বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচ শেষ হতেই মাঠে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনা দলের ফুটবলাররা তাদের অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে শূন্যে তুলে নেন। কোনো শিরোপা জয় বা ফাইনাল নয়, তবুও মেসিকে ঘিরে সতীর্থদের এই উদযাপন যেন এক গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
৩৯ বছর বয়সী মেসিকে ঘিরে সতীর্থদের এই উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে, বিশ্ব ফুটবলের এই কিংবদন্তিকে মানুষ কেবল সেরা খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, বরং একজন অসামান্য মানুষ হিসেবেও মূল্যায়ন করে।
মেসির নেতৃত্ব নিয়ে ড্রেসিংরুমেও রয়েছে ভিন্ন চিত্র। তিনি প্রথাগত চিৎকার বা বক্তৃতার বদলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। আর্জেন্টিনা দলের তরুণ ফুটবলার যেমন হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ বা অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টাররা শৈশব থেকেই মেসিকে দেখে বড় হয়েছেন।
দলের নতুন সদস্যদের উৎসাহ দেওয়া এবং জয়ের কৃতিত্ব সতীর্থদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার মানসিকতাই মেসিকে সবার কাছে একজন অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
একসময় নিজের দেশের সমর্থকদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে অবসরের ঘোষণা দিলেও মেসির প্রত্যাবর্তন আর্জেন্টাইন ফুটবলে নতুন যুগের সূচনা করে। তার নেতৃত্বেই দলটি এখন ব্যক্তিনির্ভরতা কাটিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ পরিবারে পরিণত হয়েছে। ম্যাচ শেষে তাকে সতীর্থদের আকাশে ছুড়ে তোলার দৃশ্যটি ছিল যেন একটি প্রতীকী সম্মাননা। সতীর্থদের নীরব বার্তাটি ছিল এমন, এতদিন মেসি তাদের সাফল্যের পথে বহন করে এনেছেন, এখন তাকে বহন করার দায়িত্ব তাদের।
প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গেও মেসির সম্পর্ক এখন দারুণ। ম্যাচের পর জার্সি বদল বা ছবি তোলার দৃশ্যগুলো এখন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোলসংখ্যা বা ট্রফির বাইরে মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা তাকে ঈর্ষা নয়, বরং হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে।
চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনার জয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেফারিং ও ভিএআর সিদ্ধান্তের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে গত মঙ্গলবার আমেরিকার আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মিশরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ের ম্যাচে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) ভূমিকা নিয়ে চলে জোর সমালোচনা।
অভিযোগ রয়েছে, আর্জেন্টিনা রেফারির সহায়তায় একের পর এক পেনাল্টি পাচ্ছে এবং প্রতিপক্ষের অনেক সিদ্ধান্ত তাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।
আর্জেন্টিনা-বিরোধীরা দাবি করছেন, কাতার বিশ্বকাপ থেকে বর্তমান আসর পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ধারাবাহিকভাবে রেফারির বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। মিশরের বিপক্ষে ম্যাচেও ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টাইনদের জয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে। বিশেষ করে মিশরের গোল বাতিল এবং শেষ গোলটির আগে ফাউলের আবেদনের প্রসঙ্গটি বারবার উঠে আসছে। অনেক দর্শকের মতে, আর্জেন্টিনা নিজে ভালো না খেলেও রেফারির উপহারে ম্যাচ জিতছে।
তবে পরিসংখ্যান ও খেলার বিশ্লেষণ অন্য কথা বলছে। ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, আর্জেন্টিনা যদি আক্রমণাত্মক ফুটবল না খেলত এবং প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে বারবার হানা না দিত, তবে রেফারির পক্ষে পেনাল্টি দেওয়া সম্ভব হতো না।
মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৫৯ শতাংশের বেশি সময় বল দখলে রেখেছিল এবং গোলের জন্য অন্তত ১৭ বার শট নিয়েছিল। ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনা ভেঙে না পড়ে সাঁড়াসি আক্রমণ চালিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে শেষ ১৩ মিনিটে তিনটি গোল আসে।
আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সালাহর কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে হুলিয়ান আলভারেজ দ্রুত লাউতারো মার্টিনেজের কাছে বল পাঠান। লাউতারোর নিখুঁত সেন্টারে এনজো ফার্নান্দেজ দারুণ হেডে গোলটি করেন। এই গোলটি প্রমাণ করে, খেলার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আর্জেন্টিনা বুদ্ধিদীপ্ত ও গোছানো ফুটবল খেলেছে। এছাড়া লিওনেল মেসি নিজে পুরো ম্যাচে আক্রমণ সাজানো ও সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছেন।
আজ রবিবারের ম্যাচেও একই ঘটনা ঘটেছে। প্রথমেই গোলে এগিয়ে গেলেও প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা আর গোল করতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধে সুইসরা গোল শোধ করলে, পরে ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা আর গোল ব্যবধান বাড়াতে পারে নি। পরে একের পর এক আক্রমনে অতিরিক্ত সময়ে আরও দুটি গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে প্রবেশ করে আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনা কেবল ‘ওয়ানম্যান শো’ বা মেসির ওপর নির্ভরশীল দল; এই ধারণা ভুল প্রমাণ করে দলের রক্ষণভাগ ও মিডফিল্ডারেরাও এখন সমানভাবে কার্যকর।
এর আগের ম্যাচে দেখা গেছে, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ আর্জেন্টিনার আক্রমণের চাপে ভুল করতে বাধ্য হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগের বিপরীতে আর্জেন্টিনার সমর্থক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, রেফারির ভুল সিদ্ধান্তে কোনো দলের হার-জিত নির্ধারণ হতে পারে, কিন্তু একটি দল রেফারির জোরেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারে না। আর্জেন্টিনার জয় এসেছে তাদের আক্রমণাত্মক খেলার তীব্রতা ও জয়ের দৃঢ় সংকল্প থেকেই।

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচ শেষ হতেই মাঠে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনা দলের ফুটবলাররা তাদের অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে শূন্যে তুলে নেন। কোনো শিরোপা জয় বা ফাইনাল নয়, তবুও মেসিকে ঘিরে সতীর্থদের এই উদযাপন যেন এক গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
৩৯ বছর বয়সী মেসিকে ঘিরে সতীর্থদের এই উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে, বিশ্ব ফুটবলের এই কিংবদন্তিকে মানুষ কেবল সেরা খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, বরং একজন অসামান্য মানুষ হিসেবেও মূল্যায়ন করে।
মেসির নেতৃত্ব নিয়ে ড্রেসিংরুমেও রয়েছে ভিন্ন চিত্র। তিনি প্রথাগত চিৎকার বা বক্তৃতার বদলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। আর্জেন্টিনা দলের তরুণ ফুটবলার যেমন হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ বা অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টাররা শৈশব থেকেই মেসিকে দেখে বড় হয়েছেন।
দলের নতুন সদস্যদের উৎসাহ দেওয়া এবং জয়ের কৃতিত্ব সতীর্থদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার মানসিকতাই মেসিকে সবার কাছে একজন অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
একসময় নিজের দেশের সমর্থকদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে অবসরের ঘোষণা দিলেও মেসির প্রত্যাবর্তন আর্জেন্টাইন ফুটবলে নতুন যুগের সূচনা করে। তার নেতৃত্বেই দলটি এখন ব্যক্তিনির্ভরতা কাটিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ পরিবারে পরিণত হয়েছে। ম্যাচ শেষে তাকে সতীর্থদের আকাশে ছুড়ে তোলার দৃশ্যটি ছিল যেন একটি প্রতীকী সম্মাননা। সতীর্থদের নীরব বার্তাটি ছিল এমন, এতদিন মেসি তাদের সাফল্যের পথে বহন করে এনেছেন, এখন তাকে বহন করার দায়িত্ব তাদের।
প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গেও মেসির সম্পর্ক এখন দারুণ। ম্যাচের পর জার্সি বদল বা ছবি তোলার দৃশ্যগুলো এখন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোলসংখ্যা বা ট্রফির বাইরে মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা তাকে ঈর্ষা নয়, বরং হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে।
চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনার জয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেফারিং ও ভিএআর সিদ্ধান্তের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে গত মঙ্গলবার আমেরিকার আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মিশরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ের ম্যাচে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) ভূমিকা নিয়ে চলে জোর সমালোচনা।
অভিযোগ রয়েছে, আর্জেন্টিনা রেফারির সহায়তায় একের পর এক পেনাল্টি পাচ্ছে এবং প্রতিপক্ষের অনেক সিদ্ধান্ত তাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।
আর্জেন্টিনা-বিরোধীরা দাবি করছেন, কাতার বিশ্বকাপ থেকে বর্তমান আসর পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ধারাবাহিকভাবে রেফারির বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। মিশরের বিপক্ষে ম্যাচেও ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টাইনদের জয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে। বিশেষ করে মিশরের গোল বাতিল এবং শেষ গোলটির আগে ফাউলের আবেদনের প্রসঙ্গটি বারবার উঠে আসছে। অনেক দর্শকের মতে, আর্জেন্টিনা নিজে ভালো না খেলেও রেফারির উপহারে ম্যাচ জিতছে।
তবে পরিসংখ্যান ও খেলার বিশ্লেষণ অন্য কথা বলছে। ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, আর্জেন্টিনা যদি আক্রমণাত্মক ফুটবল না খেলত এবং প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে বারবার হানা না দিত, তবে রেফারির পক্ষে পেনাল্টি দেওয়া সম্ভব হতো না।
মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৫৯ শতাংশের বেশি সময় বল দখলে রেখেছিল এবং গোলের জন্য অন্তত ১৭ বার শট নিয়েছিল। ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনা ভেঙে না পড়ে সাঁড়াসি আক্রমণ চালিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে শেষ ১৩ মিনিটে তিনটি গোল আসে।
আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সালাহর কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে হুলিয়ান আলভারেজ দ্রুত লাউতারো মার্টিনেজের কাছে বল পাঠান। লাউতারোর নিখুঁত সেন্টারে এনজো ফার্নান্দেজ দারুণ হেডে গোলটি করেন। এই গোলটি প্রমাণ করে, খেলার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আর্জেন্টিনা বুদ্ধিদীপ্ত ও গোছানো ফুটবল খেলেছে। এছাড়া লিওনেল মেসি নিজে পুরো ম্যাচে আক্রমণ সাজানো ও সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছেন।
আজ রবিবারের ম্যাচেও একই ঘটনা ঘটেছে। প্রথমেই গোলে এগিয়ে গেলেও প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা আর গোল করতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধে সুইসরা গোল শোধ করলে, পরে ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা আর গোল ব্যবধান বাড়াতে পারে নি। পরে একের পর এক আক্রমনে অতিরিক্ত সময়ে আরও দুটি গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে প্রবেশ করে আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনা কেবল ‘ওয়ানম্যান শো’ বা মেসির ওপর নির্ভরশীল দল; এই ধারণা ভুল প্রমাণ করে দলের রক্ষণভাগ ও মিডফিল্ডারেরাও এখন সমানভাবে কার্যকর।
এর আগের ম্যাচে দেখা গেছে, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ আর্জেন্টিনার আক্রমণের চাপে ভুল করতে বাধ্য হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগের বিপরীতে আর্জেন্টিনার সমর্থক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, রেফারির ভুল সিদ্ধান্তে কোনো দলের হার-জিত নির্ধারণ হতে পারে, কিন্তু একটি দল রেফারির জোরেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারে না। আর্জেন্টিনার জয় এসেছে তাদের আক্রমণাত্মক খেলার তীব্রতা ও জয়ের দৃঢ় সংকল্প থেকেই।

আপনার মতামত লিখুন