সংবাদ

সেরিব্রাল পালসি: করুণা নয়, প্রয়োজন সুযোগ ও অন্তর্ভুক্তি


নাজনীন নিতু
নাজনীন নিতু
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৯ এএম

সেরিব্রাল পালসি: করুণা নয়, প্রয়োজন সুযোগ ও অন্তর্ভুক্তি
শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়। তাই শিশুর চলাফেরা বা কথা বলার ধরন দেখে তার শেখার ক্ষমতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়

সেরিব্রাল পালসি হলো বিকাশমান মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতা বা ক্ষতির কারণে সৃষ্ট একদল স্নায়বিক অবস্থা, যার প্রধান প্রভাব পড়ে নড়াচড়া ও অঙ্গভঙ্গিতে। তবে এর প্রভাব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন। কারও চলাফেরায় সমস্যা থাকতে পারে, আবার কারও কথা বলা, যোগাযোগ, খাওয়া, শেখা বা দৈনন্দিন কাজেও সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

৬ অক্টোবর ছিল বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস। দিনটি শুধু একটি শারীরিক অবস্থার বিষয়ে মানুষকে জানানোর দিন নয়; বরং সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত মানুষের অধিকার, মর্যাদা, সক্ষমতা ও সমাজে সমান অংশগ্রহণের বিষয়টি নতুন করে ভাবার দিন।

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সেরিব্রাল পালসির ক্ষেত্রে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও দ্রুত প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক একটি প্রমাণভিত্তিক নির্দেশিকায় ১৬টি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও ২৭টি নিয়ন্ত্রিত গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বা সেরিব্রাল পালসি শনাক্ত হওয়া শিশুদের যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপে যুক্ত করা, বাবা-মায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শুরু থেকেই পরিবারের লক্ষ্য নির্ধারণে অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রে নির্দিষ্ট কিছু অনুশীলন করানোই যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক গবেষণাভিত্তিক পর্যালোচনাগুলোতে শিশুর বয়স, বিকাশ, ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও পরিবারের প্রয়োজন বিবেচনা করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সক্রিয় অংশগ্রহণমূলক পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিবারের ভূমিকাও তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রাথমিক সেবায় পরিবারকেন্দ্রিক পদ্ধতি নিয়ে ৪২টি গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় পরিবারকে সেবার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা, তাদের মতামত ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরিবারের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে।

তবে গবেষণা আমাদের আরেকটি বিষয়ও মনে করিয়ে দেয়—সেরিব্রাল পালসির পুনর্বাসনে সব পদ্ধতির প্রমাণ সমান শক্তিশালী নয়। কোক্রেনভিত্তিক গবেষণার একটি সমন্বিত পর্যালোচনায় বিভিন্ন পুনর্বাসন পদ্ধতির কার্যকারিতার প্রমাণে ভিন্নতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সীমিত গবেষণার কথা বলা হয়েছে। তাই “একটি পদ্ধতিই সবার জন্য কার্যকর”—এমন ধারণার পরিবর্তে ব্যক্তির প্রয়োজন ও প্রমাণের ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ নির্বাচন করা জরুরি।

সেরিব্রাল পালসি নিয়ে আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—এতে আক্রান্ত প্রত্যেক ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কম। বাস্তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়। তাই শিশুর চলাফেরা বা কথা বলার ধরন দেখে তার শেখার ক্ষমতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

যোগাযোগের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু স্পষ্টভাবে কথা বলতে না পারলেও তার চিন্তা, অনুভূতি ও সিদ্ধান্ত জানানোর অধিকার রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাক্‌ ও ভাষা চিকিৎসা এবং সহায়ক যোগাযোগ পদ্ধতি তাকে নিজের কথা প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে। প্রাথমিক হস্তক্ষেপের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাতেও যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পুনর্বাসনের লক্ষ্যও শুধু হাঁটানো বা কথা বলানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুর স্বনির্ভরতা, যোগাযোগ, শিক্ষা, সামাজিক অংশগ্রহণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। এজন্য পরিবার, চিকিৎসক, শারীরিক চিকিৎসক, বাক্‌ ও ভাষা চিকিৎসক, পেশাগত চিকিৎসক, শিক্ষক এবং সমাজ—সবার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

তবে চিকিৎসার পাশাপাশি বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও। শিশুকে লুকিয়ে রাখা নয়, সুযোগ দিতে হবে। করুণা নয়, সম্মান দিতে হবে। “সে কী করতে পারে না?”—এই প্রশ্নের বদলে আমাদের জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত—“সে কী করতে পারে, আর তার সক্ষমতাকে বিকশিত করতে আমাদের কী পরিবর্তন প্রয়োজন?”

সেরিব্রাল পালসি একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। প্রতিটি মানুষের মতো তারও রয়েছে নিজস্ব স্বপ্ন, দক্ষতা, পছন্দ ও সম্ভাবনা। তাই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের দায়িত্ব হলো সীমাবদ্ধতার দেয়াল তৈরি না করে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।

[লেখক: স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, সিআরপি]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


সেরিব্রাল পালসি: করুণা নয়, প্রয়োজন সুযোগ ও অন্তর্ভুক্তি

প্রকাশের তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সেরিব্রাল পালসি হলো বিকাশমান মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতা বা ক্ষতির কারণে সৃষ্ট একদল স্নায়বিক অবস্থা, যার প্রধান প্রভাব পড়ে নড়াচড়া ও অঙ্গভঙ্গিতে। তবে এর প্রভাব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন। কারও চলাফেরায় সমস্যা থাকতে পারে, আবার কারও কথা বলা, যোগাযোগ, খাওয়া, শেখা বা দৈনন্দিন কাজেও সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

৬ অক্টোবর ছিল বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস। দিনটি শুধু একটি শারীরিক অবস্থার বিষয়ে মানুষকে জানানোর দিন নয়; বরং সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত মানুষের অধিকার, মর্যাদা, সক্ষমতা ও সমাজে সমান অংশগ্রহণের বিষয়টি নতুন করে ভাবার দিন।

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সেরিব্রাল পালসির ক্ষেত্রে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও দ্রুত প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক একটি প্রমাণভিত্তিক নির্দেশিকায় ১৬টি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও ২৭টি নিয়ন্ত্রিত গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বা সেরিব্রাল পালসি শনাক্ত হওয়া শিশুদের যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপে যুক্ত করা, বাবা-মায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শুরু থেকেই পরিবারের লক্ষ্য নির্ধারণে অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রে নির্দিষ্ট কিছু অনুশীলন করানোই যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক গবেষণাভিত্তিক পর্যালোচনাগুলোতে শিশুর বয়স, বিকাশ, ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও পরিবারের প্রয়োজন বিবেচনা করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সক্রিয় অংশগ্রহণমূলক পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিবারের ভূমিকাও তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রাথমিক সেবায় পরিবারকেন্দ্রিক পদ্ধতি নিয়ে ৪২টি গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় পরিবারকে সেবার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা, তাদের মতামত ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরিবারের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে।

তবে গবেষণা আমাদের আরেকটি বিষয়ও মনে করিয়ে দেয়—সেরিব্রাল পালসির পুনর্বাসনে সব পদ্ধতির প্রমাণ সমান শক্তিশালী নয়। কোক্রেনভিত্তিক গবেষণার একটি সমন্বিত পর্যালোচনায় বিভিন্ন পুনর্বাসন পদ্ধতির কার্যকারিতার প্রমাণে ভিন্নতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সীমিত গবেষণার কথা বলা হয়েছে। তাই “একটি পদ্ধতিই সবার জন্য কার্যকর”—এমন ধারণার পরিবর্তে ব্যক্তির প্রয়োজন ও প্রমাণের ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ নির্বাচন করা জরুরি।

সেরিব্রাল পালসি নিয়ে আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—এতে আক্রান্ত প্রত্যেক ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কম। বাস্তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়। তাই শিশুর চলাফেরা বা কথা বলার ধরন দেখে তার শেখার ক্ষমতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

যোগাযোগের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু স্পষ্টভাবে কথা বলতে না পারলেও তার চিন্তা, অনুভূতি ও সিদ্ধান্ত জানানোর অধিকার রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাক্‌ ও ভাষা চিকিৎসা এবং সহায়ক যোগাযোগ পদ্ধতি তাকে নিজের কথা প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে। প্রাথমিক হস্তক্ষেপের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাতেও যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পুনর্বাসনের লক্ষ্যও শুধু হাঁটানো বা কথা বলানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুর স্বনির্ভরতা, যোগাযোগ, শিক্ষা, সামাজিক অংশগ্রহণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। এজন্য পরিবার, চিকিৎসক, শারীরিক চিকিৎসক, বাক্‌ ও ভাষা চিকিৎসক, পেশাগত চিকিৎসক, শিক্ষক এবং সমাজ—সবার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

তবে চিকিৎসার পাশাপাশি বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও। শিশুকে লুকিয়ে রাখা নয়, সুযোগ দিতে হবে। করুণা নয়, সম্মান দিতে হবে। “সে কী করতে পারে না?”—এই প্রশ্নের বদলে আমাদের জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত—“সে কী করতে পারে, আর তার সক্ষমতাকে বিকশিত করতে আমাদের কী পরিবর্তন প্রয়োজন?”

সেরিব্রাল পালসি একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। প্রতিটি মানুষের মতো তারও রয়েছে নিজস্ব স্বপ্ন, দক্ষতা, পছন্দ ও সম্ভাবনা। তাই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের দায়িত্ব হলো সীমাবদ্ধতার দেয়াল তৈরি না করে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।

[লেখক: স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, সিআরপি]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত