বিকেল সাড়ে পাঁচটা। কারওয়ান বাজারের মোড়ে বাসের চাকা স্তব্ধ হয়ে থমকে আছে প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে। জানালার আধখোলা কাচে কপাল ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল জামিল। জ্যামের সাইরেন, হর্নের বিকট আওয়াজ আর কালো ধোঁয়া— সব মিলিয়ে ঢাকার এই ধুলোবালিমাখা বিকেলটা বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শ্বাসরোধকারী বিষণ্নতা তৈরি করে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে সময় দেখল সে। সাড়ে ছয়টায় বনানীতে একটা ব্যাচেলর বাসা দেখতে যাওয়ার কথা। গত দুই মাস ধরে টু-লেট (ঞড়-খবঃ) সাইনবোর্ড দেখে দেখে পায়ের পাতা ক্ষয়ে যাওয়ার অবস্থা।
‘আইটি বা করপোরেট ব্যাকগ্রাউন্ড? ব্যাচেলর তো... ভাইয়া, ফ্যামিলি ছাড়া তো আমরা ঘর ভাড়া দিই না।’
‘রাত নয়টার মধ্যে গেটে তালা পড়বে, কোনো বন্ধু-বান্ধব তো দূরের কথা, নিজের ভাই আসলেও থাকা যাবে না।’
বাড়িওয়ালাদের এই একই গৎবাঁধা অজুহাত শুনতে শুনতে জামিল ক্লান্ত। মেগাসিটির চকচকে ইমারতের আড়ালে এক চিলতে মাথার ওপর ছাদ খোঁজার এই ব্যাকুলতা যে কতটা নির্মম, তা কেবল এই শহরের ব্যাচেলররাই বোঝে। বাসের কাচে বৃষ্টির দু-এক ফোটা আঁচড় কাটতেই জামিলের মনটা একমুহূর্তে চলে গেল চার-পাঁচ বছর আগের সেই চেনা দিনগুলোয়। কার্জন হলের সামনে কদম গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকার দিনগুলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রথম দেখাটা খুব নাটকীয় কিছু ছিল না, কিন্তু ছিল ভীষণ জীবন্ত। টিএসসির আড্ডায় বন্ধুদের হইচইয়ের মাঝে হুট করে এসে বসেছিল অবন্তী। পরনে সাধারণ একটা সুতির সালোয়ার-কামিজ, চোখে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা। চায়ের দোকানে প্রথম যখন জামিল তার দিকে কাপ এগিয়ে দিয়েছিল, অবন্তী চোখ তুলে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেছিল, ‘আপনার চায়ের কাপে চিনি কিন্তু একদম কম, জামিল ভাই।’
সেই যে শুরু হলো। কলা ভবনের করিডোর, মল চত্বর, আর ছায়াময় অপরাজেয় বাংলা— সবখানেই জামিল আর অবন্তী। পকেটে টিউশনির সামান্য কটা টাকা, অথচ বুকে ছিল এক আকাশ স্বপ্ন। কারওয়ান বাজারের জ্যামেই এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বাসের ব্যাকবেঞ্চে পাশে বসেছিল অবন্তী। বাসের ধাক্কায় বারবার গা ঘেঁষে যাওয়ার ভিড়ে অবন্তীর ঠাণ্ডা হাতটা নিজের তালুতে চেপে ধরে জামিল বলেছিল, ‘চাকরিটা পেলেই আমরা একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া নেব, অবু। জানালার পাশে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ থাকবে। আমরা বারান্দায় টব সাজাব।’
অবন্তী ওর কাঁধে মাথা রেখে হালকা হেসে উত্তর দিয়েছিল, ‘আমার কোনো মায়াপুরী চাই না জামিল। শুধু এক কাপ চা আর তোমার সাথে দিনশেষে সময় কাটানোর মতো একটুখানি নিজের জায়গা পেলেই হবে। যেখানে আমরা দুজন কোনো হিসেব ছাড়া বাঁচব।’
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই আবেগ আর বাস্তবতার রাজপথ এক হয় না। পাস করার পর জামিল ঢুকলো একটা বহুজাতিক কোম্পানির ‘প্রসেস এক্সিকিউটিভ’ হিসেবে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা, এক্সেল শিটের ডেটা গ্রাফ, ক্লায়েন্টের মেইল আর পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইডের যান্ত্রিক দৌড়। পকেটে টাকা আসতে শুরু করল ঠিকই, কিন্তু জামিলের সময়গুলো কে যেন কেড়ে নিল। অবন্তীও একটি প্রাইভেট ব্যাংকে জয়েন করল।
কর্পোরেট জীবনের ক্লান্তি তাদের একটু একটু করে গ্রাস করতে শুরু করল। ৮ বাই ১০ ফুটের এক মেস রুমে ফিরে জামিল যখন ক্লান্তিতে ঘুমে ঢলে পড়ত, অবন্তী তখন হয়তো ফোনে অপেক্ষা করত একটুখানি আদরের কথার জন্য, ফোনে একটু চুমো খাওয়ার আশায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ল্যাপটপ খুলে প্রেজেন্টেশন বানাতে বানাতে জামিল বলত, ‘আর কয়েকটা মাস অবু, প্রমোশনটা পেয়ে নিই... তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।’
কিন্তু কোনো কিছুই ঠিক হয় না। সময়ে দিতে না পারা, ক্লান্তির অজুহাত আর অভিমানের দেয়াল প্রতিদিন এক ইঞ্চি করে উঁচু হতে লাগল। তারপরেই এলো সেই ঝড়, যা জামিলকে ভেতর থেকে একদম গুঁড়িয়ে দিল। অবন্তীর অফিসে ততদিনে নতুন এক ম্যানেজারের আগমন ঘটেছে— স্মার্ট, গোছানো, এবং অবন্তীকে দেওয়ার মতো যার প্রচুর সময় ও আভিজাত্য ছিল। জামিল ভেবেছিল তাদের চার বছরের ভালোবাসার শক্ত ভিত অন্তত কোনো তৃতীয় ব্যক্তির ছায়ায় ডগমগ করবে না। কিন্তু একদিন সন্ধ্যায় অবন্তীর ল্যাপটপে ভুল করে খোলা থেকে যাওয়া চ্যাটবক্স আর রেস্তোরাঁর বিলে চোখ পড়ার পর জামিলর পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল।
যে অবন্তী বলত— ‘শুধু এক কাপ চা আর তুমি হলেই চলবে’, সেই অবন্তীই খুব শান্ত গলায় একদিন গুলশানের এক অভিজাত কফিশপে বসে জামিলের চোখে চোখ রেখে বলেছিল, ‘বাস্তবতা দিয়ে চিন্তা করো জামিল। তোমার এই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, মেসে থাকা জীবন আর প্রমোশনের অপেক্ষায় আমি আমার পুরো জীবন আটকে রাখতে পারি না। মিল্টন আমাকে একটা গোছানো জীবন দিতে পারবে... যেটা তোমার কাছে শুধুই আশ্বাস।’
বিশ্বাসের ঘর ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার সেই শব্দটা কোনো ল্যাপটপের কিবোর্ড বা বাসের হর্নের শব্দ চাপা দিতে পারেনি। বাসের হঠাৎ এক তীব্র ঝাকুনিতে জামিলের স্মৃতির সুতো ছিঁড়ে গেল। সে এখন আর সেই একতারা হাতে ঘুরে বেড়ানো, অবন্তীর প্রেমে বুঁদ থাকা তরুণ নয়। বাসটা মোড় পেরিয়ে একটু সামনে এগোল। বৃষ্টি এখন বেশ জমে উঠেছে। জানালার কাচ বেয়ে জলের ফোঁটাগুলো নিচে নেমে যাচ্ছে, ঠিক যেন চোখের পানির মতো। জামিল পকেট থেকে ইয়ারফোনটা বের করে কানে গুঁজে দিল।
আজ রোববার, সপ্তাহের শুরু। কাল আবার সেই একই রুটিন— অ্যালার্মের যান্ত্রিক শব্দে ঘুম ভাঙা, বুয়ার হাতের আধসেদ্ধ ভাত গিলে অফিসে ছুটে যাওয়া, আর দিনশেষে একটা নিজের ঘরের খোঁজে অচেনা গলিতে হেঁটে বেড়ানো। মোবাইলে রিং বেজে উঠল। বনানীর সেই বাড়িওয়ালার নম্বর।
‘হ্যালো, জামিল সাহেব? আপনি কোথায়? আপনি না আসলে আমি কিন্তু অন্য পার্টিকে চাবি বুঝিয়ে দেব। তাদের ঘর পছন্দ হয়েছে এবং তারা এডভ্যান্স দিতে চাচ্ছে।’
জামিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, ‘জি চাচা, আমি প্রায় চলে এসেছি। জ্যামে আটকে ছিলাম... আর দশ-পনের মিনিট লাগবে।’
কথা শেষ করে মোবাইলটা পকেটে রাখতে গিয়ে জামিল পকেট থেকে ওয়ালেটটা টেনে বের করে দেখল— ওয়ালেটটি বেশ পুরানো। জন্মদিনে চার বছর আগে অবন্তী কিনে দিয়েছিল। ওয়ালেটের ভিতর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটা পুরনো বাস টিকিট। পেছনের নীল কালিতে অবন্তীর হাতের টলমল হরফে লেখা: ‘প্রতিটা বৃষ্টিতেই আমি তোমার পাশে থাকতে চাই, জামিল।’
জামিল টিকিটটার দিকে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে জানালার সামান্য ফাঁক দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা কারওয়ান বাজারের কালো পিচঢালা রাস্তায় টিকিটটা ছেড়ে দিল। বাতাসে উবে গিয়ে সেটা মিশে গেল কর্দমাক্ত কাদায়। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই, তার ফোনের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। কোনো অজানা বা নতুন নম্বর নয়। ডিসপ্লেতে ভেসে উঠেছে একটা চেনা নাম— অবন্তী। নিচে ছোট করে লেখা একটি নতুন টেক্সট মেসেজ:
‘জামিল, বনানীর যে বাসাটা তুমি দেখতে যাচ্ছ... তিন তলার ডানপাশের ফ্ল্যাটটা কি? গাড়ি বারান্দায় একটা নীল ছাতা হেলান দিয়ে রাখা?’
জামিলের বুকের ভেতরটা হঠাৎ হীম হয়ে গেল। বাসের জানালা দিয়ে সে বাইরের বৃষ্টি দেখতে দেখতে থমকে গেল। অবন্তী এই বাসার ঠিকানা জানল কীভাবে? সে কি এখনও জামিলের পিছু ছাড়েনি, নাকি জামিলের এই চেনা হাহাকারের গন্তব্যটাই আসলে অন্য কারো আগে থেকেই সাজানো কোনো ছক?
বাসের হর্ন আর বৃষ্টির শব্দের মাঝেই বিলু কাঁপা হাতে ফোনটা কান পর্যন্ত নিল না, শুধু টেক্সট বক্সটা খুলে ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই অবন্তীর দ্বিতীয় মেসেজটা এলো:
‘মিল্টনের সাথে আমার সব শেষ হয়ে গেছে, জামিল। ও যে আমাকে কতটা ধোঁকা দিয়েছে, তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। আমি জানি তুমি আজও আমায় ভালোবাসো। তাই এই বাসাটা আমি নিজে তিন মাসের অ্যাডভান্স দিয়ে তোমার জন্য বুক করে রেখেছি... এসো, আমরা আবার নতুন করে শুরু করি।’
শব্দগুলো পড়ার পর জামিলের মাথাটা এক মুহূর্তের জন্য একদম ফাঁকা হয়ে গেল। বাসের কাচে ভেসে ওঠা নিজের আবছা প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল সে। সেখানে কোনো প্রেমিক পুরুষ দাঁড়িয়ে নেই; দাঁড়িয়ে আছে কর্পোরেট ঘানি টানা এক ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অবয়ব। যে মেয়েটা ক্যারিয়ার, স্থায়িত্ব আর আলোর ঝলকানির লোভ পড়ে তাকে কাদার মধ্যে ফেলে এক লহমায় পর করে দিয়েছিল— আজ তার রাজপ্রাসাদ ভেঙে পড়ছে বলেই কি সে আবার জামিলের দরজায় ফিরে এসেছে? ভালোবাসার নামে এই দানছত্র, এই বাসা ভাড়া করে দেওয়া কি সত্যিই অনুশোচনা, নাকি আবারও জামিলকে একটা হাতের পুতুল বানিয়ে নিজের অপরাধবোধ হালকা করার একটা অপচেষ্টা?
বৃষ্টিভেজা রাতের অন্ধকারের দিকে তাকাতে তাকাতে সে মনে মনে ভাবল— গৃহহীন হওয়া কঠিন, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বেঁচে দিয়ে কারোর করুণার ছাদ মাথায় নেওয়া তারচেয়েও বেশি বিষাক্ত। জামিল বনানী না নেমে আবার ফিরতি গাড়িতে কলাবাগান চলে আসল তার পুরানো মেসে। তার বুকের ভেতরের সেই বিষাক্ত শ্বাসরোধকারী অনুভূতিটা আর নেই। প্রথমবার এই নিঃস্ব ব্যাচেলর জীবনটাকে তার কাছে ভীষণ মুক্ত, স্বাধীন আর নিজের বলে মনে হলো।
সামনের কালচে অলিগলির মাঝে হাজারটা আলো জ্বলছে। এই বিশাল শহরে আজ তার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই ঠিকই, কিন্তু নিজের ওপর নিজের অধিকারটুকু সে ফের খুঁজে পেয়েছে।

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬
বিকেল সাড়ে পাঁচটা। কারওয়ান বাজারের মোড়ে বাসের চাকা স্তব্ধ হয়ে থমকে আছে প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে। জানালার আধখোলা কাচে কপাল ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল জামিল। জ্যামের সাইরেন, হর্নের বিকট আওয়াজ আর কালো ধোঁয়া— সব মিলিয়ে ঢাকার এই ধুলোবালিমাখা বিকেলটা বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শ্বাসরোধকারী বিষণ্নতা তৈরি করে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে সময় দেখল সে। সাড়ে ছয়টায় বনানীতে একটা ব্যাচেলর বাসা দেখতে যাওয়ার কথা। গত দুই মাস ধরে টু-লেট (ঞড়-খবঃ) সাইনবোর্ড দেখে দেখে পায়ের পাতা ক্ষয়ে যাওয়ার অবস্থা।
‘আইটি বা করপোরেট ব্যাকগ্রাউন্ড? ব্যাচেলর তো... ভাইয়া, ফ্যামিলি ছাড়া তো আমরা ঘর ভাড়া দিই না।’
‘রাত নয়টার মধ্যে গেটে তালা পড়বে, কোনো বন্ধু-বান্ধব তো দূরের কথা, নিজের ভাই আসলেও থাকা যাবে না।’
বাড়িওয়ালাদের এই একই গৎবাঁধা অজুহাত শুনতে শুনতে জামিল ক্লান্ত। মেগাসিটির চকচকে ইমারতের আড়ালে এক চিলতে মাথার ওপর ছাদ খোঁজার এই ব্যাকুলতা যে কতটা নির্মম, তা কেবল এই শহরের ব্যাচেলররাই বোঝে। বাসের কাচে বৃষ্টির দু-এক ফোটা আঁচড় কাটতেই জামিলের মনটা একমুহূর্তে চলে গেল চার-পাঁচ বছর আগের সেই চেনা দিনগুলোয়। কার্জন হলের সামনে কদম গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকার দিনগুলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রথম দেখাটা খুব নাটকীয় কিছু ছিল না, কিন্তু ছিল ভীষণ জীবন্ত। টিএসসির আড্ডায় বন্ধুদের হইচইয়ের মাঝে হুট করে এসে বসেছিল অবন্তী। পরনে সাধারণ একটা সুতির সালোয়ার-কামিজ, চোখে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা। চায়ের দোকানে প্রথম যখন জামিল তার দিকে কাপ এগিয়ে দিয়েছিল, অবন্তী চোখ তুলে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেছিল, ‘আপনার চায়ের কাপে চিনি কিন্তু একদম কম, জামিল ভাই।’
সেই যে শুরু হলো। কলা ভবনের করিডোর, মল চত্বর, আর ছায়াময় অপরাজেয় বাংলা— সবখানেই জামিল আর অবন্তী। পকেটে টিউশনির সামান্য কটা টাকা, অথচ বুকে ছিল এক আকাশ স্বপ্ন। কারওয়ান বাজারের জ্যামেই এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বাসের ব্যাকবেঞ্চে পাশে বসেছিল অবন্তী। বাসের ধাক্কায় বারবার গা ঘেঁষে যাওয়ার ভিড়ে অবন্তীর ঠাণ্ডা হাতটা নিজের তালুতে চেপে ধরে জামিল বলেছিল, ‘চাকরিটা পেলেই আমরা একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া নেব, অবু। জানালার পাশে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ থাকবে। আমরা বারান্দায় টব সাজাব।’
অবন্তী ওর কাঁধে মাথা রেখে হালকা হেসে উত্তর দিয়েছিল, ‘আমার কোনো মায়াপুরী চাই না জামিল। শুধু এক কাপ চা আর তোমার সাথে দিনশেষে সময় কাটানোর মতো একটুখানি নিজের জায়গা পেলেই হবে। যেখানে আমরা দুজন কোনো হিসেব ছাড়া বাঁচব।’
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই আবেগ আর বাস্তবতার রাজপথ এক হয় না। পাস করার পর জামিল ঢুকলো একটা বহুজাতিক কোম্পানির ‘প্রসেস এক্সিকিউটিভ’ হিসেবে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা, এক্সেল শিটের ডেটা গ্রাফ, ক্লায়েন্টের মেইল আর পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইডের যান্ত্রিক দৌড়। পকেটে টাকা আসতে শুরু করল ঠিকই, কিন্তু জামিলের সময়গুলো কে যেন কেড়ে নিল। অবন্তীও একটি প্রাইভেট ব্যাংকে জয়েন করল।
কর্পোরেট জীবনের ক্লান্তি তাদের একটু একটু করে গ্রাস করতে শুরু করল। ৮ বাই ১০ ফুটের এক মেস রুমে ফিরে জামিল যখন ক্লান্তিতে ঘুমে ঢলে পড়ত, অবন্তী তখন হয়তো ফোনে অপেক্ষা করত একটুখানি আদরের কথার জন্য, ফোনে একটু চুমো খাওয়ার আশায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ল্যাপটপ খুলে প্রেজেন্টেশন বানাতে বানাতে জামিল বলত, ‘আর কয়েকটা মাস অবু, প্রমোশনটা পেয়ে নিই... তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।’
কিন্তু কোনো কিছুই ঠিক হয় না। সময়ে দিতে না পারা, ক্লান্তির অজুহাত আর অভিমানের দেয়াল প্রতিদিন এক ইঞ্চি করে উঁচু হতে লাগল। তারপরেই এলো সেই ঝড়, যা জামিলকে ভেতর থেকে একদম গুঁড়িয়ে দিল। অবন্তীর অফিসে ততদিনে নতুন এক ম্যানেজারের আগমন ঘটেছে— স্মার্ট, গোছানো, এবং অবন্তীকে দেওয়ার মতো যার প্রচুর সময় ও আভিজাত্য ছিল। জামিল ভেবেছিল তাদের চার বছরের ভালোবাসার শক্ত ভিত অন্তত কোনো তৃতীয় ব্যক্তির ছায়ায় ডগমগ করবে না। কিন্তু একদিন সন্ধ্যায় অবন্তীর ল্যাপটপে ভুল করে খোলা থেকে যাওয়া চ্যাটবক্স আর রেস্তোরাঁর বিলে চোখ পড়ার পর জামিলর পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল।
যে অবন্তী বলত— ‘শুধু এক কাপ চা আর তুমি হলেই চলবে’, সেই অবন্তীই খুব শান্ত গলায় একদিন গুলশানের এক অভিজাত কফিশপে বসে জামিলের চোখে চোখ রেখে বলেছিল, ‘বাস্তবতা দিয়ে চিন্তা করো জামিল। তোমার এই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, মেসে থাকা জীবন আর প্রমোশনের অপেক্ষায় আমি আমার পুরো জীবন আটকে রাখতে পারি না। মিল্টন আমাকে একটা গোছানো জীবন দিতে পারবে... যেটা তোমার কাছে শুধুই আশ্বাস।’
বিশ্বাসের ঘর ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার সেই শব্দটা কোনো ল্যাপটপের কিবোর্ড বা বাসের হর্নের শব্দ চাপা দিতে পারেনি। বাসের হঠাৎ এক তীব্র ঝাকুনিতে জামিলের স্মৃতির সুতো ছিঁড়ে গেল। সে এখন আর সেই একতারা হাতে ঘুরে বেড়ানো, অবন্তীর প্রেমে বুঁদ থাকা তরুণ নয়। বাসটা মোড় পেরিয়ে একটু সামনে এগোল। বৃষ্টি এখন বেশ জমে উঠেছে। জানালার কাচ বেয়ে জলের ফোঁটাগুলো নিচে নেমে যাচ্ছে, ঠিক যেন চোখের পানির মতো। জামিল পকেট থেকে ইয়ারফোনটা বের করে কানে গুঁজে দিল।
আজ রোববার, সপ্তাহের শুরু। কাল আবার সেই একই রুটিন— অ্যালার্মের যান্ত্রিক শব্দে ঘুম ভাঙা, বুয়ার হাতের আধসেদ্ধ ভাত গিলে অফিসে ছুটে যাওয়া, আর দিনশেষে একটা নিজের ঘরের খোঁজে অচেনা গলিতে হেঁটে বেড়ানো। মোবাইলে রিং বেজে উঠল। বনানীর সেই বাড়িওয়ালার নম্বর।
‘হ্যালো, জামিল সাহেব? আপনি কোথায়? আপনি না আসলে আমি কিন্তু অন্য পার্টিকে চাবি বুঝিয়ে দেব। তাদের ঘর পছন্দ হয়েছে এবং তারা এডভ্যান্স দিতে চাচ্ছে।’
জামিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, ‘জি চাচা, আমি প্রায় চলে এসেছি। জ্যামে আটকে ছিলাম... আর দশ-পনের মিনিট লাগবে।’
কথা শেষ করে মোবাইলটা পকেটে রাখতে গিয়ে জামিল পকেট থেকে ওয়ালেটটা টেনে বের করে দেখল— ওয়ালেটটি বেশ পুরানো। জন্মদিনে চার বছর আগে অবন্তী কিনে দিয়েছিল। ওয়ালেটের ভিতর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটা পুরনো বাস টিকিট। পেছনের নীল কালিতে অবন্তীর হাতের টলমল হরফে লেখা: ‘প্রতিটা বৃষ্টিতেই আমি তোমার পাশে থাকতে চাই, জামিল।’
জামিল টিকিটটার দিকে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে জানালার সামান্য ফাঁক দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা কারওয়ান বাজারের কালো পিচঢালা রাস্তায় টিকিটটা ছেড়ে দিল। বাতাসে উবে গিয়ে সেটা মিশে গেল কর্দমাক্ত কাদায়। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই, তার ফোনের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। কোনো অজানা বা নতুন নম্বর নয়। ডিসপ্লেতে ভেসে উঠেছে একটা চেনা নাম— অবন্তী। নিচে ছোট করে লেখা একটি নতুন টেক্সট মেসেজ:
‘জামিল, বনানীর যে বাসাটা তুমি দেখতে যাচ্ছ... তিন তলার ডানপাশের ফ্ল্যাটটা কি? গাড়ি বারান্দায় একটা নীল ছাতা হেলান দিয়ে রাখা?’
জামিলের বুকের ভেতরটা হঠাৎ হীম হয়ে গেল। বাসের জানালা দিয়ে সে বাইরের বৃষ্টি দেখতে দেখতে থমকে গেল। অবন্তী এই বাসার ঠিকানা জানল কীভাবে? সে কি এখনও জামিলের পিছু ছাড়েনি, নাকি জামিলের এই চেনা হাহাকারের গন্তব্যটাই আসলে অন্য কারো আগে থেকেই সাজানো কোনো ছক?
বাসের হর্ন আর বৃষ্টির শব্দের মাঝেই বিলু কাঁপা হাতে ফোনটা কান পর্যন্ত নিল না, শুধু টেক্সট বক্সটা খুলে ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই অবন্তীর দ্বিতীয় মেসেজটা এলো:
‘মিল্টনের সাথে আমার সব শেষ হয়ে গেছে, জামিল। ও যে আমাকে কতটা ধোঁকা দিয়েছে, তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। আমি জানি তুমি আজও আমায় ভালোবাসো। তাই এই বাসাটা আমি নিজে তিন মাসের অ্যাডভান্স দিয়ে তোমার জন্য বুক করে রেখেছি... এসো, আমরা আবার নতুন করে শুরু করি।’
শব্দগুলো পড়ার পর জামিলের মাথাটা এক মুহূর্তের জন্য একদম ফাঁকা হয়ে গেল। বাসের কাচে ভেসে ওঠা নিজের আবছা প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল সে। সেখানে কোনো প্রেমিক পুরুষ দাঁড়িয়ে নেই; দাঁড়িয়ে আছে কর্পোরেট ঘানি টানা এক ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অবয়ব। যে মেয়েটা ক্যারিয়ার, স্থায়িত্ব আর আলোর ঝলকানির লোভ পড়ে তাকে কাদার মধ্যে ফেলে এক লহমায় পর করে দিয়েছিল— আজ তার রাজপ্রাসাদ ভেঙে পড়ছে বলেই কি সে আবার জামিলের দরজায় ফিরে এসেছে? ভালোবাসার নামে এই দানছত্র, এই বাসা ভাড়া করে দেওয়া কি সত্যিই অনুশোচনা, নাকি আবারও জামিলকে একটা হাতের পুতুল বানিয়ে নিজের অপরাধবোধ হালকা করার একটা অপচেষ্টা?
বৃষ্টিভেজা রাতের অন্ধকারের দিকে তাকাতে তাকাতে সে মনে মনে ভাবল— গৃহহীন হওয়া কঠিন, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বেঁচে দিয়ে কারোর করুণার ছাদ মাথায় নেওয়া তারচেয়েও বেশি বিষাক্ত। জামিল বনানী না নেমে আবার ফিরতি গাড়িতে কলাবাগান চলে আসল তার পুরানো মেসে। তার বুকের ভেতরের সেই বিষাক্ত শ্বাসরোধকারী অনুভূতিটা আর নেই। প্রথমবার এই নিঃস্ব ব্যাচেলর জীবনটাকে তার কাছে ভীষণ মুক্ত, স্বাধীন আর নিজের বলে মনে হলো।
সামনের কালচে অলিগলির মাঝে হাজারটা আলো জ্বলছে। এই বিশাল শহরে আজ তার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই ঠিকই, কিন্তু নিজের ওপর নিজের অধিকারটুকু সে ফের খুঁজে পেয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন