সংবাদ

উপকূলীয় জনপদে ডাবের শতকোটি টাকার বাণিজ্য


শহিদুল ইসলাম জামাল, চরফ্যাশন (ভোলা)
শহিদুল ইসলাম জামাল, চরফ্যাশন (ভোলা)
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম

উপকূলীয় জনপদে ডাবের শতকোটি টাকার বাণিজ্য
ছবি : সংবাদ

তীব্র গরমে ক্লান্ত শরীরে সতেজতার আমেজ ফিরিয়ে আনতে কিংবা ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর শরীরের তরল পদার্থের ঘাটতি মেটাতে প্রাকৃতিক পানীয় হিসেবে ডাবের পানির ভূমিকা অপরিসীম। ভেজাল ও কৃত্রিম কোমল পানীয়ের বিপরীতে সাধারণ মানুষ এখন প্রাকৃতিক ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ডাবের পানির দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছেন।

ফলে বাজারে ডাবের চাহিদা দিন দিন বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের পলিগঠিত উর্বর মাটি নারিকেল ও ডাব উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ভোলার উপকূলীয় অঞ্চল চরফ্যাশনে ডাব চাষকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। শুধু চরফ্যাশন উপজেলায় ডাব বিক্রি করেই গ্রামীণ অর্থনীতির চাকায় বছরে প্রায় শতকোটি টাকার লেনদেন ঘটছে।

ডাবের এই ব্যাপক চাহিদা উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবিকার পথ খুলে দিয়েছে। মহাজন, আড়তদার, ফড়িয়া থেকে শুরু করে পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের জীবিকার রসদ জোগাচ্ছে এই ডাব ব্যবসা।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এ অঞ্চলের শহর ও গ্রাম মিলিয়ে প্রায় ২,৪৫০ হেক্টর জমিতে নারিকেল গাছ রয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১২০ থেকে ১৫০টি গাছ থাকে এবং সঠিক পরিচর্যায় প্রতিটি গাছ থেকে বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ১৬০টি পর্যন্ত ডাব পাওয়া যায়। বাজারে ভালো দাম ও কদর থাকায় স্থানীয় গৃহস্থরা এখন নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করছেন, যার ফলে উৎপাদনও আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে বহু অসচ্ছল পরিবার ধীরে ধীরে সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছে।

ডাব চাষ ও ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় গৃহস্থদের ভাগ্য বদলের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে চরফ্যাশনের বিভিন্ন ইউনিয়নে। যেমন দুলারহাট নীলকমল ইউনিয়নের আলাউদ্দিন মাস্টার কয়েক বছর আগেও সঠিক দাম না পাওয়ায় বাগানের প্রায় পাঁচ শতাধিক গাছের পরিচর্যা করতেন না, ফলে পোকা ও ইঁদুরের আক্রমণে প্রচুর ডাব নষ্ট হতো।

কিন্তু বর্তমানে ডাবের ভালো দাম থাকায় তিনি নিয়মিত পরিচর্যা করছেন এবং বছরে কেবল ডাব বিক্রি করেই ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা বাড়তি আয় করছেন। একইভাবে চর মানিকা এলাকার রফিজল মোল্লা তার বাড়ির আশপাশের দুই শতাধিক নারিকেল গাছ থেকে ডাব বিক্রি করে বছরে কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন। এই জমানো টাকা দিয়ে তিনি ইতিমধ্যে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও জমি কেনার আশা রাখছেন।

চরফ্যাশনের ডাব স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিস্তৃত হচ্ছে সারা দেশের বাজারে। এখানকার কলমির মোড় এলাকার আড়তদার মো. কবির হোসেন জানান, ফড়িয়ারা সরাসরি গৃহস্থদের কাছ থেকে প্রতি জোড়া ডাব ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় সংগ্রহ করে আড়তদারদের কাছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি করেন। তিনি একাই প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকার ডাব বিভিন্ন মোকামে পাঠান। চরফ্যাশন উপজেলায় তার মতো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন আড়তদার রয়েছেন, যাদের প্রত্যেকেই মাসে গড়ে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার ডাব ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটসহ দেশের প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহরের বাজারে পাঠান।

প্রথাগত বাজারজাতকরণের পাশাপাশি বর্তমান যুগের তরুণেরাও এই ব্যবসায় পিছিয়ে নেই। স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তারা ভোক্তা পর্যায়ে ডাবের চাহিদা দেখে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা শুরু করেছেন। তারা সরাসরি বাগান থেকে তাজা ডাব সংগ্রহ করে অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছেন, যা তরুণদের মাঝে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

ভোলা তথা চরফ্যাশনের ডাবের এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে এর গুণগত মান বড় ভূমিকা রাখছে। চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা জানান, এখানকার ডাব আকারে বড় হওয়ার পাশাপাশি ভেতরে পানির পরিমাণ এবং মিষ্টতা অনেক বেশি হওয়ায় সারা দেশে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে উন্নত জাতের নারিকেল চারা বিতরণ, বালাই ব্যবস্থাপনার সঠিক পরামর্শ এবং অন্যান্য কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ফলে নারিকেল ও ডাব চাষ বৃদ্ধি পেয়ে চরফ্যাশনের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি স্থায়ী ও সমৃদ্ধ অবস্থান গড়ে তুলছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬


উপকূলীয় জনপদে ডাবের শতকোটি টাকার বাণিজ্য

প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

তীব্র গরমে ক্লান্ত শরীরে সতেজতার আমেজ ফিরিয়ে আনতে কিংবা ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর শরীরের তরল পদার্থের ঘাটতি মেটাতে প্রাকৃতিক পানীয় হিসেবে ডাবের পানির ভূমিকা অপরিসীম। ভেজাল ও কৃত্রিম কোমল পানীয়ের বিপরীতে সাধারণ মানুষ এখন প্রাকৃতিক ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ডাবের পানির দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছেন।

ফলে বাজারে ডাবের চাহিদা দিন দিন বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের পলিগঠিত উর্বর মাটি নারিকেল ও ডাব উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ভোলার উপকূলীয় অঞ্চল চরফ্যাশনে ডাব চাষকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। শুধু চরফ্যাশন উপজেলায় ডাব বিক্রি করেই গ্রামীণ অর্থনীতির চাকায় বছরে প্রায় শতকোটি টাকার লেনদেন ঘটছে।

ডাবের এই ব্যাপক চাহিদা উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবিকার পথ খুলে দিয়েছে। মহাজন, আড়তদার, ফড়িয়া থেকে শুরু করে পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের জীবিকার রসদ জোগাচ্ছে এই ডাব ব্যবসা।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এ অঞ্চলের শহর ও গ্রাম মিলিয়ে প্রায় ২,৪৫০ হেক্টর জমিতে নারিকেল গাছ রয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১২০ থেকে ১৫০টি গাছ থাকে এবং সঠিক পরিচর্যায় প্রতিটি গাছ থেকে বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ১৬০টি পর্যন্ত ডাব পাওয়া যায়। বাজারে ভালো দাম ও কদর থাকায় স্থানীয় গৃহস্থরা এখন নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করছেন, যার ফলে উৎপাদনও আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে বহু অসচ্ছল পরিবার ধীরে ধীরে সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছে।

ডাব চাষ ও ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় গৃহস্থদের ভাগ্য বদলের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে চরফ্যাশনের বিভিন্ন ইউনিয়নে। যেমন দুলারহাট নীলকমল ইউনিয়নের আলাউদ্দিন মাস্টার কয়েক বছর আগেও সঠিক দাম না পাওয়ায় বাগানের প্রায় পাঁচ শতাধিক গাছের পরিচর্যা করতেন না, ফলে পোকা ও ইঁদুরের আক্রমণে প্রচুর ডাব নষ্ট হতো।

কিন্তু বর্তমানে ডাবের ভালো দাম থাকায় তিনি নিয়মিত পরিচর্যা করছেন এবং বছরে কেবল ডাব বিক্রি করেই ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা বাড়তি আয় করছেন। একইভাবে চর মানিকা এলাকার রফিজল মোল্লা তার বাড়ির আশপাশের দুই শতাধিক নারিকেল গাছ থেকে ডাব বিক্রি করে বছরে কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন। এই জমানো টাকা দিয়ে তিনি ইতিমধ্যে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও জমি কেনার আশা রাখছেন।

চরফ্যাশনের ডাব স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিস্তৃত হচ্ছে সারা দেশের বাজারে। এখানকার কলমির মোড় এলাকার আড়তদার মো. কবির হোসেন জানান, ফড়িয়ারা সরাসরি গৃহস্থদের কাছ থেকে প্রতি জোড়া ডাব ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় সংগ্রহ করে আড়তদারদের কাছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি করেন। তিনি একাই প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকার ডাব বিভিন্ন মোকামে পাঠান। চরফ্যাশন উপজেলায় তার মতো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন আড়তদার রয়েছেন, যাদের প্রত্যেকেই মাসে গড়ে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার ডাব ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটসহ দেশের প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহরের বাজারে পাঠান।

প্রথাগত বাজারজাতকরণের পাশাপাশি বর্তমান যুগের তরুণেরাও এই ব্যবসায় পিছিয়ে নেই। স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তারা ভোক্তা পর্যায়ে ডাবের চাহিদা দেখে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা শুরু করেছেন। তারা সরাসরি বাগান থেকে তাজা ডাব সংগ্রহ করে অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছেন, যা তরুণদের মাঝে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

ভোলা তথা চরফ্যাশনের ডাবের এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে এর গুণগত মান বড় ভূমিকা রাখছে। চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা জানান, এখানকার ডাব আকারে বড় হওয়ার পাশাপাশি ভেতরে পানির পরিমাণ এবং মিষ্টতা অনেক বেশি হওয়ায় সারা দেশে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে উন্নত জাতের নারিকেল চারা বিতরণ, বালাই ব্যবস্থাপনার সঠিক পরামর্শ এবং অন্যান্য কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ফলে নারিকেল ও ডাব চাষ বৃদ্ধি পেয়ে চরফ্যাশনের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি স্থায়ী ও সমৃদ্ধ অবস্থান গড়ে তুলছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত