সংবাদ

শ্রদ্ধাঞ্জলি

লালনের মানবধর্ম: মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি


মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন
মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৭ পিএম

লালনের মানবধর্ম: মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি
লালন ফকির / জন্ম: ০১ কার্তিক ১১৭৯ বাংলা; মৃত্যু: ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ (০১ কার্তিক ১২৯৭)

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া খ্যাপা রে তুই মূল হারাবি ॥’

বাংলার লোকসংস্কৃতি ও সাধন-সাহিত্যের ইতিহাসে যে ক’জন সাধক কবি মানবতার সর্বজনীন দর্শন নির্মাণ করেছেন, লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০) তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি; তাঁর সাধনার কেন্দ্র ছিল মানুষ এবং মানুষের অন্তর্নিহিত সত্য। সমাজ যখন মানুষকে জাত, বর্ণ, ধর্ম ও বাহ্যিক নানা পরিচয়ের সীমারেখায় বিভক্ত করেছিল, লালন তখন প্রশ্ন তুলেছেন-মানুষের আসল পরিচয় কোথায়? লালন তার গানের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও সামাজিক পরিচয়ের কৃত্রিম বিভাজনের বিপরীতে মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তাঁর সাধনার কেন্দ্র ছিল মানুষের অন্তর্লীন সত্য; মানুষের মধ্য দিয়েই তিনি পরম সত্তার সন্ধান করেছেন। নিজের দেহ ও অন্তরের রহস্যকে উপলব্ধি করে মানুষের মধ্যে নিহিত অসীম সত্তাকে চিনে নেওয়াই তাঁর সাধনার মূল লক্ষ্য। তাই তাঁর মানবধর্মের মূলকথা মানুষের মধ্যে পরমের সন্ধান এবং মানুষকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আত্মিক সত্যের উপলব্ধি। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।/মানুষ ছাড়া খ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’ —এই বাণীতে তাঁর সমগ্র মানবদর্শনের সারকথা যেন ধ্বনিত হয়েছে। মানুষকে অবহেলা, অপমান করলে ঈশ্বরের আরাধনা মহান সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে সত্য খোঁজা ছাড়া আর কিছুই নয়। লালনের মানবধর্ম নিছক মানবতাবাদ নয়; এটি মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক গভীর জীবনদর্শন, যা আজও বিভক্ত সমাজের সামনে মানবমুক্তির এক শক্তিশালী পথনির্দেশ হিসেবে উপস্থিত।

লালনের কাছে মানুষ কেবল সামাজিক জীব নয়; মানুষই সত্যের আধার। তাঁর বিখ্যাত প্রশ্ন— ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’, অথবা ‘লালন ফকির কোন জাতের ছেলে?’ জাতপরিচয়ের প্রচলিত ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। জন্মের পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না— এই উপলব্ধিই তাঁর মানবধর্মের ভিত্তি। মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করাই তাঁর সাধনার প্রথম শর্ত।

লালনের দর্শনে মানবপ্রেম কোনো নিছক সামাজিক নীতিবাক্য নয়; এটি আত্মসন্ধানের পথ। তাই যে মানুষের ভেতর পরমাত্মা বিরাজ করে সেই মানুষকে অবহেলা, অসম্মান করে কোনো সাধনায়-ই সিদ্ধি লাভ হবে না। লালন বলেছেন— ‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার’— লালন সাঁইয়ের এই আধ্যাত্মিক বাণীটি বাউল দর্শনের অন্যতম মূল স্তম্ভ ‘গুরুবাদ’ এবং ‘নরতত্ত্ব’ (Humanism) এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। লালনের কাছে ঈশ্বর সাধনার সর্বোচ্চ মাধ্যম হলো মানুষ। বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বা শুধু শাস্ত্রজ্ঞানের মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়া যায় না। যিনি প্রকৃত গুরুর নির্দেশিত পথে চলে নিজের মনকে শুদ্ধ করতে পারেন এবং মানুষের সেবা করতে পারেন, তিনিই জীবনের পরম সত্য বা আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করেন।

লালনের দর্শনে দেহ একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর দেহতত্ত্বে মানবদেহকে নিছক শরীর হিসেবে দেখা হয়নি; বরং দেহের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সাধনার রহস্য ও পরম সত্যের সন্ধান। মানুষের জন্ম, দেহের গঠন, প্রাণের প্রবাহ এবং দেহের অন্তর্লীন রহস্য নিয়ে তাঁর বহু গান রচিত হয়েছে। দেহ তাঁর কাছে আত্মপরিচয় ও সৃষ্টির রহস্য অন্বেষণের একটি ক্ষেত্র।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মাঝেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল রহস্য লুকিয়ে আছে (যা বাউলতত্ত্বে ‘যা নেই ভাণ্ডে, তা নেই ব্রহ্মাণ্ডে’ বলে পরিচিত)। গুরুর প্রতি নিষ্ঠা রাখার অর্থ হলো মানুষের প্রতি নিষ্ঠা ও ভালোবাসা রাখা। মানুষকে ভালোবাসার মাধ্যমেই পরমাত্মাকে পাওয়া সম্ভব— এটাই এই দর্শনের মূল কথা। ‘নদী কিংবা বিল বাওড় খাল, সর্বস্থলে একই এক জল।/একা মেরে সাঁই ফেরে সর্ব ঠাঁই, মানুষে মিশিয়ে হয় বেদান্তর।’ গানে নদীর জলের সাথে বিল বা খালের জলের যে তুলনা লালন এনেছেন, তা মূলত অদ্বৈতবাদের প্রতীক। নদী, বিল বা খালের জল দেখতে আলাদা মনে হলেও মূলগতভাবে তা একই জল। একইভাবে, পৃথিবীতে ধর্মে বর্ণে, গোত্রে বা আচারে নানা রূপভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সকল সৃষ্টির পেছনে পরম সত্য বা স্রষ্টা একজনই। লালন বলেছেন— ‘নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে/আকার সাকার হইল সে।/যেজন দিব্যজ্ঞানী হয়/সেহি জানতে পায়/কলি যুগে হলো মানুষ অবতার।’— সেই নিরাকার পরম জ্যোতিই সৃষ্টির লীলা আস্বাদন করতে মানুষরূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। অর্থাৎ, অদৃশ্য ঈশ্বর বা সাঁই মানুষের মাঝেই আকার বা ‘সাকার’ রূপ নিয়ে দৃশ্যমান হন। মানব দেহকে তাই ঈশ্বরের আসল বসতি মনে করেন। তাই মানুষকে বাদ দিয়ে বা মানুষকে কষ্ট দিয়ে দূর আকাশের ঈশ্বরের আরাধনা করা নিরর্থক। মানুষের মাঝেই পরমাত্মা অবতার রূপে বিরাজ করছেন। লালন বলছেন, যিনি ‘দিব্যজ্ঞানী’ গুরু অর্থাৎ পরম প্রভুর দয়ায় যাঁর ভেতরের আধ্যাত্মিক চোখ খুলে গেছে, কেবল তিনিই পরম সত্যটি উপলব্ধি করতে পারেন, তিনিই কেবল তা জানতে পারেন। তাই কুতর্কের দোকান না খুলে বুঝতে হবে মানব দেহই অবতার অর্থাৎ স্রষ্টার প্রতিনিধি। যিনি নিরাকার জ্যোতি, তিনিই সাকার মানুষ। তাই ঈশ্বরকে পেতে হলে মানুষের প্রতি ভক্তি রাখতে হবে এবং গুরুর শরণাপন্ন হয়ে সেই দিব্যজ্ঞান লাভ করতে হবে।

‘আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে / দেখ না রে মন ভেয়ে।/ দেশ দেশান্তর দৌড়ে এবার/মরছো কেন হাঁপিয়ে।’ — লালন তাঁর নিজের মনকে সম্বোধন করে বলছেন যে, পরম পবিত্র স্থান ‘মক্কা’ মূলত মানুষের এই দেহের ভেতরেই বিদ্যমান। মানুষ সত্য বা সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে দেশ থেকে দেশান্তরে (যেমন মক্কা-মদিনা বা তীর্থস্থানে) ছুটে বেড়ায় এবং ক্লান্ত হয়ে হাঁপিয়ে মরে। কিন্তু আসল সত্য তো নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে, যা মানুষ চোখ মেলে (অনুভব করে) দেখে না। লালনের ভাবনায়— ঈশ্বর কোনো দূর আকাশে বা পাথরের দালানে বসবাস করেন না। মানুষের পবিত্র দেহই হচ্ছে আসল উপাসনালয় বা মক্কা। নিজের কুপ্রবৃত্তি দূর করে গুরুর সাহায্যে অন্তরে ডুব দিলে পরমাত্মার দেখা পাওয়া সম্ভব। ‘আপনারে আপনি চেনা যদি যায়/তবে তারে চিনতে পারি সেই পরিচয়।/উপরওয়ালা সদয় বাড়ি,/আত্মারূপে অবতারি,/মনের ঘোরে চিনতে নারি/কিসে কি হয়।’— এখানে লালন বলেছেন— মানুষ যদি নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে পারে, তবে পরম সত্তা বা স্রষ্টাকেও উপলব্ধি করা সম্ভব। কিন্তু অজ্ঞতা, মনের বিভ্রান্তি ও সংসারের মায়ার কারণে মানুষ নিজের অন্তর্নিহিত পরিচয় সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না। বাহ্যিক দেহ ও পরিচয়ের ভিন্নতার আড়ালে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার গভীর ঐক্য রয়েছে। তাই লালনের মূল বক্তব্য হলো— নিজেকে সত্যভাবে চেনাই আত্মউপলব্ধির প্রধান পথ, আর সেই আত্মউপলব্ধির মধ্য দিয়েই জীবনের গভীর সত্য ও পরম সত্তাকে চেনা সম্ভব। একই সুরে লালন আরও বলেন— ‘ও যার আপন খবর আপনার হয় না/একবার আপনারে চিনতে পারলে রে/যাবে অচেনারে চেনা, যাবে অচেনারে চেনা।— আত্মরূপে কর্তা হরি, মনে নিষ্ঠা হলে মিলবে তার ঠিকানা/ও তুই বেদ-বেদান্ত পড়বি যত রে ও তোর বাড়বে তত লখ্না।’ —মানুষ সাধারণত বাইরের জগৎ, শাস্ত্র ও নানা জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে পরম সত্যকে খুঁজে বেড়ায়; অথচ নিজের অন্তরের সত্যকে চিনতে না পারলে সেই জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে না। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে পারে, তখন তার কাছে এত দিন অচেনা ও দুর্বোধ্য সত্যও পরিচিত হয়ে ওঠে।

লালনের মতে, আত্মরূপেই কর্তার (স্রষ্টার) প্রকাশ। মনের মধ্যে সত্যের প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতা জন্মালে মানুষ নিজের অন্তরেই সেই পরম সত্তার সন্ধান পেতে পারে। তাই কেবল বেদ-বেদান্ত বা ধর্মগ্রন্থ পাঠ করলেই আত্মজ্ঞান অর্জিত হয় না; বরং অতিরিক্ত গ্রন্থগত জ্ঞান অনেক সময় মানুষের মধ্যে জ্ঞানের অহংকার ও বিভ্রান্তিই বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রকৃত জ্ঞান হলো নিজের অন্তরকে জানা, নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করা এবং সেই আত্মসত্যের মধ্য দিয়ে পরম সত্যকে চিনে নেওয়া। লালন বলেছেন— ‘আপনারে আপনি চিনিনে।/দিন দোনের পর যার নাম অধরতারে চিনবো কেমনে।/আপনারে চিনতাম যদি মিলতো অটলচরণনিধি।/মানুষের করণ হতো সিদ্ধি শুনি আগম পুরাণে।’ —পরম সত্যকে জানার আগে মানুষকে নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে হবে। বাহ্যিক পরিচয়, আচার বা শুধু শাস্ত্রজ্ঞান নয়— নিজের অন্তর্জগতের অনুসন্ধান ও আত্মতত্ত্বের উপলব্ধির মধ্য দিয়েই সত্যজ্ঞান লাভ করা সম্ভব। লালনের এই দর্শনে আত্মজ্ঞানই পরমতত্ত্ব উপলব্ধির প্রধান দ্বার। ‘দিব্যজ্ঞানী যেজন হলো নিজতত্ত্বে নিরঞ্জন পেলো।/সিরাজ সাঁই কয় লালন রইলো জন্ম অন্ধ মন গুনে।’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি দিব্যজ্ঞান অর্জন করেন, তিনি নিজের স্বরূপের নির্মল সত্য উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু আত্মজ্ঞান থেকে বঞ্চিত মানুষ ‘জন্ম অন্ধ মন গুনে’— অর্থাৎ চোখে দেখতে পেলেও অন্তর্দৃষ্টির অভাবে সত্যকে চিনতে পারে না।

লালনের দর্শনে দেহ একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর দেহতত্ত্বে মানবদেহকে নিছক শরীর হিসেবে দেখা হয়নি; বরং দেহের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সাধনার রহস্য ও পরম সত্যের সন্ধান। মানুষের জন্ম, দেহের গঠন, প্রাণের প্রবাহ এবং দেহের অন্তর্লীন রহস্য নিয়ে তাঁর বহু গান রচিত হয়েছে। তবে তাঁর দেহতত্ত্বকে কেবল শারীরিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করলে লালনের সাধনাদর্শনের গভীরতা অনুধাবন করা যায় না। দেহ তাঁর কাছে আত্মপরিচয় ও সৃষ্টির রহস্য অন্বেষণের একটি ক্ষেত্র।

‘এই মানুষে সেই মানুষ আছে,/কতো মুনি-ঋষি-যোগী-তপস্বী তারে খুঁজে বেড়াচ্ছে।/জলে যেমন চাঁদ দেখা যায়, ধরতে গেলে হাতে কে পায়?/আলেক মানুষ অমনি সদাই,/আছে আলেকে বসে।’ —লালনের দর্শনের এই মর্মবোধে দেহ ও আত্মার সম্পর্ক নতুন তাৎপর্য লাভ করে। যে সত্যকে মানুষ দূর আকাশে, তীর্থে বা বহির্জগতে খুঁজে বেড়ায়, তার সন্ধান নিজের অস্তিত্বের মধ্যেই সম্ভব। এই কারণে তাঁর সাধনা আত্মঅনুসন্ধানী এবং একই সঙ্গে গভীরভাবে মানবকেন্দ্রিক।

লালনের মানবধর্ম নতুন কোনো বিষয় নয় বরং খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ অব্দে সক্রেটিস এর ‘নিজেকে জানো’ বাণীটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। প্লেটোর দর্শনে ‘নিজেকে জানা’ মানে কেবল শরীরকে জানা নয়, বরং নিজের আত্মাকে জানা। শরীর নশ্বর, কিন্তু আত্মা অমর এবং পরম সত্যের অংশ। চতুর্দশ শতকের বাঙালি কবি বড়ু চণ্ডীদাস বলেছেন— ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। পঞ্চদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ভারতীয় মরমি কবি ও সাধক সন্ত কবীর (১৩৯৮-১৫১৮) বলেছেন— ‘কস্তুরী কুণ্ডল বসৈ, মৃগ ঢূঁঢৈ বন মাহি।/ঐসে ঘটি-ঘটি রাম হ্যায়, দুনিয়া দেখৈ নাহি॥’ —হরিণ যেমন নিজের নাভিতে থাকা কস্তুরীর সুগন্ধ চিনতে না পেরে তা সারা বনে খুঁজে বেড়ায়, ঠিক তেমনি সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষের ভেতরেই বাস করেন। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে মানুষ তা দেখতে পায় না এবং বাইরে খুঁজে ফেরে। কবীর আরও বলেছেন— ‘জো তিল মাহী তেল হৈ, জু্যঁ চকমক মেঁ আগি।/তেরা সাঁঈ তুঝ মেঁ হৈ, জাগি সকে তো জাগি॥’ অর্থাৎ তিলের ভেতরে যেমন তেল লুকিয়ে থাকে এবং চকমকি পাথরের ভেতরে যেমন আগুন লুকিয়ে থাকে, ঠিক তেমনি তোমার প্রভু তোমার নিজের ভেতরেই আছেন। যদি তোমার সেই জ্ঞান বা চেতনা থাকে, তবে তা জাগ্রত করে নিজের ভেতরেই তাঁকে চিনে নাও।

তবে লালনের মানবধর্ম সক্রেটিস, প্লেটো, বড়ু চণ্ডীদাস কিংবা সন্ত কবীর থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মতবাদ নয় বরং লালনের মানবধর্মের সঙ্গে তাঁদের আত্মসন্ধান ও অন্তর্লীন সত্যের অনুসন্ধানের একটি গভীর ভাবগত সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। এ মর্মার্থ হলো আত্মসন্ধান, দেহতত্ত্ব, সাধনা ও অন্তরের পরিশুদ্ধি। তাই লালনের মানুষভজনা একই সঙ্গে নৈতিক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক সাধনা।

লালনের মানবধর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো— তিনি মানুষকে কোনো পরিচয়ের অধীন করেননি; বরং পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর কাছে মানুষই ছিল সাধনার ক্ষেত্র, মানুষই ছিল সত্যের সন্ধানের পথ এবং মানুষের মধ্যেই ছিল সেই ‘অচিন মানুষ’-এর অবস্থান। দেহতত্ত্বের গভীর অনুসন্ধান তাঁকে শিখিয়েছে নিজের অস্তিত্বের ভেতরেই পরম সত্যকে খুঁজতে; আর মানবপ্রেম তাঁকে শিখিয়েছে অন্য মানুষের মধ্যে সেই একই সত্যকে সম্মান করতে। ফলে লালনের ‘মানুষ ভজনা’ কোনো নিছক কাব্যিক অভিব্যক্তি নয়, এটি আত্মপরিচয়, মানবমর্যাদা ও মুক্তির এক সমন্বিত দর্শন। আজকের পৃথিবীতে যখন ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও পরিচয়ের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হয়, তখন লালনের বাণী আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষকে ছোট করে কোনো মহত্তর সত্যকে পাওয়া যায় না, মানুষকে ঘৃণা করে কোনো সাধনা পূর্ণ হয় না। তাই লালনের প্রকৃত শিক্ষা বাহ্যিক পরিচয়ের অহংকার পেরিয়ে মানুষের মধ্যে মানুষকে দেখতে শেখা, তবে সেই পথেই ‘সোনার মানুষ’ হওয়া সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬


লালনের মানবধর্ম: মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি

প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া খ্যাপা রে তুই মূল হারাবি ॥’

বাংলার লোকসংস্কৃতি ও সাধন-সাহিত্যের ইতিহাসে যে ক’জন সাধক কবি মানবতার সর্বজনীন দর্শন নির্মাণ করেছেন, লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০) তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি; তাঁর সাধনার কেন্দ্র ছিল মানুষ এবং মানুষের অন্তর্নিহিত সত্য। সমাজ যখন মানুষকে জাত, বর্ণ, ধর্ম ও বাহ্যিক নানা পরিচয়ের সীমারেখায় বিভক্ত করেছিল, লালন তখন প্রশ্ন তুলেছেন-মানুষের আসল পরিচয় কোথায়? লালন তার গানের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও সামাজিক পরিচয়ের কৃত্রিম বিভাজনের বিপরীতে মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তাঁর সাধনার কেন্দ্র ছিল মানুষের অন্তর্লীন সত্য; মানুষের মধ্য দিয়েই তিনি পরম সত্তার সন্ধান করেছেন। নিজের দেহ ও অন্তরের রহস্যকে উপলব্ধি করে মানুষের মধ্যে নিহিত অসীম সত্তাকে চিনে নেওয়াই তাঁর সাধনার মূল লক্ষ্য। তাই তাঁর মানবধর্মের মূলকথা মানুষের মধ্যে পরমের সন্ধান এবং মানুষকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আত্মিক সত্যের উপলব্ধি। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।/মানুষ ছাড়া খ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’ —এই বাণীতে তাঁর সমগ্র মানবদর্শনের সারকথা যেন ধ্বনিত হয়েছে। মানুষকে অবহেলা, অপমান করলে ঈশ্বরের আরাধনা মহান সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে সত্য খোঁজা ছাড়া আর কিছুই নয়। লালনের মানবধর্ম নিছক মানবতাবাদ নয়; এটি মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক গভীর জীবনদর্শন, যা আজও বিভক্ত সমাজের সামনে মানবমুক্তির এক শক্তিশালী পথনির্দেশ হিসেবে উপস্থিত।

লালনের কাছে মানুষ কেবল সামাজিক জীব নয়; মানুষই সত্যের আধার। তাঁর বিখ্যাত প্রশ্ন— ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’, অথবা ‘লালন ফকির কোন জাতের ছেলে?’ জাতপরিচয়ের প্রচলিত ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। জন্মের পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না— এই উপলব্ধিই তাঁর মানবধর্মের ভিত্তি। মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করাই তাঁর সাধনার প্রথম শর্ত।

লালনের দর্শনে মানবপ্রেম কোনো নিছক সামাজিক নীতিবাক্য নয়; এটি আত্মসন্ধানের পথ। তাই যে মানুষের ভেতর পরমাত্মা বিরাজ করে সেই মানুষকে অবহেলা, অসম্মান করে কোনো সাধনায়-ই সিদ্ধি লাভ হবে না। লালন বলেছেন— ‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার’— লালন সাঁইয়ের এই আধ্যাত্মিক বাণীটি বাউল দর্শনের অন্যতম মূল স্তম্ভ ‘গুরুবাদ’ এবং ‘নরতত্ত্ব’ (Humanism) এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। লালনের কাছে ঈশ্বর সাধনার সর্বোচ্চ মাধ্যম হলো মানুষ। বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বা শুধু শাস্ত্রজ্ঞানের মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়া যায় না। যিনি প্রকৃত গুরুর নির্দেশিত পথে চলে নিজের মনকে শুদ্ধ করতে পারেন এবং মানুষের সেবা করতে পারেন, তিনিই জীবনের পরম সত্য বা আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করেন।

লালনের দর্শনে দেহ একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর দেহতত্ত্বে মানবদেহকে নিছক শরীর হিসেবে দেখা হয়নি; বরং দেহের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সাধনার রহস্য ও পরম সত্যের সন্ধান। মানুষের জন্ম, দেহের গঠন, প্রাণের প্রবাহ এবং দেহের অন্তর্লীন রহস্য নিয়ে তাঁর বহু গান রচিত হয়েছে। দেহ তাঁর কাছে আত্মপরিচয় ও সৃষ্টির রহস্য অন্বেষণের একটি ক্ষেত্র।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মাঝেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল রহস্য লুকিয়ে আছে (যা বাউলতত্ত্বে ‘যা নেই ভাণ্ডে, তা নেই ব্রহ্মাণ্ডে’ বলে পরিচিত)। গুরুর প্রতি নিষ্ঠা রাখার অর্থ হলো মানুষের প্রতি নিষ্ঠা ও ভালোবাসা রাখা। মানুষকে ভালোবাসার মাধ্যমেই পরমাত্মাকে পাওয়া সম্ভব— এটাই এই দর্শনের মূল কথা। ‘নদী কিংবা বিল বাওড় খাল, সর্বস্থলে একই এক জল।/একা মেরে সাঁই ফেরে সর্ব ঠাঁই, মানুষে মিশিয়ে হয় বেদান্তর।’ গানে নদীর জলের সাথে বিল বা খালের জলের যে তুলনা লালন এনেছেন, তা মূলত অদ্বৈতবাদের প্রতীক। নদী, বিল বা খালের জল দেখতে আলাদা মনে হলেও মূলগতভাবে তা একই জল। একইভাবে, পৃথিবীতে ধর্মে বর্ণে, গোত্রে বা আচারে নানা রূপভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সকল সৃষ্টির পেছনে পরম সত্য বা স্রষ্টা একজনই। লালন বলেছেন— ‘নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে/আকার সাকার হইল সে।/যেজন দিব্যজ্ঞানী হয়/সেহি জানতে পায়/কলি যুগে হলো মানুষ অবতার।’— সেই নিরাকার পরম জ্যোতিই সৃষ্টির লীলা আস্বাদন করতে মানুষরূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। অর্থাৎ, অদৃশ্য ঈশ্বর বা সাঁই মানুষের মাঝেই আকার বা ‘সাকার’ রূপ নিয়ে দৃশ্যমান হন। মানব দেহকে তাই ঈশ্বরের আসল বসতি মনে করেন। তাই মানুষকে বাদ দিয়ে বা মানুষকে কষ্ট দিয়ে দূর আকাশের ঈশ্বরের আরাধনা করা নিরর্থক। মানুষের মাঝেই পরমাত্মা অবতার রূপে বিরাজ করছেন। লালন বলছেন, যিনি ‘দিব্যজ্ঞানী’ গুরু অর্থাৎ পরম প্রভুর দয়ায় যাঁর ভেতরের আধ্যাত্মিক চোখ খুলে গেছে, কেবল তিনিই পরম সত্যটি উপলব্ধি করতে পারেন, তিনিই কেবল তা জানতে পারেন। তাই কুতর্কের দোকান না খুলে বুঝতে হবে মানব দেহই অবতার অর্থাৎ স্রষ্টার প্রতিনিধি। যিনি নিরাকার জ্যোতি, তিনিই সাকার মানুষ। তাই ঈশ্বরকে পেতে হলে মানুষের প্রতি ভক্তি রাখতে হবে এবং গুরুর শরণাপন্ন হয়ে সেই দিব্যজ্ঞান লাভ করতে হবে।

‘আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে / দেখ না রে মন ভেয়ে।/ দেশ দেশান্তর দৌড়ে এবার/মরছো কেন হাঁপিয়ে।’ — লালন তাঁর নিজের মনকে সম্বোধন করে বলছেন যে, পরম পবিত্র স্থান ‘মক্কা’ মূলত মানুষের এই দেহের ভেতরেই বিদ্যমান। মানুষ সত্য বা সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে দেশ থেকে দেশান্তরে (যেমন মক্কা-মদিনা বা তীর্থস্থানে) ছুটে বেড়ায় এবং ক্লান্ত হয়ে হাঁপিয়ে মরে। কিন্তু আসল সত্য তো নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে, যা মানুষ চোখ মেলে (অনুভব করে) দেখে না। লালনের ভাবনায়— ঈশ্বর কোনো দূর আকাশে বা পাথরের দালানে বসবাস করেন না। মানুষের পবিত্র দেহই হচ্ছে আসল উপাসনালয় বা মক্কা। নিজের কুপ্রবৃত্তি দূর করে গুরুর সাহায্যে অন্তরে ডুব দিলে পরমাত্মার দেখা পাওয়া সম্ভব। ‘আপনারে আপনি চেনা যদি যায়/তবে তারে চিনতে পারি সেই পরিচয়।/উপরওয়ালা সদয় বাড়ি,/আত্মারূপে অবতারি,/মনের ঘোরে চিনতে নারি/কিসে কি হয়।’— এখানে লালন বলেছেন— মানুষ যদি নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে পারে, তবে পরম সত্তা বা স্রষ্টাকেও উপলব্ধি করা সম্ভব। কিন্তু অজ্ঞতা, মনের বিভ্রান্তি ও সংসারের মায়ার কারণে মানুষ নিজের অন্তর্নিহিত পরিচয় সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না। বাহ্যিক দেহ ও পরিচয়ের ভিন্নতার আড়ালে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার গভীর ঐক্য রয়েছে। তাই লালনের মূল বক্তব্য হলো— নিজেকে সত্যভাবে চেনাই আত্মউপলব্ধির প্রধান পথ, আর সেই আত্মউপলব্ধির মধ্য দিয়েই জীবনের গভীর সত্য ও পরম সত্তাকে চেনা সম্ভব। একই সুরে লালন আরও বলেন— ‘ও যার আপন খবর আপনার হয় না/একবার আপনারে চিনতে পারলে রে/যাবে অচেনারে চেনা, যাবে অচেনারে চেনা।— আত্মরূপে কর্তা হরি, মনে নিষ্ঠা হলে মিলবে তার ঠিকানা/ও তুই বেদ-বেদান্ত পড়বি যত রে ও তোর বাড়বে তত লখ্না।’ —মানুষ সাধারণত বাইরের জগৎ, শাস্ত্র ও নানা জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে পরম সত্যকে খুঁজে বেড়ায়; অথচ নিজের অন্তরের সত্যকে চিনতে না পারলে সেই জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে না। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে পারে, তখন তার কাছে এত দিন অচেনা ও দুর্বোধ্য সত্যও পরিচিত হয়ে ওঠে।

লালনের মতে, আত্মরূপেই কর্তার (স্রষ্টার) প্রকাশ। মনের মধ্যে সত্যের প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতা জন্মালে মানুষ নিজের অন্তরেই সেই পরম সত্তার সন্ধান পেতে পারে। তাই কেবল বেদ-বেদান্ত বা ধর্মগ্রন্থ পাঠ করলেই আত্মজ্ঞান অর্জিত হয় না; বরং অতিরিক্ত গ্রন্থগত জ্ঞান অনেক সময় মানুষের মধ্যে জ্ঞানের অহংকার ও বিভ্রান্তিই বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রকৃত জ্ঞান হলো নিজের অন্তরকে জানা, নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করা এবং সেই আত্মসত্যের মধ্য দিয়ে পরম সত্যকে চিনে নেওয়া। লালন বলেছেন— ‘আপনারে আপনি চিনিনে।/দিন দোনের পর যার নাম অধরতারে চিনবো কেমনে।/আপনারে চিনতাম যদি মিলতো অটলচরণনিধি।/মানুষের করণ হতো সিদ্ধি শুনি আগম পুরাণে।’ —পরম সত্যকে জানার আগে মানুষকে নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে হবে। বাহ্যিক পরিচয়, আচার বা শুধু শাস্ত্রজ্ঞান নয়— নিজের অন্তর্জগতের অনুসন্ধান ও আত্মতত্ত্বের উপলব্ধির মধ্য দিয়েই সত্যজ্ঞান লাভ করা সম্ভব। লালনের এই দর্শনে আত্মজ্ঞানই পরমতত্ত্ব উপলব্ধির প্রধান দ্বার। ‘দিব্যজ্ঞানী যেজন হলো নিজতত্ত্বে নিরঞ্জন পেলো।/সিরাজ সাঁই কয় লালন রইলো জন্ম অন্ধ মন গুনে।’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি দিব্যজ্ঞান অর্জন করেন, তিনি নিজের স্বরূপের নির্মল সত্য উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু আত্মজ্ঞান থেকে বঞ্চিত মানুষ ‘জন্ম অন্ধ মন গুনে’— অর্থাৎ চোখে দেখতে পেলেও অন্তর্দৃষ্টির অভাবে সত্যকে চিনতে পারে না।

লালনের দর্শনে দেহ একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর দেহতত্ত্বে মানবদেহকে নিছক শরীর হিসেবে দেখা হয়নি; বরং দেহের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সাধনার রহস্য ও পরম সত্যের সন্ধান। মানুষের জন্ম, দেহের গঠন, প্রাণের প্রবাহ এবং দেহের অন্তর্লীন রহস্য নিয়ে তাঁর বহু গান রচিত হয়েছে। তবে তাঁর দেহতত্ত্বকে কেবল শারীরিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করলে লালনের সাধনাদর্শনের গভীরতা অনুধাবন করা যায় না। দেহ তাঁর কাছে আত্মপরিচয় ও সৃষ্টির রহস্য অন্বেষণের একটি ক্ষেত্র।

‘এই মানুষে সেই মানুষ আছে,/কতো মুনি-ঋষি-যোগী-তপস্বী তারে খুঁজে বেড়াচ্ছে।/জলে যেমন চাঁদ দেখা যায়, ধরতে গেলে হাতে কে পায়?/আলেক মানুষ অমনি সদাই,/আছে আলেকে বসে।’ —লালনের দর্শনের এই মর্মবোধে দেহ ও আত্মার সম্পর্ক নতুন তাৎপর্য লাভ করে। যে সত্যকে মানুষ দূর আকাশে, তীর্থে বা বহির্জগতে খুঁজে বেড়ায়, তার সন্ধান নিজের অস্তিত্বের মধ্যেই সম্ভব। এই কারণে তাঁর সাধনা আত্মঅনুসন্ধানী এবং একই সঙ্গে গভীরভাবে মানবকেন্দ্রিক।

লালনের মানবধর্ম নতুন কোনো বিষয় নয় বরং খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ অব্দে সক্রেটিস এর ‘নিজেকে জানো’ বাণীটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। প্লেটোর দর্শনে ‘নিজেকে জানা’ মানে কেবল শরীরকে জানা নয়, বরং নিজের আত্মাকে জানা। শরীর নশ্বর, কিন্তু আত্মা অমর এবং পরম সত্যের অংশ। চতুর্দশ শতকের বাঙালি কবি বড়ু চণ্ডীদাস বলেছেন— ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। পঞ্চদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ভারতীয় মরমি কবি ও সাধক সন্ত কবীর (১৩৯৮-১৫১৮) বলেছেন— ‘কস্তুরী কুণ্ডল বসৈ, মৃগ ঢূঁঢৈ বন মাহি।/ঐসে ঘটি-ঘটি রাম হ্যায়, দুনিয়া দেখৈ নাহি॥’ —হরিণ যেমন নিজের নাভিতে থাকা কস্তুরীর সুগন্ধ চিনতে না পেরে তা সারা বনে খুঁজে বেড়ায়, ঠিক তেমনি সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষের ভেতরেই বাস করেন। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে মানুষ তা দেখতে পায় না এবং বাইরে খুঁজে ফেরে। কবীর আরও বলেছেন— ‘জো তিল মাহী তেল হৈ, জু্যঁ চকমক মেঁ আগি।/তেরা সাঁঈ তুঝ মেঁ হৈ, জাগি সকে তো জাগি॥’ অর্থাৎ তিলের ভেতরে যেমন তেল লুকিয়ে থাকে এবং চকমকি পাথরের ভেতরে যেমন আগুন লুকিয়ে থাকে, ঠিক তেমনি তোমার প্রভু তোমার নিজের ভেতরেই আছেন। যদি তোমার সেই জ্ঞান বা চেতনা থাকে, তবে তা জাগ্রত করে নিজের ভেতরেই তাঁকে চিনে নাও।

তবে লালনের মানবধর্ম সক্রেটিস, প্লেটো, বড়ু চণ্ডীদাস কিংবা সন্ত কবীর থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো মতবাদ নয় বরং লালনের মানবধর্মের সঙ্গে তাঁদের আত্মসন্ধান ও অন্তর্লীন সত্যের অনুসন্ধানের একটি গভীর ভাবগত সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। এ মর্মার্থ হলো আত্মসন্ধান, দেহতত্ত্ব, সাধনা ও অন্তরের পরিশুদ্ধি। তাই লালনের মানুষভজনা একই সঙ্গে নৈতিক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক সাধনা।

লালনের মানবধর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো— তিনি মানুষকে কোনো পরিচয়ের অধীন করেননি; বরং পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর কাছে মানুষই ছিল সাধনার ক্ষেত্র, মানুষই ছিল সত্যের সন্ধানের পথ এবং মানুষের মধ্যেই ছিল সেই ‘অচিন মানুষ’-এর অবস্থান। দেহতত্ত্বের গভীর অনুসন্ধান তাঁকে শিখিয়েছে নিজের অস্তিত্বের ভেতরেই পরম সত্যকে খুঁজতে; আর মানবপ্রেম তাঁকে শিখিয়েছে অন্য মানুষের মধ্যে সেই একই সত্যকে সম্মান করতে। ফলে লালনের ‘মানুষ ভজনা’ কোনো নিছক কাব্যিক অভিব্যক্তি নয়, এটি আত্মপরিচয়, মানবমর্যাদা ও মুক্তির এক সমন্বিত দর্শন। আজকের পৃথিবীতে যখন ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও পরিচয়ের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হয়, তখন লালনের বাণী আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষকে ছোট করে কোনো মহত্তর সত্যকে পাওয়া যায় না, মানুষকে ঘৃণা করে কোনো সাধনা পূর্ণ হয় না। তাই লালনের প্রকৃত শিক্ষা বাহ্যিক পরিচয়ের অহংকার পেরিয়ে মানুষের মধ্যে মানুষকে দেখতে শেখা, তবে সেই পথেই ‘সোনার মানুষ’ হওয়া সম্ভব।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত