মরক্কোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রতিকূল মরুভূমিতে বিরল প্রজাতির স্যান্ড ক্যাট বা বালি বিড়ালের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি একটি পাহাড়ের পাদদেশে একটি মা বিড়াল ও তার পাঁচটি শাবকের সন্ধান পাওয়া যায়। এই ক্ষুদ্র ফেলিড প্রজাতিটি সাহারার চরম পরিবেশে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য বিস্ময়কর।
স্যান্ড ক্যাট বিশ্বের ক্ষুদ্রতম বন্য ফেলিড প্রজাতিগুলোর একটি। এর শরীরের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৪০ থেকে ৫৭ সেন্টিমিটার। ওজন ১.৪ থেকে ৩.৪ কেজির মধ্যে সীমাবদ্ধ। দেখতে অনেকটা ছোট গৃহপালিত বিড়ালের মতো হলেও এর চেহারায় রয়েছে মরুভূমির জীবনযাপনের নিখুঁত ছাপ।
এর লোমের রং ফ্যাকাশে হলুদ বা ধূসর-বাদামি, যা বালির সঙ্গে মিশে যেতে সাহায্য করে। শরীরে ডোরা বা ছোপ নেই, তবে কিছু নমুনার পায়ে কালো দাগ দেখা যায় । লম্বা লেজে থাকে ২ থেকে ৬টি কালো রিং এবং কালো অগ্রভাগ।
স্যান্ড ক্যাটের বিবর্তনীয় ইতিহাস বেশ জটিল। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন বছর আগে ফেলিড পরিবারের যে শাখা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তার সঙ্গে স্যান্ড ক্যাটের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই শাখায় রয়েছে বন্য বিড়াল, জঙ্গল ক্যাট এবং ব্ল্যাক-ফুটেড ক্যাট ।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্যান্ড ক্যাটের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। কেউ এটিকে প্যালাস ক্যাটের নিকটাত্মীয় বলে মনে করতেন, আবার কেউ একে বন্য বিড়ালের কাছাকাছি স্থান দিতেন । বর্তমানে এটিকে ফেলিস গণের অন্তর্ভুক্ত স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
স্যান্ড ক্যাট মূলত নিশাচর শিকারি। এরা একাকি জীবনযাপন করে। নিজের এলাকা চিহ্নিত করতে গন্ধ ব্যবহার করে। দিনের বেলা এরা বালির নিচে তৈরি গর্তে বা পাথরের আড়ালে বিশ্রাম নেয়।
সম্প্রতি নাইজার ও চাদের মরুভূমিতে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, স্যান্ড ক্যাট সূর্যোদয়ের এক-দুই ঘণ্টার মধ্যে এবং সূর্যাস্তের সময়ও সক্রিয় থাকে। কখনও কখনও দিনের আলোতেও এদের দেখা যায়। বিশেষ করে শীতকালে যখন তাপমাত্রা সহনীয় থাকে।
স্যান্ড ক্যাটের খাদ্যতালিকায় প্রধানত থাকে ছোট ইঁদুর, বিশেষ করে জারবিল, জার্দ ও জারবোয়া। এ ছাড়া টিকটিকি, সাপ, পাখি, পোকামাকড় এবং কখনও কখনও খরগোশও শিকার করে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্যান্ড ক্যাট শিকার থেকে যে আর্দ্রতা পায়, তা দিয়েই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। তবে সুযোগ পেলে পানি পান করতেও দ্বিধা করে না।
স্যান্ড ক্যাটের শরীর মরুভূমির চরম পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত। এর পায়ের তলায় ঘন, কালো ও শক্ত লোমের স্তর থাকে, যা উত্তপ্ত বালি থেকে পা রক্ষা করে এবং শিকার ধরতে গিয়ে নিঃশব্দে চলতে সাহায্য করে।
এর বড় কান তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তি দেয়, যা মাটির নিচে চলাচলকারী ছোট প্রাণীদের শব্দ শুনতে সাহায্য করে। কানগুলি মাথার পাশে নিচুতে বসানো, যা বালির ঝড়ের সময় সুরক্ষা দেয়। চোখের চারপাশে সাদা রিং এবং গালের ওপর লাল রেখা এদের চেহারাকে আলাদা করে তোলে।
স্যান্ড ক্যাট মরক্কো, আলজেরিয়া, নাইজার, মিশর, সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত, ইরান, পাকিস্তানসহ উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার মরুভূমিতে পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) স্যান্ড ক্যাটকে ‘নূন্যতম উদ্বেগের’ প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তবে এর সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই সীমিত। কিছু অঞ্চলে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
সংরক্ষণবাদীরা বলছেন, এই প্রজাতির ভবিষ্যৎ রক্ষায় আরও গবেষণা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। মরক্কোতে মা বিড়াল ও পাঁচ শাবকের সন্ধান এই ক্ষুদ্র শিকারির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আশা জোগাচ্ছে।

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মরক্কোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রতিকূল মরুভূমিতে বিরল প্রজাতির স্যান্ড ক্যাট বা বালি বিড়ালের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি একটি পাহাড়ের পাদদেশে একটি মা বিড়াল ও তার পাঁচটি শাবকের সন্ধান পাওয়া যায়। এই ক্ষুদ্র ফেলিড প্রজাতিটি সাহারার চরম পরিবেশে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য বিস্ময়কর।
স্যান্ড ক্যাট বিশ্বের ক্ষুদ্রতম বন্য ফেলিড প্রজাতিগুলোর একটি। এর শরীরের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৪০ থেকে ৫৭ সেন্টিমিটার। ওজন ১.৪ থেকে ৩.৪ কেজির মধ্যে সীমাবদ্ধ। দেখতে অনেকটা ছোট গৃহপালিত বিড়ালের মতো হলেও এর চেহারায় রয়েছে মরুভূমির জীবনযাপনের নিখুঁত ছাপ।
এর লোমের রং ফ্যাকাশে হলুদ বা ধূসর-বাদামি, যা বালির সঙ্গে মিশে যেতে সাহায্য করে। শরীরে ডোরা বা ছোপ নেই, তবে কিছু নমুনার পায়ে কালো দাগ দেখা যায় । লম্বা লেজে থাকে ২ থেকে ৬টি কালো রিং এবং কালো অগ্রভাগ।
স্যান্ড ক্যাটের বিবর্তনীয় ইতিহাস বেশ জটিল। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন বছর আগে ফেলিড পরিবারের যে শাখা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তার সঙ্গে স্যান্ড ক্যাটের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই শাখায় রয়েছে বন্য বিড়াল, জঙ্গল ক্যাট এবং ব্ল্যাক-ফুটেড ক্যাট ।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্যান্ড ক্যাটের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। কেউ এটিকে প্যালাস ক্যাটের নিকটাত্মীয় বলে মনে করতেন, আবার কেউ একে বন্য বিড়ালের কাছাকাছি স্থান দিতেন । বর্তমানে এটিকে ফেলিস গণের অন্তর্ভুক্ত স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
স্যান্ড ক্যাট মূলত নিশাচর শিকারি। এরা একাকি জীবনযাপন করে। নিজের এলাকা চিহ্নিত করতে গন্ধ ব্যবহার করে। দিনের বেলা এরা বালির নিচে তৈরি গর্তে বা পাথরের আড়ালে বিশ্রাম নেয়।
সম্প্রতি নাইজার ও চাদের মরুভূমিতে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, স্যান্ড ক্যাট সূর্যোদয়ের এক-দুই ঘণ্টার মধ্যে এবং সূর্যাস্তের সময়ও সক্রিয় থাকে। কখনও কখনও দিনের আলোতেও এদের দেখা যায়। বিশেষ করে শীতকালে যখন তাপমাত্রা সহনীয় থাকে।
স্যান্ড ক্যাটের খাদ্যতালিকায় প্রধানত থাকে ছোট ইঁদুর, বিশেষ করে জারবিল, জার্দ ও জারবোয়া। এ ছাড়া টিকটিকি, সাপ, পাখি, পোকামাকড় এবং কখনও কখনও খরগোশও শিকার করে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্যান্ড ক্যাট শিকার থেকে যে আর্দ্রতা পায়, তা দিয়েই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। তবে সুযোগ পেলে পানি পান করতেও দ্বিধা করে না।
স্যান্ড ক্যাটের শরীর মরুভূমির চরম পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত। এর পায়ের তলায় ঘন, কালো ও শক্ত লোমের স্তর থাকে, যা উত্তপ্ত বালি থেকে পা রক্ষা করে এবং শিকার ধরতে গিয়ে নিঃশব্দে চলতে সাহায্য করে।
এর বড় কান তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তি দেয়, যা মাটির নিচে চলাচলকারী ছোট প্রাণীদের শব্দ শুনতে সাহায্য করে। কানগুলি মাথার পাশে নিচুতে বসানো, যা বালির ঝড়ের সময় সুরক্ষা দেয়। চোখের চারপাশে সাদা রিং এবং গালের ওপর লাল রেখা এদের চেহারাকে আলাদা করে তোলে।
স্যান্ড ক্যাট মরক্কো, আলজেরিয়া, নাইজার, মিশর, সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত, ইরান, পাকিস্তানসহ উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার মরুভূমিতে পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) স্যান্ড ক্যাটকে ‘নূন্যতম উদ্বেগের’ প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তবে এর সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই সীমিত। কিছু অঞ্চলে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
সংরক্ষণবাদীরা বলছেন, এই প্রজাতির ভবিষ্যৎ রক্ষায় আরও গবেষণা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। মরক্কোতে মা বিড়াল ও পাঁচ শাবকের সন্ধান এই ক্ষুদ্র শিকারির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আশা জোগাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন