সংবাদ

ড্রেজারের থাবায় নিঃস্ব হচ্ছে শত শত মানুষ


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, মাদারীপুর
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, মাদারীপুর
প্রকাশ: ২ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম

ড্রেজারের থাবায় নিঃস্ব হচ্ছে শত শত মানুষ
অবৈধ ড্রেজারের থাবায় মাদারীপুরে ভাঙনের তাণ্ডব। ছবি : সংবাদ

একসময় গোয়ালভরা গরু আর ধানভরা গোলা ছিল এনামুল আকনের। ১০ বিঘা ফসলি জমিতে ফলত সোনার ফসল। আজ তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। আড়িয়াল খাঁ নদের ভয়াল ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে এখন অন্যের জমিতে আশ্রিত তিনি। কেবল এনামুল নন, তার মতো শতাধিক পরিবারের এখন ঠাঁই হয়েছে অন্যের করুণায়। মাদারীপুর সদর ও কালকিনি উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এখন গিলে খাচ্ছে রাক্ষুসে নদী। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অবৈধ ড্রেজারে বালু তোলাই এই অকাল ভাঙনের মূল কারণ।

সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা এনামুল আকন (৪৮) অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ‘ড্রেজার দিয়ে বালু না তোলা হলে নদী এভাবে ভাঙত না। প্রতিবাদ করলে রাতে বাড়িতে হামলার ভয় থাকে। আল্লাহ ছাড়া আমাদের দেখার কেউ নেই।’ একই গ্রামের টিটল আকনও তার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে এখন নিঃস্ব।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আড়িয়াল খাঁ নদের পাড়ে হোগলপাতিয়া, চরহোগলপাতিয়া, চর কালকিনি, সস্তাল ও কাদের আকন কান্দিসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম এখন ভাঙনের মুখে। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি, মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল। ইতিমধ্যে চরহোগলপাতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু স্থাপনা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, রাতভর ড্রেজারের গর্জনে ঘুমানো যায় না। অবৈধভাবে বালু তোলায় নদীর গতিপথ বদলে সরাসরি পাড়ে আঘাত করছে পানি। অভিযোগের তিরে রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী শামীম আকনসহ একটি সিন্ডিকেট। তবে শামীম আকন ড্রেজার মালিকানার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি শুধু মাটি বিক্রি করেছি, ড্রেজার আমার নয়।’

জনপ্রতিনিধিরাও এ ক্ষেত্রে অনেকটা অসহায়। ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লোকমান বেপারী বলেন, ‘বালু ব্যবসায়ীরা অনেক প্রভাবশালী। প্রতিবাদ করলে নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে।’ ঝাউদি ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে কেউ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।

জানতে চাইলে মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান বলেন, নদীতীর সংরক্ষণে একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু হবে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব জানান, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং এটি অব্যাহত থাকবে।

জেলা প্রশাসক মিস মর্জিনা আক্তারও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট টিম নিয়মিত কাজ করছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসের ভিড়েও থামছে না ড্রেজারের গর্জন, আর কমছে না নদীপাড়ে বসবাসরত মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬


ড্রেজারের থাবায় নিঃস্ব হচ্ছে শত শত মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ০২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

একসময় গোয়ালভরা গরু আর ধানভরা গোলা ছিল এনামুল আকনের। ১০ বিঘা ফসলি জমিতে ফলত সোনার ফসল। আজ তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। আড়িয়াল খাঁ নদের ভয়াল ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে এখন অন্যের জমিতে আশ্রিত তিনি। কেবল এনামুল নন, তার মতো শতাধিক পরিবারের এখন ঠাঁই হয়েছে অন্যের করুণায়। মাদারীপুর সদর ও কালকিনি উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এখন গিলে খাচ্ছে রাক্ষুসে নদী। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অবৈধ ড্রেজারে বালু তোলাই এই অকাল ভাঙনের মূল কারণ।

সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা এনামুল আকন (৪৮) অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ‘ড্রেজার দিয়ে বালু না তোলা হলে নদী এভাবে ভাঙত না। প্রতিবাদ করলে রাতে বাড়িতে হামলার ভয় থাকে। আল্লাহ ছাড়া আমাদের দেখার কেউ নেই।’ একই গ্রামের টিটল আকনও তার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে এখন নিঃস্ব।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আড়িয়াল খাঁ নদের পাড়ে হোগলপাতিয়া, চরহোগলপাতিয়া, চর কালকিনি, সস্তাল ও কাদের আকন কান্দিসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম এখন ভাঙনের মুখে। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি, মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল। ইতিমধ্যে চরহোগলপাতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু স্থাপনা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, রাতভর ড্রেজারের গর্জনে ঘুমানো যায় না। অবৈধভাবে বালু তোলায় নদীর গতিপথ বদলে সরাসরি পাড়ে আঘাত করছে পানি। অভিযোগের তিরে রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী শামীম আকনসহ একটি সিন্ডিকেট। তবে শামীম আকন ড্রেজার মালিকানার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি শুধু মাটি বিক্রি করেছি, ড্রেজার আমার নয়।’

জনপ্রতিনিধিরাও এ ক্ষেত্রে অনেকটা অসহায়। ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লোকমান বেপারী বলেন, ‘বালু ব্যবসায়ীরা অনেক প্রভাবশালী। প্রতিবাদ করলে নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে।’ ঝাউদি ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে কেউ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।

জানতে চাইলে মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান বলেন, নদীতীর সংরক্ষণে একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু হবে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব জানান, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং এটি অব্যাহত থাকবে।

জেলা প্রশাসক মিস মর্জিনা আক্তারও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট টিম নিয়মিত কাজ করছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসের ভিড়েও থামছে না ড্রেজারের গর্জন, আর কমছে না নদীপাড়ে বসবাসরত মানুষের দীর্ঘশ্বাস।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত