মফিদুল হক। লেখক, গবেষক, প্রকাশক। তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সবসময় এই ব্যক্তিত্বকে দেখা যায়। তার সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন সংবাদ-এর বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদ। সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ: সাংস্কৃতিক জগতে আপনার পদার্পণটা কীভাবে হলো?
মফিদুল হক: এসএসসির চৌকাঠ পার হলাম ১৯৬৫ সালে। সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে পরিচয় কিন্তু তার আগে। ঢাকাতে শুরু হয়েছিল স্কুলজীবন, তারপরে বাবার চাকরির সূত্রে ময়মনসিংহ, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে আবার ঢাকায় আসলাম। ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। আর ৬৫-৬৬ সালটা কিন্তু ওই ষাটের দশকেরই, বলা যায় দ্বিতীয়ার্ধটা একটা অন্যরকম সময় ছিল। আর কলেজে যেটা হয় নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন সেখানে চলে। আমার সম্পৃক্ততা ঘটেছিল মূলত সাহিত্য পত্রিকা সংকলন করা, ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত এইসব মিলে। তারপর ধীরে ধীরে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি সংসদ, ছায়ানটের সঙ্গেও একটা যুক্ততা, কর্মী হিসেবে থেকেছি নানা আয়োজনে। পহেলা বৈশাখের আয়োজনেও ছিলাম প্রথম যেটা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে।
রাশেদ আহমেদ: ষাটের দশকে বাঙালি সংস্কৃতির একটা জাগরণ তৈরি হয়েছিল। সেই জাগরণটা এখনকার সময়ে কি দেখতে পান?
মফিদুল হক: সময় তো আলাদা। মানে, ইট ইজ অ্যানাদার টাইম, অ্যানাদার ডে। আবার ওই জাগরণটা কী ছিল যদি আমরা পেছনে ফিরে তাকাই, আমরা তো বলি যে জাতীয় জাগরণ। যেটা এমনিও বলি যে বায়ান্ন থেকে একাত্তর। এই জাগরণটা নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। যদি আমরা বলি পাকিস্তান রাষ্ট্র যে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বের কাঠামো চাপিয়ে দিলো, আর সেই চাপিয়ে দিলো তার সঙ্গে যে শোষণটা তারা শুরু করলো- অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক শোষণ, মানুষের অধিকারহীনতা, সেটার বিপরীতে তো বায়ান্নর... বায়ান্ন কিন্তু একটা সত্যিকারের অর্থে বলা যায় যে ‘বাঙালি মুসলমানের ঘরে ফেরা’ এরকম একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন বদরুদ্দীন উমর, অনেক অর্থেই সত্য। আবার এখানে একটা দিকও বুঝতে হবে যে, পুরো বাঙালিত্ব কিন্তু কেবল বাঙালি মুসলমান দিয়ে তো হয় না। বাঙালি মুসলমানের ঘরে ফেরার কথা যদি বলি তাহলে ঠিক হিন্দু মুসলমান বিভাজন করলে, তাহলে বাঙালি হিন্দু তো ঘরেই ছিল। কিন্তু এই যে উভয়ের মিলন, যে অসাম্প্রদায়িকতা, সেটা কিন্তু ক্রমান্বয়ে জোরদার হতে শুরু করলো। ভাষা আন্দোলনটার দিকে যদি আপনি তাকান, ভাষার প্রশ্নের কথা যখন আমরা বলি, মাতৃভাষার অধিকার, তখন কিন্তু সেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টানের কোনো বিভাজন থাকে না। যারাই মায়ের পেট থেকে এই ভাষা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এই ভূখণ্ডে, সেই তখন এই মাতৃভাষার অধিকারী। ফলে মাতৃভাষার ওপর আক্রমণ যখন হয় তখন প্রতিরোধটা কিন্তু অসাম্প্রদায়িক। প্রকৃতিগতভাবেই অসাম্প্রদায়িক। ফলে এই ভাষা আন্দোলন থেকেই কিন্তু জাতীয় চেতনার উন্মেষ শুরু হলো। তারপর ‘৫৪-এর নির্বাচন, আরো অনেক ইতিহাস আমাদের। সেই অর্থে বললে আমরা ষাটের দশকে যখন পৌঁছালাম তখন কিন্তু অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। ’৫৪-এর নির্বাচনের বিজয়ে বাংলা একাডেমির জন্ম দিলো, অনেক রকমভাবে সাংস্কৃতিক জাগরণ সূচনা করলো। আবার ৫৮-তে সেগুলো সব রুদ্ধ করা হলো সামরিক শাসনে। আর সামরিক শাসনটা কিছুটা শিথিল হলো কিন্তু পীড়নটা চললো। যেমন ৬১-তে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন করতে দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধেই যে প্রতিরোধ, সেখান থেকেই ছায়ানটের জন্ম। কিন্তু পাকিস্তান আমলে এর কোনোটাই তো সহজ ছিল না। এবং ৬৫ সালেও কিন্তু নানা রকমভাবে পীড়নটা অব্যাহত ছিল, ৬৪ সালের দাঙ্গাটা একটা বড় ঘটনা হলো। যেটা আবার সমাজে ওই বিভাজন রেখাটাকে প্রকট করে তুললো। ৬৫-তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধটাও একটা উন্মাদনা তৈরি করলো। এইসবের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যেমন হলো দাঙ্গার বিরুদ্ধেও কিন্তু একটা জাগরণ হলো। সেখানে মানে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একটা বড় ভূমিকা পালন করলো। সাংবাদিকরা সেখানে বড় ভূমিকা পালন করলো। তখন যে পত্রিকাগুলো ছিল যে অবজার্ভার, সংবাদ, ইত্তেফাক, তিন সম্পাদক মিলে একটা যৌথ সম্পাদকীয় প্রকাশ করলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। এই আহ্বানের মধ্যেই কিন্তু আবার এই জাগরণের বীজমন্ত্র। ফলে তখন কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিরোধ, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ সমান্তরালভাবে চলেছে, পারস্পরিক হাতে হাত ধরে চলেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে তো আমরা ভিন্নতর পরিস্থিতিতে যাত্রা শুরু করলাম। আর নানা রকম সংকটও এখানে ক্রমে ক্রমে দেখা দিতে লাগলো। তো সেগুলোর দিকে না গিয়ে আমি যদি ৫০ বছরের অভিযাত্রাটা ভাবি, তাহলে কিন্তু কিছুটা বেদনাবোধ করতে হয়। পাকিস্তান তো ২৩ বছরের শাসন, কিন্তু আপনি অভিযাত্রাগুলো খুব চিহ্নিত করতে পারছেন। আর এই ৫০ বছরে আমরা দেখছি যে, বড় অর্জন, বড় মাইলফলক ঠিক ওরকমভাবে চিহ্নিত করতে পারছি না। সমাজটা অনেকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। অনেক ধরনের বিভাজন তৈরি হচ্ছে। সেটা ধনী-দরিদ্রের বিভাজন, সেটা শহর-গ্রামের বিভাজন, সেটা শিক্ষার সুযোগ, সুযোগহীনতার বিভাজন, সেটা শিক্ষা, গুণগত শিক্ষার সঙ্গে আর্থিক বিনিয়োগ জড়িত, যারা অধিকৃত নিম্নবিত্ত তাদের গুণগত শিক্ষার সুযোগটা আমরা সংকুচিত করে রাখছি। ফলে ওই জাগরণ তৈরি করতে হলে যেই ভূমিটা আমাদের দরকার, সেটা কিন্তু আমরা তৈরি করতে পারিনি বা রক্ষা করতে পারিনি। আবার কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে অনেক কিছু ঘটছে। বা ছোট ছোট উদ্যোগে অনেক কিছু ঘটছে। ফলে দুটো সময়কে মেলানো যায় না। দুটো সময় দুরকমভাবে তার চ্যালেঞ্জ, জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে। কিন্তু মূল তার তাগিদ থাকবে মুক্তি। চিন্তার মুক্তি, দর্শনের মুক্তি, মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রেও অগ্রসরতার জন্য মুক্তি, মুক্ত সমাজ, মুক্তির বহমানতা।
রাশেদ আহমেদ: এই যে বলছিলেন চিন্তার মুক্তি, দর্শনের মুক্তি। এখনকার পরিবেশে কি মুক্তচিন্তা করার অধিকার দেয়? আছে?
মফিদুল হক: আমাদের মুক্তচিন্তার জায়গাটা ক্রমান্বয়েই সংকুচিত হচ্ছে। আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করেছি বলছি, প্রবেশ করার জন্যে তো আমার সংবিধান, আমার সমস্ত কার্যক্রম সেখানেও উত্থান-পতন আছে। কিন্তু গণতন্ত্রে মানুষের যে বাকস্বাধীনতা, সেটা কিন্তু নেই। এখনো সহনশীল সমাজ হয়ে উঠেনি। আর তার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে অদূরদর্শিতা, রাজনীতিকরা আশু সুবিধার জন্যে অনেক সময় প্রলুব্ধ হন। আর চিন্তার মুক্তি মানে তো আমাকে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হতে হবে। ভিন্নমতের প্রতি আমাকে মানে তার যেমন পরিসর তৈরি করতে হবে, তেমনি তার কথাগুলো আমাকে শুনতে হবে। আমি গ্রহণ করি বা বর্জন করি সেটা অন্য বিষয়। তো সেই জায়গায় আমাদের তো সমাজটাই এখন অনেক বেশি অসহিষ্ণু। আমরা দেখছি যে বিশেষ করে যদি কয়েক বছর ধরি, যেই আকুতি নিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনটা হয়েছিল, সেটা তো এই মুক্তিরই আকুতি। সেটা বারবারই সেখানে আসছে। কিন্তু সেটা আমরা যদি বাস্তবের সঙ্গে মেলাই, তাহলে দেখবো যে এই পরবর্তী সমাজটা বা জীবনধারা বা রাজনৈতিক পরিক্রমণ বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে, সেটা একটা ফাঁক তৈরি করেছে। এবং মুখে একটা কথা হচ্ছে, কিন্তু ভূমিতে আবার আরেক বাস্তবতা। তার সঙ্গে অনেক কিছু এখানে যুক্ত হচ্ছে। এই যে মব কালচার বলে একটা কথা, যে মব তো আর কালচার হয় না, যে গোষ্ঠীগত উগ্রতা। মানুষকে সাময়িকভাবে উত্তেজিত করে অপরকে আঘাত করা। আর এই অপরকে আঘাত করাটা এখন অনেকভাবে প্রসারিত হচ্ছে। সেটা দুঃখজনক। ফলে ওই সময়ের সঙ্গে যদি তুলনা করি এই সময়টা অনেক জটিল। এই সময়ে মানুষের আকুতিও কিন্তু, বা চাহিদাও কিন্তু অনেক বেড়েছে। আবার অধিকারহীনতাও অনেক মানে বেড়েছে। ফলে সব মিলিয়ে আমি বলবো যে এটা ভিন্ন সময়। কিন্তু মূল যে বাণী যে আমরা একটা গণতান্ত্রিক মুক্ত সমাজ চাই, যেখানে সকল মানুষের বিকাশের সুযোগগুলো উন্মুক্ত হবে।
রাশেদ আহমেদ: এই যে অপরকে আঘাত করা, সাধারণত দেখা যাচ্ছে যে ভিন্ন কথা যারা বলে, মুক্তচিন্তার কথা যারা বলে, তাদের উপরেই কিন্তু আঘাতটা বেশি হয়। এই যে উগ্রবাদীতা, এই ভূমিটা চাষ হলো কীভাবে?
মফিদুল হক: দেখুন এই প্রশ্নটাই আসলে অনেক গভীরভাবে তলিয়ে দেখার আছে। এবং আপনি যে কথাটা বলছেন ওর মধ্যে কিন্তু একটা ইঙ্গিত রয়েছে। ভূমিটা চাষ হলো কী করে? একটা ভূমি কিন্তু কর্ষিত হয় অনেক পরিশ্রমে, অনেক সময় নিয়ে। আমি যখন ফসলটা দেখি তখন সেটাই কিন্তু একমাত্র দিক নয়। এবং চাষী যখন মাঠে কাজ করে তখনও তো অনেক বাধা আসে। খরা আসে, বন্যা আসে, নানারকম জটিলতা তৈরি হয়। তো এই যে ভূমিটা চাষ করা বা কর্ষণ, সংস্কৃতিটাও তো এক অর্থে কৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ যে বলতেন এটার সঙ্গে কর্ষণটা যুক্ত। এই চর্চাটা কিন্তু আমরা নানাভাবে অবহেলা করেছি। বিশেষ করে বলবো যে আমরা যখন প্রতিরোধের জায়গায় ছিলাম পাকিস্তানি আমলে, তখন কিন্তু এটা অনেকভাবে চর্চিত হয়েছে। আমরা হয়তো মানে বৃত্তটা ওই রাষ্ট্রীয় শক্তিটা অর্জন করেনি, কিন্তু রাষ্ট্রশক্তির বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল। আর সেখান থেকে অনেক কিছু আমরা পেয়েছি। অনেক সৃষ্টিশীলতার পরিচয়, বলবো যে খুবই সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের দেখা আমরা পেয়েছি, যারা আমাদের শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতিকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তো তার সঙ্গে কিন্তু যখন শিল্পের কথা বলেন, সংস্কৃতির কথা বলেন, সেটা কিন্তু মিলনের কথা বলে। এবং সেইখানে উগ্রবাদীতার যে জায়গা ছিল বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতাকে, সেটা মোকাবেলা করেই তো এই বাংলাদেশের বিকাশ। বাংলাদেশের জাতিসত্তা, যেটার একেবারে সারাৎসারে যদি বলি যে, এটাও তো সাধারণ মানুষই একটা সংজ্ঞায়িত করেছিল, সেই আমাদের তো এখন বিস্মিত হতে হয় যে ওই সময়ে রাজপথে যে স্লোগানগুলো দেওয়া হতো... একটা স্লোগান কে প্রথম চালু করলো আমরা কেউ জানি না।
রাশেদ আহমেদ: আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, এই যে বাংলার বাউল গান, এই গানটার উৎস কোথায়?
মফিদুল হক: উৎস ওই যে আপনি বললেন, জমিন। এবং বাউল গানেও দেখবেন যে ভাঙাগড়ার কথা অনেক থাকে। আর জীবনকে খুব বড়ভাবে দেখা। নদীতীরের মানুষ জানে যে তার জীবন অনিত্য। এই আছে এই নেই। এই দেখিলাম সোনার ছবি, এই দেখি নাই গো। কিন্তু সে তো এটার মোকাবেলা করছে। ফলে আমার মানসের ভেতরেও কিন্তু একটা সাদৃশ্য তৈরি হচ্ছে। এই সব মিলেই তো বাঙালিত্ব। এটা তো মানে এই বাঙালিত্ব, পশ্চিম বাংলার বাঙালিত্ব, বিভাজন কী, পার্থক্য কী, মুসলমানের কতটুকু অবদান সেটা... এটা সকলে মিলে অবদান। নানা রকমভাবে এটা রচিত হয় এবং এখনো রচিত হয়ে চলার পথ উন্মুক্ত আছে। এখন আমরা সেটা কি নষ্ট করবো? নাকি সেটাকে আমরা আমানত হিসেবে প্রসার ঘটাবো? তো ফলে এই যে বলছেন, এটা কবে ঘটলো? সমাজের দিকে তাকালে তো দেখবো যে নানারকমভাবে এটা ঘটে। এটার একটা দীর্ঘ লড়াইও আছে এই উপমহাদেশে। আমি যতই মিলনের কথা বলি সাম্প্রদায়িকতা তো এখানে বারবার মাথাচাড়া দিয়েছে। আবার মিলনের আদর্শও এখানে জায়গা করার চেষ্টা করেছে। এই নিয়েই তো লড়াই। তো এই লড়াইটা আমরা মনে করেছিলাম যে স্বাধীন বাংলাদেশে এর একটা নিরসন ঘটাতে পেরেছি। আমার সংবিধানেও সেটার প্রতিফলন ছিল।
রাশেদ আহমেদ: স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাটা তো ছিল যে আমরা স্বাধীন হবো, তখন আর কোনো সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। যে কথাগুলো বললেন আমরা বাঙালি। আমার বাঙালি সংস্কৃতি থাকবে। ধর্ম যার যার জায়গায় থাকবে। এটাই তো ছিল?
মফিদুল হক: হ্যাঁ, এককথায় যদি বলেন, বাঙালি বাংলা শাসন করবে। তো বাঙালি যখন বাংলা শাসন করবে, তখন তো বাঙালিই করবে। তো সেই বাঙালির মধ্যে তো ধর্মীয় বিভাজন মূখ্য নয়। আমার জাতিসত্তাটা কী? আমার জাতিসত্তা হচ্ছে আমার এই ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, গাঙ্গেয় বদ্বীপ যদি বলি, আর তার সঙ্গে ভাষাভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক ঐক্য। দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় একটা নৃতাত্ত্বিক ঐক্যও তৈরি হয়েছে। তো এটা সহজাত একটা উপলব্ধি ছিল। সেটা সংবিধানেও প্রতিফলিত হয়েছে। বাস্তবে সেটার প্রয়োগে কোথায় ঘাটতি হয়েছে, কোথায় ব্যর্থতা, কোথায় সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেগুলো কিন্তু খুব চুলচেরা বিশ্লেষণের আছে। আর তার সঙ্গে দেখবো রাজনৈতিক ঘাত প্রতিঘাতে এগুলোকে কোনো কোনো সময় রাজনৈতিক শক্তি ধর্মটাকে ব্যবহার করেছে। অপব্যবহারই বলবো। এটা খুব বড় প্রবণতা হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানিরাও ধর্মকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটা তো আমরা মোকাবেলা করেছি। আজকে অনেক সূক্ষ্মভাবে এবং অনেক গভীর স্বার্থ নিয়ে ধর্মকে যখন ব্যবহার করা হয়, সেটা কিন্তু আজকে আমার মধ্যে বিভাজন তৈরি করে। পাকিস্তানিরা যেটা করতে চেয়েছিল আমি কিন্তু জাতীয় সত্তা নিয়ে সেই বিভাজনকে অতিক্রম করেই তাদের মোকাবেলা করেছি। আজকে কিন্তু আমার এই জাতিসত্তার যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর স্বদেশের প্রতি আমার যে সংযুক্তি তার থেকে যে দায়বোধ, সেটাকে নিয়েই অগ্রসর হতে হবে। মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু মৌলিক জায়গায় একটা ঐকমত্য থাকবে। সেটা আমরা মনে হয় এখনো তৈরি করতে পারিনি।
রাশেদ আহমেদ: একটা প্রশ্নের মীমাংসা কেউ করতে চায় না, সেটা হলো জাতি আগে, না ধর্ম আগে? আমাদের এই বিভেদটা অনেক বেশি।
রাশেদ আহমেদ: আমি বলতে চাচ্ছি যে আমাদের জাতির উপরে ধর্মকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মফিদুল হক: না না সেইজন্যই বলছি আপনি বলছেন এই যে দ্বন্দ্বটা, এই দ্বন্দ্বটা তো আমি কোথাও দেখছি না। আমরা এই দ্বন্দ্বটাকে অনেকভাবে তার মানে কি আমরা এটা কৃত্রিমভাবে করছি।
রাশেদ আহমেদ: স্বার্থের জন্য কি করা হচ্ছে?
মফিদুল হক: মীমাংসা যদি খুঁজতে চান, নিশ্চয়ই এটা হয় কি যে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা। ধর্মকে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করা। আর সেখানেই অমানবিকতা চলে আসে। আমি যখন গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ে আগাই, তখন কিন্তু মানবসত্তার দিকে তাকাই না। আমি বরং চেষ্টা করি যে এই গোষ্ঠীসত্তাকে ঐক্যবদ্ধ করতে হলে অপর গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়াতে, সে আমার ক্ষতি করছে, সে আমার প্রতিপক্ষ, সে আমাকে নানাভাবে আমার কুঁড়ে কুঁড়ে বিনষ্ট করছে আমার ভিত্তি, এরকম একটা ইমেজ দাঁড় করানো হয়। তার মধ্যে থেকে গোষ্ঠীস্বার্থটাকে বড় করে তোলা হয়।
একটা অসাধারণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন ১৯৪৮ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। যে পাকিস্তান হয়েছে, তখন ভবিষ্যতকে কীভাবে আমরা নির্ধারণ করবো, কীভাবে পথ চলবো। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল। মুসলিম লীগের এক অংশ উদার চিন্তার মানুষও তো ছিলেন, হাবীবুল্লাহ বাহার ছিলেন, অন্যরা ছিলেন, তারা একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একটা বামপন্থী ঘরানার এই অজিত কুমার গুহ, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তিনিও এটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তো সেখানে মোটামুটি বিদ্বৎসমাজের সবাই যুক্ত হয়েছেন। কার্জন হলে তিনদিনের সম্মেলন হয়েছিল।
রাশেদ আহমেদ: বিরোধের জায়গাও না এটা।
মফিদুল হক: বিরোধের কোনো জায়গা নেই। এবং সেটা ধরেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তো বহুভাষাবিদ পণ্ডিত এবং ইসলামী শাস্ত্রে তো অত্যন্ত পারঙ্গম একজন ব্যক্তি। নানারকম গ্রন্থ অনুবাদও করেছেন। নিষ্ঠাবান মুসলমান তিনি। এবং তিনি যখন এই কথাটা বলেন তখন আমার মনে হয় যে এই কথাটার তাৎপর্যটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করা উচিত। একটু কান পেতে এই বাণীগুলো শোনা উচিত। জাতিসত্তার সংস্কৃতিতে যদি যাই তাহলে দেখব, এর নানারকম রিফ্লেকশন আছে। এটা মানুষের সহজাত। মানুষ তো প্রকৃতির সন্তান। মানুষ তো একক সত্তা, আবার সে মহাবিশ্বের অংশ। এই চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারকা- এই সবকিছুর মধ্যেই তার অস্তিত্ব। এই অস্তিত্বটাই কিন্তু ধর্মের খুব সুন্দরভাবে তাকে এই অস্তিত্বের সার্থকতা কোথায়, সেখানে যে সদর্থক যে মূল্যবোধগুলো, সেখানে মানবসমাজের ঐক্য এই সবকিছুই তো মেলে ধরে। ইসলাম তো আরো সুন্দরভাবে একটা শান্তির ধর্ম হিসেবে এটা তুলে ধরে। তো সেখানে যারা বিকৃতি ঘটায়, যারা এর গভীরতাটা অধ্যয়নের দিকে না গিয়ে বরং এটাকে ব্যবহার করে আমি কী করে অপরকে আঘাত করতে পারি, সহিংসতা প্রচার করতে পারি? আপনি দেখবেন কেবল অন্য ধর্ম নয়, এখন নিজ ধর্মের মধ্যেও আমরা ফারাক তৈরি করছি। ফারাক তৈরি করতে চাইলে তো কতরকমভাবে করা যায়। কেন, মানুষ তো বৈচিত্র্যময় সত্তা। আর মানবজাতি যদি বলি এটা একটা মোজাইক। বহুরকম রঙ এসে মিলে এটা গঠিত হয়। তো ফারাক ধরলে তো নিজ ধর্মের মধ্যেও ফারাক যেমন তৈরি হয়। শিয়া সুন্নি, কাদিয়ানি, নানারকম ফারাক। এই আচার ওই আচার এবং আমি মানে নিজ নিজ ধর্ম পালনের চাইতেও অপরকে ধর্ম দিয়ে আঘাত করা, এটা তো একটা মূঢ়তার প্রকাশ। তো এটার সঙ্গে তো ধর্মের কোনো যুক্ততা নেই। বরং ধর্মের অবমাননা হয়। ধর্ম যখন এই রক্তপাত ঘটায়, ধর্ম যখন অপরের মত যদি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তো আমি তো মত দিয়েই সেটার মোকাবেলা করব। আর সেখানেও যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করার কথা, সেটা করা হয় না। ধৈর্য, সহনশীলতা এবং ইসলামের ইতিহাসে তো অসংখ্য উদাহরণ আছে যে... খুব বিখ্যাত কবি, আরবি ভাষায় তো খুবই বড় কবি ইমরুল কায়েস এর কথাই বলা যায়, তিনি তো ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলেন না, কিন্তু রসুলও তার কবিতাকে মূল্য দিতেন এইজন্য যে সেই কবিতার মধ্যে যে শব্দের ঝংকার, কবিতার মধ্যে মিলের যে শক্তি সেটাও তো আমাকে বুঝতে হবে, জানতে হবে। আর আমি তার যেখানে অমানবিক বাণী, যেখানে অন্ধতার প্রচার হচ্ছে সেটা তো আমি মোকাবেলা করবই। আলো দিয়ে, জ্ঞান দিয়ে, প্রজ্ঞা দিয়ে। আর এটাই তো মানে যে মানব অস্তিত্বের একটা বড় বৈশিষ্ট্য।
রাশেদ আহমেদ: ইদানিং একটা জিনিস লক্ষ্য করবেন যে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল ইসলামকে দুই পক্ষ আলাদা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা দুইজনই তো ধর্মের আগে মানুষ, এই কথাই কিন্তু সবসময় লেখালেখিতে বলে গেছেন। কিন্তু এখন দুইজনকে আলাদা করা হচ্ছে, একজন হিন্দু আরেকজন মুসলমান...
মফিদুল হক: দেখেন, দুজনই কিন্তু এক অর্থে বহুত্ববাদী। একসময় পূর্ব বাংলায়, সর্বধর্মবাদী একটা গোষ্ঠী ছিল। এখনো আছে কিছু কিছু; তারা অনেকটা ব্রাহ্ম সমাজের প্রভাবিত বলা যায়। সঙ্গীতের মধ্য দিয়েই তাদের উপাসনা। আর এই সঙ্গীতে যে বাণীগুলো সেটা সবসময়ই খুব ভালো।অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশ, আলোকিত কর- এরকমই সেই বাণী। রবীন্দ্রনাথ তো আনুষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না। তার ধর্মবোধটা অনেকটা যে মহাজীবনের কথা তিনি বলেন, একটা মহাসৃষ্টির কথা বলেন, তো সেটা আধ্যাত্মিকতা দ্বারা খুবই আপ্লুত। আর কাজী নজরুল ইসলাম, তিনি নিজ ধর্মটাকে তার সারসত্তায় এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন যে, অপর সত্তা বিচরণে তার কোনো অসুবিধা বা বিঘ্ন ঘটেনি। ফলে তিনি যেসব ইসলামী গান লিখেছেন, আপনি দেখবেন যে এই গানগুলো যদি গভীরভাবে দেখি তাহলে জাগরণের গান। ইসলামের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী যে উপাদানগুলো আছে, বা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যে আহ্বান আছে, সেগুলোকে তিনি আলিঙ্গন করেই এই গানগুলো লিখেছেন। প্রত্যেকটা গানেই আপনি দেখবেন। বা এমনকি নারী জাগরণের গানও দেখবেন। বিবি খাদিজাকে তিনি যেভাবে চিত্রায়িত করেছেন, যিনি প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি একজন নারী। সেই হিসেবে যে নারীকে, নারীর সত্তাকে তিনি কিন্তু অনেক উঁচুতে স্থান দিলেন। এবং তার জীবনের আরো অনেক ঘটনা নিয়ে। আবার যখন শ্যামাসঙ্গীত লিখছেন, তখন কিন্তু আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ধরিনি যেটা শ্যামাসঙ্গীত, সেটাও কিন্তু জাগরণের গান। শ্যামাসঙ্গীত হচ্ছে একটা শক্তির আরাধনা। আর এই গানটাকে তিনি কিন্তু নিয়ে গেছেন বিশেষ করে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শক্তির... সেটা বিদ্রোহী কবিতায় আপনি দেখেন। এটা ছত্রে ছত্রে কিন্তু এই দুই ধর্মের এই উপাদানগুলো এসে ওখানে মিলেমিশে গেছে। ফলে এরা যেই উচ্চতায় বা যেই গভীরতায় বিচরণ করেছেন, সেটা বুঝলে তো এমন ফালতু পার্থক্য করা যায় না।
রাশেদ আহমেদ: এটা করে কী হচ্ছে? উগ্রবাদীরা এটাকে নিয়ে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চাচ্ছে।
মফিদুল হক: দেখুন এর মোকাবেলা করতে আপনার হাতে তো সেই অস্ত্রটা রয়েছে। যে সত্য এবং সুন্দর। রবীন্দ্রনাথ নজরুল সম্পর্কে এমন একটা সৌন্দর্য রয়েছে যেটা পল্টন থেকে নজরুল ফিরলেন ১৯১৯ সালে। করাচি থেকে ট্রেনে একটা বিশাল যাত্রা। পুরা ভারতবর্ষ অতিক্রম করে সেটাও একটা অভিজ্ঞতা। আর সেখানে তার পল্টন জীবনটাও একটা অভিজ্ঞতা, তার আগের জীবনটাও যে দুঃখময় জীবন সেখানে আবার গান কীভাবে জড়িত ছিল, সবমিলিয়ে তো একটা স্বশিক্ষিত একজন যুবক। আবার টগবগে যুবক। বিদ্রোহী সত্তাটা তো তার ভিতরে রয়েছে বলেই পল্টনে গিয়েছিলেন যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রয়োজন হবে এবং সেটা শিখতে হবে। তো পল্টন থেকে যখন ফিরলেন তখন বলা হয় যে তার ঝুলিতে, একটা বিশাল অভিজ্ঞতা জমেছে, সেখানেও তিনি ফার্সি অধ্যয়ন করেছেন, নানা জাতির মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে পল্টনে, তো ভারতবর্ষের বহু জাতিসত্তার মানুষ মিলেই পল্টন। আর তার ঝুলিতে ছিল দুটো বই। কিতাবই বলতে পারি। একটা হচ্ছে হাফেজের দেওয়ান। দেওয়ানে হাফেজ। আরেকটা হচ্ছে গীতাঞ্জলি।
রাশেদ আহমেদ: আপনি কত সালের কথা বলছেন?
মফিদুল হক: এটা হচ্ছে ১৯১৯ সালের শেষে তো পল্টন ভেঙে তিনি ফিরলেন আরকি। ১৯ সালের শুরুর দিকে তারপরে তো ১৯ সালের শেষে, ২০ সালেই বলা যায় বিদ্রোহী কবিতা লিখলেন। প্রকাশ হলো ২০ সালের জানুয়ারিতেই সম্ভবত। লিখলেন তিনি ১৯১৯ সালের শেষে। সেখানেও কিন্তু আমরা ওই একটা প্রতিফলন দেখি অসাধারণভাবে। অনুষঙ্গগুলো নিয়ে এসছেন, উপমাগুলো নিয়ে এসছেন নানা ধর্ম থেকে। বৈশ্বিক উপমাও নিয়ে এসছেন। যে আমি ভীম ভাসমান মাইন। ভীমের সঙ্গে মাইনের তো কোনো যোগসূত্র নেই। একটা পৌরাণিক, আরেকটা আধুনিক। মাইন শব্দটা কবিতায় যে ব্যবহার করা যায় এটাও কিন্তু অভিনব, কী চমৎকারভাবে তিনি এই গাঁথুনিটা তৈরি করলেন। ফিরে এসে প্রবল প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ধূমকেতু পত্রিকা অর্ধ-সাপ্তাহিক তিনি সূচনা করলেন। আর রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ কামনা করলেন। তখন কত তার বয়স, ১৯২২ এ যদি ধরি, ২৩ বছর বয়স। কবিতা লিখেছেন, কবিতা নানারকম ভাবে লিখছেন। এরকম একটা একেবারে নবীন যুবককে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা সুন্দর আশীর্বাদ বাণী দিলেন। যেটা তার পত্রিকা অর্ধ-সাপ্তাহিক, প্রতি মাস্টহেডে ছাপা হতো যেটা পত্রিকার শিরোনাম যেটা বলা হয়। যে “আয় চলে আয় রে ধূমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু”। তো এই যে নজরুলকে তখনই রবীন্দ্রনাথ যেভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, সেতুবন্ধন তো আমরা বলি নানাভাবে কিন্তু ‘অগ্নিসেতু’ বললেন রবীন্দ্রনাথ। এটা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মহিমাও প্রকাশ করে আর নজরুলের শক্তিময়তাও প্রকাশ করে, যে সম্ভাবনাটা রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন। আর নজরুল যে কাজ করছেন সেটা একটা অগ্নিসেতু তৈরি করার কাজ। এটা খুব সহজ কাজ না। তারপরে বলছেন, “জাগিয়ে দে রে চমক মেরে, আছে যারা অর্ধচেতন”। তো আমার কাছে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের তো একটা কৌতুকপ্রিয়তা বা পরিহাসবোধও ছিল। ভাই এই যে তিনি মিলিয়ে দিলেন ধূমকেতুটা অর্ধ-সাপ্তাহিক। আর তিনি আবার বললেন যে, “চমক মেরে জাগিয়ে দে যারা অর্ধচেতন আছে”। অচেতনও বলতে পারতেন, অন্য কিছু বলতে পারতেন। কিন্তু অর্ধসাপ্তাহিকের সঙ্গে যে অর্ধচেতন কথাটা আবার খুব মিলে যায়। তার অর্থ কি যে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের একটা আত্মিক সম্মেলন হয়ে গিয়েছিল তখনই। রবীন্দ্রনাথ তো তখন নোবেল বিজয়ী মহাখ্যাতিমান একজন ব্যক্তি। তারপরে ধূমকেতুর কারণেই তো নজরুল জেলে গেলেন। কারাগারে নজরুলের ওপরে খুবই পীড়ন, রাজবন্দী মর্যাদা দেওয়া হয়নি, নানারকমভাবে অত্যাচার করা হচ্ছে। তিনি অনশন করলেন। সবাই খুব চিন্তিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টেলিগ্রাম পাঠালেন। যে, “Give up hunger strike. Our literature claims you”. আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়, তুমি অনশন ভঙ্গ করো। নজরুলকে তখন প্রেসিডেন্সি জেল থেকে বহরমপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর ব্রিটিশরা টেলিগ্রামটা ফেরত পাঠালো যে ‘প্রাপককে পাওয়া যায়নি’। কারণ ওইটা প্রেসিডেন্সি জেলে পাঠানো হয়েছিল। ওরা তো জানে বন্দী কোন জেলে আছে। নিয়ম হচ্ছে সেখানে ফরোয়ার্ড করে দেওয়া। এটাকে ডেড টেলিগ্রাম বানিয়ে ফেরত পাঠালেন। কিন্তু নজরুলের কাছে তো বার্তাটা পৌঁছেছিল। আর তখনই নজরুল অনশন ভঙ্গ করলেন। আর তখনই রবীন্দ্রনাথ বসন্ত নাটকটা লিখলেন। আর নাটকটা প্রকাশ পেল, রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ করলেন ‘শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু’। তো তখন ২৪-২৫ বছর বয়সের একজন কবি, রবীন্দ্রনাথ যে এরকম কোনো অনুজকে তার বই উৎসর্গ করেছেন যার সামনে জীবনটা সামনে রয়ে গেছে, এটার কিন্তু দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। তো এইটাকে আমরা কী বলবো? কি অসাধারণ একটা মিল। আবার ২২শে শ্রাবণ ১৯৪১, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের সময় নজরুল তো তখন আকাশবাণীতে ট্রেইনার হিসেবে কাজ করছেন। আকাশবাণী ধারা বর্ণনা দিবে তখন। রবীন্দ্রনাথের শেষকৃত্য সব যাত্রার। আর নজরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হলো যে এই অনুষ্ঠানটাতে উপযুক্ত গান কবিতা দিয়ে একটা চাংক তৈরি করা। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পড়লেন। ‘রবিহারা’ নাম দিয়ে তিনি একটা কবিতা লিখলেন, সেটাকে গানেও রূপান্তর করলেন। তিনি গাইলেন, দুজন সহশিল্পী ছিল, দুই নারী কণ্ঠ। এটা এখনো ইউটিউবে পাওয়া যায়, খোঁজ করলে। নজরুলের সেই কণ্ঠ, সেই উদাত্ত কণ্ঠ। আর তার সঙ্গে এই যে ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে... এই কথা দিয়ে যে তাকে আর জাগাইয়ো না। যে গোটা জাতির পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানালেন কিন্তু যদি ওই অর্থে বলি তাহলে কাজী নজরুল ইসলাম।
রাশেদ আহমেদ: ‘ঘুমিয়ে গেছে শান্ত হয়ে...আমার গানের বুলবুলি’ এটা তো তার ছেলের...
মফিদুল হক: ছেলের। না ঘুমিয়ে... এটা ছিল কথাটা এমন ছিল যে ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত কবি’। হ্যাঁ। তারে আর জাগাইয়ো না।
রাশেদ আহমেদ: একটু অন্যভাবে ওইটা আবার...
মফিদুল হক: হ্যাঁ ওই গান না ঠিক। কিন্তু ওইটা মৃত্যুর প্রসঙ্গই। কিন্তু তিনি দীর্ঘকাল তার জীবন সাধনার মধ্যে দিয়ে আমাদের যা দিয়ে গেছেন সেটা নিয়ে যেন আমরা অগ্রসর হই, এরকম হয়েছে। মানে গানটার মধ্যে একটা গভীরতা আছে কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে লেখা। সবচেয়ে বড় কথা আমার মনে হয় যে, একেবারে যৌবনের শুরুতে তাদের একটা সংযোগ। আর রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণে তাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর জন্য যদি বলি সেটার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সেটা অসাধারণভাবে করেছেন। তার একবছর পরেই কিন্তু নজরুল বাকরুদ্ধ হয়ে যান, তিনি অসুস্থ হয়ে যান।
রাশেদ আহমেদ: কিন্তু এখন দেখেন, কী আশ্চার্য! যে দুজনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়। বিরোধ বাঁধানোর চেষ্টা করা হয়।
মফিদুল হক: হ্যাঁ, আপনি সবকিছুকে দেখবেন, এটা কি ক্ষুদ্রতার দিকে নিয়ে যায় না বৃহত্বের দিকে আমাকে হাতছানি দেয়। এটাই হচ্ছে আপনার লিটমাস টেস্ট। লিটমাস পেপার বলেন। এটা দিয়ে বিচার করেন তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন। ঢাকাতে ১৯২৬ সালে কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন প্রথমবারের মতো। আর ঢাকাতে রবীন্দ্রনাথও এসেছিলেন ১৯২৬ সালে। রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন ফেব্রুয়ারি মাসে। নজরুল এসেছিলেন সম্ভবত জুন-জুলাই মাসে। তো রবীন্দ্রনাথকে ঢাকাতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাকে ডি-লিট উপাধিতে সম্মানিত করবে। কার্জন হলে সেই অনুষ্ঠানটা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ১৯২৬ সালে তারা প্রথম ডি-লিট দেওয়ার কথা যখন তারা চিন্তা করলেন, অনেক ভাবনা চিন্তা করে মনে করলেন যে সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাপ্য। তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরূপতা ছিল না সৌহার্দ্য ছিল? পারস্পরিক সংযোগটার প্রকৃতি কী ছিল, এটা সেই ঘটনা দিয়েই বোঝা যায়। এখানে তো কোনো সময়ই এই প্রশ্নটা অতীতে ওঠেনি, ওটার মধ্যে আমি যেতে চাই না। যে ওটা মানে গবেষণা করলে বেরিয়ে যায়, কোন সালে কোথায় কী হয়েছিল। এটা নিয়ে কাজও অনেক আছে। মূল কথা হচ্ছে যে আমরা বিদ্বেষের বাণী প্রচার করতে চাই না, আমরা মিলনের কথা বলতে চাই। তার সঙ্গে অবশ্যই চলে আসে যে আমরা বিদ্বেষের জন্যে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিব? আর আমরা যদি বলি যে সম্প্রীতির জন্যে তো আমরা সত্যের আশ্রয় নিব। তো এই সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব নিয়েই জীবন। আর এই দ্বন্দ্ব চলবে কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে এটা যখন জাতীয়ভাবে উঠে আসে সমাজের সাম্প্রদায়িক ঘৃণা বিদ্বেষের ভাণ্ডটাকে আরো হলাহল যুক্ত করতে। মানে ওই যে বলে বেদনায় ভরে গিয়েছে পেয়ালা। আমার তো হিংসা বিদ্বেষের বিষে পেয়ালা ভরে যাচ্ছে, উপচে পড়ছে। সেটা তো আমাকে নষ্ট করে দিবে মানবসত্তা হিসেবে। যিনি এটা প্রচার করছেন তিনিও কিন্তু বিনষ্টের দিকে যাচ্ছেন। এবং এখানে আরো মনে হয় যে নজরুল যে ঢাকায় আসলেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের আমন্ত্রণে, যাদের শিখা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যথার্থভাবেই। তারা তো চেয়েছিলেন যে বুদ্ধির মুক্তি, এটাই ছিল তাদের মূল বাণীমন্ত্র। যে ‘জ্ঞান যেখানে বন্দী, চিন্তা যেখানে অবরুদ্ধ, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। এটাই ছিল তাদের মাস্টহেড, শিখা পত্রিকার শিরোনামে লেখা থাকতো। এবং শিখার বার্ষিক সম্মেলন হতো। শিখার বিভিন্ন অধিবেশন হতো। আর সেসব অধিবেশনে কিন্তু শুরুতে সঙ্গীত পরিবেশন করা হতো। এটা তখন একটা রীতিও ছিল। এমনকি রাজনৈতিক সভা সমাবেশেও আমাদের দেশেও আমরা ষাটের দশকে দেখেছি অনেক সময় গান দিয়েই হয়তো সভার কাজ শুরু হতো। বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা ঘোষণা করলেন চট্টগ্রামের পোলোগ্রাউন্ডের বিশাল জনসভায়, তিনি প্রকাশ্যে সেটা মানুষের সামনে তুলে ধরলেন। তখন কিন্তু তারই একটা নির্দেশ ছিল চট্টগ্রামে যারা গণসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন তারা তখন সমবেতভাবে ওই গানটা গাইলেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’। ছয় দফা ঘোষণাটা ওই সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
রাশেদ আহমেদ: ৬৬ সালে এটা?
রাশেদ আহমেদ: কোন জায়গায় করলেন এটা?
মফিদুল হক: সম্মেলনটা কোথায় হয়েছিল সেটা একটু দেখতে হবে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই হতো এসব আয়োজন। যেহেতু শিখা গোষ্ঠীর যারা ছিলেন আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন তারা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন অধ্যাপক, মানে প্রশিক্ষক বলা যায়। কাজী মোতাহার হোসেন তো ডেমোনস্ট্রেটর ছিলেন তখন।
রাশেদ আহমেদ: বাংলাদেশের অভ্যুদয় কিন্তু বিকাশের পথে, মুক্তির পথে এটা বলা যায় যে বড় একটা বাধা অতিক্রম করে জাগরণ হলো। সেই বাংলাদেশ যদি আজকে এই ক্ষুদ্রতা, মূঢ়তা, ধর্মান্ধতা, সেটাকে সামাজিক জীবনে রাজনৈতিক জীবনে নিত্য আমরা প্রয়োগ করতে থাকি, একদিন কিন্তু এর বিরুদ্ধে জাগরণ হবে। এই যুগটা হয়তো ইতিহাসে বর্বর যুগ হিসেবে চিহ্নিত হবে। আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন ইদানিং। নৌকা বাইচের মতো সাংস্কৃতিক কালচার সেটা হতে দেওয়া হচ্ছে না। তারপর বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান হতে দেওয়া হচ্ছে না। ইভেন সিনেমা প্রদর্শন সেটিও করতে দেওয়া হচ্ছে না।
রাশেদ আহমেদ: যারা বাধা দিচ্ছে, যারা গান করতে দিচ্ছে না, নৌকা বাইচ করতে দিচ্ছে না, ছবি প্রদর্শন করতে দিচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কিন্তু তাদের প্রতিহত করা হচ্ছে না।
মফিদুল হক: দেখুন দুর্ভাগ্য তো সেইখানেই। আমি ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করি। তখন কিন্তু আমি নিজে ধার্মিক থাকি না। কিন্তু আমি ধর্মের বুলিটা তখন আবার খুব জোরে আওড়াতে থাকি। আমি জানি তো আমি কী করছি। আর এটা ধর্মীয় বিবেচনায় যুক্তিসিদ্ধ বা যুক্তিসিদ্ধ কিনা এই প্রশ্ন আর তখন তোলা হয় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা তো এখন সার্বজনীন হয়ে গেছে। এটা যে কেবল বাংলাদেশের বিষয় তা নয়। আপনি ভারতের দিকে তাকান সেখানে দেখেন হিন্দুত্ববাদকে এখন আবার রাজনৈতিকভাবে কত রকমভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, মানে সাংস্কৃতিকভাবে। আমাদের এখানেও সেটা ঘটছে। পশ্চিমের দিকেও বা আমেরিকাতেও দেখেন একটা যে নিউবর্ন খ্রিস্টান বলে যে সেটাকে নিয়ে। বা আপনি আজকে ইসরায়েল রাষ্ট্রটা দেখেন। যে ওই সময়ে ৪৭ সালে পাকিস্তান হলো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র আর ইসরায়েল হলো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। এই দুই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কিন্তু তার নিজ জনগণকে প্রায় উৎখাতের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। পাকিস্তান তো ধর্মের নামেই প্রতিষ্ঠা পেলো, যে পাকভূমি, হোমল্যান্ড ফর দা মুসলিমস অফ ইন্ডিয়া। তারাই কিন্তু একাত্তরে এখানে ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করলো। যার সিংহভাগ মুসলমান। তো এটা তো মুসলমানদের দ্বারাই মুসলমান হত্যা হয়েছে বিশ শতকের ইতিহাসে। তো সেটা তো আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। আমরা যখন যে ধর্মের কথাটা যখন বলবো তখন ধর্মকে কীভাবে এই রসাতলে নিয়ে যায় যেখানে এক ধর্মের মানুষ অপর ধর্মকে উৎখাত করে দিচ্ছে দ্বিধাহীনভাবে। কেন? যে তারা প্রকৃত মুসলমান না। তারা হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত। তাদের ভাষা সংস্কৃত ঘেঁষা। তো এরকম বর্বরতা তো আসলে এই সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়। সেজন্য আজকে যে বর্বরতাগুলো সেটা খুব মানে শংকিত হওয়ার বিষয় আছে। যে এটা এখানে থামবে না যদি না এটার মোকাবেলাটা আমরা করতে না পারি।
রাশেদ আহমেদ: আবার একটা জিনিস দেখবেন যখন মক্কা বিজয় হলো, হযরত মোহাম্মদ যখন মক্কা বিজয় করলেন, অন্য ধর্মের লোকজন মদিনায়, মদিনা সনদের মাধ্যমে তারা তাদের অধিকার কিন্তু নিশ্চিত থাকলো।
রাশেদ আহমেদ: খুব সহজে মানুষকে জিনিসটা কানেক্ট করে, তাই না?
মফিদুল হক: মানবিক প্রবৃত্তি যেটা, যে সত্তাটা যে আকুতিটা, যে আত্মাটা আমরা বলি, সেখানে গিয়ে এটা কিন্তু একটা যে মরমে গিয়া পশিল আরকি হ্যাঁ। ফলে এই যে মানে ধর্মের সৌন্দর্য সেটাকেও কিন্তু আমরা একটা কদর্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি এইসব আচরণের মধ্য দিয়ে। সেখানে আমার মনে হয় যে ধার্মিক মানুষদের আজকে আমরা চাইবো যে যথার্থ ধার্মিক মানুষদের একটা জাগরণ ঘটুক।
রাশেদ আহমেদ: তাদেরও একটা রোল প্লে করার দরকার আছে এই মুহূর্তে, তাই বলছেন?
মফিদুল হক: আমাদের দেশের তো সিংহভাগ মানুষই ধার্মিক মানুষ।তারা কিন্তু সবসময় এই সংস্কৃতিটার মধ্যে একটা সহনশীলতা তো আছে। এখানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মুসলমান মিলেমিশে তো বহু বছর ধরে বসবাস করছে। কত রকম উদাহরণ সমাজে আছে। আর সেটার পরিচয় আমরা বহুরকমভাবে পাই সমাজে। সেটা যেন আমরা নষ্ট না করি, সেটা তো আমার শক্তির জায়গা। তো সবমিলে আমার যেটা মনে হয় যে, আজকে একটা অধোগতি সভ্যতার ঘটছে বিশ্বব্যাপী। দেখুন মানুষ তো এত জ্ঞান-বিজ্ঞানে এত বিশালতা আগে অর্জন করেনি। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তার হাতের মুঠোয় তো পৃথিবী চলে এসেছে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগে কিন্তু এখন ফসলের উৎপাদন আমার দেশেও প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিলাম। এত অর্জনের পরেও যদি সভ্যতার বিচার করি, মানবতার বিচার করি তাহলে দেখব যে অনেক শংকিত হওয়ার জায়গা যে এটার একটা অধোগতি হচ্ছে। যদি প্রযুক্তিই ধরেন যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেন একটা হিংসা প্রকাশের বাহন হয়ে যাচ্ছে। এটা তো মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযুক্তি করবে। সংযুক্তি করছে অনেকভাবে। কিন্তু তার পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে যে মানুষ অনেক বেশি অসহিষ্ণুতা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সে প্রয়োগ করছে। গালিগালাজ, অপরকে হেয় করা, নানাভাবে বিকৃতি ঘটানো। তার অর্থ হচ্ছে যে আমরা একটা সভ্যতারই একটা বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
রাশেদ আহমেদ: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অপব্যবহার করা হচ্ছে।
মফিদুল হক: খুবই অপব্যবহার করা হচ্ছে। যেই কারণে দেখুন পশ্চিম দেশে এখন বলা হচ্ছে যে ১৫ বছর ১৬ বছরের নিচে কারো হাতে এই ফেসবুক বা এই ইনস্টাগ্রাম বা এইসব প্ল্যাটফর্মের অ্যাক্সেস দেওয়া যাবে না। আইন করেই তারা বন্ধ করছে। মনে হতে পারে এটা তো মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। কিন্তু সেটা না। সেটা প্রজন্মকে যদি আমার রক্ষা করতে হয় তার সত্যিকার বিকাশ ঘটাতে হয়, সেখানে তো আমাদের এটা একটা যথেচ্ছাচারের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। যেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জাতিসংঘও এটা নিয়ে অনেক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছে। অনেক আলোচনা হচ্ছে। ইউনেস্কো বলছে যে ডিজিটাল লিটারেসি। আমার অক্ষর জ্ঞান শিখবো, তার সঙ্গে আমার ডিজিটাল জ্ঞানটাও অর্জন করবো। যেন ডিজিটাল ভুবনে আমি যেন বিচরণ করার সক্ষমতা অর্জন করি। ফলে মানে স্বাধীনতা বলি সংস্কৃতি বলি অনেক দায় থাকে। এটা যে কেবল আমি বিনোদন বা আমি উপভোগ করবো, আমি ভোক্তা থাকবো তা নয়। যদি সত্যিকারের সংস্কৃতির সঙ্গে আমার মোকাবেলা হয় তাহলে নিজেই অনুভব করবো যে শিল্পী যেমন একটা দায় থেকে তার শিল্প সৃষ্টি করেন, ভোক্তাও একটা দায় থেকে শিল্পকে গ্রহণ করে। করে বলেই তো এই যে বাউল গানের যদি আমি বলি এই গ্রাম-গ্রামান্তরে এই আসরগুলোতে গরিব দরিদ্র মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আর তার জীবনের যে দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা সবকিছুর সে একটা যেন নিরসন ঘটে, একটা পথ সে খুঁজে পায়। আবার নিজের ভেতরে একটা শক্তি সে খুঁজে পায়। আবার সে উঠে দাঁড়াবার একটা প্রেরণা পায়। তো এই এটাই তো শিল্প সংস্কৃতির কাজ। তো সেটা জোরদার করে চললেই মনে হয় যে আমাদের একটা বড় দিকে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো।
রাশেদ আহমেদ: অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সময় দেয়ার জন্য।
মফিদুল হক: ধন্যবাদ এই কথোপকথনের সুযোগটা করে দেওয়ার জন্যে।

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মফিদুল হক। লেখক, গবেষক, প্রকাশক। তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সবসময় এই ব্যক্তিত্বকে দেখা যায়। তার সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন সংবাদ-এর বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদ। সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ: সাংস্কৃতিক জগতে আপনার পদার্পণটা কীভাবে হলো?
মফিদুল হক: এসএসসির চৌকাঠ পার হলাম ১৯৬৫ সালে। সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে পরিচয় কিন্তু তার আগে। ঢাকাতে শুরু হয়েছিল স্কুলজীবন, তারপরে বাবার চাকরির সূত্রে ময়মনসিংহ, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে আবার ঢাকায় আসলাম। ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। আর ৬৫-৬৬ সালটা কিন্তু ওই ষাটের দশকেরই, বলা যায় দ্বিতীয়ার্ধটা একটা অন্যরকম সময় ছিল। আর কলেজে যেটা হয় নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন সেখানে চলে। আমার সম্পৃক্ততা ঘটেছিল মূলত সাহিত্য পত্রিকা সংকলন করা, ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত এইসব মিলে। তারপর ধীরে ধীরে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি সংসদ, ছায়ানটের সঙ্গেও একটা যুক্ততা, কর্মী হিসেবে থেকেছি নানা আয়োজনে। পহেলা বৈশাখের আয়োজনেও ছিলাম প্রথম যেটা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে।
রাশেদ আহমেদ: ষাটের দশকে বাঙালি সংস্কৃতির একটা জাগরণ তৈরি হয়েছিল। সেই জাগরণটা এখনকার সময়ে কি দেখতে পান?
মফিদুল হক: সময় তো আলাদা। মানে, ইট ইজ অ্যানাদার টাইম, অ্যানাদার ডে। আবার ওই জাগরণটা কী ছিল যদি আমরা পেছনে ফিরে তাকাই, আমরা তো বলি যে জাতীয় জাগরণ। যেটা এমনিও বলি যে বায়ান্ন থেকে একাত্তর। এই জাগরণটা নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। যদি আমরা বলি পাকিস্তান রাষ্ট্র যে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বের কাঠামো চাপিয়ে দিলো, আর সেই চাপিয়ে দিলো তার সঙ্গে যে শোষণটা তারা শুরু করলো- অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক শোষণ, মানুষের অধিকারহীনতা, সেটার বিপরীতে তো বায়ান্নর... বায়ান্ন কিন্তু একটা সত্যিকারের অর্থে বলা যায় যে ‘বাঙালি মুসলমানের ঘরে ফেরা’ এরকম একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন বদরুদ্দীন উমর, অনেক অর্থেই সত্য। আবার এখানে একটা দিকও বুঝতে হবে যে, পুরো বাঙালিত্ব কিন্তু কেবল বাঙালি মুসলমান দিয়ে তো হয় না। বাঙালি মুসলমানের ঘরে ফেরার কথা যদি বলি তাহলে ঠিক হিন্দু মুসলমান বিভাজন করলে, তাহলে বাঙালি হিন্দু তো ঘরেই ছিল। কিন্তু এই যে উভয়ের মিলন, যে অসাম্প্রদায়িকতা, সেটা কিন্তু ক্রমান্বয়ে জোরদার হতে শুরু করলো। ভাষা আন্দোলনটার দিকে যদি আপনি তাকান, ভাষার প্রশ্নের কথা যখন আমরা বলি, মাতৃভাষার অধিকার, তখন কিন্তু সেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টানের কোনো বিভাজন থাকে না। যারাই মায়ের পেট থেকে এই ভাষা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এই ভূখণ্ডে, সেই তখন এই মাতৃভাষার অধিকারী। ফলে মাতৃভাষার ওপর আক্রমণ যখন হয় তখন প্রতিরোধটা কিন্তু অসাম্প্রদায়িক। প্রকৃতিগতভাবেই অসাম্প্রদায়িক। ফলে এই ভাষা আন্দোলন থেকেই কিন্তু জাতীয় চেতনার উন্মেষ শুরু হলো। তারপর ‘৫৪-এর নির্বাচন, আরো অনেক ইতিহাস আমাদের। সেই অর্থে বললে আমরা ষাটের দশকে যখন পৌঁছালাম তখন কিন্তু অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। ’৫৪-এর নির্বাচনের বিজয়ে বাংলা একাডেমির জন্ম দিলো, অনেক রকমভাবে সাংস্কৃতিক জাগরণ সূচনা করলো। আবার ৫৮-তে সেগুলো সব রুদ্ধ করা হলো সামরিক শাসনে। আর সামরিক শাসনটা কিছুটা শিথিল হলো কিন্তু পীড়নটা চললো। যেমন ৬১-তে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন করতে দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধেই যে প্রতিরোধ, সেখান থেকেই ছায়ানটের জন্ম। কিন্তু পাকিস্তান আমলে এর কোনোটাই তো সহজ ছিল না। এবং ৬৫ সালেও কিন্তু নানা রকমভাবে পীড়নটা অব্যাহত ছিল, ৬৪ সালের দাঙ্গাটা একটা বড় ঘটনা হলো। যেটা আবার সমাজে ওই বিভাজন রেখাটাকে প্রকট করে তুললো। ৬৫-তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধটাও একটা উন্মাদনা তৈরি করলো। এইসবের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যেমন হলো দাঙ্গার বিরুদ্ধেও কিন্তু একটা জাগরণ হলো। সেখানে মানে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একটা বড় ভূমিকা পালন করলো। সাংবাদিকরা সেখানে বড় ভূমিকা পালন করলো। তখন যে পত্রিকাগুলো ছিল যে অবজার্ভার, সংবাদ, ইত্তেফাক, তিন সম্পাদক মিলে একটা যৌথ সম্পাদকীয় প্রকাশ করলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। এই আহ্বানের মধ্যেই কিন্তু আবার এই জাগরণের বীজমন্ত্র। ফলে তখন কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিরোধ, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ সমান্তরালভাবে চলেছে, পারস্পরিক হাতে হাত ধরে চলেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে তো আমরা ভিন্নতর পরিস্থিতিতে যাত্রা শুরু করলাম। আর নানা রকম সংকটও এখানে ক্রমে ক্রমে দেখা দিতে লাগলো। তো সেগুলোর দিকে না গিয়ে আমি যদি ৫০ বছরের অভিযাত্রাটা ভাবি, তাহলে কিন্তু কিছুটা বেদনাবোধ করতে হয়। পাকিস্তান তো ২৩ বছরের শাসন, কিন্তু আপনি অভিযাত্রাগুলো খুব চিহ্নিত করতে পারছেন। আর এই ৫০ বছরে আমরা দেখছি যে, বড় অর্জন, বড় মাইলফলক ঠিক ওরকমভাবে চিহ্নিত করতে পারছি না। সমাজটা অনেকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। অনেক ধরনের বিভাজন তৈরি হচ্ছে। সেটা ধনী-দরিদ্রের বিভাজন, সেটা শহর-গ্রামের বিভাজন, সেটা শিক্ষার সুযোগ, সুযোগহীনতার বিভাজন, সেটা শিক্ষা, গুণগত শিক্ষার সঙ্গে আর্থিক বিনিয়োগ জড়িত, যারা অধিকৃত নিম্নবিত্ত তাদের গুণগত শিক্ষার সুযোগটা আমরা সংকুচিত করে রাখছি। ফলে ওই জাগরণ তৈরি করতে হলে যেই ভূমিটা আমাদের দরকার, সেটা কিন্তু আমরা তৈরি করতে পারিনি বা রক্ষা করতে পারিনি। আবার কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে অনেক কিছু ঘটছে। বা ছোট ছোট উদ্যোগে অনেক কিছু ঘটছে। ফলে দুটো সময়কে মেলানো যায় না। দুটো সময় দুরকমভাবে তার চ্যালেঞ্জ, জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে। কিন্তু মূল তার তাগিদ থাকবে মুক্তি। চিন্তার মুক্তি, দর্শনের মুক্তি, মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রেও অগ্রসরতার জন্য মুক্তি, মুক্ত সমাজ, মুক্তির বহমানতা।
রাশেদ আহমেদ: এই যে বলছিলেন চিন্তার মুক্তি, দর্শনের মুক্তি। এখনকার পরিবেশে কি মুক্তচিন্তা করার অধিকার দেয়? আছে?
মফিদুল হক: আমাদের মুক্তচিন্তার জায়গাটা ক্রমান্বয়েই সংকুচিত হচ্ছে। আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করেছি বলছি, প্রবেশ করার জন্যে তো আমার সংবিধান, আমার সমস্ত কার্যক্রম সেখানেও উত্থান-পতন আছে। কিন্তু গণতন্ত্রে মানুষের যে বাকস্বাধীনতা, সেটা কিন্তু নেই। এখনো সহনশীল সমাজ হয়ে উঠেনি। আর তার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে অদূরদর্শিতা, রাজনীতিকরা আশু সুবিধার জন্যে অনেক সময় প্রলুব্ধ হন। আর চিন্তার মুক্তি মানে তো আমাকে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হতে হবে। ভিন্নমতের প্রতি আমাকে মানে তার যেমন পরিসর তৈরি করতে হবে, তেমনি তার কথাগুলো আমাকে শুনতে হবে। আমি গ্রহণ করি বা বর্জন করি সেটা অন্য বিষয়। তো সেই জায়গায় আমাদের তো সমাজটাই এখন অনেক বেশি অসহিষ্ণু। আমরা দেখছি যে বিশেষ করে যদি কয়েক বছর ধরি, যেই আকুতি নিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনটা হয়েছিল, সেটা তো এই মুক্তিরই আকুতি। সেটা বারবারই সেখানে আসছে। কিন্তু সেটা আমরা যদি বাস্তবের সঙ্গে মেলাই, তাহলে দেখবো যে এই পরবর্তী সমাজটা বা জীবনধারা বা রাজনৈতিক পরিক্রমণ বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে, সেটা একটা ফাঁক তৈরি করেছে। এবং মুখে একটা কথা হচ্ছে, কিন্তু ভূমিতে আবার আরেক বাস্তবতা। তার সঙ্গে অনেক কিছু এখানে যুক্ত হচ্ছে। এই যে মব কালচার বলে একটা কথা, যে মব তো আর কালচার হয় না, যে গোষ্ঠীগত উগ্রতা। মানুষকে সাময়িকভাবে উত্তেজিত করে অপরকে আঘাত করা। আর এই অপরকে আঘাত করাটা এখন অনেকভাবে প্রসারিত হচ্ছে। সেটা দুঃখজনক। ফলে ওই সময়ের সঙ্গে যদি তুলনা করি এই সময়টা অনেক জটিল। এই সময়ে মানুষের আকুতিও কিন্তু, বা চাহিদাও কিন্তু অনেক বেড়েছে। আবার অধিকারহীনতাও অনেক মানে বেড়েছে। ফলে সব মিলিয়ে আমি বলবো যে এটা ভিন্ন সময়। কিন্তু মূল যে বাণী যে আমরা একটা গণতান্ত্রিক মুক্ত সমাজ চাই, যেখানে সকল মানুষের বিকাশের সুযোগগুলো উন্মুক্ত হবে।
রাশেদ আহমেদ: এই যে অপরকে আঘাত করা, সাধারণত দেখা যাচ্ছে যে ভিন্ন কথা যারা বলে, মুক্তচিন্তার কথা যারা বলে, তাদের উপরেই কিন্তু আঘাতটা বেশি হয়। এই যে উগ্রবাদীতা, এই ভূমিটা চাষ হলো কীভাবে?
মফিদুল হক: দেখুন এই প্রশ্নটাই আসলে অনেক গভীরভাবে তলিয়ে দেখার আছে। এবং আপনি যে কথাটা বলছেন ওর মধ্যে কিন্তু একটা ইঙ্গিত রয়েছে। ভূমিটা চাষ হলো কী করে? একটা ভূমি কিন্তু কর্ষিত হয় অনেক পরিশ্রমে, অনেক সময় নিয়ে। আমি যখন ফসলটা দেখি তখন সেটাই কিন্তু একমাত্র দিক নয়। এবং চাষী যখন মাঠে কাজ করে তখনও তো অনেক বাধা আসে। খরা আসে, বন্যা আসে, নানারকম জটিলতা তৈরি হয়। তো এই যে ভূমিটা চাষ করা বা কর্ষণ, সংস্কৃতিটাও তো এক অর্থে কৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ যে বলতেন এটার সঙ্গে কর্ষণটা যুক্ত। এই চর্চাটা কিন্তু আমরা নানাভাবে অবহেলা করেছি। বিশেষ করে বলবো যে আমরা যখন প্রতিরোধের জায়গায় ছিলাম পাকিস্তানি আমলে, তখন কিন্তু এটা অনেকভাবে চর্চিত হয়েছে। আমরা হয়তো মানে বৃত্তটা ওই রাষ্ট্রীয় শক্তিটা অর্জন করেনি, কিন্তু রাষ্ট্রশক্তির বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল। আর সেখান থেকে অনেক কিছু আমরা পেয়েছি। অনেক সৃষ্টিশীলতার পরিচয়, বলবো যে খুবই সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের দেখা আমরা পেয়েছি, যারা আমাদের শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতিকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তো তার সঙ্গে কিন্তু যখন শিল্পের কথা বলেন, সংস্কৃতির কথা বলেন, সেটা কিন্তু মিলনের কথা বলে। এবং সেইখানে উগ্রবাদীতার যে জায়গা ছিল বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতাকে, সেটা মোকাবেলা করেই তো এই বাংলাদেশের বিকাশ। বাংলাদেশের জাতিসত্তা, যেটার একেবারে সারাৎসারে যদি বলি যে, এটাও তো সাধারণ মানুষই একটা সংজ্ঞায়িত করেছিল, সেই আমাদের তো এখন বিস্মিত হতে হয় যে ওই সময়ে রাজপথে যে স্লোগানগুলো দেওয়া হতো... একটা স্লোগান কে প্রথম চালু করলো আমরা কেউ জানি না।
রাশেদ আহমেদ: আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, এই যে বাংলার বাউল গান, এই গানটার উৎস কোথায়?
মফিদুল হক: উৎস ওই যে আপনি বললেন, জমিন। এবং বাউল গানেও দেখবেন যে ভাঙাগড়ার কথা অনেক থাকে। আর জীবনকে খুব বড়ভাবে দেখা। নদীতীরের মানুষ জানে যে তার জীবন অনিত্য। এই আছে এই নেই। এই দেখিলাম সোনার ছবি, এই দেখি নাই গো। কিন্তু সে তো এটার মোকাবেলা করছে। ফলে আমার মানসের ভেতরেও কিন্তু একটা সাদৃশ্য তৈরি হচ্ছে। এই সব মিলেই তো বাঙালিত্ব। এটা তো মানে এই বাঙালিত্ব, পশ্চিম বাংলার বাঙালিত্ব, বিভাজন কী, পার্থক্য কী, মুসলমানের কতটুকু অবদান সেটা... এটা সকলে মিলে অবদান। নানা রকমভাবে এটা রচিত হয় এবং এখনো রচিত হয়ে চলার পথ উন্মুক্ত আছে। এখন আমরা সেটা কি নষ্ট করবো? নাকি সেটাকে আমরা আমানত হিসেবে প্রসার ঘটাবো? তো ফলে এই যে বলছেন, এটা কবে ঘটলো? সমাজের দিকে তাকালে তো দেখবো যে নানারকমভাবে এটা ঘটে। এটার একটা দীর্ঘ লড়াইও আছে এই উপমহাদেশে। আমি যতই মিলনের কথা বলি সাম্প্রদায়িকতা তো এখানে বারবার মাথাচাড়া দিয়েছে। আবার মিলনের আদর্শও এখানে জায়গা করার চেষ্টা করেছে। এই নিয়েই তো লড়াই। তো এই লড়াইটা আমরা মনে করেছিলাম যে স্বাধীন বাংলাদেশে এর একটা নিরসন ঘটাতে পেরেছি। আমার সংবিধানেও সেটার প্রতিফলন ছিল।
রাশেদ আহমেদ: স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাটা তো ছিল যে আমরা স্বাধীন হবো, তখন আর কোনো সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। যে কথাগুলো বললেন আমরা বাঙালি। আমার বাঙালি সংস্কৃতি থাকবে। ধর্ম যার যার জায়গায় থাকবে। এটাই তো ছিল?
মফিদুল হক: হ্যাঁ, এককথায় যদি বলেন, বাঙালি বাংলা শাসন করবে। তো বাঙালি যখন বাংলা শাসন করবে, তখন তো বাঙালিই করবে। তো সেই বাঙালির মধ্যে তো ধর্মীয় বিভাজন মূখ্য নয়। আমার জাতিসত্তাটা কী? আমার জাতিসত্তা হচ্ছে আমার এই ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, গাঙ্গেয় বদ্বীপ যদি বলি, আর তার সঙ্গে ভাষাভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক ঐক্য। দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় একটা নৃতাত্ত্বিক ঐক্যও তৈরি হয়েছে। তো এটা সহজাত একটা উপলব্ধি ছিল। সেটা সংবিধানেও প্রতিফলিত হয়েছে। বাস্তবে সেটার প্রয়োগে কোথায় ঘাটতি হয়েছে, কোথায় ব্যর্থতা, কোথায় সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেগুলো কিন্তু খুব চুলচেরা বিশ্লেষণের আছে। আর তার সঙ্গে দেখবো রাজনৈতিক ঘাত প্রতিঘাতে এগুলোকে কোনো কোনো সময় রাজনৈতিক শক্তি ধর্মটাকে ব্যবহার করেছে। অপব্যবহারই বলবো। এটা খুব বড় প্রবণতা হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানিরাও ধর্মকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটা তো আমরা মোকাবেলা করেছি। আজকে অনেক সূক্ষ্মভাবে এবং অনেক গভীর স্বার্থ নিয়ে ধর্মকে যখন ব্যবহার করা হয়, সেটা কিন্তু আজকে আমার মধ্যে বিভাজন তৈরি করে। পাকিস্তানিরা যেটা করতে চেয়েছিল আমি কিন্তু জাতীয় সত্তা নিয়ে সেই বিভাজনকে অতিক্রম করেই তাদের মোকাবেলা করেছি। আজকে কিন্তু আমার এই জাতিসত্তার যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর স্বদেশের প্রতি আমার যে সংযুক্তি তার থেকে যে দায়বোধ, সেটাকে নিয়েই অগ্রসর হতে হবে। মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু মৌলিক জায়গায় একটা ঐকমত্য থাকবে। সেটা আমরা মনে হয় এখনো তৈরি করতে পারিনি।
রাশেদ আহমেদ: একটা প্রশ্নের মীমাংসা কেউ করতে চায় না, সেটা হলো জাতি আগে, না ধর্ম আগে? আমাদের এই বিভেদটা অনেক বেশি।
রাশেদ আহমেদ: আমি বলতে চাচ্ছি যে আমাদের জাতির উপরে ধর্মকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মফিদুল হক: না না সেইজন্যই বলছি আপনি বলছেন এই যে দ্বন্দ্বটা, এই দ্বন্দ্বটা তো আমি কোথাও দেখছি না। আমরা এই দ্বন্দ্বটাকে অনেকভাবে তার মানে কি আমরা এটা কৃত্রিমভাবে করছি।
রাশেদ আহমেদ: স্বার্থের জন্য কি করা হচ্ছে?
মফিদুল হক: মীমাংসা যদি খুঁজতে চান, নিশ্চয়ই এটা হয় কি যে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা। ধর্মকে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করা। আর সেখানেই অমানবিকতা চলে আসে। আমি যখন গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ে আগাই, তখন কিন্তু মানবসত্তার দিকে তাকাই না। আমি বরং চেষ্টা করি যে এই গোষ্ঠীসত্তাকে ঐক্যবদ্ধ করতে হলে অপর গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়াতে, সে আমার ক্ষতি করছে, সে আমার প্রতিপক্ষ, সে আমাকে নানাভাবে আমার কুঁড়ে কুঁড়ে বিনষ্ট করছে আমার ভিত্তি, এরকম একটা ইমেজ দাঁড় করানো হয়। তার মধ্যে থেকে গোষ্ঠীস্বার্থটাকে বড় করে তোলা হয়।
একটা অসাধারণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন ১৯৪৮ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। যে পাকিস্তান হয়েছে, তখন ভবিষ্যতকে কীভাবে আমরা নির্ধারণ করবো, কীভাবে পথ চলবো। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল। মুসলিম লীগের এক অংশ উদার চিন্তার মানুষও তো ছিলেন, হাবীবুল্লাহ বাহার ছিলেন, অন্যরা ছিলেন, তারা একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একটা বামপন্থী ঘরানার এই অজিত কুমার গুহ, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তিনিও এটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তো সেখানে মোটামুটি বিদ্বৎসমাজের সবাই যুক্ত হয়েছেন। কার্জন হলে তিনদিনের সম্মেলন হয়েছিল।
রাশেদ আহমেদ: বিরোধের জায়গাও না এটা।
মফিদুল হক: বিরোধের কোনো জায়গা নেই। এবং সেটা ধরেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তো বহুভাষাবিদ পণ্ডিত এবং ইসলামী শাস্ত্রে তো অত্যন্ত পারঙ্গম একজন ব্যক্তি। নানারকম গ্রন্থ অনুবাদও করেছেন। নিষ্ঠাবান মুসলমান তিনি। এবং তিনি যখন এই কথাটা বলেন তখন আমার মনে হয় যে এই কথাটার তাৎপর্যটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করা উচিত। একটু কান পেতে এই বাণীগুলো শোনা উচিত। জাতিসত্তার সংস্কৃতিতে যদি যাই তাহলে দেখব, এর নানারকম রিফ্লেকশন আছে। এটা মানুষের সহজাত। মানুষ তো প্রকৃতির সন্তান। মানুষ তো একক সত্তা, আবার সে মহাবিশ্বের অংশ। এই চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারকা- এই সবকিছুর মধ্যেই তার অস্তিত্ব। এই অস্তিত্বটাই কিন্তু ধর্মের খুব সুন্দরভাবে তাকে এই অস্তিত্বের সার্থকতা কোথায়, সেখানে যে সদর্থক যে মূল্যবোধগুলো, সেখানে মানবসমাজের ঐক্য এই সবকিছুই তো মেলে ধরে। ইসলাম তো আরো সুন্দরভাবে একটা শান্তির ধর্ম হিসেবে এটা তুলে ধরে। তো সেখানে যারা বিকৃতি ঘটায়, যারা এর গভীরতাটা অধ্যয়নের দিকে না গিয়ে বরং এটাকে ব্যবহার করে আমি কী করে অপরকে আঘাত করতে পারি, সহিংসতা প্রচার করতে পারি? আপনি দেখবেন কেবল অন্য ধর্ম নয়, এখন নিজ ধর্মের মধ্যেও আমরা ফারাক তৈরি করছি। ফারাক তৈরি করতে চাইলে তো কতরকমভাবে করা যায়। কেন, মানুষ তো বৈচিত্র্যময় সত্তা। আর মানবজাতি যদি বলি এটা একটা মোজাইক। বহুরকম রঙ এসে মিলে এটা গঠিত হয়। তো ফারাক ধরলে তো নিজ ধর্মের মধ্যেও ফারাক যেমন তৈরি হয়। শিয়া সুন্নি, কাদিয়ানি, নানারকম ফারাক। এই আচার ওই আচার এবং আমি মানে নিজ নিজ ধর্ম পালনের চাইতেও অপরকে ধর্ম দিয়ে আঘাত করা, এটা তো একটা মূঢ়তার প্রকাশ। তো এটার সঙ্গে তো ধর্মের কোনো যুক্ততা নেই। বরং ধর্মের অবমাননা হয়। ধর্ম যখন এই রক্তপাত ঘটায়, ধর্ম যখন অপরের মত যদি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তো আমি তো মত দিয়েই সেটার মোকাবেলা করব। আর সেখানেও যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করার কথা, সেটা করা হয় না। ধৈর্য, সহনশীলতা এবং ইসলামের ইতিহাসে তো অসংখ্য উদাহরণ আছে যে... খুব বিখ্যাত কবি, আরবি ভাষায় তো খুবই বড় কবি ইমরুল কায়েস এর কথাই বলা যায়, তিনি তো ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলেন না, কিন্তু রসুলও তার কবিতাকে মূল্য দিতেন এইজন্য যে সেই কবিতার মধ্যে যে শব্দের ঝংকার, কবিতার মধ্যে মিলের যে শক্তি সেটাও তো আমাকে বুঝতে হবে, জানতে হবে। আর আমি তার যেখানে অমানবিক বাণী, যেখানে অন্ধতার প্রচার হচ্ছে সেটা তো আমি মোকাবেলা করবই। আলো দিয়ে, জ্ঞান দিয়ে, প্রজ্ঞা দিয়ে। আর এটাই তো মানে যে মানব অস্তিত্বের একটা বড় বৈশিষ্ট্য।
রাশেদ আহমেদ: ইদানিং একটা জিনিস লক্ষ্য করবেন যে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল ইসলামকে দুই পক্ষ আলাদা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা দুইজনই তো ধর্মের আগে মানুষ, এই কথাই কিন্তু সবসময় লেখালেখিতে বলে গেছেন। কিন্তু এখন দুইজনকে আলাদা করা হচ্ছে, একজন হিন্দু আরেকজন মুসলমান...
মফিদুল হক: দেখেন, দুজনই কিন্তু এক অর্থে বহুত্ববাদী। একসময় পূর্ব বাংলায়, সর্বধর্মবাদী একটা গোষ্ঠী ছিল। এখনো আছে কিছু কিছু; তারা অনেকটা ব্রাহ্ম সমাজের প্রভাবিত বলা যায়। সঙ্গীতের মধ্য দিয়েই তাদের উপাসনা। আর এই সঙ্গীতে যে বাণীগুলো সেটা সবসময়ই খুব ভালো।অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশ, আলোকিত কর- এরকমই সেই বাণী। রবীন্দ্রনাথ তো আনুষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না। তার ধর্মবোধটা অনেকটা যে মহাজীবনের কথা তিনি বলেন, একটা মহাসৃষ্টির কথা বলেন, তো সেটা আধ্যাত্মিকতা দ্বারা খুবই আপ্লুত। আর কাজী নজরুল ইসলাম, তিনি নিজ ধর্মটাকে তার সারসত্তায় এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন যে, অপর সত্তা বিচরণে তার কোনো অসুবিধা বা বিঘ্ন ঘটেনি। ফলে তিনি যেসব ইসলামী গান লিখেছেন, আপনি দেখবেন যে এই গানগুলো যদি গভীরভাবে দেখি তাহলে জাগরণের গান। ইসলামের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী যে উপাদানগুলো আছে, বা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যে আহ্বান আছে, সেগুলোকে তিনি আলিঙ্গন করেই এই গানগুলো লিখেছেন। প্রত্যেকটা গানেই আপনি দেখবেন। বা এমনকি নারী জাগরণের গানও দেখবেন। বিবি খাদিজাকে তিনি যেভাবে চিত্রায়িত করেছেন, যিনি প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি একজন নারী। সেই হিসেবে যে নারীকে, নারীর সত্তাকে তিনি কিন্তু অনেক উঁচুতে স্থান দিলেন। এবং তার জীবনের আরো অনেক ঘটনা নিয়ে। আবার যখন শ্যামাসঙ্গীত লিখছেন, তখন কিন্তু আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ধরিনি যেটা শ্যামাসঙ্গীত, সেটাও কিন্তু জাগরণের গান। শ্যামাসঙ্গীত হচ্ছে একটা শক্তির আরাধনা। আর এই গানটাকে তিনি কিন্তু নিয়ে গেছেন বিশেষ করে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শক্তির... সেটা বিদ্রোহী কবিতায় আপনি দেখেন। এটা ছত্রে ছত্রে কিন্তু এই দুই ধর্মের এই উপাদানগুলো এসে ওখানে মিলেমিশে গেছে। ফলে এরা যেই উচ্চতায় বা যেই গভীরতায় বিচরণ করেছেন, সেটা বুঝলে তো এমন ফালতু পার্থক্য করা যায় না।
রাশেদ আহমেদ: এটা করে কী হচ্ছে? উগ্রবাদীরা এটাকে নিয়ে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চাচ্ছে।
মফিদুল হক: দেখুন এর মোকাবেলা করতে আপনার হাতে তো সেই অস্ত্রটা রয়েছে। যে সত্য এবং সুন্দর। রবীন্দ্রনাথ নজরুল সম্পর্কে এমন একটা সৌন্দর্য রয়েছে যেটা পল্টন থেকে নজরুল ফিরলেন ১৯১৯ সালে। করাচি থেকে ট্রেনে একটা বিশাল যাত্রা। পুরা ভারতবর্ষ অতিক্রম করে সেটাও একটা অভিজ্ঞতা। আর সেখানে তার পল্টন জীবনটাও একটা অভিজ্ঞতা, তার আগের জীবনটাও যে দুঃখময় জীবন সেখানে আবার গান কীভাবে জড়িত ছিল, সবমিলিয়ে তো একটা স্বশিক্ষিত একজন যুবক। আবার টগবগে যুবক। বিদ্রোহী সত্তাটা তো তার ভিতরে রয়েছে বলেই পল্টনে গিয়েছিলেন যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রয়োজন হবে এবং সেটা শিখতে হবে। তো পল্টন থেকে যখন ফিরলেন তখন বলা হয় যে তার ঝুলিতে, একটা বিশাল অভিজ্ঞতা জমেছে, সেখানেও তিনি ফার্সি অধ্যয়ন করেছেন, নানা জাতির মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে পল্টনে, তো ভারতবর্ষের বহু জাতিসত্তার মানুষ মিলেই পল্টন। আর তার ঝুলিতে ছিল দুটো বই। কিতাবই বলতে পারি। একটা হচ্ছে হাফেজের দেওয়ান। দেওয়ানে হাফেজ। আরেকটা হচ্ছে গীতাঞ্জলি।
রাশেদ আহমেদ: আপনি কত সালের কথা বলছেন?
মফিদুল হক: এটা হচ্ছে ১৯১৯ সালের শেষে তো পল্টন ভেঙে তিনি ফিরলেন আরকি। ১৯ সালের শুরুর দিকে তারপরে তো ১৯ সালের শেষে, ২০ সালেই বলা যায় বিদ্রোহী কবিতা লিখলেন। প্রকাশ হলো ২০ সালের জানুয়ারিতেই সম্ভবত। লিখলেন তিনি ১৯১৯ সালের শেষে। সেখানেও কিন্তু আমরা ওই একটা প্রতিফলন দেখি অসাধারণভাবে। অনুষঙ্গগুলো নিয়ে এসছেন, উপমাগুলো নিয়ে এসছেন নানা ধর্ম থেকে। বৈশ্বিক উপমাও নিয়ে এসছেন। যে আমি ভীম ভাসমান মাইন। ভীমের সঙ্গে মাইনের তো কোনো যোগসূত্র নেই। একটা পৌরাণিক, আরেকটা আধুনিক। মাইন শব্দটা কবিতায় যে ব্যবহার করা যায় এটাও কিন্তু অভিনব, কী চমৎকারভাবে তিনি এই গাঁথুনিটা তৈরি করলেন। ফিরে এসে প্রবল প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ধূমকেতু পত্রিকা অর্ধ-সাপ্তাহিক তিনি সূচনা করলেন। আর রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ কামনা করলেন। তখন কত তার বয়স, ১৯২২ এ যদি ধরি, ২৩ বছর বয়স। কবিতা লিখেছেন, কবিতা নানারকম ভাবে লিখছেন। এরকম একটা একেবারে নবীন যুবককে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা সুন্দর আশীর্বাদ বাণী দিলেন। যেটা তার পত্রিকা অর্ধ-সাপ্তাহিক, প্রতি মাস্টহেডে ছাপা হতো যেটা পত্রিকার শিরোনাম যেটা বলা হয়। যে “আয় চলে আয় রে ধূমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু”। তো এই যে নজরুলকে তখনই রবীন্দ্রনাথ যেভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, সেতুবন্ধন তো আমরা বলি নানাভাবে কিন্তু ‘অগ্নিসেতু’ বললেন রবীন্দ্রনাথ। এটা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মহিমাও প্রকাশ করে আর নজরুলের শক্তিময়তাও প্রকাশ করে, যে সম্ভাবনাটা রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন। আর নজরুল যে কাজ করছেন সেটা একটা অগ্নিসেতু তৈরি করার কাজ। এটা খুব সহজ কাজ না। তারপরে বলছেন, “জাগিয়ে দে রে চমক মেরে, আছে যারা অর্ধচেতন”। তো আমার কাছে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের তো একটা কৌতুকপ্রিয়তা বা পরিহাসবোধও ছিল। ভাই এই যে তিনি মিলিয়ে দিলেন ধূমকেতুটা অর্ধ-সাপ্তাহিক। আর তিনি আবার বললেন যে, “চমক মেরে জাগিয়ে দে যারা অর্ধচেতন আছে”। অচেতনও বলতে পারতেন, অন্য কিছু বলতে পারতেন। কিন্তু অর্ধসাপ্তাহিকের সঙ্গে যে অর্ধচেতন কথাটা আবার খুব মিলে যায়। তার অর্থ কি যে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের একটা আত্মিক সম্মেলন হয়ে গিয়েছিল তখনই। রবীন্দ্রনাথ তো তখন নোবেল বিজয়ী মহাখ্যাতিমান একজন ব্যক্তি। তারপরে ধূমকেতুর কারণেই তো নজরুল জেলে গেলেন। কারাগারে নজরুলের ওপরে খুবই পীড়ন, রাজবন্দী মর্যাদা দেওয়া হয়নি, নানারকমভাবে অত্যাচার করা হচ্ছে। তিনি অনশন করলেন। সবাই খুব চিন্তিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টেলিগ্রাম পাঠালেন। যে, “Give up hunger strike. Our literature claims you”. আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়, তুমি অনশন ভঙ্গ করো। নজরুলকে তখন প্রেসিডেন্সি জেল থেকে বহরমপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর ব্রিটিশরা টেলিগ্রামটা ফেরত পাঠালো যে ‘প্রাপককে পাওয়া যায়নি’। কারণ ওইটা প্রেসিডেন্সি জেলে পাঠানো হয়েছিল। ওরা তো জানে বন্দী কোন জেলে আছে। নিয়ম হচ্ছে সেখানে ফরোয়ার্ড করে দেওয়া। এটাকে ডেড টেলিগ্রাম বানিয়ে ফেরত পাঠালেন। কিন্তু নজরুলের কাছে তো বার্তাটা পৌঁছেছিল। আর তখনই নজরুল অনশন ভঙ্গ করলেন। আর তখনই রবীন্দ্রনাথ বসন্ত নাটকটা লিখলেন। আর নাটকটা প্রকাশ পেল, রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ করলেন ‘শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু’। তো তখন ২৪-২৫ বছর বয়সের একজন কবি, রবীন্দ্রনাথ যে এরকম কোনো অনুজকে তার বই উৎসর্গ করেছেন যার সামনে জীবনটা সামনে রয়ে গেছে, এটার কিন্তু দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। তো এইটাকে আমরা কী বলবো? কি অসাধারণ একটা মিল। আবার ২২শে শ্রাবণ ১৯৪১, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের সময় নজরুল তো তখন আকাশবাণীতে ট্রেইনার হিসেবে কাজ করছেন। আকাশবাণী ধারা বর্ণনা দিবে তখন। রবীন্দ্রনাথের শেষকৃত্য সব যাত্রার। আর নজরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হলো যে এই অনুষ্ঠানটাতে উপযুক্ত গান কবিতা দিয়ে একটা চাংক তৈরি করা। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পড়লেন। ‘রবিহারা’ নাম দিয়ে তিনি একটা কবিতা লিখলেন, সেটাকে গানেও রূপান্তর করলেন। তিনি গাইলেন, দুজন সহশিল্পী ছিল, দুই নারী কণ্ঠ। এটা এখনো ইউটিউবে পাওয়া যায়, খোঁজ করলে। নজরুলের সেই কণ্ঠ, সেই উদাত্ত কণ্ঠ। আর তার সঙ্গে এই যে ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে... এই কথা দিয়ে যে তাকে আর জাগাইয়ো না। যে গোটা জাতির পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানালেন কিন্তু যদি ওই অর্থে বলি তাহলে কাজী নজরুল ইসলাম।
রাশেদ আহমেদ: ‘ঘুমিয়ে গেছে শান্ত হয়ে...আমার গানের বুলবুলি’ এটা তো তার ছেলের...
মফিদুল হক: ছেলের। না ঘুমিয়ে... এটা ছিল কথাটা এমন ছিল যে ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত কবি’। হ্যাঁ। তারে আর জাগাইয়ো না।
রাশেদ আহমেদ: একটু অন্যভাবে ওইটা আবার...
মফিদুল হক: হ্যাঁ ওই গান না ঠিক। কিন্তু ওইটা মৃত্যুর প্রসঙ্গই। কিন্তু তিনি দীর্ঘকাল তার জীবন সাধনার মধ্যে দিয়ে আমাদের যা দিয়ে গেছেন সেটা নিয়ে যেন আমরা অগ্রসর হই, এরকম হয়েছে। মানে গানটার মধ্যে একটা গভীরতা আছে কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে লেখা। সবচেয়ে বড় কথা আমার মনে হয় যে, একেবারে যৌবনের শুরুতে তাদের একটা সংযোগ। আর রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণে তাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর জন্য যদি বলি সেটার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সেটা অসাধারণভাবে করেছেন। তার একবছর পরেই কিন্তু নজরুল বাকরুদ্ধ হয়ে যান, তিনি অসুস্থ হয়ে যান।
রাশেদ আহমেদ: কিন্তু এখন দেখেন, কী আশ্চার্য! যে দুজনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়। বিরোধ বাঁধানোর চেষ্টা করা হয়।
মফিদুল হক: হ্যাঁ, আপনি সবকিছুকে দেখবেন, এটা কি ক্ষুদ্রতার দিকে নিয়ে যায় না বৃহত্বের দিকে আমাকে হাতছানি দেয়। এটাই হচ্ছে আপনার লিটমাস টেস্ট। লিটমাস পেপার বলেন। এটা দিয়ে বিচার করেন তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন। ঢাকাতে ১৯২৬ সালে কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন প্রথমবারের মতো। আর ঢাকাতে রবীন্দ্রনাথও এসেছিলেন ১৯২৬ সালে। রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন ফেব্রুয়ারি মাসে। নজরুল এসেছিলেন সম্ভবত জুন-জুলাই মাসে। তো রবীন্দ্রনাথকে ঢাকাতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাকে ডি-লিট উপাধিতে সম্মানিত করবে। কার্জন হলে সেই অনুষ্ঠানটা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ১৯২৬ সালে তারা প্রথম ডি-লিট দেওয়ার কথা যখন তারা চিন্তা করলেন, অনেক ভাবনা চিন্তা করে মনে করলেন যে সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাপ্য। তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরূপতা ছিল না সৌহার্দ্য ছিল? পারস্পরিক সংযোগটার প্রকৃতি কী ছিল, এটা সেই ঘটনা দিয়েই বোঝা যায়। এখানে তো কোনো সময়ই এই প্রশ্নটা অতীতে ওঠেনি, ওটার মধ্যে আমি যেতে চাই না। যে ওটা মানে গবেষণা করলে বেরিয়ে যায়, কোন সালে কোথায় কী হয়েছিল। এটা নিয়ে কাজও অনেক আছে। মূল কথা হচ্ছে যে আমরা বিদ্বেষের বাণী প্রচার করতে চাই না, আমরা মিলনের কথা বলতে চাই। তার সঙ্গে অবশ্যই চলে আসে যে আমরা বিদ্বেষের জন্যে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিব? আর আমরা যদি বলি যে সম্প্রীতির জন্যে তো আমরা সত্যের আশ্রয় নিব। তো এই সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব নিয়েই জীবন। আর এই দ্বন্দ্ব চলবে কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে এটা যখন জাতীয়ভাবে উঠে আসে সমাজের সাম্প্রদায়িক ঘৃণা বিদ্বেষের ভাণ্ডটাকে আরো হলাহল যুক্ত করতে। মানে ওই যে বলে বেদনায় ভরে গিয়েছে পেয়ালা। আমার তো হিংসা বিদ্বেষের বিষে পেয়ালা ভরে যাচ্ছে, উপচে পড়ছে। সেটা তো আমাকে নষ্ট করে দিবে মানবসত্তা হিসেবে। যিনি এটা প্রচার করছেন তিনিও কিন্তু বিনষ্টের দিকে যাচ্ছেন। এবং এখানে আরো মনে হয় যে নজরুল যে ঢাকায় আসলেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের আমন্ত্রণে, যাদের শিখা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যথার্থভাবেই। তারা তো চেয়েছিলেন যে বুদ্ধির মুক্তি, এটাই ছিল তাদের মূল বাণীমন্ত্র। যে ‘জ্ঞান যেখানে বন্দী, চিন্তা যেখানে অবরুদ্ধ, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। এটাই ছিল তাদের মাস্টহেড, শিখা পত্রিকার শিরোনামে লেখা থাকতো। এবং শিখার বার্ষিক সম্মেলন হতো। শিখার বিভিন্ন অধিবেশন হতো। আর সেসব অধিবেশনে কিন্তু শুরুতে সঙ্গীত পরিবেশন করা হতো। এটা তখন একটা রীতিও ছিল। এমনকি রাজনৈতিক সভা সমাবেশেও আমাদের দেশেও আমরা ষাটের দশকে দেখেছি অনেক সময় গান দিয়েই হয়তো সভার কাজ শুরু হতো। বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা ঘোষণা করলেন চট্টগ্রামের পোলোগ্রাউন্ডের বিশাল জনসভায়, তিনি প্রকাশ্যে সেটা মানুষের সামনে তুলে ধরলেন। তখন কিন্তু তারই একটা নির্দেশ ছিল চট্টগ্রামে যারা গণসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন তারা তখন সমবেতভাবে ওই গানটা গাইলেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’। ছয় দফা ঘোষণাটা ওই সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
রাশেদ আহমেদ: ৬৬ সালে এটা?
রাশেদ আহমেদ: কোন জায়গায় করলেন এটা?
মফিদুল হক: সম্মেলনটা কোথায় হয়েছিল সেটা একটু দেখতে হবে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই হতো এসব আয়োজন। যেহেতু শিখা গোষ্ঠীর যারা ছিলেন আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন তারা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন অধ্যাপক, মানে প্রশিক্ষক বলা যায়। কাজী মোতাহার হোসেন তো ডেমোনস্ট্রেটর ছিলেন তখন।
রাশেদ আহমেদ: বাংলাদেশের অভ্যুদয় কিন্তু বিকাশের পথে, মুক্তির পথে এটা বলা যায় যে বড় একটা বাধা অতিক্রম করে জাগরণ হলো। সেই বাংলাদেশ যদি আজকে এই ক্ষুদ্রতা, মূঢ়তা, ধর্মান্ধতা, সেটাকে সামাজিক জীবনে রাজনৈতিক জীবনে নিত্য আমরা প্রয়োগ করতে থাকি, একদিন কিন্তু এর বিরুদ্ধে জাগরণ হবে। এই যুগটা হয়তো ইতিহাসে বর্বর যুগ হিসেবে চিহ্নিত হবে। আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন ইদানিং। নৌকা বাইচের মতো সাংস্কৃতিক কালচার সেটা হতে দেওয়া হচ্ছে না। তারপর বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান হতে দেওয়া হচ্ছে না। ইভেন সিনেমা প্রদর্শন সেটিও করতে দেওয়া হচ্ছে না।
রাশেদ আহমেদ: যারা বাধা দিচ্ছে, যারা গান করতে দিচ্ছে না, নৌকা বাইচ করতে দিচ্ছে না, ছবি প্রদর্শন করতে দিচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কিন্তু তাদের প্রতিহত করা হচ্ছে না।
মফিদুল হক: দেখুন দুর্ভাগ্য তো সেইখানেই। আমি ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করি। তখন কিন্তু আমি নিজে ধার্মিক থাকি না। কিন্তু আমি ধর্মের বুলিটা তখন আবার খুব জোরে আওড়াতে থাকি। আমি জানি তো আমি কী করছি। আর এটা ধর্মীয় বিবেচনায় যুক্তিসিদ্ধ বা যুক্তিসিদ্ধ কিনা এই প্রশ্ন আর তখন তোলা হয় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা তো এখন সার্বজনীন হয়ে গেছে। এটা যে কেবল বাংলাদেশের বিষয় তা নয়। আপনি ভারতের দিকে তাকান সেখানে দেখেন হিন্দুত্ববাদকে এখন আবার রাজনৈতিকভাবে কত রকমভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, মানে সাংস্কৃতিকভাবে। আমাদের এখানেও সেটা ঘটছে। পশ্চিমের দিকেও বা আমেরিকাতেও দেখেন একটা যে নিউবর্ন খ্রিস্টান বলে যে সেটাকে নিয়ে। বা আপনি আজকে ইসরায়েল রাষ্ট্রটা দেখেন। যে ওই সময়ে ৪৭ সালে পাকিস্তান হলো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র আর ইসরায়েল হলো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। এই দুই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কিন্তু তার নিজ জনগণকে প্রায় উৎখাতের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। পাকিস্তান তো ধর্মের নামেই প্রতিষ্ঠা পেলো, যে পাকভূমি, হোমল্যান্ড ফর দা মুসলিমস অফ ইন্ডিয়া। তারাই কিন্তু একাত্তরে এখানে ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করলো। যার সিংহভাগ মুসলমান। তো এটা তো মুসলমানদের দ্বারাই মুসলমান হত্যা হয়েছে বিশ শতকের ইতিহাসে। তো সেটা তো আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। আমরা যখন যে ধর্মের কথাটা যখন বলবো তখন ধর্মকে কীভাবে এই রসাতলে নিয়ে যায় যেখানে এক ধর্মের মানুষ অপর ধর্মকে উৎখাত করে দিচ্ছে দ্বিধাহীনভাবে। কেন? যে তারা প্রকৃত মুসলমান না। তারা হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত। তাদের ভাষা সংস্কৃত ঘেঁষা। তো এরকম বর্বরতা তো আসলে এই সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়। সেজন্য আজকে যে বর্বরতাগুলো সেটা খুব মানে শংকিত হওয়ার বিষয় আছে। যে এটা এখানে থামবে না যদি না এটার মোকাবেলাটা আমরা করতে না পারি।
রাশেদ আহমেদ: আবার একটা জিনিস দেখবেন যখন মক্কা বিজয় হলো, হযরত মোহাম্মদ যখন মক্কা বিজয় করলেন, অন্য ধর্মের লোকজন মদিনায়, মদিনা সনদের মাধ্যমে তারা তাদের অধিকার কিন্তু নিশ্চিত থাকলো।
রাশেদ আহমেদ: খুব সহজে মানুষকে জিনিসটা কানেক্ট করে, তাই না?
মফিদুল হক: মানবিক প্রবৃত্তি যেটা, যে সত্তাটা যে আকুতিটা, যে আত্মাটা আমরা বলি, সেখানে গিয়ে এটা কিন্তু একটা যে মরমে গিয়া পশিল আরকি হ্যাঁ। ফলে এই যে মানে ধর্মের সৌন্দর্য সেটাকেও কিন্তু আমরা একটা কদর্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি এইসব আচরণের মধ্য দিয়ে। সেখানে আমার মনে হয় যে ধার্মিক মানুষদের আজকে আমরা চাইবো যে যথার্থ ধার্মিক মানুষদের একটা জাগরণ ঘটুক।
রাশেদ আহমেদ: তাদেরও একটা রোল প্লে করার দরকার আছে এই মুহূর্তে, তাই বলছেন?
মফিদুল হক: আমাদের দেশের তো সিংহভাগ মানুষই ধার্মিক মানুষ।তারা কিন্তু সবসময় এই সংস্কৃতিটার মধ্যে একটা সহনশীলতা তো আছে। এখানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মুসলমান মিলেমিশে তো বহু বছর ধরে বসবাস করছে। কত রকম উদাহরণ সমাজে আছে। আর সেটার পরিচয় আমরা বহুরকমভাবে পাই সমাজে। সেটা যেন আমরা নষ্ট না করি, সেটা তো আমার শক্তির জায়গা। তো সবমিলে আমার যেটা মনে হয় যে, আজকে একটা অধোগতি সভ্যতার ঘটছে বিশ্বব্যাপী। দেখুন মানুষ তো এত জ্ঞান-বিজ্ঞানে এত বিশালতা আগে অর্জন করেনি। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তার হাতের মুঠোয় তো পৃথিবী চলে এসেছে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগে কিন্তু এখন ফসলের উৎপাদন আমার দেশেও প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিলাম। এত অর্জনের পরেও যদি সভ্যতার বিচার করি, মানবতার বিচার করি তাহলে দেখব যে অনেক শংকিত হওয়ার জায়গা যে এটার একটা অধোগতি হচ্ছে। যদি প্রযুক্তিই ধরেন যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেন একটা হিংসা প্রকাশের বাহন হয়ে যাচ্ছে। এটা তো মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযুক্তি করবে। সংযুক্তি করছে অনেকভাবে। কিন্তু তার পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে যে মানুষ অনেক বেশি অসহিষ্ণুতা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সে প্রয়োগ করছে। গালিগালাজ, অপরকে হেয় করা, নানাভাবে বিকৃতি ঘটানো। তার অর্থ হচ্ছে যে আমরা একটা সভ্যতারই একটা বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
রাশেদ আহমেদ: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অপব্যবহার করা হচ্ছে।
মফিদুল হক: খুবই অপব্যবহার করা হচ্ছে। যেই কারণে দেখুন পশ্চিম দেশে এখন বলা হচ্ছে যে ১৫ বছর ১৬ বছরের নিচে কারো হাতে এই ফেসবুক বা এই ইনস্টাগ্রাম বা এইসব প্ল্যাটফর্মের অ্যাক্সেস দেওয়া যাবে না। আইন করেই তারা বন্ধ করছে। মনে হতে পারে এটা তো মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। কিন্তু সেটা না। সেটা প্রজন্মকে যদি আমার রক্ষা করতে হয় তার সত্যিকার বিকাশ ঘটাতে হয়, সেখানে তো আমাদের এটা একটা যথেচ্ছাচারের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। যেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জাতিসংঘও এটা নিয়ে অনেক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছে। অনেক আলোচনা হচ্ছে। ইউনেস্কো বলছে যে ডিজিটাল লিটারেসি। আমার অক্ষর জ্ঞান শিখবো, তার সঙ্গে আমার ডিজিটাল জ্ঞানটাও অর্জন করবো। যেন ডিজিটাল ভুবনে আমি যেন বিচরণ করার সক্ষমতা অর্জন করি। ফলে মানে স্বাধীনতা বলি সংস্কৃতি বলি অনেক দায় থাকে। এটা যে কেবল আমি বিনোদন বা আমি উপভোগ করবো, আমি ভোক্তা থাকবো তা নয়। যদি সত্যিকারের সংস্কৃতির সঙ্গে আমার মোকাবেলা হয় তাহলে নিজেই অনুভব করবো যে শিল্পী যেমন একটা দায় থেকে তার শিল্প সৃষ্টি করেন, ভোক্তাও একটা দায় থেকে শিল্পকে গ্রহণ করে। করে বলেই তো এই যে বাউল গানের যদি আমি বলি এই গ্রাম-গ্রামান্তরে এই আসরগুলোতে গরিব দরিদ্র মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আর তার জীবনের যে দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা সবকিছুর সে একটা যেন নিরসন ঘটে, একটা পথ সে খুঁজে পায়। আবার নিজের ভেতরে একটা শক্তি সে খুঁজে পায়। আবার সে উঠে দাঁড়াবার একটা প্রেরণা পায়। তো এই এটাই তো শিল্প সংস্কৃতির কাজ। তো সেটা জোরদার করে চললেই মনে হয় যে আমাদের একটা বড় দিকে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো।
রাশেদ আহমেদ: অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সময় দেয়ার জন্য।
মফিদুল হক: ধন্যবাদ এই কথোপকথনের সুযোগটা করে দেওয়ার জন্যে।

আপনার মতামত লিখুন