কথাসাহিত্যে নৈতিকতা : প্রবৃত্তি, বিবেক ও আত্মসংযম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুন, লিও টলস্টয় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
সাহিত্যে নৈতিকতা মূলত পাপ-পুণ্যের দ্বন্দ্ব নয়; বরং মানুষের প্রবৃত্তি, আত্মপরিচয় ও আত্মসংযমের অন্তর্দ্বন্দ্বের শিল্পরূপ। মানুষের অবচেতন মন একদিকে আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, ঈর্ষা, লোভ কিংবা ক্ষমতার বাসনা জাগিয়ে তোলে; অন্যদিকে চেতন মন, সামাজিক বোধ, আত্মপরিচয় ও নৈতিক বিচার সেই প্রবৃত্তিকে প্রশ্ন করে, নিয়ন্ত্রণ করে অথবা নতুন অর্থ দেয়। এই দ্বন্দ্বই কথাসাহিত্যের বহু স্মরণীয় চরিত্রকে গভীরতা দিয়েছে।
এই আলোচনার শুরুতে উদাহরণ হিসেবে আনা যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের কুবের ও কপিলাকে। তাদের সম্পর্ককে কেবল প্রেম বা যৌন আকর্ষণের কাঠামোয় ব্যাখ্যা করলে চরিত্র দুটির মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ধরা পড়ে না। সেখানে আছে গভীর আবেগ, পারস্পরিক আকর্ষণ, সামাজিক বাস্তবতা, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং আত্মসংযমের এক সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব।
মনোবিশ্লেষণের ভাষায় কুবের ও কপিলার আকর্ষণ মানুষের আদিম প্রবৃত্তির প্রকাশ। কিন্তু কপিলার ভেতরে সমান শক্তিতে কাজ করে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক দ্বন্দ্ব। তবে এই সংযমকে কেবল নৈতিক বিজয় বললে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পচিন্তাকে সংকুচিত করা হবে।
মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক অনিশ্চয়তা, নারীর নিরাপত্তাবোধ এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও এখানে সমানভাবে সক্রিয়। ফলে কপিলার সিদ্ধান্ত নৈতিকতার একরৈখিক প্রকাশ নয়; বরং বহুমাত্রিক মানবিক বাস্তবতার ফল।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কপিলার অন্তর্দ্বন্দ্বকে কেবল বিশ্লেষণ করেননি; সংলাপ ও আচরণের মধ্য দিয়েও অসাধারণ শিল্পরূপ দিয়েছেন। উদ্ধৃতি দেওয়া যায়, যেমন—
‘কপিলা যে পিছু পিছ আসিয়াছে তা কি কুবের জানে?
তাহার আকস্মিক হাসির শব্দে কুবের ভয়ে আধমরা হইয়া যায়। ঠকঠক করিয়া সে কাঁপিতে থাকে। নির্জন নদীতীরে সন্ধ্যারাত্রে কে হাসিবে? মানুষ নয়, নিশ্চয় নয়।
কপিলা বলে, তামুক ফেইলা আইছ মাঝি। কুবের নামিয়া আসিয়া তামাকের দলাটা গ্রহণ করে। বলে, খাটাশের মতো হাসিস ক্যান কপিলা, আঁই?
কপিলা বলে, ডরাইছিলা, হ? আরে পুরুষ!
তারপর বলে, আমারে নিবা মাঝি লগে?
বলে আর কপিলা আবদার করিয়া কুবেরের হাত ধরিয়া টানাটানি করে, চিরদিনের শান্ত নিরীহ কুবেরকে কোথায় যেন সে লইয়া যাইবে। মালার বোন না কপিলা? হ। কুবের তাহার দুই কাঁধ শক্ত করিয়া ধরিয়া অবাধ্য বাঁশের কঞ্চির মতো তাহাকে পিছনে হেলাইয়া দেয়, বলে, বজ্জাতি করস যদি, নদীতে চুবানি দিমু কপিলা!
কপিলা ধপ করিয়া সেইখানে কাদার উপরে বসিয়া পড়ে, হাসিতে হাসিতে বলে, আরে পুরুষ!
তাহার নির্বিবাদে কাদায় বসা আর শয়তানি হাসি আর খোঁচা দেওয়া পরিহাস— সব বড়ো রহস্যময় ও দুর্বোধ্য।’ (পদ্মা নদীর মাঝি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়; ঐতিহ্য: পৃষ্ঠা ৫০)
এই রহস্যময় এবং দুর্বোধ্য বোধই মানবিক সংযমের শিল্পিত রূপ। এই দৃশ্যে কপিলার উচ্চারিত ‘আমারে নিবা মাঝি লগে?’ প্রশ্নটি কেবল প্রেম নিবেদন নয়। এটি প্রবৃত্তির আহ্বান। কিন্তু সেই আহ্বানের পরও উপন্যাসটিতে তার আচরণের ভেতরে দ্বিধা, আত্মসংযম ও প্রত্যাহার দেখা যায়। এখানেই চরিত্রটি মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা অর্জন করে; উপন্যাসকে মোচড় দিয়ে বুঝিয়ে দেয় কপিলার ভেতরের সংযম একইসাথে মানবিক ও শৈল্পিক। দৃশ্যটি কেবল প্রেমের নয়; প্রবৃত্তি, আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসংযমের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক মুহূর্ত।
সাহিত্যে এই ধরনের পরিস্থিতিতে গভীর আবেগ থাকা সত্ত্বেও আত্মসংযম সম্পর্ককে ভিন্ন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। এটি গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ। মোটিফ বলতে এমন পুনরাবর্তিত শিল্পধারণাকে বোঝায়, যা একটি রচনার গভীর অর্থ নির্মাণ করে। কুবের-কপিলার সম্পর্ক সেই অর্থে বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী মোটিফ। এই মোটিফ বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যে বারবার ফিরে এসেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে বিনোদিনী ও মহেন্দ্রের আকর্ষণের ভেতরে কামনা, আত্মমর্যাদা ও বিবেকের সংঘর্ষ কাজ করে। শেষের কবিতা-য় অমিত ও লাবণ্য পরস্পরকে ভালোবাসলেও তাদের বিচ্ছেদ আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার এক গভীর উপলব্ধি হয়ে ওঠে। শরৎচন্দ্রের গৃহদাহ উপন্যাসে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নৈতিক সংকট ও সামাজিক দায়বোধের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
বিশ্বসাহিত্যেও একই মানবিক নাটক বিভিন্ন রূপে ফিরে এসেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—
Leo Tolstoy-Gi Anna Karenina-য় ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা সামাজিক নৈতিকতার সঙ্গে সংঘর্ষে ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়।
Edith Wharton-Gi The Age of Innocence -এ নিউল্যান্ড আর্চার ও এলেন ওলেনস্কার সম্পর্ক কর্তব্যবোধের কাছে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আর Kazuo Ishiguro-এর The Remains of the Day-এ স্টিভেন্স ও মিস কেন্টনের নীরব আবেগ, আত্মসংযম, পেশাগত আনুগত্য এবং আত্মপ্রতারণার এক মর্মস্পর্শী প্রতীকে রূপ নেয়। উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত অপূর্ণ প্রেমের কাহিনি নয়; বরং জীবনের অন্তিম প্রান্তে এসে হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার বেদনাময় উপলব্ধি।
এই উদাহরণগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণার দিকে নিয়ে যায়। সাহিত্যে নৈতিকতা অনেক সময় নীতিশিক্ষা নয়; বরং প্রবৃত্তি ও আত্মসংযম, আকাঙ্ক্ষা ও দায়িত্ব, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক অস্তিত্বের সংঘর্ষ। কুবের-কপিলা, বিনোদিনী-মহেন্দ্র, অমিত-লাবণ্য কিংবা নিউল্যান্ড-এলেন— তাঁরা ভিন্ন সংস্কৃতি ও সময়ের মানুষ হলেও একই মানবিক নাটকের বিভিন্ন রূপ।
এই কারণেই কথাসাহিত্যের চরিত্র বিশ্লেষণে কেবল সামাজিক নৈতিকতা যথেষ্ট নয়; মানুষের অন্তর্জগতের দিকেও তাকাতে হয়। অবচেতন প্রবৃত্তি কীভাবে আকর্ষণ সৃষ্টি করে, চেতন মন কীভাবে তার মূল্যায়ন করে, আত্মপরিচয় কীভাবে সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মনস্তত্ত্ব ও নৈতিক দর্শনের সহায়তা প্রয়োজন হয়। সাহিত্য তখন শুধু গল্প থাকে না; মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর অনুসন্ধানে পরিণত হয়।
দুই
সাহিত্যের চরিত্র বিশ্লেষণে মনোবিজ্ঞান ও নৈতিক দর্শনকে পাশাপাশি রাখা যায়। কারণ মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মনস্তত্ত্ব একদিকে প্রবৃত্তি ও মানসিক প্রক্রিয়ার কথা বলে, অন্যদিকে নৈতিক দর্শন আলোচনা করে চরিত্র, আত্মসংযম ও নৈতিক সিদ্ধান্তের। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি একত্রে বিবেচনা করলে সাহিত্যিক চরিত্রের অন্তর্জগৎ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মনের তিনটি প্রধান উপাদানের কথা বলেছেন— ইড (Id), ইগো (Ego) এবং সুপারইগো (Superego)। ইড মানুষের আদিম প্রবৃত্তির উৎস; ক্ষুধা, যৌন আকাঙ্ক্ষা, রাগ, প্রতিশোধস্পৃহা কিংবা ক্ষমতার বাসনা তারই অংশ। সুপারইগো গড়ে ওঠে পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি ও শিক্ষার প্রভাবে; এটি মানুষের অন্তর্গত নৈতিক বোধ, যা ভালো-মন্দের বিচার করে। আর ইগো বাস্তবতার আলোকে এই দুই শক্তির মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করে। মানুষের নৈতিক আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই এই অন্তর্দ্বন্দ্বের ফল।
কিন্তু নৈতিকতা কি কেবল প্রবৃত্তির দমন?
এই প্রশ্নে অ্যারিস্টটলের অবস্থান ভিন্ন। তাঁর Nicomachean Ethics-এ নৈতিকতা কোনো নিষেধাজ্ঞার নাম নয়; বরং চরিত্র গঠনের এক ধারাবাহিক অনুশীলন। মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা থাকবে, আবেগ থাকবে, প্রলোভন থাকবে— এটাই স্বাভাবিক। নৈতিকতার কাজ সেগুলোকে অস্বীকার করা নয়, বরং সুষম ও মানবিক পথে পরিচালিত করা।
অ্যারিস্টটলের বিখ্যাত Golden Mean ধারণা অনুসারে অধিকাংশ নৈতিক গুণ দুটি চরম অবস্থার মাঝখানে অবস্থান করে। সাহস থাকে বেপরোয়াভাব ও ভীরুতার মাঝখানে, উদারতা অপচয় ও কৃপণতার মাঝখানে। প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
একদিকে প্রবৃত্তির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, অন্যদিকে সমস্ত আবেগকে অস্বীকার করা— এই দুই চরম অবস্থার মাঝখানেই রয়েছে সংযম (Temperance)।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে কপিলা চরিত্রটি নতুনভাবে পাঠ করা যায়। সে আকর্ষণ অনুভব করে, আবেগকে অস্বীকার করে না; কিন্তু সেই আবেগের সম্পূর্ণ অধীনও হয়ে পড়ে না। তার ভেতরে দ্বিধা আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, আবার আত্মনিয়ন্ত্রণও আছে। ফলে কপিলার সংযম নিছক সামাজিক ভয়ের ফল নয়; বরং চরিত্রের পরিণতিরও প্রকাশ। অ্যারিস্টটলের ভাষায় এটি Temperance-এর একটি সাহিত্যিক রূপ।
এখানেই ফ্রয়েড ও অ্যারিস্টটলের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। ফ্রয়েড ভাষ্যে, কপিলা তার প্রবৃত্তিকে দমন করেছে। অ্যারিস্টটল বলবেন, সে তার প্রবৃত্তিকে শাসন করেছে। এই দুটি অবস্থানের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। দমন (repression) মানসিক চাপের কারণ হতে পারে; কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-mastery) চরিত্রের পরিণতির পরিচায়ক। সাহিত্যের অনেক স্মরণীয় চরিত্র এই দুই অবস্থার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভাগ্য নির্মাণ করে।
অ্যারিস্টটলের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Akrasia—অর্থাৎ দুর্বল ইচ্ছাশক্তি। মানুষ অনেক সময় জানে কোন কাজটি নৈতিকভাবে সঠিক, তবু প্রবৃত্তি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা আবেগের চাপে বিপরীত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। নৈতিক জ্ঞান আর নৈতিক আচরণ তাই এক বিষয় নয়।
বিশ্বসাহিত্যের অসংখ্য ট্র্যাজেডি এই Akrasia-র ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আনা কারেনিনা জানতেন তাঁর সিদ্ধান্তের সামাজিক মূল্য কত কঠিন হতে পারে; তবু আকাঙ্ক্ষার পথ থেকে সরে আসতে পারেননি।
William Shakespeare-এর Macbeth-এ ম্যাকবেথ জানতেন হত্যা অন্যায়, কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।
আবার Fyodor Dostoevsky-এর Crime and Punishment-এ রস্কলনিকভ নিজেকে সাধারণ নৈতিকতার ঊর্ধ্বে ভাবতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত অপরাধবোধ ও আত্মদ্বন্দ্বের কাছে পরাজিত হন।
এই চরিত্রগুলো প্রমাণ করে, মানুষের জীবনে ট্র্যাজেডি ঘটে অনেক সময় জ্ঞানের অভাবে নয়; আত্মনিয়ন্ত্রণের সংকটে।
এই কারণেই সাহিত্যে নৈতিকতা কেবল পাপ ও পুণ্যের দ্বন্দ্ব নয়; বরং প্রবৃত্তি, বিবেক এবং আত্মসংযমের জটিল সম্পর্ক। সাহিত্যের বড় চরিত্রগুলো আমাদের শেখায়, নৈতিকতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন প্রলোভন উপস্থিত থাকে। প্রলোভনহীন সংযমের কোনো মূল্য নেই; আর আকাঙ্ক্ষাহীন নৈতিকতারও কোনো নাটকীয়তা নেই। অনেকটা প্রলুব্ধ হওয়ার সুযোগের অভাবে ভালো থাকা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কপিলার চরিত্রে এই মানবিক দ্বন্দ্বকে কোনো নীতিকথায় পরিণত করেননি। বরং সংলাপ, আচরণ ও নীরবতার মধ্য দিয়ে এমন এক শিল্পরূপ দিয়েছেন, যেখানে আকর্ষণ ও আত্মসংযম পাশাপাশি অবস্থান করে। কুবের ও কপিলার সম্পর্কের শক্তি এখানেই— তারা কেবল প্রেমের চরিত্র নয়; মানুষের অন্তর্জগতের জটিলতার প্রতীক। সাহিত্য এই জটিলতাকেই ভাষা দেয়, আর সেই কারণেই তার সত্য জীবনকে অতিক্রম করেও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে।
তিন
ফ্রয়েড মানুষের অবচেতন প্রবৃত্তির কথা বলেছেন, অ্যারিস্টটল বলেছেন চরিত্র ও আত্মসংযমের কথা। মনস্তত্ত্বে এই আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন জ্যাঁ পিঁয়াজে, লরেন্স কোলবার্গ এবং জোনাথন হাইট। তাঁদের গবেষণা দেখায়, নৈতিকতা কোনো স্থির গুণ নয়; এটি মানুষের জ্ঞানীয় বিকাশ, সামাজিক অভিজ্ঞতা, আবেগ ও আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে ক্রমাগত পরিণত হয়।
পিঁয়াজের মতে, শিশুর নৈতিকতা প্রথমে চারপাশের নিয়মের ওপর নির্ভরশীল। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে শেখে যে নিয়ম মানুষের তৈরি; পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য এবং পারস্পরিক ন্যায্যতার আলোকে তার মূল্যায়ন করা যায়। অর্থাৎ নৈতিকতা তখন কেবল নিয়ম মানা নয়, ন্যায়বোধের বিকাশ।
মনোগবেষক কোলবার্গ এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেন। তাঁর মতে, নৈতিক বিকাশের প্রথম স্তরে মানুষ শাস্তি এড়ানো বা পুরস্কার পাওয়ার জন্য নৈতিক আচরণ করে। পরবর্তী স্তরে সামাজিক নিয়ম, আইন ও স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর সর্বোচ্চ স্তরে ব্যক্তি সার্বজনীন ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। নৈতিকতা তাই স্থির কোনো বিধি নয়; এটি আত্মসচেতনতারও একটি যাত্রা।
জোনাথন হাইট নৈতিক মনোবিজ্ঞানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেন। তাঁর মতে, মানুষ সব সময় যুক্তি দিয়ে নৈতিক সিদ্ধান্ত নেয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে কাজ করে অন্তর্দৃষ্টি ও আবেগ; পরে যুক্তি এসে সেই সিদ্ধান্তকে ব্যাখ্যা করে। নৈতিক বিচার তাই কেবল বুদ্ধির ফল নয়; সহমর্মিতা, ঘৃণা, করুণা, আনুগত্য এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাও তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
এসব আলোচনা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে নিয়ে যায়। নৈতিক সিদ্ধান্তে আবেগ ও যুক্তি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক।
মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া অনেক সময় আবেগনির্ভর হতে পারে, কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে সচেতন মূল্যায়ন সেই প্রতিক্রিয়াকে সংশোধন, পরিমার্জন কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বুদ্ধিভিত্তিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করে— আমি কী চাই, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমার সিদ্ধান্ত অন্য মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলবে? এটি কি ন্যায্য? দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি কী? এই আত্মজিজ্ঞাসাই নৈতিক পরিপক্বতার সূচনা করে।
সাহিত্যের চরিত্রগুলোর ভেতরেও আমরা একই প্রক্রিয়া দেখি। তারা কেবল ঘটনার শিকার নয়; নিজের সঙ্গে নিজের এক দীর্ঘ সংলাপেরও অংশ। সেই সংলাপের একদিকে থাকে প্রবৃত্তি, অন্যদিকে বিবেক; একদিকে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে সম্পর্ক, দায়িত্ব এবং আত্মপরিচয়। এই অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষই চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলে।
মনস্তত্ত্বের ভাষায় অবচেতন মন মানুষের বহু স্মৃতি, আবেগ, অভ্যাস ও মানসিক প্রবণতার ভাণ্ডার। তার অনেক প্রভাবই আমাদের সচেতন চিন্তার বাইরে থেকে আচরণকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে চেতন মন বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করে, বিকল্প বিবেচনা করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়। মানুষের জীবন এই দুই স্তরের নিরবচ্ছিন্ন মিথস্ক্রিয়ায় গঠিত হয়।
কথাসাহিত্যের সার্থকতা এখানেই যে, তা মানুষের এই অন্তর্জগতকে দৃশ্যমান করে। ঘটে যাওয়া দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহের আড়ালে লেখক দেখান চরিত্রের নীরব দ্বন্দ্ব, অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ, আত্মপ্রতারণা কিংবা আত্মসংযমের দীর্ঘ যাত্রা। ফলে সাহিত্য কেবল ঘটনা বর্ণনা করে না; মানুষের মনের গোপন ভূগোলও উন্মোচন করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্যে নৈতিকতা কোনো বিচারকের হাতুড়ি নয়। এটি মানুষের অন্তর্জীবনের এক সৃজনশীল সমন্বয়— যেখানে প্রবৃত্তি, বিবেক, যুক্তি, আবেগ এবং আত্মপরিচয় পরস্পরের সঙ্গে অবিরাম সংলাপে যুক্ত থাকে। সেই সংলাপ কখনও ট্র্যাজেডি সৃষ্টি করে, কখনও মুক্তি দেয়, কখনও বা মানুষকে নিজের অজানা সত্তার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
সম্ভবত এই কারণেই কালজয়ী কথাসাহিত্য আমাদের কাছে বারবার ফিরে আসে। আমরা সেখানে কেবল কুবের, কপিলা, আনা কারেনিনা, রস্কলনিকভ কিংবা স্টিভেন্সকে দেখি না; তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের ভেতর নিজেরই প্রতিচ্ছবি আবিষ্কার করি। সাহিত্য তখন জীবনের অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকে না; মানুষের আত্মঅনুসন্ধানের এক গভীর শিল্পরূপে পরিণত হয়।
***
আপনার মতামত লিখুন