সংবাদ

ক্রেডিট-ডিপোজিট তথ্যে নতুন মডেল আইসিডিআইআর


সাজ্জাদ হোসেন রিজু
সাজ্জাদ হোসেন রিজু
প্রকাশ: ৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

ক্রেডিট-ডিপোজিট তথ্যে নতুন মডেল আইসিডিআইআর
ছবি: এআই

১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) প্রতিষ্ঠা করে। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে বিতরণকৃত সমস্ত প্রকার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ-তথ্য একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসা। যাতে করে ঋণসংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব হয়। শুরুতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তথ্য ব্যাবস্থাপনা দিয়ে শুরু হলেও ২০০১ সাল থেকে কম্পিউটারাইজড তথ্য ব্যবস্থাপনার দিকে যায় সিআইবির কার্যক্রম। 

২০১১ সালে অনলাইন পদ্ধতি প্রবর্তনের পর থেকে ব্যাংকগুলো অনলাইনের মাধ্যমে সিআইবি আবেদন ও তথ্য পেতে শুরু করে; যা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ছিল। এরপর থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে সিআইবির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ায় বর্তমানে কয়েক ঘণ্টায় সিআইবি রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব। যা থেকে ব্যাংকগুলো একজন গ্রাহকের সকল প্রকার ঋণের তথ্য খুব সহজেই বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত মার্চ মাস শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা; যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রচুর ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ-গ্রহিতা রয়েছে, যারা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করছেন না। সরকার দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখা ও ব্যাংকিং কার্ক্রমকে গতিশীল রাখতেই এ ধরণের নীতি সহায়তা প্রদান করে থাকে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ-গ্রহিতাগণ এ সকল নীতি সহায়তার সুযোগ নিয়ে থাকেন। 

তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে ইচ্ছকৃত খেলাপিদের আমানত হিসাবগুলোতে কোটি কোটি টাকা পড়ে আছে, অন্যদিকে তারা খেলাপি ঋণগ্রস্ত। ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলো তাদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করতে পারছে না। ইন্টিগ্রেটেড ক্রেডিট অ্যান্ড ডিপোজিট ইনফরমেশন রিপোর্টিং (আইসিডিআইআর) এই জটিলতার নিরসন করতে পারে। 

কীভাবে কাজ করবে আইসিডিআইআর 

আইসিডিআইআর হবে প্রচলিত সিআইবির একটি আধুনিক সংষ্করণ। এই রিপোর্টিং ব্যবস্থা সিআইবির মতো শুধুমাত্র ঋণের তথ্যই রিপোর্ট করবে না বরং ঋণের পাশাপাশি একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ব্যাংকিং আমানতের তথ্যও রিপোর্ট করবে। বর্তমান ও অতীতের ঋণের ইতিহাসের পাশাপাশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সকল ক্যাটাগরির আমানত হিসাবের তথ্য, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ইউটিলিটি দেনার তথ্য, ট্যাক্স সংক্রান্ত ব্যয় ও দেনার তথ্য, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস, ঋণ পুনঃতফসিল সংক্রান্ত তথ্য, যানবাহন মালিকানা ও স্থাবর সম্পত্তির তথ্যও সন্নিবেশিত থাকবে এনআইডি (...), টিন (...) ও বিন (...) এর অধীনে। 

প্রচলিত সিআইবিতে শুধুমাত্র ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ঋণের তথ্য রিপোর্ট করে। আইসিডিআইআর-এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন- জাতীয় রাজস্ব রোর্ড, ভুমি অফিস, বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষসমূহ, বিআরটিএ, গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিসমূহ, বিভিন্ন আঞ্চলিক ওয়াসাসমূহ তাদের নিজ নিজ গ্রাহকের বর্তমান অবস্থা নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তর অন্তর রিপোর্ট করবে। 

আইসিডিআইআর তার অধীনে রিপোর্টকৃত ডাটা থেকে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ঋণ খোলাপিদের একটি রেটিং তৈরি করবে এবং সিদ্ধান্ত প্রস্তাব করতে পারবে।  এতে করে কোনো গ্রাহক ব্যাংক ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিনের জন্য খেলাপি হলে বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে থাকলে ঋণ গ্রহিতার ব্যাংক ওইসব গ্রাহকের অধীনে থাকা অন্যসব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট করা গ্রাহকের আমানত হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দায়-দেনা ইত্যাদির তথ্য অনুসন্ধান করতে পারবে। 

সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রয়োজনে নিজের অনাদায়ী ঋণ সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমের মাধ্যেমে আবেদন করে গ্রাহকের অন্য প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানত হিসাব হতে সংশ্লিষ্ট ঋণের সমুদয় অথবা আংশিক সমন্বয় করে নিতে পারবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র সহায়ক জামানতের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সন্বয়ের প্রক্রিয়া আইনগতভাবে জটিল, সময় সাপেক্ষ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলতার হার সন্তোষজনক নয়। কিন্তু স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে আইসিডিআইআর প্রবর্তন করা গেলে তা দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হ্রাসকল্পে অত্যন্ত স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও কার্যকরী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।

আইসিডিআইআর প্রবর্তনের ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে-

খেলাপি ঋণ হ্রাস: যখন একজন খেলাপি ঋণগ্রহিতার (ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান) সামগ্রিক আর্থিক দায়ের পাশাপাশি যাবতীয় আমানত ব্যাংকের কাছে দৃশ্যমান হবে তখন অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ এবং তথ্য গোপনের সুযোগ কমে যাবে। ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে।

আমানতের মাধ্যমে ঋণের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা থাকবে: আইসিডিআইআর ডাটাবেজ ব্যবহারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা প্রণয়ন করে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঞ্চিত আমানত হিসাব থেকে খেলাপি ঋণের দায় পরিশোধের মতো কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ফলে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণও হ্রাস পাবে।

গ্রাহকের ধরণ অনুযায়ী সুবিধা প্রদান: যে সকল গ্রাহক নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন তারা দ্রুত ঋণ অনুমোদন পাবেন। তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণদান অথবা অধিক‍ পরিমাণে ঋণ-সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে যে সকল গ্রাহকের অতীত ইতিহাস সন্তোষজনক নয়, তাদের অবস্থা বিবেচনা করে তাকে তার সুবিধাজনক বা কাস্টমাইজ বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হবে।

প্রতারণা সনাক্তকরণ ও খেলাপির আগাম সতর্কতা: আইসিডিআইআর-এর মাধ্যমে সহজেই আর্থিক প্রতারণা সনাক্তকরণ সম্ভব হবে। কারণ তখন গ্রাহকের ঋণ-তথ্যের পাশাপাশি আমানত পরিস্থিতিও জানা সম্ভব হবে। ফলে খেলাপি ঋণ গ্রহিতার দিক থেকে উপর্যুপরি ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতারণার সুযোগ আগে থেকেই সনাক্ত করা সম্ভব হবে। যা পক্ষান্তরে ঋণের খেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা হিসাবে কাজ করবে।

ব্যাসেল ফ্রেমওয়ার্ক ও আইএফআরএস ৯ বাস্তবায়নে সহায়ক: আধুনিক ব্যাংকিংয়ে এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস (ইসিএল) বা ঋণগ্রহিতার খেলাপির কারণে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্ষতি নির্ধারণের জন্য সমন্বিত তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য। আইসিডিআইআর এই তথ্য চাহিদাকে কার্ক্ররভাবে পূরণ করতে সক্ষম।

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সম্ভবনা: বিগ ডাটা এনালাইসিসি এবং আইসিডিআইআর এর সকল পক্ষের ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্লক চেইন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত কার্যকরভাবে একজন খেলাপি ঋণ-গ্রহিতার নতুন ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করা যাবে। পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আদায় কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা সম্ভব হবে।

দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে, ঋণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ও ধরণ পরিবর্তিত হচ্ছে, খেলাপি ঋণ বাড়ছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ মূল্যায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা অশানুরূপ নয়।

আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে, অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণদানের বিকল্পও নেই। এতোসব সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকিং খাত ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণগ্রহিতাদের আমানতের তথ্য ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকের পদক্ষেপ বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজীকরণ করবে এই আইসিডিআইআর।

লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬


ক্রেডিট-ডিপোজিট তথ্যে নতুন মডেল আইসিডিআইআর

প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) প্রতিষ্ঠা করে। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে বিতরণকৃত সমস্ত প্রকার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ-তথ্য একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসা। যাতে করে ঋণসংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব হয়। শুরুতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তথ্য ব্যাবস্থাপনা দিয়ে শুরু হলেও ২০০১ সাল থেকে কম্পিউটারাইজড তথ্য ব্যবস্থাপনার দিকে যায় সিআইবির কার্যক্রম। 

২০১১ সালে অনলাইন পদ্ধতি প্রবর্তনের পর থেকে ব্যাংকগুলো অনলাইনের মাধ্যমে সিআইবি আবেদন ও তথ্য পেতে শুরু করে; যা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ছিল। এরপর থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে সিআইবির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ায় বর্তমানে কয়েক ঘণ্টায় সিআইবি রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব। যা থেকে ব্যাংকগুলো একজন গ্রাহকের সকল প্রকার ঋণের তথ্য খুব সহজেই বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত মার্চ মাস শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা; যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রচুর ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ-গ্রহিতা রয়েছে, যারা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করছেন না। সরকার দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখা ও ব্যাংকিং কার্ক্রমকে গতিশীল রাখতেই এ ধরণের নীতি সহায়তা প্রদান করে থাকে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ-গ্রহিতাগণ এ সকল নীতি সহায়তার সুযোগ নিয়ে থাকেন। 

তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে ইচ্ছকৃত খেলাপিদের আমানত হিসাবগুলোতে কোটি কোটি টাকা পড়ে আছে, অন্যদিকে তারা খেলাপি ঋণগ্রস্ত। ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলো তাদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করতে পারছে না। ইন্টিগ্রেটেড ক্রেডিট অ্যান্ড ডিপোজিট ইনফরমেশন রিপোর্টিং (আইসিডিআইআর) এই জটিলতার নিরসন করতে পারে। 

কীভাবে কাজ করবে আইসিডিআইআর 

আইসিডিআইআর হবে প্রচলিত সিআইবির একটি আধুনিক সংষ্করণ। এই রিপোর্টিং ব্যবস্থা সিআইবির মতো শুধুমাত্র ঋণের তথ্যই রিপোর্ট করবে না বরং ঋণের পাশাপাশি একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ব্যাংকিং আমানতের তথ্যও রিপোর্ট করবে। বর্তমান ও অতীতের ঋণের ইতিহাসের পাশাপাশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সকল ক্যাটাগরির আমানত হিসাবের তথ্য, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ইউটিলিটি দেনার তথ্য, ট্যাক্স সংক্রান্ত ব্যয় ও দেনার তথ্য, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস, ঋণ পুনঃতফসিল সংক্রান্ত তথ্য, যানবাহন মালিকানা ও স্থাবর সম্পত্তির তথ্যও সন্নিবেশিত থাকবে এনআইডি (...), টিন (...) ও বিন (...) এর অধীনে। 

প্রচলিত সিআইবিতে শুধুমাত্র ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ঋণের তথ্য রিপোর্ট করে। আইসিডিআইআর-এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন- জাতীয় রাজস্ব রোর্ড, ভুমি অফিস, বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষসমূহ, বিআরটিএ, গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিসমূহ, বিভিন্ন আঞ্চলিক ওয়াসাসমূহ তাদের নিজ নিজ গ্রাহকের বর্তমান অবস্থা নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তর অন্তর রিপোর্ট করবে। 

আইসিডিআইআর তার অধীনে রিপোর্টকৃত ডাটা থেকে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ঋণ খোলাপিদের একটি রেটিং তৈরি করবে এবং সিদ্ধান্ত প্রস্তাব করতে পারবে।  এতে করে কোনো গ্রাহক ব্যাংক ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিনের জন্য খেলাপি হলে বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে থাকলে ঋণ গ্রহিতার ব্যাংক ওইসব গ্রাহকের অধীনে থাকা অন্যসব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট করা গ্রাহকের আমানত হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দায়-দেনা ইত্যাদির তথ্য অনুসন্ধান করতে পারবে। 

সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রয়োজনে নিজের অনাদায়ী ঋণ সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমের মাধ্যেমে আবেদন করে গ্রাহকের অন্য প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানত হিসাব হতে সংশ্লিষ্ট ঋণের সমুদয় অথবা আংশিক সমন্বয় করে নিতে পারবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র সহায়ক জামানতের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সন্বয়ের প্রক্রিয়া আইনগতভাবে জটিল, সময় সাপেক্ষ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলতার হার সন্তোষজনক নয়। কিন্তু স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে আইসিডিআইআর প্রবর্তন করা গেলে তা দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হ্রাসকল্পে অত্যন্ত স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও কার্যকরী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।

আইসিডিআইআর প্রবর্তনের ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে-

খেলাপি ঋণ হ্রাস: যখন একজন খেলাপি ঋণগ্রহিতার (ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান) সামগ্রিক আর্থিক দায়ের পাশাপাশি যাবতীয় আমানত ব্যাংকের কাছে দৃশ্যমান হবে তখন অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ এবং তথ্য গোপনের সুযোগ কমে যাবে। ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে।

আমানতের মাধ্যমে ঋণের দায় পরিশোধের ব্যবস্থা থাকবে: আইসিডিআইআর ডাটাবেজ ব্যবহারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা প্রণয়ন করে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঞ্চিত আমানত হিসাব থেকে খেলাপি ঋণের দায় পরিশোধের মতো কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ফলে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণও হ্রাস পাবে।

গ্রাহকের ধরণ অনুযায়ী সুবিধা প্রদান: যে সকল গ্রাহক নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন তারা দ্রুত ঋণ অনুমোদন পাবেন। তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণদান অথবা অধিক‍ পরিমাণে ঋণ-সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে যে সকল গ্রাহকের অতীত ইতিহাস সন্তোষজনক নয়, তাদের অবস্থা বিবেচনা করে তাকে তার সুবিধাজনক বা কাস্টমাইজ বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হবে।

প্রতারণা সনাক্তকরণ ও খেলাপির আগাম সতর্কতা: আইসিডিআইআর-এর মাধ্যমে সহজেই আর্থিক প্রতারণা সনাক্তকরণ সম্ভব হবে। কারণ তখন গ্রাহকের ঋণ-তথ্যের পাশাপাশি আমানত পরিস্থিতিও জানা সম্ভব হবে। ফলে খেলাপি ঋণ গ্রহিতার দিক থেকে উপর্যুপরি ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতারণার সুযোগ আগে থেকেই সনাক্ত করা সম্ভব হবে। যা পক্ষান্তরে ঋণের খেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা হিসাবে কাজ করবে।

ব্যাসেল ফ্রেমওয়ার্ক ও আইএফআরএস ৯ বাস্তবায়নে সহায়ক: আধুনিক ব্যাংকিংয়ে এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস (ইসিএল) বা ঋণগ্রহিতার খেলাপির কারণে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্ষতি নির্ধারণের জন্য সমন্বিত তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য। আইসিডিআইআর এই তথ্য চাহিদাকে কার্ক্ররভাবে পূরণ করতে সক্ষম।

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সম্ভবনা: বিগ ডাটা এনালাইসিসি এবং আইসিডিআইআর এর সকল পক্ষের ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্লক চেইন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত কার্যকরভাবে একজন খেলাপি ঋণ-গ্রহিতার নতুন ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করা যাবে। পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আদায় কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা সম্ভব হবে।

দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে, ঋণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ও ধরণ পরিবর্তিত হচ্ছে, খেলাপি ঋণ বাড়ছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ মূল্যায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা অশানুরূপ নয়।

আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে, অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণদানের বিকল্পও নেই। এতোসব সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকিং খাত ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণগ্রহিতাদের আমানতের তথ্য ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকের পদক্ষেপ বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজীকরণ করবে এই আইসিডিআইআর।

লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত