সংবাদ

মাহালী আদিবাসীদের প্রাণের উৎসব ‘জিতিয়া পার্বন’


ষ্টেফান সরেন
ষ্টেফান সরেন
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৪ এএম

মাহালী আদিবাসীদের প্রাণের উৎসব ‘জিতিয়া পার্বন’
কাজে মগ্ন একজন মাহালী

একটি জাতির পরিচয় শুধু তার নাম, বসতি কিংবা জীবনযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভাষা, গান, নাচ, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, লোককথা, উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েও একটি জনগোষ্ঠী তার স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। তাই কোনো সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি উৎসবের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে ইতিহাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাহালী আদিবাসী সম্প্রদায়ের ‘জিতিয়া পার্বন’ তেমনই একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যা একসময় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। নিজেদের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার তাগিদে মাহালীরা আবারও এই উৎসবকে ফিরিয়ে এনেছেন।

গত ৩ অক্টোবর ২০২৬ রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা মাহালী পাড়ায় দিনব্যাপী উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে জিতিয়া পার্বন। মাহালী আদিবাসী আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংগঠন (মাসাউস) ও জিতিয়া পার্বন উদযাপন কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার প্রায় ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের সহস্রাধিক শিশু, নারী ও পুরুষ অংশ নেন। কয়েকদিনের প্রস্তুতির পর শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। নাচ, গান, মাদলের ছন্দ, প্রার্থনা, আলোচনা, পিঠা বিতরণ এবং বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবটি পরিণত হয় মাহালী সম্প্রদায়ের মিলনমেলায়।

মাহালী সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, জিতিয়া পার্বণের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। জিত বহন ঠাকুর নামে একজন মাহালী নেতা ছিলেন, যিনি মানুষের কুসংস্কার, পরাধীনতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তার স্মরণে মাহালীরা এই পার্বণ পালন করে আসছেন বলে প্রবীণরা জানান। উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কঠোরভাবে নিরামিষ খাবার গ্রহণ। প্রার্থনার পাশাপাশি গান ও নৃত্য এ পার্বণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎসবের সময় যে লোকগানটি গাওয়া হয়, তার কথায়ও ফুটে ওঠে মাহালী জীবনের সরলতা ও সামষ্টিকতার ছবি।

তবে জিতিয়া পার্বণের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাহালী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নানা সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের কারণে মাহালী সমাজে এ উৎসবের চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে উৎসবটি নিয়মিতভাবে উদযাপিত না হওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই নিজেদের ঐতিহ্যের একটি অংশ অচেনা হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে মাহালী সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাসাউসের নেতৃত্বে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় আবার জিতিয়া পার্বন উদযাপন শুরু হয়।

মাসাউসের নির্বাহী পরিচালক মেরিনা হাঁসদার ভাষায়, প্রায় ৫০ বছর ধরে মাহালী সমাজের একটি অংশ ধর্মান্তরসহ নানা কারণে এই উৎসব থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাই জিতিয়া পার্বনকে তারা কেবল একটি পুরোনো উৎসব হিসেবে দেখছেন না; বরং মাহালী পরিচয়কে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। এই উদ্যোগে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাহালী তরুণদের মধ্যে নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্যবাহী দং ও ঝুমুর নাচ এবং মাদলের চর্চা বাড়ছে।

জিতিয়া পার্বনের পুনর্জাগরণের এই ধারাটি এক দিনের নয়। ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বাগানপাড়া, ললিত নগরে উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পবা উপজেলার দামকুড়ায় এবং ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গোদাগাড়ীর কাকনহাটের শুরশুনিপাড়ায় আয়োজন করা হয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তানোরের মুন্ডুমালা মাহালী পাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এ উৎসব। বিভিন্ন সময়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, অক্সফাম, এনএজিআর, সিসিবিভিও, কারিতাস, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি, ইউসেপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সহযোগিতা করেছেন। ফলে উৎসবটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রবীণ মাহালী সমাজের গুরুজন ও জিতিয়া পার্বণের ঠাকুর ষষ্ঠী টুডু তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় ভুলে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূলকথা হলো—নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রবীণদের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে এবং গর্বের সঙ্গে তা ধরে রাখতে হবে। এই আহ্বানের গুরুত্ব আজকের সময়ে আরও বেশি। বিশ্বায়ন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার কারণে ছোট জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি নানা চাপের মুখে পড়ছে। নতুন প্রজন্ম যদি নিজেদের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই অনেক লোকজ জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক উপাদান হারিয়ে যেতে পারে।

জিতিয়া পার্বন মাহালী সম্প্রদায়ের কাছে আনন্দ ও মিলনের উৎসব হওয়ার পাশাপাশি আত্মপরিচয় রক্ষারও একটি আয়োজন। এর মধ্য দিয়ে শিশুরা নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, তরুণেরা সাংস্কৃতিক চর্চায় যুক্ত হচ্ছে এবং প্রবীণদের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে বসা রীতি ও স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দং ও ঝুমুর নাচ, মাদলের ছন্দ, লোকগান, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সম্মিলিত প্রার্থনা—সব মিলিয়ে এ উৎসব মাহালী জীবনের বহুমাত্রিক সংস্কৃতিকে ধারণ করছে।

একটি দেশের বৈচিত্র‍্য তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেখানে বসবাসকারী সব জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মর্যাদা পায়। বাংলাদেশের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর সমাজেরও দায় রয়েছে। কারণ একটি সংস্কৃতির বিলুপ্তি শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্যকেই দরিদ্র করে।

জিতিয়া পার্বনের মাদলের শব্দ তাই কেবল একটি উৎসবের আহ্বান নয়। এর মধ্যে রয়েছে শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার ডাক, নিজেদের ইতিহাস জানার আহ্বান এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়। মাহালীরা যেন নিজেদের ভাষা, গান, নাচ ও জীবনাচারকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। ঐতিহ্যকে শুধু স্মরণ করলেই হবে না, তাকে চর্চার মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জিতিয়া পার্বনের প্রাণের উৎসব সেই চর্চারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


মাহালী আদিবাসীদের প্রাণের উৎসব ‘জিতিয়া পার্বন’

প্রকাশের তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

একটি জাতির পরিচয় শুধু তার নাম, বসতি কিংবা জীবনযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভাষা, গান, নাচ, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, লোককথা, উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েও একটি জনগোষ্ঠী তার স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। তাই কোনো সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি উৎসবের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে ইতিহাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাহালী আদিবাসী সম্প্রদায়ের ‘জিতিয়া পার্বন’ তেমনই একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যা একসময় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। নিজেদের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার তাগিদে মাহালীরা আবারও এই উৎসবকে ফিরিয়ে এনেছেন।

গত ৩ অক্টোবর ২০২৬ রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা মাহালী পাড়ায় দিনব্যাপী উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে জিতিয়া পার্বন। মাহালী আদিবাসী আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংগঠন (মাসাউস) ও জিতিয়া পার্বন উদযাপন কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার প্রায় ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের সহস্রাধিক শিশু, নারী ও পুরুষ অংশ নেন। কয়েকদিনের প্রস্তুতির পর শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। নাচ, গান, মাদলের ছন্দ, প্রার্থনা, আলোচনা, পিঠা বিতরণ এবং বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবটি পরিণত হয় মাহালী সম্প্রদায়ের মিলনমেলায়।

মাহালী সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, জিতিয়া পার্বণের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। জিত বহন ঠাকুর নামে একজন মাহালী নেতা ছিলেন, যিনি মানুষের কুসংস্কার, পরাধীনতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তার স্মরণে মাহালীরা এই পার্বণ পালন করে আসছেন বলে প্রবীণরা জানান। উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কঠোরভাবে নিরামিষ খাবার গ্রহণ। প্রার্থনার পাশাপাশি গান ও নৃত্য এ পার্বণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎসবের সময় যে লোকগানটি গাওয়া হয়, তার কথায়ও ফুটে ওঠে মাহালী জীবনের সরলতা ও সামষ্টিকতার ছবি।

তবে জিতিয়া পার্বণের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাহালী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নানা সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের কারণে মাহালী সমাজে এ উৎসবের চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে উৎসবটি নিয়মিতভাবে উদযাপিত না হওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই নিজেদের ঐতিহ্যের একটি অংশ অচেনা হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে মাহালী সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাসাউসের নেতৃত্বে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় আবার জিতিয়া পার্বন উদযাপন শুরু হয়।

মাসাউসের নির্বাহী পরিচালক মেরিনা হাঁসদার ভাষায়, প্রায় ৫০ বছর ধরে মাহালী সমাজের একটি অংশ ধর্মান্তরসহ নানা কারণে এই উৎসব থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাই জিতিয়া পার্বনকে তারা কেবল একটি পুরোনো উৎসব হিসেবে দেখছেন না; বরং মাহালী পরিচয়কে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। এই উদ্যোগে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাহালী তরুণদের মধ্যে নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্যবাহী দং ও ঝুমুর নাচ এবং মাদলের চর্চা বাড়ছে।

জিতিয়া পার্বনের পুনর্জাগরণের এই ধারাটি এক দিনের নয়। ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বাগানপাড়া, ললিত নগরে উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পবা উপজেলার দামকুড়ায় এবং ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গোদাগাড়ীর কাকনহাটের শুরশুনিপাড়ায় আয়োজন করা হয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তানোরের মুন্ডুমালা মাহালী পাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এ উৎসব। বিভিন্ন সময়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, অক্সফাম, এনএজিআর, সিসিবিভিও, কারিতাস, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি, ইউসেপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সহযোগিতা করেছেন। ফলে উৎসবটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রবীণ মাহালী সমাজের গুরুজন ও জিতিয়া পার্বণের ঠাকুর ষষ্ঠী টুডু তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় ভুলে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূলকথা হলো—নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রবীণদের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে এবং গর্বের সঙ্গে তা ধরে রাখতে হবে। এই আহ্বানের গুরুত্ব আজকের সময়ে আরও বেশি। বিশ্বায়ন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার কারণে ছোট জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি নানা চাপের মুখে পড়ছে। নতুন প্রজন্ম যদি নিজেদের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই অনেক লোকজ জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক উপাদান হারিয়ে যেতে পারে।

জিতিয়া পার্বন মাহালী সম্প্রদায়ের কাছে আনন্দ ও মিলনের উৎসব হওয়ার পাশাপাশি আত্মপরিচয় রক্ষারও একটি আয়োজন। এর মধ্য দিয়ে শিশুরা নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, তরুণেরা সাংস্কৃতিক চর্চায় যুক্ত হচ্ছে এবং প্রবীণদের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে বসা রীতি ও স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দং ও ঝুমুর নাচ, মাদলের ছন্দ, লোকগান, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সম্মিলিত প্রার্থনা—সব মিলিয়ে এ উৎসব মাহালী জীবনের বহুমাত্রিক সংস্কৃতিকে ধারণ করছে।

একটি দেশের বৈচিত্র‍্য তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেখানে বসবাসকারী সব জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মর্যাদা পায়। বাংলাদেশের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর সমাজেরও দায় রয়েছে। কারণ একটি সংস্কৃতির বিলুপ্তি শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্যকেই দরিদ্র করে।

জিতিয়া পার্বনের মাদলের শব্দ তাই কেবল একটি উৎসবের আহ্বান নয়। এর মধ্যে রয়েছে শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার ডাক, নিজেদের ইতিহাস জানার আহ্বান এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়। মাহালীরা যেন নিজেদের ভাষা, গান, নাচ ও জীবনাচারকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। ঐতিহ্যকে শুধু স্মরণ করলেই হবে না, তাকে চর্চার মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জিতিয়া পার্বনের প্রাণের উৎসব সেই চর্চারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত