আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। তবে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, দেশে পা রাখলে বিমানবন্দর এলাকাতেই তাকে হত্যার চেষ্টা হতে পারে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এই প্রথম কোনো ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় নিজের পরিকল্পনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দেশের সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’-এর নির্বাহী সম্পাদক অমল সরকারকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। প্রায় দেড় মাস ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশ ছাড়ার নাটকীয় প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রথমবারের মতো তার ভাষ্য সামনে এল।
৫ আগস্টের সেই মুহূর্ত : ‘ভেবেছিলাম টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছি’
গত ৫ আগস্ট গণভবন ছাড়ার মুহূর্তটি নিয়ে শেখ হাসিনা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, তিনি কোনোভাবেই দেশ ছেড়ে যেতে চাননি। শেখ হাসিনা বলেন, 'আমি যে দেশ ছেড়ে এসেছি, আমি তো আসতে চাইনি। আমাকে একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে চলে আসতে বাধ্য করা হয়েছিল। এমনকি আমি যখন হেলিকপ্টারে উঠি, তখনও জানতাম না যে আমাকে ভারতে নেওয়া হচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম আমি আমার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায় যাচ্ছি। হেলিকপ্টার যখন সীমান্ত অতিক্রম করে, তখন আমাকে জানানো হয় আমরা ভারতে যাচ্ছি।'
ডিসেম্বরে ফেরার প্রস্তুতি ও প্রাণের ঝুঁকি
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বারবার তার দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, 'দেশটা আমার। আমার বাবা এই দেশ স্বাধীন করেছেন। আমাকে কেন ফিরতে দেওয়া হবে না? আমি ডিসেম্বরেই ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, কারণ ওটা আমাদের বিজয়ের মাস।' তবে ফেরার পথে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা করছেন তিনি। তার ভাষায়, 'আমি জানি, আমি ফিরলে এয়ারপোর্টেই আমাকে হত্যা করা হতে পারে। শুধু আমার নয়, আমার ফেরার সঙ্গে যারা যুক্ত থাকবে, তাদের প্রত্যেকের জীবনের ঝুঁকি আছে। আমি কাউকে বিপদে ফেলে দেশে ফিরতে চাই না, তবে মানুষের পাশে আমাকে দাঁড়াতে হবে।'
ভারতের প্রতি সতর্কবার্তা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
বাংলাদেশে বর্তমানে ‘জঙ্গিবাদী শক্তির’ উত্থান ঘটছে দাবি করে শেখ হাসিনা ভারতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে বর্তমানে যে অস্থিরতা ও মৌলবাদী শক্তির বিস্তার ঘটছে, তার খেসারত শুধু আমাদের নয়, ভারতকেও দিতে হবে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত যদি মনে করে তারা শান্তিতে থাকবে, তবে সেটি ভুল হতে পারে।' তিনি দুই দেশের মধ্যে সামরিক জোটের চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচন এবং বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে নিয়ে দিল্লির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নেতৃত্বের হাল ধরবেন শেখ সেলিম
দলের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেতৃত্ব কে দেবেন, সে বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি জানান, তার অনুপস্থিতিতে দলের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ছোট বোন শেখ রেহানার রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, 'রেহানা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়।'
তারেক রহমান ও অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে সমালোচনা
লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি নেতা তারেক রহমানের তীব্র সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তার অভিযোগ, তারেক রহমান বিদেশ থেকে বসে বাংলাদেশে লাশের রাজনীতি করছেন। অন্যদিকে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি ‘সুপরিকল্পিত নকশা’ (মেটিকুলাস ডিজাইন) বলে অভিহিত করেন তিনি। দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'আমার দেশের সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেখে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়।'
সবশেষে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, কোনো ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা অনুমতির জন্য তিনি বসে থাকবেন না। অবস্থা বুঝে যে কোনো সময় তিনি দেশের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। তবে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, দেশে পা রাখলে বিমানবন্দর এলাকাতেই তাকে হত্যার চেষ্টা হতে পারে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এই প্রথম কোনো ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় নিজের পরিকল্পনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দেশের সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল’-এর নির্বাহী সম্পাদক অমল সরকারকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। প্রায় দেড় মাস ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশ ছাড়ার নাটকীয় প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রথমবারের মতো তার ভাষ্য সামনে এল।
৫ আগস্টের সেই মুহূর্ত : ‘ভেবেছিলাম টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছি’
গত ৫ আগস্ট গণভবন ছাড়ার মুহূর্তটি নিয়ে শেখ হাসিনা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, তিনি কোনোভাবেই দেশ ছেড়ে যেতে চাননি। শেখ হাসিনা বলেন, 'আমি যে দেশ ছেড়ে এসেছি, আমি তো আসতে চাইনি। আমাকে একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে চলে আসতে বাধ্য করা হয়েছিল। এমনকি আমি যখন হেলিকপ্টারে উঠি, তখনও জানতাম না যে আমাকে ভারতে নেওয়া হচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম আমি আমার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায় যাচ্ছি। হেলিকপ্টার যখন সীমান্ত অতিক্রম করে, তখন আমাকে জানানো হয় আমরা ভারতে যাচ্ছি।'
ডিসেম্বরে ফেরার প্রস্তুতি ও প্রাণের ঝুঁকি
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বারবার তার দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, 'দেশটা আমার। আমার বাবা এই দেশ স্বাধীন করেছেন। আমাকে কেন ফিরতে দেওয়া হবে না? আমি ডিসেম্বরেই ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, কারণ ওটা আমাদের বিজয়ের মাস।' তবে ফেরার পথে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা করছেন তিনি। তার ভাষায়, 'আমি জানি, আমি ফিরলে এয়ারপোর্টেই আমাকে হত্যা করা হতে পারে। শুধু আমার নয়, আমার ফেরার সঙ্গে যারা যুক্ত থাকবে, তাদের প্রত্যেকের জীবনের ঝুঁকি আছে। আমি কাউকে বিপদে ফেলে দেশে ফিরতে চাই না, তবে মানুষের পাশে আমাকে দাঁড়াতে হবে।'
ভারতের প্রতি সতর্কবার্তা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
বাংলাদেশে বর্তমানে ‘জঙ্গিবাদী শক্তির’ উত্থান ঘটছে দাবি করে শেখ হাসিনা ভারতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে বর্তমানে যে অস্থিরতা ও মৌলবাদী শক্তির বিস্তার ঘটছে, তার খেসারত শুধু আমাদের নয়, ভারতকেও দিতে হবে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত যদি মনে করে তারা শান্তিতে থাকবে, তবে সেটি ভুল হতে পারে।' তিনি দুই দেশের মধ্যে সামরিক জোটের চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নির্বাচন এবং বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে নিয়ে দিল্লির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নেতৃত্বের হাল ধরবেন শেখ সেলিম
দলের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেতৃত্ব কে দেবেন, সে বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি জানান, তার অনুপস্থিতিতে দলের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ছোট বোন শেখ রেহানার রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, 'রেহানা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়।'
তারেক রহমান ও অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে সমালোচনা
লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি নেতা তারেক রহমানের তীব্র সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তার অভিযোগ, তারেক রহমান বিদেশ থেকে বসে বাংলাদেশে লাশের রাজনীতি করছেন। অন্যদিকে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি ‘সুপরিকল্পিত নকশা’ (মেটিকুলাস ডিজাইন) বলে অভিহিত করেন তিনি। দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'আমার দেশের সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেখে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়।'
সবশেষে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, কোনো ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা অনুমতির জন্য তিনি বসে থাকবেন না। অবস্থা বুঝে যে কোনো সময় তিনি দেশের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন