শাকিল মাহমুদ মানুষটা নিখুঁততার প্রতি এক অদ্ভুত আসক্তি পোষণ করেন। তার কাছে “পরিপাটি” শুধু অভ্যাস নয়, একটা বিশ্বাস। তার রুমে ঢুকলে মনে হয়, এখানে বিশৃঙ্খলা প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হয়। বিছানার চাদর ভাঁজহীন, টেবিলের বইগুলো উচ্চতা অনুযায়ী সাজানো, কলমগুলো একই দিকে মুখ করে রাখা। মেঝে এতটাই পরিষ্কার যেন ধুলোরও এখানে প্রবেশাধিকার নেই। ঘরটা শীততপ নিয়ন্ত্রিত, একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় স্থির— না বেশি ঠাণ্ডা, না কম। শাকিল বিশ্বাস করেন, যেখানে নিয়ন্ত্রণ আছে, সেখানে অনিশ্চয়তার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু জীবন কখনো কখনো এমন কিছু ঘটায়, যা কোনো নিয়ম মানে না।
সেদিন বিকেলে তিনি তার টেবিলে বসে কাজ করছিলেন। ঘরের ভেতর নিঃশব্দতা— শুধু এসির মৃদু গুঞ্জন। হঠাৎ একটা ভোঁ ভোঁ শব্দ তার মনোযোগ ভেঙে দিল। প্রথমে তিনি গুরুত্ব দিলেন না, ভেবেছিলেন বাইরে থেকে কোনো শব্দ ঢুকে পড়েছে। কিন্তু শব্দটা ক্রমেই কাছে এল, তার কানের পাশ দিয়ে ঘুরে গেল, তারপর টেবিলের ওপর এসে বসল। শাকিল তাকিয়ে দেখলেন— একটা মাছি। কিন্তু সাধারণ মাছি না; বড়, ভারি, কালচে রঙের। তার রুমে! কীভাবে সম্ভব? এই ঘরে যেখানে ধুলোও ঢুকতে পারে না, সেখানে একটি মাছি!
ভ্রু কুঁচকে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে মাছিটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করলেন। মাছিটা উড়ে গেল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ভয় পেল না। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এসে দেয়ালে বসলো। শাকিল হাত তুলে আঘাত করলেন— ফাঁকা। মাছিটা আবার উড়ে গেল। এভাবেই শুরু হলো এক অদ্ভুত লড়াই— একজন মানুষ আর একটি মাছির মধ্যে। প্রথমে বিরক্তি, তারপর অস্বস্তি, তারপর রাগ। “এই রুমে এটা থাকবে?”— নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলেন তিনি।
তিনি পত্রিকা হাতে নিলেন। মাছিটা দেয়ালে বসে আছে। ধীরে ধীরে এগোলেন, শ্বাস আটকালেন, আঘাত করলেন— মিস। মাছিটা যেন খেলছে। কখনো ছাদে, কখনো বাতির পাশে, কখনো টেবিলের কিনারে বসছে। শাকিলের মনে হলো, এই ছোট প্রাণিটা যেন তাকে উপহাস করছে। দ্বিতীয় দিনেও একই অবস্থা। তিনি স্প্রে আনলেন, ঘরের কোণে কোণে ছিটালেন। মাছিটা কিছুক্ষণ অস্থির হলো, ডানা কাঁপল, নিচে নামল— তারপর আবার উড়ল। মরে না। তৃতীয় দিনে এসে শাকিল ক্লান্ত হয়ে গেলেন। তিনি বসে আছেন, মাছিটা ঘরের ভেতর ঘুরছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি হাল ছেড়ে দিলেন। “থাক...”—বলে ফেললেন। যাকে তিনি এতদিন মারতে চেয়েছিলেন, শেষে তাকেই থাকতে দিলেন।
তারপর হঠাৎ জরুরি কাজ। ২০ দিনের জন্য বাইরে যেতে হলো। রুমটা বন্ধ করে তিনি চলে গেলেন। মাছিটার কথা তখন আর তার মনে ছিল না। দরজা বন্ধ, জানালা বন্ধ, আলো নিভে গেলেও এসি’র ঠান্ডা বাতাস একইভাবে ঘুরতে থাকল। ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল— কিন্তু সময় থেমে থাকল না।
এই ২০ দিন— ঘরের ভেতর কী ঘটেছিল, তা কেউ জানে না। শুধু অনুমান করা যায়— একটি প্রাণ, একটি ছোট্ট মাছি, নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য কতটা লড়াই করেছিল। প্রথম কয়েকদিন হয়তো সে ঘরের প্রতিটি কোণ ঘুরে দেখেছিল। দেয়ালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, ছাদের কোণ থেকে বাতির ধারে— যেন কোনো অদৃশ্য দরজা খুঁজছিল। তার ডানার শব্দ ধীরে ধীরে কমে আসছিল, কিন্তু থামেনি। বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি তাকে চালিয়ে যাচ্ছিল।
খাবার নেই, পানি নেই— তবুও সে উড়ছিল। হয়তো টেবিলের ওপর রাখা বইয়ের পাশে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। হয়তো জানালার দিকে তাকিয়ে থেকেছে— যেখানে বাইরের আলো ঢুকতে পারেনি, তবুও সে বুঝতে পেরেছে, বাইরে একটা পৃথিবী আছে। দিন গড়িয়েছে। শক্তি কমেছে। ডানার গতি ধীর হয়েছে। একসময় হয়তো সে আর উড়তে পারেনি। দেয়ালের নিচে নেমে এসেছে। মেঝের ঠাণ্ডা স্পর্শে তার শরীর থমকে গেছে। তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে থামেনি— সে শুধু ধীরে হয়েছে। শেষ মুহূর্তটা কেমন ছিল, তা কেউ জানে না। কোনো শব্দ হয়নি, কোনো প্রতিবাদ হয়নি। শুধু একসময়, নিঃশব্দে— তার ডানাগুলো থেমে গেছে। ঘরটা তখনও আগের মতোই ছিল— পরিপাটি, নিয়ন্ত্রিত, নিঃশব্দ। শুধু একটি প্রাণ কমে গেছে।
২০ দিন পর শাকিল ফিরে এলেন। দরজা খুললেন। ঘরের ভেতর সেই পরিচিত শীতলতা তাকে স্বাগত জানাল। সবকিছু আগের মতোই— পরিপাটি, নিয়ন্ত্রিত, স্থির। যেন এই ২০ দিনে কিছুই ঘটেনি। কিন্তু দরজার পাশেই মেঝেতে একটা ছোট কালচে দাগ চোখে পড়ল। তিনি এগিয়ে গেলেন। নিচে তাকালেন। একটা মাছি— মরা। উল্টে পড়ে আছে, ডানাগুলো ছড়িয়ে, নিঃশব্দ।
শাকিল থেমে গেলেন। চোখ সরাতে পারলেন না। এটাই কি সেই মাছি? যাকে তিনি তিন দিন ধরে মারতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি? তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জমতে লাগল। বিরক্তি না, রাগ না— একটা নিঃশব্দ ভার। তিনি ধীরে বসে পড়লেন। মাছিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে বললেন, “আমি তোকে মারতে পারিনি... তুই নিজেই মরে গেলি...”
ঘরটা তখন নিঃশব্দ। এসি’র শব্দও যেন দূরে সরে গেছে। শাকিল ভাবতে লাগলেন— এই মাছিটা ২০ দিন এই রুমে একা ছিল। কেউ নেই, কিছু নেই, কোনো পথ নেই। তবুও সে বেঁচে ছিল— কিছুদিন। তারপর চুপচাপ থেমে গেছে। কেউ তাকে হত্যা করেনি, কেউ তাকে রক্ষা করেনি। তবুও মৃত্যু এসেছে। তার ভেতরে একটা প্রশ্ন জেগে উঠল— তিনি কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণে আছেন?
এই রুম, এই শৃঙ্খলা, এই নিখুঁততা— সবকিছু ঠিক রেখেও তিনি একটা মাছিকে থামাতে পারেননি। আর যাকে তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন, তার জীবন থেমে গেছে। তাহলে নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? তিনি জানালার দিকে তাকালেন— সব বন্ধ। তবুও মাছিটা ঢুকেছিল। আবার মেঝের দিকে তাকালেন— মাছিটার দেহ ছোট, তুচ্ছ। কিন্তু তার মৃত্যু— অদ্ভুত ভারি।
তিনি টিস্যু নিলেন, মাছিটাকে তুললেন, কিন্তু ডাস্টবিনের সামনে গিয়ে থেমে গেলেন। তার চোখ মাছির উপর স্থির হয়ে রইল। তিনি হঠাৎ অনুভব করলেন— এই ছোট্ট প্রাণটা শুধু একটা মাছি নয়; এটা একটা অস্তিত্ব, যা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে। যতক্ষণ পেরেছে বেঁচে থেকেছে। আর শেষ পর্যন্ত— নিঃশব্দে থেমে গেছে।
তার হাত একটু কেঁপে উঠল। তিনি বুঝলেন— এই রুমে তার নিয়ন্ত্রণ ছিল শুধু দৃশ্যমান জিনিসে। অদৃশ্য যেটা— সেটা কখনোই তার হাতে ছিল না। মৃত্যু কাউকে হারানোর সুযোগ দেয় না; সে নিজেই এসে সব শেষ করে দেয়।
তিনি ধীরে ধীরে মাছিটাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। ফিরে এসে চেয়ারে বসলেন। চোখ বন্ধ করলেন। তার মনে হলো— এই রুমে তিনি একা নন, কখনোই ছিলেন না। কারণ নীরবতা কখনো ফাঁকা নয়।
আর মৃত্যু— সে কখনো দরজা দিয়ে আসে না।
যাকে আমরা হত্যা করতে পারি না, মৃত্যু তাকে নিঃশব্দে স্পর্শ করে— আর তখনই বুঝি, নিয়ন্ত্রণ কোনোদিনই আমাদের হাতে ছিল না।

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
শাকিল মাহমুদ মানুষটা নিখুঁততার প্রতি এক অদ্ভুত আসক্তি পোষণ করেন। তার কাছে “পরিপাটি” শুধু অভ্যাস নয়, একটা বিশ্বাস। তার রুমে ঢুকলে মনে হয়, এখানে বিশৃঙ্খলা প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হয়। বিছানার চাদর ভাঁজহীন, টেবিলের বইগুলো উচ্চতা অনুযায়ী সাজানো, কলমগুলো একই দিকে মুখ করে রাখা। মেঝে এতটাই পরিষ্কার যেন ধুলোরও এখানে প্রবেশাধিকার নেই। ঘরটা শীততপ নিয়ন্ত্রিত, একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় স্থির— না বেশি ঠাণ্ডা, না কম। শাকিল বিশ্বাস করেন, যেখানে নিয়ন্ত্রণ আছে, সেখানে অনিশ্চয়তার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু জীবন কখনো কখনো এমন কিছু ঘটায়, যা কোনো নিয়ম মানে না।
সেদিন বিকেলে তিনি তার টেবিলে বসে কাজ করছিলেন। ঘরের ভেতর নিঃশব্দতা— শুধু এসির মৃদু গুঞ্জন। হঠাৎ একটা ভোঁ ভোঁ শব্দ তার মনোযোগ ভেঙে দিল। প্রথমে তিনি গুরুত্ব দিলেন না, ভেবেছিলেন বাইরে থেকে কোনো শব্দ ঢুকে পড়েছে। কিন্তু শব্দটা ক্রমেই কাছে এল, তার কানের পাশ দিয়ে ঘুরে গেল, তারপর টেবিলের ওপর এসে বসল। শাকিল তাকিয়ে দেখলেন— একটা মাছি। কিন্তু সাধারণ মাছি না; বড়, ভারি, কালচে রঙের। তার রুমে! কীভাবে সম্ভব? এই ঘরে যেখানে ধুলোও ঢুকতে পারে না, সেখানে একটি মাছি!
ভ্রু কুঁচকে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে মাছিটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করলেন। মাছিটা উড়ে গেল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ভয় পেল না। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এসে দেয়ালে বসলো। শাকিল হাত তুলে আঘাত করলেন— ফাঁকা। মাছিটা আবার উড়ে গেল। এভাবেই শুরু হলো এক অদ্ভুত লড়াই— একজন মানুষ আর একটি মাছির মধ্যে। প্রথমে বিরক্তি, তারপর অস্বস্তি, তারপর রাগ। “এই রুমে এটা থাকবে?”— নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলেন তিনি।
তিনি পত্রিকা হাতে নিলেন। মাছিটা দেয়ালে বসে আছে। ধীরে ধীরে এগোলেন, শ্বাস আটকালেন, আঘাত করলেন— মিস। মাছিটা যেন খেলছে। কখনো ছাদে, কখনো বাতির পাশে, কখনো টেবিলের কিনারে বসছে। শাকিলের মনে হলো, এই ছোট প্রাণিটা যেন তাকে উপহাস করছে। দ্বিতীয় দিনেও একই অবস্থা। তিনি স্প্রে আনলেন, ঘরের কোণে কোণে ছিটালেন। মাছিটা কিছুক্ষণ অস্থির হলো, ডানা কাঁপল, নিচে নামল— তারপর আবার উড়ল। মরে না। তৃতীয় দিনে এসে শাকিল ক্লান্ত হয়ে গেলেন। তিনি বসে আছেন, মাছিটা ঘরের ভেতর ঘুরছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি হাল ছেড়ে দিলেন। “থাক...”—বলে ফেললেন। যাকে তিনি এতদিন মারতে চেয়েছিলেন, শেষে তাকেই থাকতে দিলেন।
তারপর হঠাৎ জরুরি কাজ। ২০ দিনের জন্য বাইরে যেতে হলো। রুমটা বন্ধ করে তিনি চলে গেলেন। মাছিটার কথা তখন আর তার মনে ছিল না। দরজা বন্ধ, জানালা বন্ধ, আলো নিভে গেলেও এসি’র ঠান্ডা বাতাস একইভাবে ঘুরতে থাকল। ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল— কিন্তু সময় থেমে থাকল না।
এই ২০ দিন— ঘরের ভেতর কী ঘটেছিল, তা কেউ জানে না। শুধু অনুমান করা যায়— একটি প্রাণ, একটি ছোট্ট মাছি, নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য কতটা লড়াই করেছিল। প্রথম কয়েকদিন হয়তো সে ঘরের প্রতিটি কোণ ঘুরে দেখেছিল। দেয়ালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, ছাদের কোণ থেকে বাতির ধারে— যেন কোনো অদৃশ্য দরজা খুঁজছিল। তার ডানার শব্দ ধীরে ধীরে কমে আসছিল, কিন্তু থামেনি। বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি তাকে চালিয়ে যাচ্ছিল।
খাবার নেই, পানি নেই— তবুও সে উড়ছিল। হয়তো টেবিলের ওপর রাখা বইয়ের পাশে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। হয়তো জানালার দিকে তাকিয়ে থেকেছে— যেখানে বাইরের আলো ঢুকতে পারেনি, তবুও সে বুঝতে পেরেছে, বাইরে একটা পৃথিবী আছে। দিন গড়িয়েছে। শক্তি কমেছে। ডানার গতি ধীর হয়েছে। একসময় হয়তো সে আর উড়তে পারেনি। দেয়ালের নিচে নেমে এসেছে। মেঝের ঠাণ্ডা স্পর্শে তার শরীর থমকে গেছে। তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে থামেনি— সে শুধু ধীরে হয়েছে। শেষ মুহূর্তটা কেমন ছিল, তা কেউ জানে না। কোনো শব্দ হয়নি, কোনো প্রতিবাদ হয়নি। শুধু একসময়, নিঃশব্দে— তার ডানাগুলো থেমে গেছে। ঘরটা তখনও আগের মতোই ছিল— পরিপাটি, নিয়ন্ত্রিত, নিঃশব্দ। শুধু একটি প্রাণ কমে গেছে।
২০ দিন পর শাকিল ফিরে এলেন। দরজা খুললেন। ঘরের ভেতর সেই পরিচিত শীতলতা তাকে স্বাগত জানাল। সবকিছু আগের মতোই— পরিপাটি, নিয়ন্ত্রিত, স্থির। যেন এই ২০ দিনে কিছুই ঘটেনি। কিন্তু দরজার পাশেই মেঝেতে একটা ছোট কালচে দাগ চোখে পড়ল। তিনি এগিয়ে গেলেন। নিচে তাকালেন। একটা মাছি— মরা। উল্টে পড়ে আছে, ডানাগুলো ছড়িয়ে, নিঃশব্দ।
শাকিল থেমে গেলেন। চোখ সরাতে পারলেন না। এটাই কি সেই মাছি? যাকে তিনি তিন দিন ধরে মারতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি? তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জমতে লাগল। বিরক্তি না, রাগ না— একটা নিঃশব্দ ভার। তিনি ধীরে বসে পড়লেন। মাছিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে বললেন, “আমি তোকে মারতে পারিনি... তুই নিজেই মরে গেলি...”
ঘরটা তখন নিঃশব্দ। এসি’র শব্দও যেন দূরে সরে গেছে। শাকিল ভাবতে লাগলেন— এই মাছিটা ২০ দিন এই রুমে একা ছিল। কেউ নেই, কিছু নেই, কোনো পথ নেই। তবুও সে বেঁচে ছিল— কিছুদিন। তারপর চুপচাপ থেমে গেছে। কেউ তাকে হত্যা করেনি, কেউ তাকে রক্ষা করেনি। তবুও মৃত্যু এসেছে। তার ভেতরে একটা প্রশ্ন জেগে উঠল— তিনি কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণে আছেন?
এই রুম, এই শৃঙ্খলা, এই নিখুঁততা— সবকিছু ঠিক রেখেও তিনি একটা মাছিকে থামাতে পারেননি। আর যাকে তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন, তার জীবন থেমে গেছে। তাহলে নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? তিনি জানালার দিকে তাকালেন— সব বন্ধ। তবুও মাছিটা ঢুকেছিল। আবার মেঝের দিকে তাকালেন— মাছিটার দেহ ছোট, তুচ্ছ। কিন্তু তার মৃত্যু— অদ্ভুত ভারি।
তিনি টিস্যু নিলেন, মাছিটাকে তুললেন, কিন্তু ডাস্টবিনের সামনে গিয়ে থেমে গেলেন। তার চোখ মাছির উপর স্থির হয়ে রইল। তিনি হঠাৎ অনুভব করলেন— এই ছোট্ট প্রাণটা শুধু একটা মাছি নয়; এটা একটা অস্তিত্ব, যা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে। যতক্ষণ পেরেছে বেঁচে থেকেছে। আর শেষ পর্যন্ত— নিঃশব্দে থেমে গেছে।
তার হাত একটু কেঁপে উঠল। তিনি বুঝলেন— এই রুমে তার নিয়ন্ত্রণ ছিল শুধু দৃশ্যমান জিনিসে। অদৃশ্য যেটা— সেটা কখনোই তার হাতে ছিল না। মৃত্যু কাউকে হারানোর সুযোগ দেয় না; সে নিজেই এসে সব শেষ করে দেয়।
তিনি ধীরে ধীরে মাছিটাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। ফিরে এসে চেয়ারে বসলেন। চোখ বন্ধ করলেন। তার মনে হলো— এই রুমে তিনি একা নন, কখনোই ছিলেন না। কারণ নীরবতা কখনো ফাঁকা নয়।
আর মৃত্যু— সে কখনো দরজা দিয়ে আসে না।
যাকে আমরা হত্যা করতে পারি না, মৃত্যু তাকে নিঃশব্দে স্পর্শ করে— আর তখনই বুঝি, নিয়ন্ত্রণ কোনোদিনই আমাদের হাতে ছিল না।

আপনার মতামত লিখুন