সংবাদ

গানে গানে গগনভেদী প্রতিবাদ


জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৭ পিএম

গানে গানে গগনভেদী প্রতিবাদ

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিও ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপ্লব হয়ে গেছে। নিল শাড়ি পরে আঁচল উড়িয়ে তার ছন্দময় হাঁটার একটি রিল ভিডিওতে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি ব্যবহার করার পর অনলাইনে তিনি ট্রলের শিকার হন। এমন একটি ভদ্রজনোচিত আচরণ ট্রল হওয়ায় সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষ একই গান ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে তার পাশে দাঁড়ান। শুধু ট্রল নয়, বিউটি পালের ভিডিও সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে কিনা, তা যাচাই করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছিল স্থানীয় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর থেমে যায় তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তুতি।

বিউটি রাণী পালের এমন একটি নির্মল ও সুস্থ কনটেন্টে নেতিবাচক মন্তব্য করার লোক যে সমাজে বিরাজমান সেই সমাজ  অসুস্থ্য। ড. মোহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রশ্রয়ে যে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও অশ্রাব্য ভাষার কুৎসিৎ উদগীরণ শুরু হয়েছিল, তার রেশ এখনও কিছুটা রয়ে গেছে। কুরুচি ভাষার বীরত্ব গাথা রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে কৃষ্টি ও সংস্কৃতিবান লোকজন চুপ থাকতে বাধ্য হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে শিক্ষকদের যত্রতত্র হেনস্তার মর্মান্তিক নজির দেখে সবাই বোবা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিউটি রানী পালের ভিডিও ক্লিপ ঘিরে গুটি কয়েক মানুষ যেভাবে নেতিবাচক ভাষা ও আলোচনার জন্ম দিতে চেয়েছিল, বিউটি রানীর প্রতি লাখো মানুষের পরিশীলিত সংহতি তা ভাসিয়ে নিয়ে গেল। ইউনূস সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বন্ধাত্ব,  শিল্পী ও নারী ক্রীড়াবিদদের হেনস্তা, লালন অনুসারীদের ওপর হামলার আঘাতে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষগুলোকে হঠাৎ আজ একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তারা প্রতিবাদ করার ভাষা খুঁজে পেয়েছে।

পাশ্চাত্য দেশে কারো ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে অন্য কেউ মাথা ঘামায় না, যদি না সেই আচরণ অন্য কারো ক্ষতি করে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে কিছু মানুষ অন্যের ব্যাপারে এত বেশি ঔৎসুক্য যে, কোন অনুষ্ঠানে কোনো প্রাপ্ত বয়ষ্ক নারীর সঙ্গে কথার শুরুতেই প্রশ্ন করে বসে, ‘আপনার স্বামী কী করেন’? যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে তিনি আদৌ বিবাহিতা কিনা তা জানার প্রয়োজন বোধ করে না। ভারত এবং বাংলাদেশের টিভি সিরিয়াল বা সিনেমা দেখলেই মানুষের মানসিকতা বোঝা যায়, অধিকাংশ লোক অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করে আনন্দ পায়। আমি যে এলাকায় থাকি সেখানকার এক প্রবীণ লোক রাস্তায় গোমটাবিহীন মেয়ে দেখলেই তার হাতের লাঠি দিয়ে খোঁচা মারে। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করে না, কারণ ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়। ওড়না না পরায় রাস্তার এক মেয়েকে এক লোক অপমান করতে কসুর করেনি। নাজেহাল হওয়ার ভয়ে আজকাল মেয়েরা কপালে টিপ পরা ছেড়ে দিয়েছে।

সমাজে কিছু লোক নারীর ত্রুটি খুঁজে বের করতে গলদঘর্ম হয়; কেমন পোষাক পরেছে, ঘর থেকে একা একা বের হওয়া উচিত হয়নি, চুলে রং করল কেন, কপালে টিপটি বেশি লাল কি-না, ঠোঁটে লিপিস্টিক কেন। কন্যা সন্তানের জন্য যাদের শখ আছে তারা এখন কন্যা সন্তান নিয়ে ভয় পায়। প্রকৃতপক্ষে নারীর পোশাক, সাজসজ্জা, আচরণের ব্যাপারে সমাজ সূচের মতো তীক্ষ্ণ। বোরকা আর হিজাব না থাকলে কিছু লোকের কাছে ইদানীং নারী সব পোশাকই উলঙ্গ থাকার সমতুল্য।এমন পোশাকের মেয়েদের তারা ট্যাগ দিয়ে বলে ‘বেহায়া’ বা ‘নির্লজ্জ’  নারী। ‘বেহায়া’ বা ‘নির্লজ্জ’ ট্যাগ দিয়ে  সমাজ নারীর ওপর কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে। যে-নারী বাঁধা ধরা রীতিনীতির বিরুদ্ধে একটু সজাগ থাকে, যে নারী একটু স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়, যে নারী তাদের মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে সচেতন থাকে, সে-নারীই বেহায়া ও নির্লজ্জ। 

সমাজের চোখে স্বাধীনচেতা নারীর সব আচরণই ‘বেহায়াপনা’। তাদের কথিত এই বেহায়াপনার বিরুদ্ধে কিছু লোক তাদের জিহবা ও হাত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বাজে কথা শোনার ভয়, হেনস্তা হওয়ার ভয়, জাহান্নামের ভয়, চরিত্রে দাগ লাগার ভয়- এত ভয় নিয়ে একটা মেয়ের পক্ষে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা প্রায় অসম্ভব। মানুষ আগে উলঙ্গ ছিল, মৃত্যুর পরও উলঙ্গ থাকবে, বেহেশতে আদম-হাওয়া উলঙ্গ ছিলেন, পৃথিবীতে আসার পরও উলঙ্গ ছিলেন, এমনকি বেহেশতেও না-কি সবাই উলঙ্গ  থাকবে। পোশাক আবিষ্কারের আগে লাখ লাখ বছর মানুষ কাপড় ছাড়াই সর্বত্র  ঘুরে বেড়িয়েছে, এখনও অনেক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতে নারীর উর্ধাঙ্গে পোশাক থাকে না, তাতে কোন সমস্যা হয় না, সমস্যা বাঁধিয়েছে পোশাকের আবিষ্কারক। 

সংস্কৃতি আর ধর্ম ভিন্ন বিবেচিত না হওয়ার কারণেই সমাজে এত বাদ-বিসম্বাদ। দেশভেদে ভূ-প্রকৃতি অনুযায়ী মানুষের আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ভিন্ন হয়ে থাকে। আমাদের দেশে একজন নারীকে শাড়ি ও টিপে যতটুকু মায়াবতী লাগে, পশ্চিমা একজন নারীকে জিন্স ও গেঞ্জিতে ততটুকু স্মার্ট লাগে। আমাদের সংস্কৃতি হলো শাড়ি পরিহিত নারীর কপালে টিপ, চোখে কাজল, চুলের বেণী। এই সংস্কৃতি হাজার বছরের।  সৌদি আরবের বিয়েতে উলুধ্বনি দেয়া হয়, এমনকি নবীজি যখন মদিনায় হিজরত করেন তখনও মদিনাবাসী নবীজীকে উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে নিয়েছিল, এটা সৌদি আরবের ধর্ম নয়, সংষ্কৃতি। ইন্দোনেশিয়ার জাতির পিতার নাম সুকর্ণ হলেও কেউ তার নামের উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন করে না, বা তাকে কেউ ‘হিন্দু’ বলে উপহাস করে না, কর্ণ মহাভারতের একটি চরিত্র। ইন্দোনেশিয়ার মতো ইরানিরাও ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান হয়েছে, কিন্তু তারা তাদের সংস্কৃতি পরিবর্তন করেনি।

‘বাঙালিয়ানা’ অর্থ বাঙ্গালীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বভাব ও জীবনযাপনের নিজস্ব ঢং। ধর্ম আর সংস্কৃতির আলাদা অস্তিত্ব জোর গলায় এবং কঠিন হস্তে প্রতিরোধ করা হচ্ছে বলে ‘বাঙালিয়ানা’ বলে কিছু আর থাকছে না। ওয়াহিবীদের মতো সব ‘সহীহ’ করার প্রক্রিয়ায় সব সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে। যে ড্রেসিং টেবিল টিপের পাতা ছাড়া অসম্পূর্ণ ছিল, এখন সেই পাতার টিপ পরলে পাপ হয়।

শুধু মেয়েদের শাড়ি আর কপালের টিপ নয়, নববর্ষ, যাত্রাপালা, বৈশাখী মেলা, বাউলের আখড়া সব কিছুতেই থাবা বসেছে। আগে পাকিস্তানিরা বাঙালি সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানি ভাবতো, এখন স্বাধীন বাংলাদেশে অধপতন এতবেশি হয়েছে যে, বাঙ্গালীরাই বাঙালিয়ানাকে হিন্দুয়ানি বলছে। দেশের ভয়াবহ চিত্র হচ্ছে, স্কুলের অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক ছাত্ররাও বাঙালিয়ানা দূর করার শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে।

২০২৬ সনে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল। তার ব্যাচের প্রায় সকলেই দেশে-বিদেশে আকর্ষণীয় পদমর্যাদায় আসীন হলেও তিনি এবং মাসুদুল ইসলাম রানা বেছে নিয়েছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা। বিউটি পাল এবং রানা দুইজনই এমএ পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলেন। বিউটি পালের  অপরাধ হচ্ছে নীল রংয়ের শাড়ি পরে তিনি তার সিল্কি চুল বাতাসে উড়িয়েছিলেন। তার আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম শিশুদের ক্লাসে ইংরেজি পড়ানোর স্টাইল। গম্ভীর শিক্ষকের চোখ রাঙানোর দিন শেষ, শিক্ষকের পুলিশি আচরণ ত্যাগ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভয়হীন বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু কিছু লোক বিউটি পালের এই ত্যাগের প্রশংসা না করে তারা খুঁজলো তিনি কী পরলেন, কোথায় দাঁড়ালেন, কীভাবে হাসলেন, কীভাবে হাঁটলেন ; আর এগুলোকে তারা নিজেদের মনের রঙে রঞ্জিত করে তার পেশা ও চরিত্রের সঙ্গে গুলিয়ে মানুষদের খাওয়াতে চাইলো। 

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬


গানে গানে গগনভেদী প্রতিবাদ

প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পালের একটি ভিডিও ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপ্লব হয়ে গেছে। নিল শাড়ি পরে আঁচল উড়িয়ে তার ছন্দময় হাঁটার একটি রিল ভিডিওতে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি ব্যবহার করার পর অনলাইনে তিনি ট্রলের শিকার হন। এমন একটি ভদ্রজনোচিত আচরণ ট্রল হওয়ায় সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষ একই গান ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে তার পাশে দাঁড়ান। শুধু ট্রল নয়, বিউটি পালের ভিডিও সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে কিনা, তা যাচাই করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছিল স্থানীয় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর থেমে যায় তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তুতি।

বিউটি রাণী পালের এমন একটি নির্মল ও সুস্থ কনটেন্টে নেতিবাচক মন্তব্য করার লোক যে সমাজে বিরাজমান সেই সমাজ  অসুস্থ্য। ড. মোহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রশ্রয়ে যে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও অশ্রাব্য ভাষার কুৎসিৎ উদগীরণ শুরু হয়েছিল, তার রেশ এখনও কিছুটা রয়ে গেছে। কুরুচি ভাষার বীরত্ব গাথা রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে কৃষ্টি ও সংস্কৃতিবান লোকজন চুপ থাকতে বাধ্য হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে শিক্ষকদের যত্রতত্র হেনস্তার মর্মান্তিক নজির দেখে সবাই বোবা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিউটি রানী পালের ভিডিও ক্লিপ ঘিরে গুটি কয়েক মানুষ যেভাবে নেতিবাচক ভাষা ও আলোচনার জন্ম দিতে চেয়েছিল, বিউটি রানীর প্রতি লাখো মানুষের পরিশীলিত সংহতি তা ভাসিয়ে নিয়ে গেল। ইউনূস সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বন্ধাত্ব,  শিল্পী ও নারী ক্রীড়াবিদদের হেনস্তা, লালন অনুসারীদের ওপর হামলার আঘাতে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষগুলোকে হঠাৎ আজ একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তারা প্রতিবাদ করার ভাষা খুঁজে পেয়েছে।

পাশ্চাত্য দেশে কারো ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে অন্য কেউ মাথা ঘামায় না, যদি না সেই আচরণ অন্য কারো ক্ষতি করে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে কিছু মানুষ অন্যের ব্যাপারে এত বেশি ঔৎসুক্য যে, কোন অনুষ্ঠানে কোনো প্রাপ্ত বয়ষ্ক নারীর সঙ্গে কথার শুরুতেই প্রশ্ন করে বসে, ‘আপনার স্বামী কী করেন’? যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে তিনি আদৌ বিবাহিতা কিনা তা জানার প্রয়োজন বোধ করে না। ভারত এবং বাংলাদেশের টিভি সিরিয়াল বা সিনেমা দেখলেই মানুষের মানসিকতা বোঝা যায়, অধিকাংশ লোক অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করে আনন্দ পায়। আমি যে এলাকায় থাকি সেখানকার এক প্রবীণ লোক রাস্তায় গোমটাবিহীন মেয়ে দেখলেই তার হাতের লাঠি দিয়ে খোঁচা মারে। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করে না, কারণ ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়। ওড়না না পরায় রাস্তার এক মেয়েকে এক লোক অপমান করতে কসুর করেনি। নাজেহাল হওয়ার ভয়ে আজকাল মেয়েরা কপালে টিপ পরা ছেড়ে দিয়েছে।

সমাজে কিছু লোক নারীর ত্রুটি খুঁজে বের করতে গলদঘর্ম হয়; কেমন পোষাক পরেছে, ঘর থেকে একা একা বের হওয়া উচিত হয়নি, চুলে রং করল কেন, কপালে টিপটি বেশি লাল কি-না, ঠোঁটে লিপিস্টিক কেন। কন্যা সন্তানের জন্য যাদের শখ আছে তারা এখন কন্যা সন্তান নিয়ে ভয় পায়। প্রকৃতপক্ষে নারীর পোশাক, সাজসজ্জা, আচরণের ব্যাপারে সমাজ সূচের মতো তীক্ষ্ণ। বোরকা আর হিজাব না থাকলে কিছু লোকের কাছে ইদানীং নারী সব পোশাকই উলঙ্গ থাকার সমতুল্য।এমন পোশাকের মেয়েদের তারা ট্যাগ দিয়ে বলে ‘বেহায়া’ বা ‘নির্লজ্জ’  নারী। ‘বেহায়া’ বা ‘নির্লজ্জ’ ট্যাগ দিয়ে  সমাজ নারীর ওপর কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে। যে-নারী বাঁধা ধরা রীতিনীতির বিরুদ্ধে একটু সজাগ থাকে, যে নারী একটু স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়, যে নারী তাদের মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে সচেতন থাকে, সে-নারীই বেহায়া ও নির্লজ্জ। 

সমাজের চোখে স্বাধীনচেতা নারীর সব আচরণই ‘বেহায়াপনা’। তাদের কথিত এই বেহায়াপনার বিরুদ্ধে কিছু লোক তাদের জিহবা ও হাত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বাজে কথা শোনার ভয়, হেনস্তা হওয়ার ভয়, জাহান্নামের ভয়, চরিত্রে দাগ লাগার ভয়- এত ভয় নিয়ে একটা মেয়ের পক্ষে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা প্রায় অসম্ভব। মানুষ আগে উলঙ্গ ছিল, মৃত্যুর পরও উলঙ্গ থাকবে, বেহেশতে আদম-হাওয়া উলঙ্গ ছিলেন, পৃথিবীতে আসার পরও উলঙ্গ ছিলেন, এমনকি বেহেশতেও না-কি সবাই উলঙ্গ  থাকবে। পোশাক আবিষ্কারের আগে লাখ লাখ বছর মানুষ কাপড় ছাড়াই সর্বত্র  ঘুরে বেড়িয়েছে, এখনও অনেক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতে নারীর উর্ধাঙ্গে পোশাক থাকে না, তাতে কোন সমস্যা হয় না, সমস্যা বাঁধিয়েছে পোশাকের আবিষ্কারক। 

সংস্কৃতি আর ধর্ম ভিন্ন বিবেচিত না হওয়ার কারণেই সমাজে এত বাদ-বিসম্বাদ। দেশভেদে ভূ-প্রকৃতি অনুযায়ী মানুষের আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ভিন্ন হয়ে থাকে। আমাদের দেশে একজন নারীকে শাড়ি ও টিপে যতটুকু মায়াবতী লাগে, পশ্চিমা একজন নারীকে জিন্স ও গেঞ্জিতে ততটুকু স্মার্ট লাগে। আমাদের সংস্কৃতি হলো শাড়ি পরিহিত নারীর কপালে টিপ, চোখে কাজল, চুলের বেণী। এই সংস্কৃতি হাজার বছরের।  সৌদি আরবের বিয়েতে উলুধ্বনি দেয়া হয়, এমনকি নবীজি যখন মদিনায় হিজরত করেন তখনও মদিনাবাসী নবীজীকে উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে নিয়েছিল, এটা সৌদি আরবের ধর্ম নয়, সংষ্কৃতি। ইন্দোনেশিয়ার জাতির পিতার নাম সুকর্ণ হলেও কেউ তার নামের উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন করে না, বা তাকে কেউ ‘হিন্দু’ বলে উপহাস করে না, কর্ণ মহাভারতের একটি চরিত্র। ইন্দোনেশিয়ার মতো ইরানিরাও ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান হয়েছে, কিন্তু তারা তাদের সংস্কৃতি পরিবর্তন করেনি।

‘বাঙালিয়ানা’ অর্থ বাঙ্গালীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বভাব ও জীবনযাপনের নিজস্ব ঢং। ধর্ম আর সংস্কৃতির আলাদা অস্তিত্ব জোর গলায় এবং কঠিন হস্তে প্রতিরোধ করা হচ্ছে বলে ‘বাঙালিয়ানা’ বলে কিছু আর থাকছে না। ওয়াহিবীদের মতো সব ‘সহীহ’ করার প্রক্রিয়ায় সব সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে। যে ড্রেসিং টেবিল টিপের পাতা ছাড়া অসম্পূর্ণ ছিল, এখন সেই পাতার টিপ পরলে পাপ হয়।

শুধু মেয়েদের শাড়ি আর কপালের টিপ নয়, নববর্ষ, যাত্রাপালা, বৈশাখী মেলা, বাউলের আখড়া সব কিছুতেই থাবা বসেছে। আগে পাকিস্তানিরা বাঙালি সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানি ভাবতো, এখন স্বাধীন বাংলাদেশে অধপতন এতবেশি হয়েছে যে, বাঙ্গালীরাই বাঙালিয়ানাকে হিন্দুয়ানি বলছে। দেশের ভয়াবহ চিত্র হচ্ছে, স্কুলের অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক ছাত্ররাও বাঙালিয়ানা দূর করার শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে।

২০২৬ সনে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল। তার ব্যাচের প্রায় সকলেই দেশে-বিদেশে আকর্ষণীয় পদমর্যাদায় আসীন হলেও তিনি এবং মাসুদুল ইসলাম রানা বেছে নিয়েছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা। বিউটি পাল এবং রানা দুইজনই এমএ পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলেন। বিউটি পালের  অপরাধ হচ্ছে নীল রংয়ের শাড়ি পরে তিনি তার সিল্কি চুল বাতাসে উড়িয়েছিলেন। তার আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম শিশুদের ক্লাসে ইংরেজি পড়ানোর স্টাইল। গম্ভীর শিক্ষকের চোখ রাঙানোর দিন শেষ, শিক্ষকের পুলিশি আচরণ ত্যাগ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভয়হীন বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু কিছু লোক বিউটি পালের এই ত্যাগের প্রশংসা না করে তারা খুঁজলো তিনি কী পরলেন, কোথায় দাঁড়ালেন, কীভাবে হাসলেন, কীভাবে হাঁটলেন ; আর এগুলোকে তারা নিজেদের মনের রঙে রঞ্জিত করে তার পেশা ও চরিত্রের সঙ্গে গুলিয়ে মানুষদের খাওয়াতে চাইলো। 

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত