সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ১৯

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৯ পিএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

নয়.

কমলা খাতুন উত্তরের দরজার মুখে একটা চাটাই টেনে বসে শিমের বিচির খোসা ছাড়াচ্ছে। সকালের দিকে সে তিন মুঠো শিমের বিচি ছিক্কা থেকে নামিয়ে সিলভারের পাতিলে ভিজিয়ে রেখেছিল। সেগুলোই এখন ছিলছে। পাতিলের জলে সারাদিন ভিজিয়ে রাখাতে শিমের বিচিগুলো বেশ ফুলে উঠেছে। বিচিগুলোর খোসা ছাড়াতে তার তেমন সমস্যা হচ্ছে না। নখের খোঁচায় অনায়েসেই ছিলে যাচ্ছে।

কমলা খাতুন চাটাইর উপর বসেছে কোলাব্যাঙের আকৃতি ধারণ করে। ধনুকের মতো পৃষ্ঠদেশ, ঘাড় ও মাথা। দৃষ্টিটা শিমের বিচির পাতিলে নিবন্ধ। হঠাৎ হঠাৎ যখন দৃষ্টিটা উঠছে, তখনই সে দেহের বাঁকানো ভঙ্গি ছেড়ে দরজার কপাটে হেলান দিয়ে পৃষ্ঠদেশটা সপে দিচ্ছে। দৃষ্টিটা ক্ষণিকের জন্য টান টান করে কখনও উঠোনের জমাজল দেখছে, কখনও আকাশ দেখছে। গাছগাছালির ফাঁক গলে দূরের উত্তরেও তার দৃষ্টিটা গিয়ে পড়ছে। আজ সকাল থেকেই খুব বৃষ্টি হচ্ছে। অবশ্য বৃষ্টিটা শুধু আজ সকাল থেকেই নয়, গত তিনদিন ধরেই বিরামহীন হচ্ছে। কখনও তুমুল ধারায়, কখনও ঝিরিঝিরি। বৃষ্টি দু-চারবার যে থামেনি, তা নয়। কিন্তু গত তিনদিনে একবারও রোদ ওঠেনি।

এখন অবশ্য বৃষ্টি নেই। বৃষ্টিটা বেশ কিছুক্ষণ আগেই থেমে গেছে। তবে এখনও কোনো রোদ ওঠেনি। এদিকে বিকেলটা প্রায় পড়ে এসেছে। রোদ না ওঠার কারণে সময়টা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। দরজার সামনে স্পষ্টত আলো থাকলেও ঘরের ভেতর একধরনের অন্ধকার ছায়া করে রেখেছে। আজকাল গ্রামে একেবারেই বিদ্যুৎ থাকে না। বৃষ্টি হলে তো আরও না। তাই প্রতিটি বাড়িতে সন্ধ্যা হলেই কুপি বা হারিকেন জ্বালাতে হয়।

কমলা খাতুন আবার আকাশ দেখল। আকাশে মেঘ করে রেখেছে বলে সময়টা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে বিকেলটা যে পড়ে এসেছে, সেটা স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে। উঠোনের ঠিক বুক বরাবর থকথকে কাদা, গোপাট ঘেঁষে বৃষ্টির জমাজল ও গোপাটের পাশে বেড়ে ওঠা কচুগাছ— সর্বত্রই দিনের আলো কমে আসছে। কচুগাছের ভেতর থেকে ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, কটর কটর ডাক, উত্তরের কোনো বাড়ির গোয়াল ঘর থেকে গরুর হাম্বা-অ-অ ডাক ও একটা গাছের মগডালে বসা কাকের অনবরত ডাকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আহ্বানেরই লক্ষণ।

কমলা খাতুন দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘরের ভেতরটাও দেখল। ঘরের ভেতর একধরনের আবছা অন্ধকার থমকে আছে। সে উঠে গিয়ে হারিকেনটা জ্বালাবে কি না, ভাবল। কিন্তু পরক্ষণ ভাবল, এত আগে হারিকেন জ্বালিয়ে কেরোসিন পুড়িয়ে কী লাভ। ঘরে তার ছেলে মনসুর পাগলা থাকলে অন্যকথা ছিল। ছেলের জন্য সে আজকাল আগ বাড়িয়ে অনেক কিছুই করে। এই যে শিমের বিচি খোসা ছাড়াচ্ছে, এটাও তার ছেলের জন্যই। আগামীকাল কই মাছ দিয়ে এই শিমের বিচিগুলো ভুনা করে রান্না করবে। গতকালই মীরবহরি বাজার থেকে তার ছেলে জ্যান্ত কই মাছগুলো কিনে নিয়ে এসেছে। এখন সেগুলো পিছদোরের দরজার পাশে মটকায় জিয়ল দেওয়া আছে।

কমলা খাতুন ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে দরজা থেকে দৃষ্টি বাড়িয়ে গোপাটের দিকে তাকাল। তাদের নৌকাটা গোপাটের কাছেই বুইদ্দার খালে আমগাছের সঙ্গে বাঁধা থাকে। বৃষ্টিটা ধরে আসতেই তার ছেলে খাল ধরে সেই যে নৌকাটা নিয়ে বের হয়েছে, এখনও ফিরেনি। আজকাল ছেলের জন্য তার ভেতরে বেশ নাড়া দেয়। ফেরার অপেক্ষায় থাকে। ছেলের পছন্দের খাবার রান্না করে ও কাপড়চোপড় ধুয়ে দেয়। যদিও তার বয়স হয়েছে, শরীরে জোর পায় না। কোমরটা আস্তে আস্তে বেঁকে যাচ্ছে। তারপরও মনে মনে সে অধিক শক্তি সঞ্চয় করে। শরীরের অধিক মনের শক্তি।

কমলা খাতুন ভাবল, মনের শক্তি তো অবশ্যই। তবে সে এখনও ছেলেকে বেশ ভয় পায়। তাই ছেলের সঙ্গে আগের মতোই কথা খুব কম বলে ঠ্যাঁটা মেরে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু ছেলে তার সঙ্গে খুব কথা বলার চেষ্টা করে। আগ বাড়িয়ে মীরবহরি বাজার থেকে বাজারসদাই করে নিয়ে আসে। তার জন্য বাজার থেকে এটাসেটা কিনে আনে। কখনও গুড়ের জিলাপি, কখনও বড় বড় রসগোল্লা, কখনও বা তিলের মোয়া। তিলের মোয়া সে খেতে পারে না, তারপরও সে খুশি হয়।

কমলা খাতুনের আরেকটা জিনিস ভালো লাগে, তার ছেলে আজকাল জমিজমাগুলো ঠিকমতো দেখাশোনা করে। সকাল-দুপুর জমিগুলোতে যায়। তাদের জমি তো একেবারে কম নয়। সেই দুই যুগ আগে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক তোলাও সে বিক্রি করেনি। অবশ্য তার বিক্রি করার প্রয়োজনও পড়েনি। এছাড়া তার আরেকটা জিনিস ভালো লাগে, তার ছেলে আজকাল কোনো পাগলামি করে না। জেল থেকে বের হওয়ার পর ছেলের মধ্যে বেশ পরিবর্তন এসেছে। ছেলে খুব আন্তরিক হয়ে ‘মা’ ডাকে। সেই ডাক শুনে তার ভেতরটা শীতল হয়ে যায়।

কিন্তু তারপরও কমলা খাতুনের ছেলের ওপর থেকে ভয়টা যাচ্ছে না। তার মনে মাঝেমধ্যে এই আশঙ্কা এসে ভিড় করে, ছেলের যদি আবার পাগলামি শুরু হয়ে যায়! মাত্র তো ছয় মাস ধরে ছেলে এমন ভালো ব্যবহার করছে। দীর্ঘদিন, প্রায় দুই যুগ ধরে ছেলে এত পাগলামি ও খারাপ ব্যবহার করে আসছে, সেই আতঙ্ক কি এত সহজে যায়?- কমলা খাতুন মাথা নাড়ল। ভাবল, না, যায় না। ছেলের যখন দশ কি এগারো বছর, তখনই তার স্বামী আসমত আলী বেপারি মারা যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পরপরই ছেলে পাগলামি শুরু হয়। সেই সঙ্গে তার প্রতি খারাপ ব্যবহার। তারপরও পেটপোছা একমাত্র ছেলে তার।

ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে কমলা খাতুন দৃষ্টিটা সীমিত করে আবার শিমের বিচির খোসা ছাড়তে শুরু করল। এরই মধ্যে সে তিন ভাগের দুই ভাগ ছিলে ফেলেছে। সন্ধ্যার আলো জ্বালানোর আগেই সে সবগুলো শিম খোসা ছাড়িয়ে শেষ করতে পারবে বলে আশা করল।

কমলা খাতুন এবার শিমের বিচির খোসা ছাড়ানোয় হাত চালাতে গিয়ে কী ভেবে উঠোনের দিকে আবার দৃষ্টি ফেলল। ঠিক তখন সে দেখল, মমিনা পিছদোর দিয়ে এসে থকথকে কাদার উঠোন পেরিয়ে তার দিকে আসছে। কেমন বিধ্বস্ত চেহারা। চোখমুখ ফোলা। মমিনা যে এসময় তার ঘরে আসে না, তা নয়। প্রায়ই আসে। গতকাল বিকেলেও বৃষ্টি ভিজে একবার এসেছিল। কিন্তু আজ মমিনার আসাটা তার কাছে কেমন অন্য রকম লাগল।

কমলা খাতুন নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে, মমিনা, তোর চোখমুখ এমুন ফোলা ক্যান, তোর কি অসুখ কইরাছে?’

মমিনা ঘরের দাওয়ায় উঠতে উঠতে বলল, ‘বড়চাচি, আমার কপাল পুইড়াছে গো, আমার কপাল পুইড়াছে।’ বলেই সে ঘরে ঢুকে কমলা খাতুনের সামনে চাটাইতে ধপাস করে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।

কমলা খাতুন ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘আহা, কান্দে না। তুই কান্দিস না তো। আবার কী হইছে তোর?

মমিনা কান্না ধরে রেখেই বলল, ‘হেয় আরেকটা বিয়া করছে!’

‘হেয় কেডা, তোর জামাই?’

‘আর কেডায়, বড়চাচি, আর কেডায়!’

‘আরে ধুর-র, কী কস?’

‘হাছাই কইতাছি।’

‘তুই জানলি ক্যামনে?’

‘আমার বড়ভাই ফোন দিছিল’

‘শওকত ফোন দিছিল, কখন?’

‘আইজকা দুপুরে।’

‘শওকত জানলো ক্যামনে?’

‘বড়ভাই তারে চিটাগাং দেখছে। কাজীরদেউরি না কু’নে জানি।’

‘তোর জামাই অখন চিটাগাঙে?’

‘আর কী কইতাছি, বড়চাচি!’

‘তয় শওকত তারে চিনল ক্যামনে?’

‘ওমা কী কও, বড়ভাই আমার জামাইরে চিনব না?’

‘আমি ওইটা জিগাই নাই। আমি জিগাইতাছি, শওকত এত মানুষের মইধ্যে চিনল ক্যামনে? তার তো ভুল হইতে পারে?’

‘বড়ভাই যেমনে কইছে, তার তো ভুল হইবার কথা না। বড়ভাই নাকি হেরে ডাকও দিছে। হেয় ডাক শুইনা ঘাড় ফিরাইয়া তাকাইয়া রিকশা দিয়া চইলা গেছে।’

‘এইটা থাইকা তো বোঝা যায় না, তোর জামাই বিয়া করছে?’

‘না, বড়চাচি, বিয়া করছে তো। বড়ভাই তারে এক মাইয়ার হাত ধইরা রিকশায় বইসা থাকতে দেখছে। মাইয়ার পরনের শাড়ি আছিল। মাইয়াডার বউয়ের মতন ঘোমটা দিয়া রাখছিল।’

‘শওকত তারে ধরল না?’

‘ধরবে ক্যামনে? ধরনের আগেই চক্ষের পলকে রিকশা লইয়া চইলা গেছে।’

কমলা খাতুন মাথা ঝাঁকাল। এমনিই। একটু কী ভেবে বলল, ‘আমার কিন্তুক তারপরও সন্দেহ হয়। একটা মানুষ রিকশা দিয়া মাইয়ার লগে যাইব, হেইডা দেইখা মনে হইব হেয় বিয়া করছে। এইডা হইতে পারে না। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের লগে রিকশায় কইরা যাইতেই পারে।’

মমিনা একটু চুপ হয়ে গেল। সে একটু ধন্দে পড়ে গেল। ভাবল, তার বড়চাচি তো কথাটা ঠিকই বলেছে। একটা মেয়েমানুষের সঙ্গে রিকশা করে গেলেই তো আর বউ হয়ে যায় না। অন্য কেউ তো হতে পারে। তারপরও তার মনে এসে একটা কাঁটা বিঁধছে। তার স্বামী যদি বিয়েই না করবে, তাহলে ছয় মাস ধরে কোনো যোগাযোগ করছে না কেন? একবার ফোন তো দিতে পারত?

কমলা খাতুন নিজ থেকেই বলল, ‘শোন, মাথা থাইকা আজেবাজে চিন্তা দূর কর। ধইর্য ধর। আমার মনে হয় না, তোর জামাই এত তাড়াতাড়ি এমুন একটা আকাম করব। তোর লাইগা তার কত টান আছিল!’

মমিনা আস্তে করে বলল, ‘তারপরও। ছয়মাস হইয়া গেছে। কোনো খবর নাই। একটা ফোনও দেয় নাই। হেয় বিয়া করবারই পারে।’

কমলা খাতুন বলল, ‘মমিনা, ভাবলে অনেক কথাই ভাবন যায়। তোরে তো কইলাম, ধইর্য ধর।’

মমিনা একমুহূর্ত চুপ হয়ে গিয়ে হাহাকারের গলায় বলল, ‘আমার এই কপালডা এমুন পুড়ল, বড়চাচি, এমুন পুড়ল...!’ বলেই সে আবার কাঁদতে শুরু করল। এবার সে কাঁদছে নাক টেনে টেনে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।

কমলা খাতুন হাত বাড়িয়ে মমিনার মাথাটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে মুছতে মুছতে বলল, ‘কান্দে না, মমিনা, কান্দে না। জানস তো, তুই কান্দলে আমার বুক ফাইটা যায়। আমার মন কইতাছে, তোর জামাই আবার ফিরা আইব। তুই জামাই অত খারাপ না। মানুষটার ভিতরটা ভালা আছিল।’

মমিনা কান্না থামিয়ে মাথা ঝাঁকাল একবার। এমনিই। বড়চাচির কথাগুলো তার জন্য সত্যি বড় সান্ত্বনার। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘বড়চাচি, তোমার কথাগুলান যেন ঠিক হয়।’

কমলা খাতুন আশ্বস্তের গলায় বলল, ‘ঠিক হইব মমিনা, নিজের ওপর ভরসা রাখ।’ —বলেই কী ভেবে সে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, ‘মমিনা, তুই আইসা তো আমারে দেরি করাইয়া ফেললি।’

মমিনা জিজ্ঞেস করল, ‘কী দেরি, বড়চাচি?’

‘আমি ভাবতেছিলাম বাত্তিটা জ্বালানোর আগেই ছইয়ের দানাগুলান ছিইলা ফেলামু।’

‘ও, হেই কথা। আমি তোমার লগে হাত লাগাইতাছি। তাড়াতাড়ি হইয়া যাইব।’

‘তাই কর, হাত লাগা।’

‘তয় আন্ধাইর তো হইয়া আইতাছে। আগে বাত্তি জ্বালাইয়া লই?

‘হেইডাই ভালা হইব। হারিকেনের চিমনি মোছা আছে। তুই হুধা সইলতা ধরাইয়া লইয়া আয়। ম্যাচ হাড়িকেনডার কাছেই আছে।’

‘আইচ্ছা, বড়চাচি।’ু বলেই মমিনা বসা থেকে উঠে গেল।

হারিকেনটা ঘরের দক্ষিণের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা আছে। দিয়াশলাইর বাক্সটাও বেড়ায় গুঁজিয়ে রাখা। মমিনা হারিকেনটা নামিয়ে একটা দিয়াশলাইর কাঠি দিয়ে সলতেটা জ্বালিয়ে নিল।

কমলা খাতুন তখন দরজার কপাটে হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বাইরে সন্ধ্যাটা ধপাস করেই যেন নেমে গেছে। গোপাট থেকে অনবরত ব্যাঙের ডাক আসছে। সঙ্গে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। একটা ডাহুক ডাকছে- কোয়াক কোয়াক, কোয়াক কোয়াক।

মমিনা হারিকেনটা চাটাইর মাঝখানে রেখে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, ‘বড়চাচি, ছইয়ের দানা দিয়া কী ছালুন রান্ধবা?’

কমলা খাতুন বাইরে থেকে দৃষ্টিটা এনে মমিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছইয়ের দানা দিয়া কইমাস রান্ধমু।’

‘কসাইয়া রান্ধবা, নাকি ঝুল ঝুল কইরা?’

‘কসাইয়া ভুনা করমু।’

‘কার লাইগা রান্ধবা, ভাইজানের লাইগা?’

‘হ, আর কার লাইগা রান্ধমু।’

মমিনা অনেকক্ষণ পর এবার মৃদু হাসল। বলল, ‘তোমার পোলা ভালা হইয়া গেছে দেইখা আমার ভালা লাগে, বড়চাচি। অনেক ভালা লাগে।’

কমলা খাতুন মাথা ঝাঁকাল। মৃদু হাসলও। বিশেষ করে মমিনার হাসিটা তার ভালো লাগল।

মনসুর পাগলা এরই মধ্যে গোপাটের আমগাছে নৌকাটা বেঁধে উঠোন পেরিয়ে ঘরের দাওয়ার দিকে আসছে, সেটা কমলা খাতুন বা মমিনা কেউ খেয়াল করল না। সে দাওয়ায় উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করল, ‘কার কী ভালা লাগে?’

কমলা খাতুন একটু থতমত খেয়ে গেল। কিছু বলল না। ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিল।

মমিনা বলল, ‘তোমার পাগলামি চইলা গেছে দেইখা ভালা লাগে।’

মনসুর পাগলা ওদের পাশ কেটে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘হ, তোর তো ভালা লাগবই। তোরে যে আর দৌড়ানি দেই না!

মমিনা কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেল। উবু হয়ে শিমের বিচি ছিলতে ছিলতে বলল, ‘হ, তোমারে কইছে।’

মনসুর পাগলা শব্দ করে হাসল, হে হে, হে হে। সে কাছেই একটা চৌকির উপর বসল। বসেই সে একবার তার মা’র দিকে তাকাল। পরক্ষণ মমিনার দিকে।

যদিও উত্তরমুখো ঘর, তারপরও দরজা খোলা বলে নরম বাতাসে হারিকেনের আলোটা ওঠানামা করছে। হারিকেনের আলোর এই ওঠানামা মমিনার চেহারার ওপর একধরনের আলোছায়ার খেলা করছে। আলোছায়ার এই খেলাতে মমিনার চেহারা থেকে যেন দুটো রূপ ঠিকরে বের হয়ে আসছে। দুটোই সৌন্দর্যের। মনসুর পাগলাকে তা মুগ্ধ করল।

মমিনা ও কমলা খাতুন দু’জনই এখন উপুড় হয়ে বসে শিমের বিচি ছিলছে। মনসুর পাগলার দৃষ্টি মমিনার ওপরই আটকে রইল। সে এ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বাড়িতে এসেছে মমিনার জন্যই। যদি সে তাকে বাড়িতে না পেত, তাহলে একবার তার ছোটচাচার বাড়িতে যেত। কোনো কারণ ছাড়াই ছোটচাচার ঘরে উঁকি মেরে ডাকত, ‘ও, কাকা, ঘরে আছনি...?’

মনসুর পাগলা ভাবল, আজ তার ভাগ্যটা ভালোই। এই সন্ধ্যার সময় বাড়িতে এসেও সে মমিনাকে পেয়ে গেছে। তাই সে চৌকিতে বসে আর নড়ছে না। মমিনার ওপর থেকেও তার দৃষ্টিটা সরছে না। হারিকেনের আলোতে মমিনাকে সে যতই দেখছে, চোখ তার ততই জুড়িয়ে যাচ্ছে। ভরাট চোখ, ভরাট মুখ, গায়ের এই দুধেআলতা রঙ!

মনসুর পাগলার গান বাঁধতে ইচ্ছে হলো। অনেকদিন পরই তার এই ইচ্ছেটা জাগল। আগে মস্তানের দরগার সামনে বসে হেরেগলায় গান ধরত। নিজের বাঁধানো গান। কিন্তু সেই গান তো তার দুঃখের গান ছিল। আজ সে কী সুখের গান বাঁধবে?

মনসুর পাগলার হঠাৎ করে এখন মস্তানের দরগায় যেতে ইচ্ছে হলো। সে উঠে দাঁড়াল। সে ভাবল, নৌকা বেয়ে গোমতী নদী দিয়ে যেতে যেতে সে গানটা বাঁধবে। তারপর দরগার সামনে বসে সে গলা খুলে গাইবে।

মনসুর পাগলা ওদের পাশ কেটে দাওয়ার দিকে পা বাড়াতেই কমলা খাতুন দৃষ্টি তুলে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে মমিনাও তাকাল। কমলা খাতুন কিছু জিজ্ঞেস করল না। কিন্তু মমিনা জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইজান, কই যাইতাছ আবার?

মনসুর পাগলা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, ‘দরগায় যাইমু। পুনোয়ারার মস্তানের দরগায়?’

‘তুমি তো এইমাত্র বাইরে থাইকা আইলা?’

‘হ, তয় গান বান্ধতে যে ইচ্ছা করতাছে, এর লাইগাই দরগায় যাইতাছি।’

‘গান! অখন?’— মমিনার মুখ হা হয়ে গেল।

কিন্তু কমলা খাতুন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মনসুর পাগলার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবার শিমের বিচি ছিলতে শুরু করল। ক্রমশ... 

***

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image


দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন 

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

নয়.

কমলা খাতুন উত্তরের দরজার মুখে একটা চাটাই টেনে বসে শিমের বিচির খোসা ছাড়াচ্ছে। সকালের দিকে সে তিন মুঠো শিমের বিচি ছিক্কা থেকে নামিয়ে সিলভারের পাতিলে ভিজিয়ে রেখেছিল। সেগুলোই এখন ছিলছে। পাতিলের জলে সারাদিন ভিজিয়ে রাখাতে শিমের বিচিগুলো বেশ ফুলে উঠেছে। বিচিগুলোর খোসা ছাড়াতে তার তেমন সমস্যা হচ্ছে না। নখের খোঁচায় অনায়েসেই ছিলে যাচ্ছে।

কমলা খাতুন চাটাইর উপর বসেছে কোলাব্যাঙের আকৃতি ধারণ করে। ধনুকের মতো পৃষ্ঠদেশ, ঘাড় ও মাথা। দৃষ্টিটা শিমের বিচির পাতিলে নিবন্ধ। হঠাৎ হঠাৎ যখন দৃষ্টিটা উঠছে, তখনই সে দেহের বাঁকানো ভঙ্গি ছেড়ে দরজার কপাটে হেলান দিয়ে পৃষ্ঠদেশটা সপে দিচ্ছে। দৃষ্টিটা ক্ষণিকের জন্য টান টান করে কখনও উঠোনের জমাজল দেখছে, কখনও আকাশ দেখছে। গাছগাছালির ফাঁক গলে দূরের উত্তরেও তার দৃষ্টিটা গিয়ে পড়ছে। আজ সকাল থেকেই খুব বৃষ্টি হচ্ছে। অবশ্য বৃষ্টিটা শুধু আজ সকাল থেকেই নয়, গত তিনদিন ধরেই বিরামহীন হচ্ছে। কখনও তুমুল ধারায়, কখনও ঝিরিঝিরি। বৃষ্টি দু-চারবার যে থামেনি, তা নয়। কিন্তু গত তিনদিনে একবারও রোদ ওঠেনি।

এখন অবশ্য বৃষ্টি নেই। বৃষ্টিটা বেশ কিছুক্ষণ আগেই থেমে গেছে। তবে এখনও কোনো রোদ ওঠেনি। এদিকে বিকেলটা প্রায় পড়ে এসেছে। রোদ না ওঠার কারণে সময়টা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। দরজার সামনে স্পষ্টত আলো থাকলেও ঘরের ভেতর একধরনের অন্ধকার ছায়া করে রেখেছে। আজকাল গ্রামে একেবারেই বিদ্যুৎ থাকে না। বৃষ্টি হলে তো আরও না। তাই প্রতিটি বাড়িতে সন্ধ্যা হলেই কুপি বা হারিকেন জ্বালাতে হয়।

কমলা খাতুন আবার আকাশ দেখল। আকাশে মেঘ করে রেখেছে বলে সময়টা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে বিকেলটা যে পড়ে এসেছে, সেটা স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে। উঠোনের ঠিক বুক বরাবর থকথকে কাদা, গোপাট ঘেঁষে বৃষ্টির জমাজল ও গোপাটের পাশে বেড়ে ওঠা কচুগাছ— সর্বত্রই দিনের আলো কমে আসছে। কচুগাছের ভেতর থেকে ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, কটর কটর ডাক, উত্তরের কোনো বাড়ির গোয়াল ঘর থেকে গরুর হাম্বা-অ-অ ডাক ও একটা গাছের মগডালে বসা কাকের অনবরত ডাকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আহ্বানেরই লক্ষণ।

কমলা খাতুন দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘরের ভেতরটাও দেখল। ঘরের ভেতর একধরনের আবছা অন্ধকার থমকে আছে। সে উঠে গিয়ে হারিকেনটা জ্বালাবে কি না, ভাবল। কিন্তু পরক্ষণ ভাবল, এত আগে হারিকেন জ্বালিয়ে কেরোসিন পুড়িয়ে কী লাভ। ঘরে তার ছেলে মনসুর পাগলা থাকলে অন্যকথা ছিল। ছেলের জন্য সে আজকাল আগ বাড়িয়ে অনেক কিছুই করে। এই যে শিমের বিচি খোসা ছাড়াচ্ছে, এটাও তার ছেলের জন্যই। আগামীকাল কই মাছ দিয়ে এই শিমের বিচিগুলো ভুনা করে রান্না করবে। গতকালই মীরবহরি বাজার থেকে তার ছেলে জ্যান্ত কই মাছগুলো কিনে নিয়ে এসেছে। এখন সেগুলো পিছদোরের দরজার পাশে মটকায় জিয়ল দেওয়া আছে।

কমলা খাতুন ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে দরজা থেকে দৃষ্টি বাড়িয়ে গোপাটের দিকে তাকাল। তাদের নৌকাটা গোপাটের কাছেই বুইদ্দার খালে আমগাছের সঙ্গে বাঁধা থাকে। বৃষ্টিটা ধরে আসতেই তার ছেলে খাল ধরে সেই যে নৌকাটা নিয়ে বের হয়েছে, এখনও ফিরেনি। আজকাল ছেলের জন্য তার ভেতরে বেশ নাড়া দেয়। ফেরার অপেক্ষায় থাকে। ছেলের পছন্দের খাবার রান্না করে ও কাপড়চোপড় ধুয়ে দেয়। যদিও তার বয়স হয়েছে, শরীরে জোর পায় না। কোমরটা আস্তে আস্তে বেঁকে যাচ্ছে। তারপরও মনে মনে সে অধিক শক্তি সঞ্চয় করে। শরীরের অধিক মনের শক্তি।

কমলা খাতুন ভাবল, মনের শক্তি তো অবশ্যই। তবে সে এখনও ছেলেকে বেশ ভয় পায়। তাই ছেলের সঙ্গে আগের মতোই কথা খুব কম বলে ঠ্যাঁটা মেরে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু ছেলে তার সঙ্গে খুব কথা বলার চেষ্টা করে। আগ বাড়িয়ে মীরবহরি বাজার থেকে বাজারসদাই করে নিয়ে আসে। তার জন্য বাজার থেকে এটাসেটা কিনে আনে। কখনও গুড়ের জিলাপি, কখনও বড় বড় রসগোল্লা, কখনও বা তিলের মোয়া। তিলের মোয়া সে খেতে পারে না, তারপরও সে খুশি হয়।

কমলা খাতুনের আরেকটা জিনিস ভালো লাগে, তার ছেলে আজকাল জমিজমাগুলো ঠিকমতো দেখাশোনা করে। সকাল-দুপুর জমিগুলোতে যায়। তাদের জমি তো একেবারে কম নয়। সেই দুই যুগ আগে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক তোলাও সে বিক্রি করেনি। অবশ্য তার বিক্রি করার প্রয়োজনও পড়েনি। এছাড়া তার আরেকটা জিনিস ভালো লাগে, তার ছেলে আজকাল কোনো পাগলামি করে না। জেল থেকে বের হওয়ার পর ছেলের মধ্যে বেশ পরিবর্তন এসেছে। ছেলে খুব আন্তরিক হয়ে ‘মা’ ডাকে। সেই ডাক শুনে তার ভেতরটা শীতল হয়ে যায়।

কিন্তু তারপরও কমলা খাতুনের ছেলের ওপর থেকে ভয়টা যাচ্ছে না। তার মনে মাঝেমধ্যে এই আশঙ্কা এসে ভিড় করে, ছেলের যদি আবার পাগলামি শুরু হয়ে যায়! মাত্র তো ছয় মাস ধরে ছেলে এমন ভালো ব্যবহার করছে। দীর্ঘদিন, প্রায় দুই যুগ ধরে ছেলে এত পাগলামি ও খারাপ ব্যবহার করে আসছে, সেই আতঙ্ক কি এত সহজে যায়?- কমলা খাতুন মাথা নাড়ল। ভাবল, না, যায় না। ছেলের যখন দশ কি এগারো বছর, তখনই তার স্বামী আসমত আলী বেপারি মারা যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পরপরই ছেলে পাগলামি শুরু হয়। সেই সঙ্গে তার প্রতি খারাপ ব্যবহার। তারপরও পেটপোছা একমাত্র ছেলে তার।

ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে কমলা খাতুন দৃষ্টিটা সীমিত করে আবার শিমের বিচির খোসা ছাড়তে শুরু করল। এরই মধ্যে সে তিন ভাগের দুই ভাগ ছিলে ফেলেছে। সন্ধ্যার আলো জ্বালানোর আগেই সে সবগুলো শিম খোসা ছাড়িয়ে শেষ করতে পারবে বলে আশা করল।

কমলা খাতুন এবার শিমের বিচির খোসা ছাড়ানোয় হাত চালাতে গিয়ে কী ভেবে উঠোনের দিকে আবার দৃষ্টি ফেলল। ঠিক তখন সে দেখল, মমিনা পিছদোর দিয়ে এসে থকথকে কাদার উঠোন পেরিয়ে তার দিকে আসছে। কেমন বিধ্বস্ত চেহারা। চোখমুখ ফোলা। মমিনা যে এসময় তার ঘরে আসে না, তা নয়। প্রায়ই আসে। গতকাল বিকেলেও বৃষ্টি ভিজে একবার এসেছিল। কিন্তু আজ মমিনার আসাটা তার কাছে কেমন অন্য রকম লাগল।

কমলা খাতুন নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে, মমিনা, তোর চোখমুখ এমুন ফোলা ক্যান, তোর কি অসুখ কইরাছে?’

মমিনা ঘরের দাওয়ায় উঠতে উঠতে বলল, ‘বড়চাচি, আমার কপাল পুইড়াছে গো, আমার কপাল পুইড়াছে।’ বলেই সে ঘরে ঢুকে কমলা খাতুনের সামনে চাটাইতে ধপাস করে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।

কমলা খাতুন ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘আহা, কান্দে না। তুই কান্দিস না তো। আবার কী হইছে তোর?

মমিনা কান্না ধরে রেখেই বলল, ‘হেয় আরেকটা বিয়া করছে!’

‘হেয় কেডা, তোর জামাই?’

‘আর কেডায়, বড়চাচি, আর কেডায়!’

‘আরে ধুর-র, কী কস?’

‘হাছাই কইতাছি।’

‘তুই জানলি ক্যামনে?’

‘আমার বড়ভাই ফোন দিছিল’

‘শওকত ফোন দিছিল, কখন?’

‘আইজকা দুপুরে।’

‘শওকত জানলো ক্যামনে?’

‘বড়ভাই তারে চিটাগাং দেখছে। কাজীরদেউরি না কু’নে জানি।’

‘তোর জামাই অখন চিটাগাঙে?’

‘আর কী কইতাছি, বড়চাচি!’

‘তয় শওকত তারে চিনল ক্যামনে?’

‘ওমা কী কও, বড়ভাই আমার জামাইরে চিনব না?’

‘আমি ওইটা জিগাই নাই। আমি জিগাইতাছি, শওকত এত মানুষের মইধ্যে চিনল ক্যামনে? তার তো ভুল হইতে পারে?’

‘বড়ভাই যেমনে কইছে, তার তো ভুল হইবার কথা না। বড়ভাই নাকি হেরে ডাকও দিছে। হেয় ডাক শুইনা ঘাড় ফিরাইয়া তাকাইয়া রিকশা দিয়া চইলা গেছে।’

‘এইটা থাইকা তো বোঝা যায় না, তোর জামাই বিয়া করছে?’

‘না, বড়চাচি, বিয়া করছে তো। বড়ভাই তারে এক মাইয়ার হাত ধইরা রিকশায় বইসা থাকতে দেখছে। মাইয়ার পরনের শাড়ি আছিল। মাইয়াডার বউয়ের মতন ঘোমটা দিয়া রাখছিল।’

‘শওকত তারে ধরল না?’

‘ধরবে ক্যামনে? ধরনের আগেই চক্ষের পলকে রিকশা লইয়া চইলা গেছে।’

কমলা খাতুন মাথা ঝাঁকাল। এমনিই। একটু কী ভেবে বলল, ‘আমার কিন্তুক তারপরও সন্দেহ হয়। একটা মানুষ রিকশা দিয়া মাইয়ার লগে যাইব, হেইডা দেইখা মনে হইব হেয় বিয়া করছে। এইডা হইতে পারে না। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের লগে রিকশায় কইরা যাইতেই পারে।’

মমিনা একটু চুপ হয়ে গেল। সে একটু ধন্দে পড়ে গেল। ভাবল, তার বড়চাচি তো কথাটা ঠিকই বলেছে। একটা মেয়েমানুষের সঙ্গে রিকশা করে গেলেই তো আর বউ হয়ে যায় না। অন্য কেউ তো হতে পারে। তারপরও তার মনে এসে একটা কাঁটা বিঁধছে। তার স্বামী যদি বিয়েই না করবে, তাহলে ছয় মাস ধরে কোনো যোগাযোগ করছে না কেন? একবার ফোন তো দিতে পারত?

কমলা খাতুন নিজ থেকেই বলল, ‘শোন, মাথা থাইকা আজেবাজে চিন্তা দূর কর। ধইর্য ধর। আমার মনে হয় না, তোর জামাই এত তাড়াতাড়ি এমুন একটা আকাম করব। তোর লাইগা তার কত টান আছিল!’

মমিনা আস্তে করে বলল, ‘তারপরও। ছয়মাস হইয়া গেছে। কোনো খবর নাই। একটা ফোনও দেয় নাই। হেয় বিয়া করবারই পারে।’

কমলা খাতুন বলল, ‘মমিনা, ভাবলে অনেক কথাই ভাবন যায়। তোরে তো কইলাম, ধইর্য ধর।’

মমিনা একমুহূর্ত চুপ হয়ে গিয়ে হাহাকারের গলায় বলল, ‘আমার এই কপালডা এমুন পুড়ল, বড়চাচি, এমুন পুড়ল...!’ বলেই সে আবার কাঁদতে শুরু করল। এবার সে কাঁদছে নাক টেনে টেনে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।

কমলা খাতুন হাত বাড়িয়ে মমিনার মাথাটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে মুছতে মুছতে বলল, ‘কান্দে না, মমিনা, কান্দে না। জানস তো, তুই কান্দলে আমার বুক ফাইটা যায়। আমার মন কইতাছে, তোর জামাই আবার ফিরা আইব। তুই জামাই অত খারাপ না। মানুষটার ভিতরটা ভালা আছিল।’

মমিনা কান্না থামিয়ে মাথা ঝাঁকাল একবার। এমনিই। বড়চাচির কথাগুলো তার জন্য সত্যি বড় সান্ত্বনার। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘বড়চাচি, তোমার কথাগুলান যেন ঠিক হয়।’

কমলা খাতুন আশ্বস্তের গলায় বলল, ‘ঠিক হইব মমিনা, নিজের ওপর ভরসা রাখ।’ —বলেই কী ভেবে সে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, ‘মমিনা, তুই আইসা তো আমারে দেরি করাইয়া ফেললি।’

মমিনা জিজ্ঞেস করল, ‘কী দেরি, বড়চাচি?’

‘আমি ভাবতেছিলাম বাত্তিটা জ্বালানোর আগেই ছইয়ের দানাগুলান ছিইলা ফেলামু।’

‘ও, হেই কথা। আমি তোমার লগে হাত লাগাইতাছি। তাড়াতাড়ি হইয়া যাইব।’

‘তাই কর, হাত লাগা।’

‘তয় আন্ধাইর তো হইয়া আইতাছে। আগে বাত্তি জ্বালাইয়া লই?

‘হেইডাই ভালা হইব। হারিকেনের চিমনি মোছা আছে। তুই হুধা সইলতা ধরাইয়া লইয়া আয়। ম্যাচ হাড়িকেনডার কাছেই আছে।’

‘আইচ্ছা, বড়চাচি।’ু বলেই মমিনা বসা থেকে উঠে গেল।

হারিকেনটা ঘরের দক্ষিণের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা আছে। দিয়াশলাইর বাক্সটাও বেড়ায় গুঁজিয়ে রাখা। মমিনা হারিকেনটা নামিয়ে একটা দিয়াশলাইর কাঠি দিয়ে সলতেটা জ্বালিয়ে নিল।

কমলা খাতুন তখন দরজার কপাটে হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বাইরে সন্ধ্যাটা ধপাস করেই যেন নেমে গেছে। গোপাট থেকে অনবরত ব্যাঙের ডাক আসছে। সঙ্গে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। একটা ডাহুক ডাকছে- কোয়াক কোয়াক, কোয়াক কোয়াক।

মমিনা হারিকেনটা চাটাইর মাঝখানে রেখে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, ‘বড়চাচি, ছইয়ের দানা দিয়া কী ছালুন রান্ধবা?’

কমলা খাতুন বাইরে থেকে দৃষ্টিটা এনে মমিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছইয়ের দানা দিয়া কইমাস রান্ধমু।’

‘কসাইয়া রান্ধবা, নাকি ঝুল ঝুল কইরা?’

‘কসাইয়া ভুনা করমু।’

‘কার লাইগা রান্ধবা, ভাইজানের লাইগা?’

‘হ, আর কার লাইগা রান্ধমু।’

মমিনা অনেকক্ষণ পর এবার মৃদু হাসল। বলল, ‘তোমার পোলা ভালা হইয়া গেছে দেইখা আমার ভালা লাগে, বড়চাচি। অনেক ভালা লাগে।’

কমলা খাতুন মাথা ঝাঁকাল। মৃদু হাসলও। বিশেষ করে মমিনার হাসিটা তার ভালো লাগল।

মনসুর পাগলা এরই মধ্যে গোপাটের আমগাছে নৌকাটা বেঁধে উঠোন পেরিয়ে ঘরের দাওয়ার দিকে আসছে, সেটা কমলা খাতুন বা মমিনা কেউ খেয়াল করল না। সে দাওয়ায় উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করল, ‘কার কী ভালা লাগে?’

কমলা খাতুন একটু থতমত খেয়ে গেল। কিছু বলল না। ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিল।

মমিনা বলল, ‘তোমার পাগলামি চইলা গেছে দেইখা ভালা লাগে।’

মনসুর পাগলা ওদের পাশ কেটে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘হ, তোর তো ভালা লাগবই। তোরে যে আর দৌড়ানি দেই না!

মমিনা কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেল। উবু হয়ে শিমের বিচি ছিলতে ছিলতে বলল, ‘হ, তোমারে কইছে।’

মনসুর পাগলা শব্দ করে হাসল, হে হে, হে হে। সে কাছেই একটা চৌকির উপর বসল। বসেই সে একবার তার মা’র দিকে তাকাল। পরক্ষণ মমিনার দিকে।

যদিও উত্তরমুখো ঘর, তারপরও দরজা খোলা বলে নরম বাতাসে হারিকেনের আলোটা ওঠানামা করছে। হারিকেনের আলোর এই ওঠানামা মমিনার চেহারার ওপর একধরনের আলোছায়ার খেলা করছে। আলোছায়ার এই খেলাতে মমিনার চেহারা থেকে যেন দুটো রূপ ঠিকরে বের হয়ে আসছে। দুটোই সৌন্দর্যের। মনসুর পাগলাকে তা মুগ্ধ করল।

মমিনা ও কমলা খাতুন দু’জনই এখন উপুড় হয়ে বসে শিমের বিচি ছিলছে। মনসুর পাগলার দৃষ্টি মমিনার ওপরই আটকে রইল। সে এ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বাড়িতে এসেছে মমিনার জন্যই। যদি সে তাকে বাড়িতে না পেত, তাহলে একবার তার ছোটচাচার বাড়িতে যেত। কোনো কারণ ছাড়াই ছোটচাচার ঘরে উঁকি মেরে ডাকত, ‘ও, কাকা, ঘরে আছনি...?’

মনসুর পাগলা ভাবল, আজ তার ভাগ্যটা ভালোই। এই সন্ধ্যার সময় বাড়িতে এসেও সে মমিনাকে পেয়ে গেছে। তাই সে চৌকিতে বসে আর নড়ছে না। মমিনার ওপর থেকেও তার দৃষ্টিটা সরছে না। হারিকেনের আলোতে মমিনাকে সে যতই দেখছে, চোখ তার ততই জুড়িয়ে যাচ্ছে। ভরাট চোখ, ভরাট মুখ, গায়ের এই দুধেআলতা রঙ!

মনসুর পাগলার গান বাঁধতে ইচ্ছে হলো। অনেকদিন পরই তার এই ইচ্ছেটা জাগল। আগে মস্তানের দরগার সামনে বসে হেরেগলায় গান ধরত। নিজের বাঁধানো গান। কিন্তু সেই গান তো তার দুঃখের গান ছিল। আজ সে কী সুখের গান বাঁধবে?

মনসুর পাগলার হঠাৎ করে এখন মস্তানের দরগায় যেতে ইচ্ছে হলো। সে উঠে দাঁড়াল। সে ভাবল, নৌকা বেয়ে গোমতী নদী দিয়ে যেতে যেতে সে গানটা বাঁধবে। তারপর দরগার সামনে বসে সে গলা খুলে গাইবে।

মনসুর পাগলা ওদের পাশ কেটে দাওয়ার দিকে পা বাড়াতেই কমলা খাতুন দৃষ্টি তুলে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে মমিনাও তাকাল। কমলা খাতুন কিছু জিজ্ঞেস করল না। কিন্তু মমিনা জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইজান, কই যাইতাছ আবার?

মনসুর পাগলা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, ‘দরগায় যাইমু। পুনোয়ারার মস্তানের দরগায়?’

‘তুমি তো এইমাত্র বাইরে থাইকা আইলা?’

‘হ, তয় গান বান্ধতে যে ইচ্ছা করতাছে, এর লাইগাই দরগায় যাইতাছি।’

‘গান! অখন?’— মমিনার মুখ হা হয়ে গেল।

কিন্তু কমলা খাতুন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মনসুর পাগলার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবার শিমের বিচি ছিলতে শুরু করল। ক্রমশ... 

***


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত