, অর্থাৎ যিনি যখন যেমন প্রাণ চায় লিখে যান, কিন্তু কখনোই লেখার বিষয়ে চিন্তা করেন না। যাঁর মনের সংসারে হৃদয়ের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তির সতিন সম্বন্ধ।’ স্বভাবকবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যটি এমন, ‘নজরুল ইসলামকেও ঐতিহাসিক অর্থে স্বভাবকবি বলেছি, সে কথা নির্ভুল। পূর্বোক্ত প্রকরণগত ছেলেমানুষি তাঁর লেখার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। ... নজরুলের কবিতাও অসংযত, অসংবৃত, প্রগলভ; তাতে পরিণতির দিকে প্রবণতা নেই; আগাগোড়াই তিনি প্রতিভাবান বালকের মতো লিখে গেছেন। নিজের মধ্যে বদল ঘটেনি কখনো, তাঁর কুড়ি বছর আর চল্লিশ বছরের লেখায় কোনরকম প্রভেদ বোঝা যায় না।’ বুদ্ধদেব বসু সব সময়ই আমার প্রিয় গদ্য লেখক। তাঁর ভাষা ঋজু এবং একই সঙ্গে সুরময়। পড়তে ভাল লাগে। কিন্তু সাহিত্য আলোচনায় তিনি বিশিষ্ট মন্তব্য করাতে। যথোপযুক্ত নিদর্শন দেখিয়ে মন্তব্যের পক্ষে তাঁর পাঠটিকে যুক্তিযুক্ত করে তুলতে আগ্রহী নন। কোন কবি কোন শিল্পীর কাজই চিরকাল একই শক্তির প্রতাপে উজ্জ্বল অক্ষয় থাকে না। সব শিল্পীর কাজের সমগ্রে অল্প কাজই অমরতা লাভ করে। নজরুলের বয়স কুড়ি থেকে খুব বেশি হলে পয়ত্রিশ পর্যন্ত রচনায় প্রামাণ্য প্রখর দীপ্তির পাশে স্বতন্ত্র উজ্জ্বলতা, নতুনদের এবং সমসাময়িকদেরও চিন্তায় প্রকরণে প্রভাব বিস্তারী। নতুন নতুন শব্দ, ছন্দ, বৈচিত্র্যের মধ্যে তথাকথিত ছেলেমানুষি এবং কথিত স্বভাবকবির বৈশিষ্ট্য বসুবাবুই খুঁজে পেয়েছেন নির্ভুলভাবে। তবে একথা বোকা পাঠকও মেনে নিতে পারে না— চল্লিশ বছরের নজরুল অথবা তাঁর সৃষ্টির শেষ কয়েকটি বছরের রচনার সঙ্গে মধ্য কুড়ির নজরুলের ব্যবধান নেই। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে লিখতে বসে বুদ্ধদেব বসু দুই জাতের কবি আবিস্কার করেন। এক ‘স্বভাববের কবি’ দ্ইু ‘স্বাভাবিক কবি’, তাঁর মতে ‘স্বাভাবিক কবিই উত্তম কবি— আর তাঁরা ছাড়া সকলেই অকবি। তাঁরা লোক মানসে নিতান্তই কবিরূপে প্রতিভাত হয়ে থাকেন। তাদের ক্ষমতার অন্যান্য বিকিরণ শেষ পর্যন্ত সেই একটি অগ্নিতে লীন হয়ে যায়।’ তো তাঁর বিবেচনাায় স্বভাবকবি গং সকলেই অকবি, নজরুলও অকবি, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তও অকবি, বুদ্ধদেব এই ছন্দের যাদুকরকেও বলেছেন স্বভাবকবি। ধন্যবাদ বসুবাবু!

সংগীতে বাণী ও কাল নিরপেক্ষ যে সুর, রাগরাগিণীর বিমূর্ত রূপ তা শুধু সমকালের শ্রোতার মুখাপেক্ষী নয়। তাই সুর এবং রাগরাগিণীর অস্তিত্ব কখনও হারিয়ে যাবে না। বাণীময় গানের সুর গঠনে, অথবা রাগরাগিণী নিজেই নিজের মহিমায় বেঁচে থাকে। তবে, গুরুদেবের গান নির্জন এককের গান। নিজের মনের নানা ভাব ব্যকুলতায় তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে অথবা প্রশান্তি ও স্বস্তির জন্য গানের ওপর ভরসা করেছেন। সেই গানের বাণীতে সুরে মানব মনের সেই চিরকালীন মানবীয় অনুভূতির অনুরণ আছে বলেই তার ক্ষয় নেই। শত বৎসর পরেও রবীন্দ্রনাথের গান আরও বহুজনের অন্তরের কথা হয়ে উঠছে। প্রিয়নাথ সেনকে কবি লিখেছিলেন ... ‘ওগুলি (গানগুলো) আমার একান্তই অন্তরের কথা— অতএব কারও না কারও অন্তরের কোনো প্রয়োজন মিটতে পারে— ... ।’

 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নজরুলের গান

প্রকাশের তারিখ : ২৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image


আখ্যানপ্রবন্ধ

‘কেন কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি’

অরিন্দম খালিদ, সবাই অবশ্য ওই ৩/৪ বছরের ছোট ছেলেটিকে চেনে বুলবুল নামে। কাজী নজরুল ইসলামের খুব আদরের মেজ ছেলে এই বুলবুল। কেন খুব আদরের! গ্রামোফোন কোম্পানির অগ্রেমান্য প্রশিক্ষক ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খাঁ  সাহেব আর নজরুলের খুব ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় যখন নজরুল চুক্তিবদ্ধ হলেন ওই গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে। হুগলি ও কৃষ্ণনগর হয়ে নজরুল তখন বাসা নিয়েছিলেন কলকাতার পান বাগান লেনে। সময়টা ১৯২৮ সাল। ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁ-র কাছে নজরুল রাগ সংগীতে তালিম নিতে শুরু করেছিলেন। খাঁ সাহেব ছিলেন বিখ্যাত গায়ক, সুরকার এবং ঠুংরী অঙ্গে তাঁর পারদর্শিতা ছিল খুব উঁচু মানের। তবে জমিরউদ্দীন খাঁ ছাড়াও নজরুল ওস্তাদ কাদের বখ্স, মঞ্জু সাহেব, মাস্তান গামা প্রমুখ বিশিষ্ট পণ্ডিতের কাছেও রাগ সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন বিচ্ছিন্নভাবে। সহজে এবং দ্রুত আত্মস্থ করে নিতে পারতেন নজরুল। পান বাগান লেনের বাড়িতে নজরুল গান করছেন খাঁ সাহেবের সঙ্গে, পাশে আসন দিয়ে বসে আছে বুলবুল, যা শোনে তাই যেন ক্ষুদে বুলবুল শিখে ফেলে, বা গাইতে পারে সঠিকভাবে। সবাই খুব আশ্চর্য হয় শিশুর এই অসাধারণ ক্ষমতায়। বাবার মতোই সে প্রতিভাবান। নজরুলের অনেক স্বপ্ন এই বুলবুলকে ঘিরে। নিয়তি তখন অলক্ষ্যে হাসে। শিশু বুলবুলের বয়স তখন পুরোপুরি চার বছরও হয়নি। ১৯৩০ সালের ৮ মে বসন্তরোগের আক্রমণে বুলবুল মারা  যায়। জন্মেছিল ৯ অক্টবর ১৯২৬ সালে। ভয়াবহ এই শোক, শোকের আকস্মিকতায় নজরুল কেমন স্তিমীত হয়ে গেলেন। ‘বিদ্রোহী’ নজরুল, অগ্নিগর্ভ কবিতা ও গানের ফূর্তিবাজ মানুষটি, প্রাণোচ্ছ্বাসে সদা চঞ্চল নজরুলের জীবনে শোক গভীর পরিবর্তন এনে দিল। এক প্রকারের আধ্যাত্মিকতায় তিনি নিমজ্জিত হলেন। শুরু করলেন যোগ সাধনা।    

ঠিক এমনি, তুলনীয় ঘটনা রবীন্দ্রনাথের জীবনেও ঘটেছিল! গুরুদেবের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রতিভা ও স্বভাবে বাবার মতো। লোকে রবি ঠাকুরের মতো করে বলত শমী ঠাকুর। আত্মস্থ করার ও মনে রাখার অসাধারণ ক্ষমতাধর শমী ১৯০৭ সালে অনতিক্রান্ত কৈশরে কলেরায় মারা গেলেন। শোকে বিহবল ও স্তিমিত হয়ে পড়েছিলেন গুরুদেবও, কয়েকদিন নিজেকে ঘরে আটকে রেখেছিলেন। কথা বলতেন না। একা একা পায়চারি করতেন ছাদে। সেই সময় কালে গুরুদেবের মনে দুঃখ কষ্ট শোক মৃত্যু জীবন ধর্ম নিয়ে নানা বোধের জন্ম নেয়। চিন্তা, বোধ ও আধ্যাত্মিক ভাবনায় এক নতুন উপলব্ধির উদয় হয়। এই উপলব্ধি নৈবেদ্যর বিশ্বাসের জগত থেকে আলাদা, আরও মহাজাগতিক- গীতাঞ্জলির গান, কবিতার রচনা তখন থেকেই। নজরুলের ‘কেন কাঁদে পরান’ এর বহু আগে শোকগ্রস্ত গুরুদেব গেয়ে উঠেছিলেন মানবিক বেদনার স্পর্শে অতলস্পর্শী উচ্চারণ—

           অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে

           নির্মল করো উজ্জ্বল করো সুন্দর করো হে॥

           জাগ্রত করো উদ্যত করো সুন্দর করো হে।

           মঙ্গল করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে॥

শোক  দুঃখ জর্জর মনকে জয় করতে তাঁর অন্তরতর কাছে আর্ত নিবেদন পেশ করলেন, ব্যক্তিগত দুঃখের ঊর্ধ্বে মনকে নির্মল উজ্জ্বল সুন্দর করার আর্তি ভৈরবী রাগে গাইলেন। এই দুই মনীষীর শোক দুঃখের মতো কঠিন বেদনা আমিও সয়ে বেড়াচ্ছি। আমার আলো নেই, আমার পাশে সে কোথায়? চারদিকে অন্ধকার। গুরুদেবের সুর বাণীতে মনকে শান্ত করার প্রয়াশ চালিয়ে যাই, কিন্তু মনকে তো জাগ্রত উদ্যত সুন্দর করে তুলতে পারছি না। শমী ও বুলবুলের মতো আলোও আমার ছিল। ছিল আমারই মতো। আমার কষ্টের এই নীল শিখা নিভে যাওয়ার নয়,  কারণ আলো তো শমী বুলবুলের মতো অপর লোকের যাত্রী  হয়নি। ওর ইহজীবন ইহলোকেই আছে। শুধু ক্ষুদ্র সংকীর্ণ বুদ্ধির দোষে আলো আমার ঘর ছাড়া। আলো বেঁচে আছে, কিন্তু আমার জীবনের অন্ধকার থেকে অনেক দূরে। সংসারের ভেদবুদ্ধি ধর্মবুদ্ধি আলোকে দূরে সরিয়ে রেখে আমাকে স্তিমিত, মূক ও উদ্যমহীন করে রেখেছে। আমার সময়, একান্ত সময়ে আলোর সঙ্গে কথা হয়, অথবা আমাদের পচিশ বছরের কত কথা— তারই স্মৃতি মন্থন চলে।

নজরুলের গান প্রসঙ্গে কথা বলতে বারবার গুরুদেবের কথা মনে চলে আসে। বিশেষকরে আলো এবং আমিও গুরুদেবের গভীর অনুভূতির পূজাপর্বের গানগুলি বা তাঁর অধ্যাত্মবোধের গানই করি। গুরুদেবের ‘নৈবেদ্য’র পর ধীরে ধীরে গীতাঞ্জলি পর্বে  অধ্যাত্মচেতনার অনেক গভীর, বিমূর্ত, বিষন্ন-সৌন্দর্যের রস সেইসব গানে। স্ত্রী, মেয়ে, পিতা, ছোট ছেলের অল্প সময়ের ব্যবধানে ব্যবধানে এত মৃত্যু গুরুদেবের  মনে জীবন মৃত্যু জগৎ ঈশ্বর সম্পর্কে মহাজাগতিক উপলব্ধি গভীরতর হয়ে ওঠে। প্রিয় ছেলে ৩/৪ বছরের অরিন্দম খালিদ বুলবুল বসন্ত রোগে মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে নজরুলের ভিতরও অধ্যাত্মচেতনার প্রকাশ ঘটতে থাকে। এর পিছনে ছোট একটি স্মৃতি আছে, নজরুলের অবচেতন থেকে সচেতন মনে সজিব হয়ে ওঠে সেই স্মৃতি, ছাত্রজীবনে স্বপ্নে দেখেছিলেন যোগীরাজ বরদাচরণ মজুমদার মহাশয়কে। যোগীরাজের প্রেরণায় নজরুল যোগ সাধনায় আত্মশক্তি জাগিয়ে পরমেশ্বরের অনুভব নিজের মধ্যে সজিব করে তুলতে চান। বুলবুলের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে এই যোগ সাধনায় তিনি আরও নিমগ্ন হন। কিন্তু প্রিয় ছেলে বুলবুলের মৃত্যু বিমর্ষ বিষন্ন করে তুললেও জীবন ও সৃষ্টির জোয়ারে তাকে ব্যস্ত হয়ে থাকতে হয়। সে সময় তিনি গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির প্রধান কম্পোজার হিসেবে নানা স্বাদের বিচিত্র ধরণের সঙ্গীত রচনা করে চলেছেন, তার সঙ্গে কিছু গদ্য, শিউলীমাল গ্রন্থেও কিছু গল্প এমনকি বিশ্বসাহিত্য নিয়ে তাকে প্রবন্ধও লিখতে হয়, বৈচিত্র্যপূর্ণ ওই সৃষ্টির মধ্যে কিছু সাধারণ ইসলামি গান অনুরুদ্ধ হয়ে লিখলেও দেখা যায় সে সময়ে লেখা তার শ্যামা কীর্তনের মধ্যেই মনের ব্যাকুলতা, পরমেশ্বরের জন্য আর্তি শ্যামার জগৎমাতা বা কৃষ্ণের ভজনার মধ্যে নিজের প্রেমিক মনকেই কাব্য ও সঙ্গীতগুণে সমৃদ্ধ সৃষ্টিকে অবিরল প্রকাশ করে গেছেন। শ্যামার মধ্যে জগৎমাতা রূপান্তরিত হয়ে যায় দেশ মাতায়। কৃষ্ণ প্রেমে মানুষের প্রেম বা মঙ্গল কামনা করুণ রসের সুরে জড়িয়ে যায়। একবার নজরুল তাঁর গুরু বরাদাচরণের কাছে জানতে চাইলেন শান্তির মোক্ষ কোন পথে মিলবে। যোগীরাজের কাছ থেকে সেই পথের নির্দেশ এল, ‘শক্ত দৃঢ় পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাও। আত্মশক্তির ওপরে বিশ্বাস রেখে আগুয়ান হও ক্রমে নিত্যানন্দের আলোকস্পর্শে- স্পন্দনে সমাধিলাভ হবে।’ যোগীরাজ বরদাচরণ মজুমদার মহাশয়ের লেখা যোগসাধন পথের নির্দেশিকার মত গ্রন্থ ‘পথ হারার পথ’ বইটির ভূমিকায় নজরুল এই সাধন পথে নিজের মনের একান্ত কথা আবেগভরে লেখেন। সেখানে তাঁর মৃত ছেলেসহ, সাধনার পথ, শান্তির পথ, অধ্যাত্মচেতনার অনেকটাই নিরাভরণ আর্ত্মস্বরে প্রকাশ করেন, বলেন যোগীরাজের দেখা পাওয়া থেকে নির্দেশিত পথ ও সম্পর্কের কথা। নজরুলের অধ্যাত্মবোধ বুঝতে এই ভূমিক নিবন্ধের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য,

‘সহসা একদিন তাঁহাকে দেখিলাম, নিমতিতা গ্রামের বিবাহ সভায়। সকলে বর দেখিতেছে আমার ক্ষুধাতুর আঁখি দেখিতেছে আমার প্রলয় সুন্দর সারথিকে। সেই বিবাহ সভায় আমার বধূরূপিনী আত্মা তাহার চিরজীবনের সাথীকে বরণ করিল .../ তাঁহারই চরণতলে বসিয়া যিনি আমার চিরকালের ধ্যয় তাঁহার জ্যোতিরূপে দেখিলাম। তিনি আমার হাতে দিলেন যে অনির্বাণ দীপশিখ, সেই দীপশিখা হাতে লইয়া আজ বার বৎসর ধরিয়া পথ চলিতেছি— আর আগে চলিতেছেন তিনি পার্থ সারথিরূপে। .../ আমার ব্রহ্মক্ষুধা আজও মিটে নাই। কিন্তু সে ক্ষুধা এই জীবনেই মিটিবে সে বিশ্বাস স্থিত হইতে পারিয়াছি আমি আমার আনন্দ রস ঘন স্বরূপকে দেখিয়াছি।.../ আমি ধন্য হইলাম, বাঁচিয়া গেলাম। আমি অসত্য হইতে সত্যে আসিলাম।’ এই গদ্যেও অনুভবের মধ্যে নজরুলের পরিণত মনের যেমন পরিচয় পাই, তেমনি আশ্চর্যভাবে এই ব্রহ্মক্ষুধা, মৃত্যুর ভিতর অমৃতের খোঁজ, ছোট গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর মহাজাগতিক বোধে আলোড়িত হওয়া সব কেমন গুরুদেবের ভাবনার স্বর অন্যকবির স্বরে উচ্চারিত, ‘... নিত্য ঝড়ে জলে ধুলায় কাদায় মলিন ‘ছোট আমি’ অন্তরের ‘বড় আমির’ সঙ্গে মিলনাভিসার করে চলেছে জনমে জনমে— যুগে যুগে। মিলন সম্পূর্ণ হইলেই অখণ্ড ব্রহ্মের আশ্রয় লাভ করা— তাঁর সান্নিধ্যে চিদানন্দ রসে ডুবে যাওয়া’—

‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

পরাণ সখা বন্ধু হে আমার।

নজরুলের সাধনার ব্রহ্ম, পরমেশ্বর গুরুদেবের থেকে কখনও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে যখন তিনি পরাধীন মানুষের ওপর শক্তিমানের নিগ্রহ দেখে গেয়ে ওঠেন,

মেলি শতদিক শত লেলিহান রসনা

জাগো বহ্নিশিখা স্বাহা দিনাবসনা

এসো ক্ষুধা হয়ে নিরস্ত্র রিক্ত ঘরে

লোটো লক্ষ¥ীর ভাণ্ডার হা হা স্বরে’ অথবা


শান্তি কোথায়, শান্তি কোথায় কেউ জানি না

মাগো তোর ঐ দনুজ দলন সংহারিণী মূর্তি বিনা।জগন্মাতা, দেশমাতা ও বিশ্বজননী— গর্ভধারিণী একাকার হয়ে যায় তাঁর শ্যামা বন্দনায়। দীর্ঘদিন অনশনে মৃতপ্রায় নজরুলের সামনে এসে দাঁড়ালেন নজরুলের অনশনে সহযাত্রী— ১৩ দিন ধরে অনশনে থাকা বিরজাসুন্দরী দেবী মাতৃ মমতা ভালোবাসার আবেগ নিয়ে। নজরুল মমতাময়ীর মন নিংড়ানো অনুরোধ রক্ষা করে তাঁর হাতে লেবুর শরবত খেয়ে অনশন ভাঙলেন চল্লিশ দিন পর। তারপর নজরুল লিখলেন

সেই অপরূপ মায়ের বন্দনা— বিরজাসুন্দরী মিলিয়ে গেলেন মা ভবানীর রূপে—

‘মাগো আমরা বেঁচে আছি তোরই প্রসাদ পেয়ে

দুঃখে শোকে বিপদ বাড়ে

বাঁচাস মা তুই বক্ষে ধরে

দয়াময়ী নাই কেহ মা

ভবানী তোর চেয়ে।’

বরদাচরণের সাধনাপথের সাধক নজরুল পরে লিখলেন কত সব শ্যামা, কীর্তন, ইসলামি ভাবধারার গান—

‘শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে

জপি আমি শ্যামার নাম

মা হলেন মোর মন্ত্রগুরু

ঠাকুর হলেন রাধাশ্যাম।’

অথবা ‘মা হবি না মেয়ে হবি উমা বলে

তুই আমারে কোল দিবি না আমিই নেব কোলে।’

অথবা ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন

রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব, যার হাতে মরণ বাঁচন

ধর্মীয় গোঁড়ামির অনেক উর্ধ্বে, সকীর্ণসীমা বা ভেদবুদ্ধির উর্ধ্বে সাধক নজরুল, সমন্বেয়ের নজরুল, গুরুদেবের ভাষায় সংস্কৃতির সমন্বয়ের সাধক নজরুল ভারত-সংস্কৃতির পূর্ণ উপলব্ধির শক্তিতে শ্যামা, কীর্তনের পাশে, ইসলামি গান, গল্প লিখেছেন। অল্প বয়সে যেমন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লিখবার সময়ে লেখেন শাতিল আরব, মোহরমের কবিতা। শ্যামা লিখবার পর, বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সময় তিনি আব্বাসউদ্দীন প্রমুখের কণ্ঠে তুলে দেন ‘ইসলামি গান’— ‘নামাজী তোর নামাজ হল রে ভুল’ ‘বাহিরে কোথায় খুঁজিস খোদারে’, ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলরে দুনিয়ায়, খোদার প্রেমের শরাব পেয়ে’ ইত্যাদি।

আলোর গানের শিক্ষক যেমন শুদ্ধভাবে গানটি গাইতে শিখিয়েছেন, তেমনি পড়িয়েছেন সংগীত বিষয়ে নানা বই। রাগরাগিণী, তান, তাল, স্বর, স্বরের নানা স্বরান্তর সংগীতের এই বিষয়গুলো বোঝাতে সব সময় নজরুলের গানকেই দৃষ্টান্ত হিসেবে বেছে নিতেন। নজরুল সংগীত ও খুব ভাল শিখেছিল। একবার আমার একটা আব্দার শুনে আলোর গুরু বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের গানের শুধু কাঠামোটি নয়, সুর তাল নয়, এর সঙ্গে গানের গভীর ভাবটিও ফুটিয়ে তুলতে হবে। মানে বাণীর মাহাত্মটুকু ভালভাবে আত্মস্থ করা প্রয়োজন। অল্প বয়সের অভিজ্ঞতাহীন জীবনে তেমন উপলব্ধির জগতটা তৈরি হয় না। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের সংগীত ও ভাব প্রকাশের উপযোগী বিশেষ গায়কীরও প্রয়োজন। আলো নিশ্চয়ই একদিন রবীন্দ্রসংগীত করবে। আগে সংগীতের ভিত্তি-জ্ঞানটুকু সরগর হয়ে উঠুক। তা ঠিক। মাস্টার মশায় তার মতো ঠিকই বলেছেন, কিন্তু আলো আমার মেয়ে, ওর বোধ উপলব্ধির ক্ষমতা অন্যদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আমার তো গান সেভাবে হলো না। কিন্তু নিজের জন্য, পরিবারে জন্যও আমি গাই। সব সময় গাই। আলোকে ধরে ধরে অনেক গুরুদেবের গান শিখিয়ে দিয়েছিলাম। সেই শিক্ষার জোরে ওকে রবীন্দ্রসংগীতেরই একজন হয়ে উঠতে হল। মাস্টার মশায়দের শিক্ষায় সংগীতের ভিত্তি-জ্ঞানটুকু খুব কাজ করেছে। সেই শিক্ষায় নির্ভর করে গানকে উপলব্ধির স্তর থেকে গাইতে হবে কেমনে সেই শিক্ষাটা আমার। নজরুলের গান আমিও অনেক করেছি। শুরুতে মার্গ সংগীতের তালিম নিতে হয়েছিল। তখন আধুনিক গানে রাগ রাগিণীর ব্যবহার প্রয়োগে নজরুলের অতুলনীয় গানগুলি আমি গেয়েছি, শিখেছি। তবে আলোর মতো লম্বা সময় ধরে নয়। আমার ক্ষেত্রে একটা কারণ হয়তো এমন যে, আমার পড়ার অভ্যাস। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বিশেষ করে তাঁর কবিতা কাব্য নাটক গীতিনাট্য এবং গান বিয়য়ে গুরুদেবের কথা লেখা আমাকে নেশায় পেয়ে বসেছিল। ফলে সহজেই গুরুদেবের গানের মানবিক বেদনার অনুদ্বেল শব্দ ব্যবহার, মানসিক নির্ভরতা, উপলব্ধির মায়াময় জগত আমাকে চুম্বুকের মতো টানত, আজও ওই একই নির্ভর আমার।   

নজরুল আমার কাছে এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর প্রতিভার সেরা সৃষ্টি সম্পদই সংগীত। কত বিচিত্র বিষয়ে কত সহজেই বহুবর্ণ রাগরাগিণীর প্রয়োগে গান লিখেছেন, সুর করেছেন এবং গেয়েছেনও। বৈচিত্র্য ও বিপুলতা নজরুল সংগীতের একটি দিক। গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে ১৯২৮ সালে যুক্ত হওয়ার পর থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত বিপুল ও বিচিত্রগানের সৃষ্টি জোয়ার ছিল বিস্ময়কর। গ্রামোফোন কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার ঘটনাও সহজভাবে ঘটেনি। রেকর্ড কোম্পানিগুলো নজরুলের গান রেকর্ড করার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখিয়ে আসছিল নজরুলের বৃটিশবিরোধী মনোভাবের জন্য। সেই সময় তখনকার বিখ্যাত গায়ক হরেন্দ্রনাথ দত্ত  নজরুলের ২টি গানে সুর দিয়ে রেকর্ডে গেয়েছেন (১৯২৬)। রেকর্ডখানি খুব বিক্রীও হয়। গ্রামোফোন কোম্পনি সে কথা জানতে পেরে খুশি হয়েই নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাঁকে ওই দুটি গানের যোগ্য রয়েলটি পাঠিয়ে দেয় এবং সেই সঙ্গে নজরুলকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে যুক্ত হয়ে গান রচনার জন্য আমন্ত্রণ করে। সেই থেকে কবি নজরুল ওদের হয়ে গুরুগম্ভীর ধ্রুপদ, আধুনিক গান থেকে চপল ও হাল্কাহাসির গান, বিদেশী গানের অনুকরণে বিদেশী সুর বসিয়ে রচনা করেছেন অনেক গান এবং শুরু থেকেই তাঁর গানে কাব্যে ভাষার চাতুর্যময় ব্যবহার যার কোন তুলনা নেই বাংলা সাহিত্যে। সহজ সৃষ্টিশীলতায় তিনি আরবী ফার্সি শব্দ বাংলা গানে ও কবিতায় এমনভাবে মিশিয়ে দিলেন যা ছিল শুধু অভিনব নয়, শিল্প নৈপুণ্যে উজ্জ্বল।

গ্রামোফোন কোম্পানি ছাড়াও নাটকে ও চলচ্চিত্রে তাঁর ব্যস্ততা বাড়ল ওই সংগীত সৃষ্টি ও পরিচালনায়। সিরাজদ্দৌলা, মহুয়া, সাবিত্রী, কারাগার, রক্তকমল, শ্যামলীর স্বপ্ন, জাহাঙ্গীর, ব্লাক আউট ইত্যাদি নাটকের জন্য গান রচনার পাশাপাশি পাতালপুরী, গোরা, ধ্রুব চলচ্চিত্রে সংগীত রচনা ও পরিচালনা করেন। গান রচনা করেন নন্দিনী, চট্টগ্রাম অস্ত্রগার লুণ্ঠন, শ্রী শ্রী তারকেশ্বর, দিকশূল, সাপুড়ে, চৌরঙ্গী, বিদ্যাপতি ছবির জন্য। ধ্রুব- সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেন। আবার বিদ্যাপতি, সাপুড়ে ছবির কাহিনীও তাঁর লেখা। গ্রামোফোন কোম্পানির পর বিখ্যাত সংগীতশাস্ত্রী সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগযোগের সূত্রে যুক্ত হলেন কলকাতা বেতারে। সময়টা ১৯৩৮ সালের প্রথম ভাগ, কলকাতা বেতারে নজরুল তিনটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। তাছাড়া বেতারের জন্য গান রচনা তো ছিলই। অনুষ্ঠান তিনটি হলো— হারামণি, নবরাগ মালিকা এবং গীতি বিচিত্রা। হারামণি অনুষ্ঠানে নজরুল অপ্রচলিত এবং লুপ্তপ্রায় রাগে গান রচনা করে প্রচার করতেন। অনুষ্ঠানটি হত মাসে একবার। হারামণি’র শুরুর দিকে সুরেশ চক্রবর্তী রাগ সম্পর্কে বলতেন আর নজরুল ওই রাগে রচিত গানটি নিজেই গাইতেন। অনুষ্ঠানটি শুনেছি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। নতুন নতুন রাগ রচনা করে তাতে রচিত গান প্রচার করতেন নবরাগ মালিকা অনুষ্ঠানে। গীতি বিচিত্রা অনুষ্ঠানটি ছিল আলেখ্যমূলক। নজরুলের রচিত আলেখ্যের মধ্যে কাফেলা, কাবেরী তীরে, ছন্দসী প্রধান। এই গীতি বিচিত্রানুষ্ঠানে একটি বিষয় বা আলেখ্য ঠিক করে তার ওপর ছয়টি করে গান পরিবেশন করা হত। যাইহোক, কত ধরণের কাজ নজরুল ওই অল্প সময়ের মধ্যে করেছেন! উদ্যম, পরিশ্রম এবং প্রতিভার শক্তিতে বাংলা আধুনিক গানকে একদিকে জনপ্রিয় অন্যদিকে শুদ্ধ সংগীত সংস্কৃতির প্রবাহ সৃষ্টি করেছিলেন। আধুনিক গান রচনায় নজরুল কেন আগ্রহী হয়েছিলেন। তার কারণ হিসেবে নজরুল বলেছিলেন, আলোই বলেছিল নজরুলের এই কথাটি, মনে আছে এখনও!  

‘আধুনিক (মডার্ন) গানের সুরের মধ্যে আমি যে অভাবটি সবচেয়ে বেশী অনুভব করি তা হচ্ছে ‘সিমিট্রি’ (সামঞ্জস্য) বা ‘ইউনিফরমিটি’-র (সমতা) অভাব। কোন রাগ বা রাগিণীর সঙ্গে অন্য রাগ বা রাগিণীর মিশ্রণ ঘটাতে হলে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শাস্ত্রে যে সূক্ষ্ম জ্ঞান বা রসবোধের প্রয়োজন তার অভাব আজকালকার অধিকাংশ সুরের মধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে....।’

রবীন্দ্র মহাবলয়ের ভিতর নজরুল কত স্পষ্ট স্বতন্ত্র হয়ে উঠলেন সংগীতে এবং কবিতায়। অন্যদিকে নজরুল কিন্তু পছন্দ করতেন গুরুদেবের গান, গাইতেন, প্রচুর তাঁর মুখস্ত ছিল। নিজের গানের বাইরে একান্ত নিরালায় তিনি গুরুদেবের গানই গাইতেন। কখনো কখনো আলোর সঙ্গে আমার মৃদু তর্ক হত। আলো নজরুলের গানের বৈচিত্র্য সুর ঋজুতার কথা বলে বিদ্রোহী কবির মহিমাকে তুলে ধরত। সেসব আলো ঠিকই বলত, কিন্তু আমার বলার কথাটি অন্য, আলো হয়তো পরে বুঝতে পেরেছে। না হলে গুরুদেবের গানে ও এমন আত্মহারা হলো কী করে!

আলোর প্রথম এ্যালবাম আমাকে উৎসর্গ করলেও কবিগুরুর চরণে প্রথম অর্ঘ্যটি কিন্তু তাঁর গানেই নিবেদন করে নেয় অন্তরের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দিয়ে । উৎসর্গে আলো লিখেছে, শিল্পী লীলাময়ী, আমার গুরু। এরপর আরও অনেক গানের এ্যলবাম প্রকাশ হলেও আলোর ২য় এ্যালবামটি ছিল নজরুলের গান নিয়ে। গানগুলোর বিশিষ্টতা হলো সবগুলো গানই বিদেশী সুর অবলম্বন করে সৃষ্টি গান, অনেকে আমরা জানিও না এই জনপ্রিয় গানগুলো বিদেশি সুরে দেশি কথায় স্বরে তালে একেবারে বাংলা গানের ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। আলোর এ্যালবামের কয়েকটি গান এমন,

ইজিপ্সিয়ান ডান্সের সুরে—

মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে নেচে যায়

আরবি সুরে—

রুমঝুম ঝুমঝুম খেজুর পাতার নূপুর পায়ে

কিউবান ডান্সের সুরে— দূর দ্বীপবাসিনী, চিনি তোমারে চিনি

ইউরোপিয় অর্কেষ্টার সুরে— খেলিছে জলদেবী, সুনীল সাগর জলে

এবং পারস্য গজলের বিষানুষঙ্গে রচিত অনুবাদকৃত গজল—

করুণ রবীন্দ্রনাথের গানের কেন অরুণ আাঁখি, দাও গো সাকী দাও শরাব, ইত্যাদি।  

আর একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ্যের অনিবার্যতা এড়াতে পারছি না, তা হল- গজল রীতির গান, বাংলায় গজল রীতির গান প্রচলন করে নজরুল জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। করাচির ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে নজরুলের সঙ্গে ছিলেন একজন পাঞ্জাবী মৌলবি। তখনকার হাবিলদার নজরুল ইসলাম মৌলবি সাহেবের কাছে ফার্সিটা ভালো করে শেখেন। পরবর্তীকালে তাঁর প্রিয় কবি হাফিজ এবং অন্য ফার্সি  কবিদের মূল লেখা পাঠ ও ফার্সি ভাষার অনুকরণে গজল রচনায় সফল হয়েছিলেন। ওই রেজিমেন্টের হাবিলদার নিত্যানন্দ দে ভাল অর্গান বাজাতে পারতেন। তাঁর কাছে নজরুল শিখলেন অর্গান বাজাতে। সৈনিক গোপী ভাল ক্ল্যারিওনেট বাজাতেন, নজরুল শিখলেন ক্ল্যারিওনেট। বাল্যকালে মক্তবের শিক্ষা, দুটি স্কুলে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা, আসানসোলের চা রুটি দোকানের কর্মচারী এবং করাচীর রেজিমেন্টের সৈনিক জীবন থেকে ফিরে সংগীত ও সাহিত্যের আকাশে রবীন্দ্রবলয়ের উজ্জ্বল আলোর পাশে ভিন্ন, নতুন এক স্বতন্ত্র নক্ষত্রের আবির্ভাবই ১৯ বছরের নজরুল,কবি কাজী নজরুল ইসলাম। জীবন, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পারিবারিক পরিচয় ধর্ম নানা বিশিষ্টতায় নজরুল তৈরি হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে গুরুদেব কেন অন্য কেউ তুলনীয় নন। মাত্র ২২টি বছর ছিল তাঁর সৃষ্টির জীবন।

গুরুদেবের থেকে সংখ্যায় নজরুলের গান অনেক বেশি। সাধারণভাবে লোকে বলে সাড়ে তিন হাজারের বেশি গান তিনি লিখেছিলেন। নজরুল নাকি নিজেই মুজাফ্ফর আহমেদকে বলেছিলেন তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ৩১৬৩টি গানের সমগ্র। নজরুল সংগীত সমগ্রের সম্পাদকের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে কবির আরও অনেক গান উদ্ধার হবে। নজরুলের সৃষ্টি ২২ বছরের বেশি নয়। ঠিক ঠাক দিন তারিখ গ্রন্থ বিষয় ধরে খোঁজ নিতে গেলে দেখা যাবে ১৯৩৪ সালের পর তাঁর আর কোন গীতিকাব্য প্রকাশ হয়নি। প্রকাশ হয়েছে ১৯৪২ সালে যখন তিনি নির্বাক অসুস্থ। অসুস্থতা ওই ৩০ দশকের শেষদিক থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। নজরুলের শেষদিকের কবিতায় আছে পুনরাবৃত্তি। সচেতন উজ্জ্বল নজরুলের তুলনায় ধর্মভাবাপন্ন রচনায় বিশেষ মনোযোগ,  এবং শিল্পমানে নজরুলের মর্যাদা ঠিকভাবে রক্ষিত হয়নি সেইসব রচনায়।  

অল্প সময়ের মধ্যে নজরুল অনেক লিখেছেন সত্য, কিন্তু সেই সব আধুনিক বাংলা গানে শেষ পর্যন্ত নজরুলের দর্শন প্রত্যয় বা একজন শিল্পী মনের গভীর তলদেশের মনভূমি কোথাও মেলে! নাটক সিনেমা গ্রামোফোন কোম্পানির হয়ে গান লিখেছেন যেমন তেমন ব্যক্তিগত অনুরোধেও লিখেছেন। শিল্পীদের অনুরোধেও গান লিখে দিয়েছেন। তাঁর গানের সুর করেছেন অনেকে। এক কমল দাশ গুপ্ত নিজেই করেছেন প্রায় চারশ। নজরুলের গানে অন্যরা তাদের মতো সুর বসিয়ে রেকর্ড করেছেন। মঞ্চে সিনেমায় গেয়েছেন। সব সময় গীতিকার নজরুলের স্বীকৃতিও মেলেনি। এমনকি নজরুলের নিজের সুর করা গানে কী সেই সুর সঠিকভাবে মেনে চলা হয়! সেখানেও ছড়িয়েছে বিভ্রান্তি। নজরুল যখন লিখছেন গাইছেন সুর করছেন তখন থেকেই এলোমেলো অবস্থা। তাঁর সুর বাণী সঠিক রক্ষা করা হচ্ছে কিনা এমন কোন তদারকী বা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান কোন কালেই ছিল না। বাংলাদেশের নজরুল ইনস্টিটিউট এই পথে কাজ করার চেষ্টা করছে— মূল সুর, স্বরলিপি, কথা সংগ্রহ করছে। কিন্তু অনুমোদন বা রেকর্ড বন্ধ করার ক্ষমতা তাদের নেই। অন্য কথায় বাণী ও সুরের কপি রাইট সংরক্ষিত নয়, বা খবরদারির আইনি অধিকার নজরুল ইন্সটিটিউটের নেই। নজরুলের গানের নির্ভরযোগ্য স্বরলিপির অভাব- এক্ষেত্রে তাঁর গান ইচ্ছা স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পিছনে আর একটি কারণ। এইসব দিক ছাড়াও, অথবা আমার কাছে এই নেইগুলোর গুরুত্ব তত নয়।

যতটা একজন ব্যক্তির নানা মানবিক মুহূর্তে, দুঃখ আনন্দ গভীর অনুভূতি আলোড়িত সময়ে যে গান সুর মনে প্রশান্তি স্বস্তি এনে দিতে পারে, যে গানের সুর বাণী মনের ভিতর গেয়ে ওঠে, অর্থাৎ নির্জন এককের গান, নজরুলের গানের তেমন বিশিষ্টতা প্রায় নেই। গুরুদেবের গানে মনের আধারটুকু আছে, যে প্রশান্তির আশ্রয় আছে তার অভাব নজরুলের ক্ষেত্রে রয়েছে। একথা বলতে চাই না যে তাঁর গানে কাব্যে প্রজ্ঞা ও মননের অভাব আছে। অনেকে যদিও বলে, ‘ইতিহাস চেতনা ও আধুনিক জীবন বীক্ষণের তেমন গূঢ়চিহ্ন নজরুলের গানে নেই। গানের সুর, গায়ন ভঙ্গি হাল্কা ও চটুল। আর্টের বিচারে তা সবার কাছে সমানভাবে ছাড়পত্র পায় না।’ আমার নিজের কাছে এমন মন্তব্য বলব, ব্যক্তিগত মত, অবশ্যই আপেক্ষিক এবং সবচেয়ে বড় কথা ইতিহাস চেতনা বা আধুনিকতার গূঢ় চিহ্ন জাতীয় পর্যবেক্ষণ সংগীত বা সুরের ক্ষেত্রে কী প্রয়োজন? আমি শুধু বলতে চাই ব্যক্তির মনে তার আবেদনটুকু কত! ওইসব মাপকাঠিতে সংগীতের রস বিচার করতে গেলে রবীন্দ্রনাথের গানও কাঠগড়ায় উঠতে বাধ্য। তবে আজও আমরা গুরুদেবের গানে, কাব্যে ভাবনায় নিত্যনব উন্মোচন, ভাবের নানা তরঙ্গে নতুন নতুন উদঘাটন, বহুতর অর্থের ব্যঞ্জনা আবিষ্কার করে চলেছি।

বাংলা আধুনিক গানের রূপ কেমন হয় সুকুমার রায় সে সম্পর্কে যা লিখেছেন নজরুলের গান তার ব্যতিক্রম নয়—

‘যে গান কথা রচনায় জীবনকে প্রত্যক্ষ করতে সাহায্য করে এবং বাস্তবতা যার বিষয়বস্তুতে স্পষ্ট এবং যে রীতিতে সুর প্রয়োগের কায়দা প্রতি অংশেই বিশিষ্ট ভাব প্রকাশ করে এবং যে গানে বিচিত্রধর্মী সুর কলি প্রযুক্ত হতে পারে, যে গানের সুর রচনায় মূলগত উদ্দেশ্য থাকে ভাব প্রতীকের গ্রন্থন এবং বিচিত্র ও বিভিন্নধর্মী স্বরসঙ্গতি সৃষ্টিতে শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য সাধন, সবশেষে যে ধরনের যন্ত্র সংগীতের সহযোগিতা তাৎপর্যমূলক তাকেই আধুনিক গান বলে বর্ণনা করা যেতে পারে।’    

নজরুলের লেখা গান তাঁরই রচিত সুরে, কখনও তাঁর পরিচালনায় সুর-শিল্পীরা সর্বত্র গাইছেন। সঙ্গীতে তিনি তখন প্রতিষ্ঠিত বলা যায়। বিশেষ করে বাংলা গানের নতুন রূপ আনলেন বাংলা গজল গানে। কিন্তু গ্রামোফোন কোম্পানি বা অন্য কোন রেকডিং কোম্পানি তাঁর গান রেকর্ডে বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছেনা। সে তার বৃটিশবিরোধী ইমেজের জন্য হোক অথবা ধর্ম পরিচয়ের জন্য হোক। রেকর্ডি কোম্পানিগুলো যেহেতু ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠান তাই শেষ পর্যন্ত তাঁর দিকে মনোযোগী হতে বাধ্য হলো সঙ্গীতে নজরুলের জনপ্রিয়তার জন্য। তাছাড়া তখনকার বিখ্যাত গায়ক হরেন্দ্রনাথ দত্ত নজরুলের একটি গান এবং রজনীকান্ত সেনের একটি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে রেকর্ড করিয়েছিলেন এবং রেকর্ডটি বিক্রিও ভালো হয়।  প্রসঙ্গত কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের নজরুল স্মৃতি গ্রন্থেও কিছু তথ্য এইক্ষেত্রে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছিল। মুজাফ্ফর সাহেব যেমন বলেছিলেন নজরুলের লেখা দুটি গান হরেন্দ্রনাথ ‘ঘোষ’ নজরুলের নাম গোপন করে রেকর্ড করেছিলেন ১৯২৬ সালে। রেকর্ড বাংলা গান নিয়ে গবেষণায় খ্যাতি অর্জন করেছেন কল্যাণবন্ধু ভট্টা”ার্য। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, রেকর্ড হয়েছিল ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বও মাসে। হরেন্দ্রনাথ ঘোষ নয় দত্ত দুটি গান রেকর্ড করলেও তাঁর একটি ছিল নজরুলের। গান নয়, তাঁর কবিতা ‘জােিতর নামে বজ্জাতি’ কবিতায় হরেন্দ্রনাথ ও নিজেই সুর দিয়ে গেয়েছিলেন। অন্য গানটি ছিল কান্ত কবির ‘মায়ের ঘরের শুধু ভাত ...’। আর একটি মজার কথা কল্যাণবন্ধ জানিয়েছেন, গ্রামোফেন কোম্পানি কাজী নজরুলের ইসলামের নাম ঠিকই জানত। এইচ, এম, ভি’র গানের রেকর্ডেও তালিকায় পষ্কিার লিখা ছিল, শ্রীযুক্ত হরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় এবারেও দু’খানি গান রেকর্ডে দিয়েছেন। প্রথম গানখানিতে দেশের জিনিসের ব্যবহার করিতে উপদেশ দেওয়া হইয়াছে। দ্বিতীয়খানি ছুঁতমার্গ পরিহার সম্বন্ধে সুপ্রসিদ্ধ কবি কাজী নজরুল ইসলাম দ্বারা রচিত। সুতরাং রচনার সৌন্দর্যে ও মনোহারিত্বে অতিশয় প্রশংসনীয়।’ মুজাফ্ফর সাহেবের ওই রকম তথ্য পরবর্তীকালের অনেক লেখক পুনরাবৃত্তি করে ভুলের প্রজন্ম সৃষ্টি করে চলেছে। বিশেষকরে খুব সমাদৃত গ্রন্থ নজরুল পরিক্রমার লেখক আব্দুল আজীজ আল্ আমান এবং করুণাময় গোস্বামীর নিজ নিজ গবেষণায় মুজাফ্ফর আহমেদ সাহেবের ব্যবহৃত তথ্য অন্য লেখক পাঠক পুনারাবৃত্তি করে চলেছেন। নজরুলের বিয়ে, সাহিত্যকৃতি ইত্যাদি প্রসঙ্গেও মুজাফ্ফর আহমেদের তথ্য প্রকৃত তথ্য বা ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যাইহোক প্রসঙ্গটি ভিন্ন।

আমার বুদ্ধিমান মেয়ে আলো সঙ্গীতের রসটুকুতেই আনন্দ খুঁজে নিতে পারে। তথ্য তার জন্য জরুরি নয়। দুঃখজনক হলো শুদ্ধ, রসগুণপূর্ণ উঁচুমানের সঙ্গীত হওয়া সত্ত্বেও নজরুলের গান সমকালে বা আজও যোগ্য সমান মর্যাদা অনেক মহাজন সুর রসিকদের কাছ থেকে পায়নি, পাচ্ছেনা। আজও পশ্চিমবঙ্গে, আকাশবাণী কেন্দ্রগুলোতে নজরুল সঙ্গীত নজরুলগীতি হয়েই থাকল। সহস্রাধীক গানের গীত, সুর, রাগ-রাগিনী তালের স্রষ্টা শুধু গীতিকারই থেকে গেলেন। শুরুতে আধুনিক গানের বিভাগে নজরুলের গান পরিবেশন হত, উপস্থাপকের ঘোষণায় জানা যেত আধুনিক গানটির গীতিকার কাজী নজরুল ইসলাম। আর মুখে মুখে ছিল কাজীদার গান। কাজীদার গান ‘নজরুলগীতি’র ক্যাটাগরিতে নজরুলের নিজের লেখা নিজের সুরে বাঁধা, নিজের প্রশিক্ষণে বড় বড় গানের শিল্পীরা জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। নজরুলের গান তখন জনপ্রিয়তার নিরিখে রবীন্দ্রনাথের গান থেকেও জনসমাদৃত হয়ে উঠেছিল। অথচ তাঁর সৃষ্টি সমস্ সঙ্গীত নজরুল সঙ্গীত হিসেবে তো নয়ই, নজরুলগীতির ক্যাটগরিতে প্রচার করার জন্যই আবেদন নিবেদন করতে হচ্ছিল। মহাজ্ঞাতি সদনে ১৯৬০ সালে নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যে কমিটি তৈরি হয়েছিল তার সদস্য ছিলেন মুজাফ্ফর আহমেদ, বিচারপতি শঙ্করপ্রসাদ মিত্র, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, ডঃ শ্রীকুমার বন্দোপাধ্যায়, মৈত্রেয়ী দেবী, অমিয় কুমার বসু প্রমুখ, কমিটির সাধারণ সম্পাদক কল্পতরু সেনগুপ্ত। এই কমিটির সদস্যরা দিল্লীতে আবেদন করেছিলেন নজরুলের গানকে আলাদা ক্যাটাগরির মর্যাদা দিতে। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওহরলাল নেহেরু, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্র ডাঃ কেশকার। এরপর ১৯৬৩ সাল থেকে নজরুলের গানকে নজরুলগীতি বলা শুরু হলো।

গজল গানের মতো নজরুল বাংলা গানে আরও একটি ধারা সঙ্গীতের ধারা সৃষ্টি করেছিলেন প্রথম, সেটি হলো ইসলামি গান! সাধারণভাবে একথা সবার কাছে সত্য মনে নাও হতে পারে, কিন্তু ব্যাকরণসঙ্গত এবং সঙ্গীত ধর্মে এই কথা মেনে নিতে হবে শুদ্ধ ইসলামি সঙ্গীত নজরুল ইসলামের হাতেই তৈরি, তিনিই এই ধারার পথিকৃত। নজরুলপূর্ব বাংলা গানের স্বাশত ধারায় অনেক লোককবির বাঁধা গানে নানা রূপ ইসলামি অনুষঙ্গ বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, গানের শ্রেণিতে তা ‘ইসলামি’ অভিধায় চিহ্নিত না হয়ে বাউল, মুর্শিদী, ফকিরী, মারফতি এমন সাধারণ অভিধায় পরিচিত। এই সব গানের লোক কবি গিতীকারদের গানের বাণীর ভর কেন্দ্রে শুধু ধর্ম ইসলাম নয়, মানবধর্মের তথা সর্বজনীন বাণীর সবল প্রতীকী আবরণে লম্বা লয়ে গাওয়া। তাঁর সুর কাঠামো, স্বরলিপি বা সঙ্গীত ধর্মের শুদ্ধতা নির্মাণকে বাজায় রাখার দায় নেই। সাধারণভাবে তাকে ‘গান’ বলা হলেও গানের সবটুকু নিয়ে সৃষ্ট সঙ্গীত নয়, অন্তত আমার তাই মনের হয়, এক্ষেত্রে নজরুরেল ইসলামি গান ইসলাম ধর্মেরই গান হওয়ার পর তার অন্য অন্য স্তর বিভার আলোচনা হতে পারে, তাই নজরুলের এই ঘরনার গান অনেক সময়ই একরৈখিক, নির্দিষ্ট; তাঁর সৃষ্টি বাংলা ঠুমরি, গজল, কীর্তন, শ্যামা বা প্রেমের গানের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ বহুস্তরীয় না হলেও সঙ্গীত ধর্মে তা সঙ্গীতই। ধ্বনি, ছন্দ, সুর, বাণী, তাল লয় মিলিয়েই সঙ্গীত।

আল্লাতে যাঁর পূর্ণ ঈমান

বিশ্ব দুলালী নবী নন্দিনী

হে নামাজী নামাজ পড়

ও মন রমজানের এই রোজার শেষে এল

আল্লাহকে যে পাইতে চায়

মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই

ইত্যাদি গানের কথার ওপর কান না চড়িয়েও সুরের আনন্দটুকু অনির্বচনীয় মনে হয়। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না ইসলামি গান নজরুলের বৈচিত্র্যপূর্ণ সঙ্গীত ধারার একটি সাধারণ ধারা মাত্র এবং যতটা তিনি স্বতপ্রণোদিত হয়ে এই গানগুলো রচনা করেছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি সব রেকর্ড কোম্পানির চহিদা এবং তাঁর চারপাশের মুসলমান বন্ধুদের পরামর্শে রচিত। বন্ধুদের ধারণা ছিল কিছু ভারি ভারি আলেম-ফাজেল-মৌলানা-মোহাদ্দেসগণের দৃষ্টিতে নজরুল ইসলাম যেভাবে বে-দাত, বে-দ্বীন, বে-শরিয়ত, কাফের, মুনাফেক, না ফরমান, জাহেল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়েছিলেন তার কিছু হলেও ইসলামি গান রচনা করে প্রশমিত করতে পারবে। যদিও সাধারণ মুসলমান বাঙালির কাছে তাঁর মুসলমানিত্বের শুদ্ধতা নিয়ে মাথা ব্যাথা ছিল না। নজরুল যতই শ্যামা কীর্তন লিখুক, তথাকথিত হিন্দু দেবীর নাম তার সাহিত্যে যতই থাকুক, তিনি ব্রাহ্ম সমাজের নারেিক মুসলিম না করেই আহ্হেলি কেতাবের তরিকামতে বিয়ে করুন না কেন তাতে কবি নজরুল, সঙ্গীতের নজরুল ম্লান না হয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিলেন। 

নজরুল তাঁর সমকালে অন্তত গানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের থেকেও জননন্দিত হয়ে ছিলেন। বিনোদনের অভাব মিটিয়েছে তাঁর গান। নজরুলের সাহিত্য আজকে তাঁর সমকালের মত করে প্রাসঙ্গিক নয়। যদিও আমরা এখনও তীব্রভাবেই নানারকম ভেদবুদ্ধি, ধর্মের অসৎ ব্যবহার, নানা অনাচারে জর্জরিত, তবুও আমরা বারবার নজরুলকে উদ্ধৃত করতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসাহিত নই। নজরুলের সৃষ্টির উপরিকাঠামোর তলদেশে গভীরতার অভাবই কি এর কারণ! এ বিষয়টি গবেষকদের হাতে ছেড়ে দেই! আমি শুধু একজন সুর রসিক হিসেবে বুঝে উঠতে চাই। তবে তাঁর সংগীত যে অবহেলা উপেক্ষা এবং কিছুটা অবমূল্যায়নের স্বীকার হয়েছে এখনো হচ্ছে সে কথাও ঠিক। যেমন নজরুলের প্রায় সমবয়সি রবীন্দ্র নজরুলের পর প্রধান সাহিত্য কর্তা এবং নজরুলের ঘনিষ্ঠ বুদ্ধদেব বসুর পাঠের সঙ্গে আমি একমত নই। নজরুলের সৃষ্টিকে শুধু গুণগত বিচারে নয় শ্রেণিগত বিচারে নীচুস্তরের- এমন ভাবনা প্রতিষ্ঠার সচেতন চেষ্টা হয়তো আছে। বুদ্ধদেব বসু মনে করেন কাব্যক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পর নজরুলের অবস্থান। বাংলা সাহিত্যের একজন ছাত্র হিসেবে এবং ব্যক্তিগত পাঠাভ্যাসের কারণে ওঁদের লেখা আমি অনেক পড়েছি। অন্ত্যমিল, পদ্যছন্দ, ছন্দের ঝঙ্কার ইত্যাদির ক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সহজ মুন্সিয়ানা আছে। কিন্তু নজরুলের কাব্য তাঁর সমকালের প্রাসঙ্গিকতা, ছন্দ প্রয়োগ বৈচিত্র্যময় ও ব্যতিক্রমী। বিশেষ করে অসাধারণ ভাষা চাতুর্য যেখানে তাঁর তুল্য বাংলা সাহিত্যে আমার বিবেচনায় ২য় জন নেই। বাংলা ভাষায় তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিনম্র অন্তর্গত নিচুস্বরের পাশে নজরুল যেন ধ্বনি ঝঙ্কারে বিপ্লব করেছেন, তাঁর কাব্য সত্যিই সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কেঁপে উঠেছে। বৈচিত্র্যময় বিষয় ও সাহসী অনুষঙ্গে তাঁর কবিতা রবীন্দ্রযুগে এক বিপুল বিস্ময়, সাড়া জাগানো ঘটনা। স্মৃতি থেকে এমন কয়েকটি পংক্তি এই ডায়ারিতে উল্লেখ করতে চাই এইজন্য যে অসম্প্রদায়িক নজরুলের মত কণ্ঠস্বরের আজকে বড় অভাব। ধর্মীয় ভেদ বুদ্ধির বলি আমি, আমার আলো। ধর্মান্তরিত না হলে আলোকে গ্রহণ করবে না মুসলমান শ্বশুরালয়। অথচ তাঁদের ছেলে রজব নিজেই ধর্মমুক্ত মানুষ। আলোকে সে ভালবেসে গ্রহণ করেছে। আলোও ধর্মমুক্ত সংস্কারমুক্ত। আলো তার স্বামীকে নিয়ে সংসার করছে কিন্তু তারা আমাদের কাছে এবং তাদের কাছে ব্রাত্য হয়ে রইল। তরুণ নজরুল লিখেছিলেন প্রায় শত বৎসর আগে একের পর এক বিস্ময়কর কবিতা। তার কিছু পংক্তি এমন,  

         খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া

উঠিয়াছি চির— বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!

...

          আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,

আমি স্রষ্টা-সুদন, শোক-তাপহানা খেয়ালী বিধির

বক্ষকরিব ভিন্ন!

...

জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া!

ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া!

হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি— ভাবলি এতেই জাতির জান,

তাইত বেকুব করলি তোরা এক জাতিকে একশ’-খান।

...

‘ও’ কা’রা কোরান, বেদ বাইবেল চুম্বিছে মরিমরি!

ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,

যাহারা আনিল গ্রন্থ— কেতাব সেই মানুষেরে মেরে

পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল!— মূর্খরা সব শোনো,

...

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ,

কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ!

“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ঐ জিজ্ঞাসে কোন্ জন?

কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!

...

মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম

হিন্দু মুসলমান

মুসলিম তার নয়ণমণি

হিন্দু তাহার প্রাণ।

নানা গদ্য রচনা ও অভিভাষণেও নজরুল গোঁড়াপন্থিদের সমালোচনা করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় অনেক আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছেন। গুরুদেবের অসম্প্রাদায়িক মন ও রচনাও ছিল নজরুলের প্রেরণা। গোঁড়া মুসলমান ও হিন্দুদের তিনি আক্রমণের স্বীকার হয়েছেন। তাকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও ‘শনিবারের চিঠি’র কর্তা ব্যক্তিরা নারাজ ছিলেন। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর সমকালীন এক পত্রিকায় এক মুসলমান বড় আহত হৃদয়ে লিখেছিলেন,

‘কবি নজরুল এছলামের খাঁটি কবি প্রতিভার উন্মেষ দেখিয়া আমরা বড়ই আশান্বিত হইয়াছিলাম। কিন্তু বিদ্রোহী কবিতা লিখিয়া তিনি আমাদিগকে একেবারেই নিরাশ করিয়াছেন। তাঁহার এই কবিতায় দু’একটি মোছলমানী শব্দ থাকিলেও উহার ভিতরের সব জিনিসটা বলিতে গেলে উহার কাঠামো হইতে আরম্ভ করিয়া বাহিরের সাজসজ্জা পর্যন্ত সবই হিন্দু ধর্মের আদর্শে অনুপ্রাণিত। কবি নজরুল এছলামের এই সাহিত্যিক প্রচেষ্টা আমাদিগকে শঙ্কান্বিত করিয়াছে।’  

নজরুলের সাহিত্যে ও গানে হিন্দু দেবদেবীর নাম ও পৌরাণিক কাহিনির বর্ণনায় গোঁড়া মুসলমান যেমন ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তেমনি উর্দু, আরবী, তুর্কী শব্দ, ইসলাম ধর্মের পৌরাণিক কাহিনির উল্লেখে গোঁড়া হিন্দুরাও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এসব অভিযোগের উত্তরে অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁকে নজরুল বলেছিলেন,

 ‘বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতের দুহিতা না হলেও পালিতা কন্যা। কাজেই তাতে হিন্দু ভাবধারা এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে ও বাদ দিলে বাংলা ভাষার অর্ধেক ফোর্স নষ্ট হয়ে যাবে। ইংরেজি সাহিত্য হতে গ্রীক পুরাণের ভাব বাদ দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। বাংলা সাহিত্য হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই সাহিত্য। এতে হিন্দুদেবদেবীর নাম দেখলে মুসলমানের রাগ করা যেমন অন্যায় হিন্দুরও তেমনি মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের মধ্যে নিত্য প্রচারিত মুসলমানী শব্দ তাদের লিখিত সাহিত্যে দেখে ভুরু কোঁচকানো অন্যায়। আমি হিন্দু- মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের এই সংস্কারে আঘাত দেবার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেবদেবীর নাম নিই।’


আর নজরুল ইসলাম তাঁর ‘হিন্দু- মুসলমান যুদ্ধ’ প্রবন্ধের শুরুতে লেখেন,

‘একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেনঃ দেখ, যে ল্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ল্যাজকে কাটবে কে?

হিন্দু মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমার বারে বারে গুরুদেবের ঐ কথাটিই মনে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে, এ ল্যাজ গজালো কি করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ঐ সঙ্গে এটাও মনে হয়, ল্যাজ যাদেরই গজায়— তা ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক— তারাই হয়ে ওঠে পশু।’

‘হিন্দু মুসলমান’ প্রবন্ধে নজরুল আরেক জায়গায় লিখেছেন— ‘প্রশ্ন করেছিলাম (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে), এই যে, ভিতরের ল্যাজ এর উদ্ভব কোথায়? আমার মনে হয় টিকিতি ও দাড়িতে। টিকিপুর ও দাড়িস্থানই বুঝি এর আদি জন্মভূমি। পশু সাজবার মানুষের একি ‘আদিম’ দুরন্ত ইচ্ছা।’ ...

এই প্রসঙ্গের সঙ্গে গুরুদেবের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বয়ান থেকে উদ্বৃত্তির প্রয়োজন এড়াতে পারছি না,

‘জনশ্রুতি এই যে, ভৈরব রাগ মহাদেবের বাঙ্গলা গানের জন্যেই প্রবর্তিত, আর শুনলেই বুঝা যায়, মিঞা মল্লার বাদশাহী আসরের ফরমাসেই রূপ নিয়েছে। কিন্তু তবুও ভৈরব বা ভৈরবী হিন্দু নয়, আর মুসলমান নয় মিঞা মল্লার। ওরা সম্প্রদায়ের অতীত। তেমনি হোমারের ইলিয়ড বা মিল্টনের প্যারাডাইস্ লস্ট মুখ্যতঃ পৌত্তলিকও নয়, অপৌত্তলিকও নয়—  ওরা সাহিত্য। ওদের গ্রহণ-বর্জন সম্বন্ধে বিচার করবার সময় একমাত্র রসের দিকে থেকেই বিচার কর্তব্য, ধর্মমতের দিক দিয়ে নয়, লজ্জা হয় এই সাদা কথাটারও ব্যাখ্যা করতে।

আমার “কথা ও কাহিনী” তে “বিচারক” নামক কবিতার একস্থানে আছে, মরাঠি রঘুনাথ রাও মুসলমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রাকালে বলছেন—

“চলেছি করিতে যবন নিপাত

জোগাতে যমের খাদ্য।”

“যবন” শব্দটা কালক্রমে হয়তো শ্রুতিকটু হয়েছে। তাই সাধারণত নিজের জবানীতে মুসলমানদের সম্বন্ধে ঐ শব্দ কখনই ব্যবহার করিনে। কিছুকাল হোলো পাঠ্য নির্বাচন বিভাগের মুসলমান পক্ষ থেকে আদেশ এল ঐ “যবন” শব্দটা তুলে দিতে হবে, বিস্মিত হলেম। দুর্ব্বল পক্ষ আমরা, ভাবলেম এই হতভাগ্য দেশ ছাড়া আর কোথাও এমন উৎপাত সম্ভব হোতে পারত না। মার্চেন্ট অফ ভেনিসে খৃস্টান বারে বারে ইহুদিকে কুকুর বলে গাল দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সমস্ত বই খানাতেই ইহুদির পরে অবজ্ঞা ফুটে উঠেছে, তা না হোলে ওর নাটকীয় বাস্তবতার অপলাপ হোত। তৎসত্ত্বেও লর্ড রেডিং যখন এখানে ভাইসরয় ছিলেন তখন ঐ বইটাকে বিদ্যালয়ের পাঠ্য শ্রেণী থেকে সরাবার জন্যে পরোয়ানা জারি করেন নি। আর ডিজরেলির মতো প্রখর বক্তা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এ সম্বন্ধে নির্বাক ছিলেন। অথচ কাব্যে মরাঠি পাত্রের মুখে উচ্চারিত সামান্য একটা “যবন” শব্দের জন্য বাংলা সাহিত্য যদি লাঞ্ছিত হোতে পারে, তাহ’লে এই মাথাগণতির দিনে কার দরজায় দোহাই পাড়ব। সমস্ত কবিতটিতে রঘুনাথ রাওকে আদর্শ পুরুষ ব’লেও খাড়া করা হয় নি, তার বিপরীত “যবন” শব্দ ব্যবহারের দ্বারা মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি যদি অন্যায় সূচিত হয়ে থাকে সে অন্যায় কবির মধ্যেও নেই, কাব্যের মধ্যেও নেই, বস্তুত সে অন্যায় সাহিত্যকে স্পর্শও করেনি। এই সঙ্গে সঙ্গে রঘুনাথ রাও যমের খাদ্য জোড়াাবার কথা বলেছে, ওটাও তো সাধুলোকের যোগ্য কথা নয়; ঐ পংক্তিটাও বর্তমান অবস্থায় আমার পক্ষে উদ্বেগের কারণ হয়ে রইল।

সাহিত্য বিচার নিয়ে এই রকম অদ্ভুত বুদ্ধিবিকার আমার হিন্দু ভ্রাতাদের মধ্যেও উগ্র হয়ে উঠতে পারে, আমি হতভাগ্য তার প্রমাণ পেয়েছি। “ঘরে বাইরে” নামক একখানা উপন্যাস অশুভলগ্নে লিখে ছিলেম। তার মধ্যে বর্ণিত সন্দীপ নামক এক র্দুবৃত্তের মুখে সীতার প্রতি অসম্মানজনক কিছু আলোচনা ছিল। বলা বাহল্য সন্দীপের চরিত্র চিত্র পরিস্ফুট করা ছাড়া এই আলোচনার মধ্যে অন্য কোনো অসৎ অভিপ্রায় ছিল না। হঠাৎ আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কলরব উঠল সীতাকে স্বয়ং আমিই অপমান করেছি। কবি বাল্মীকি অযোধ্যার প্রজাদের মুখের দুর্বাক্যকে দুর্ম্মুখের মুখ দিয়ে ব্যক্ত করিয়ে নিরপরাধ সীতার নির্বাসন সম্ভব করেছেন। কেউ তা ত্রেতাযুুগের কবির প্রতি দোষারোপ করেন নি। আর কলি যুগের কবির মাথায় হিন্দু- মুসলামান উভয় পক্ষই একই শ্রেণির অপরাধ চাপিয়ে যদি তার অখ্যাতিকে দুর্ভর করে তোলেন, তবে কি এই বাংলাদেশের পঙ্কিল মাটিকেই দায়ী করব? প্রাকৃতিক কারণ ছাড়া কোনো রকম নৈতিক কারণ অনুমান করতে সাহস করিনে।’

ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষ যে এখনও চরম অপমান ও দুঃখ পায় এবং দুঃখ দেয় তার নজির তো এখন আমার মেয়ে এবং আমি। আলোর শাশুড়ি কড়া আদেশ বা দিব্যি দিয়েছে ছেলেকে-তোর বউ মুসলমান না হওয়া পর্যন্ত ওর গর্ভে যেন আমাদের পরিবারের সন্তান জন্ম না নেয়। যদি জন্ম নেয় তোকে ত্যাজ্য পুত্র করবই শুধু নয়, আমার অভিশাপে তোরা শেষ হয়ে যাবি। আমার কষ্ট থেকেই এতসব কথা এল।

যাইহোক, বুদ্ধদেব বসুর কথা এখন বলি, প্রথমত তিনি নজরুলের গান বিষয়ে যে কথাগুলো বলেছেন সেখানে তাঁর সংগীতবোধের অভাব পীড়াদায়ক। বসুবাবু এও মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির কাব্যগুলো সুরে গাওয়ায় চিত্তবিক্ষেপ ঘটতে পারে। সুর বসানো কাব্য-গীতগুলো কাব্য হিসেবে হৃদয়ের অন্তঃস্থলে অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারলেও সংগীত হিসেবে নাকি হৃদয়ের কাছে তার আবেদন ভুলে থাকাই ভাল। তাঁর কাথাটাই পড়ে দেখি। গীতাঞ্জলি প্রসঙ্গে তাঁর মতটি এমন,

‘গীতাঞ্জলি’ — পর্যায়ের রচনাগুলি সত্যিকার কবিতা এবং ছন্দশিল্পেরও উজ্জ্বল উদাহরণ; অর্থাৎ তারা কবিতা হিসেবেই               নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। গীত হবার জন্যে বাংলাদেশে তাদের জনপ্রিয়তা আজ অসামান্য, কিন্তু তাতে তাদের আন্তরিক মূল্য বৃদ্ধি পায়নি। বরং তাদের অন্তঃস্থলে পৌঁছতে হ’লে গান হিসেবে তাদের ভুলে থাকা ভালো; সুর যেমন স্নায়ুতন্ত্রীকে আনন্দ দেয়, তেমনি তা চিত্তবিক্ষেপও ঘটাতে পারে, আর ‘গীতাঞ্জলি’র মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ রচনা পেলে আমরা তাতে আরো কিছু যোগ করতে চাই না, ...।’ মানে সুর বসিয়ে সঙ্গীতাকারে শুনতে চাই না। তাতে বুদ্ধদেব বাবুর চিত্তবিক্ষেপ ঘটতে পারে! আমরা যারা গানের মানুষ, গান যাদের মনে প্রাণে কানে,বলার কথাটি ওই সুরেই বসিয়ে নেই, তাদের কাছে ‘গীতাঞ্জলি’র গভীর অনুভব, ধ্যান, আর বিষাদ সৌন্দর্যের অভিঘাত সুরেই বাক্সময় ও রহস্যময় হয়ে ওঠে। কবি বুদ্ধদেব সংগীত স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের সংগীত বিষয়ে বীজকথাটি বুঝতে পারেননি,

রবীন্দ্রনাথেরই কথা, কবিতা যেখানে শেষ, গানের সেখানে শুরু। কবিতার বাণীকে সুর নানা ভঙ্গিতে ইঙ্গিতে নানাভাবে ভরে তুলতে পারে। সংগীতে সুরের ভাষা বিচিত্র ভাবের ভাষা হয়ে গানকে বা গান-কাব্যকে  বহুমাত্রিক রূপ দিতে পারে। ছন্দগতি এবং তালের বিন্যাসও সুরের ভাবকে নতুন ব্যঞ্জনা দেয়। রবীন্দ্রনাথের মতে-‘সংগীত সুরের রাগরাগিনী নহে, সংগীত ভাবের রাগরাগিনী।’

সাংগীতিক কাঠামো, সুর তাল স্বর রাগ ঠাটের কথা নয়, নজরুলের গানে দৃষ্টান্তহীনভাবে অমার্জিত শব্দ, রুচির দোষ, স্থুল স্পর্শ তিনি পেয়েছেন! নজরুলের গান প্রসঙ্গে তাঁর মতটি এমন,

“সাধারণভাবে বলা যায় যে তাঁর গান তার কবিতার চেয়ে বেশি তৃপ্তিকর— গানের ক্ষুদ্র আকারে তাঁর অতিকথনের দোষ প্রশ্রয় পেতে পারেনি— ‘বুলবুল’ ও ‘চোখের চাতকে’ কিছু কিছু রচনা পাওয়া যাবে,  যাকে অনিন্দ্য বললে অত্যন্ত বেশি বলা হয় না। আরো বেশি গান যে অনিন্দ্য হয়নি, তার কারণ নজরুলের দুরতিক্রম্য রুচির দোষ। কত গান সুন্দর আরম্ভ হয়েছে,সুন্দর চলে এসেছে, কিন্তু শেষ স্তবকে কোনো একটা অমার্জিত শব্দ প্রয়োগে সমস্ত জিনিষটিই গেছে নষ্ট হয়ে। তাঁর প্রেমের গান সরস, কমনীয়, চিত্রবহুল: কিন্তু তার আবেদন আমাদের মনে যখনই ঘন হয়ে আসে তখনই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে, কোনো স্থূল স্পর্শে মোহ ভেঙে যায়। গীতরচয়িতার অন্য সমস্ত গুণ তাঁর ছিলো— শুধু যদি এই দোষ না থাকতো, শুধু যদি তাঁর রুচি হতো পরিশীলিত, তাহলে তাঁর মধ্যে একজন মহৎ গীতকারকে আমরা বরণ করতে পারতাম।”

‘অমার্জিত শব্দ’, ‘স্থূল স্পর্শ’, ‘রুচির দোষ’ কী, কোথায় কীভাবে ঘটল তার কোন নজির দেখাবার দায়িত্ববোধ করলেন না বুদ্ধবাবু, যেমন তিনি মত প্রকাশ করেন শুধু— সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের চেয়ে নজরুল নিচুমানের কবি। যাইহোক, নজরুলের সংগীত ও সৃষ্টি যে পরিস্থিতি ও অবহেলার স্বীকার, সে কথা ঠিক, তাছাড়া স্বঘোষিত উচ্চমনাদের দৈন্যতা এবং সর্বপরি নজরুলের অস্থির চঞ্চল অসংগঠিত ভাবনা ও যাপন সঠিক ধারায় নজরুল সংগীত চর্চা পথের অন্তরায় হয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে সুধীর চক্রবর্তীর মতটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

‘তাঁর গান প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত এলিটিস্টদের ততটা মনোযোগ পায় নি। সংগীতের যাঁরা সারদর্শী— যেমন রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও অমিয়নাথ সান্যাল, তাঁদের লেখনী নজরুলের গান বিষয়ে কিছু উচ্চারণ করে নি। নজরুলের গান ভালো করে যাঁরা শিখেছিলেন এবং শিখিয়েছিলেন তাঁরা একে একে প্রয়াত হয়েছেন। কমল দাশগুপ্ত, সুবল দাশগুপ্ত, চিত্ত রায়, ধীরেন দাস, জগৎ ঘটক, নিতাই ঘটক, আব্বাসউদ্দিন, শচীন দেববর্মন, গিরীন চক্রবর্তী, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আঙুরবালা, ইন্দুবালা সকলেই প্রয়াত। এখনও গাইছেন প্রবীণা ফিরোজা বেগম বা সুপ্রভা সরকার— কিন্তু তারপরে যাঁরা নজরুলের গান রেকর্ড করেছেনে শ্রোতৃসমাজ ও সংগীত গবেষেকেরা তাঁদের সম্পর্কে সংশয়ী। কোনো কোনো গায়ক নানা কাল্পনিক সুরে, আবার কোনো কোনো গায়ক তাঁর নিজের রাগদারী সংগীত পরিবেশনের দক্ষতা নজরুলের গানের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে, দুই বাংলায় এই মুহূর্তে নজরুলের গানের সমাদর ও জনপ্রিয়তা যথেষ্ট কিন্তু তাঁর গান নিয়ে নানারকম সমস্যা, সংকট ও প্রশ্ন উঠেছে যা নিরাকরণ করা কঠিন। প্রশ্নাকারে সমস্যাগুলি হল— সত্যি সত্যি নজরুলের গান সংখ্যায় কত? তার সব কি সংকলিত হয়েছে, না ছড়িয়ে আছে ইতস্তত পত্র-পত্রিকায়? তাঁর নামে প্রচলিত সব গানই কি মৌলিক, না অন্যের লেখা গান তাতে মিশে গেছে? মিশ্রিত গানগুলি চিহ্নিত করার উপায় কী? নজরুলগীতির কোনো নির্ভরযোগ্য স্বরলিপি গ্রন্থ আছে কি? তাঁর গানের যে অজস্র সংখ্যক রেকর্ড এক সময়ে বেরিয়েছিল, সেগুলি কি সংগৃহীত হয়েছে? একই নজরুলগীতি একাধিক শিল্পীর একাধিক সুরে, এমন কি আলাদা তালে রেকর্ড করা হয়েছে এবং হচ্ছে, তার কোন্টি নতুন শিক্ষার্থীর পক্ষে গ্রহণীয়? রবীন্দ্রনাথের যেমন বিশ্বভারতী, নজরুলের গানের জন্য তেমনই কি একটি একাডেমি খোলা যায় না— যার কর্তৃত্ব সবাই মেনে নেবেন? এই সব- কটি প্রশ্নের, বা সংশয়-সংকটের কোনো ইতিবাচক জবাব আমাদের জানা নেই।’

সুধীর বাবুর এই কথাগুলোয় চিহ্নিত মূল সমস্যার সমাধান আমরা এখনও দেখতে পায়নি। যদিও নজরুল ইন্সটিটিউট এমনসব সংকট নিরসনেই কাজ করছে বলে বিশ্বাস করি। ফিরোজা বেগম আর এই পৃথিবীতে নেই। আমাদের আরও একটু ভেবে দেখতে হবে যে, সংগীতের আবেদন বিশেষভাবে আমাদের হৃদয়ে, অনুভবে। কারণ গান- গল্প বা নাটকের মত কাহিনী চরিত্র ও সামাজিকতা দিয়ে তার আবেদন সৃষ্টি করে না। কান তার প্রধান ইন্দ্রীয়। ওই গানের সুর ও বাণীতে যদি চিরকালীনতার আবেদন না থাকে তবে সমকালেই বিনোদিত করে শ্রোতার মন থেকে চলে যেতে পারে। গান যখন পারফরমিং কলারূপে গৃহীত হয়, তখন সমকালের শ্রোতাদ্বারাই তার গ্রহণ বর্জন প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত হয়। ভাবীকালে আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকে না। সমকালের রুচির ওপর নির্ভর করে তার আয়ু, রুচি বদলাবেই, এই বদলে শুধু সেইটুকুই চিরকালের থেকে যায় যেটুকুর আবেদন একান্ত ব্যক্তির মনে চিরন্তন মানবীয় অনুভূতির স্পন্দনে স্পন্দিত হয়।   

বাণী প্রধান গান যদি শ্রোতা মুখাপেক্ষীই হয়ে থাকে তাহলে ভাবীকালের শ্রোতার নতুন রুচির গান তৈরি হবে। নিধুবাবুর টপ্পা, পালাকীর্তন, কবিগান ইত্যাদি এখন শহর গ্রাম কোথাও আগের মত জনসমাদরে গৃহীত হয় না। অন্তত জনপ্রিয় সংগীতের ধারায় এই ঐতিহ্যবাহী গানের ফর্মগুলো আগের মতো আর নেই।

গুরুদেবের এই গদ্যছন্দ কথ্যভঙ্গির বিন্যাস আজকের কবি রজব আলীদের মতো নয়। গুরুদেব আধুনিক নয়! ওরা আধুনিক। এতটাই আধুনিক যে আমার মনের এমন ব্যাকুল বিপন্ন পরাজিত বোধটি প্রকাশের জন্য আধুনিক কবিতার বুকে আশ্রয় পায় নি। আধুনিক কবিতা কি তবে আশ্রয় দেয় না! বরং আশ্রয় কেড়ে নেয়! প্রশান্তি বয়ে আনে না, অশান্তিতে তলিয়ে দেয়! ভরসা নয়, উদ্বিগ্ন করে। জীবনানন্দের পর বিনয়, শক্তি খুব বেশি হলে তিন চারজন কবি আমাদের হৃদয়ের তেমন পংক্তি উচ্চারণ করেছেন। যে কবিতা বা তার অবিনাশী পংক্তি নানা মানবীয় ভাব উদ্বেগ উত্তেজনায় স্বতস্ফূর্তভাবে উচ্চারণ করি। সহস্র আধুনিক কবিদের রচনার আবেদন হয়ত ভবিষ্যত হৃদয়ের জন্য অপেক্ষা করছে! শত বৎসরের পুরনো কবি রবীন্দ্রনাথের পংক্তি তাঁর ভবিষ্যতের পাঠক আমরা যেমন উচ্চারণ করছি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা মানে শুধু সঞ্চয়িতা নয়; গীতবিতানের দুই সহস্রাধিক গানও কাব্যবাচ্য, তাঁর নাটক, গীতি- নৃত্য- কাব্য নাটকও কবিতা। ছিন্নপত্র এমনকি গল্পগুচ্ছও গদ্য কবিতা।

রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কবিদের নিয়ে যিনি বেশি দাদাগিরি করেছেন, দেখিয়ে দিয়েছেন কে আধুনিক, কে নয়, সেই বুদ্ধদেব বসুর কবিতা আজ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে! আজকের আধুনিক কবিও কি তাকে পাঠ করে! সাধারণ পাঠক এমন কি কবি ও লেখকেরা পড়ে তিথিডোর, তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থসমূহ এমন কি তাঁর করা অসাধারণ অনুবাদের বোদলেয়ার, রিলকে, কালীদাস। এই বসু কবি অত্যন্ত জোরালভাবে লিখে জানিয়েছেন, ভাষণে শুনিয়েছেন- কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ‘কাব্য কলার কোন অনন্য আদর্শে আত্মসমর্পণ করেননি— যেমন করেছিলেন বোদলেয়ার ও ভের্লেন, ইয়েটস ও এলিয়েট, পরবর্তীকালে সুধীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ।’ ‘বিচ্ছিন্নভাবে প্রীতিজনক’, ‘একটি মাত্র মনোভঙ্গি যথেষ্ট’; ‘ধ্বনি সংঘাতহীন’, ‘বিসংবেদী সুর নেই’, পংক্তি হাতুড়ীর মতো আঘাত করে না।’ এমন অজস্র মন্তব্যের সঙ্গে কিছু প্রশংসা সূচক মন্তব্য। এর কোন একটি সত্য হলে অন্য মন্তব্যটি অর্থহীন হয়ে পড়ে। রবীন্দ্র বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর বিস্তর আলোচনার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মন্তব্যটি হলো গীতবিতান বিষয়ে। তাঁর মনে হয়েছে সমগ্র রবীন্দ্ররচনাবলীর মধ্যে গীতবিতানই সবচেয়ে রাবীন্দ্রীক। গীতবিতান মানে প্রায় আড়াই হাজার গান- কাব্য, যেখানে অন্তর্ভুক্ত গীতিনাট্য নৃত্যনাট্য কাব্যনাটকের গানগুলোও। তাহলে গীতবিতান রবীন্দ্রনাথের রচনার অনেকটা অংশ নিয়েই।

কবি নজরুল ইসলামকেও তিনি ‘কিশোর কবি’ ‘প্রতিভাবান বালক’ এবং ‘স্বভাবকবি’র তকমা এঁটে দিয়েছেন অসাধারণ একাধিক গদ্যভাষ্যে। খুব আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বুদ্ধবসু কথা বলেন, ওঁর কথার ওপর কথা চলে না। আমাদের কবি রজব আলীর মধ্যেও এমন একটি প্রত্যয় ঘোষিত হতে প্রায় দেখেছি। বুদ্ধদেব নির্ভুলভাবে নজরুল ইসলামকেও ‘স্বভাবকবি’ হিসেবে বিবেচনা করেন। তো স্বভাবকবি বলতে তিনি কি বোঝাতে চান? ‘স্বভাবকবি বলতে শুধু এটুকু বোঝায় না যে ইনি স্বভাবতই কবি— সে কথা না বললেও চলে, বোঝায় সেই কবিকে, যিনি একান্তই হৃদয়নির্ভর, প্রেরণায় বিশ্বাসী, অর্থাৎ যিনি যখন যেমন প্রাণ চায় লিখে যান, কিন্তু কখনোই লেখার বিষয়ে চিন্তা করেন না। যাঁর মনের সংসারে হৃদয়ের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তির সতিন সম্বন্ধ।’ স্বভাবকবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যটি এমন, ‘নজরুল ইসলামকেও ঐতিহাসিক অর্থে স্বভাবকবি বলেছি, সে কথা নির্ভুল। পূর্বোক্ত প্রকরণগত ছেলেমানুষি তাঁর লেখার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। ... নজরুলের কবিতাও অসংযত, অসংবৃত, প্রগলভ; তাতে পরিণতির দিকে প্রবণতা নেই; আগাগোড়াই তিনি প্রতিভাবান বালকের মতো লিখে গেছেন। নিজের মধ্যে বদল ঘটেনি কখনো, তাঁর কুড়ি বছর আর চল্লিশ বছরের লেখায় কোনরকম প্রভেদ বোঝা যায় না।’ বুদ্ধদেব বসু সব সময়ই আমার প্রিয় গদ্য লেখক। তাঁর ভাষা ঋজু এবং একই সঙ্গে সুরময়। পড়তে ভাল লাগে। কিন্তু সাহিত্য আলোচনায় তিনি বিশিষ্ট মন্তব্য করাতে। যথোপযুক্ত নিদর্শন দেখিয়ে মন্তব্যের পক্ষে তাঁর পাঠটিকে যুক্তিযুক্ত করে তুলতে আগ্রহী নন। কোন কবি কোন শিল্পীর কাজই চিরকাল একই শক্তির প্রতাপে উজ্জ্বল অক্ষয় থাকে না। সব শিল্পীর কাজের সমগ্রে অল্প কাজই অমরতা লাভ করে। নজরুলের বয়স কুড়ি থেকে খুব বেশি হলে পয়ত্রিশ পর্যন্ত রচনায় প্রামাণ্য প্রখর দীপ্তির পাশে স্বতন্ত্র উজ্জ্বলতা, নতুনদের এবং সমসাময়িকদেরও চিন্তায় প্রকরণে প্রভাব বিস্তারী। নতুন নতুন শব্দ, ছন্দ, বৈচিত্র্যের মধ্যে তথাকথিত ছেলেমানুষি এবং কথিত স্বভাবকবির বৈশিষ্ট্য বসুবাবুই খুঁজে পেয়েছেন নির্ভুলভাবে। তবে একথা বোকা পাঠকও মেনে নিতে পারে না— চল্লিশ বছরের নজরুল অথবা তাঁর সৃষ্টির শেষ কয়েকটি বছরের রচনার সঙ্গে মধ্য কুড়ির নজরুলের ব্যবধান নেই। কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে লিখতে বসে বুদ্ধদেব বসু দুই জাতের কবি আবিস্কার করেন। এক ‘স্বভাববের কবি’ দ্ইু ‘স্বাভাবিক কবি’, তাঁর মতে ‘স্বাভাবিক কবিই উত্তম কবি— আর তাঁরা ছাড়া সকলেই অকবি। তাঁরা লোক মানসে নিতান্তই কবিরূপে প্রতিভাত হয়ে থাকেন। তাদের ক্ষমতার অন্যান্য বিকিরণ শেষ পর্যন্ত সেই একটি অগ্নিতে লীন হয়ে যায়।’ তো তাঁর বিবেচনাায় স্বভাবকবি গং সকলেই অকবি, নজরুলও অকবি, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তও অকবি, বুদ্ধদেব এই ছন্দের যাদুকরকেও বলেছেন স্বভাবকবি। ধন্যবাদ বসুবাবু!

সংগীতে বাণী ও কাল নিরপেক্ষ যে সুর, রাগরাগিণীর বিমূর্ত রূপ তা শুধু সমকালের শ্রোতার মুখাপেক্ষী নয়। তাই সুর এবং রাগরাগিণীর অস্তিত্ব কখনও হারিয়ে যাবে না। বাণীময় গানের সুর গঠনে, অথবা রাগরাগিণী নিজেই নিজের মহিমায় বেঁচে থাকে। তবে, গুরুদেবের গান নির্জন এককের গান। নিজের মনের নানা ভাব ব্যকুলতায় তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে অথবা প্রশান্তি ও স্বস্তির জন্য গানের ওপর ভরসা করেছেন। সেই গানের বাণীতে সুরে মানব মনের সেই চিরকালীন মানবীয় অনুভূতির অনুরণ আছে বলেই তার ক্ষয় নেই। শত বৎসর পরেও রবীন্দ্রনাথের গান আরও বহুজনের অন্তরের কথা হয়ে উঠছে। প্রিয়নাথ সেনকে কবি লিখেছিলেন ... ‘ওগুলি (গানগুলো) আমার একান্তই অন্তরের কথা— অতএব কারও না কারও অন্তরের কোনো প্রয়োজন মিটতে পারে— ... ।’

 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত