সংবাদ

গ্রন্থপাঠ

নগরশঙ্খ: ধূলিধূসর জীবনের আখ্যান


বিনয় বর্মন
বিনয় বর্মন
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৫ এএম

নগরশঙ্খ: ধূলিধূসর জীবনের আখ্যান
শফিক ইমতিয়াজের “নগরশঙ্খ” আমাদের নাগরিক জীবনযাত্রার এক কাব্যিক দলিল। কবিতার ছত্রে ছত্রে চিত্রিত নাগরিক সভ্যতার পটভূমিতে যান্ত্রিক জীবনের ধূলিধূসর আখ্যান। এখানে প্রগাঢ় হয়ে বাজে নাগরিক অস্তিত্বের গান: “তুমি ভুলে যাবে কি, তোমার দেহে ভিড়বাহী শহরের শ্বাস/ বিস্তৃত পাতাল জুড়ে মুমূর্ষু মাটির গান” (প্রত্নস্বর)। দৃশ্যত শাহরিক জীবনের উৎকট বাস্তবতাকেই মূর্ত করে তার কবিতা: “মজুর শ্রমিক বেকার ভিখিরি দেহজীবী/ আহা ঘুম, সমান্তরাল; বিবর্ণ নিঃশ্বাস ও বাতিল বগির/ নিরালাপ শ্মশান সৌন্দর্য” (পরিত্যক্ত ইস্টিশনে)। নগরশঙ্খের কবিতাগুলোতে প্রতিভাত নাগরিক মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, দুঃখকষ্ট, দীর্ঘশ্বাস, নৈরাশ্য ও নিঃসঙ্গতা। নাগরিক যন্ত্রণা এক তীব্র ভাষা পায় তার পঙ্ক্তিমালায়। নগরজীবন বাহ্যিক জৌলুসে ভরা, কিন্তু আলোর নিচে যেমন অন্ধকার, তেমনি অট্টালিকার চাকচিক্যের মধ্যে বিরাজ করে এক আত্মিক শূন্যতা। কবির অনুভবে এক আত্মপীড়নের বিভীষিকা: “নিজেকেই ঠোকরাতে হয়, শেখে কি নাগরিকপাখি? / তাদেরও সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, নেই উত্তাপসম্ভব জীবনের পাঠ” (শিউলিপাত)। গ্রন্থের নামকবিতায় তিনি নগর আর নগরের মানুষের পরিচয় ব্যক্ত করেন: “আপিস বাজার ও অট্টালিকার বিপুল বিস্তার/ ফেঁপে ওঠা আলো ও শব্দপ্রাবল্যে/ মানুষ কি কুঁজো অথবা ঠুঁটো?” নগরের দেয়ালগুলোর মধ্যে বাজারের ব্যস্ততা, সংকীর্ণ সংস্কৃতি ও পতনশীল হৃদয়বৃত্তি তার দৃষ্টি এড়ায় না: উঠেছে দেয়াল অগণিত তাই প্রতিদিন রোদের মৃত্যু, সংবাদ নয় ইঁদুরের সংস্কৃতিবোধ, কে তার গুরুত্ব এড়ায়? প্রসারমান বাজার, উধাও হার্দিক সেতু” (নগরশঙ্খ) শহরে দালানের পর দালান ওঠে, কিন্তু তাতে কী সুখস্বস্তি বাড়ে? “উদোমথোরা মালকোছা মেরে হাঁটে জমকনগর/ প্রাসাদ উঠেছে বটে অগণিত গোদে বিষফোঁড়া” (অনুবাদ)। শহুরে মানুষের আপাতউচ্ছল হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে বিষণ্নতা, তারই প্রতিচ্ছায়া যেন ধরা পড়ে এই পঙ্ক্তিতে: “কী খোঁজে সিনেশহরের বক, এক পায়ে দাঁড়িয়ে নাকি ব্যক্তিখোঁড়া/ বর্গমূল বিষণ্ন, অংকের বালিস্তূপে নৃত্যপর প্রভুচিহ্নগুলো” (ক্ষারজোসনা)। “কবিতাগুচ্ছ” কবিতায় পাওয়া যায় আরো কিছু বিদঘুটে নগরচিহ্ন: “ইটগ্রস্ত খয়েরি যাপন: সারারাত ইঁদুরের ঠুকঠাক/ আর দাঁতকাটা শব্দে ছিঁড়ে যাওয়া ঘুম... নষ্ট গলি, ভাঙা ডাকবাক্স দেখে বুঝি/ আস্তাবলের দুর্গন্ধে কোনো হৃদয়নগর গড়ে উঠবে না।” এরূপ শহর কবির কাছে এক “আধাশহর” যেখানে বাস করে উনপুরুষেরা। এখানে ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকে নিঃসঙ্গতা। “এই নগর-নিরাকে শুনি/ প্রতিদিন বেড়ে ওঠা আলাপহীন নিঃসঙ্গ মানুষের শ্বাস” (আস্তানাগুলো)। নগরের কংক্রিট হাড়গোড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় দূষিত বাতাস। এখানকার মানুষের মননেও দূষণ। “চকের উন্মুক্ত বাতাস নগরে বয়ে যাবে, ভাবাটাই ভুল... নগর মনুষ্য রক্তের জমাট বিস্ফোরণ” (নগর ধারণা)। “পৌঁছা” কবিতায় আমরা দেখি চাকরিজীবীর নিত্য ছোটাছুটি, গাড়িতে চড়ে অফিসে যাওয়া, ফাইল, মিটিং, আড্ডা। সে চলছে তো চলছেই, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না, জীবনের কোনো গতি হচ্ছে না। “যাচ্ছি আসছি/ কোথাও পৌঁছুতে পারলাম?/ মাঝেমাঝে পৌঁছে যাই/ ঘুম ভেঙে গেলে আর মনে করতে পারি না, কোথায়” (পৌঁছা)। গন্তব্যহীন এক বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খায় নাগরিক জীবন। অস্তিত্ববাদী সংকটের আয়নায় বিম্বিত হয় জীবনের অর্থহীনতা। কবির নগরমন চিরভ্রামণিক। তিনি রাতের নির্জনে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েন। চায়ের দোকানে বসে চা পান করেন, উচ্চৈঃস্বরে নাম ধরে শহরটিকে ডাকেন। শহর তার ডাকে সাড়া দেয়— “চেনা বেড়ালের মতো মিয়োঁ মিয়োঁ শব্দে/ নীরব শহর যেন কাছে এসে বসে/ শিকার ধরার তীক্ষ্ণ নখ লুকিয়ে সে/ তাকায় ঘোলাটে চোখে/ যেন কোনোদিন কেউ ওকে দেয়নি চিলতে স্নেহ/ দেখতেও চায়নি ওর কান্নার বরফকুচি/ পর্যুদস্ত চোখ আর হৃদয়ের দাহস্রোত” (রাতের শহরে)। রাতের বাতাসে ভেসে বেড়ায় দীর্ঘশ্বাস। “রাতের নগর, নির্জন গহ্বর/ ঘরে ফেরা, সে নতুন দীর্ঘশ্বাস” (অতিমারী দিন)। কবি শহরকেন্দ্রিক নানা গল্প বয়ান করেন যা কেবল পাঠককে আমোদিতই করে না, তার মধ্যে সঞ্চার করে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে এক গভীর ঔৎসুক্য ও উপলব্ধি। আমরা শুনি “চোখবাঁধা লোক ও শকটের গল্প”। চোখবাঁধা একজন মানুষ শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, রেস্তোরাঁয় বসে, বাড়ির ছাদে ওঠে, গজল শোনে। তার সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়। সে এক লোমশ শকট সম্পর্কে নগরবাসীকে সতর্ক করে দেয়, কিন্তু তার কথা কেউ বিশ্বাস করে না, সবাই হো হো করে হাসে। শেষে কী ঘটে? শহরের সব কম্পিউটার হ্যাঙ হয়ে যায়। আর তার মুখ চেপে ধরার আগে সে বলে, “তোমাদের মিলিত মিছিল যদি ওর চে দীর্ঘ না হয় তবে ওই লোমশ শকট...” কথা শেষ হয় না, পাঠকের মনে এক প্রহেলিকার জন্ম দিয়ে কবিতাটি শেষ হয়। এখানে যে প্রচ্ছন্ন সামাজিক বিপ্লবের কথা আছে তা বলাই বাহুল্য। “সর্বাত্মকবাদের ইতিহাস ও কবি” কবিতায় আমরা পাই একজোড়া জুতোর গল্প। ভোগ্যপণ্যের দোকানে বিপুলসংখক জুতো, সেখানে উপচেপড়া ভিড়, জুতো কেনার প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেখানে কবিরা উপেক্ষিত। ফলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে, অধিকারের দাবি জানায়। কিন্তু নগ্নপদ কবি যারা, তারা দ্বিমত পোষণ করে: “আমরা জুতোর মাপে পা ঢোকাব না।” কবিদের চিন্তা ও জীবনযাপন সাধারণের চেয়ে ভিন্ন, তাই তাদেরকে কোনো ছাঁচে ফেলা যায় না। ছাঁচের মধ্যে রাখতে পারলে শাসকের সুবিধা হয়। ছাঁচের বাইরে থেকে নিজস্বতার সন্ধানকে রাষ্ট্রযন্ত্র এক বৌদ্ধিক ধৃষ্টতা হিসেবে গণ্য করে। কবি একাকী বসে থাকেন সড়কদ্বীপে জলসুমতি কিংবা অন্য কারো অপেক্ষায়। সময় গড়িয়ে যায়, কিন্তু তার দেখা মেলে না, ফলে জন্ম নেয় হতাশা। “তুমি না আসো যদি/ আকাশ হবে তারাবিহীন/ সড়কদ্বীপে আর কোনোদিন ভোর হবে না” (বসে আছি সড়কদ্বীপে)। রাজনৈতিক চিন্তা সূক্ষ¥ভাবে রূপকে প্রকাশিত। “বহুদিন নেই তুমি সুপ্রিয়নগরে; কী করে নিঃশ্বাস নিই/ যেখানেই যাই শূন্যতার পোড়াগন্ধ/ বোঝা দায় এখানে কখনো বাকশস্যের আবাদ ছিল” (বহুদিন তুমি নেই)। বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাকস্বাধীনতা হারানোর বিষয়টি এখানে প্রধান। নগরজীবনে যেমন চাঞ্চল্য আছে, তেমনি আছে অবসাদ, যেমন আছে মিলনের সুর, তেমনি বিরহের বিস্তার। “কতকাল স্থাণুজঙ্গমে খয়েরি অবসাদ, দিনমান পিছুহটা/ কখনো সড়কদ্বীপে নীল দুপুরের গান/ ভোরে নদীপারে বেজে ওঠা লঞ্চের সিটি-সংকেতে/ বারবার দুলে ওঠা বিরহী নগর” (প্রাগুক্ত)। নাগরিক জীবনে থাকে নানা জটিলতা; এখানে মানুষের চিন্তা জটিলকুটিল, শঠতা ও হঠকারিতায় ভরা। কবি তাদের চিন্তার জটিলতাকে প্রতিফলিত করেন শব্দযৌগে। গদ্যছন্দের প্রবহমানতায় শব্দগুলো নতুন মাত্রা নিয়ে হাজির হয় পাঠকের মনে। এখানে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো: ক্ষয়পুরুষ, সমুদ্রপাখি, চন্দ্রমোম, দুপুরকণ্ঠ, রজতনন্দন, বসন্তবিস্ফার, শাস্ত্রহিম, চৈত্রবিদ্ধ, আলাপজল, অরাতিপ্রতাপ, সামন্তপাথর, জলভ্রান্তি, নখরঅলীক, ভেতরনখ, গাড়লগুমোট, দুপুরদেয়াল, বিহঙ্গঝাঁপ, তৃষ্ণাসরোদ। শব্দগুলো সহজে মেলার নয়, এর জন্য দরকার কল্পনাশক্তি এবং জটিল ভাবনার সংশ্লেষ। তবে এরূপ শব্দযৌগায়ন প্রবণতা প্রমাণ করে যে কবি নিজে নগরসভ্যতার প্রতিভূ, এবং তার চিন্তায় রয়েছে নগরস্বভাব। নগরশঙ্খের একটি বড় মহিমা এর অন্তর্লীন মানবিক বোধ। কবিতা লেখার সময় কবি প্রান্তিক জনতাকে কখনো ভোলেন না। তিনি পথের ধারে পড়ে থাকা অবহেলিত মানুষকে তার পঙ্ক্তিতে বসান। তার সাক্ষী “শুদ্রতম” কবিতা, যেখানে দলিত-পদদলিত মানুষের জন্য সমবেদনা ব্যক্ত: “সুপেয় জলের জন্য কেঁদে ফেরে প্রান্তের গেলাস/ দলিত দেহের দ্বীপে পানিবাহী ত্রাস।” “অনিবার্য দ্বন্দ্বের ধ্বনি” কবিতায় তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বাজার অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলেন এবং যন্ত্রসভ্যতাকে একপ্রকার ব্যঙ্গ করেন: “হায় লোহা, মরিচার জন্ম দিবি বলে কি একদিন আগুনে তপ্ত হয়েছিলি?” কাজেই শফিক ইমতিয়াজের কাব্যচর্চা নিছক ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ নয়, বরং তা মানবসমাজ ও প্রগতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সকল প্রকার অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নান্দনিক প্রতিবাদ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬


নগরশঙ্খ: ধূলিধূসর জীবনের আখ্যান

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬

featured Image
শফিক ইমতিয়াজের “নগরশঙ্খ” আমাদের নাগরিক জীবনযাত্রার এক কাব্যিক দলিল। কবিতার ছত্রে ছত্রে চিত্রিত নাগরিক সভ্যতার পটভূমিতে যান্ত্রিক জীবনের ধূলিধূসর আখ্যান। এখানে প্রগাঢ় হয়ে বাজে নাগরিক অস্তিত্বের গান: “তুমি ভুলে যাবে কি, তোমার দেহে ভিড়বাহী শহরের শ্বাস/ বিস্তৃত পাতাল জুড়ে মুমূর্ষু মাটির গান” (প্রত্নস্বর)। দৃশ্যত শাহরিক জীবনের উৎকট বাস্তবতাকেই মূর্ত করে তার কবিতা: “মজুর শ্রমিক বেকার ভিখিরি দেহজীবী/ আহা ঘুম, সমান্তরাল; বিবর্ণ নিঃশ্বাস ও বাতিল বগির/ নিরালাপ শ্মশান সৌন্দর্য” (পরিত্যক্ত ইস্টিশনে)। নগরশঙ্খের কবিতাগুলোতে প্রতিভাত নাগরিক মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, দুঃখকষ্ট, দীর্ঘশ্বাস, নৈরাশ্য ও নিঃসঙ্গতা। নাগরিক যন্ত্রণা এক তীব্র ভাষা পায় তার পঙ্ক্তিমালায়। নগরজীবন বাহ্যিক জৌলুসে ভরা, কিন্তু আলোর নিচে যেমন অন্ধকার, তেমনি অট্টালিকার চাকচিক্যের মধ্যে বিরাজ করে এক আত্মিক শূন্যতা। কবির অনুভবে এক আত্মপীড়নের বিভীষিকা: “নিজেকেই ঠোকরাতে হয়, শেখে কি নাগরিকপাখি? / তাদেরও সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, নেই উত্তাপসম্ভব জীবনের পাঠ” (শিউলিপাত)। গ্রন্থের নামকবিতায় তিনি নগর আর নগরের মানুষের পরিচয় ব্যক্ত করেন: “আপিস বাজার ও অট্টালিকার বিপুল বিস্তার/ ফেঁপে ওঠা আলো ও শব্দপ্রাবল্যে/ মানুষ কি কুঁজো অথবা ঠুঁটো?” নগরের দেয়ালগুলোর মধ্যে বাজারের ব্যস্ততা, সংকীর্ণ সংস্কৃতি ও পতনশীল হৃদয়বৃত্তি তার দৃষ্টি এড়ায় না: উঠেছে দেয়াল অগণিত তাই প্রতিদিন রোদের মৃত্যু, সংবাদ নয় ইঁদুরের সংস্কৃতিবোধ, কে তার গুরুত্ব এড়ায়? প্রসারমান বাজার, উধাও হার্দিক সেতু” (নগরশঙ্খ) শহরে দালানের পর দালান ওঠে, কিন্তু তাতে কী সুখস্বস্তি বাড়ে? “উদোমথোরা মালকোছা মেরে হাঁটে জমকনগর/ প্রাসাদ উঠেছে বটে অগণিত গোদে বিষফোঁড়া” (অনুবাদ)। শহুরে মানুষের আপাতউচ্ছল হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে বিষণ্নতা, তারই প্রতিচ্ছায়া যেন ধরা পড়ে এই পঙ্ক্তিতে: “কী খোঁজে সিনেশহরের বক, এক পায়ে দাঁড়িয়ে নাকি ব্যক্তিখোঁড়া/ বর্গমূল বিষণ্ন, অংকের বালিস্তূপে নৃত্যপর প্রভুচিহ্নগুলো” (ক্ষারজোসনা)। “কবিতাগুচ্ছ” কবিতায় পাওয়া যায় আরো কিছু বিদঘুটে নগরচিহ্ন: “ইটগ্রস্ত খয়েরি যাপন: সারারাত ইঁদুরের ঠুকঠাক/ আর দাঁতকাটা শব্দে ছিঁড়ে যাওয়া ঘুম... নষ্ট গলি, ভাঙা ডাকবাক্স দেখে বুঝি/ আস্তাবলের দুর্গন্ধে কোনো হৃদয়নগর গড়ে উঠবে না।” এরূপ শহর কবির কাছে এক “আধাশহর” যেখানে বাস করে উনপুরুষেরা। এখানে ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকে নিঃসঙ্গতা। “এই নগর-নিরাকে শুনি/ প্রতিদিন বেড়ে ওঠা আলাপহীন নিঃসঙ্গ মানুষের শ্বাস” (আস্তানাগুলো)। নগরের কংক্রিট হাড়গোড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় দূষিত বাতাস। এখানকার মানুষের মননেও দূষণ। “চকের উন্মুক্ত বাতাস নগরে বয়ে যাবে, ভাবাটাই ভুল... নগর মনুষ্য রক্তের জমাট বিস্ফোরণ” (নগর ধারণা)। “পৌঁছা” কবিতায় আমরা দেখি চাকরিজীবীর নিত্য ছোটাছুটি, গাড়িতে চড়ে অফিসে যাওয়া, ফাইল, মিটিং, আড্ডা। সে চলছে তো চলছেই, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না, জীবনের কোনো গতি হচ্ছে না। “যাচ্ছি আসছি/ কোথাও পৌঁছুতে পারলাম?/ মাঝেমাঝে পৌঁছে যাই/ ঘুম ভেঙে গেলে আর মনে করতে পারি না, কোথায়” (পৌঁছা)। গন্তব্যহীন এক বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খায় নাগরিক জীবন। অস্তিত্ববাদী সংকটের আয়নায় বিম্বিত হয় জীবনের অর্থহীনতা। কবির নগরমন চিরভ্রামণিক। তিনি রাতের নির্জনে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েন। চায়ের দোকানে বসে চা পান করেন, উচ্চৈঃস্বরে নাম ধরে শহরটিকে ডাকেন। শহর তার ডাকে সাড়া দেয়— “চেনা বেড়ালের মতো মিয়োঁ মিয়োঁ শব্দে/ নীরব শহর যেন কাছে এসে বসে/ শিকার ধরার তীক্ষ্ণ নখ লুকিয়ে সে/ তাকায় ঘোলাটে চোখে/ যেন কোনোদিন কেউ ওকে দেয়নি চিলতে স্নেহ/ দেখতেও চায়নি ওর কান্নার বরফকুচি/ পর্যুদস্ত চোখ আর হৃদয়ের দাহস্রোত” (রাতের শহরে)। রাতের বাতাসে ভেসে বেড়ায় দীর্ঘশ্বাস। “রাতের নগর, নির্জন গহ্বর/ ঘরে ফেরা, সে নতুন দীর্ঘশ্বাস” (অতিমারী দিন)। কবি শহরকেন্দ্রিক নানা গল্প বয়ান করেন যা কেবল পাঠককে আমোদিতই করে না, তার মধ্যে সঞ্চার করে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে এক গভীর ঔৎসুক্য ও উপলব্ধি। আমরা শুনি “চোখবাঁধা লোক ও শকটের গল্প”। চোখবাঁধা একজন মানুষ শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, রেস্তোরাঁয় বসে, বাড়ির ছাদে ওঠে, গজল শোনে। তার সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়। সে এক লোমশ শকট সম্পর্কে নগরবাসীকে সতর্ক করে দেয়, কিন্তু তার কথা কেউ বিশ্বাস করে না, সবাই হো হো করে হাসে। শেষে কী ঘটে? শহরের সব কম্পিউটার হ্যাঙ হয়ে যায়। আর তার মুখ চেপে ধরার আগে সে বলে, “তোমাদের মিলিত মিছিল যদি ওর চে দীর্ঘ না হয় তবে ওই লোমশ শকট...” কথা শেষ হয় না, পাঠকের মনে এক প্রহেলিকার জন্ম দিয়ে কবিতাটি শেষ হয়। এখানে যে প্রচ্ছন্ন সামাজিক বিপ্লবের কথা আছে তা বলাই বাহুল্য। “সর্বাত্মকবাদের ইতিহাস ও কবি” কবিতায় আমরা পাই একজোড়া জুতোর গল্প। ভোগ্যপণ্যের দোকানে বিপুলসংখক জুতো, সেখানে উপচেপড়া ভিড়, জুতো কেনার প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেখানে কবিরা উপেক্ষিত। ফলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে, অধিকারের দাবি জানায়। কিন্তু নগ্নপদ কবি যারা, তারা দ্বিমত পোষণ করে: “আমরা জুতোর মাপে পা ঢোকাব না।” কবিদের চিন্তা ও জীবনযাপন সাধারণের চেয়ে ভিন্ন, তাই তাদেরকে কোনো ছাঁচে ফেলা যায় না। ছাঁচের মধ্যে রাখতে পারলে শাসকের সুবিধা হয়। ছাঁচের বাইরে থেকে নিজস্বতার সন্ধানকে রাষ্ট্রযন্ত্র এক বৌদ্ধিক ধৃষ্টতা হিসেবে গণ্য করে। কবি একাকী বসে থাকেন সড়কদ্বীপে জলসুমতি কিংবা অন্য কারো অপেক্ষায়। সময় গড়িয়ে যায়, কিন্তু তার দেখা মেলে না, ফলে জন্ম নেয় হতাশা। “তুমি না আসো যদি/ আকাশ হবে তারাবিহীন/ সড়কদ্বীপে আর কোনোদিন ভোর হবে না” (বসে আছি সড়কদ্বীপে)। রাজনৈতিক চিন্তা সূক্ষ¥ভাবে রূপকে প্রকাশিত। “বহুদিন নেই তুমি সুপ্রিয়নগরে; কী করে নিঃশ্বাস নিই/ যেখানেই যাই শূন্যতার পোড়াগন্ধ/ বোঝা দায় এখানে কখনো বাকশস্যের আবাদ ছিল” (বহুদিন তুমি নেই)। বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাকস্বাধীনতা হারানোর বিষয়টি এখানে প্রধান। নগরজীবনে যেমন চাঞ্চল্য আছে, তেমনি আছে অবসাদ, যেমন আছে মিলনের সুর, তেমনি বিরহের বিস্তার। “কতকাল স্থাণুজঙ্গমে খয়েরি অবসাদ, দিনমান পিছুহটা/ কখনো সড়কদ্বীপে নীল দুপুরের গান/ ভোরে নদীপারে বেজে ওঠা লঞ্চের সিটি-সংকেতে/ বারবার দুলে ওঠা বিরহী নগর” (প্রাগুক্ত)। নাগরিক জীবনে থাকে নানা জটিলতা; এখানে মানুষের চিন্তা জটিলকুটিল, শঠতা ও হঠকারিতায় ভরা। কবি তাদের চিন্তার জটিলতাকে প্রতিফলিত করেন শব্দযৌগে। গদ্যছন্দের প্রবহমানতায় শব্দগুলো নতুন মাত্রা নিয়ে হাজির হয় পাঠকের মনে। এখানে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো: ক্ষয়পুরুষ, সমুদ্রপাখি, চন্দ্রমোম, দুপুরকণ্ঠ, রজতনন্দন, বসন্তবিস্ফার, শাস্ত্রহিম, চৈত্রবিদ্ধ, আলাপজল, অরাতিপ্রতাপ, সামন্তপাথর, জলভ্রান্তি, নখরঅলীক, ভেতরনখ, গাড়লগুমোট, দুপুরদেয়াল, বিহঙ্গঝাঁপ, তৃষ্ণাসরোদ। শব্দগুলো সহজে মেলার নয়, এর জন্য দরকার কল্পনাশক্তি এবং জটিল ভাবনার সংশ্লেষ। তবে এরূপ শব্দযৌগায়ন প্রবণতা প্রমাণ করে যে কবি নিজে নগরসভ্যতার প্রতিভূ, এবং তার চিন্তায় রয়েছে নগরস্বভাব। নগরশঙ্খের একটি বড় মহিমা এর অন্তর্লীন মানবিক বোধ। কবিতা লেখার সময় কবি প্রান্তিক জনতাকে কখনো ভোলেন না। তিনি পথের ধারে পড়ে থাকা অবহেলিত মানুষকে তার পঙ্ক্তিতে বসান। তার সাক্ষী “শুদ্রতম” কবিতা, যেখানে দলিত-পদদলিত মানুষের জন্য সমবেদনা ব্যক্ত: “সুপেয় জলের জন্য কেঁদে ফেরে প্রান্তের গেলাস/ দলিত দেহের দ্বীপে পানিবাহী ত্রাস।” “অনিবার্য দ্বন্দ্বের ধ্বনি” কবিতায় তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বাজার অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলেন এবং যন্ত্রসভ্যতাকে একপ্রকার ব্যঙ্গ করেন: “হায় লোহা, মরিচার জন্ম দিবি বলে কি একদিন আগুনে তপ্ত হয়েছিলি?” কাজেই শফিক ইমতিয়াজের কাব্যচর্চা নিছক ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ নয়, বরং তা মানবসমাজ ও প্রগতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সকল প্রকার অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নান্দনিক প্রতিবাদ।

সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত