দুপুর ঠিক পৌনে একটা। পুরানা পল্টনের মোড়ে ট্রাফিক সিগনালে আটকে থাকা রিকশার হাতল ধরে হাঁপাচ্ছিলেন ৪২ বছর বয়সী আবুল কাসেম। কপালে জমে থাকা ঘাম গামছা দিয়ে মুছে নিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।
জুলাইয়ের চড়া রোদ আর বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতা মিলে যেন এক নারকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল থার্মোমিটারে ঢাকার তাপমাত্রা তখন ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পের কারণে ‘অনুভূত তাপমাত্রা’ বা ‘হিট ইনডেক্স’ ৪৪ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে।
কাসেম মিয়া বললেন, “বাবা, রিকশা চালানো তো দূরের কথা, এই গরমে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে যায়। দুই ক্ষ্যাপ মারলেই মাথা ঘোরে। আগে দিনে সাত-আটশো টাকা কামাইতাম, এখন এই গরমে শরীর সায় দেয় না। দুপুরে গ্যারেজে গিয়ে শুয়ে থাকি। আয় অর্ধেক হয়ে গেছে।”
ঠিক বাংলাদেশ সময় যখন দুপুর একটা, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন শহরের তাপমাত্রা তখন আরামদায়ক ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গবেষণাগারে বসে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের জটিল সমীকরণ মেলাচ্ছেন অধ্যাপক উইলিয়াম স্মিথ।
কাসেম মিয়ার মতো তীব্র ঘাম বা হিটস্ট্রোকের ভয় তাকে তাড়া করছে না। কাসেম মিয়া লড়ছেন আজকের দিনের ভাতের জন্য। আর স্মিথ লড়ছেন আগামী দশকের প্রযুক্তির রূপরেখা আঁকতে।
আবুল কাসেম আর উইলিয়াম স্মিথের এই যাপিত জীবনের ব্যবধান কেবল দুই ব্যক্তির গল্প নয়; এটি আসলে বিশ্বের উত্তর আর দক্ষিণ গোলার্ধের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিফলন।বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর প্যাটার্ন চোখ এড়ায় না। পৃথিবীর যত ধনী ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে উন্নত দেশ, তার প্রায় সবই নাতিশীতোষ্ণ বা শীতপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত।
অন্যদিকে, আফ্রিকার সাহারা-নিম্ন অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা গরমের দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দারিদ্র্য, রোগবালাই আর অনগ্রসরতার বৃত্তে বন্দি।
এই ভৌগোলিক বিভাজন কি স্রেফ কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে জলবায়ু, ইতিহাস, মানুষের কর্মক্ষমতা ও অর্থনীতির এক গভীর রহস্য? বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদেরা যুগ যুগ ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন।
তথ্য-উপাত্তের কঠিন সত্য
তাকানো যাক বিজ্ঞান ও গবেষণার সূচকের দিকেও। ১৯০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞানে (পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞান) যত নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই গেছে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের শীতপ্রধান দেশগুলোতে। বিশ্বের মোট গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ের ৮৮ শতাংশেরও বেশি খরচ হয় এই শীতল অঞ্চলের দেশগুলোতে। আর বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ, যারা চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাদের সিংহভাগের ঠিকানা এই উষ্ণমণ্ডল।
রোগের অদৃশ্য শৃঙ্খল
ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় মাইনাস তাপমাত্রার শীতকাল প্রাকৃতিকভাবেই এই জীবাণু এবং মশার লার্ভা ধ্বংস করে দেয়। ফলে সেখানে রোগব্যাধির প্রকোপ কম।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্সের মতে, “যে দেশে ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গুর মতো মহামারি নিয়মিত হানা দেয়, সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রতি বছর ১.৩ শতাংশ কম হয়।”
গরমে কি আসলেই মনোযোগ কমে
এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিতর্কিত একটি বিষয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের চিন্তাশক্তি ও শারীরিক উৎপাদনশীলতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিসুং পার্ক ও তার দল যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালান। সেখানে দেখা যায়, যেসব বছর গ্রীষ্মকালে পরীক্ষার দিনগুলোতে তাপমাত্রা বেশি ছিল, সেসব বছরের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে।আমাদের দেশের দিকে তাকানো যাক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে গ্রীষ্মকালে যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলে, তখন সেখানকার শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের অবস্থা কী হয়? ঘামে ভিজে, হাঁসফাঁস করতে করতে কি জটিল কোনো গণিত সমাধান করা বা সূক্ষ্ম কাজ করা সম্ভব?
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তীব্র গরমের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা বাবদ প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুসারে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে কর্মক্ষমতা আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়।
উপনিবেশবাদের নীল নকশা
ভৌগোলিক কারণ কি তবে মানুষের নিয়তি? এখানেই তীব্র আপত্তি তুলেছেন আধুনিক কালের সেরা অর্থনীতিবিদেরা। ২০২৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী তিন বিজ্ঞানী দারোন আসেমোগলু, জেমস রবিনসন ও সাইমন জনসন তাদের কালজয়ী গ্রন্থ ‘হোয়াই ন্যাশনস ফেইস’-এ দেখিয়েছেন, জলবায়ু কোনো চিরন্তন নিয়তি নয়। আসল ব্যবধানটা গড়ে দিয়েছে ‘ইতিহাস এবং প্রতিষ্ঠান’।
১৫০০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো যখন বিশ্বজুড়ে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করছিল, তখন তারা জলবায়ু দেখেই তাদের শোষণের ধরন নির্ধারণ করেছিল।বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ
কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা আমেরিকার উত্তর অংশের জলবায়ু ছিল ইউরোপের মতোই শীতল। সেখানে রোগবালাইয়ের ভয় কম থাকায় ইউরোপীয়রা সপরিবারে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। যেহেতু তারা সেখানে নিজেরা থাকবে, তাই তারা সেখানে এমন সব প্রতিষ্ঠান ও আইন তৈরি করল যা মানুষের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার এবং শিক্ষার বিস্তার ঘটায়। এগুলোকে বলা হয় ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান’।
লুণ্ঠনকারী উপনিবেশ
আজকে আমরা যে অনুন্নত শাসনব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির মুখোমুখি হই, তা আসলে সেই ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনকারী ব্যবস্থারই রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।
১৭৫৭ সালের আগেও বাংলার তাঁতি ও কৃষকদের সমৃদ্ধি দেখে বিশ্ব বিস্মিত হতো। তখনো এ দেশের জলবায়ু গরমই ছিল। কিন্তু তখনকার উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা ইংরেজদের কুখ্যাত শোষণে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। অর্থাৎ, গরম আবহাওয়া আমাদের দরিদ্র করেনি, লুণ্ঠন ও শোষণের ইতিহাস আমাদের এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
জেরেড ডায়মন্ডের তত্ত্ব
পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী বিজ্ঞানী জেরেড ডায়মন্ড তার বিখ্যাত বই ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিল’-এ এক অভিনব ভৌগোলিক তত্ত্ব দিয়েছেন। তার মতে, ইউরোপ ও এশিয়ার (ইউরেশিয়া) মানচিত্রটি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। অন্যদিকে আফ্রিকা ও আমেরিকার মানচিত্র উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত।
আগামীর বিশ্ব বদলে দেবে মানবসভ্যতার চিত্র
পাশাপাশি, ইউরেশিয়ায় গরু, ঘোড়া, ভেড়া ও শূকরের মতো গৃহপালিত পশুর প্রাচুর্য ছিল। এদের সংস্পর্শে থেকে ইউরোপীয়দের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই পরবর্তীতে ইউরোপীয়দের বিশ্বজয়ে সাহায্য করে, যখন তাদের নিয়ে যাওয়া জীবাণুতে আমেরিকার কোটি কোটি আদিবাসী মারা যায়।
ডায়মন্ডের মতে, ইউরোপীয়রা জন্মগতভাবে বেশি বুদ্ধিমান ছিল না, তারা কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইতিহাসের এক বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল।
মাটির পুষ্টি ও শক্তির অর্থনীতি
বিজ্ঞান বলছে, মাটির উর্বরতার পেছনেও জলবায়ুর ভূমিকা রয়েছে। শীতপ্রধান অঞ্চলের মাটি তৈরি হয়েছে প্রাচীন হিমবাহের পলি দিয়ে, যা পুষ্টি উপাদানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অন্যদিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এত ভারী বৃষ্টিপাত হয় যে, তা মাটির ওপরের স্তরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ধুয়ে নিয়ে যায়।
ব্যতিক্রম শুধু আমাদের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার অববাহিকা, যেখানে প্রতি বছর নতুন পলি এসে মাটিকে উর্বর করে তোলে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সেই আশীর্বাদই এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে নিয়মিত বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার কারণে।
সিঙ্গাপুর কীভাবে ‘অভিশাপ’ কাটালো
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ার এই তথাকথিত অভিশাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বেশ কিছু দেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদাহরণ সিঙ্গাপুর। ঠিক নিরক্ষরেখার ওপরে অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটি একসময় ছিল তীব্র গরম, ম্যালেরিয়া আর দারিদ্র্যে জর্জরিত এক অনুন্নত বন্দর। ১৯৬৫ সালে যখন মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর আলাদা হয়ে যায়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এই দেশ টিকবে না। কিন্তু দেশটির প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটালেন। যাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার কোনটি? তিনি এক মুহূর্তও না ভেবে উত্তর দিয়েছিলেন ‘এয়ার কন্ডিশনার’ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র।
উত্তর কেন ধনী, দক্ষিণ কেন দরিদ্র?
বাংলাদেশের জন্য বার্তা
জলবায়ুর এই বিভাজন আগামী দিনে আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে চলেছে। আইপিসিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে যে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সবচেয়ে বড় শিকার হবে আমাদের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলো। অথচ এই উষ্ণায়নের জন্য আমাদের ঐতিহাসিক দায় নেই বললেই চলে।
ভবিষ্যতের যেসব বিপদ কড়া নাড়ছে
ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রার হুমকি: বাতাসে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা যদি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় (যাকে ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রা বলা হয়) যেখানে মানুষের শরীর আর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠাণ্ডা করতে পারে না, তবে ঘরের বাইরে কাজ করা মানুষের জন্য তা সরাসরি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
কৃষি বিপর্যয়: অনিয়মিত বর্ষা এবং অসময়ের খরা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।
নিয়তি বনাম লড়াই
বাংলাদেশ এই নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর যে বিশাল জনমিতিক সুবিধা রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে হলে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে:
সবুজ নগর পরিকল্পনা: ঢাকা শহরের তাপমাত্রা আশেপাশের গ্রামীণ অঞ্চলের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি বেশি, যাকে বলা হয় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’। আমাদের দ্রুত নগরের ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতে হবে। জলাশয়গুলো রক্ষা করতে হবে এবং ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করতে হবে।
শ্রমিকবান্ধব কাজের পরিবেশ: পোশাক কারখানা ও অন্যান্য কলকারখানায় ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। অতিরিক্ত গরমের দিনগুলোতে কাজের সময় পরিবর্তন করে সকাল বা সন্ধ্যায় নিয়ে যাওয়ার নীতি প্রণয়ন করা দরকার।
শিক্ষায় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির ব্যবহার: স্কুল-কলেজগুলোর অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন গরমে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোনিবেশ করতে পারে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণায় জিডিপির বরাদ্দ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
শীতের দেশে বিজ্ঞানীর প্রাচুর্য আর গরমের দেশে দারিদ্র্যের হাহাকার- এই দৃশ্যটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তৈরি হওয়া এক বৈষম্যের চিত্র। এর পেছনে জলবায়ুর যেমন ভূমিকা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা আছে ইতিহাসের ট্র্যাজেডি আর ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের।
কিন্তু আজ যখন আমরা একুশ শতকের এক চতুর্থভাগ পেরিয়ে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি-প্রকৃতি আমাদের ওপর যে কর চাপিয়েছে, মানুষ তার মেধা, সুশাসন আর প্রযুক্তি দিয়ে তা শোধ করতে পারে। আবুল কাসেমদের ঘামঝরা ক্লান্ত দুপুরগুলোকে যদি আমরা সুপরিকল্পিত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ল্যাবের উদ্ভাবনী শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি, তবেই ঘুচবে উত্তর-দক্ষিণের এই হাজার বছরের বিভাজন।
ভূগোল আমাদের পথ আগলাতে পারে, কিন্তু গন্তব্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা কেবল আমাদেরই হাতে।
লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
/

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬
দুপুর ঠিক পৌনে একটা। পুরানা পল্টনের মোড়ে ট্রাফিক সিগনালে আটকে থাকা রিকশার হাতল ধরে হাঁপাচ্ছিলেন ৪২ বছর বয়সী আবুল কাসেম। কপালে জমে থাকা ঘাম গামছা দিয়ে মুছে নিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।
জুলাইয়ের চড়া রোদ আর বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতা মিলে যেন এক নারকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল থার্মোমিটারে ঢাকার তাপমাত্রা তখন ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পের কারণে ‘অনুভূত তাপমাত্রা’ বা ‘হিট ইনডেক্স’ ৪৪ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে।
কাসেম মিয়া বললেন, “বাবা, রিকশা চালানো তো দূরের কথা, এই গরমে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে যায়। দুই ক্ষ্যাপ মারলেই মাথা ঘোরে। আগে দিনে সাত-আটশো টাকা কামাইতাম, এখন এই গরমে শরীর সায় দেয় না। দুপুরে গ্যারেজে গিয়ে শুয়ে থাকি। আয় অর্ধেক হয়ে গেছে।”
ঠিক বাংলাদেশ সময় যখন দুপুর একটা, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন শহরের তাপমাত্রা তখন আরামদায়ক ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গবেষণাগারে বসে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের জটিল সমীকরণ মেলাচ্ছেন অধ্যাপক উইলিয়াম স্মিথ।
কাসেম মিয়ার মতো তীব্র ঘাম বা হিটস্ট্রোকের ভয় তাকে তাড়া করছে না। কাসেম মিয়া লড়ছেন আজকের দিনের ভাতের জন্য। আর স্মিথ লড়ছেন আগামী দশকের প্রযুক্তির রূপরেখা আঁকতে।
আবুল কাসেম আর উইলিয়াম স্মিথের এই যাপিত জীবনের ব্যবধান কেবল দুই ব্যক্তির গল্প নয়; এটি আসলে বিশ্বের উত্তর আর দক্ষিণ গোলার্ধের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিফলন।বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর প্যাটার্ন চোখ এড়ায় না। পৃথিবীর যত ধনী ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে উন্নত দেশ, তার প্রায় সবই নাতিশীতোষ্ণ বা শীতপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত।
অন্যদিকে, আফ্রিকার সাহারা-নিম্ন অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা গরমের দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দারিদ্র্য, রোগবালাই আর অনগ্রসরতার বৃত্তে বন্দি।
এই ভৌগোলিক বিভাজন কি স্রেফ কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে জলবায়ু, ইতিহাস, মানুষের কর্মক্ষমতা ও অর্থনীতির এক গভীর রহস্য? বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদেরা যুগ যুগ ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন।
তথ্য-উপাত্তের কঠিন সত্য
তাকানো যাক বিজ্ঞান ও গবেষণার সূচকের দিকেও। ১৯০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞানে (পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞান) যত নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই গেছে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের শীতপ্রধান দেশগুলোতে। বিশ্বের মোট গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ের ৮৮ শতাংশেরও বেশি খরচ হয় এই শীতল অঞ্চলের দেশগুলোতে। আর বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ, যারা চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাদের সিংহভাগের ঠিকানা এই উষ্ণমণ্ডল।
রোগের অদৃশ্য শৃঙ্খল
ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় মাইনাস তাপমাত্রার শীতকাল প্রাকৃতিকভাবেই এই জীবাণু এবং মশার লার্ভা ধ্বংস করে দেয়। ফলে সেখানে রোগব্যাধির প্রকোপ কম।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্সের মতে, “যে দেশে ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গুর মতো মহামারি নিয়মিত হানা দেয়, সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রতি বছর ১.৩ শতাংশ কম হয়।”
গরমে কি আসলেই মনোযোগ কমে
এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিতর্কিত একটি বিষয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের চিন্তাশক্তি ও শারীরিক উৎপাদনশীলতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিসুং পার্ক ও তার দল যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালান। সেখানে দেখা যায়, যেসব বছর গ্রীষ্মকালে পরীক্ষার দিনগুলোতে তাপমাত্রা বেশি ছিল, সেসব বছরের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে।আমাদের দেশের দিকে তাকানো যাক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে গ্রীষ্মকালে যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলে, তখন সেখানকার শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের অবস্থা কী হয়? ঘামে ভিজে, হাঁসফাঁস করতে করতে কি জটিল কোনো গণিত সমাধান করা বা সূক্ষ্ম কাজ করা সম্ভব?
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তীব্র গরমের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা বাবদ প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুসারে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে কর্মক্ষমতা আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়।
উপনিবেশবাদের নীল নকশা
ভৌগোলিক কারণ কি তবে মানুষের নিয়তি? এখানেই তীব্র আপত্তি তুলেছেন আধুনিক কালের সেরা অর্থনীতিবিদেরা। ২০২৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী তিন বিজ্ঞানী দারোন আসেমোগলু, জেমস রবিনসন ও সাইমন জনসন তাদের কালজয়ী গ্রন্থ ‘হোয়াই ন্যাশনস ফেইস’-এ দেখিয়েছেন, জলবায়ু কোনো চিরন্তন নিয়তি নয়। আসল ব্যবধানটা গড়ে দিয়েছে ‘ইতিহাস এবং প্রতিষ্ঠান’।
১৫০০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো যখন বিশ্বজুড়ে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করছিল, তখন তারা জলবায়ু দেখেই তাদের শোষণের ধরন নির্ধারণ করেছিল।বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ
কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা আমেরিকার উত্তর অংশের জলবায়ু ছিল ইউরোপের মতোই শীতল। সেখানে রোগবালাইয়ের ভয় কম থাকায় ইউরোপীয়রা সপরিবারে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। যেহেতু তারা সেখানে নিজেরা থাকবে, তাই তারা সেখানে এমন সব প্রতিষ্ঠান ও আইন তৈরি করল যা মানুষের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার এবং শিক্ষার বিস্তার ঘটায়। এগুলোকে বলা হয় ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান’।
লুণ্ঠনকারী উপনিবেশ
আজকে আমরা যে অনুন্নত শাসনব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির মুখোমুখি হই, তা আসলে সেই ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনকারী ব্যবস্থারই রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।
১৭৫৭ সালের আগেও বাংলার তাঁতি ও কৃষকদের সমৃদ্ধি দেখে বিশ্ব বিস্মিত হতো। তখনো এ দেশের জলবায়ু গরমই ছিল। কিন্তু তখনকার উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা ইংরেজদের কুখ্যাত শোষণে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। অর্থাৎ, গরম আবহাওয়া আমাদের দরিদ্র করেনি, লুণ্ঠন ও শোষণের ইতিহাস আমাদের এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
জেরেড ডায়মন্ডের তত্ত্ব
পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী বিজ্ঞানী জেরেড ডায়মন্ড তার বিখ্যাত বই ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিল’-এ এক অভিনব ভৌগোলিক তত্ত্ব দিয়েছেন। তার মতে, ইউরোপ ও এশিয়ার (ইউরেশিয়া) মানচিত্রটি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। অন্যদিকে আফ্রিকা ও আমেরিকার মানচিত্র উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত।
আগামীর বিশ্ব বদলে দেবে মানবসভ্যতার চিত্র
পাশাপাশি, ইউরেশিয়ায় গরু, ঘোড়া, ভেড়া ও শূকরের মতো গৃহপালিত পশুর প্রাচুর্য ছিল। এদের সংস্পর্শে থেকে ইউরোপীয়দের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই পরবর্তীতে ইউরোপীয়দের বিশ্বজয়ে সাহায্য করে, যখন তাদের নিয়ে যাওয়া জীবাণুতে আমেরিকার কোটি কোটি আদিবাসী মারা যায়।
ডায়মন্ডের মতে, ইউরোপীয়রা জন্মগতভাবে বেশি বুদ্ধিমান ছিল না, তারা কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইতিহাসের এক বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল।
মাটির পুষ্টি ও শক্তির অর্থনীতি
বিজ্ঞান বলছে, মাটির উর্বরতার পেছনেও জলবায়ুর ভূমিকা রয়েছে। শীতপ্রধান অঞ্চলের মাটি তৈরি হয়েছে প্রাচীন হিমবাহের পলি দিয়ে, যা পুষ্টি উপাদানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অন্যদিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এত ভারী বৃষ্টিপাত হয় যে, তা মাটির ওপরের স্তরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ধুয়ে নিয়ে যায়।
ব্যতিক্রম শুধু আমাদের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার অববাহিকা, যেখানে প্রতি বছর নতুন পলি এসে মাটিকে উর্বর করে তোলে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সেই আশীর্বাদই এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে নিয়মিত বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার কারণে।
সিঙ্গাপুর কীভাবে ‘অভিশাপ’ কাটালো
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ার এই তথাকথিত অভিশাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বেশ কিছু দেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদাহরণ সিঙ্গাপুর। ঠিক নিরক্ষরেখার ওপরে অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটি একসময় ছিল তীব্র গরম, ম্যালেরিয়া আর দারিদ্র্যে জর্জরিত এক অনুন্নত বন্দর। ১৯৬৫ সালে যখন মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর আলাদা হয়ে যায়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এই দেশ টিকবে না। কিন্তু দেশটির প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটালেন। যাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার কোনটি? তিনি এক মুহূর্তও না ভেবে উত্তর দিয়েছিলেন ‘এয়ার কন্ডিশনার’ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র।
উত্তর কেন ধনী, দক্ষিণ কেন দরিদ্র?
বাংলাদেশের জন্য বার্তা
জলবায়ুর এই বিভাজন আগামী দিনে আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে চলেছে। আইপিসিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে যে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সবচেয়ে বড় শিকার হবে আমাদের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলো। অথচ এই উষ্ণায়নের জন্য আমাদের ঐতিহাসিক দায় নেই বললেই চলে।
ভবিষ্যতের যেসব বিপদ কড়া নাড়ছে
ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রার হুমকি: বাতাসে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা যদি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় (যাকে ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রা বলা হয়) যেখানে মানুষের শরীর আর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠাণ্ডা করতে পারে না, তবে ঘরের বাইরে কাজ করা মানুষের জন্য তা সরাসরি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
কৃষি বিপর্যয়: অনিয়মিত বর্ষা এবং অসময়ের খরা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।
নিয়তি বনাম লড়াই
বাংলাদেশ এই নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর যে বিশাল জনমিতিক সুবিধা রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে হলে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে:
সবুজ নগর পরিকল্পনা: ঢাকা শহরের তাপমাত্রা আশেপাশের গ্রামীণ অঞ্চলের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি বেশি, যাকে বলা হয় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’। আমাদের দ্রুত নগরের ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতে হবে। জলাশয়গুলো রক্ষা করতে হবে এবং ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করতে হবে।
শ্রমিকবান্ধব কাজের পরিবেশ: পোশাক কারখানা ও অন্যান্য কলকারখানায় ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। অতিরিক্ত গরমের দিনগুলোতে কাজের সময় পরিবর্তন করে সকাল বা সন্ধ্যায় নিয়ে যাওয়ার নীতি প্রণয়ন করা দরকার।
শিক্ষায় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির ব্যবহার: স্কুল-কলেজগুলোর অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন গরমে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোনিবেশ করতে পারে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণায় জিডিপির বরাদ্দ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
শীতের দেশে বিজ্ঞানীর প্রাচুর্য আর গরমের দেশে দারিদ্র্যের হাহাকার- এই দৃশ্যটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তৈরি হওয়া এক বৈষম্যের চিত্র। এর পেছনে জলবায়ুর যেমন ভূমিকা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা আছে ইতিহাসের ট্র্যাজেডি আর ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের।
কিন্তু আজ যখন আমরা একুশ শতকের এক চতুর্থভাগ পেরিয়ে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি-প্রকৃতি আমাদের ওপর যে কর চাপিয়েছে, মানুষ তার মেধা, সুশাসন আর প্রযুক্তি দিয়ে তা শোধ করতে পারে। আবুল কাসেমদের ঘামঝরা ক্লান্ত দুপুরগুলোকে যদি আমরা সুপরিকল্পিত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ল্যাবের উদ্ভাবনী শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি, তবেই ঘুচবে উত্তর-দক্ষিণের এই হাজার বছরের বিভাজন।
ভূগোল আমাদের পথ আগলাতে পারে, কিন্তু গন্তব্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা কেবল আমাদেরই হাতে।
লেখক: ভিডিও বিভাগ প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
/

আপনার মতামত লিখুন