ফুটবল মাঠে কত শত রূপকথা তৈরি হয়, তবে লিওনেল মেসি এবং লামিন ইয়ামালের গল্পটি যেন রূপকথাকেও হার মানায়। এটি যেন বিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের কোনো সিনেমা, যেখানে সময় নিজেই নিজের চারপাশে মোচড় দিয়ে এক অদ্ভুত বৃত্ত পূরণ করেছে। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসের এক শীতের দিন।
বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে ইউনিসেফের একটি চ্যারিটি ফটোশুটের জন্য ২০ বছরের তরুণ মেসি পাঁচ মাসের এক শিশুকে প্লাস্টিকের টবে পরম মমতায় গোসল করিয়েছিলেন। আজ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে, সেই শিশুটিই ৩৯ বছর বয়সী সর্বকালের সেরা ফুটবলারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার শেষ বিশ্বকাপ জয়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। একদিকে টানা দুই বিশ্বকাপ ও সবমিলিয়ে চতুর্থ শিরোপা জয়ের হাতছানি আলবিসেলেস্তেদের, অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরার সামনে দাঁড়িয়ে স্পেন। তবে এই দুই দেশের ফাইনালের মহারণের চেয়েও ফুটবলবিশ্বকে বেশি রোমাঞ্চিত করছে মেসি বনাম ইয়ামালের সেই মনস্তাত্ত্বিক ও জাদুকরী লড়াই।
মেসির বয়স ৩৯ হলেও মাঠের জাদুতে ধরে রেখেছেন অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে দ্বিতীয় স্থানে আছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। পজিশনিং, নিখুঁত ভিশন আর জাদুকরী পাস দিয়ে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে তুলেছেন তিনি। গ্রুপপর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিকের দেখাও পেয়েছেন। ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ও সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে বিদায়বেলাটা তাই রাঙাতে চাইবেন মেসি, এটাই স্বাভাবিক।
তবে সেই পথে মেসির সবচেয়ে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন সদ্য ১৯ বছরে পা দেওয়া ইয়ামাল। চলতি বিশ্বকাপে নামের পাশে সাত ম্যাচে ১ গোল থাকলেও, গ্রুপপর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোল করে মেসির একটি রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন ইয়ামাল। ২০০৬ বিশ্বকাপে মেসি যখন প্রথম গোল করেছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৫৭ দিন।
১৪ দিনের ব্যবধানে মেসিকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের কনিষ্ঠতম গোলদাতার তালিকায় ৮ নম্বরে জায়গা করে নিয়েছেন ইয়ামাল। মেসি যখন ১৯ বছরে পা দিয়েছিলেন, তখন তার ক্যারিয়ারে গোল ছিল ১৯টি। আর ইয়ামাল ইতিমধ্যেই ৫৬টি গোল করার পাশাপাশি তিনটি লা লিগা ও স্পেনের হয়ে ইউরো ২০২৪ শিরোপাও জিতে নিয়েছেন।
ফাইনালের আগে নিউইয়র্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্পেনের এই তরুণ তারকাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে মেসি বলেন, "ইয়ামাল অসাধারণ একজন ফুটবলার। আমি তাকে অনেক দিন ধরেই অনুসরণ করছি, কারণ সে এমন একটি ক্লাবে খেলে, যেটিকে আমি ভালোবাসি। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই সে বিশ্ব ফুটবলের আইকনে পরিণত হয়েছে। সামনে তার পুরো ক্যারিয়ার পড়ে আছে এবং ইতিহাস গড়ার দারুণ সুযোগও রয়েছে। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যেন সেটা এবার না হয়।"
শৈশবে ইয়ামালকে কোলে নিয়ে তোলা সেই বিখ্যাত ছবি নিয়েও কথা বলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। নস্টালজিক হয়ে মেসি বলেন, "আমি যখন ওর সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম, তখন সে ছিল ছোট্ট একটি শিশু। আর এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে তার বিপক্ষে খেলতে নামব; এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। জীবনে এমন ঘটনাও ঘটে! এখন সে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।"
আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের শেষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে কি মেসি পারবেন স্প্যানিশ এই দুর্গ ভাঙার কোনো জাদুকরী উপায় খুঁজে বের করতে? নাকি সেদিন মেসির হাতে গোসল করা সেই ছোট্ট ইয়ামাল আজ কেড়ে নেবে রাজার শেষ স্বপ্ন? বার্সেলোনার লা মেসিয়া একাডেমি থেকে উঠে আসা দুই প্রজন্মের এই রোমাঞ্চকর দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায় আজ থমকে দাঁড়িয়েছে গোটা ফুটবল বিশ্ব।

সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬
ফুটবল মাঠে কত শত রূপকথা তৈরি হয়, তবে লিওনেল মেসি এবং লামিন ইয়ামালের গল্পটি যেন রূপকথাকেও হার মানায়। এটি যেন বিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের কোনো সিনেমা, যেখানে সময় নিজেই নিজের চারপাশে মোচড় দিয়ে এক অদ্ভুত বৃত্ত পূরণ করেছে। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসের এক শীতের দিন।
বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে ইউনিসেফের একটি চ্যারিটি ফটোশুটের জন্য ২০ বছরের তরুণ মেসি পাঁচ মাসের এক শিশুকে প্লাস্টিকের টবে পরম মমতায় গোসল করিয়েছিলেন। আজ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে, সেই শিশুটিই ৩৯ বছর বয়সী সর্বকালের সেরা ফুটবলারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার শেষ বিশ্বকাপ জয়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। একদিকে টানা দুই বিশ্বকাপ ও সবমিলিয়ে চতুর্থ শিরোপা জয়ের হাতছানি আলবিসেলেস্তেদের, অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরার সামনে দাঁড়িয়ে স্পেন। তবে এই দুই দেশের ফাইনালের মহারণের চেয়েও ফুটবলবিশ্বকে বেশি রোমাঞ্চিত করছে মেসি বনাম ইয়ামালের সেই মনস্তাত্ত্বিক ও জাদুকরী লড়াই।
মেসির বয়স ৩৯ হলেও মাঠের জাদুতে ধরে রেখেছেন অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে দ্বিতীয় স্থানে আছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। পজিশনিং, নিখুঁত ভিশন আর জাদুকরী পাস দিয়ে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে তুলেছেন তিনি। গ্রুপপর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিকের দেখাও পেয়েছেন। ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ও সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে বিদায়বেলাটা তাই রাঙাতে চাইবেন মেসি, এটাই স্বাভাবিক।
তবে সেই পথে মেসির সবচেয়ে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন সদ্য ১৯ বছরে পা দেওয়া ইয়ামাল। চলতি বিশ্বকাপে নামের পাশে সাত ম্যাচে ১ গোল থাকলেও, গ্রুপপর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোল করে মেসির একটি রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন ইয়ামাল। ২০০৬ বিশ্বকাপে মেসি যখন প্রথম গোল করেছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৫৭ দিন।
১৪ দিনের ব্যবধানে মেসিকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের কনিষ্ঠতম গোলদাতার তালিকায় ৮ নম্বরে জায়গা করে নিয়েছেন ইয়ামাল। মেসি যখন ১৯ বছরে পা দিয়েছিলেন, তখন তার ক্যারিয়ারে গোল ছিল ১৯টি। আর ইয়ামাল ইতিমধ্যেই ৫৬টি গোল করার পাশাপাশি তিনটি লা লিগা ও স্পেনের হয়ে ইউরো ২০২৪ শিরোপাও জিতে নিয়েছেন।
ফাইনালের আগে নিউইয়র্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্পেনের এই তরুণ তারকাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে মেসি বলেন, "ইয়ামাল অসাধারণ একজন ফুটবলার। আমি তাকে অনেক দিন ধরেই অনুসরণ করছি, কারণ সে এমন একটি ক্লাবে খেলে, যেটিকে আমি ভালোবাসি। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই সে বিশ্ব ফুটবলের আইকনে পরিণত হয়েছে। সামনে তার পুরো ক্যারিয়ার পড়ে আছে এবং ইতিহাস গড়ার দারুণ সুযোগও রয়েছে। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যেন সেটা এবার না হয়।"
শৈশবে ইয়ামালকে কোলে নিয়ে তোলা সেই বিখ্যাত ছবি নিয়েও কথা বলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। নস্টালজিক হয়ে মেসি বলেন, "আমি যখন ওর সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম, তখন সে ছিল ছোট্ট একটি শিশু। আর এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে তার বিপক্ষে খেলতে নামব; এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। জীবনে এমন ঘটনাও ঘটে! এখন সে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।"
আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের শেষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে কি মেসি পারবেন স্প্যানিশ এই দুর্গ ভাঙার কোনো জাদুকরী উপায় খুঁজে বের করতে? নাকি সেদিন মেসির হাতে গোসল করা সেই ছোট্ট ইয়ামাল আজ কেড়ে নেবে রাজার শেষ স্বপ্ন? বার্সেলোনার লা মেসিয়া একাডেমি থেকে উঠে আসা দুই প্রজন্মের এই রোমাঞ্চকর দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায় আজ থমকে দাঁড়িয়েছে গোটা ফুটবল বিশ্ব।

আপনার মতামত লিখুন