একসময় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে শোনা যেত তাঁতের অবিরাম ছন্দ। সেই শব্দ ছিল হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রতীক, ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিত শব্দ ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের অন্যতম বৃহৎ তাঁতশিল্প অঞ্চল সিরাজগঞ্জ এখন কঠিন সংকটের মুখোমুখি।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের বিভিন্ন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয়টি উপজেলা ও সলঙ্গা অঞ্চলে মোট প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০টি তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার তাঁত বর্তমানে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। ফলে সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ৯৬ হাজার শ্রমিক।
তাঁতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ কারখানা পুরোপুরি বিলুপ্ত না হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। ঈদ বা বিশেষ মৌসুমে কাপড়ের চাহিদা বাড়লে কিছু কারখানা অল্প সময়ের জন্য চালু হয়, পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। গত কয়েক বছর ধরেই এমন পরিস্থিতি চলছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় তাঁত বন্ধের চিত্র উদ্বেগজনক। বেলকুচিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক তাঁত বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে মোট তাঁতের অনুপাতে বন্ধের হার বেশি শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জ সদরে। উল্লাপাড়াতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তাঁত উৎপাদন কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়েছে।
উল্লাপাড়ার বালসাবাড়ি এলাকার তাঁতশ্রমিক আব্দুর হাদিসুর বলেন, আগে যে পরিমাণ কাপড় উৎপাদন হতো এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক মালিক বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করলেও অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে তাঁতশিল্পের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তাঁত মালিকদের অভিযোগ, সুতা, রঙ ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্যদিকে বাজারে কাপড়ের বিক্রি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগের অর্থও তুলতে পারছেন না তারা।
উল্লাপাড়ার এক মহাজন জানান, কয়েক বছর আগেও তার কারখানার সাপ্তাহিক বিক্রি ছিল প্রায় এক লাখ টাকার কাছাকাছি। বর্তমানে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে জেনারেটর পরিচালনার জন্য প্রতিদিন বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।
আরেক মালিক বলেন, লোকসান সামাল দিতে না পেরে তিনি অধিকাংশ তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে বিনিয়োগের সাহসও পাচ্ছেন না।
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ কাপড়ের বাজার শাহজাদপুর হাটে। ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এখানে কাপড় কিনতে আসতেন। বিদেশি ক্রেতাদেরও উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
হাটসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আগের তুলনায় ক্রেতা ও বিক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। লেনদেনও নেমে এসেছে অনেক নিচে। ফলে তাঁতশিল্পনির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে।
দীর্ঘদিন তাঁতশিল্পে যুক্ত থাকা অনেক শ্রমিক এখন বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন। কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ হোটেল বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় জীবিকা খুঁজছেন।
প্রায় চার দশক ধরে তাঁতের সঙ্গে যুক্ত এক শ্রমিক বলেন, আগে তাঁতের কাজ করেই সংসার চলত। এখন কাজ না থাকায় অন্য উপায় খুঁজতে হচ্ছে। নতুন প্রজন্মও আর এই পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
তাঁত মালিক ও শ্রমিকদের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দেশি কাপড়ের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা হাজার হাজার তাঁত স্থায়ীভাবে হারিয়ে যেতে পারে।
একসময় যে শিল্প সিরাজগঞ্জের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে লাখো মানুষের, সেই ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা না মিললে তাঁতের জনপদে হয়তো একদিন সত্যিই থেমে যাবে সেই পরিচিত ছন্দের শব্দ।

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একসময় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে শোনা যেত তাঁতের অবিরাম ছন্দ। সেই শব্দ ছিল হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রতীক, ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিত শব্দ ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের অন্যতম বৃহৎ তাঁতশিল্প অঞ্চল সিরাজগঞ্জ এখন কঠিন সংকটের মুখোমুখি।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের বিভিন্ন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয়টি উপজেলা ও সলঙ্গা অঞ্চলে মোট প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০টি তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার তাঁত বর্তমানে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। ফলে সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ৯৬ হাজার শ্রমিক।
তাঁতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ কারখানা পুরোপুরি বিলুপ্ত না হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। ঈদ বা বিশেষ মৌসুমে কাপড়ের চাহিদা বাড়লে কিছু কারখানা অল্প সময়ের জন্য চালু হয়, পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। গত কয়েক বছর ধরেই এমন পরিস্থিতি চলছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় তাঁত বন্ধের চিত্র উদ্বেগজনক। বেলকুচিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক তাঁত বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে মোট তাঁতের অনুপাতে বন্ধের হার বেশি শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জ সদরে। উল্লাপাড়াতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তাঁত উৎপাদন কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়েছে।
উল্লাপাড়ার বালসাবাড়ি এলাকার তাঁতশ্রমিক আব্দুর হাদিসুর বলেন, আগে যে পরিমাণ কাপড় উৎপাদন হতো এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক মালিক বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করলেও অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে তাঁতশিল্পের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তাঁত মালিকদের অভিযোগ, সুতা, রঙ ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্যদিকে বাজারে কাপড়ের বিক্রি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগের অর্থও তুলতে পারছেন না তারা।
উল্লাপাড়ার এক মহাজন জানান, কয়েক বছর আগেও তার কারখানার সাপ্তাহিক বিক্রি ছিল প্রায় এক লাখ টাকার কাছাকাছি। বর্তমানে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে জেনারেটর পরিচালনার জন্য প্রতিদিন বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।
আরেক মালিক বলেন, লোকসান সামাল দিতে না পেরে তিনি অধিকাংশ তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে বিনিয়োগের সাহসও পাচ্ছেন না।
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ কাপড়ের বাজার শাহজাদপুর হাটে। ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এখানে কাপড় কিনতে আসতেন। বিদেশি ক্রেতাদেরও উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
হাটসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আগের তুলনায় ক্রেতা ও বিক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। লেনদেনও নেমে এসেছে অনেক নিচে। ফলে তাঁতশিল্পনির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে।
দীর্ঘদিন তাঁতশিল্পে যুক্ত থাকা অনেক শ্রমিক এখন বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন। কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ হোটেল বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় জীবিকা খুঁজছেন।
প্রায় চার দশক ধরে তাঁতের সঙ্গে যুক্ত এক শ্রমিক বলেন, আগে তাঁতের কাজ করেই সংসার চলত। এখন কাজ না থাকায় অন্য উপায় খুঁজতে হচ্ছে। নতুন প্রজন্মও আর এই পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
তাঁত মালিক ও শ্রমিকদের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দেশি কাপড়ের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা হাজার হাজার তাঁত স্থায়ীভাবে হারিয়ে যেতে পারে।
একসময় যে শিল্প সিরাজগঞ্জের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে লাখো মানুষের, সেই ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা না মিললে তাঁতের জনপদে হয়তো একদিন সত্যিই থেমে যাবে সেই পরিচিত ছন্দের শব্দ।

আপনার মতামত লিখুন