সংবাদ

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামার আশঙ্কা বিশ্বব্যাংকের


প্রকাশ: ৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক  ৯ শতাংশে নামার আশঙ্কা বিশ্বব্যাংকের

  • রাজস্ব, আর্থিক খাত এবং ব্যবসা পরিবেশে সংস্কার না হলে অর্থনৈতিক স্থীতিশীলতা আসবে না
  • ২০২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপির অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন
  • সঠিকভাবে পরিকল্পিত শিল্পনীতি নির্দিষ্ট বাজারের সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়ক হতে পারে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে এবং আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে দশমিক শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, দারিদ্রের হার বৃদ্ধি ব্যাংক খাতের দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে দ্রুত কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে নানা চাপে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ধীরগতির মধ্যে রয়েছে, দারিদ্র্য বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থায় রয়েছে এবং ব্যাংক খাত চাপের মধ্যে আছে। এর পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ দুর্বল এবং বেসরকারি বিনিয়োগও কমে গেছে। বুধবারবাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট আপডেটশীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমে দশমিক শতাংশে নেমে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, রপ্তানি আয় কমতে পারে এবং প্রবাসী আয়ও হ্রাস পেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত হওয়ায় এবং ব্যাংক খাত দুর্বল থাকায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে।

ফলে সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব আরও বেশি পড়তে পারে। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি। বিশেষ করে রাজস্ব বৃদ্ধি, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি গড়ে দশমিক শতাংশে রয়েছে। খাদ্য অখাদ্য উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি বেশি। এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক শতাংশ, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক শতাংশে। অর্থাৎ প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যাঁ পেস বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পেছনে দীর্ঘদিন ধরে সহনশীলতা বা প্রতিকূলতা মোকাবিলার সক্ষমতা বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত এবং ব্যবসা পরিবেশে কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার না হলে এই সক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। শক্তিশালী দ্রুত সংস্কার গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এতে দেশ আবারও টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারবে এবং আরও বেশি ভালো বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে।

একই পরামর্শ দেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা। তিনি বলেন, ‘দ্রুত বাড়তে থাকা শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানো এবং প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ম-কানুনের অনিশ্চয়তা কমানো, লক্ষ্যভিত্তিকভাবে বিধিনিষেধ শিথিল করা, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানের বিকাশে যেসব বাধা রয়েছে সেগুলো দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

ব্যাংক খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক শতাংশে পৌঁছেছে যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি। অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার ঘাটতিও রয়েছে। বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীল হলেও রপ্তানি এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কম। ২০২৫ অর্থবছরে দেশের কর মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত শতাংশের নিচে নেমে গেছে যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, দেশের বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও ছোট মাঝারি উদ্যোক্তারা নানা সমস্যায় রয়েছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অর্থায়নের অভাব তাদের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে। সংস্থাটি কিছু সুপারিশ করেছে। সেগুলো হলো, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, বাণিজ্য নীতি সহজ করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নত করা জরুরি।

ছাড়া সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো সমন্বিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করা সম্ভব। এতে দারিদ্র্য কমবে এবং অর্থনৈতিক সুফল সবার মধ্যে আরও সমভাবে বণ্টিত হবে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইওহানেস জুট বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এখনো ভালো রয়েছে। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং অর্থনীতিকে বিভিন্ন ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম করতে দেশগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসরগে বলেন, ‘সামগ্রিক বিস্তৃত সংস্কার এখনো অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তবে সঠিকভাবে পরিকল্পিত শিল্পনীতি নির্দিষ্ট বাজারের সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়ক হতে পারে। যেমন শিল্পপার্ক স্থাপন, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু, বাজারে প্রবেশ সহজ করা এবং রপ্তানির মান উন্নয়ন, ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, রপ্তানি কমতে পারে এবং প্রবাসী আয় হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে, ফলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও এই সংঘাত বড় প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি বেশি চাপে পড়বে।

সংস্কারের সুপারিশ করে সংস্থাটি বলছে, স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করা। একই সঙ্গে বেশি টেকসই কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে স্বল্প মধ্যমেয়াদি নীতির সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। বাহ্যিক ধাক্কা মোকাবিলায় সীমিত নীতিগত সুযোগকে সতর্কভাবে ব্যবহার করতে হবে। যেমন, আমদানি মূল্য বাড়ার কিছু অংশ সমন্বয় করতে দেওয়া, পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সাময়িক লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন করা জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাহিদা জোগান উভয় দিকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।

একদিকে কার্যকর বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রানীতি প্রয়োগ করতে হবে, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দুর্নীতির মতো সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন কমাতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাও জরুরি। এর জন্য ব্যাংকগুলোর মূলধন বাড়ানো, খেলাপি ঋণ দ্রুত সমাধান করা, তদারকি জোরদার করা এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন করতে হবে।

মূল সারাংশতে সংস্থাটি জানায়, বেসরকারি বিনিয়োগ কর্মসংস্থান বাড়াতে নিয়ন্ত্রক জটিলতা বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে ব্যবসা পরিবেশ উন্নত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কর্মসংস্থান সংকট সমাধানে সমন্বিত সুসংগঠিত নীতিগত উদ্যোগ দরকার।

এজন্য কাঠামোগত চারটি বড় ঘাটতি দূর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, অবকাঠামো ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন জ্বালানি খাতে উন্নয়ন প্রয়োজন, যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজে পরিচালিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক ব্যবসা পরিবেশে সমস্যা রয়েছে। জটিল অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো প্রয়োগ করা হয় এমন নিয়ম-কানুন ব্যবসার জন্য বাধা তৈরি করছে, যা সহজ স্বচ্ছ করা জরুরি। তৃতীয়ত, দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। শ্রমবাজারে যে ধরনের দক্ষতার চাহিদা আছে, তার সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতার মিল নেই। এই ব্যবধান কমাতে প্রশিক্ষণ শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। চতুর্থত, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এখনো কম, যা বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থান অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ২৪ মে ২০২৬


বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামার আশঙ্কা বিশ্বব্যাংকের

প্রকাশের তারিখ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

  • রাজস্ব, আর্থিক খাত এবং ব্যবসা পরিবেশে সংস্কার না হলে অর্থনৈতিক স্থীতিশীলতা আসবে না
  • ২০২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপির অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন
  • সঠিকভাবে পরিকল্পিত শিল্পনীতি নির্দিষ্ট বাজারের সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়ক হতে পারে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে এবং আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে দশমিক শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, দারিদ্রের হার বৃদ্ধি ব্যাংক খাতের দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে দ্রুত কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে নানা চাপে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ধীরগতির মধ্যে রয়েছে, দারিদ্র্য বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থায় রয়েছে এবং ব্যাংক খাত চাপের মধ্যে আছে। এর পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ দুর্বল এবং বেসরকারি বিনিয়োগও কমে গেছে। বুধবারবাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট আপডেটশীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমে দশমিক শতাংশে নেমে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, রপ্তানি আয় কমতে পারে এবং প্রবাসী আয়ও হ্রাস পেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত হওয়ায় এবং ব্যাংক খাত দুর্বল থাকায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে।

ফলে সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব আরও বেশি পড়তে পারে। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি। বিশেষ করে রাজস্ব বৃদ্ধি, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি গড়ে দশমিক শতাংশে রয়েছে। খাদ্য অখাদ্য উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি বেশি। এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক শতাংশ, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক শতাংশে। অর্থাৎ প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যাঁ পেস বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পেছনে দীর্ঘদিন ধরে সহনশীলতা বা প্রতিকূলতা মোকাবিলার সক্ষমতা বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত এবং ব্যবসা পরিবেশে কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার না হলে এই সক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। শক্তিশালী দ্রুত সংস্কার গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এতে দেশ আবারও টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারবে এবং আরও বেশি ভালো বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে।

একই পরামর্শ দেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা। তিনি বলেন, ‘দ্রুত বাড়তে থাকা শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানো এবং প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ম-কানুনের অনিশ্চয়তা কমানো, লক্ষ্যভিত্তিকভাবে বিধিনিষেধ শিথিল করা, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানের বিকাশে যেসব বাধা রয়েছে সেগুলো দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

ব্যাংক খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক শতাংশে পৌঁছেছে যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি। অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার ঘাটতিও রয়েছে। বৈদেশিক খাত কিছুটা স্থিতিশীল হলেও রপ্তানি এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কম। ২০২৫ অর্থবছরে দেশের কর মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত শতাংশের নিচে নেমে গেছে যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, দেশের বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও ছোট মাঝারি উদ্যোক্তারা নানা সমস্যায় রয়েছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অর্থায়নের অভাব তাদের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে। সংস্থাটি কিছু সুপারিশ করেছে। সেগুলো হলো, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, বাণিজ্য নীতি সহজ করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নত করা জরুরি।

ছাড়া সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো সমন্বিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করা সম্ভব। এতে দারিদ্র্য কমবে এবং অর্থনৈতিক সুফল সবার মধ্যে আরও সমভাবে বণ্টিত হবে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইওহানেস জুট বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এখনো ভালো রয়েছে। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং অর্থনীতিকে বিভিন্ন ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষম করতে দেশগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসরগে বলেন, ‘সামগ্রিক বিস্তৃত সংস্কার এখনো অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তবে সঠিকভাবে পরিকল্পিত শিল্পনীতি নির্দিষ্ট বাজারের সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়ক হতে পারে। যেমন শিল্পপার্ক স্থাপন, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু, বাজারে প্রবেশ সহজ করা এবং রপ্তানির মান উন্নয়ন, ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, রপ্তানি কমতে পারে এবং প্রবাসী আয় হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে, ফলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও এই সংঘাত বড় প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি বেশি চাপে পড়বে।

সংস্কারের সুপারিশ করে সংস্থাটি বলছে, স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করা। একই সঙ্গে বেশি টেকসই কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে স্বল্প মধ্যমেয়াদি নীতির সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। বাহ্যিক ধাক্কা মোকাবিলায় সীমিত নীতিগত সুযোগকে সতর্কভাবে ব্যবহার করতে হবে। যেমন, আমদানি মূল্য বাড়ার কিছু অংশ সমন্বয় করতে দেওয়া, পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সাময়িক লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন করা জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাহিদা জোগান উভয় দিকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।

একদিকে কার্যকর বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রানীতি প্রয়োগ করতে হবে, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দুর্নীতির মতো সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন কমাতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাও জরুরি। এর জন্য ব্যাংকগুলোর মূলধন বাড়ানো, খেলাপি ঋণ দ্রুত সমাধান করা, তদারকি জোরদার করা এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন করতে হবে।

মূল সারাংশতে সংস্থাটি জানায়, বেসরকারি বিনিয়োগ কর্মসংস্থান বাড়াতে নিয়ন্ত্রক জটিলতা বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে ব্যবসা পরিবেশ উন্নত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কর্মসংস্থান সংকট সমাধানে সমন্বিত সুসংগঠিত নীতিগত উদ্যোগ দরকার।

এজন্য কাঠামোগত চারটি বড় ঘাটতি দূর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, অবকাঠামো ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন জ্বালানি খাতে উন্নয়ন প্রয়োজন, যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজে পরিচালিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক ব্যবসা পরিবেশে সমস্যা রয়েছে। জটিল অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো প্রয়োগ করা হয় এমন নিয়ম-কানুন ব্যবসার জন্য বাধা তৈরি করছে, যা সহজ স্বচ্ছ করা জরুরি। তৃতীয়ত, দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। শ্রমবাজারে যে ধরনের দক্ষতার চাহিদা আছে, তার সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতার মিল নেই। এই ব্যবধান কমাতে প্রশিক্ষণ শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। চতুর্থত, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এখনো কম, যা বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থান অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত