পেশাদার ফুটবলের নির্মম ব্যাকরণ বলে, দিনশেষে স্কোরবোর্ডের সংখ্যা আর পয়েন্ট টেবিলই শেষ কথা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ডাগআউটের চেনা দর্শনটা একেবারেই আলাদা। সেখানে ট্যাকটিক্যাল বোর্ডের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষের পারস্পরিক বন্ধন, আর কঠোর পেশাদারিত্বের চেয়েও দামি হয়ে ওঠে নিখাদ ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব।
লিওনেল স্কালোনি, পাবলো আইমার, রবার্তো আয়ালা আর ওয়াল্টার সামুয়েল; এই চার বন্ধুর অবিচ্ছেদ্য রসায়নেই যেন আজ মাঠের পর মাঠ মাতিয়ে বেড়াচ্ছে আলবিসেলেস্তেরা। ফুটবল দুনিয়া যখন গাণিতিক ছকে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন এই চার বাঙালি হৃদয়ের মতো আবেগপ্রবণ বন্ধু বদলে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের পর হোর্হে সাম্পাওলির বিদায়ের লগ্নটা ছিল আর্জেন্টিনার ফুটবলের অন্যতম অন্ধকার সময়। চারপাশের বিশৃঙ্খলা আর ব্যর্থতার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নিয়ে আলবিসেলেস্তেদের হাল ধরেছিলেন লিওনেল স্কালোনি। আর সেই কঠিন যাত্রায় তাঁর ছায়াসঙ্গী হিসেবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাকি তিন পরম বন্ধু।
এই চার বন্ধুর জাদুকরী স্পর্শে আর্জেন্টিনা একে একে ঘরে তুলেছে দুটি কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপের সেই মহাকাব্যিক ট্রফি। আর আজ, উত্তর আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে তারা আরও একটি বিশ্বকাপ জয়ের দ্বারে, যেখানে ইতিহাস গড়ার হাতছানি দিচ্ছে তাদের।
চলতি বিশ্বকাপে আলজেরিয়া ম্যাচের পর ফিফার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটকে একটি আবেগঘন সাক্ষাৎকার দিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রধান সহকারী কোচ পাবলো আইমার। সেখানে টেকনিক ও ট্যাকটিকসের চেয়েও বেশি ফুটে উঠেছে তাদের চার বন্ধুর ডাগআউটের ভেতরের মানবিক গল্প।
স্কালোনির অবিশ্বাস্য সাফল্যের মূল চাবিকাঠি প্রকাশ করে আইমার বলেন, "স্কালোনি শুধু একটা দারুণ দলই গড়েননি, এমন এক ঝাঁক মানুষকে একত্র করেছেন যারা সবাই একই লক্ষ্যের দিকে ছুটছে। এটা অর্জন করা খুবই কঠিন। আর ওর সবচেয়ে বড় গুণ হলো, ও সবার মাঝে আত্মবিশ্বাস আর মানসিক শান্তি ছড়িয়ে দিতে পারে, যা এই স্তরের ফুটবলে করাটা ভীষণ কঠিন।"
বিশ্বকাপের তীব্র চাপের মধ্যেও নিজেদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে দারুণভাবে উপভোগ করছেন আইমাররা। ড্রেসিংরুমের আসল রহস্য উন্মোচন করে তিনি আরও বলেন, "আমরা শুধু চারজন সহকর্মী নই, আমরা বন্ধু। আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পেরে আনন্দিত। ফুটবল মাঠের ফল যেকোনো দিকে যেতে পারে, কিন্তু এই যে ৪০টা দিন আমরা একসঙ্গে জীবন কাটাচ্ছি, এর পরিবেশটা সুন্দর হওয়া জরুরি। তা না হলে জীবনের এই দিনগুলোই বৃথা মনে হবে।" মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে আয়ালা, সামুয়েল ও আইমারদের এই যে গভীর মেলবন্ধন, এটাই পুরো দলের পরিবেশকে করে তুলেছে চনমনে।
অথচ খেলোয়াড় হিসেবে এই আইমার, আয়ালা বা সামুয়েলদের বিশ্বকাপ লড়াইয়ের স্মৃতিগুলো মোটেও মধুর ছিল না। ২০০২ বা ২০০৬ বিশ্বকাপে সোনালী প্রজন্ম নিয়েও তাঁদের ফিরতে হয়েছিল চরম হতাশা আর খালি হাতে। নিজের খেলোয়াড়ী জীবনের সেই বেদনাবিধুর দিনগুলোর কথা মনে করে আইমার কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, "ফুটবলার হিসেবে আমরা বিশ্বকাপে খেলেছি কিন্তু জিততে পারিনি। তাই সেই স্মৃতিগুলোর কিছু আনন্দের, কিছু বেদনার। তবে বিশ্বকাপে দেশের হয়ে খেলতে পারা, টিভির পর্দায় দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে পারার অনুভূতি সব সময়ই স্পেশাল।"
খেলোয়াড় হিসেবে যে আক্ষেপ বুকে চেপে রেখেছিলেন, কোচ হিসেবে ডাগআউটে বসে দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরিদের সেটাই এনে দিয়েছেন এই চার বন্ধু। ট্রফি ক্যাবিনেটে একটা বিশ্বকাপ তো যুক্ত হয়েছেই, এবার আরেকটি সোনালী ট্রফি সাজানোর অপেক্ষায় চার বন্ধুর এই রূপকথা।

সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬
পেশাদার ফুটবলের নির্মম ব্যাকরণ বলে, দিনশেষে স্কোরবোর্ডের সংখ্যা আর পয়েন্ট টেবিলই শেষ কথা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ডাগআউটের চেনা দর্শনটা একেবারেই আলাদা। সেখানে ট্যাকটিক্যাল বোর্ডের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষের পারস্পরিক বন্ধন, আর কঠোর পেশাদারিত্বের চেয়েও দামি হয়ে ওঠে নিখাদ ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব।
লিওনেল স্কালোনি, পাবলো আইমার, রবার্তো আয়ালা আর ওয়াল্টার সামুয়েল; এই চার বন্ধুর অবিচ্ছেদ্য রসায়নেই যেন আজ মাঠের পর মাঠ মাতিয়ে বেড়াচ্ছে আলবিসেলেস্তেরা। ফুটবল দুনিয়া যখন গাণিতিক ছকে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন এই চার বাঙালি হৃদয়ের মতো আবেগপ্রবণ বন্ধু বদলে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের পর হোর্হে সাম্পাওলির বিদায়ের লগ্নটা ছিল আর্জেন্টিনার ফুটবলের অন্যতম অন্ধকার সময়। চারপাশের বিশৃঙ্খলা আর ব্যর্থতার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নিয়ে আলবিসেলেস্তেদের হাল ধরেছিলেন লিওনেল স্কালোনি। আর সেই কঠিন যাত্রায় তাঁর ছায়াসঙ্গী হিসেবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাকি তিন পরম বন্ধু।
এই চার বন্ধুর জাদুকরী স্পর্শে আর্জেন্টিনা একে একে ঘরে তুলেছে দুটি কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপের সেই মহাকাব্যিক ট্রফি। আর আজ, উত্তর আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে তারা আরও একটি বিশ্বকাপ জয়ের দ্বারে, যেখানে ইতিহাস গড়ার হাতছানি দিচ্ছে তাদের।
চলতি বিশ্বকাপে আলজেরিয়া ম্যাচের পর ফিফার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটকে একটি আবেগঘন সাক্ষাৎকার দিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রধান সহকারী কোচ পাবলো আইমার। সেখানে টেকনিক ও ট্যাকটিকসের চেয়েও বেশি ফুটে উঠেছে তাদের চার বন্ধুর ডাগআউটের ভেতরের মানবিক গল্প।
স্কালোনির অবিশ্বাস্য সাফল্যের মূল চাবিকাঠি প্রকাশ করে আইমার বলেন, "স্কালোনি শুধু একটা দারুণ দলই গড়েননি, এমন এক ঝাঁক মানুষকে একত্র করেছেন যারা সবাই একই লক্ষ্যের দিকে ছুটছে। এটা অর্জন করা খুবই কঠিন। আর ওর সবচেয়ে বড় গুণ হলো, ও সবার মাঝে আত্মবিশ্বাস আর মানসিক শান্তি ছড়িয়ে দিতে পারে, যা এই স্তরের ফুটবলে করাটা ভীষণ কঠিন।"
বিশ্বকাপের তীব্র চাপের মধ্যেও নিজেদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে দারুণভাবে উপভোগ করছেন আইমাররা। ড্রেসিংরুমের আসল রহস্য উন্মোচন করে তিনি আরও বলেন, "আমরা শুধু চারজন সহকর্মী নই, আমরা বন্ধু। আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পেরে আনন্দিত। ফুটবল মাঠের ফল যেকোনো দিকে যেতে পারে, কিন্তু এই যে ৪০টা দিন আমরা একসঙ্গে জীবন কাটাচ্ছি, এর পরিবেশটা সুন্দর হওয়া জরুরি। তা না হলে জীবনের এই দিনগুলোই বৃথা মনে হবে।" মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে আয়ালা, সামুয়েল ও আইমারদের এই যে গভীর মেলবন্ধন, এটাই পুরো দলের পরিবেশকে করে তুলেছে চনমনে।
অথচ খেলোয়াড় হিসেবে এই আইমার, আয়ালা বা সামুয়েলদের বিশ্বকাপ লড়াইয়ের স্মৃতিগুলো মোটেও মধুর ছিল না। ২০০২ বা ২০০৬ বিশ্বকাপে সোনালী প্রজন্ম নিয়েও তাঁদের ফিরতে হয়েছিল চরম হতাশা আর খালি হাতে। নিজের খেলোয়াড়ী জীবনের সেই বেদনাবিধুর দিনগুলোর কথা মনে করে আইমার কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, "ফুটবলার হিসেবে আমরা বিশ্বকাপে খেলেছি কিন্তু জিততে পারিনি। তাই সেই স্মৃতিগুলোর কিছু আনন্দের, কিছু বেদনার। তবে বিশ্বকাপে দেশের হয়ে খেলতে পারা, টিভির পর্দায় দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে পারার অনুভূতি সব সময়ই স্পেশাল।"
খেলোয়াড় হিসেবে যে আক্ষেপ বুকে চেপে রেখেছিলেন, কোচ হিসেবে ডাগআউটে বসে দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরিদের সেটাই এনে দিয়েছেন এই চার বন্ধু। ট্রফি ক্যাবিনেটে একটা বিশ্বকাপ তো যুক্ত হয়েছেই, এবার আরেকটি সোনালী ট্রফি সাজানোর অপেক্ষায় চার বন্ধুর এই রূপকথা।

আপনার মতামত লিখুন