সংবাদ

জ্বলছে না চুলা , নেই বিদ্যুৎও : সংকটে নরসিংদীবাসী


প্রতিনিধি, নরসিংদী
প্রতিনিধি, নরসিংদী
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৩ এএম

জ্বলছে না চুলা , নেই বিদ্যুৎও : সংকটে নরসিংদীবাসী
ছবি : সংগৃহীত

সারা দেশের মতো নরসিংদীতেও দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। এতে জেলাবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটে দেখা দিয়েছে পরিবহনের তীব্র সংকট।

সরেজমিনে দেখা যায়, নরসিংদী শহর ও এর আশপাশের এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহকদের চুলা জ্বলছে না। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে দীর্ঘ অপেক্ষা করেও চালকেরা গ্যাস পাচ্ছেন না। অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

শহরের বাসিন্দা লিজা রহমান জানান, গত ৩ দিন ধরে তারা গ্যাস পাচ্ছেন না। সামান্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে রান্নাবান্না করা অসম্ভব। তিনি বলেন, “গত ৩ দিন ধরে গৃহকর্তাকে সকালের নাস্তা না করে এবং দুপুরের খাবার না নিয়েই কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদেরও একই অবস্থা। এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে থাকতে হবে।”

আরেক বাসিন্দা সালমা আক্তার বলেন, “গ্যাস নিয়ে লুকোচুরি চলছে। কখন আসে আর কখন যায় বলা যায় না। রান্না করতে গেলেই গ্যাস থাকে না। প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনে খাওয়া আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।”

গ্যাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা এক সিএনজিচালক বলেন, “ভোর ৫টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, এখন সকাল ৯টা বাজে। এখনো গ্যাস পাইনি।” ট্রাকচালক ফারুক মিয়া জানান, তার গাড়িতে কাঁচামাল রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস না পাওয়ায় গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, ফলে মালামাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চৌয়ালা শিল্প এলাকার একটি সাইজিং কারখানার কর্মকর্তা জানান, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ কমে গেছে। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট থাকতে পারে।

গ্যাসের পাশাপাশি নতুন করে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের তীব্র সংকট। পুরো জেলা জুড়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। অঞ্চল বা ফিডার ভিত্তিক লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম না থাকায় কলকারখানা ও অফিস-আদালতের কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে।

চৌয়ালার এক পাওয়ারলুম শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা উৎপাদনের ভিত্তিতে কাজ করি। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে উৎপাদন কমে গেছে। গত ২ দিনে ৮টি মেশিন চালিয়ে মাত্র ৩২০ গজ কাপড় উৎপাদন করেছি। এভাবে চললে পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।”

পাওয়ারলুম ফ্যাক্টরির মালিকেরা জানান, বিদ্যুতের সংকটের কারণে তাঁরা পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। আয়ের তুলনায় ব্যাংক ঋণসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আবাসিক গ্রাহক সাদিকুর রহমান অভিযোগ করেন, লোডশেডিংয়ের কারণে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা ও সন্তানদের নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটছে। চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পেলেও মাস শেষে ‘ভুতুড়ে বিল’ ঠিকই দিতে হচ্ছে।

নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার জানান, গত ২৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জের ভুলতা গ্রিডের কাছে ‘ভুলতা-নরসিংদী ১৩২ কেভি’ জাতীয় সঞ্চালন লাইনের একটি তার ছিঁড়ে গেছে। বর্তমানে বিকল্প হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নরসিংদী গ্রিড উপকেন্দ্রটি চালু রাখা হয়েছে। তবে ওই লাইনের সক্ষমতা কম হওয়ায় চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ১৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৯০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সদর, রায়পুরা, শিবপুর, মনোহরদী ও বেলাবো উপজেলায় প্রায় ৫০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত লাইনের তার পরিবর্তন করে সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬


জ্বলছে না চুলা , নেই বিদ্যুৎও : সংকটে নরসিংদীবাসী

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুলাই ২০২৬

featured Image

সারা দেশের মতো নরসিংদীতেও দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। এতে জেলাবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটে দেখা দিয়েছে পরিবহনের তীব্র সংকট।

সরেজমিনে দেখা যায়, নরসিংদী শহর ও এর আশপাশের এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহকদের চুলা জ্বলছে না। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে দীর্ঘ অপেক্ষা করেও চালকেরা গ্যাস পাচ্ছেন না। অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

শহরের বাসিন্দা লিজা রহমান জানান, গত ৩ দিন ধরে তারা গ্যাস পাচ্ছেন না। সামান্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে রান্নাবান্না করা অসম্ভব। তিনি বলেন, “গত ৩ দিন ধরে গৃহকর্তাকে সকালের নাস্তা না করে এবং দুপুরের খাবার না নিয়েই কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদেরও একই অবস্থা। এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে থাকতে হবে।”

আরেক বাসিন্দা সালমা আক্তার বলেন, “গ্যাস নিয়ে লুকোচুরি চলছে। কখন আসে আর কখন যায় বলা যায় না। রান্না করতে গেলেই গ্যাস থাকে না। প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনে খাওয়া আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।”

গ্যাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা এক সিএনজিচালক বলেন, “ভোর ৫টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, এখন সকাল ৯টা বাজে। এখনো গ্যাস পাইনি।” ট্রাকচালক ফারুক মিয়া জানান, তার গাড়িতে কাঁচামাল রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস না পাওয়ায় গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, ফলে মালামাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চৌয়ালা শিল্প এলাকার একটি সাইজিং কারখানার কর্মকর্তা জানান, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ কমে গেছে। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট থাকতে পারে।

গ্যাসের পাশাপাশি নতুন করে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের তীব্র সংকট। পুরো জেলা জুড়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। অঞ্চল বা ফিডার ভিত্তিক লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম না থাকায় কলকারখানা ও অফিস-আদালতের কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে।

চৌয়ালার এক পাওয়ারলুম শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা উৎপাদনের ভিত্তিতে কাজ করি। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে উৎপাদন কমে গেছে। গত ২ দিনে ৮টি মেশিন চালিয়ে মাত্র ৩২০ গজ কাপড় উৎপাদন করেছি। এভাবে চললে পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।”

পাওয়ারলুম ফ্যাক্টরির মালিকেরা জানান, বিদ্যুতের সংকটের কারণে তাঁরা পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। আয়ের তুলনায় ব্যাংক ঋণসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আবাসিক গ্রাহক সাদিকুর রহমান অভিযোগ করেন, লোডশেডিংয়ের কারণে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা ও সন্তানদের নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটছে। চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পেলেও মাস শেষে ‘ভুতুড়ে বিল’ ঠিকই দিতে হচ্ছে।

নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার জানান, গত ২৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জের ভুলতা গ্রিডের কাছে ‘ভুলতা-নরসিংদী ১৩২ কেভি’ জাতীয় সঞ্চালন লাইনের একটি তার ছিঁড়ে গেছে। বর্তমানে বিকল্প হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নরসিংদী গ্রিড উপকেন্দ্রটি চালু রাখা হয়েছে। তবে ওই লাইনের সক্ষমতা কম হওয়ায় চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ১৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৯০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সদর, রায়পুরা, শিবপুর, মনোহরদী ও বেলাবো উপজেলায় প্রায় ৫০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত লাইনের তার পরিবর্তন করে সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত