আমেরিকার আইনি ইতিহাসে ডোনাল্ড ইউজিন মিলার জুনিয়রের ঘটনাটি এক বিরল ও অদ্ভুত উদাহরণ। ২০১৩ সালের অক্টোবরে ওহাইওর হ্যানকক কাউন্টির প্রোবেট আদালতে হাজির হন ৬১ বছর বয়সী এই ব্যক্তি। তিনি সুস্থ, সবল, কথা বলছেন, হাঁটছেন- আদালতকক্ষে দাঁড়িয়ে বিচারকের সামনে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছেন।
বিচারককে উদ্দেশ করে বলছিলেন, ‘ইওর ওনার, আমি জীবিত তবুও আমাকে মৃত বলছেন কেন বারবার? তবে বিচারক তার সিদ্ধান্তে অটল। বার বার করে বলে যাচ্ছিলেন, ‘আপনি এখনও আইনগতভাবে মৃত।’
১৯৮৬ সালে চাকরি হারানোর পর মদ্যপানের আসক্তি এবং প্রায় ২৬ হাজার ডলার বকেয়া সন্তানের ভরণপোষণের চাপে নিজের পরিবার ছেড়ে নিখোঁজ হয়ে যান ডোনাল্ড মিলার। তারপর টানা আট বছর তার কোনো খোঁজ মেলেনি।
১৯৯৪ সালে তার সাবেক স্ত্রী রবিন মিলার আদালতে আবেদন করেন, যাতে তাকে আইনগতভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়। এর ফলে তাদের দুই মেয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় উত্তরাধিকারভিত্তিক ভাতা পেতে পারে। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে।মিলারকে আইনগতভাবে মৃত ঘোষণা করা হয় ।
এরপর দীর্ঘ সময় মিলার জর্জিয়া ও ফ্লোরিডায় পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন অস্থায়ী কাজ করে জীবন কাটান। ২০০৫ সালে ওহাইওতে ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, সরকারি নথিতে তিনি এখন মৃত ব্যক্তি! নিজের পরিচয়, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর ফিরে পেতে ২০১৩ সালে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন।
বিচারক অ্যালান ডেভিস স্বীকার করেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি সুস্থ ও জীবিত। কিন্তু তারপরও তাকে আইনগতভাবে মৃতই থাকতে হবে বলে রায় দেন।কারণ ওহাইও অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণার আদেশ চ্যালেঞ্জ বা বাতিল করার জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। মিলার প্রায় ২০ বছর পর আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় সেই সময়সীমা অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
বিচারক বলেন, আইন তাকে রায় পরিবর্তনের সুযোগ দেয় না। বিচারকের ভাষায়, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি আপনি এখানে বসে আছেন, আপনি সুস্থ আছেন, কিন্তু আইন আমাকে মৃত্যুর পূর্ববর্তী রায় পরিবর্তন করতে বাধা দেয়।’
এই রায়ের ফলে তিনি দীর্ঘ সময় বৈধভাবে কাজ করা, গাড়ি চালানো বা ব্যাংক হিসাব খোলার মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন।তবে আদালত থেকে বের হওয়ার পর একটি বিষয় নিয়ে তিনি স্বস্তি পান- যেহেতু আইন তাকে মৃত হিসেবেই গণ্য করছে, তাই তার বকেয়া সন্তানের ভরণপোষণের অর্থ আদায় করাও কার্যত সম্ভব নয়। কারণ আইন মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে পারে না!
পরে ডোনাল্ড মিলার যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের মাধ্যমে নতুন পরিচয় পাওয়ার উদ্যোগ নেন। এর ফলে তিনি আবার বৈধভাবে কাজ করা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ পান।তবে তার জন্মের সময় দেওয়া মূল সামাজিক নিরাপত্তা পরিচয়টি সরকারি নথিতে আজও মৃত হিসেবেই চিহ্নিত রয়েছে।
ঘটনাটি আইনি জটিলতার এক অনন্য উদাহরণ। একজন জীবিত ব্যক্তি আদালতে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করেও আইনের চোখে মৃত থেকেছেন- যেন কাফকা বা জোসেফ হেলারের কোনো উপন্যাস থেকে উঠে আসা এক হাস্যকর অথচ মর্মান্তিক বাস্তবতা।

শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬
আমেরিকার আইনি ইতিহাসে ডোনাল্ড ইউজিন মিলার জুনিয়রের ঘটনাটি এক বিরল ও অদ্ভুত উদাহরণ। ২০১৩ সালের অক্টোবরে ওহাইওর হ্যানকক কাউন্টির প্রোবেট আদালতে হাজির হন ৬১ বছর বয়সী এই ব্যক্তি। তিনি সুস্থ, সবল, কথা বলছেন, হাঁটছেন- আদালতকক্ষে দাঁড়িয়ে বিচারকের সামনে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছেন।
বিচারককে উদ্দেশ করে বলছিলেন, ‘ইওর ওনার, আমি জীবিত তবুও আমাকে মৃত বলছেন কেন বারবার? তবে বিচারক তার সিদ্ধান্তে অটল। বার বার করে বলে যাচ্ছিলেন, ‘আপনি এখনও আইনগতভাবে মৃত।’
১৯৮৬ সালে চাকরি হারানোর পর মদ্যপানের আসক্তি এবং প্রায় ২৬ হাজার ডলার বকেয়া সন্তানের ভরণপোষণের চাপে নিজের পরিবার ছেড়ে নিখোঁজ হয়ে যান ডোনাল্ড মিলার। তারপর টানা আট বছর তার কোনো খোঁজ মেলেনি।
১৯৯৪ সালে তার সাবেক স্ত্রী রবিন মিলার আদালতে আবেদন করেন, যাতে তাকে আইনগতভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়। এর ফলে তাদের দুই মেয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় উত্তরাধিকারভিত্তিক ভাতা পেতে পারে। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে।মিলারকে আইনগতভাবে মৃত ঘোষণা করা হয় ।
এরপর দীর্ঘ সময় মিলার জর্জিয়া ও ফ্লোরিডায় পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন অস্থায়ী কাজ করে জীবন কাটান। ২০০৫ সালে ওহাইওতে ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, সরকারি নথিতে তিনি এখন মৃত ব্যক্তি! নিজের পরিচয়, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর ফিরে পেতে ২০১৩ সালে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন।
বিচারক অ্যালান ডেভিস স্বীকার করেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি সুস্থ ও জীবিত। কিন্তু তারপরও তাকে আইনগতভাবে মৃতই থাকতে হবে বলে রায় দেন।কারণ ওহাইও অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণার আদেশ চ্যালেঞ্জ বা বাতিল করার জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। মিলার প্রায় ২০ বছর পর আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় সেই সময়সীমা অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
বিচারক বলেন, আইন তাকে রায় পরিবর্তনের সুযোগ দেয় না। বিচারকের ভাষায়, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি আপনি এখানে বসে আছেন, আপনি সুস্থ আছেন, কিন্তু আইন আমাকে মৃত্যুর পূর্ববর্তী রায় পরিবর্তন করতে বাধা দেয়।’
এই রায়ের ফলে তিনি দীর্ঘ সময় বৈধভাবে কাজ করা, গাড়ি চালানো বা ব্যাংক হিসাব খোলার মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন।তবে আদালত থেকে বের হওয়ার পর একটি বিষয় নিয়ে তিনি স্বস্তি পান- যেহেতু আইন তাকে মৃত হিসেবেই গণ্য করছে, তাই তার বকেয়া সন্তানের ভরণপোষণের অর্থ আদায় করাও কার্যত সম্ভব নয়। কারণ আইন মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে পারে না!
পরে ডোনাল্ড মিলার যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের মাধ্যমে নতুন পরিচয় পাওয়ার উদ্যোগ নেন। এর ফলে তিনি আবার বৈধভাবে কাজ করা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ পান।তবে তার জন্মের সময় দেওয়া মূল সামাজিক নিরাপত্তা পরিচয়টি সরকারি নথিতে আজও মৃত হিসেবেই চিহ্নিত রয়েছে।
ঘটনাটি আইনি জটিলতার এক অনন্য উদাহরণ। একজন জীবিত ব্যক্তি আদালতে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করেও আইনের চোখে মৃত থেকেছেন- যেন কাফকা বা জোসেফ হেলারের কোনো উপন্যাস থেকে উঠে আসা এক হাস্যকর অথচ মর্মান্তিক বাস্তবতা।

আপনার মতামত লিখুন