সন্তানের অমনোযোগিতা, জেদ কিংবা দুষ্টুমি সামলাতে অনেক মা-বাবাই বকাঝকার আশ্রয় নেন। কিন্তু শাসন করার বদলে ধৈর্য ধরে আচরণ শেখানোর মাধ্যমে শিশুর একাগ্রতা ও শিষ্টাচার গড়ে তোলা সম্ভব। জাপানে শিশুদের আচরণ শেখানোর ক্ষেত্রে মা-বাবার নিজেদের উদাহরণ তৈরি করা, নিয়মিত রুটিন অনুসরণ এবং ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিজিটাল গণমাধ্যম আপওয়ার্ডিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেখিকা সেসিলি নোবলার শিশুদের শৃঙ্খলা শেখানোর এমন তিনটি কৌশল তুলে ধরেছেন। কৌশলগুলো অনুসরণ করে মা-বাবারাও সন্তানকে ইতিবাচকভাবে আচরণ শেখানোর চেষ্টা করতে পারেন।
১. নিজের আচরণের মধ্য দিয়ে শিক্ষা দিন
শিশুরা বড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং তা অনুকরণ করার চেষ্টা করে। তাই সন্তানকে শান্ত, বিনয়ী ও ধৈর্যশীল হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে মা-বাবাকেও নিজেদের আচরণে সেই গুণগুলোর চর্চা করতে হবে।
সন্তান রেগে গিয়ে চিৎকার না করুক, এমনটা চাইলে মা-বাবারও রাগের সময় নিজেকে সামলানো জরুরি। কারণ, বড়দের চিৎকার বা রূঢ় আচরণে শিশু ভয় পেতে পারে। এতে ভুলের কারণ কিংবা আচরণ সংশোধনের বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট নাও হতে পারে।
সন্তান ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে রেগে না গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করুন। এরপর তাকে কাছে ডেকে স্নেহের সঙ্গে ভুলটি বুঝিয়ে বলুন এবং সেই আচরণের পরিণতি সম্পর্কে ধারণা দিন। একবারেই পরিবর্তন না এলেও ধৈর্য ধরে বোঝালে শিশু ধীরে ধীরে শিখতে পারে।
২. নিয়ম তৈরি করুন, তা মেনেও চলুন
শিশুর দৈনন্দিন জীবনে নির্দিষ্ট রুটিন ও পরিষ্কার নিয়ম থাকলে তার জন্য কোন সময়ে কী করতে হবে, তা বোঝা সহজ হয়। বিপরীতে, নিয়মের অনিশ্চয়তা শিশুর মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিষয়টি বোঝার জন্য কর্মক্ষেত্রের উদাহরণ বিবেচনা করা যায়। অফিসে কখন যেতে হবে, কী কাজ করতে হবে কিংবা কখন সভা শুরু হবে, তা জানা না থাকলে একজন কর্মীও বিভ্রান্তিতে পড়বেন। শিশুদের ক্ষেত্রেও নিয়মকানুন স্পষ্ট না থাকলে একই ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তাই পরিবারের দৈনন্দিন কাজে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম চালু করা যেতে পারে। যেমন:
শিশুকে আগে থেকেই নিয়মগুলো বুঝিয়ে দিন এবং নিজেরাও সেগুলো মেনে চলুন। নিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে শিশুর পক্ষে তা বুঝে অনুসরণ করা সহজ হতে পারে।
৩. ভুলকে শাস্তির কারণ নয়, শেখার সুযোগ ভাবুন
শিশু জেদ করলে কিংবা অবাধ্য আচরণ করলে শুধু ‘এটা করো না’ বা ‘দুষ্টুমি বন্ধ করো’ বলার পরিবর্তে কেন সে এমন আচরণ করছে, তা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। অনেক সময় কোনো পরিস্থিতি সামলানোর প্রয়োজনীয় দক্ষতা শিশুর আয়ত্তে থাকে না।
ধরা যাক, কোনো কিছু না পেয়ে শিশু কান্নাকাটি করছে। তখন তাকে বকাঝকা না করে হতাশা সামলানোর উপায় শেখানো যেতে পারে। একইভাবে, একাধিক শিশু একটি খেলনা নিয়ে বিরোধে জড়ালে তাদের অপেক্ষা করা এবং পালা করে খেলার নিয়ম বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইতিবাচক ভাষায় শিশুকে বোঝানো গুরুত্বপূর্ণ। এতে সে শুধু কোন কাজটি করা উচিত নয়, বরং তার পরিবর্তে কীভাবে আচরণ করতে হবে, সেটিও শিখতে পারে।
এই পদ্ধতিতে ভুলকে কেবল শাস্তিযোগ্য আচরণ হিসেবে না দেখে শেখার একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের পেছনে কোন দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, তা বুঝে শিশুকে সেই দক্ষতা আয়ত্ত করতে সাহায্য করাই এর মূল লক্ষ্য।
শাসনের আগে বোঝার চেষ্টা করুন
শিশুর আচরণ সংশোধনে প্রতিবার শাস্তি দেওয়ার বদলে এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যেখানে সে নিয়ম বুঝতে পারে এবং নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। মা-বাবার আদর্শ আচরণ, নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ - এই তিনটি বিষয় শিশুর শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচার গঠনে সহায়ক হতে পারে।
শিশুর আচরণে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর শুধু তা থামানোর চেষ্টা না করে, ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে, সেটি শেখানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬
সন্তানের অমনোযোগিতা, জেদ কিংবা দুষ্টুমি সামলাতে অনেক মা-বাবাই বকাঝকার আশ্রয় নেন। কিন্তু শাসন করার বদলে ধৈর্য ধরে আচরণ শেখানোর মাধ্যমে শিশুর একাগ্রতা ও শিষ্টাচার গড়ে তোলা সম্ভব। জাপানে শিশুদের আচরণ শেখানোর ক্ষেত্রে মা-বাবার নিজেদের উদাহরণ তৈরি করা, নিয়মিত রুটিন অনুসরণ এবং ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিজিটাল গণমাধ্যম আপওয়ার্ডিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেখিকা সেসিলি নোবলার শিশুদের শৃঙ্খলা শেখানোর এমন তিনটি কৌশল তুলে ধরেছেন। কৌশলগুলো অনুসরণ করে মা-বাবারাও সন্তানকে ইতিবাচকভাবে আচরণ শেখানোর চেষ্টা করতে পারেন।
১. নিজের আচরণের মধ্য দিয়ে শিক্ষা দিন
শিশুরা বড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং তা অনুকরণ করার চেষ্টা করে। তাই সন্তানকে শান্ত, বিনয়ী ও ধৈর্যশীল হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে মা-বাবাকেও নিজেদের আচরণে সেই গুণগুলোর চর্চা করতে হবে।
সন্তান রেগে গিয়ে চিৎকার না করুক, এমনটা চাইলে মা-বাবারও রাগের সময় নিজেকে সামলানো জরুরি। কারণ, বড়দের চিৎকার বা রূঢ় আচরণে শিশু ভয় পেতে পারে। এতে ভুলের কারণ কিংবা আচরণ সংশোধনের বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট নাও হতে পারে।
সন্তান ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে রেগে না গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করুন। এরপর তাকে কাছে ডেকে স্নেহের সঙ্গে ভুলটি বুঝিয়ে বলুন এবং সেই আচরণের পরিণতি সম্পর্কে ধারণা দিন। একবারেই পরিবর্তন না এলেও ধৈর্য ধরে বোঝালে শিশু ধীরে ধীরে শিখতে পারে।
২. নিয়ম তৈরি করুন, তা মেনেও চলুন
শিশুর দৈনন্দিন জীবনে নির্দিষ্ট রুটিন ও পরিষ্কার নিয়ম থাকলে তার জন্য কোন সময়ে কী করতে হবে, তা বোঝা সহজ হয়। বিপরীতে, নিয়মের অনিশ্চয়তা শিশুর মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিষয়টি বোঝার জন্য কর্মক্ষেত্রের উদাহরণ বিবেচনা করা যায়। অফিসে কখন যেতে হবে, কী কাজ করতে হবে কিংবা কখন সভা শুরু হবে, তা জানা না থাকলে একজন কর্মীও বিভ্রান্তিতে পড়বেন। শিশুদের ক্ষেত্রেও নিয়মকানুন স্পষ্ট না থাকলে একই ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তাই পরিবারের দৈনন্দিন কাজে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম চালু করা যেতে পারে। যেমন:
শিশুকে আগে থেকেই নিয়মগুলো বুঝিয়ে দিন এবং নিজেরাও সেগুলো মেনে চলুন। নিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে শিশুর পক্ষে তা বুঝে অনুসরণ করা সহজ হতে পারে।
৩. ভুলকে শাস্তির কারণ নয়, শেখার সুযোগ ভাবুন
শিশু জেদ করলে কিংবা অবাধ্য আচরণ করলে শুধু ‘এটা করো না’ বা ‘দুষ্টুমি বন্ধ করো’ বলার পরিবর্তে কেন সে এমন আচরণ করছে, তা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। অনেক সময় কোনো পরিস্থিতি সামলানোর প্রয়োজনীয় দক্ষতা শিশুর আয়ত্তে থাকে না।
ধরা যাক, কোনো কিছু না পেয়ে শিশু কান্নাকাটি করছে। তখন তাকে বকাঝকা না করে হতাশা সামলানোর উপায় শেখানো যেতে পারে। একইভাবে, একাধিক শিশু একটি খেলনা নিয়ে বিরোধে জড়ালে তাদের অপেক্ষা করা এবং পালা করে খেলার নিয়ম বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইতিবাচক ভাষায় শিশুকে বোঝানো গুরুত্বপূর্ণ। এতে সে শুধু কোন কাজটি করা উচিত নয়, বরং তার পরিবর্তে কীভাবে আচরণ করতে হবে, সেটিও শিখতে পারে।
এই পদ্ধতিতে ভুলকে কেবল শাস্তিযোগ্য আচরণ হিসেবে না দেখে শেখার একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের পেছনে কোন দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, তা বুঝে শিশুকে সেই দক্ষতা আয়ত্ত করতে সাহায্য করাই এর মূল লক্ষ্য।
শাসনের আগে বোঝার চেষ্টা করুন
শিশুর আচরণ সংশোধনে প্রতিবার শাস্তি দেওয়ার বদলে এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যেখানে সে নিয়ম বুঝতে পারে এবং নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। মা-বাবার আদর্শ আচরণ, নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ - এই তিনটি বিষয় শিশুর শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচার গঠনে সহায়ক হতে পারে।
শিশুর আচরণে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর শুধু তা থামানোর চেষ্টা না করে, ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে, সেটি শেখানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন