সংবাদ

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে অংশীজনদের আপত্তি


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে অংশীজনদের আপত্তি
আবাসিক-বাণিজ্যিক-শিল্প: সব খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব, অংশীজনদের আপত্তি

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ও সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাবের পরদিন খুচরা পর্যায়ে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পসহ সব খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি কোম্পানিগুলো। খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৬ থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। 

বৃহস্পতিবার (২১ মে) ঢাকার ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত দ্বিতীয় দিনের গণশুনানিতে ৬টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি এই প্রস্তাব তুলে ধরে। পাইকারি পর্যায়ে যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে সেই বর্ধিত খরচও গ্রাহক পর্যায়ে যুক্ত করার যৌথ আবেদন জানায় প্রতিষ্ঠানগুলো।

গণশুনানিতে শুধু দাম বাড়ানোর প্রস্তাবই আসেনি, বরং গ্রাহকশ্রেণি পুনর্নির্ধারণ, প্রি-পেইড মিটারে নতুন ধরনের চার্জ আরোপ, বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় আনা এবং শিল্প গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টির মতো একাধিক প্রস্তাব সামনে এসেছে।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর এসব প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন গণশুনানিতে অংশ নেওয়া ভোক্তা অধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী ও শিল্প সংগঠনের নেতারা।

 গণশুনানিতে বক্তব্যে অংশীজনরা ভোক্তার ওপর নতুন চাপ না দিয়ে ব্যয় কমানোর পথ খোঁজার দাবি তুলেছেন। তাদের কয়েকজন বলছেন, বিদ্যুৎ খাতকে মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে দেখা যাবে না। ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস, প্রকল্প ব্যয় ও অদক্ষতার বোঝা ভোক্তার ওপর চাপানো যাবে না।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়ে শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বলেছেন, “বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, কাঁচামালের উচ্চ মূল্য এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশীয় শিল্প খাত এমনিতেই টিকে থাকার লড়াই করছে। এই অবস্থায় নতুন করে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে তা বহন করার মতো ক্ষমতা শিল্প খাতের নেই।”

আগের দিন বুধবার (২০ মে) প্রথম দিনের গণশুনানিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে এক টাকা ২০ পয়সা থেকে এক টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করে। একই দিনে শুনানিতে বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিট ১৯ পয়সা বা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি। 

প্রথম দিনের শুনানিতে অংশ নিয়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।

বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ছয় বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানির মোট গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৯৮ লাখের বেশি। এর মধ্যে গৃহস্থালি গ্রাহক ৪ কোটি ২৫ লাখের বেশি এবং লাইফলাইন গ্রাহক প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ। বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের গ্রাহক সবচেয়ে বেশি। মার্চ পর্যন্ত তাদের মোট গ্রাহক ৩ কোটি ৯১ লাখের বেশি, গৃহস্থালি গ্রাহক ৩ কোটি ৩৯ লাখের বেশি।

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রির পাশপাশি বিপিডিবি কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে। এছাড়া, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)- সরকারি মোট এই ছয়টি প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। 

সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্যে দেখা যায়, বিতরণ লাইনে গড় সিস্টেম লস ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ হলেও কিছু কিছু সংস্থায় এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি, যা গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বিপিডিবির দাবি, ইউনিটে ঘাটতি ‘২৯ পয়সা’

বিপিডিবি গণশুনানিতে জানিয়েছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ট্যারিফ বজায় থাকলে তাদের প্রতি ইউনিটে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াবে ২৯ পয়সা। এই আর্থিক ঘাটতি সমন্বয় করার জন্য তারা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে।

একই সঙ্গে সংস্থাটি একটি নতুন নিয়ম চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। 

বর্তমানে ৮০ কিলোওয়াট পর্যন্ত নিম্নচাপ (এলটি) গ্রাহকসীমা রয়েছে, যা কমিয়ে ৫০ কিলোওয়াট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, ৫০ কিলোওয়াটের বেশি লোড ব্যবহারকারী গ্রাহকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মধ্যচাপ (এমটি) গ্রাহকশ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। 

বিপিডিবির দাবি, বর্তমানে ৫০ কিলোওয়াটের বেশি লোডের গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে একই ট্রান্সফরমার থেকে সীমিত সংখ্যক গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। 

এছাড়া, মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণ ট্যারিফ থেকে সরিয়ে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বিপিডিবি।

পল্লী বিদ্যুতের ৫.৯৩% দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

ঢাকার বাইরে বেশীরভাগ জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা বিআরইবির আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গড়ে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য ৮ টাকা ৫০ পয়সা হলেও লোকসান এড়িয়ে সংস্থাটিকে সচল রাখতে এই মূল্য কমপক্ষে ৯ টাকা করা জরুরি।

দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ‘লাইফলাইন’ সুবিধা আরও সংকুচিত করার প্রস্তাব দিয়েছে বিআরইবি। তাদের নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহকের অনুমোদিত লোড ১ কিলোওয়াট বা তার কম এবং মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার সর্বোচ্চ ৫০ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, কেবল তারাই লাইফলাইন সুবিধা পাবেন।

এর বাইরে ব্যাটারিচালিত চার্জিং স্টেশনগুলোর জন্য আলাদা গ্রাহকশ্রেণি তৈরি করা, ইটভাটা ও চিলিং সেন্টারগুলোকে বাণিজ্যিক থেকে শিল্পশ্রেণিতে রূপান্তর করা এবং বহুতল ভবনে একাধিক শিল্প সংযোগ দেওয়ার ব্যাপারেও তারা সুপারিশ করেছে বিআরইবি।

ডিপিডিসির প্রস্তাব ৬.৯৬% বাড়ানোর

ঢাকার  একাংশ এবং নারায়ণগঞ্জের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ডিপিডিসি গড়ে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করেছে। তাদের দাবি, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও বর্তমান পরিচালন ব্যয়ের কারণে তাদের বিপুল রাজস্ব ঘাটতি থেকে যাবে।

ঘাটতি পূরণে ডিপিডিসি কিছু নতুন নিয়ম চালুর প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন করে সিকিউরিটি চার্জ আদায় করা এবং যেসব গ্রাহকের পাওয়ার ফ্যাক্টর কম, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। 

এছাড়া, যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ট্যারিফ বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করার এবং বস্তি এলাকায় কক্ষভিত্তিক ফ্ল্যাট ট্যারিফ চালুর সুপারিশ করেছে তারা।

ডেসকোর প্রস্তাব ৯.৬৭ শতাংশ বৃদ্ধির

ঢাকার উত্তরাঞ্চল ও মিরপুর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান ডেসকো জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত তিন বছরে তাদের মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬১১ কোটি টাকা।এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি ও ঘাটতি মোকাবিলা করতে সংস্থাটি গড়ে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব পেশ করেছে। 

ডেসকো তাদের আবেদনে আরও উল্লেখ করেছে, প্রি-পেইড গ্রাহকদের জন্য বর্তমানে যে রিবেট বা ছাড় সুবিধা চালু আছে, তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে ডিমান্ড চার্জের পরিমাণও বাড়ানো দরকার।

ওজোপাডিকোর দাবি, ইউনিটে ঘাটতি ‘৮৫ পয়সা’

দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকো জানিয়েছে, বিগত দিনগুলোতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই তুলনায় খুচরা পর্যায়ের ট্যারিফ সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিতরণে তাদের ৮৫ পয়সারও বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংস্থাটি আবাসিক লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে ইজিবাইক চার্জিং স্টেশনগুলোকে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় এনে রাজস্ব বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে তারা।

নেসকো ট্যারিফ পুননির্ধারণ চায়

উত্তরাঞ্চলে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নেসকো জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ক্রয় এবং তা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার বিতরণ ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাদের নিজস্ব বিতরণ ব্যয় প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৬৬ পয়সায় গিয়ে পৌঁছাবে। এই ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং নতুন পাইকারি মূল্যের ওপর ভিত্তি করে খুচরা ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ বা বাড়ানোর জন্য বিইআরসির কাছে আবেদন জানিয়েছে সংস্থাটি।

টিইসির আপত্তি

বিতরণ সংস্থাগুলোর এসব ‘ঢালাও প্রস্তাবের’ বিপরীতে বিইআরসির ‘কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি)’ বেশ কিছু বিষয়ে আপত্তি ও সতর্কতা ব্যক্ত করেছে। 

কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির উপস্থাপনায় বলা হয়, ছয় বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানি প্রতি ইউনিটে বিতরণ ব্যয় ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা ধরে খুচরা ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। বিপিডিবি প্রতি ইউনিটে বিতরণ ব্যয় ধরেছে ৮৫ পয়সা, বিআরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা।

কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বলছে, ছয় সংস্থার ভারিত গড়ে নিট বিতরণ ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২৫ পয়সা।

কমিটির হিসাবে পিডিবির নিট বিতরণ ব্যয় ৭৫ পয়সা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ১ টাকা ৩৯ পয়সা, ডিপিডিসির ১ টাকা ১৮ পয়সা, ডেসকোর ১ টাকা ১৬ পয়সা, ওজোপাডিকোর ১ টাকা ৩৩ পয়সা এবং নেসকোর ১ টাকা ৪৩ পয়সা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ছয় সংস্থা ও কোম্পানির মোট নিট বিতরণ ব্যয় ১১ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা। এ সময়ে বিদ্যুৎ বিক্রির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯৫ হাজার ৬১৩ মিলিয়ন ইউনিট।

কারিগরি কমিটি বলেছেন, “নিম্নচাপ বা এলটি গ্রাহকের লোডসীমা ৮০ কিলোওয়াট থেকে কমিয়ে হুট করে ৫০ কিলোওয়াটে নামানো ঠিক হবে না। এটি করার আগে একটি স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ‘রেগুলেটরি ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বা এর প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি।”

কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে বাণিজ্যিক গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথ নয় বলে মত দিয়েছে টিইসি। যেসব গ্রাহকের নন-ডিমান্ড মিটার রয়েছে, তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার দেখে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত লোড নির্ধারণ করা অন্যায় হবে বলেও মত দিয়েছে কমিশনের কারিগরি কমিটি। পর্যায়ক্রমে সব জায়গায় ডিমান্ড মিটার স্থাপন করার পরামর্শ দিয়েছে টিইসি।

অংশীজনদের বিরোধিতা

বৃহস্পতিবার শুনানিতে অংশ নিয়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, “প্রস্তাবে কখনও কোটি টাকা, কখনও মিলিয়ন টাকা ব্যবহার করায় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। দিন শেষে এটা টাকা পয়সার হিসাব। তাই হিসাব উপস্থাপনের সময় কোটি আর মিলিয়ন একসঙ্গে ব্যবহার না করাই ভালো।”

রেট অব রিটার্ন ও করপোরেট ট্যাক্স বিদ্যুতের দামে যুক্ত করার বিষয়েও আপত্তি জানিয়ে সৈয়দ মিজানুর বলেন, “সরকারকে মুনাফাখোর চরিত্রের দিকে নেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের মনোপলি সেবা কস্ট টু কস্ট হওয়া উচিত, কস্ট প্লাস নয়।”

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বদলে কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে গণশুনানি হওয়া দরকার। দরিদ্র গ্রাহকদের জন্য শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিইআরসির সরকারকে প্রস্তাব দেওয়া উচিত।”

ধাব বা স্ল্যাব পরিবর্তনের প্রস্তাবের সমালোচনা করে সিপিবির এই নেতা বলেন, “লাইফলাইন গ্রাহকের নামে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট কাটার নতুন ব্যবস্থা করা হচ্ছে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন,“ দাম বাড়ানোর যুক্তি উপস্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম কীভাবে কমানো যায়, সেই পরিকল্পনাও থাকা উচিত। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বলতে হবে, তারা কীভাবে বিদ্যুতের দাম কমাতে পারে।” তিনি বলেন, “অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্য বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। আইপিপি ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।”

বিএসএমএ’র সাত দফা

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম শুনানিতে বলেন, “বড় শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ মূল্য না বাড়িয়ে ডিমান্ড চার্জ ও পাওয়ার ফ্যাক্টরভিত্তিক অতিরিক্ত চার্জ পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। তিনি বলেন, “অবকাঠামো আমরা নির্মাণ করেছি। তারপরও প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ দিতে হচ্ছে। এই ডিমান্ড চার্জ থেকে আমরা রেহাই চাই।” তিনি বিদ্যুৎ সংযোগের সময় জমা দেওয়া নিরাপত্তা আমানতের সুদ বিলের সঙ্গে সমন্বয়েরও দাবি জানান। 

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) বিইআরসির কাছে সাত দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও দাবি লিখিতভাবে জমা দিয়েছে। প্রস্তাব ও দাবিগুলো হলো- 

১. স্টিল শিল্পে বিদ্যুতের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা: ভারী শিল্প, বিশেষ করে স্টিল মিলগুলোকে সচল রাখতে কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না।

২. ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট কমানো: বর্তমানে আরোপিত অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ বাতিল করতে হবে এবং অতিরিক্ত ভ্যাটের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে।

৩. পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ পুনর্বিবেচনা: পাওয়ার ফ্যাক্টরের ওপর ভিত্তি করে যে অতিরিক্ত জরিমানা বা চার্জ আদায় করা হয়, তা যৌক্তিকভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

৪. ক্যাপাসিটি চার্জ প্রত্যাহার: বিদ্যুৎকেন্দ্রের অলস বসে থাকার পেছনে যে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, তা ধাপে ধাপে পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে।

৫. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ: শিল্পকারখানায় লোডশেডিংমুক্ত, নিরবচ্ছিন্ন এবং মানসম্মত (ভোল্টেজ ওঠানামা ছাড়া) বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

৬. বিশেষ শিল্প ট্যারিফ চালু: উচ্চ ভোল্টেজ ব্যবহারকারী ভারী শিল্প গ্রাহকদের জন্য একটি সাশ্রয়ী ও বিশেষ শিল্প ট্যারিফ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

৭. সিকিউরিটি মানির বিপরীতে সুবিধা: জামানত বা সিকিউরিটি মানি হিসেবে সরকারের কাছে যে বিপুল অর্থ জমা থাকে, তার বিপরীতে সুদ প্রদান করতে হবে অথবা তা মাসিক বিলের সঙ্গে সমন্বয় করার সুবিধা দিতে হবে।

ব্যবসায়ী সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশের শিল্প খাতকে যদি এই সংকটে টিকিয়ে রাখা না যায়, তবে কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে, নতুন বিনিয়োগ থমকে যাবে এবং দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যে ধস নামবে। তাই বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের বর্তমান সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনার জন্য বিইআরসির কাছে জোর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

ভোক্তার স্বার্থ নিশ্চিত করবে কমিশন

বিইআরসি চেয়ারম্যন জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে সদস্য (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) মো. আব্দুর রাজ্জাক, সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগে. জেনারেল মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার (অব.), সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান, সদস্য (পেট্রোলিয়াম) ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া শুনানি গ্রহণ করেন।  এসময় বিইআরসি সচিব (যুগ্মসচিব) মো. নজরুল ইসলাম সরকার ও কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, “শুনানিতে বিভিন্ন পক্ষের মতামত, পর্যবেক্ষণ, তথ্য উপাত্ত ও দলিল বিবেচনায় নেওয়া হবে। বক্তব্যগুলো লিপিবদ্ধ ও রেকর্ড করা হয়েছে। যারা এরপরেও লিখিত কোনো বক্তব্য দিতে চান, তারা ২৩ মে ২০২৬ তারিখের মধ্যে আমাদের কাছে পাঠাবেন।”

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, “কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ভোক্তার স্বার্থ দেখা। নিঃসন্দেহে আমরা এটা থেকে বিচ্যুত হব না।”

ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেল খাতের প্রকল্প গ্রহণের আগে বিইআরসির মতামত নেওয়ার বিষয়েও সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেন তিনি। ক্যাপাসিটি চার্জ প্রসঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বা পিপিএগুলো বিইআরসিতে আসেনি। এসব চুক্তি কমিশন পর্যালোচনা করলে দায় কমিশনের ওপরও আসত। তিনি বলেন, “ক্যাপাসিটি চার্জের জন্য ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে জাতির জন্য ক্ষতিকর কাজ হয়েছে।”

ভবিষ্যতে আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোনো প্রকল্প কমিশনের পূর্বানুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে বলে জানান তিনি। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে অংশীজনদের আপত্তি

প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

featured Image

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ও সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাবের পরদিন খুচরা পর্যায়ে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পসহ সব খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি কোম্পানিগুলো। খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৬ থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। 

বৃহস্পতিবার (২১ মে) ঢাকার ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত দ্বিতীয় দিনের গণশুনানিতে ৬টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি এই প্রস্তাব তুলে ধরে। পাইকারি পর্যায়ে যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে সেই বর্ধিত খরচও গ্রাহক পর্যায়ে যুক্ত করার যৌথ আবেদন জানায় প্রতিষ্ঠানগুলো।

গণশুনানিতে শুধু দাম বাড়ানোর প্রস্তাবই আসেনি, বরং গ্রাহকশ্রেণি পুনর্নির্ধারণ, প্রি-পেইড মিটারে নতুন ধরনের চার্জ আরোপ, বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় আনা এবং শিল্প গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টির মতো একাধিক প্রস্তাব সামনে এসেছে।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর এসব প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন গণশুনানিতে অংশ নেওয়া ভোক্তা অধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী ও শিল্প সংগঠনের নেতারা।

 গণশুনানিতে বক্তব্যে অংশীজনরা ভোক্তার ওপর নতুন চাপ না দিয়ে ব্যয় কমানোর পথ খোঁজার দাবি তুলেছেন। তাদের কয়েকজন বলছেন, বিদ্যুৎ খাতকে মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে দেখা যাবে না। ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস, প্রকল্প ব্যয় ও অদক্ষতার বোঝা ভোক্তার ওপর চাপানো যাবে না।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানিয়ে শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বলেছেন, “বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, কাঁচামালের উচ্চ মূল্য এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশীয় শিল্প খাত এমনিতেই টিকে থাকার লড়াই করছে। এই অবস্থায় নতুন করে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে তা বহন করার মতো ক্ষমতা শিল্প খাতের নেই।”

আগের দিন বুধবার (২০ মে) প্রথম দিনের গণশুনানিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে এক টাকা ২০ পয়সা থেকে এক টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করে। একই দিনে শুনানিতে বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিট ১৯ পয়সা বা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি। 

প্রথম দিনের শুনানিতে অংশ নিয়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।

বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ছয় বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানির মোট গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৯৮ লাখের বেশি। এর মধ্যে গৃহস্থালি গ্রাহক ৪ কোটি ২৫ লাখের বেশি এবং লাইফলাইন গ্রাহক প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ। বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের গ্রাহক সবচেয়ে বেশি। মার্চ পর্যন্ত তাদের মোট গ্রাহক ৩ কোটি ৯১ লাখের বেশি, গৃহস্থালি গ্রাহক ৩ কোটি ৩৯ লাখের বেশি।

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রির পাশপাশি বিপিডিবি কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে। এছাড়া, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)- সরকারি মোট এই ছয়টি প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। 

সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্যে দেখা যায়, বিতরণ লাইনে গড় সিস্টেম লস ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ হলেও কিছু কিছু সংস্থায় এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি, যা গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বিপিডিবির দাবি, ইউনিটে ঘাটতি ‘২৯ পয়সা’

বিপিডিবি গণশুনানিতে জানিয়েছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ট্যারিফ বজায় থাকলে তাদের প্রতি ইউনিটে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াবে ২৯ পয়সা। এই আর্থিক ঘাটতি সমন্বয় করার জন্য তারা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে।

একই সঙ্গে সংস্থাটি একটি নতুন নিয়ম চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। 

বর্তমানে ৮০ কিলোওয়াট পর্যন্ত নিম্নচাপ (এলটি) গ্রাহকসীমা রয়েছে, যা কমিয়ে ৫০ কিলোওয়াট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, ৫০ কিলোওয়াটের বেশি লোড ব্যবহারকারী গ্রাহকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মধ্যচাপ (এমটি) গ্রাহকশ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। 

বিপিডিবির দাবি, বর্তমানে ৫০ কিলোওয়াটের বেশি লোডের গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে একই ট্রান্সফরমার থেকে সীমিত সংখ্যক গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। 

এছাড়া, মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণ ট্যারিফ থেকে সরিয়ে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বিপিডিবি।

পল্লী বিদ্যুতের ৫.৯৩% দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

ঢাকার বাইরে বেশীরভাগ জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা বিআরইবির আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গড়ে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য ৮ টাকা ৫০ পয়সা হলেও লোকসান এড়িয়ে সংস্থাটিকে সচল রাখতে এই মূল্য কমপক্ষে ৯ টাকা করা জরুরি।

দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ‘লাইফলাইন’ সুবিধা আরও সংকুচিত করার প্রস্তাব দিয়েছে বিআরইবি। তাদের নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহকের অনুমোদিত লোড ১ কিলোওয়াট বা তার কম এবং মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার সর্বোচ্চ ৫০ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, কেবল তারাই লাইফলাইন সুবিধা পাবেন।

এর বাইরে ব্যাটারিচালিত চার্জিং স্টেশনগুলোর জন্য আলাদা গ্রাহকশ্রেণি তৈরি করা, ইটভাটা ও চিলিং সেন্টারগুলোকে বাণিজ্যিক থেকে শিল্পশ্রেণিতে রূপান্তর করা এবং বহুতল ভবনে একাধিক শিল্প সংযোগ দেওয়ার ব্যাপারেও তারা সুপারিশ করেছে বিআরইবি।

ডিপিডিসির প্রস্তাব ৬.৯৬% বাড়ানোর

ঢাকার  একাংশ এবং নারায়ণগঞ্জের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ডিপিডিসি গড়ে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করেছে। তাদের দাবি, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও বর্তমান পরিচালন ব্যয়ের কারণে তাদের বিপুল রাজস্ব ঘাটতি থেকে যাবে।

ঘাটতি পূরণে ডিপিডিসি কিছু নতুন নিয়ম চালুর প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন করে সিকিউরিটি চার্জ আদায় করা এবং যেসব গ্রাহকের পাওয়ার ফ্যাক্টর কম, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। 

এছাড়া, যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ট্যারিফ বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করার এবং বস্তি এলাকায় কক্ষভিত্তিক ফ্ল্যাট ট্যারিফ চালুর সুপারিশ করেছে তারা।

ডেসকোর প্রস্তাব ৯.৬৭ শতাংশ বৃদ্ধির

ঢাকার উত্তরাঞ্চল ও মিরপুর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান ডেসকো জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত তিন বছরে তাদের মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬১১ কোটি টাকা।এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি ও ঘাটতি মোকাবিলা করতে সংস্থাটি গড়ে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব পেশ করেছে। 

ডেসকো তাদের আবেদনে আরও উল্লেখ করেছে, প্রি-পেইড গ্রাহকদের জন্য বর্তমানে যে রিবেট বা ছাড় সুবিধা চালু আছে, তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে ডিমান্ড চার্জের পরিমাণও বাড়ানো দরকার।

ওজোপাডিকোর দাবি, ইউনিটে ঘাটতি ‘৮৫ পয়সা’

দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকো জানিয়েছে, বিগত দিনগুলোতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই তুলনায় খুচরা পর্যায়ের ট্যারিফ সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিতরণে তাদের ৮৫ পয়সারও বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংস্থাটি আবাসিক লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে ইজিবাইক চার্জিং স্টেশনগুলোকে বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় এনে রাজস্ব বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে তারা।

নেসকো ট্যারিফ পুননির্ধারণ চায়

উত্তরাঞ্চলে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নেসকো জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ক্রয় এবং তা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার বিতরণ ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাদের নিজস্ব বিতরণ ব্যয় প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৬৬ পয়সায় গিয়ে পৌঁছাবে। এই ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং নতুন পাইকারি মূল্যের ওপর ভিত্তি করে খুচরা ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ বা বাড়ানোর জন্য বিইআরসির কাছে আবেদন জানিয়েছে সংস্থাটি।

টিইসির আপত্তি

বিতরণ সংস্থাগুলোর এসব ‘ঢালাও প্রস্তাবের’ বিপরীতে বিইআরসির ‘কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি)’ বেশ কিছু বিষয়ে আপত্তি ও সতর্কতা ব্যক্ত করেছে। 

কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির উপস্থাপনায় বলা হয়, ছয় বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানি প্রতি ইউনিটে বিতরণ ব্যয় ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা ধরে খুচরা ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। বিপিডিবি প্রতি ইউনিটে বিতরণ ব্যয় ধরেছে ৮৫ পয়সা, বিআরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা।

কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বলছে, ছয় সংস্থার ভারিত গড়ে নিট বিতরণ ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২৫ পয়সা।

কমিটির হিসাবে পিডিবির নিট বিতরণ ব্যয় ৭৫ পয়সা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ১ টাকা ৩৯ পয়সা, ডিপিডিসির ১ টাকা ১৮ পয়সা, ডেসকোর ১ টাকা ১৬ পয়সা, ওজোপাডিকোর ১ টাকা ৩৩ পয়সা এবং নেসকোর ১ টাকা ৪৩ পয়সা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ছয় সংস্থা ও কোম্পানির মোট নিট বিতরণ ব্যয় ১১ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা। এ সময়ে বিদ্যুৎ বিক্রির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯৫ হাজার ৬১৩ মিলিয়ন ইউনিট।

কারিগরি কমিটি বলেছেন, “নিম্নচাপ বা এলটি গ্রাহকের লোডসীমা ৮০ কিলোওয়াট থেকে কমিয়ে হুট করে ৫০ কিলোওয়াটে নামানো ঠিক হবে না। এটি করার আগে একটি স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ‘রেগুলেটরি ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বা এর প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি।”

কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে বাণিজ্যিক গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথ নয় বলে মত দিয়েছে টিইসি। যেসব গ্রাহকের নন-ডিমান্ড মিটার রয়েছে, তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার দেখে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে অতিরিক্ত লোড নির্ধারণ করা অন্যায় হবে বলেও মত দিয়েছে কমিশনের কারিগরি কমিটি। পর্যায়ক্রমে সব জায়গায় ডিমান্ড মিটার স্থাপন করার পরামর্শ দিয়েছে টিইসি।

অংশীজনদের বিরোধিতা

বৃহস্পতিবার শুনানিতে অংশ নিয়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, “প্রস্তাবে কখনও কোটি টাকা, কখনও মিলিয়ন টাকা ব্যবহার করায় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। দিন শেষে এটা টাকা পয়সার হিসাব। তাই হিসাব উপস্থাপনের সময় কোটি আর মিলিয়ন একসঙ্গে ব্যবহার না করাই ভালো।”

রেট অব রিটার্ন ও করপোরেট ট্যাক্স বিদ্যুতের দামে যুক্ত করার বিষয়েও আপত্তি জানিয়ে সৈয়দ মিজানুর বলেন, “সরকারকে মুনাফাখোর চরিত্রের দিকে নেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের মনোপলি সেবা কস্ট টু কস্ট হওয়া উচিত, কস্ট প্লাস নয়।”

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বদলে কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে গণশুনানি হওয়া দরকার। দরিদ্র গ্রাহকদের জন্য শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিইআরসির সরকারকে প্রস্তাব দেওয়া উচিত।”

ধাব বা স্ল্যাব পরিবর্তনের প্রস্তাবের সমালোচনা করে সিপিবির এই নেতা বলেন, “লাইফলাইন গ্রাহকের নামে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট কাটার নতুন ব্যবস্থা করা হচ্ছে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন,“ দাম বাড়ানোর যুক্তি উপস্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম কীভাবে কমানো যায়, সেই পরিকল্পনাও থাকা উচিত। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বলতে হবে, তারা কীভাবে বিদ্যুতের দাম কমাতে পারে।” তিনি বলেন, “অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্য বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। আইপিপি ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।”

বিএসএমএ’র সাত দফা

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম শুনানিতে বলেন, “বড় শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ মূল্য না বাড়িয়ে ডিমান্ড চার্জ ও পাওয়ার ফ্যাক্টরভিত্তিক অতিরিক্ত চার্জ পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। তিনি বলেন, “অবকাঠামো আমরা নির্মাণ করেছি। তারপরও প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ দিতে হচ্ছে। এই ডিমান্ড চার্জ থেকে আমরা রেহাই চাই।” তিনি বিদ্যুৎ সংযোগের সময় জমা দেওয়া নিরাপত্তা আমানতের সুদ বিলের সঙ্গে সমন্বয়েরও দাবি জানান। 

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) বিইআরসির কাছে সাত দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও দাবি লিখিতভাবে জমা দিয়েছে। প্রস্তাব ও দাবিগুলো হলো- 

১. স্টিল শিল্পে বিদ্যুতের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা: ভারী শিল্প, বিশেষ করে স্টিল মিলগুলোকে সচল রাখতে কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না।

২. ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট কমানো: বর্তমানে আরোপিত অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ বাতিল করতে হবে এবং অতিরিক্ত ভ্যাটের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে।

৩. পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ পুনর্বিবেচনা: পাওয়ার ফ্যাক্টরের ওপর ভিত্তি করে যে অতিরিক্ত জরিমানা বা চার্জ আদায় করা হয়, তা যৌক্তিকভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

৪. ক্যাপাসিটি চার্জ প্রত্যাহার: বিদ্যুৎকেন্দ্রের অলস বসে থাকার পেছনে যে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, তা ধাপে ধাপে পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে।

৫. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ: শিল্পকারখানায় লোডশেডিংমুক্ত, নিরবচ্ছিন্ন এবং মানসম্মত (ভোল্টেজ ওঠানামা ছাড়া) বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

৬. বিশেষ শিল্প ট্যারিফ চালু: উচ্চ ভোল্টেজ ব্যবহারকারী ভারী শিল্প গ্রাহকদের জন্য একটি সাশ্রয়ী ও বিশেষ শিল্প ট্যারিফ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

৭. সিকিউরিটি মানির বিপরীতে সুবিধা: জামানত বা সিকিউরিটি মানি হিসেবে সরকারের কাছে যে বিপুল অর্থ জমা থাকে, তার বিপরীতে সুদ প্রদান করতে হবে অথবা তা মাসিক বিলের সঙ্গে সমন্বয় করার সুবিধা দিতে হবে।

ব্যবসায়ী সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশের শিল্প খাতকে যদি এই সংকটে টিকিয়ে রাখা না যায়, তবে কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে, নতুন বিনিয়োগ থমকে যাবে এবং দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যে ধস নামবে। তাই বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের বর্তমান সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনার জন্য বিইআরসির কাছে জোর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

ভোক্তার স্বার্থ নিশ্চিত করবে কমিশন

বিইআরসি চেয়ারম্যন জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে সদস্য (অর্থ, প্রশাসন ও আইন) মো. আব্দুর রাজ্জাক, সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগে. জেনারেল মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার (অব.), সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান, সদস্য (পেট্রোলিয়াম) ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া শুনানি গ্রহণ করেন।  এসময় বিইআরসি সচিব (যুগ্মসচিব) মো. নজরুল ইসলাম সরকার ও কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, “শুনানিতে বিভিন্ন পক্ষের মতামত, পর্যবেক্ষণ, তথ্য উপাত্ত ও দলিল বিবেচনায় নেওয়া হবে। বক্তব্যগুলো লিপিবদ্ধ ও রেকর্ড করা হয়েছে। যারা এরপরেও লিখিত কোনো বক্তব্য দিতে চান, তারা ২৩ মে ২০২৬ তারিখের মধ্যে আমাদের কাছে পাঠাবেন।”

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, “কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ভোক্তার স্বার্থ দেখা। নিঃসন্দেহে আমরা এটা থেকে বিচ্যুত হব না।”

ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেল খাতের প্রকল্প গ্রহণের আগে বিইআরসির মতামত নেওয়ার বিষয়েও সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেন তিনি। ক্যাপাসিটি চার্জ প্রসঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বা পিপিএগুলো বিইআরসিতে আসেনি। এসব চুক্তি কমিশন পর্যালোচনা করলে দায় কমিশনের ওপরও আসত। তিনি বলেন, “ক্যাপাসিটি চার্জের জন্য ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে জাতির জন্য ক্ষতিকর কাজ হয়েছে।”

ভবিষ্যতে আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোনো প্রকল্প কমিশনের পূর্বানুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে বলে জানান তিনি। 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত