পৃথিবী থেকে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে মহাশূন্যে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক শর্করা ‘এরিথ্রুলোজ’। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই আবিষ্কার জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বহু দশক ধরে খুঁজছেন- মহাশূন্যে কি জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান রয়েছে? সেই অনুসন্ধানে এবার এলো এক চমকপ্রদ আবিষ্কার। আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত জি+০.৬৯৩−০.০২৭ নামের এক বিশাল আণবিক মেঘে শনাক্ত হয়েছে ‘এরিথ্রুলোজ’ নামক একটি প্রাকৃতিক শর্করা।
এরিথ্রুলোজ কিন্তু আমাদের কাছে অপরিচিত কোনো পদার্থ নয়। এটি পৃথিবীতে রাস্পবেরি ফলের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়। এমনকি কৃত্রিম ট্যানিং (ফেক ট্যান) প্রসাধনীতেও এটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু একই শর্করা যে নক্ষত্রের মাঝের বিশাল মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে- এমন ধারণা কয়েক বছর আগেও বিজ্ঞানীদের কাছে অকল্পনীয় ছিল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সংবেদনশীল দুটি রেডিও টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে এই শর্করার উপস্থিতি শনাক্ত করেন। পরে পরীক্ষাগারের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি সত্যিই এরিথ্রুলোজ।
গবেষণার প্রধান লেখক ইজাসকুন জিমেনেজ সেরা বলেন, ‘এই ফলাফল প্রচলিত ধারণাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। মহাশূন্যে জটিল জৈব অণু তৈরির প্রক্রিয়া হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়েও ভিন্ন।’
জীবনের মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে শর্করার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিএনএ ও আরএনএর গঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জৈব প্রক্রিয়ায় শর্করার অবদান অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই শর্করাগুলো প্রথম তৈরি হলো কীভাবে?
পৃথিবীতে প্রাণের জন্মের আগের পরিবেশ অনুকরণ করে গবেষণাগারে নানা পরীক্ষা চালানো হয়েছে। কিন্তু সেখানে স্বাভাবিকভাবে জটিল শর্করা তৈরি করা যায়নি। ফলে জীবনের কিছু উপাদান পৃথিবীতে তৈরি হয়নি, মহাশূন্য থেকেই এসেছে- এমন ধারণা আরও জোরালো হয়।
এর আগে উল্কাপিণ্ড ও গ্রহাণুর নমুনায় বিভিন্ন শর্করার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তবে নক্ষত্রগুলোর মাঝখানের মহাশূন্যে সরাসরি এমন শর্করার অস্তিত্ব আগে শনাক্ত করা যায়নি। নতুন এই আবিষ্কার সেই শূন্যস্থান পূরণ করল।
গবেষণার আরেকটি দিক বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। সাধারণ ধারণা ছিল, মহাশূন্যে অণুগুলো ধীরে ধীরে একটি করে কার্বন পরমাণু যুক্ত করে বড় হয়। সে ক্ষেত্রে তিন-কার্বনের সহজ শর্করা আগে পাওয়া যাওয়ার কথা।
কিন্তু গবেষকেরা দেখলেন উল্টো ঘটনা- তিন-কার্বনের শর্করার কোনো প্রমাণই মেলেনি, বরং আরও জটিল চার-কার্বনের এরিথ্রুলোজই পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মহাশূন্যে জটিল অণু তৈরির প্রক্রিয়া হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে একটি সময়কে বলা হয় ‘লেট হেভি বোম্বারডমেন্ট’। তখন অসংখ্য গ্রহাণু ও ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। বিজ্ঞানীদের নতুন হিসাব বলছে, সেই সময় মহাকাশ থেকে প্রায় ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টন এরিথ্রুলোজ পৃথিবীতে আসতে পারে।
যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তবে সেই শর্করা হয়তো আদিম পৃথিবীর রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। কোটি কোটি বছর পরে যার ফল হিসেবে জন্ম নিয়েছে প্রাণের প্রথম রূপ। অবশ্য এটি এখনো একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান।
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু পৃথিবীর অতীত বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদি মহাশূন্যে স্বাভাবিকভাবে এমন জটিল শর্করা তৈরি হতে পারে, তবে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে গড়ে ওঠা গ্রহেও জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান পৌঁছে যেতে পারে।
অর্থাৎ, মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও স্বাভাবিক কোনো বিষয় হতে পারে। গবেষণাটি সম্প্রতি ন্যাচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬
পৃথিবী থেকে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে মহাশূন্যে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক শর্করা ‘এরিথ্রুলোজ’। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই আবিষ্কার জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বহু দশক ধরে খুঁজছেন- মহাশূন্যে কি জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান রয়েছে? সেই অনুসন্ধানে এবার এলো এক চমকপ্রদ আবিষ্কার। আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত জি+০.৬৯৩−০.০২৭ নামের এক বিশাল আণবিক মেঘে শনাক্ত হয়েছে ‘এরিথ্রুলোজ’ নামক একটি প্রাকৃতিক শর্করা।
এরিথ্রুলোজ কিন্তু আমাদের কাছে অপরিচিত কোনো পদার্থ নয়। এটি পৃথিবীতে রাস্পবেরি ফলের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়। এমনকি কৃত্রিম ট্যানিং (ফেক ট্যান) প্রসাধনীতেও এটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু একই শর্করা যে নক্ষত্রের মাঝের বিশাল মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে- এমন ধারণা কয়েক বছর আগেও বিজ্ঞানীদের কাছে অকল্পনীয় ছিল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সংবেদনশীল দুটি রেডিও টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে এই শর্করার উপস্থিতি শনাক্ত করেন। পরে পরীক্ষাগারের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি সত্যিই এরিথ্রুলোজ।
গবেষণার প্রধান লেখক ইজাসকুন জিমেনেজ সেরা বলেন, ‘এই ফলাফল প্রচলিত ধারণাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। মহাশূন্যে জটিল জৈব অণু তৈরির প্রক্রিয়া হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়েও ভিন্ন।’
জীবনের মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে শর্করার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিএনএ ও আরএনএর গঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জৈব প্রক্রিয়ায় শর্করার অবদান অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই শর্করাগুলো প্রথম তৈরি হলো কীভাবে?
পৃথিবীতে প্রাণের জন্মের আগের পরিবেশ অনুকরণ করে গবেষণাগারে নানা পরীক্ষা চালানো হয়েছে। কিন্তু সেখানে স্বাভাবিকভাবে জটিল শর্করা তৈরি করা যায়নি। ফলে জীবনের কিছু উপাদান পৃথিবীতে তৈরি হয়নি, মহাশূন্য থেকেই এসেছে- এমন ধারণা আরও জোরালো হয়।
এর আগে উল্কাপিণ্ড ও গ্রহাণুর নমুনায় বিভিন্ন শর্করার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তবে নক্ষত্রগুলোর মাঝখানের মহাশূন্যে সরাসরি এমন শর্করার অস্তিত্ব আগে শনাক্ত করা যায়নি। নতুন এই আবিষ্কার সেই শূন্যস্থান পূরণ করল।
গবেষণার আরেকটি দিক বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। সাধারণ ধারণা ছিল, মহাশূন্যে অণুগুলো ধীরে ধীরে একটি করে কার্বন পরমাণু যুক্ত করে বড় হয়। সে ক্ষেত্রে তিন-কার্বনের সহজ শর্করা আগে পাওয়া যাওয়ার কথা।
কিন্তু গবেষকেরা দেখলেন উল্টো ঘটনা- তিন-কার্বনের শর্করার কোনো প্রমাণই মেলেনি, বরং আরও জটিল চার-কার্বনের এরিথ্রুলোজই পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মহাশূন্যে জটিল অণু তৈরির প্রক্রিয়া হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে একটি সময়কে বলা হয় ‘লেট হেভি বোম্বারডমেন্ট’। তখন অসংখ্য গ্রহাণু ও ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। বিজ্ঞানীদের নতুন হিসাব বলছে, সেই সময় মহাকাশ থেকে প্রায় ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টন এরিথ্রুলোজ পৃথিবীতে আসতে পারে।
যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তবে সেই শর্করা হয়তো আদিম পৃথিবীর রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। কোটি কোটি বছর পরে যার ফল হিসেবে জন্ম নিয়েছে প্রাণের প্রথম রূপ। অবশ্য এটি এখনো একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান।
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু পৃথিবীর অতীত বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদি মহাশূন্যে স্বাভাবিকভাবে এমন জটিল শর্করা তৈরি হতে পারে, তবে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে গড়ে ওঠা গ্রহেও জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান পৌঁছে যেতে পারে।
অর্থাৎ, মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও স্বাভাবিক কোনো বিষয় হতে পারে। গবেষণাটি সম্প্রতি ন্যাচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন