সংবাদ

সাহিত্য

বিমল গুহর ৭৫: একজীবনের কাব্যকথা

মানুষের প্রতি গভীর আস্থা রেখে, মহৎ সত্যরীতি, শিল্পের সাধনায় মগ্ন-থাকা বিস্ময়ের দাবি রাখে। বিমল গুহ বিস্ময়কর পরিস্থিতিতে, স্বল্পসংখ্যক মানুষদেরই একজন। তিনি যা সত্য মেনেছেন, তা বলেন দৃঢ়তার সঙ্গে এবং শতাংশ বিশ্বস্ততায় তা করেন। দীর্ঘদিনের সহযাত্রী, কবিতাকাজ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের আলোয় তাঁর হৃদয়ের উত্তাপ আমি অনুভব করেছি— প্রখর এবং প্রাজ্ঞ। জেকে বসে থাকা শটতা, কপটতা, গ্লানি ও ক্লান্তির মধ্যেও দেখেছি বিমলের মনে জন্মেছে সেই প্রতীতি— ‘মানুষের মনে দীপ্তি আছে, তাই রোজ নক্ষত্র ও সূর্য মধুর’।  ব্যক্তি বিমল আর কবি বিমল গুহ সম্পর্কে আমার যা উপলব্ধি, তা অনেকে বলেছেন। তবু ‘সব সত্য অবিকল’ মেনে নিয়ে তাঁর কবিতা সম্পর্কে আমার পর্যবেক্ষণের কিয়দাংশ উল্লেখ করতে চাই।  কবিতা বিচারের দুটি দিক রয়েছে, প্রাচীর আচার্যরা তা-ই বিবেচনা করেছেন— আত্মা ও শরীর। আত্মার স্বরূপ নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই মতান্তর রয়েছে। কেউ বলেছেন কবিতার আত্মা হলো রীতি, কারো মতে ধ্বনি, আবার কেউ বলেছেন রস, একদল তো নাকচই করে দিয়ে বলেছেন কবিতার আত্মা বলে কিছু নেই। আসল বিষয়টি হচ্ছে আলংকারিক রূপ বা সাজসজ্জা। আত্মা বিষয়টির পরেও থাকে কবিতার শরীর প্রসঙ্গটি। শব্দ ও অর্থ নিয়ে কবিতার যে বাক্সময় রূপ, তা-ই হচ্ছে কাব্যশরীর। আদিকবি বাল্মীকি থেকে শুরু, আজকের কবির মনেও কবিতার রহস্যময়তা বিষয়ে একই প্রশ্ন, একই কৌতূহল। আগামীতেও যে এর উত্তর পাওয়া যাবে না, তা প্রায় নিশ্চিত হয়েই বলা যায়। তারপরও অধিকাংশের সিদ্ধান্ত— আত্মা ও শরীরের সমন্বয়ে আবর্তিত হচ্ছে কবিতার চিরকালীন আলো এবং অন্ধকারের রহস্যধারা। বিপরীত মত কিংবা ভিন্ন মত থাকতে পারে, আছেও। এতদিন ধরে চলে-আসা বিতর্ক-বিবাদ সম্পূর্ণ গ্রহণ বা বর্জন না-করে বলা যায়— আত্মাকে বাদ দিয়ে কবিতা নয়, আবার শরীর বিবর্জনের কোনো রচনাকে কবিতা মনে হয় না। কবিতার আত্মা এবং শরীরের যে সম্মিলন, কবি বিমল গুহের কাব্যপ্রয়াসে তা শনাক্ত করা যায়। তত্ত্বকথা নয়— যিনি সৃজনশীল মানুষ, তাঁর একটা নিজস্ব একটা ভুবন থাকে, অবলোকনের নিজস্বতা থাকে। যিনি কবি তার চেতনার বিকাশ কবিতার পথে। কবিতা যখন নির্মিত হতে থাকে, কবির চোখে বাস্তবতার উদ্ঘাটন তো থাকেই— থাকে সম্ভাবনার দৃশ্য, কানে থাকে শব্দ এবং শব্দের যথাযথ অনুষঙ্গ। বিষয়ের ভেতর অনেক বিষয়, শব্দের ভেতর আরো বেশি শব্দ, বজ্রগর্ভ শব্দের ইঙ্গিত। এই ইঙ্গিত বিমল গুহের কবিতায় আছে—   ‘শব্দের ভেতরে শব্দ খেলা করে ... ...শব্দ শুধু শব্দের ভেতরে শব্দ ডুব দেয় ... ... শব্দ বড় প্রতিশব্দময় ... ...আবার আক্ষেপের কথাও আছে— মেটোপথে কখনোবা শব্দ করে শব্দের বেসাত রৌদ্রজ্বলা দিনে শস্যের প্রান্তর ছুঁয়ে দোল খায় শব্দের উপমা শব্দহীন আরেক জড়তা এ এক বিষম খেলা খেলতে খেলতে কেউ কেউ পায়’[শব্দ শব্দ খেলা: অহংকার তোমার শব্দ]সেই কেউ কেউ-এর দলে যে বিমল গুহের অবস্থান সেকথা আমি নির্দ্বিধায় বলছি। তাঁর বহু কবিতায় এই শব্দ নিয়ে বহুরৈখিক ভাবনা এবং উপলব্ধির বিস্তৃতি ঘটেছে। বারবার তিনি অনুষঙ্গ পাল্টেছেন, কখনো বাস্তবতার প্রাখর্যে, কখনো শুধুই কল্পনানির্ভর— ‘বলো কার প্রতীক্ষায়, হে আমার শব্দাবলি গনগনেজাগ্রত শিশুর কান্না শুনে কাটাও রজনী অবিশ্রাম?‘[কার প্রতীক্ষায় আছো: অহংকার তোমর শব্দ] কিংবা ‘একটি দিনের জন্য কিংবা বাড়তি একটি রাতের জন্য নয়,  একটি শব্দের জন্য একটু সময় শুধু মুহূর্তের চাওয়া অন্য পৃথিবীর প্রতি কোনো মোহ নেই।’[একটি শব্দ উচ্চারণের মতো একটু সময়: সাঁকো পার হলে খোলাপথ] শব্দ নিয়ে বিমল অনেক পথ হেঁটেছেন, দেখেছেন এর দ্যুতি ও দাহ্যতা। সব দেখারই শেষ থাকে, তখনই সিদ্ধান্ত—‘শব্দ ধ্বনি কিংবা অক্ষর যা-ই হোকব্যবহৃত হতে হতে নিজের ভৈবব ফিরে পায়— বসে তক্তপোশে  তারপর জারি করে গ্রেফতারি পরোয়ানা  মৃত্যুদণ্ড অথবা অজানা নির্বাসন, মূলত শব্দই মূর্ত শক্তিমান ধ্বনি উচ্চারিত হতে হতে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়।’[শব্দ: সাঁকো পার হলে খোলাপথ] প্রাত্যহিকতা বলি আর গভীর দর্শন, অথবা যদি বলি পথচলতি মানুষের হঠাৎ দেখা এবং মিলিয়ে যাওয়া একটি অনুদৃশ্য। সবই ছেঁকে তুলতে চেয়েছেন কবি তাঁর কবিতার খোলামেলা, আধখোলা অথবা রাখঢাকের রহস্যময়তায়।বিমল গুহের বহু কবিতায় অনুষঙ্গ হয়ে এসেছে প্রেম। ব্যক্তিপ্রেমের অনুভূতিটি স্পর্শ করে অপরাপর প্রেমানভূতিকে। ‘তোমার অবজ্ঞা পেয়ে ভালোবাসা তীব্র হলো আরো’— এটা বোধ করি যথার্থ প্রেমিকের চিরপুরাতন দীর্ঘশ্বাস। এর সঙ্গে মিশে আছে যে আকুতি, যে একাগ্রতা তা বৃহৎ অর্থে জীবনচেতনারই একটি অংশ। ভালোবাসার সর্বময়তায় নির্দিষ্ট হয়ে থাকে জীবনের সত্যগুলো, সুন্দরগুলো। ভালোবাসাকে কখনো সংজ্ঞায়িত করা যায় না, বিশ্লেষণ করা যায় না কোনো ধরাবাঁধা ছকে। ‘ভুলভর্তি রাফখাতা’ শিরোনামের কবিতায় কবি বলেছেন— ‘একটি সংজ্ঞায় শুধু নিজেকে মিলাতে গিয়ে ভুলে ভুলে রাফখাতা ভরাট করেছি’। তা-ই হয়। ভালোবাসা মুখস্থ পথে হাঁটে না। এর জন্য চাই খোলা হাওয়া, বিস্তীর্ণ মাঠ। ‘ভালোবাসা না দেখা না পাওয়ার মধ্যে খুব ক্ষীণ দূরত্বের লুকোচুরি খেলা’।সমাজ-সচেতন কবি বিমল গুহ দেশ, মানুষ, আর এসবের যৌক্তিক আকাঙ্ক্ষাগুলো কবিতায় তুলে আনেন শিল্পশর্ত পূরণ করে। চেঁচামেচি আর অকারণ কোলাহল যে কবিতা নয়, এর জন্য চাই উচ্চারণের পরিমিতি, গাঢ় আবেগ তাড়নার মধ্যেও তা বিমল ভুলে যান না।  ‘প্রত্যহ বাতাসে শুনি বিপন্ন মানুষের চিৎকার ঘরের আঙিনায় বসে আমরাও ভাগ করি পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি— পুরানো বিশ্বাস,দূর থেকে একদল নষ্ট মানুষ দাঁড়িয়ে হাততালি দেয় ছুড়ে দেয় নষ্ট শিস প্রজন্মের দিকে।’[নষ্ট মানুষ: নষ্ট মানুষ ও অন্যান্য কবিতা] অবস্থা দৃষ্টে বুঝতে আর বাকি থাকে না যে ভাঙনের শব্দগুলো ক্রমেই স্পষ্টতর হচ্ছে— ‘পোষা অশ্বখুর ক্ষত করে আমাদের আগামীর দিন’। মূল্যবোধের জানালাগুলো বন্ধ হতে হতে আমরা ডুবে যাচ্ছি অতল অন্ধকারে। কবির উপলব্ধি— ‘আমার কবিতা আজকাল আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে গণতন্ত্র হননের ... ... আমার কবিতা কখনো কখনো আমারও বিরুদ্ধে চলে যায়।’ [আমার কবিতা: নষ্ট মানুষ ও অন্যান্য কবিতা] কবির কাছে তো কবিতার অভিযোগ থাকবেই। আসলে এ অভিযোগ নয়, বাস্তবতার একটি উন্মোচন মাত্র। আরো গাঢ় হয়ে আসে অন্ধকার, দম বন্ধ হয়ে আসে। এত যে হতাশা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, তবু কবিকে আশাবাদী হতে হয়। নতুন দিনের প্রত্যাশায় বুক বেঁধে থাকাই তো কবির ধর্ম। বিমল গুহের উচ্চারণে সেই দীপ্তি—‘নতুন প্রজন্মের কবিতা এনে দেবেবারুদের ক্ষীপ্রতা, তখন বাংলার মানুষের ইতিহাস  লেখা হবে কবিদের হাতে কবিতার সত্যে প্রকম্পিত কবি ও মানুষ  জীবনের যৌথ সত্যবন্ধ রচনা করবে এই বাংলায়।’[চব্বিশ বছর পর: নষ্ট মানুষ ও অন্যান্য কবিতা] কবির অন্বেষণ থেমে থাকে না। সেই অন্বেষণের নানা স্তর এবং মাত্রায় বিমল গুহকে দেখা যায় প্রকৃতির স্মরণাপন্ন হতে, কখনো আবেগঘন, কখনো দেশানুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিকতার আবহে, কখনোবা সমকালের ভাঙন এবং স্বপ্নবৃত্ত থিতু হয়েছে চিরকালীন আকাঙ্ক্ষার কাছে। তিনি তখন উচ্চারণ করেন— ‘পৃথিবী ক্ষুধার্ত হলে বৃদ্ধ ও যুবার চোখে  বেলাল্লা রোদের ছানি পড়ে, পৃথিবী ক্ষুধার্ত হলে কামার্ত রমণীর মতো লণ্ডভণ্ড করে দেয় সময় শাসন।’[ক্ষুধা: সাঁকো পার হলে খোলাপথ] আমাদের বুঝতে আর বাকি থাকে না, কবির অন্বেষণে উঠে-আসা উপলব্ধির যে বৈপরীত্য তা মানুষের অর্জিত সভ্যতার উঁচু সিঁড়িটির জন্য হুমকি। যুক্তির কাছে যা পরাজিত, কঠিন-কঠোর বাস্তবতার নিরিখে তা হৃদয়-সত্যতা দাবি করে। বিমলের কবিতার আত্মার স্বরূপটি বহুমুখী আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত। নিজে যা উপলব্ধি করেন, হতে পারে ব্যক্তিপরিমণ্ডলে, সামাজিক বা গণতান্ত্রিক পরিসংখ্যানে, কবিতার শৈলীকরণে— তা সমকালকে ডিঙিয়ে চলে যায় শাশ্বতের আনন্দ এবং আকাঙ্ক্ষার কাছে, হয়ে ওঠে সর্বজনীন। শব্দ প্রয়োগের দক্ষতা, উপমা, চিত্রকল্প, অনুপ্রাসের দ্যুতি বিমল গুহের কবিতার আত্মাকে করেছে গ্রাহী, কোমল ও স্বপ্নাবিষ্ট। শৃঙ্খলাবোধ কবিতাকে নিয়ে যায় গ্রাহ্যতার ভিন্ন একটি স্তরে। তাঁর কবিতার বিষয় বলি, বিন্যাস বলি, ছন্দ বলি— সর্বক্ষেত্রেই শৃঙ্খলাবোধের বিষয়টি পাঠক শনাক্ত করতে পারেন। তিনি কখনো বাংলা কবিতার ছন্দরীতিকে অবজ্ঞা করেননি, বরং সর্বত্র সমীহ করে নির্মাণ করেছেন কবিতার শরীর। তাঁর প্রিয় এবং অনায়াসলব্ধ একটি প্রকরণ অক্ষরবৃত্ত। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে—  ‘মানুষের দশা দেখে কাঁদে এই গুমোট আকাশ, বৃষ্টিভেজা ক্রূর মেঘ চেয়ে দেখে বঙ্গোপসাগর কেঁপে ওঠে। পেটভর্তি জলজ প্রাণীর তাজা লাশ বিপন্ন স্বদেশ ঘিরে ছেয়ে আছে জলের কবর।’[শতাব্দীর ছায়া কাঁপে: প্রতিবাদী শব্দের মিছিল] এখানে ৮+১০=১৮ মাত্রার অন্ত্যমিলের অক্ষরবৃত্ত শুধু নয়, মাত্রাবিন্যাসের স্বাধীনতা নিয়ে কবিতাকে দিয়েছেন ভিন্ন ব্যঞ্জনা। তাঁর মাত্রাবৃত্ত ছন্দের দক্ষতাও চোখে পড়ার মতো— ‘এসেছিলে তুমি একলা নিশীথে হেঁটে ভরা বাদলের শব্দে গুঞ্জরণে, মৃদুপায়ে বাজে পলাতকা ঝুমঝুমি সূর্যের রেখা দুলেছে কুঞ্জবনে কী করে ফেরাতে পারো?[কী করে ফেরাতে পারো: ভালোবাসার কবিতা] এখানে ৬ মাত্রার যে অগ্রসরমানতা, এমন উদাহরণের অনেক কবিতা আমরা চিহ্নিত করতে পারি তাঁর কাব্যপ্রয়াসে। মাত্রাবৃত্তের প্রতি চরণে একাধিক সমমাত্রিক পর্ব থাকায় এ ছন্দে একটা নির্ধারিত দোলা তৈরি হয়, কবিতাপাঠ ধীর লয়ের হয়, উপভোগ্য হয়।  স্বরবৃত্তের মুন্সিয়ানাও বিমল গুহের কবিতাকে বাগ্ময় করেছে। একটা ধারণা প্রচলিত আছে— স্বরবৃত্ত ছন্দ হচ্ছে হালকা চালের কবিতা। এ ছন্দ যেন গভীর বিষয় ধারণ করতে পারে না। বিমল গুহের কবিতার পাঠক স্বরবৃত্তের ঘাড়ের হালকা চালের দোষটি যে খারিজ করবেন তা নিশ্চিত হয়ে বলা যায়। একটি উদাহরণ দিয়ে বলি— ‘যখন তুমি দোরগোড়াতে বসে ছড়াও তোমার যুগল পদ্মপাতা,দশটি কোমল ছন্দোময়ী মাছি উড়ে এসে জুড়ে রঙিন ছাতা।’[যখন তুমি: ভালোবাসার কবিতা] এটি স্বরবৃত্তের ঐতিহ্যগত ৪ মাত্রার চাল, একটি ২ মাত্রার অতিপর্ব। এরকম অনেক উদাহরণ উদ্ধৃত করা যাবে, যেখানে স্বরবৃত্তের হালকা দুলুলির ভেতরে থাকছে গভীর কথাটি, গভীর ব্যাপ্তি। বিমলের ৫ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দেও লক্ষ করি— স্বরবৃত্তের চাল বিদ্যমান। একে আমরা বলি স্বরমাত্রিক চাল। তেমন একটি উজ্জ্বল উদাহরণ— ‘শহর জুড়ে ধুম লেগেছে দেখে পাড়ার লোকে করছে কানাকানি,আগামীকাল কাঙালি ভোজ হবেএকলা কেন গুমরো হয়ে থাকিস?’[কালের কবিতা: স্বপ্নে জ্বলে শর্তহীন ভোর] কবিতার যে বহিরঙ্গ, এর যে অন্তর্গত সৌন্দর্য— এ দুটো দিকের প্রতি বিমল গুহের কবিস্বভাবের যত্ন-আত্তি রয়েছে। নিজের মতো করে পাঠকের জন্যও তৈরি করেন পরিমিত অপেক্ষার দায়। কবি নিজেই যেন পাঠকের কাছে প্রশ্ন করেন— ‘কার প্রতীক্ষায় আছো হে আমার দুঃখী শব্দাবলি ’। প্রশ্ন আরো আছে— ‘কে তুমি শব্দের বুকে বিঁধে দিয়ে দৃশ্যমান সুচ শরীর রক্তাক্ত করো— হাই তোলো আড়মোড়া কেটে ... ...দাঁড়ি কমা কেঁপে ওঠে— অর্ধযতি কোলনের চোখেবিষাদের ছায়া নামে, থরথর বৃত্তের পয়ারছন্দের দোলায় মাথা নাড়ে বয়স্ক স্বভাবে হাসে, পড়ার টেবিলে ঝুঁকে বৃদ্ধকবি মূহ্যমান শোকেপাঠকেরা হতবাক, ভীষণ দুর্দিন কবিতার তুরাগের বেনোজলে হাজার শব্দের লাশ ভাসে।’[সমালোচকের প্রতি: স্বপ্নে জ্বলে শর্তহীন ভোর] কবি এভাবে বিষয়ের অনুষঙ্গে, শব্দের মহার্ঘে ছন্দের দ্যোতনায়, আপাত হতাশার দৃশ্যকে নিজ দক্ষতায় নিয়ে যান নতুন মাত্রায়— যেখানে পাঠকের মনোজগতে কবির উপলব্ধির দ্যুতি বিচ্ছুরিত হয়। ছন্দের অনুকার নয়, ‘অমেতার অস্তকরণে’ ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতায় যে কবিতা লেখা হয়, তা-ই কালের ও কালান্তরের কবিতা। বিমল গুহ দীর্ঘ কাব্যসাধনার মধ্য দিয়ে এ কাজটি করেছেন দক্ষতায়, সফলও হয়েছেন। সত্তরের দশকের অঙ্গুলিমেয় প্রতিনিধি কবি যাঁরা, বিমল গুহ তাঁদেরই একজন। বি ম ল  গু হ  জী ব ন ক থাসমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি বিমল গুহ। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের কবিতা যাঁদের হাতে নতুন বোধ ও জীবনোপলব্ধিতে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে, সময়কে ধরে রাখার শিল্পকৌশল নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে— বিমল গুহ তাঁদের অন্যতম। সার্থক চিত্রকল্প-উপমা-রূপক সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের স্বপ্ন আর জীবনবাস্তবতাকে উন্নীত করেছেন কাব্যশিল্পে। শব্দের চাতুর্য ব্যবহারে নির্মাণ করে চলেছেন জাতিসত্তার চিরন্তন শিল্পরূপ। বিমল গুহের কবিতার আত্মার স্বরূপটি বহুমুখী আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত। কবিতার ক্ষেত্রে সতত শুদ্ধাচারী ও সুন্দরের পূজারী এই কবির কাব্য-শিকড় আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে আমাদের জীবন ও জগতের অন্তর্ভেদী উচ্চারণ। বিমল গুহের কাব্যিক পরিমিতিবোধ ঈর্ষণীয় এবং জীবনকে দেখার ক্ষমতা অসাধারণ। তাঁর ভাষা সর্বত্র বলিষ্ঠ ও সাবলীল। কাব্যবিন্যাসের স্বীয় বৈশিষ্ট্যে বিমল গুহের কবিতা আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের রূপভাষ্য, অসুন্দর ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের তূর্যবাদন। কবিতার স্বীকৃত ব্যাকরণ ও রূপৈশ্বর্যকে গ্রহণ করে তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব স্বর। বিমল গুহ জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার বাজালিয়া গ্রামে। প্রসন্নকুমার গুহ ও মানদাবালার বড় ছেলে। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামে। পড়ালেখা গ্রামের স্কুল-কলেজে। কাব্যচর্চারও সূত্রপাত স্কুলের ছাত্রাবস্থায়। ঢাকায় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অহংকার, তোমার শব্দ’। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ ৪৭টি, তম্মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ১৮টি। ২০২২ সালে করোনাকালের কবিতা নিয়ে প্রকাশিত ‘এ কোন মাতাল নৃত্য‘ বিমল গুহের কাব্যভাবনায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। একই বছর প্রকাশিত হয়েছে আত্মজীবনী ‘ধলপ্রহরের আলো‘। বিমল গুহের কবিতা বাংলাদেশ ছাড়া অন্যান্য দেশেও সমাদৃত হয়েছে; অনূদিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। আমন্ত্রিতকবি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন দেশবিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।  তম্মধ্যে স্কটল্যান্ড, লন্ডন, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লী, নেব্রাস্কা, নিউইয়র্ক উল্লেখযোগ্য। 

বিমল গুহর ৭৫: একজীবনের কাব্যকথা