বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
গোলাপের দেশে, বেদানার দেশে
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
ক্রোয়েশিয়া পৌঁছানোর আগেই ভেবেছি সুযোগ ঘটলে দু’দিনের জন্য একা কোথাও গিয়ে ঘুরে আসবো। একা ঘুরতে যাওয়ার আনন্দ জগতে দ্বিতীয়টি নেই— ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, আরও বেশি ঢোকা যায় নিজের ভেতরে। নিজের পছন্দ-অপছন্দ, সক্ষমতার বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া যায়। অপরিচিত স্থানে একা ঘুরতে যাওয়া মানেই একা একা নতুন সমস্যার মোকাবেলা করা। সে এক অন্য আনন্দ।
স্প্লিট শহরে এসে শুনি, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা বেশি দূরে নয়। যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো। কিন্তু গণপরিবহণে গেলে ঝামেলা ও সময় দুইই বেশি। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ঢোকা মানেই সেংজেন বলয় থেকে বের হয়ে যাওয়া, ফলে ক্রোয়েশিয়া-বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা সীমানায় নিরাপত্তা খুব কড়াকড়ি। এই সীমানা পার হয়ে পদব্রজে চোরা পথে ইতালি-জার্মানির পথে পা বাড়ায় মানুষ । বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা থেকে ভিসা ছাড়া ক্রোয়েশিয়ায় ঢোকা যায় না। তবে সেংজেনভুক্ত কোনো দেশের রেসিডেন্ট পারমিট থাকলে ক্রোয়েশিয়া থেকে ও মুলুকে যেতে আলাদা ভিসা লাগে না। কিন্তু ঝঞ্ঝাট হলো, এই ইমিগ্রেশন-জটিলতা সময় খেয়ে ফ্যালে। গণপরিবহণে গেলে বিড়ম্বনা ঢের বেশি, শুনেছি হেস্তনেস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু স্প্লিট থেকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিখ্যাত মোস্তার শহরে বেড়াতে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন ভ্রমণসংস্থার বিশেষ যে যাতায়াতের ব্যবস্থা আছে তাতে খরচা বেশি হলেও ঝামেলা নাকি নেই। ক্রোয়েশিয়া শিক্ষাসফরের সফর-নির্দেশকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি বলেন, আমরা যে দুই সপ্তাহ ক্রোয়েশিয়া আছি তার সপ্তাহান্ত মূলত ছুটি। অর্থাৎ শুক্রবারের বিকেল থেকে সোমবারের সকাল পর্যন্ত মূল প্রোগ্রামের আওতামুক্ত। এ সময় যার যা ইচ্ছে করতে পারে। আমি বলি, মোস্তার যাবো ভাবছি। তিনি বলেন, সমস্যা নেই, তবে যেখান থেকে বুকিং করবে তাদের নাম ঠিকানা আমাকে দিয়ে রাখবে। আমি শনিবারে মোস্তার ভ্রমণের প্রারম্ভিক বুকিং সম্পন্ন করে ফেলি।
মে মাসের শনিবারে এক ভোর। বিভিন্ন চিন্তা আর উত্তেজনায় রাতে ভালো ঘুম হয়নি। মোস্তার যাচ্ছি, যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। সেংজেন থেকে বের হয়ে ঢুকতে যাচ্ছি বলকানের আরও গহিনে। কত কী চিন্তা মনের ভেতর সেই ঘন ভোরে গোল হয়ে আসছে তার ঠিক নেই। সেদিন আকাশ আলোকিত হওয়ার আগেভাগেই স্নান সেরে আমি তৈরি। তখনও হোস্টেলে পাশের রুমে সহপাঠিরা গহিন নিদ্রায় বিভোর। চালের ওপর থেমে থেমে দু’একটি চড়ুই ডাকছে। বের হওয়ার আগে চেষ্টা করলাম হালকা প্রাতরাশ সারার। সম্ভব হলো না। আমার এই এক সমস্যা, বোধহয় অনেকেরই— বিশেষ কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আগে উত্তেজনায় খাওয়ার আগ্রহ উবে যায়। ফলে, কিছু শুকনো খাবার আর সফেন জল সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। ভ্রমণসংস্থার যে অফিস থেকে যাত্রার জন্য বুকিং করেছিলাম তার সামনে ভোর সাড়ে ছয়টায় থাকতে বলা হয়েছে।
আদ্রিয়ান সাগরের উপকূলে টিলার উপরে আমাদের হোস্টেল। সেখান থেকে ভ্রমণ সংস্থার অফিসে যাওয়ার পথটি পায়ে হেঁটেই যাওয়া যায়। হোস্টেল থেকে বের হওয়ার পর সেই সকালে পথগুলো অপরিচিত মনে হতে থাকে। ক্রোয়েশিয়ায় এর আগে এতো ভোরে কখনো ঘুম থেকে উঠিনি। হোস্টেল থেকে ঢালু সরু পথ সাগরের দিকে গিয়ে নেমেছে, নির্জন সেই পথের দু’পাশের বাড়িগুলোর কিনার ঘেঁষে ঘেঁষে অন্ধকারের রেখা তখনও যায়নি। ঢালু পথে মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই নেমে এলাম সমুদ্রের তীর ধরে এগিয়ে যাওয়া বন্দরের পিচঢালা ¯িপ্লট শহরের বিখ্যাত রিভা সরণিতে। সাধারণ পথ সে নয়, তাকে বলতে হয় প্রমোদসরণী। সেই সরণীর একপাশে আদ্রিয়ান সাগরের অনন্ত নীল জলরাশি, অন্যপাশে পুরাতন প্রাসাদের ঝুলবারান্দা। প্রতিদিন সন্ধেবেলায় এই সরণিজুড়ে হাজার লোকের ভিড় লেগেই থাকে, সারা পৃথিবী থেকে পর্যটকেরা হাজির হয়। কিন্তু তখন পথটি জনশূন্য। মাথায় কমলা রঙের ক্যাপ আর হাতে গ্লাভস পরে কেবল কয়েকজন পরিষ্কারকর্মী তাদের কাজে ব্যস্ত। টিলা থেকে হেঁটে ডালমেশিয়ান উপকূলের রিভা প্রমোদসরণিতে নামতেই মৃদুমন্দ হাওয়া সমুদ্রের নোনা গন্ধ এনে শরীর ভরিয়ে দিলো। আদ্রিয়ান তখন তুলনামূলক শান্ত। ঢেউয়ের আওয়াজ কোমল। সেই ঢেউয়ে দুলছে রিভার শান বাঁধানো ঘাটে সারি সারি নোঙর করা নৌকা। তাদের শরীরে প্রভাত সূর্যের কনকরেখা খাবি খাচ্ছে। রাস্তার বুক চিরে গভরমেন্টের লাগানো সারি সারি পাম গাছ। তাদের পাতার ভেতরে প্রভাতের নরম হাওয়া অবিরাম কম্পন রেখে আরও কিছু দূরে প্রায় এক হাজার আটশো বছরের পুরোনো ডায়োক্লেশিয়ান প্রাসাদের দেওয়ালের গায়ে ধাক্কা খাচ্ছে। আমি এগিয়ে চলি। সরণির দোকানগুলোর সামনে মৃত চেয়ার-টেবিলগুলো চড়ুই, বুনো কবুতর আর ক্রোয়েশীয় গাঙচিলের দখলে। তাদের নরম মেজাজ আর সমুদ্রের প্রশান্ত নীল জলরাশি একসঙ্গে ভ্রম রাখে মাথার ভেতরে। সহসা মনে হয়, মোস্তার আমাকে কী দেবে জানি না, কিন্তু এই শান্ত ভোর আমাকে অনেক কিছুই দিয়ে গ্যালো।
আরেকটু হাঁটতেই বুকিং অফিসের সামনে এসে পড়ি। ভেবেছিলাম অনেক লোকের দেখা পাওয়া যাবে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার, রাস্তের পাশে জনা দশেকের মতো লোক অপেক্ষারত। কিন্তু কাউকেই গাইড মনে হলো না। সবার মুখেই অপেক্ষার সুবর্ণরেখা। ভাবলাম, তারাও মোস্তারের যাত্রী কিনা কারো কাছে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হওয়া যাক। নিকটে দেখি এক দম্পতি, দেখে মনে হয় ইউরোপিয়ান, দু’জনের বয়স ষাটের বেশি। স্ত্রী যাই-ই বলছে, লোকটি কেবল চাপা স্বরে হেসে যাচ্ছে। কাছে গিয়ে প্রথম প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সময়ই কোনো এক অদ্ভুত কারণে মনে হলো তারা জার্মান। এই ঘটনা বেশ অনেকবার ঘটেছে, আইসল্যান্ড, ফ্রান্স কিংবা স্পেনের পথে পথে ঘোরার সময় মুখের গঠন, কাপড় পরার ঢং, চোখের ওঠানামা, বিশেষ করে ইংরেজির উচ্চারণভঙ্গিতে কীভাবে যেন মনে হয়, এরা জার্মান। ভ্রমণসংস্থার অফিসের দিকে আঙুল দেখিয়ে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করি, ‘কিছু না মনে করলে, আপনারা কি এই ভ্রমণসংস্থার আয়োজনে মোস্তার যাচ্ছেন’? লোকটি হেসে হেসে বললে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু সাড়ে ছয়টা তো প্রায় হয়েই গেলো, কেউ তো নিতে আসছে না। আপনিও কি মোস্তার যাবেন’? আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে ইংরেজি ভাষায় করা প্রশ্নের উত্তর জার্মানে দিলাম। শুনে চোখ বড় করে নারীটি বলল, কীভাবে বুঝলে আমরা জার্মান? এইতো শুরু হয়ে গেলো আলাপ। ভ্রমণের আগেই ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবে পেলাম জার্মানদম্পতি মানফ্রিড ও টিনাকে। উত্তর জার্মানির বাল্টিক সমুদ্রের তীরবর্তী এক্যার্নফোর্ডে শহর থেকে বসবাসের কামরা বিশিষ্ট ব্যক্তিগত গাড়িতে চেপে চেক রিপাবলিক, অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া ঘুরে ক্রোয়েশিয়ায় থেমেছে। পথে একেক দেশে একাধিক দিন থেকেছে, ঘুরেছে, দেখেছে। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার স্প্লিটের পর বলকানের ভেতরে আর যেহেতু সেংজেন অঞ্চল নেই, সে কারণে স্প্লিটে গাড়ি পার্ক করে আমাদের সঙ্গে মোস্তার যাচ্ছে। গাড়ি সঙ্গে নিতে গেলে অতিরিক্ত পারমিটের ঝাক্কি। মোস্তার ঘুরে ক্রোয়েশিয়া ফিরে, তারপর ঘরে ফেরার বন্দোবস্ত করবে। ফেরার পথ নাকি হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, পোলান্ড হয়ে। ভাবি, কী এক জীবন তাদের! দুই মাস ধরে এ-দেশ থেকে ও-দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের সঙ্গে আলাপের মধ্যেই, মার্সিডিজের কালো একটি মিনিবাস আমাদের সামনে থামে। দরজা খুলে নেমে আসে ধনুকের মতো বাঁকা ছিপছিপে দীর্ঘদেহি এক নারী, উচ্চতা ছয়-ফুটের কাছাকাছি, নখে কৃষ্ণ নখরঞ্জনী, চোখ ঘন কাজলাবৃত, কাঁধ পর্যন্ত চুল চুলবন্ধনীতে আবদ্ধ। ক্রোয়েশীয় না হয়ে যায় না। জানালো সে আমাদের ট্যুরের গাইড। পকেট থেকে কাগজ বের করে নাম ধরে ডেকে সবাইকে মিনিবাসে তুললো। আমরা সব মিলিয়ে বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন বর্ণের তের জন। বাসে উঠতেই গাইড তার পরিচয় দিলো। নাম হেলেনা, স্প্লিটের স্থানীয়। আইন নিয়ে পড়াশোনা করছে। পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন এই পেশা বেছে নিয়েছে।
মিনিবাসের ভেতরে ঢুকে মনে হলো, আরেক দুনিয়া। পরিষ্কার আর সুশৃঙ্খল আসনের সারি। আমি ডান পাশের জানালার সিট পাই। জানালাগুলো পরিষ্কার, ভেতর থেকে বাইরে তাকালে মনে হচ্ছে বিশাল এক ক্যানভাস। কিছুক্ষণ পর যাত্রা শুরু হয়। ¯িপ্লট শহর ছাড়তেই দেখি পিচঢালা পথ ডেনেরিক পর্বতমালার খাঁজ ধরে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। বামে কেবল চরে বেড়ানো সবুজ, মাঝে মধ্যে ঝোপ ঝোপ ল্যাভেন্ডেরের ঢেউখেলানো মাঠ, কখনো কেবল অলিভ বাগানের সারি। ডানে খাড়া উঠে যাওয়া ডিনারিক পর্বতেরা দূরে মেঘের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে বসে আছে। হুটহাট পাহাড়ের কাত হওয়া শরীরে মেঘের ছায়া এসে ভর করে। সেই ছায়ার ভেতর হাত রেখে দৃশ্যরা রৌদ্র গায়ে মাখে আর অবিরাম কাঁপে। আমি চুপচাপ দেখি। আরও কিছু পরে দেখি ডানপাশের পাহাড় সহসা নাই হয়ে গেলো। গাড়ি চলছে পাহাড়ের প্রান্ত ধরে। ডান জানালার ওপাশে ধু ধু শূন্যতা। কিছু পরে সেই শূন্যতার ভেতর দূরে ফুলে ওঠে ফেনায়িত সাদাটে নীল রঙ— সেই দূরের ভেতর আদ্রিয়ান সাগরের অফুরন্ত জলরাশি ধীরে ভেঙে পড়ছে। কিন্তু এ কী! সাগর অতো নিচে কেন? ঠিকভাবে তাকিয়ে দেখে অনিচ্ছুক কেঁপে উঠি! আমরা যে পথ ধরে চলেছি, সে পথ যেন পাহাড়ের ডগার ওপরে সরু একটি রেখা। উঠতে উঠতে এতো উঁচুতে উঠে গেছি যে, ডানে সমুদ্রের তাকালে মনে হয়, আমরা বাসে নয়, রয়েছি উড়োজাহাজে— জানালা গলে নিচে চোখ পড়লে বুকের ভেতর শূন্যতা ঘাই মারে। দুই-একটি গাংচিলকে দেখি আমাদের সমান উচ্চতায় ডানা টান-টান করে হাওয়া আর গতির ভেতরে অবিচলিত ভঙ্গিতে ভাসছে। চোখের জানালা ভেঙে তখন কেবল বুকের ভেতর শিহরন ঢোকে। এ কোথায় এলাম! টিনা-মানফ্রিডের মুখে কোনো কথা নেই, তারাও ডানে তাকিয়ে। কিছুক্ষণ পরে আমাদের সেই এক দৃষ্টিতে ভাটা পড়ে, গাইডের ঘোষণা। পাসপোর্ট জমা দিতে হবে, একটু পরেই ক্রোয়েশিয়ার সীমানা শেষ। আমাদের বাস থেকে না নামলেও চলবে। তিনিই সব সম্পন্ন করে আনবেন। এইসবের ভেতর মনোযোগ শেষে ডানে তাকিয়ে দেখি স্বপ্নের আকাশপথ ছেড়ে আমরা ঢুকে পড়েছি টোল আদায়ের জন্য বানানো একঘেয়ে প্রশস্ত রাস্তার শরীরে। পাহাড়েরা সরে গেছে দূরে।
পনের মিনিটে আমাদের সবার ক্রোয়েশিয়া অংশের ইমিগ্রেশন শেষ হয়। পাসপোর্টে পাওয়া গেলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের তারকা সম্বলিত একটি সিল। সিল বলছে, আমরা ক্রোয়েশিয়া থেকে বেরিয়ে গেলাম। কিছু দূরে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ইমিগ্রেশন। এর মধ্যে আমাদের ফোনের নেটওয়ার্ক উধাও হয়ে গেলো। বসনীয় ইমিগ্রেশনে গিয়ে নড়ে বসলাম। ক্রোয়েশিয়ার পুলিশের মতো এদেশের পুলিশেরা তেমন ফিটফাট নয়, কোথায় যেন ছাড়াছাড়া ভাব। ইমিগ্রেশন শেষে পাসপোর্ট চেক করে দেখি কোনো সিল নেই। গাইড বললো, এরা সিল দেয় না। ও দেশে ঢুকতেই ক্রোয়েশিয়া থেকে আসা আট লেনের রাস্তা দুই লেনে গিয়ে ঠেকলো। কিছু পরে পিচঢালা রাস্তার ভেতরের ডিভাইডারও উধাও। সেই পথ ছেড়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ঢালু, কখনো বন্ধুর পথে বসনীয় গ্রামের (বলে রাখা ভালো বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা দেশটি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা দুটি অঞ্চলে বিভক্ত। দেশটিকে বসনিয়া বলে ডাকলে হার্জেগোভিনার স্থানীয়রা খুবই রাগ করে) ভেতর দিয়ে গাড়ি এগোতে লাগলো। দু’পাশের দৃশ্যের ভেতর এখন আর ডিনারিক পর্বতেরা নেই। কেবল ঢেউখেলানো ঝাড়-ঝাড় সবুজ গাছপালা। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর বসনিয়ার একটি পাড়াগাঁয়ের ভেতরে বাজারমতো জায়গায় যাত্রা-বিরতি দেওয়া হলো। এলাকাটি ছোট্ট, ছিমছাম। আশপাশ একটু ঘুরে দেখা আর সতেজ হওয়ার জন্য এক ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হলো।
নামার পর অনুভূতিটা বদলে গেলো। ভেতর থেকে যা মনে হয়েছে, চারপাশটা তার থেকেও বেশি সুন্দর। পাহাড়ি জঙ্গলের ভেতর বসনীয় গ্রাম। এভাবে প্রকৃত বসনিয়া চোখের সামনে দেখতে পারবো ভাবিনি। মনস্থির করলাম, যতটুকু সম্ভব গ্রামটা ভালো করে ঘুরে দেখবো। গ্রামীণ বসনিয়া এবং তার প্রকৃতি বোঝার জন্য এই সুযোগ কাজে লাগাতেই হবে। সেদিনের আকাশ ছিলো রৌদ্রকরোজ্জ্বল সমুদ্ভাসিত নীল। আমরা যে পথে এসেছি তাকে হাইওয়ে বলা চলে না। কয়েকটি টিলার খাঁজে নির্জীবভাবে সুদীর্ঘ শীতনিদ্রায় নিদ্রিত কৃশকায় ভুজঙ্গিনীর মতো পড়ে থাকা একটি গ্রামীণ পথ। পিচের কোথাও খোয়া উঠে গেছে, কোথাও তার ভঙ্গুর কিনার ঘেঁষে ধুলো উড়ছে। পথের দু’পাশে ছড়িয়ে আছে ছাপড়া দেওয়া কয়েকটি মুদি দোকান। সামনের বেঞ্চিতে বসলেই দোকানের ভেতরের তেল চিটচিটে পুরাতন গন্ধ মেজাজে ঢুকে পড়ে। যেন সন্ধ্যায় বাংলাদেশের কোনো হাটের ভেতরে টিমটিমে কুপি জ্বালানো পুরোনো মুদি দোকানের সামনে বসেছি। রাস্তায় কয়েকজন পুরনো টেবিল পেতে স্থানীয় হস্তশিল্পের অলঙ্কার, বেদানা, স্টবেরি ইত্যাদি বিক্রি করছে। আমাদের দলের প্রায় সবাই এটা সেটা কেনা, দরদাম করায় ব্যস্ত হয়ে গ্যালো। হেলেনা বাসচালকের সঙ্গে দোকানের বেঞ্চিতে বসে সিগারেট ফুঁকছে। আমি এসব আয়োজন থেকে বেরিয়ে গ্রামের ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। শহরের বাইরে নতুন কোথাও গেলে সেখানকার নৈসর্গিকতা অবলোকনে ব্যস্ত হয়ে পড়া আমার অভ্যাস। চলতে চলতে যা যা দেখলাম, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করা কঠিন। সরু পিচঢালা পথের একধারে পাথুরের টিলা ধীরে ধীরে উপরে উঠে গেছে, টিলার মধ্যে এখানে সেখানে গ্রামীণ ঘর আটকে আছে। একদম মাথায় একটি দুর্গের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। পরে জেনেছিলাম সেই দুর্গের নাম পোচিতেল। টিলার শরীরভর্তি অফুরন্ত সবুজের ঝাড়ঝাড় বিরুৎ উদ্ভিদ। সেই সবুজের ভেতরে দূরে এক জায়গায় একটি মসজিদের মিনার উঁকি দিচ্ছে। পিচঢালা পথের অন্য ধারে অনতিদূরে আঁকাবাঁকা সবুজ ছোটো একটি নদী বয়ে গেছে। নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণ পর মনে হলো অন্য কোনো ভুবনে এসে পড়েছি। জায়গাটা জঙ্গলাবৃত। মানুষের পা সেখানে পড়ে বলে মনে হয় না। নদীটি স্রোতস্বিনী। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় প্রস্থে বিশ ফুটের বেশি হবে না, কিন্তু ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, ওপারের খাড়া পাথুরে পাহাড়টি নদীর বুকের ওপর এসে ফুরিয়ে গিয়ে ঝুলবারান্দার মতো ঝুলছে। তার নিচ দিয়েও স্বচ্ছসলিলা নদীটির অনেকখানি দ্রুতবেগে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর ওপর শেষ হওয়া সেই ঝুলন্ত কালো পাথুরে পাহাড়ের গায়ে বিচিত্র বর্ণের শৈবাল আটকে আছে। সেইসব শৈবালের ভেতর কোথাও কোথাও গর্ত। তাদের মধ্যে পাখিরা বাসা বেঁধে কূজন করছে। এই জায়গাটির পাহাড় অন্য স্থানের তুলনায় একটু বেশিই উঁচু, এ কারণে দুপুরপূর্ব সূর্যের মাত্র কয়েকটি কর নদীর জলের ভেতর পড়ছে। পাহাড়ের গায়ে স্থানে স্থানে শৈবালের সঙ্গে নাম না-জানা গুল্ম আকারের উদ্ভিদ পল্লব বিস্তার করে ঝুলছে। সেইসব পত্রের ভেতর দিয়ে যখনই ঝিরিঝিরি হাওয়ার আবির্ভাব ঘটছে তখনই নদীর চঞ্চল জলে তাদের ছায়া নাচছে। নৃত্যরত সেই ছায়া দেখতে দেখতে অজান্তেই সবকিছু ভুলে যাই। জল বয়ে যাচ্ছে অবিশ্রান্ত। ঠিক সবুজ সেই জলের রঙ নয়, বরং সবুজটি নীলের দিকে ধাবিত হতে গিয়ে ফিরোজায় আটকে গেছে। জলের ভেতর রঙ-বেরঙের মাছ স্রোতের উল্টোদিকে সন্তরণলীলায় মগ্ন। নদীটির নাম নেরেত, এই নদী আরও সামনে এগিয়ে মোস্তার শহরের বুকের ভেতর দিয়ে চলে গেছে। নদীর অপর পাশে দৃশ্য সুধার মতো আমাকে টানে। কিন্তু কোথাও সেতুর দেখা নেই, অন্যদিকে সময় বাড়ন্ত, অগত্যা যাওয়া হয় না। ঠিক করি, আমি নদীর যে পাশে দাঁড়িয়ে সে পাশের অদূরে সবুজ টিলার উপরে যেখানে মসজিদের মিনার দেখেছি, অন্তত সে পর্যন্ত যাবো। যেতে যেতে এ দেশের গ্রামীণ পথ আরও দেখা হবে। নদীতীর ছেড়ে গাড়ি চলাচলের সেই সরু পিচঢালা পথ পার হয়ে এগোই। এখান থেকে ধীরে ধীরে টিলা উপরের দিকে উঠে গেছে। মসজিদের পথ খুঁজে পেলাম সহজেই। পথের ধারে সাটানো ক্ষুদ্র সাইনবোর্ড পড়ে জানা গ্যালো, এ অটোমান সাম্রাজ্যের রেখে যাওয়া মসজিদ। এগোই। ছোটো পাথরে ভরা ধুলোর পথ। দু’পাশে অনুচ্চ গাছগাছালি। মাঝে মধ্যে দু’একটি ছাপড়া বাড়িঘর। লোকের দেখা নেই বললেই চলে। টিলার পথ ধরে উপরে উঠতে গিয়ে লক্ষ করি, বিজন সেই পথের ভেতর একটি সাদাকালো বিড়াল পিছুপিছু আসছে, আমি থামলে সে থামে, চললে, চলে। তাকে ভালো করে দেখি। মর্মবিদ্ধ হরিণী যেভাবে শিকারির দিকে তাকায়, সে যেন ঠিক সেভাবে আমার দিকে তাকায়। স্নেহের প্রসবন উথলে আসে। থাকুক সে আমার সঙ্গে! বিড়ালটিকে অবলোকন করার পর এই প্রথম অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে দু’পাশের সবুজ দেখি। থমকে যাই। একি! চারপাশে এ-তো সাধারণ কোনো সবুজ বিরুতের ঝাড় নয়, এ-তো গোলাপ আর বেদানার ঝোপ। টিলার আরেকটু উপরে উঠে চারপাশে খেয়াল করে দেখি, উপত্যাকার শরীরে যতদূর আমার দৃষ্টির বিস্তার, ততদূর সয়লাভ হয়ে আছে বুনো বেদানা আর বুনো গোলাপের ঝোপে। ঝোপের ভেতর হাজারে হাজার ফুটে আছে রক্তাভ বুনো গোলাপ আর বেদানাফুল। তাদের মিশ্রিত সুরভী কিছুটা কেয়ার সুগন্ধীর মতো। শত শত গাছে পেকে ফেটে রয়েছে বেদানা। বাজিগর পাখির মতো ছোটো ছোটো পাখির দল সেসব খাচ্ছে আর অবিরাম কোলাহল করছে। আমি দাঁড়িয়ে কেবল তাদের দেখি আর বারবার কোথায় যেন হারিয়ে যাই। মাঝে-মধ্যে পাখিরা চুপ হয়ে গেলে শুনি ঝিঁঝিঁ পোকাদের। তাদের ঝিল্লিধ্বনি করাত দিয়ে দুনিয়ে যেন ফালা ফালা করে ফেলবে। ভুল করে স্বর্গে এসে পড়লাম না তো!
হাতের সময় শুকিয়ে আসছে। ফিরে আসতে হয়। এরপর সেই যাত্রায় ছোটো খাটো বিরতিতে যতবার গাড়ি থেমেছে, যতবার দু’পাশের পাহাড়ি উপত্যাকার শরীরে চোখ রেখেছি, ততবারই দেখেছি একই ক্রীড়া। বসনিয়ার অনাবাদি জমি ভরে আছে বুনো বেদানা আর গোলাপে। কী এক দেশ, পথ-ঘাট ঝোপ-ঝাড় আচ্ছন্ন হয়ে আছে বেদানা আর গোলাপ ফুলে!
সেদিন মোস্তার পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর হয়ে যায়। টিলায় ঘেরা অসুন্দর কিছু পুরোনো আমলের অটোমান রুচির দালানকোঠায় সজ্জিত একটি ছোটো শহর। পুরাতন শহরের দালানে দালানে আটপৌরে একটা স্বাদ লেগে আছে। শহরের ভেতরে বয়ে গেছে সেই নেরেত নদী। হাজার হাজার মানুষের আন্দোলনে সেই সুন্দর বিজন নদীটিকে যেন এখানে অপরিচিত লাগছে। নদীর উপরে সুলতান সুলেমানের আমলে নির্মিত বিখ্যাত পুরাতন ‘দ্য ওল্ড ব্রিজ অব মোস্তার’। তার উপরে শত মানুষের চলাচল, সেলফিবাজি। যেদিকে তাকাই মানুষে গিজগিজ করছে। মোস্তারের পথে হাঁটি, ‘দ্য ওল্ড ব্রিজ অব মোস্তার’ নির্মাণের নেপথ্যের হায়রুদ্দিনের গল্প শুনি, পথের দু’ধারে মানুষের মোস্তার ভ্রমণের উচ্ছ্বাস দেখি, তবু আমার কিছুই ভালো লাগে না। আমার মন পড়ে থাকে বলকানের নির্জন পাথুরে উপত্যাকার বুনো গোলাপ কিংবা বেদানা ফুলের সুরভীর ভেতর।
সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির
নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম
প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ
কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
আপনার মতামত লিখুন