ইতিহাসের পাতায় কৃষক বিদ্রোহের ঘটনা কম নেই। তবে ১৩৮১ সালের ইংল্যান্ডের কৃষক বিদ্রোহ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অতিরিক্ত কর, শ্রেণিবৈষম্য ও ক্ষমতাবানদের দাপটের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সেই আন্দোলন এবার উঠে এসেছে হলিউডের বড় পর্দায়। পল গ্রিনগ্রাস পরিচালিত ‘দ্য আপরাইজিং’ সিনেমায় ইতিহাসের সেই উত্তাল সময়কে তুলে ধরা হয়েছে এক সাধারণ কৃষকের চোখ দিয়ে।
সিনেমাটির প্রধান
চরিত্রে অভিনয় করেছেন হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা অ্যান্ড্রু গারফিল্ড। ঐতিহাসিক এই বিদ্রোহ
নিয়ে এর আগে বিভিন্ন তথ্যচিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা হলেও ১৩৮১ সালের কৃষক বিদ্রোহকে
এত বড় পরিসরে মূল বিষয় করে নির্মিত সিনেমা খুব বেশি দেখা যায়নি। সেই জায়গা থেকেই ‘দ্য
আপরাইজিং’ আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
সিনেমার কেন্দ্রীয়
চরিত্রের নাম ‘প্লাউম্যান’। অ্যান্ড্রু গারফিল্ড অভিনীত এই চরিত্রটি কোনো ঐতিহাসিক
ব্যক্তিত্বের সরাসরি প্রতিরূপ নয়। তিনি একজন সাধারণ কৃষক, যার জীবন ব্ল্যাক ডেথ মহামারির
আঘাতে আগেই ভেঙে পড়েছে। মহামারিতে স্ত্রী ও সন্তানদের হারানোর পর তিনি হয়ে পড়েন একা।
এর মধ্যে নতুন করে তার ওপর চেপে বসে করের বোঝা।
কিশোর রাজা রিচার্ড
দ্বিতীয়ের শাসনামলে রাজকীয় পরিষদ সাধারণ মানুষের ওপর কর বাড়িয়ে দেয়। কৃষকদের কাছে সেই
কর হয়ে ওঠে অসহনীয়। জীবিকা নির্বাহ করাই যখন কঠিন, তখন বাড়তি কর কীভাবে দেওয়া সম্ভব—এই
প্রশ্ন থেকেই ধীরে ধীরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
প্লাউম্যানের ব্যক্তিগত
ক্ষোভ একপর্যায়ে বৃহত্তর প্রতিবাদের অংশ হয়ে ওঠে। একজন সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ কীভাবে
হাজারো মানুষের কণ্ঠে পরিণত হয়, সিনেমার গল্প এগিয়েছে সেই পথ ধরে। প্লাউম্যানের সঙ্গে
একপর্যায়ে যুক্ত হন কৃষক বিদ্রোহের ঐতিহাসিক দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা ওয়াট টাইলার ও জন
বল।
ওয়াট টাইলার চরিত্রে
অভিনয় করেছেন কসমো জার্ভিস। সামরিক অভিজ্ঞতা থাকা এই নেতা বিদ্রোহীদের সংগঠিত করতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অন্যদিকে জেমি বেল অভিনয় করেছেন র্যাডিক্যাল ধর্মযাজক
জন বলের চরিত্রে।
হাজারো কৃষককে সঙ্গে
নিয়ে তারা লন্ডনের দিকে এগিয়ে যান। উদ্দেশ্য ছিল রাজার কাছে নিজেদের দাবি পৌঁছে দেওয়া।
তাদের ধারণা ছিল, কিশোর রাজা রিচার্ড দ্বিতীয়কে তার চারপাশের ক্ষমতাবান পরিষদ কার্যত
নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তাদের লড়াই শুধু করের বিরুদ্ধে ছিল না; তারা চেয়েছিল ক্ষমতার কাঠামোরও
পরিবর্তন।
রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ
চরিত্রে দেখা গেছে টম হল্যান্ডার ও জনি লি মিলারকে। অন্যদিকে ক্যাথরিন ওয়াটারস্টন ও
থমাসিন ম্যাকেঞ্জিও রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রে।
পল গ্রিনগ্রাসের
সিনেমা মানেই দ্রুতগতি, বাস্তবঘনিষ্ঠ অ্যাকশন ও অস্থির ক্যামেরার ব্যবহার। ‘ব্লাডি
সানডে’, ‘ইউনাইটেড ৯৩’ কিংবা ‘জেসন বোর্ন’ সিরিজে যে নির্মাণশৈলী দর্শক দেখেছেন, ‘দ্য
আপরাইজিং’-এও তার ছাপ স্পষ্ট।
বিদ্রোহীদের কাদামাখা
মাঠ পেরিয়ে এগিয়ে চলা, ঘোড়সওয়ার সৈন্যদের সঙ্গে সংঘর্ষ, রক্তক্ষয়ী লড়াই কিংবা মধ্যযুগীয়
লন্ডনের বিশৃঙ্খলা—সবকিছুই ধারণ করা হয়েছে গতিশীল ক্যামেরায়। ফলে দর্শক যেন দূর থেকে
ইতিহাস দেখছেন না, বরং ঘটনাগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন—এমন অনুভূতি তৈরি হবে।
মধ্যযুগের লন্ডনকে
পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিশাল সেট ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট ব্যবহার করেছেন নির্মাতা
পল গ্রিনগ্রাস। কাদামাটি, ধুলো, ঘোড়ার দৌড়, অস্ত্রের ঝনঝনানি—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে
অস্থির এক সময়ের আবহ।
ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে
নির্মিত সিনেমায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে—কতটা ইতিহাস আর কতটা নির্মাতার কল্পনা? ‘দ্য
আপরাইজিং’ও সেই প্রশ্নের বাইরে নয়। সিনেমাটি মুক্তির পরই বোঝা যাবে, ১৩৮১ সালের ঐতিহাসিক
ঘটনাকে পল গ্রিনগ্রাস কতটা বাস্তবভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন।
ছয় শতকেরও বেশি
পুরোনো একটি কৃষক বিদ্রোহকে নতুন ভাষায় আজকের দর্শকের সামনে হাজির করেছেন পল গ্রিনগ্রাস।
ফলে ‘দ্য আপরাইজিং’ শুধু ১৩৮১ সালের ইংল্যান্ডের গল্প নয়; এটি ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের
সম্পর্ক নিয়ে একটি পুরোনো প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে আনে—বৈষম্য ও নিপীড়ন কতটা বাড়লে
সাধারণ মানুষ বিদ্রোহে নামতে বাধ্য হয়।

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
ইতিহাসের পাতায় কৃষক বিদ্রোহের ঘটনা কম নেই। তবে ১৩৮১ সালের ইংল্যান্ডের কৃষক বিদ্রোহ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অতিরিক্ত কর, শ্রেণিবৈষম্য ও ক্ষমতাবানদের দাপটের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সেই আন্দোলন এবার উঠে এসেছে হলিউডের বড় পর্দায়। পল গ্রিনগ্রাস পরিচালিত ‘দ্য আপরাইজিং’ সিনেমায় ইতিহাসের সেই উত্তাল সময়কে তুলে ধরা হয়েছে এক সাধারণ কৃষকের চোখ দিয়ে।
সিনেমাটির প্রধান
চরিত্রে অভিনয় করেছেন হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা অ্যান্ড্রু গারফিল্ড। ঐতিহাসিক এই বিদ্রোহ
নিয়ে এর আগে বিভিন্ন তথ্যচিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা হলেও ১৩৮১ সালের কৃষক বিদ্রোহকে
এত বড় পরিসরে মূল বিষয় করে নির্মিত সিনেমা খুব বেশি দেখা যায়নি। সেই জায়গা থেকেই ‘দ্য
আপরাইজিং’ আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
সিনেমার কেন্দ্রীয়
চরিত্রের নাম ‘প্লাউম্যান’। অ্যান্ড্রু গারফিল্ড অভিনীত এই চরিত্রটি কোনো ঐতিহাসিক
ব্যক্তিত্বের সরাসরি প্রতিরূপ নয়। তিনি একজন সাধারণ কৃষক, যার জীবন ব্ল্যাক ডেথ মহামারির
আঘাতে আগেই ভেঙে পড়েছে। মহামারিতে স্ত্রী ও সন্তানদের হারানোর পর তিনি হয়ে পড়েন একা।
এর মধ্যে নতুন করে তার ওপর চেপে বসে করের বোঝা।
কিশোর রাজা রিচার্ড
দ্বিতীয়ের শাসনামলে রাজকীয় পরিষদ সাধারণ মানুষের ওপর কর বাড়িয়ে দেয়। কৃষকদের কাছে সেই
কর হয়ে ওঠে অসহনীয়। জীবিকা নির্বাহ করাই যখন কঠিন, তখন বাড়তি কর কীভাবে দেওয়া সম্ভব—এই
প্রশ্ন থেকেই ধীরে ধীরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
প্লাউম্যানের ব্যক্তিগত
ক্ষোভ একপর্যায়ে বৃহত্তর প্রতিবাদের অংশ হয়ে ওঠে। একজন সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ কীভাবে
হাজারো মানুষের কণ্ঠে পরিণত হয়, সিনেমার গল্প এগিয়েছে সেই পথ ধরে। প্লাউম্যানের সঙ্গে
একপর্যায়ে যুক্ত হন কৃষক বিদ্রোহের ঐতিহাসিক দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা ওয়াট টাইলার ও জন
বল।
ওয়াট টাইলার চরিত্রে
অভিনয় করেছেন কসমো জার্ভিস। সামরিক অভিজ্ঞতা থাকা এই নেতা বিদ্রোহীদের সংগঠিত করতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অন্যদিকে জেমি বেল অভিনয় করেছেন র্যাডিক্যাল ধর্মযাজক
জন বলের চরিত্রে।
হাজারো কৃষককে সঙ্গে
নিয়ে তারা লন্ডনের দিকে এগিয়ে যান। উদ্দেশ্য ছিল রাজার কাছে নিজেদের দাবি পৌঁছে দেওয়া।
তাদের ধারণা ছিল, কিশোর রাজা রিচার্ড দ্বিতীয়কে তার চারপাশের ক্ষমতাবান পরিষদ কার্যত
নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তাদের লড়াই শুধু করের বিরুদ্ধে ছিল না; তারা চেয়েছিল ক্ষমতার কাঠামোরও
পরিবর্তন।
রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ
চরিত্রে দেখা গেছে টম হল্যান্ডার ও জনি লি মিলারকে। অন্যদিকে ক্যাথরিন ওয়াটারস্টন ও
থমাসিন ম্যাকেঞ্জিও রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রে।
পল গ্রিনগ্রাসের
সিনেমা মানেই দ্রুতগতি, বাস্তবঘনিষ্ঠ অ্যাকশন ও অস্থির ক্যামেরার ব্যবহার। ‘ব্লাডি
সানডে’, ‘ইউনাইটেড ৯৩’ কিংবা ‘জেসন বোর্ন’ সিরিজে যে নির্মাণশৈলী দর্শক দেখেছেন, ‘দ্য
আপরাইজিং’-এও তার ছাপ স্পষ্ট।
বিদ্রোহীদের কাদামাখা
মাঠ পেরিয়ে এগিয়ে চলা, ঘোড়সওয়ার সৈন্যদের সঙ্গে সংঘর্ষ, রক্তক্ষয়ী লড়াই কিংবা মধ্যযুগীয়
লন্ডনের বিশৃঙ্খলা—সবকিছুই ধারণ করা হয়েছে গতিশীল ক্যামেরায়। ফলে দর্শক যেন দূর থেকে
ইতিহাস দেখছেন না, বরং ঘটনাগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন—এমন অনুভূতি তৈরি হবে।
মধ্যযুগের লন্ডনকে
পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিশাল সেট ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট ব্যবহার করেছেন নির্মাতা
পল গ্রিনগ্রাস। কাদামাটি, ধুলো, ঘোড়ার দৌড়, অস্ত্রের ঝনঝনানি—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে
অস্থির এক সময়ের আবহ।
ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে
নির্মিত সিনেমায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে—কতটা ইতিহাস আর কতটা নির্মাতার কল্পনা? ‘দ্য
আপরাইজিং’ও সেই প্রশ্নের বাইরে নয়। সিনেমাটি মুক্তির পরই বোঝা যাবে, ১৩৮১ সালের ঐতিহাসিক
ঘটনাকে পল গ্রিনগ্রাস কতটা বাস্তবভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন।
ছয় শতকেরও বেশি
পুরোনো একটি কৃষক বিদ্রোহকে নতুন ভাষায় আজকের দর্শকের সামনে হাজির করেছেন পল গ্রিনগ্রাস।
ফলে ‘দ্য আপরাইজিং’ শুধু ১৩৮১ সালের ইংল্যান্ডের গল্প নয়; এটি ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের
সম্পর্ক নিয়ে একটি পুরোনো প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে আনে—বৈষম্য ও নিপীড়ন কতটা বাড়লে
সাধারণ মানুষ বিদ্রোহে নামতে বাধ্য হয়।

আপনার মতামত লিখুন