সংবাদ

এআই কীভাবে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে?


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১২ পিএম

এআই কীভাবে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে?
বিল গেটসের সতর্কবার্তার পেছনে এআইয়ের যে সাত ভয়ংকর ঝুঁকি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজের গতি বাড়াচ্ছে, চিকিৎসা ও বিজ্ঞান গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি ভুল হাতে পড়ে, কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়াই আরও ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে, তাহলে এর ক্ষতির পরিসরও অভূতপূর্ব হতে পারে। 

মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তাটি মূলত সেই সম্ভাব্য বিপদের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।  গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানের সাক্ষাৎকারের একটি অংশে গেটস বলেন, এআই এমন শক্তিশালী প্রযুক্তি যে এটি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যার ফলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। 

তার ভাষায়, অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন মানুষের হাতে সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তির ব্যবহার আগে দেখা যেকোনো অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী বিপদের সমন্বয় তৈরি করতে পারে।

গেটস কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার পূর্বাভাস দেননি। তার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—এআই যত বেশি সক্ষম হচ্ছে, মানুষও তত বেশি ক্ষমতাশালী একটি হাতিয়ার হাতে পাচ্ছে। সেই হাতিয়ার যদি সাইবার হামলা, জীবাণু অস্ত্র, প্রতারণা, যুদ্ধ বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের মতো কাজে ব্যবহৃত হয়, ক্ষতির মাত্রা প্রচলিত প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বড় হতে পারে।

জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা

এআইয়ের সবচেয়ে গুরুতর সম্ভাব্য অপব্যবহারের একটি হলো জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করা। জীববিজ্ঞান সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণাপত্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা কিংবা জটিল গবেষণার ধাপ সাজানোর ক্ষেত্রে উন্নত এআই ব্যবহৃত হতে পারে। একই সক্ষমতা যদি ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো হয়, তাহলে জীবাণু অস্ত্র তৈরির পথে কিছু বাধা কমে যেতে পারে।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনে জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে এআইয়ের সম্ভাব্য অপব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীববৈজ্ঞানিক গবেষণায় উপকারী একই সক্ষমতা কখনো ক্ষতিকর কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে বৈধ গবেষণা বাধাগ্রস্ত না করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকও জানিয়েছে, তারা এমন ব্যবহার শনাক্ত করেছে যেখানে তাদের এআই মডেলকে জীবাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সাইবার হামলা আরও ভয়ংকর হওয়া

একজন দক্ষ হ্যাকারকে এখন অনেক কাজ নিজে করতে হয়। কিন্তু এআই সেই কাজের কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয় করতে পারে—কোড বিশ্লেষণ, দুর্বলতা খুঁজে বের করা, আক্রমণের বিভিন্ন ধাপ সাজানো কিংবা বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করা।

ফলে ভবিষ্যতের সাইবার হামলা শুধু একটি ওয়েবসাইট বা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি অবকাঠামো একসঙ্গে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনে উন্নত এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়ার বিষয়টি আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিল গেটসও এর আগে সতর্ক করেছেন, শক্তিশালী এআই ব্যবহার করে অসৎ পক্ষ হাসপাতাল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎব্যবস্থা ও সরকারি ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করতে পারে।

ভুয়া তথ্যের কারখানা

ভুয়া খবর নতুন কিছু নয়। কিন্তু এআই সেই কাজকে দ্রুত, সস্তা এবং ব্যাপক করে তুলতে পারে। একজন মানুষ একটি ভুয়া ছবি বা ভিডিও তৈরি করতে যত সময় নেবেন, এআই দিয়ে একই কাজ অনেক দ্রুত করা সম্ভব। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষায় হাজার হাজার বার্তা তৈরি, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে প্রচার এবং একই মিথ্যা তথ্যের অসংখ্য সংস্করণ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে এআই

এর ফলে একটি রাজনৈতিক সংকট, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিংবা যুদ্ধের সময় সত্য-মিথ্যা আলাদা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এখানে বিপদ শুধু একটি ভুয়া ছবি নয়। বিপদ হলো—এআই ব্যবহার করে একই সঙ্গে ছবি, ভিডিও, অডিও, লেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাল্পনিক পরিচয় তৈরি করে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বাস্তবতা তৈরি করা।

মানুষের পরিচয় নকল করে প্রতারণা

কারও কণ্ঠস্বর নকল করে ফোন করা, মুখের ছবি ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করা কিংবা ব্যক্তির লেখার ধরন অনুকরণ করে বার্তা পাঠানো—এআই এসব কাজকে আরও সহজ করছে।

ফলে ভবিষ্যতে একজন মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে শুধু ভুয়া ই-মেইল পাঠানো যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রতারক তাঁর পরিবারের সদস্যের কণ্ঠস্বর নকল করে ফোন করতে পারে, প্রতিষ্ঠানের প্রধানের মতো কথা বলতে পারে কিংবা ভিডিও কলে পরিচিত ব্যক্তির মুখ ব্যবহার করতে পারে।

বিল গেটসের আগের সতর্কবার্তাতেও এআইয়ের মাধ্যমে বড় আকারের প্রতারণা ও অপতথ্য ছড়ানোর ঝুঁকির কথা এসেছে।

যুদ্ধের ধরন বদলে দেওয়া

এআইয়ের সামরিক ব্যবহার ইতিমধ্যে বাস্তবতা। ভবিষ্যতে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আরও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা, নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কোনো প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ শেষ পর্যন্ত কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে?

যদি একাধিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তাহলে ভুল শনাক্তকরণ বা ভুল তথ্যের কারণে একটি ছোট সংঘাতও দ্রুত বড় আকার নিতে পারে। আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা আলোচনায় মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি

এআই শুধু তথ্য তৈরি করছে না; ধীরে ধীরে বাস্তব জগতের বিভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবহন, শিল্পকারখানা, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য অবকাঠামোয় এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বাড়ছে। এখানে একটি নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো এআই ব্যবস্থা ভুল সিদ্ধান্ত নিলে শুধু ভুল তথ্য তৈরি হবে না—বাস্তব জগতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনে এআই এজেন্টের ঝুঁকির কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমে গেলে কোনো ভুল দ্রুত এক ব্যবস্থা থেকে অন্য ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এআই যদি নিজেই আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে

সবচেয়ে গভীর উদ্বেগটি অবশ্য এখানেই। বর্তমান এআই মূলত মানুষের নির্দেশে কাজ করে। কিন্তু এমন এআই তৈরি হলে, যা নিজের কোড বিশ্লেষণ করতে পারে, নতুন সংস্করণ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় মানুষের সরাসরি তদারকি ছাড়াই কাজ করতে পারে—তখন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের প্রধান গবেষক ইভান হুবিঙ্গার সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বলেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাবনা তাঁর ব্যক্তিগত হিসাবে ১০ শতাংশের বেশি। এটি তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন—বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো পূর্বাভাস নয়।

এই ধরনের আশঙ্কা নিয়েই অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোদেই উন্নত এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমিয়ে নিরাপত্তা পরীক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং ইলন মাস্কও তাঁর আহ্বানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

এআই নিজেই মানবজাতির শত্রু?

এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।বিল গেটসের বক্তব্যে বিপদের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের অসৎ উদ্দেশ্য এবং অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তির সমন্বয়। অর্থাৎ ঝুঁকিটি কেবল এমন নয় যে এআই একদিন হঠাৎ নিজে থেকে মানবজাতিকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেবে।

একদিকে আছে মানুষের হাতে এআইয়ের অপব্যবহার—জীবাণু অস্ত্র, সাইবার হামলা, প্রতারণা, যুদ্ধ, অপতথ্য ও অবকাঠামোতে আক্রমণ। অন্যদিকে আছে আরও স্বয়ংক্রিয় ও ক্ষমতাশালী এআই ব্যবস্থাকে মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার সমস্যা।এই দুই ঝুঁকি এক নয়। প্রথমটি মূলত অপব্যবহারের ঝুঁকি, দ্বিতীয়টি নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি।

ভয় নয়, নিয়ন্ত্রণই মূল প্রশ্ন

এআই বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ একই প্রযুক্তি চিকিৎসা, বিজ্ঞান, শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা ও গবেষণায় বড় সুবিধা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনের ভাষ্যেও মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে—ক্ষতিকর ব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি উপকারী বৈজ্ঞানিক ব্যবহার কীভাবে চালু রাখা যায়।

মানুষের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে এআই

তাই আসল প্রশ্ন হয়তো এআই কতটা শক্তিশালী হবে, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—মানুষের হাতে এআই যত শক্তিশালী হবে, তার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণও কি ততটাই শক্তিশালী হবে?

বিল গেটসের সতর্কবার্তার গুরুত্ব এখানেই। তিনি বলেছেন, শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির নিজস্ব নিরাপত্তানীতি যথেষ্ট নয়; আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদেরও নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থার আলোচনায় যুক্ত হতে হবে এবং তা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

অর্থাৎ, এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় লড়াই সম্ভবত মানুষ বনাম যন্ত্রের নয়। বরং প্রযুক্তির গতি আর মানুষের নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার মধ্যে। আর সেই ব্যবধান যত বাড়বে, বিল গেটসের সতর্কবার্তাটিও তত বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


এআই কীভাবে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে?

প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজের গতি বাড়াচ্ছে, চিকিৎসা ও বিজ্ঞান গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি ভুল হাতে পড়ে, কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়াই আরও ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে, তাহলে এর ক্ষতির পরিসরও অভূতপূর্ব হতে পারে। 

মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তাটি মূলত সেই সম্ভাব্য বিপদের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।  গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানের সাক্ষাৎকারের একটি অংশে গেটস বলেন, এআই এমন শক্তিশালী প্রযুক্তি যে এটি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যার ফলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। 

তার ভাষায়, অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন মানুষের হাতে সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তির ব্যবহার আগে দেখা যেকোনো অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী বিপদের সমন্বয় তৈরি করতে পারে।

গেটস কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার পূর্বাভাস দেননি। তার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—এআই যত বেশি সক্ষম হচ্ছে, মানুষও তত বেশি ক্ষমতাশালী একটি হাতিয়ার হাতে পাচ্ছে। সেই হাতিয়ার যদি সাইবার হামলা, জীবাণু অস্ত্র, প্রতারণা, যুদ্ধ বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের মতো কাজে ব্যবহৃত হয়, ক্ষতির মাত্রা প্রচলিত প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বড় হতে পারে।

জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা

এআইয়ের সবচেয়ে গুরুতর সম্ভাব্য অপব্যবহারের একটি হলো জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করা। জীববিজ্ঞান সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণাপত্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা কিংবা জটিল গবেষণার ধাপ সাজানোর ক্ষেত্রে উন্নত এআই ব্যবহৃত হতে পারে। একই সক্ষমতা যদি ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো হয়, তাহলে জীবাণু অস্ত্র তৈরির পথে কিছু বাধা কমে যেতে পারে।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনে জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে এআইয়ের সম্ভাব্য অপব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীববৈজ্ঞানিক গবেষণায় উপকারী একই সক্ষমতা কখনো ক্ষতিকর কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে বৈধ গবেষণা বাধাগ্রস্ত না করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকও জানিয়েছে, তারা এমন ব্যবহার শনাক্ত করেছে যেখানে তাদের এআই মডেলকে জীবাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সাইবার হামলা আরও ভয়ংকর হওয়া

একজন দক্ষ হ্যাকারকে এখন অনেক কাজ নিজে করতে হয়। কিন্তু এআই সেই কাজের কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয় করতে পারে—কোড বিশ্লেষণ, দুর্বলতা খুঁজে বের করা, আক্রমণের বিভিন্ন ধাপ সাজানো কিংবা বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করা।

ফলে ভবিষ্যতের সাইবার হামলা শুধু একটি ওয়েবসাইট বা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি অবকাঠামো একসঙ্গে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনে উন্নত এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়ার বিষয়টি আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিল গেটসও এর আগে সতর্ক করেছেন, শক্তিশালী এআই ব্যবহার করে অসৎ পক্ষ হাসপাতাল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎব্যবস্থা ও সরকারি ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করতে পারে।

ভুয়া তথ্যের কারখানা

ভুয়া খবর নতুন কিছু নয়। কিন্তু এআই সেই কাজকে দ্রুত, সস্তা এবং ব্যাপক করে তুলতে পারে। একজন মানুষ একটি ভুয়া ছবি বা ভিডিও তৈরি করতে যত সময় নেবেন, এআই দিয়ে একই কাজ অনেক দ্রুত করা সম্ভব। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষায় হাজার হাজার বার্তা তৈরি, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে প্রচার এবং একই মিথ্যা তথ্যের অসংখ্য সংস্করণ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে এআই

এর ফলে একটি রাজনৈতিক সংকট, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিংবা যুদ্ধের সময় সত্য-মিথ্যা আলাদা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এখানে বিপদ শুধু একটি ভুয়া ছবি নয়। বিপদ হলো—এআই ব্যবহার করে একই সঙ্গে ছবি, ভিডিও, অডিও, লেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাল্পনিক পরিচয় তৈরি করে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বাস্তবতা তৈরি করা।

মানুষের পরিচয় নকল করে প্রতারণা

কারও কণ্ঠস্বর নকল করে ফোন করা, মুখের ছবি ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করা কিংবা ব্যক্তির লেখার ধরন অনুকরণ করে বার্তা পাঠানো—এআই এসব কাজকে আরও সহজ করছে।

ফলে ভবিষ্যতে একজন মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে শুধু ভুয়া ই-মেইল পাঠানো যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রতারক তাঁর পরিবারের সদস্যের কণ্ঠস্বর নকল করে ফোন করতে পারে, প্রতিষ্ঠানের প্রধানের মতো কথা বলতে পারে কিংবা ভিডিও কলে পরিচিত ব্যক্তির মুখ ব্যবহার করতে পারে।

বিল গেটসের আগের সতর্কবার্তাতেও এআইয়ের মাধ্যমে বড় আকারের প্রতারণা ও অপতথ্য ছড়ানোর ঝুঁকির কথা এসেছে।

যুদ্ধের ধরন বদলে দেওয়া

এআইয়ের সামরিক ব্যবহার ইতিমধ্যে বাস্তবতা। ভবিষ্যতে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আরও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা, নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কোনো প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ শেষ পর্যন্ত কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে?

যদি একাধিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তাহলে ভুল শনাক্তকরণ বা ভুল তথ্যের কারণে একটি ছোট সংঘাতও দ্রুত বড় আকার নিতে পারে। আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা আলোচনায় মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি

এআই শুধু তথ্য তৈরি করছে না; ধীরে ধীরে বাস্তব জগতের বিভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবহন, শিল্পকারখানা, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য অবকাঠামোয় এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বাড়ছে। এখানে একটি নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো এআই ব্যবস্থা ভুল সিদ্ধান্ত নিলে শুধু ভুল তথ্য তৈরি হবে না—বাস্তব জগতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনে এআই এজেন্টের ঝুঁকির কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমে গেলে কোনো ভুল দ্রুত এক ব্যবস্থা থেকে অন্য ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এআই যদি নিজেই আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে

সবচেয়ে গভীর উদ্বেগটি অবশ্য এখানেই। বর্তমান এআই মূলত মানুষের নির্দেশে কাজ করে। কিন্তু এমন এআই তৈরি হলে, যা নিজের কোড বিশ্লেষণ করতে পারে, নতুন সংস্করণ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় মানুষের সরাসরি তদারকি ছাড়াই কাজ করতে পারে—তখন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের প্রধান গবেষক ইভান হুবিঙ্গার সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বলেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাবনা তাঁর ব্যক্তিগত হিসাবে ১০ শতাংশের বেশি। এটি তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন—বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো পূর্বাভাস নয়।

এই ধরনের আশঙ্কা নিয়েই অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোদেই উন্নত এআইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমিয়ে নিরাপত্তা পরীক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং ইলন মাস্কও তাঁর আহ্বানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

এআই নিজেই মানবজাতির শত্রু?

এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।বিল গেটসের বক্তব্যে বিপদের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের অসৎ উদ্দেশ্য এবং অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তির সমন্বয়। অর্থাৎ ঝুঁকিটি কেবল এমন নয় যে এআই একদিন হঠাৎ নিজে থেকে মানবজাতিকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেবে।

একদিকে আছে মানুষের হাতে এআইয়ের অপব্যবহার—জীবাণু অস্ত্র, সাইবার হামলা, প্রতারণা, যুদ্ধ, অপতথ্য ও অবকাঠামোতে আক্রমণ। অন্যদিকে আছে আরও স্বয়ংক্রিয় ও ক্ষমতাশালী এআই ব্যবস্থাকে মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার সমস্যা।এই দুই ঝুঁকি এক নয়। প্রথমটি মূলত অপব্যবহারের ঝুঁকি, দ্বিতীয়টি নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি।

ভয় নয়, নিয়ন্ত্রণই মূল প্রশ্ন

এআই বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ একই প্রযুক্তি চিকিৎসা, বিজ্ঞান, শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা ও গবেষণায় বড় সুবিধা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনের ভাষ্যেও মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে—ক্ষতিকর ব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি উপকারী বৈজ্ঞানিক ব্যবহার কীভাবে চালু রাখা যায়।

মানুষের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে এআই

তাই আসল প্রশ্ন হয়তো এআই কতটা শক্তিশালী হবে, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—মানুষের হাতে এআই যত শক্তিশালী হবে, তার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণও কি ততটাই শক্তিশালী হবে?

বিল গেটসের সতর্কবার্তার গুরুত্ব এখানেই। তিনি বলেছেন, শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির নিজস্ব নিরাপত্তানীতি যথেষ্ট নয়; আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদেরও নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থার আলোচনায় যুক্ত হতে হবে এবং তা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

অর্থাৎ, এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় লড়াই সম্ভবত মানুষ বনাম যন্ত্রের নয়। বরং প্রযুক্তির গতি আর মানুষের নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার মধ্যে। আর সেই ব্যবধান যত বাড়বে, বিল গেটসের সতর্কবার্তাটিও তত বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত