সংবাদ

এ সপ্তাহের কবিতা


প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:২৪ এএম

এ সপ্তাহের কবিতা
শিল্পী : কাইয়ুম চৌধুরী

আমার কন্যাদের প্রতি

দিলারা হাফিজ

 

কন্যা তুমি সুস্মিত, সোনালি হৃদয়ের আতস

মরমের যাত্রা পথে স্বাস্থ্য আনন্দের উজ্জ্বল উদ্ধার!

 

ভালোবাসা শিখে নিও বহমান নরম নদীর কাছে...

অরণ্য-উজার করা ঋদ্ধ সবুজাভ আলো তুমি...

 

ক্ষমাই হতে পারে তোমার যোগ্য, শব্দ অর্থ অলঙ্কার,

ধৈর্য্যর নামাবলি যদি গায়ে পরে নাও চটজলদি!

 

জীবন, উদযাপনে দিব্যজ্ঞানের দীপখানি ভালোবেসে

জ্বেলে দিতে হবে কন্যা, তোমাকেই...

 

অপরের ক্ষয় ক্ষতি না গেঁথে নিজের সুতোয়

 

ধরে নাও, তোমার ভালো কেউ চাইছে না

কণ্টকিত কিছু দ্রোহের জঞ্জাল রেখে গেলো

তোমার উঠোনজুড়ে...,

 

কাঠের চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের মধ্য-খাটালে

কখনো বা বেডরুমের শাদা চাদরটির পরে

 

কী করবে তুমি?

বলী হবে শত্রুর খড়গে?

 

অপমানে কেঁদে কেটে চোখের জলে ভরে দেবে

দুচারটে সরোবর?

 

বাদে-প্রতিবাদে রাগে দুঃখে অহংকারে

নিজের মাথায় ছিঁড়বে চুল?

 

সর্বভূতে দয়া না করে দ্রোহের আগুনে পোড়াবে নিজেকেই?

 

একগাদা অভিযোগ নিয়ে কোর্টে যাবে মামলা ঠুকতে...

বিনাশ করবে সংসার যাতনার যত ক্লেশ?

 

এভাবে পাবে না তুমি কোনোই পরিত্রাণ...

 

যদি চাওশান্তি, কথার তীর ছোঁড় কম, শোন্ বেশি

নিজেকে অপরিহার্য করো মাটি জল বাতাস যেমন!

 

ঘাত-প্রতিঘাতময় এই সমুজ্জ্বল সময়ের কাছে...

তুমি হও ঘূর্ণায়মান সংসার মঞ্চে নিঃশব্দ তহবিল...

 

কুরুক্ষেত্রের পদ্মব্যূহ ভেদ করতে রণনীতি-জ্ঞান

তোমাকেই শিখে নিতে হবে কন্যাসাহসিকা

 

অপরিসীম ধৈর্য্যে আর মানবিক মার্জনাগুণে

কন্যা ভগ্নিরূপে, জায়া জননীরূপে তবেই তুমি অনন্যা

***

 

 


লিফট উঠেছিল আকাশ অবধি

খালেদ হোসাইন

 

লিফট উঠেছিল আকাশ অবধি

লিফট নেমেছিল পাতালে

চুম্বনহীন শুষ্ক ভ্রমণ

ছাড়া কিছু পাবে হাতালে?

 

মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখেছি

সুগোল সুনীল পিণ্ড

তুমি ছিলে চুপ, তা তো অপরূপ

কিন্তু হৃৎপিণ্ড

 

থরথর করে কেঁপেছে, বুঝেছ

ভাবোনি মহাপ্রলয় তো!

বোকা প্রেমিকের এমনই তো হয়

তুমি তা ভেবেছ হয়তো!

 

আবার যখন পাতালে নেমেছি

কেঁপেছে তোমার বুক তো

আতঙ্কে ছিল ওই অন্তরে

 

কেন, তুমি না মুক্ত?

 


 

লুকিং গ্লাসে কবুতর

শিহাব শাহরিয়ার

 

বাবা ঘুমাচ্ছেন আমার ঘুমের ভেতর

মা ঘুমাচ্ছেন আমার নিঃশ্বাসের ভেতর

 

বাবা গাঙ চিনিয়েছিলেনতাই আমি মূর্খ

মা চুল চিনিয়েছিলেনতাই আমি অবাধ্য

 

আমি যদি বৃষ্টি কুড়াইতাও আমার দোষ

আমার ওষ্ঠযুগল উল্টেদেয়ালে ধাক্কা খেলে

তাও আমার দোষদোষে নাকি দ্বন্দ্ব থাকে?

 

পার্থক্য দ্বন্দ্বের পর আত্মহত্যা জেগে ওঠে

তখন অচিন পাখিকে ঘর চিনাইসে দ্যাখে

লুকিং গ্লাসে পড়ে আছে... কয়েকটি কবুতর


 

লাগাম টেনে ধরো

প্রণব মজুমদার

 

ইচ্ছেটাকে প্রখর করো না; তাতে কামনা বাড়ে

ক্রমশঃমান তীব্রতায় মনে হানা দেয় লোভ

তখন অনেকেই পঙ্কিল পথে হেঁটে হেঁটে

পাপের জন্ম দেয়; পাপে মৃত্যু ভাবে জন?

কলুষের প্রতাপ দেখে পুণ্য শুয়ে থাকে নীরবে

ঘরে বাইরে পাপে একাকার, মিথ্যার বেসাতি,

প্রতারণার নতুন নতুন সংস্করণে অশান্ত পৃথিবী

বিশ্ব যেন পাপের বিশালতম এক কারখানা

এখানে কেউ অগ্নিকাণ্ড ঘটায় না; চালায় না ধ্বংসযজ্ঞ

বরং নিষ্ঠুরতায় ক্ষমতালোভে পুড়িয়ে দেয়া হয় পুণ্যঘর,

ক্ষুধায় কাঁদে অবুঝ শিশু, পঙ্কিলে বিপন্ন সভ্যতা

 

ইচ্ছার ঘোড়াটাকে দমাতে শিখ

তাতে খুঁজে পাবে পুণ্যের ঠিকানা 

যেখানে ভরপুর ভালোবাসার আনন্দ


 

 

গোপন অসুখ

নাহিদ পারভেজ

 

খুব নীরবে

তোমার চলে যাওয়া দেখলাম

অসহায় চোখে

তাকিয়েছিলে যখন,

কেন যেন মনে হয়েছিল

এই বুঝি

তুমি আবার আসবে,

অবাক জোছনায় ভরে উঠবে

তখন আমার উঠোন

সেই তুমি

আর এলে না!

তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায়

কেটে গেল

কত রজনি, মাস, বছর,

যুগের পর যুগ

সেই থেকে

ধীরে ধীরে তুমি হয়ে উঠলে

আমার গোপন অসুখ


 

জীবনের মহাকাব্য

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

 

খেয়ালের খেয়া নীলে মেঘে মেঘে ভাসালো ভেলা

সময়ের রকেট ছোটে বেখেয়ালে আলোকবর্ষ বেগে

ভাবনার চরকায় মনে বোনা বস্ত্রে ফাগুন খেলে হোলি

অলস দুপুর কোকিলের আড্ডায় হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত

 

কালো কেশে আলোয় হেসে বেণী বাঁধে কমলা রোদ্দুর

মলয়ে মাধুর্য মেখে গলে পড়ে অমরাবতী নগরে নিসর্গে

তবু উচাটন মন গুন গুন করে কণ্ঠে ভাঁজে রবীন্দ্রনাথ

ইলোরার নৃত্য-প্রতিমায় জীবন পায় উর্বশী উর্মিলা গং

 

নানা দোষে অসন্তোষে দ্রোহী হয়ে নাচে যাপিত জীবন

অলকার মগ্নতায় দলবেঁধে শান্তি হাঁটে বরফের দেশে

নিঃসঙ্গ লেকভ্যালি শুনে যায় কানভরে রুদ্র প্রলাপ

কালজয়ী উপন্যাসের এভাবেই লেখা হয় প্রতিটা দিন


 

ঝরা পাপড়ির দহন

মাতিন মোসাব্বির

 

এবারে দেখা হয়নি শিউলিভোরের আঁধারে ঝরে পড়া ছোট্ট সাদা ফুল,

কমলা ডাঁটে যার লেগে থাকে শেষ রাত্রির স্বপ্ন,

যেন প্রভাতের মাটিতে প্রেয়সীর প্রিয় নূপুরের শব্দে জাগে তার পদধ্বনি

 

শিউলির শিশিরে সিক্ত হয়নি কুণ্ঠিত হাত দুখানি,

ঘ্রাণ! সে তো দূর কী বাত!

যে মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণে জেগে উঠত সকালের আলো,

আজ সেখানে শুকনো বাতাস, নিঃশব্দ নীরবতা

 

শিউলি-কামিনীর গন্ধে একসময় হৃদয়ে বাজত প্রেমের ঘণ্টা

সেই সুরে কেঁপে উঠত ভোরের আকাশ,

তোমার চোখের মায়ায় লুকাত অগণিত পাপড়ির সাদা রহস্য

 

তোমার কেশরাশির নির্মলতায় শরীরে নির্লজ্জ শিহরন,

যেন বাতাসে দুলে ওঠে শিউলির ডালসেই প্রথম বুঝেছি,

প্রেমের আরেকটি দ্বার আছে

 

তোমার হাতে হাত রেখে চলতে গিয়ে জেনেছি,

প্রিয় স্পর্শে গভীরতর উষ্ণতার অনুভব

যেন শিশিরে ভেজা ফুলের গায়ে সূর্যের প্রথম ছোঁয়া,

তলপেটের শিরাগুলো টানটান হয়ে ব্যথা জাগায়

 

প্রেমে শুধুমন নয়দেহও জ্বলে, জ্বলে অদৃশ্য প্রদীপের শিখায়,

যার আলোয় রাতও স্নিগ্ধ হয়, আর নিঃশব্দে পুড়ে যায় সমস্ত ভয়

 

শিউলি-পাপড়ির শিশিরে যেমন ভিজিয়েছি ওষ্ঠ-অধর, তেমনি

তোমার ওষ্ঠ-অধরে স্নাত হোক আমার ওষ্ঠ-অধর

আমার অস্থির-অসহিষ্ণু কামনার প্রশ্বাস নেবে তোমার বুকের লবণাক্ত বুনো ঘ্রাণ

কিন্তু হায়! তুমি যে বরুনা, ওখানে শুধুই ছলনার বিষের উৎকট গন্ধ!

 

ঝরা শিউলি-বকুল সর্বদা প্রেমের অর্ঘ্য হয় নাহয় না দেবতার প্রণামী

আজকাল প্রয়াতদের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসাবেও দেখা যায় না বকুলমালা

ঝরা শিউলি-বকুলসব সময় আদর-ভালবাসার অঞ্জলিতে ভরে ওঠে না;

কিছু পড়ে থাকে ধুলোয় অবহেলায়, কিছু পদাদলিত হয়ে হারায়অনিচ্ছায়

 

খুব জানতে ইচ্ছে করে

তুমি ইচ্ছায় না অনিচ্ছায় প্রেমের শিউলি-বকুল পদদলিত করে গেলে?

 

বলো, কী উপাধিতে ভূষিত হবে তুমিচিরাচরিত ছলনাময়ীপ্রেমিক প্রতারক!

 


মাকোন্দো

মনিপদ্ম দত্ত

(কৃতজ্ঞতা: গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস)

 

যারা পাহাড় খুঁজছিল,

উত্তরের পথ ধরল

যারা সমুদ্র, দক্ষিণের

সবারই জানা বা অজানা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল

বাকিরা

পৃথিবীর পেট ফুলে যে জলাভূমিতে তাদের জন্ম হয়েছিল

সেই সব স্যাঁতস্যাঁতে আকাঁড়া গাঁয়ের

মাটিই আঁকড়াল

কারণ তারা ভালবেসেছিল ম্যাজিক, স্বপ্ন, আর, গোপন উত্তেজনা,

নোনা ঘামের গন্ধ, মশারির বিরুদ্ধতা

উত্তর দক্ষিণ থেকে কিন্তু সকলেই ফিরে এলো

অবশ্যই তারা পাহাড় দেখেছিল, সমুদ্রও

সঙ্গে অনেক কিছু নিয়েও ফিরেছিল

কেবল দুচোখ কিছু ক্লান্ত স্বপ্নহীন

তাদের গল্পগুলো রোমাঞ্চকর হলেও

ম্যাজিক ছিল না


 

 

বৃষ্টি তোমাকে দিয়েছিল বিষ,

আমাকে দিয়েছিল অমৃতসুধা

মিরাজুল আলম

 

শুনেছি, তুমুল বৃষ্টির রাতে তুমি নাকি ঘুমের মন্ত্র পান করেও ঘুমাতে পারনি

আর আমি বৃষ্টির শব্দ থেকে সংগীত সৃষ্টি করি

 

শুনেছি বৃষ্টির শিহরন, তোমার দেহে নাকি বিষের জ্বালা সৃষ্টি করে

গতকাল সন্ধ্যায় বৃষ্টির জলে ভিজতে গিয়েছিলে

বৃষ্টির জল নাকি তোমার দেহকে দারুণভাবে পুড়িয়েছিল

আর আমি

বৃষ্টিস্নানে আমার দেহের সব বিষাদ বেদনা মুছে দিয়েছি

 

শুনেছি পৃথিবীতে বৃষ্টি হলেই,

তুমি নাকি আকাশকে অকথ্য ভাষায়

গালিগালাজ করো

অথচ, বষ্টির জল মানেই আমার কাছে

পিপাসার পবিত্র জল


 

 

মেঘের খামে একটা চিঠি

আমির হামজা

 

আজ জানলার ওপারে বর্ষার অঝোর ধারা

একটানা, ক্লান্তিহীন এক অদ্ভুত একাকীত্বে

চারপাশটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে

প্রকৃতির এই উন্মাতাল জলছবিতে সবাই যখন

বৃষ্টি ভেজা রোমাঞ্চ খোঁজে,

ঠিক তখন কেউ এসে শুধালো না

কেন মেঘের খামে একটা চিঠি আসে না?

কেন কদম ফুলের মায়া বাড়ে না?

কেন বৃষ্টিতে ভিজি না?

কেন চিৎকার করে কাঁদি না?

 

এই যে উপেক্ষা,

এই যে একটা চেনা কণ্ঠস্বরের অনুপস্থিতি

তা আমাকে বিরহী করে তোলে

 

কেউ অন্তত জিগ্যেস করুক

এই জল থৈথৈ দিনেও বুকের ভেতরটা

এতটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে কেন

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬


এ সপ্তাহের কবিতা

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬

featured Image

আমার কন্যাদের প্রতি

দিলারা হাফিজ

 

কন্যা তুমি সুস্মিত, সোনালি হৃদয়ের আতস

মরমের যাত্রা পথে স্বাস্থ্য আনন্দের উজ্জ্বল উদ্ধার!

 

ভালোবাসা শিখে নিও বহমান নরম নদীর কাছে...

অরণ্য-উজার করা ঋদ্ধ সবুজাভ আলো তুমি...

 

ক্ষমাই হতে পারে তোমার যোগ্য, শব্দ অর্থ অলঙ্কার,

ধৈর্য্যর নামাবলি যদি গায়ে পরে নাও চটজলদি!

 

জীবন, উদযাপনে দিব্যজ্ঞানের দীপখানি ভালোবেসে

জ্বেলে দিতে হবে কন্যা, তোমাকেই...

 

অপরের ক্ষয় ক্ষতি না গেঁথে নিজের সুতোয়

 

ধরে নাও, তোমার ভালো কেউ চাইছে না

কণ্টকিত কিছু দ্রোহের জঞ্জাল রেখে গেলো

তোমার উঠোনজুড়ে...,

 

কাঠের চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের মধ্য-খাটালে

কখনো বা বেডরুমের শাদা চাদরটির পরে

 

কী করবে তুমি?

বলী হবে শত্রুর খড়গে?

 

অপমানে কেঁদে কেটে চোখের জলে ভরে দেবে

দুচারটে সরোবর?

 

বাদে-প্রতিবাদে রাগে দুঃখে অহংকারে

নিজের মাথায় ছিঁড়বে চুল?

 

সর্বভূতে দয়া না করে দ্রোহের আগুনে পোড়াবে নিজেকেই?

 

একগাদা অভিযোগ নিয়ে কোর্টে যাবে মামলা ঠুকতে...

বিনাশ করবে সংসার যাতনার যত ক্লেশ?

 

এভাবে পাবে না তুমি কোনোই পরিত্রাণ...

 

যদি চাওশান্তি, কথার তীর ছোঁড় কম, শোন্ বেশি

নিজেকে অপরিহার্য করো মাটি জল বাতাস যেমন!

 

ঘাত-প্রতিঘাতময় এই সমুজ্জ্বল সময়ের কাছে...

তুমি হও ঘূর্ণায়মান সংসার মঞ্চে নিঃশব্দ তহবিল...

 

কুরুক্ষেত্রের পদ্মব্যূহ ভেদ করতে রণনীতি-জ্ঞান

তোমাকেই শিখে নিতে হবে কন্যাসাহসিকা

 

অপরিসীম ধৈর্য্যে আর মানবিক মার্জনাগুণে

কন্যা ভগ্নিরূপে, জায়া জননীরূপে তবেই তুমি অনন্যা

***

 

 


লিফট উঠেছিল আকাশ অবধি

খালেদ হোসাইন

 

লিফট উঠেছিল আকাশ অবধি

লিফট নেমেছিল পাতালে

চুম্বনহীন শুষ্ক ভ্রমণ

ছাড়া কিছু পাবে হাতালে?

 

মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখেছি

সুগোল সুনীল পিণ্ড

তুমি ছিলে চুপ, তা তো অপরূপ

কিন্তু হৃৎপিণ্ড

 

থরথর করে কেঁপেছে, বুঝেছ

ভাবোনি মহাপ্রলয় তো!

বোকা প্রেমিকের এমনই তো হয়

তুমি তা ভেবেছ হয়তো!

 

আবার যখন পাতালে নেমেছি

কেঁপেছে তোমার বুক তো

আতঙ্কে ছিল ওই অন্তরে

 

কেন, তুমি না মুক্ত?

 


 

লুকিং গ্লাসে কবুতর

শিহাব শাহরিয়ার

 

বাবা ঘুমাচ্ছেন আমার ঘুমের ভেতর

মা ঘুমাচ্ছেন আমার নিঃশ্বাসের ভেতর

 

বাবা গাঙ চিনিয়েছিলেনতাই আমি মূর্খ

মা চুল চিনিয়েছিলেনতাই আমি অবাধ্য

 

আমি যদি বৃষ্টি কুড়াইতাও আমার দোষ

আমার ওষ্ঠযুগল উল্টেদেয়ালে ধাক্কা খেলে

তাও আমার দোষদোষে নাকি দ্বন্দ্ব থাকে?

 

পার্থক্য দ্বন্দ্বের পর আত্মহত্যা জেগে ওঠে

তখন অচিন পাখিকে ঘর চিনাইসে দ্যাখে

লুকিং গ্লাসে পড়ে আছে... কয়েকটি কবুতর


 

লাগাম টেনে ধরো

প্রণব মজুমদার

 

ইচ্ছেটাকে প্রখর করো না; তাতে কামনা বাড়ে

ক্রমশঃমান তীব্রতায় মনে হানা দেয় লোভ

তখন অনেকেই পঙ্কিল পথে হেঁটে হেঁটে

পাপের জন্ম দেয়; পাপে মৃত্যু ভাবে জন?

কলুষের প্রতাপ দেখে পুণ্য শুয়ে থাকে নীরবে

ঘরে বাইরে পাপে একাকার, মিথ্যার বেসাতি,

প্রতারণার নতুন নতুন সংস্করণে অশান্ত পৃথিবী

বিশ্ব যেন পাপের বিশালতম এক কারখানা

এখানে কেউ অগ্নিকাণ্ড ঘটায় না; চালায় না ধ্বংসযজ্ঞ

বরং নিষ্ঠুরতায় ক্ষমতালোভে পুড়িয়ে দেয়া হয় পুণ্যঘর,

ক্ষুধায় কাঁদে অবুঝ শিশু, পঙ্কিলে বিপন্ন সভ্যতা

 

ইচ্ছার ঘোড়াটাকে দমাতে শিখ

তাতে খুঁজে পাবে পুণ্যের ঠিকানা 

যেখানে ভরপুর ভালোবাসার আনন্দ


 

 

গোপন অসুখ

নাহিদ পারভেজ

 

খুব নীরবে

তোমার চলে যাওয়া দেখলাম

অসহায় চোখে

তাকিয়েছিলে যখন,

কেন যেন মনে হয়েছিল

এই বুঝি

তুমি আবার আসবে,

অবাক জোছনায় ভরে উঠবে

তখন আমার উঠোন

সেই তুমি

আর এলে না!

তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায়

কেটে গেল

কত রজনি, মাস, বছর,

যুগের পর যুগ

সেই থেকে

ধীরে ধীরে তুমি হয়ে উঠলে

আমার গোপন অসুখ


 

জীবনের মহাকাব্য

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

 

খেয়ালের খেয়া নীলে মেঘে মেঘে ভাসালো ভেলা

সময়ের রকেট ছোটে বেখেয়ালে আলোকবর্ষ বেগে

ভাবনার চরকায় মনে বোনা বস্ত্রে ফাগুন খেলে হোলি

অলস দুপুর কোকিলের আড্ডায় হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত

 

কালো কেশে আলোয় হেসে বেণী বাঁধে কমলা রোদ্দুর

মলয়ে মাধুর্য মেখে গলে পড়ে অমরাবতী নগরে নিসর্গে

তবু উচাটন মন গুন গুন করে কণ্ঠে ভাঁজে রবীন্দ্রনাথ

ইলোরার নৃত্য-প্রতিমায় জীবন পায় উর্বশী উর্মিলা গং

 

নানা দোষে অসন্তোষে দ্রোহী হয়ে নাচে যাপিত জীবন

অলকার মগ্নতায় দলবেঁধে শান্তি হাঁটে বরফের দেশে

নিঃসঙ্গ লেকভ্যালি শুনে যায় কানভরে রুদ্র প্রলাপ

কালজয়ী উপন্যাসের এভাবেই লেখা হয় প্রতিটা দিন


 

ঝরা পাপড়ির দহন

মাতিন মোসাব্বির

 

এবারে দেখা হয়নি শিউলিভোরের আঁধারে ঝরে পড়া ছোট্ট সাদা ফুল,

কমলা ডাঁটে যার লেগে থাকে শেষ রাত্রির স্বপ্ন,

যেন প্রভাতের মাটিতে প্রেয়সীর প্রিয় নূপুরের শব্দে জাগে তার পদধ্বনি

 

শিউলির শিশিরে সিক্ত হয়নি কুণ্ঠিত হাত দুখানি,

ঘ্রাণ! সে তো দূর কী বাত!

যে মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণে জেগে উঠত সকালের আলো,

আজ সেখানে শুকনো বাতাস, নিঃশব্দ নীরবতা

 

শিউলি-কামিনীর গন্ধে একসময় হৃদয়ে বাজত প্রেমের ঘণ্টা

সেই সুরে কেঁপে উঠত ভোরের আকাশ,

তোমার চোখের মায়ায় লুকাত অগণিত পাপড়ির সাদা রহস্য

 

তোমার কেশরাশির নির্মলতায় শরীরে নির্লজ্জ শিহরন,

যেন বাতাসে দুলে ওঠে শিউলির ডালসেই প্রথম বুঝেছি,

প্রেমের আরেকটি দ্বার আছে

 

তোমার হাতে হাত রেখে চলতে গিয়ে জেনেছি,

প্রিয় স্পর্শে গভীরতর উষ্ণতার অনুভব

যেন শিশিরে ভেজা ফুলের গায়ে সূর্যের প্রথম ছোঁয়া,

তলপেটের শিরাগুলো টানটান হয়ে ব্যথা জাগায়

 

প্রেমে শুধুমন নয়দেহও জ্বলে, জ্বলে অদৃশ্য প্রদীপের শিখায়,

যার আলোয় রাতও স্নিগ্ধ হয়, আর নিঃশব্দে পুড়ে যায় সমস্ত ভয়

 

শিউলি-পাপড়ির শিশিরে যেমন ভিজিয়েছি ওষ্ঠ-অধর, তেমনি

তোমার ওষ্ঠ-অধরে স্নাত হোক আমার ওষ্ঠ-অধর

আমার অস্থির-অসহিষ্ণু কামনার প্রশ্বাস নেবে তোমার বুকের লবণাক্ত বুনো ঘ্রাণ

কিন্তু হায়! তুমি যে বরুনা, ওখানে শুধুই ছলনার বিষের উৎকট গন্ধ!

 

ঝরা শিউলি-বকুল সর্বদা প্রেমের অর্ঘ্য হয় নাহয় না দেবতার প্রণামী

আজকাল প্রয়াতদের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসাবেও দেখা যায় না বকুলমালা

ঝরা শিউলি-বকুলসব সময় আদর-ভালবাসার অঞ্জলিতে ভরে ওঠে না;

কিছু পড়ে থাকে ধুলোয় অবহেলায়, কিছু পদাদলিত হয়ে হারায়অনিচ্ছায়

 

খুব জানতে ইচ্ছে করে

তুমি ইচ্ছায় না অনিচ্ছায় প্রেমের শিউলি-বকুল পদদলিত করে গেলে?

 

বলো, কী উপাধিতে ভূষিত হবে তুমিচিরাচরিত ছলনাময়ীপ্রেমিক প্রতারক!

 


মাকোন্দো

মনিপদ্ম দত্ত

(কৃতজ্ঞতা: গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস)

 

যারা পাহাড় খুঁজছিল,

উত্তরের পথ ধরল

যারা সমুদ্র, দক্ষিণের

সবারই জানা বা অজানা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল

বাকিরা

পৃথিবীর পেট ফুলে যে জলাভূমিতে তাদের জন্ম হয়েছিল

সেই সব স্যাঁতস্যাঁতে আকাঁড়া গাঁয়ের

মাটিই আঁকড়াল

কারণ তারা ভালবেসেছিল ম্যাজিক, স্বপ্ন, আর, গোপন উত্তেজনা,

নোনা ঘামের গন্ধ, মশারির বিরুদ্ধতা

উত্তর দক্ষিণ থেকে কিন্তু সকলেই ফিরে এলো

অবশ্যই তারা পাহাড় দেখেছিল, সমুদ্রও

সঙ্গে অনেক কিছু নিয়েও ফিরেছিল

কেবল দুচোখ কিছু ক্লান্ত স্বপ্নহীন

তাদের গল্পগুলো রোমাঞ্চকর হলেও

ম্যাজিক ছিল না


 

 

বৃষ্টি তোমাকে দিয়েছিল বিষ,

আমাকে দিয়েছিল অমৃতসুধা

মিরাজুল আলম

 

শুনেছি, তুমুল বৃষ্টির রাতে তুমি নাকি ঘুমের মন্ত্র পান করেও ঘুমাতে পারনি

আর আমি বৃষ্টির শব্দ থেকে সংগীত সৃষ্টি করি

 

শুনেছি বৃষ্টির শিহরন, তোমার দেহে নাকি বিষের জ্বালা সৃষ্টি করে

গতকাল সন্ধ্যায় বৃষ্টির জলে ভিজতে গিয়েছিলে

বৃষ্টির জল নাকি তোমার দেহকে দারুণভাবে পুড়িয়েছিল

আর আমি

বৃষ্টিস্নানে আমার দেহের সব বিষাদ বেদনা মুছে দিয়েছি

 

শুনেছি পৃথিবীতে বৃষ্টি হলেই,

তুমি নাকি আকাশকে অকথ্য ভাষায়

গালিগালাজ করো

অথচ, বষ্টির জল মানেই আমার কাছে

পিপাসার পবিত্র জল


 

 

মেঘের খামে একটা চিঠি

আমির হামজা

 

আজ জানলার ওপারে বর্ষার অঝোর ধারা

একটানা, ক্লান্তিহীন এক অদ্ভুত একাকীত্বে

চারপাশটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে

প্রকৃতির এই উন্মাতাল জলছবিতে সবাই যখন

বৃষ্টি ভেজা রোমাঞ্চ খোঁজে,

ঠিক তখন কেউ এসে শুধালো না

কেন মেঘের খামে একটা চিঠি আসে না?

কেন কদম ফুলের মায়া বাড়ে না?

কেন বৃষ্টিতে ভিজি না?

কেন চিৎকার করে কাঁদি না?

 

এই যে উপেক্ষা,

এই যে একটা চেনা কণ্ঠস্বরের অনুপস্থিতি

তা আমাকে বিরহী করে তোলে

 

কেউ অন্তত জিগ্যেস করুক

এই জল থৈথৈ দিনেও বুকের ভেতরটা

এতটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে কেন


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত