সবুজ
পাসপোর্ট বুকে চেপে যখন
মোস্তাফিজুর রহমান অনিক কিংবা অক্ষয়
চন্দ্র দাসরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দরের ৩ নম্বর গেট
দিয়ে ভেতরে ঢুকছিলেন, তখন তাদের চোখে
ছিল ইউরোপের ঝলমলে আকাশ, আর বুকে ছিল
এক বুক রঙিন স্বপ্ন।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার অনিক আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার
নবীনগরের অক্ষয়ের মতো মধ্যবিত্ত ঘরের
যুবকদের কাছে ইতালি পৌঁছানো
মানেই পরিবারের ভাগ্যবদল।
কিন্তু
সেই স্বপ্নের শেষ পরিণতি যে
ঢাকা বিমানবন্দরের লাল জোনের অন্ধকার
বাথরুমে, কিংবা রোম বিমানবন্দর থেকে
কান্নায় ভেঙে পড়ে শূন্য
হাতে ফিরে আসায় হবে;
তা হয়তো তারা কল্পনাও
করেননি।
শাহজালাল
বিমানবন্দর দিয়ে নেপাল যাওয়ার
নামে ইতালির জাল ভিসা পিঠে
সেঁটে মানব পাচারের যে
ভয়ঙ্কর ও অভিনব এক
নাটকের মঞ্চায়ন হয়েছে, তা সস্প্রতি উদঘাটন
করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই
চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির নেপথ্যে রয়েছে বিমানবন্দরের ভেতরের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট,
যাদের খপ্পরে পড়ে আজ নিঃস্ব
সাধারণ মানুষ, আর বহির্বিশ্বে ক্ষুণ্ন
হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি।
নেপাল
ভ্রমণের আড়ালে রোম যাত্রা: যেভাবে চলতো সেই ‘বাথরুম অপারেশন’
তদন্ত
সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের
তথ্যানুযায়ী, মানব পাচারকারী চক্রটি
অত্যন্ত চতুর এবং অভিনব
এক কৌশল বেছে নিয়েছিল।
গত ২৬ মে সকাল
৮টার দিকে অনিক ও
অক্ষয়সহ তিনজন যাত্রী বিমানবন্দরের বোর্ডিং এলাকার বিশেষ গেট (র-ডি)
দিয়ে প্রবেশ করেন। তাদের মূল গন্তব্য দেখানো
হয়েছিল নেপাল।
তারা
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কাঠমান্ডুগামী ফ্লাইট ‘বিজি-৩৭১’ এর
জন্য বোর্ডিং পাসও সংগ্রহ করেন।
কিন্তু রহস্যজনকভাবে তারা ইমিগ্রেশন এরিয়ায়
প্রবেশ না করে স্টাফ
এক্সিট গেট নম্বর ৫
দিয়ে বের হয়ে বিমানবন্দরের
বহুতল কার পার্কিং এলাকায়
চলে যান। সেখানে আগে
থেকেই ওৎ পেতে ছিল
দালাল চক্রের সদস্যরা।
কার
পার্কিংয়ের অন্ধকার কোণে পার্ক করা
একটি প্রাইভেট কারের ভেতর বসে মুহূর্তের
মধ্যে বদলে যায় পুরো
দৃশ্যপট। দালালরা তাদের হাতে তুলে দেয়
ইতালির জাল স্টিকার ভিসা,
রোমগামী বাংলাদেশ বিমানের টিকিট এবং বোর্ডিং পাস।
এরপর
সকাল ৮টা ৪১ মিনিটে
তারা ৬ নম্বর হেভি
লাগেজ গেট দিয়ে পুনরায়
বিমানবন্দরে প্রবেশ করে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে
যান। সেখানে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে নেপাল ভ্রমণের ভ্রমণ নথিপত্র উপস্থাপন করলে ১, ৫
এবং ৬ নম্বর ডেস্কে
কর্মরত কর্মকর্তারা তা যাচাই করে
সঠিক পান এবং তাদের
ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করেন।
আসল
খেলাটি শুরু হয় ইমিগ্রেশন
পার হওয়ার পর। দালালের পূর্ব
নির্দেশনা অনুযায়ী যাত্রীরা বিমানবন্দরের অতি সুরক্ষিত ‘রেড
জোন’-এর একটি বাথরুমে
প্রবেশ করেন। সেখানে ঢুকে অনিক তার
পাসপোর্টের ৫ নম্বর পৃষ্ঠায়
এবং অক্ষয় তার পাসপোর্টের ৭
নম্বর পাতায় ইতালির ভুয়ো স্টিকার ভিসাটি
নিজ হাতে আঠা দিয়ে
লাগিয়ে নেন।
শুধু
তাই নয়, আসল ভিসার
মতো নিখুঁত দেখতে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা জাল
সিলও পাসপোর্টে বসানো হয়। এরপর অত্যন্ত
সতর্কতার সাথে নেপাল যাওয়ার
সমস্ত আসল নথিপত্র বাথরুমের
কমোডে ফেলে ফ্লাশ করে
আলামত নষ্ট করে দেওয়া
হয়। এভাবে নেপালের যাত্রী এক নিমেষেই রূপান্তরিত
হন ইতালির যাত্রীতে।
বিমানের
অসাধু কর্মকর্তা ও রক্ষকের বেশে ভক্ষক যারা
বাথরুম
থেকে বের হয়ে যাত্রীরা
যখন ইতালির জাল ভিসা বুকে
নিয়ে বোর্ডিং ব্রিজ সি-২ এর
আইএনএস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশারালাইজেশন সার্ভিস) গেটে যান, তখন
তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন খোদ বিমানের
ভেতরকার এক অসাধু কর্মকর্তা।
নিয়ম
অনুযায়ী আইএনএস গেটে পাসপোর্ট ও
ভিসা চূড়ান্ত পরীক্ষা করার কথা থাকলেও,
সেখানে কর্তব্যরত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার এখলাসুর রহমান যাত্রীদের কোনো প্রকার চেকিং
ছাড়াই গেট পার করে
দেন।
সকাল
১০টা ৯ মিনিটে রোমগামী
ফ্লাইট ‘বিজি-৩৫৫’ তে
চড়ে বসেন তারা। একই
দিনে, একই সময়ে, একই
এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে একজন যাত্রী কীভাবে
দুটি ভিন্ন দেশের বোর্ডিং পাস পেলেন; তা
নিয়ে এখন খোদ বিমান
কর্তৃপক্ষের দিকেই আঙুল উঠছে।
তিন
যাত্রীর মধ্যে একজন রোম বিমানবন্দরে
নেমে পাচারকারীদের সহায়তায় ইমিগ্রেশন পার হতে পারলেও,
অনিক ও অক্ষয় ইতালির
ইমিগ্রেশন পুলিশের তীক্ষ্ণ নজরে ধরা পড়ে
যান। তাদের পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসাটি
সম্পূর্ণ জাল হিসেবে চিহ্নিত
করে ইতালি কর্তৃপক্ষ। তিন দিন আটক
রাখার পর গত ২৯
মে একই বিমানের ফিরতি
ফ্লাইটে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
শুধু তাই নয়, জাল
ভিসার অবৈধ যাত্রী বহন
করার অপরাধে ইতালির বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে প্রায় ১০ হাজার ইউরো
জরিমানা করেছে।
“আমরা
প্রতারণার শিকার”: ভুক্তভোগীদের কান্না ও সিআইডির সাঁড়াশি অভিযান
রোম
থেকে ফেরত আসার পর
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখতেই আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর
জেরার মুখে পড়েন অনিক
ও অক্ষয়। সিআইডি ও ইমিগ্রেশন পুলিশের
যৌথ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে কান্নায় ভেঙে
পড়েন তারা।
সিআইডির
কাছে দেওয়া লিখিত ও মৌখিক জবানবন্দিতে
তারা জানান, তারা মানব পাচারকারী
চক্রের ‘নিষ্ঠুর প্রতারণার শিকার’ হয়েছেন। ইউরোপে যাওয়ার অন্ধ মোহে জীবনের
সব সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলেন দালালদের
হাতে, অথচ ‘তারা জানতেনই
না যে ভিসাটি জাল
ছিল’। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী
মোস্তাফিজুর রহমান অনিক বাদী হয়ে
বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের
করেছেন।
মামলাটির
তদন্তভার এখন সিআইডির বিশেষায়িত
মানব পাচার দমন টিমের হাতে।
তদন্তের তদারকি কর্মকর্তা ও সিআইডির একজন
বিশেষ পুলিশ সুপার এই প্রতিবেদককে বলেন,
“এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় খোদ বিমান বাংলাদেশ
এয়ারলাইন্সের অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত। আমরা ইতিমধ্যেই জুনিয়র
গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার এখলাসুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করেছে,
এই অবৈধ মানব পাচারের
জন্য সে যাত্রীপ্রতি ২
লাখ টাকা করে নিত।
সে এই চক্রের আরও
৪ থেকে ৫ জনের
নাম প্রকাশ করেছে। পুরো সিন্ডিকেটটিকে আমরা
চিহ্নিত করেছি এবং সবাইকে আইনের
আওতায় আনতে সিআইডির টিম
মাঠে কাজ করছে।”
এছাড়া
ইতালি সরকার বিমানকে দেওয়া ১০ হাজার ইউরো
জরিমানার কাগজটি উদ্ধারের চেষ্টাও চলছে বলে জানান
তিনি।
আইএনএস
গেটের ইমিগ্রেশন ডেস্ক বন্ধ কেন? সিভিল এভিয়েশনের দিকে আঙুল
এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতির পেছনে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক বিরাট গলদ
ও সমন্বয়হীনতার চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে
জানা যায়, অতীতে বিমানবন্দরে
আইএনএস গেটে বৈধ যাত্রী
নিশ্চিত করার জন্য দুটি
ডেস্ক পাশাপাশি কাজ করত; একটি
এয়ারলাইন্সের স্টাফ ডেস্ক এবং অন্যটি ইমিগ্রেশন
পুলিশের ডেস্ক। কিন্তু করোনা মহামারীর সময় আইএনএস গেট
থেকে ইমিগ্রেশনের ডেস্কটি সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। মহামারী শেষ হওয়ার পর
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও রহস্যজনক কারণে
সেই ডেস্কটি আর চালু করা
যায়নি।
ইমিগ্রেশন
কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পরিস্থিতি
স্বাভাবিক হওয়ার পর আমরা আইএনএস
গেটে পুনরায় চেকিং কার্যক্রম শুরু করার জন্য
ডেস্কটি স্থাপনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (বেবিচক) এতে রাজী হয়নি
এবং কোনো সহযোগিতা করেনি।
ফলে চূড়ান্ত ইমিগ্রেশন চেকিং ছাড়াই যাত্রীরা বিমানে উঠে যাচ্ছেন, যার
সুযোগ নিচ্ছে এই পাচারকারী চক্র।
আইএনএস গেটে ইমিগ্রেশন পুলিশের
কঠোর নজরদারি থাকলে বাথরুমে ভিসা বদলানোর এই
অপকৌশল অনেক আগেই ভেস্তে
দেওয়া যেত।”
ইমিগ্রেশন
কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তাদের উচ্চপর্যায়ে জানিয়ে অবিলম্বে এই গেটের কার্যক্রম
আগের মতো চালু করার
জোর সুপারিশ করেছে।
এদিকে,
এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি এবং জরিমানার বিষয়ে
জানতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম)সহ বেশ
কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা
ফোন রিসিভ করেননি।
শনিবার সন্ধ্যায় জিএম-এর নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে “এটি রং নম্বর” বলে সংযোগটি কেটে দেন। ফলে বিমান কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬
সবুজ
পাসপোর্ট বুকে চেপে যখন
মোস্তাফিজুর রহমান অনিক কিংবা অক্ষয়
চন্দ্র দাসরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দরের ৩ নম্বর গেট
দিয়ে ভেতরে ঢুকছিলেন, তখন তাদের চোখে
ছিল ইউরোপের ঝলমলে আকাশ, আর বুকে ছিল
এক বুক রঙিন স্বপ্ন।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার অনিক আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার
নবীনগরের অক্ষয়ের মতো মধ্যবিত্ত ঘরের
যুবকদের কাছে ইতালি পৌঁছানো
মানেই পরিবারের ভাগ্যবদল।
কিন্তু
সেই স্বপ্নের শেষ পরিণতি যে
ঢাকা বিমানবন্দরের লাল জোনের অন্ধকার
বাথরুমে, কিংবা রোম বিমানবন্দর থেকে
কান্নায় ভেঙে পড়ে শূন্য
হাতে ফিরে আসায় হবে;
তা হয়তো তারা কল্পনাও
করেননি।
শাহজালাল
বিমানবন্দর দিয়ে নেপাল যাওয়ার
নামে ইতালির জাল ভিসা পিঠে
সেঁটে মানব পাচারের যে
ভয়ঙ্কর ও অভিনব এক
নাটকের মঞ্চায়ন হয়েছে, তা সস্প্রতি উদঘাটন
করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই
চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির নেপথ্যে রয়েছে বিমানবন্দরের ভেতরের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট,
যাদের খপ্পরে পড়ে আজ নিঃস্ব
সাধারণ মানুষ, আর বহির্বিশ্বে ক্ষুণ্ন
হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি।
নেপাল
ভ্রমণের আড়ালে রোম যাত্রা: যেভাবে চলতো সেই ‘বাথরুম অপারেশন’
তদন্ত
সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের
তথ্যানুযায়ী, মানব পাচারকারী চক্রটি
অত্যন্ত চতুর এবং অভিনব
এক কৌশল বেছে নিয়েছিল।
গত ২৬ মে সকাল
৮টার দিকে অনিক ও
অক্ষয়সহ তিনজন যাত্রী বিমানবন্দরের বোর্ডিং এলাকার বিশেষ গেট (র-ডি)
দিয়ে প্রবেশ করেন। তাদের মূল গন্তব্য দেখানো
হয়েছিল নেপাল।
তারা
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কাঠমান্ডুগামী ফ্লাইট ‘বিজি-৩৭১’ এর
জন্য বোর্ডিং পাসও সংগ্রহ করেন।
কিন্তু রহস্যজনকভাবে তারা ইমিগ্রেশন এরিয়ায়
প্রবেশ না করে স্টাফ
এক্সিট গেট নম্বর ৫
দিয়ে বের হয়ে বিমানবন্দরের
বহুতল কার পার্কিং এলাকায়
চলে যান। সেখানে আগে
থেকেই ওৎ পেতে ছিল
দালাল চক্রের সদস্যরা।
কার
পার্কিংয়ের অন্ধকার কোণে পার্ক করা
একটি প্রাইভেট কারের ভেতর বসে মুহূর্তের
মধ্যে বদলে যায় পুরো
দৃশ্যপট। দালালরা তাদের হাতে তুলে দেয়
ইতালির জাল স্টিকার ভিসা,
রোমগামী বাংলাদেশ বিমানের টিকিট এবং বোর্ডিং পাস।
এরপর
সকাল ৮টা ৪১ মিনিটে
তারা ৬ নম্বর হেভি
লাগেজ গেট দিয়ে পুনরায়
বিমানবন্দরে প্রবেশ করে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে
যান। সেখানে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে নেপাল ভ্রমণের ভ্রমণ নথিপত্র উপস্থাপন করলে ১, ৫
এবং ৬ নম্বর ডেস্কে
কর্মরত কর্মকর্তারা তা যাচাই করে
সঠিক পান এবং তাদের
ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করেন।
আসল
খেলাটি শুরু হয় ইমিগ্রেশন
পার হওয়ার পর। দালালের পূর্ব
নির্দেশনা অনুযায়ী যাত্রীরা বিমানবন্দরের অতি সুরক্ষিত ‘রেড
জোন’-এর একটি বাথরুমে
প্রবেশ করেন। সেখানে ঢুকে অনিক তার
পাসপোর্টের ৫ নম্বর পৃষ্ঠায়
এবং অক্ষয় তার পাসপোর্টের ৭
নম্বর পাতায় ইতালির ভুয়ো স্টিকার ভিসাটি
নিজ হাতে আঠা দিয়ে
লাগিয়ে নেন।
শুধু
তাই নয়, আসল ভিসার
মতো নিখুঁত দেখতে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা জাল
সিলও পাসপোর্টে বসানো হয়। এরপর অত্যন্ত
সতর্কতার সাথে নেপাল যাওয়ার
সমস্ত আসল নথিপত্র বাথরুমের
কমোডে ফেলে ফ্লাশ করে
আলামত নষ্ট করে দেওয়া
হয়। এভাবে নেপালের যাত্রী এক নিমেষেই রূপান্তরিত
হন ইতালির যাত্রীতে।
বিমানের
অসাধু কর্মকর্তা ও রক্ষকের বেশে ভক্ষক যারা
বাথরুম
থেকে বের হয়ে যাত্রীরা
যখন ইতালির জাল ভিসা বুকে
নিয়ে বোর্ডিং ব্রিজ সি-২ এর
আইএনএস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশারালাইজেশন সার্ভিস) গেটে যান, তখন
তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন খোদ বিমানের
ভেতরকার এক অসাধু কর্মকর্তা।
নিয়ম
অনুযায়ী আইএনএস গেটে পাসপোর্ট ও
ভিসা চূড়ান্ত পরীক্ষা করার কথা থাকলেও,
সেখানে কর্তব্যরত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার এখলাসুর রহমান যাত্রীদের কোনো প্রকার চেকিং
ছাড়াই গেট পার করে
দেন।
সকাল
১০টা ৯ মিনিটে রোমগামী
ফ্লাইট ‘বিজি-৩৫৫’ তে
চড়ে বসেন তারা। একই
দিনে, একই সময়ে, একই
এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে একজন যাত্রী কীভাবে
দুটি ভিন্ন দেশের বোর্ডিং পাস পেলেন; তা
নিয়ে এখন খোদ বিমান
কর্তৃপক্ষের দিকেই আঙুল উঠছে।
তিন
যাত্রীর মধ্যে একজন রোম বিমানবন্দরে
নেমে পাচারকারীদের সহায়তায় ইমিগ্রেশন পার হতে পারলেও,
অনিক ও অক্ষয় ইতালির
ইমিগ্রেশন পুলিশের তীক্ষ্ণ নজরে ধরা পড়ে
যান। তাদের পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসাটি
সম্পূর্ণ জাল হিসেবে চিহ্নিত
করে ইতালি কর্তৃপক্ষ। তিন দিন আটক
রাখার পর গত ২৯
মে একই বিমানের ফিরতি
ফ্লাইটে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
শুধু তাই নয়, জাল
ভিসার অবৈধ যাত্রী বহন
করার অপরাধে ইতালির বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে প্রায় ১০ হাজার ইউরো
জরিমানা করেছে।
“আমরা
প্রতারণার শিকার”: ভুক্তভোগীদের কান্না ও সিআইডির সাঁড়াশি অভিযান
রোম
থেকে ফেরত আসার পর
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখতেই আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর
জেরার মুখে পড়েন অনিক
ও অক্ষয়। সিআইডি ও ইমিগ্রেশন পুলিশের
যৌথ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে কান্নায় ভেঙে
পড়েন তারা।
সিআইডির
কাছে দেওয়া লিখিত ও মৌখিক জবানবন্দিতে
তারা জানান, তারা মানব পাচারকারী
চক্রের ‘নিষ্ঠুর প্রতারণার শিকার’ হয়েছেন। ইউরোপে যাওয়ার অন্ধ মোহে জীবনের
সব সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলেন দালালদের
হাতে, অথচ ‘তারা জানতেনই
না যে ভিসাটি জাল
ছিল’। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী
মোস্তাফিজুর রহমান অনিক বাদী হয়ে
বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের
করেছেন।
মামলাটির
তদন্তভার এখন সিআইডির বিশেষায়িত
মানব পাচার দমন টিমের হাতে।
তদন্তের তদারকি কর্মকর্তা ও সিআইডির একজন
বিশেষ পুলিশ সুপার এই প্রতিবেদককে বলেন,
“এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় খোদ বিমান বাংলাদেশ
এয়ারলাইন্সের অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত। আমরা ইতিমধ্যেই জুনিয়র
গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার এখলাসুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করেছে,
এই অবৈধ মানব পাচারের
জন্য সে যাত্রীপ্রতি ২
লাখ টাকা করে নিত।
সে এই চক্রের আরও
৪ থেকে ৫ জনের
নাম প্রকাশ করেছে। পুরো সিন্ডিকেটটিকে আমরা
চিহ্নিত করেছি এবং সবাইকে আইনের
আওতায় আনতে সিআইডির টিম
মাঠে কাজ করছে।”
এছাড়া
ইতালি সরকার বিমানকে দেওয়া ১০ হাজার ইউরো
জরিমানার কাগজটি উদ্ধারের চেষ্টাও চলছে বলে জানান
তিনি।
আইএনএস
গেটের ইমিগ্রেশন ডেস্ক বন্ধ কেন? সিভিল এভিয়েশনের দিকে আঙুল
এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতির পেছনে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক বিরাট গলদ
ও সমন্বয়হীনতার চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে
জানা যায়, অতীতে বিমানবন্দরে
আইএনএস গেটে বৈধ যাত্রী
নিশ্চিত করার জন্য দুটি
ডেস্ক পাশাপাশি কাজ করত; একটি
এয়ারলাইন্সের স্টাফ ডেস্ক এবং অন্যটি ইমিগ্রেশন
পুলিশের ডেস্ক। কিন্তু করোনা মহামারীর সময় আইএনএস গেট
থেকে ইমিগ্রেশনের ডেস্কটি সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। মহামারী শেষ হওয়ার পর
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও রহস্যজনক কারণে
সেই ডেস্কটি আর চালু করা
যায়নি।
ইমিগ্রেশন
কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পরিস্থিতি
স্বাভাবিক হওয়ার পর আমরা আইএনএস
গেটে পুনরায় চেকিং কার্যক্রম শুরু করার জন্য
ডেস্কটি স্থাপনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (বেবিচক) এতে রাজী হয়নি
এবং কোনো সহযোগিতা করেনি।
ফলে চূড়ান্ত ইমিগ্রেশন চেকিং ছাড়াই যাত্রীরা বিমানে উঠে যাচ্ছেন, যার
সুযোগ নিচ্ছে এই পাচারকারী চক্র।
আইএনএস গেটে ইমিগ্রেশন পুলিশের
কঠোর নজরদারি থাকলে বাথরুমে ভিসা বদলানোর এই
অপকৌশল অনেক আগেই ভেস্তে
দেওয়া যেত।”
ইমিগ্রেশন
কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তাদের উচ্চপর্যায়ে জানিয়ে অবিলম্বে এই গেটের কার্যক্রম
আগের মতো চালু করার
জোর সুপারিশ করেছে।
এদিকে,
এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি এবং জরিমানার বিষয়ে
জানতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম)সহ বেশ
কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা
ফোন রিসিভ করেননি।
শনিবার সন্ধ্যায় জিএম-এর নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে “এটি রং নম্বর” বলে সংযোগটি কেটে দেন। ফলে বিমান কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

আপনার মতামত লিখুন