আমরা যখন অপরাধের কথা ভাবি, তখন সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারীর চিত্র। এ ধরনের অপরাধ দৃশ্যমান, তাৎক্ষণিক এবং অনেক সময় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘ব্লু-কলার ক্রাইম’। কিন্তু আধুনিক সমাজে এমন এক ধরনের অপরাধ রয়েছে, যার কোনো রক্তাক্ত দৃশ্য নেই, অথচ এর ক্ষতি একটি দেশের অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত করে দেয়। এই অপরাধই হলো ‘হোয়াইট কালার ক্রাইম’।
সাদারল্যান্ডের তত্ত্বের আলোকে
১৯৩৯ সালে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ড প্রথম ‘হোয়াইট কালার ক্রাইম’ ধারণাটি উপস্থাপন করেন। তার মতে, সমাজে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব পালনের সময় নিজের অবস্থানের অপব্যবহার করে যে অপরাধ করেন, সেটিই হোয়াইট কালার ক্রাইম।
এই সংজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, অসাধু ব্যবসায়ী, ব্যাংকার কিংবা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা যখন ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তখন তার ক্ষতি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে হোয়াইট কালার ক্রাইম
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াইট কালার ক্রাইমের সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্র হলো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি, ভুয়া বা শেল কোম্পানির নামে ঋণ গ্রহণ, শেয়ারবাজারে কারসাজি, কর ফাঁকি, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো ঘটনাগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
এসব অপরাধের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অপরাধীরা অনেক সময় সমাজে সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত থাকেন। বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে তাদের আর্থিক অনিয়মের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থাহীনতা এসবই এমন অপরাধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব।
অন্যদিকে, সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও হোয়াইট কালার অপরাধে বিচারপ্রক্রিয়া প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আইনি জটিলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আরও অপরাধ সংঘটনের পথ সহজ করে দেয়।
অর্থনীতির জন্য নীরব হুমকি
হোয়াইট কালার ক্রাইমের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর অদৃশ্য প্রভাব। একটি ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বিদেশে অর্থ পাচার শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে না; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাহত করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, এই অপরাধের শিকার শেষ পর্যন্ত গোটা সমাজ।
উত্তরণের পথ
হোয়াইট কালার ক্রাইমকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার সংকটও বটে। তাই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
একই সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জনগণের মধ্যে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। আইনের চোখে সবাই সমান এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই হোয়াইট কালার ক্রাইমের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দৃশ্যমান অপরাধের পাশাপাশি এই অদৃশ্য অর্থনৈতিক মহামারীর বিরুদ্ধেও সমান গুরুত্ব দিয়ে লড়াই করতে হবে। কারণ, একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য সব সময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একটি কলমের স্বাক্ষর, একটি জালিয়াতিপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারই যথেষ্ট।
লেখক: শিক্ষার্থী, অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬
আমরা যখন অপরাধের কথা ভাবি, তখন সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারীর চিত্র। এ ধরনের অপরাধ দৃশ্যমান, তাৎক্ষণিক এবং অনেক সময় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ‘ব্লু-কলার ক্রাইম’। কিন্তু আধুনিক সমাজে এমন এক ধরনের অপরাধ রয়েছে, যার কোনো রক্তাক্ত দৃশ্য নেই, অথচ এর ক্ষতি একটি দেশের অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত করে দেয়। এই অপরাধই হলো ‘হোয়াইট কালার ক্রাইম’।
সাদারল্যান্ডের তত্ত্বের আলোকে
১৯৩৯ সালে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ড প্রথম ‘হোয়াইট কালার ক্রাইম’ ধারণাটি উপস্থাপন করেন। তার মতে, সমাজে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব পালনের সময় নিজের অবস্থানের অপব্যবহার করে যে অপরাধ করেন, সেটিই হোয়াইট কালার ক্রাইম।
এই সংজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, অসাধু ব্যবসায়ী, ব্যাংকার কিংবা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা যখন ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তখন তার ক্ষতি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে হোয়াইট কালার ক্রাইম
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াইট কালার ক্রাইমের সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্র হলো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি, ভুয়া বা শেল কোম্পানির নামে ঋণ গ্রহণ, শেয়ারবাজারে কারসাজি, কর ফাঁকি, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো ঘটনাগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
এসব অপরাধের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো অপরাধীরা অনেক সময় সমাজে সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত থাকেন। বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে তাদের আর্থিক অনিয়মের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থাহীনতা এসবই এমন অপরাধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব।
অন্যদিকে, সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও হোয়াইট কালার অপরাধে বিচারপ্রক্রিয়া প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আইনি জটিলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আরও অপরাধ সংঘটনের পথ সহজ করে দেয়।
অর্থনীতির জন্য নীরব হুমকি
হোয়াইট কালার ক্রাইমের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর অদৃশ্য প্রভাব। একটি ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বিদেশে অর্থ পাচার শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে না; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাহত করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, এই অপরাধের শিকার শেষ পর্যন্ত গোটা সমাজ।
উত্তরণের পথ
হোয়াইট কালার ক্রাইমকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার সংকটও বটে। তাই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
একই সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জনগণের মধ্যে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। আইনের চোখে সবাই সমান এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই হোয়াইট কালার ক্রাইমের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দৃশ্যমান অপরাধের পাশাপাশি এই অদৃশ্য অর্থনৈতিক মহামারীর বিরুদ্ধেও সমান গুরুত্ব দিয়ে লড়াই করতে হবে। কারণ, একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য সব সময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একটি কলমের স্বাক্ষর, একটি জালিয়াতিপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারই যথেষ্ট।
লেখক: শিক্ষার্থী, অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন