মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পর্যটনশিল্পের বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা। কোথাও পাহাড়-টিলা কেটে তৈরি হচ্ছে স্থাপনা, কোথাও বনের ভেতরে নির্মিত হচ্ছে কটেজ, আবার কোথাও গাছপালা সরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে যাতায়াতের পথ। গত কয়েক বছরে জেলাজুড়ে রিসোর্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০টিতে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশের অনুমোদন ও বৈধতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
পর্যটন ব্যবসার এই বিস্তারে একদিকে বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতি, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে অজগর, গোখরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, গন্ধগোকুল, বানর ও মেছো বিড়াল। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, বনাঞ্চলে মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি এবং রিসোর্টের কৃত্রিম আলোর প্রভাবে বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং নষ্ট হচ্ছে তাদের চলাচলের পথ ও খাদ্যের উৎস। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পর্যটনের বিকাশের নামে প্রকৃতির ওপর এভাবে চাপ বাড়তে থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে বিপন্ন হতে পারে শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংরক্ষিত চিরহরিৎ বনাঞ্চল। ১ হাজার ২৫০ হেক্টর আয়তনের এই বনাঞ্চলকে ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর জেলায় পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে শ্রীমঙ্গলে ১৩ একর জায়গাজুড়ে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন শ্রেণির রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠতে থাকে।
বিশেষ করে রাধানগর এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় সূত্রের হিসাবে, শুধু এই এলাকাতেই রয়েছে ৪০ থেকে ৪৫টি রিসোর্ট। পুরো শ্রীমঙ্গল উপজেলায় রিসোর্টের সংখ্যা শতাধিক এবং জেলাজুড়ে এ সংখ্যা প্রায় ২০০।
তবে গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। এখন কোথাও আবাসিক বাড়ির কয়েকটি কক্ষ সাজিয়ে, কোথাও পাহাড়-টিলা কেটে ছোট স্থাপনা নির্মাণ করেই দেওয়া হচ্ছে রিসোর্টের নাম। এসব স্থাপনার অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বড় কোম্পানি, ধনাঢ্য ব্যক্তি, আইনজীবী, ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা এবং জনপ্রিয় কয়েকজন তারকা এসব রিসোর্টে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন বলে জানা গেছে। মূলধারার রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কেউ কেউ স্থানীয়দের কাছ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন শতক জমি কিনে সেখানে কয়েকটি কক্ষ নির্মাণ করেই রিসোর্টের নামে ব্যবসা চালাচ্ছেন।
পাহাড়-টিলা কেটে রিসোর্ট নির্মাণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে। উঁচু টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে, বনের ভেতরে নির্মিত হচ্ছে কটেজ এবং গাছপালা সরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে রাস্তা। এতে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যাওয়ার পাশাপাশি বন্য প্রাণীর বিচরণক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব জানান, চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে লাউয়াছড়া থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাপসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে এসেছে। এর মধ্যে অজগর, পদ্ম গোখরা, আইড ক্যাট স্নেক, সবুজ ফণিমনসা, গন্ধগোকুল, বানর ও মেছো বিড়াল রয়েছে। নির্বিচারে পাহাড় ও জঙ্গল কেটে ফেলা এবং প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের বিচরণ বেড়ে যাওয়ায় বন্য প্রাণীরা বনকে আর নিরাপদ মনে করতে পারছে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য আ. স. ম. ছালেহ সোহেল বলেন, রিসোর্টগুলোতে ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম আলোর বিকিরণ বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয় বিপন্ন হয়ে পড়ে। ১০ থেকে ২০টি রিসোর্ট থাকলে পরিস্থিতি এক রকম হতে পারত, কিন্তু বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ২০০-তে পৌঁছেছে।
পর্যটন খাতের বিকাশের সঙ্গে রিসোর্টের সংখ্যা বাড়লেও সব প্রতিষ্ঠান একই নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বৈধ ব্যবসায়ীরা। শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, পাহাড়ি এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণ করতে হলে জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। তবে তাঁর হিসাবে, পূর্ণাঙ্গ রিসোর্টের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টির বেশি হবে না।
শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী সেলিম আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্রীমঙ্গলে প্রকৃত অর্থে রিসোর্ট বলতে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি আছে। সরকারি নিয়ম মেনে কর দিয়ে যাঁরা ব্যবসা করছেন, তারা নামসর্বস্ব এসব অবৈধ রিসোর্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম জানান, অধিদপ্তর থেকে প্রায় ৫০টি রিসোর্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র নেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ মামলা করা হয়েছে। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০টি বা তার বেশি কক্ষ রয়েছে, এমন রিসোর্টকে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দেয়। ২০টির কম কক্ষ রয়েছে, এমন রিসোর্টের ক্ষেত্রে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, টিলা বা পাহাড় কাটার অভিযোগ পেলে প্রশাসন তা খতিয়ে দেখে। উপজেলা বর্তমানে কতটি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, সেগুলোর ভূমির মালিকানা, অনুমোদন ও লাইসেন্সের অবস্থা কী-এসব তথ্য সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ডেটাবেস তৈরির কাজ চলছে। জমি বা টিলার শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন না থাকলে তা করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং সম্প্রতি নিয়ম অমান্য করায় দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রকৃতির ওপর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষতি ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা। তাদের মতে, পর্যটনের বিকাশের জন্য রিসোর্ট নির্মাণের প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু তা পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল ধ্বংসের বিনিময়ে হতে পারে না।

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পর্যটনশিল্পের বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা। কোথাও পাহাড়-টিলা কেটে তৈরি হচ্ছে স্থাপনা, কোথাও বনের ভেতরে নির্মিত হচ্ছে কটেজ, আবার কোথাও গাছপালা সরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে যাতায়াতের পথ। গত কয়েক বছরে জেলাজুড়ে রিসোর্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০টিতে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশের অনুমোদন ও বৈধতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
পর্যটন ব্যবসার এই বিস্তারে একদিকে বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতি, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে অজগর, গোখরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, গন্ধগোকুল, বানর ও মেছো বিড়াল। পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, বনাঞ্চলে মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি এবং রিসোর্টের কৃত্রিম আলোর প্রভাবে বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং নষ্ট হচ্ছে তাদের চলাচলের পথ ও খাদ্যের উৎস। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পর্যটনের বিকাশের নামে প্রকৃতির ওপর এভাবে চাপ বাড়তে থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে বিপন্ন হতে পারে শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংরক্ষিত চিরহরিৎ বনাঞ্চল। ১ হাজার ২৫০ হেক্টর আয়তনের এই বনাঞ্চলকে ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর জেলায় পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে শ্রীমঙ্গলে ১৩ একর জায়গাজুড়ে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন শ্রেণির রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠতে থাকে।
বিশেষ করে রাধানগর এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় সূত্রের হিসাবে, শুধু এই এলাকাতেই রয়েছে ৪০ থেকে ৪৫টি রিসোর্ট। পুরো শ্রীমঙ্গল উপজেলায় রিসোর্টের সংখ্যা শতাধিক এবং জেলাজুড়ে এ সংখ্যা প্রায় ২০০।
তবে গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। এখন কোথাও আবাসিক বাড়ির কয়েকটি কক্ষ সাজিয়ে, কোথাও পাহাড়-টিলা কেটে ছোট স্থাপনা নির্মাণ করেই দেওয়া হচ্ছে রিসোর্টের নাম। এসব স্থাপনার অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বড় কোম্পানি, ধনাঢ্য ব্যক্তি, আইনজীবী, ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা এবং জনপ্রিয় কয়েকজন তারকা এসব রিসোর্টে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন বলে জানা গেছে। মূলধারার রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কেউ কেউ স্থানীয়দের কাছ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন শতক জমি কিনে সেখানে কয়েকটি কক্ষ নির্মাণ করেই রিসোর্টের নামে ব্যবসা চালাচ্ছেন।
পাহাড়-টিলা কেটে রিসোর্ট নির্মাণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে। উঁচু টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে, বনের ভেতরে নির্মিত হচ্ছে কটেজ এবং গাছপালা সরিয়ে তৈরি করা হচ্ছে রাস্তা। এতে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যাওয়ার পাশাপাশি বন্য প্রাণীর বিচরণক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব জানান, চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে লাউয়াছড়া থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাপসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে এসেছে। এর মধ্যে অজগর, পদ্ম গোখরা, আইড ক্যাট স্নেক, সবুজ ফণিমনসা, গন্ধগোকুল, বানর ও মেছো বিড়াল রয়েছে। নির্বিচারে পাহাড় ও জঙ্গল কেটে ফেলা এবং প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের বিচরণ বেড়ে যাওয়ায় বন্য প্রাণীরা বনকে আর নিরাপদ মনে করতে পারছে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য আ. স. ম. ছালেহ সোহেল বলেন, রিসোর্টগুলোতে ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কৃত্রিম আলোর বিকিরণ বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয় বিপন্ন হয়ে পড়ে। ১০ থেকে ২০টি রিসোর্ট থাকলে পরিস্থিতি এক রকম হতে পারত, কিন্তু বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ২০০-তে পৌঁছেছে।
পর্যটন খাতের বিকাশের সঙ্গে রিসোর্টের সংখ্যা বাড়লেও সব প্রতিষ্ঠান একই নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বৈধ ব্যবসায়ীরা। শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, পাহাড়ি এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণ করতে হলে জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। তবে তাঁর হিসাবে, পূর্ণাঙ্গ রিসোর্টের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টির বেশি হবে না।
শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী সেলিম আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্রীমঙ্গলে প্রকৃত অর্থে রিসোর্ট বলতে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি আছে। সরকারি নিয়ম মেনে কর দিয়ে যাঁরা ব্যবসা করছেন, তারা নামসর্বস্ব এসব অবৈধ রিসোর্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম জানান, অধিদপ্তর থেকে প্রায় ৫০টি রিসোর্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র নেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ মামলা করা হয়েছে। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০টি বা তার বেশি কক্ষ রয়েছে, এমন রিসোর্টকে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দেয়। ২০টির কম কক্ষ রয়েছে, এমন রিসোর্টের ক্ষেত্রে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, টিলা বা পাহাড় কাটার অভিযোগ পেলে প্রশাসন তা খতিয়ে দেখে। উপজেলা বর্তমানে কতটি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, সেগুলোর ভূমির মালিকানা, অনুমোদন ও লাইসেন্সের অবস্থা কী-এসব তথ্য সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও ডেটাবেস তৈরির কাজ চলছে। জমি বা টিলার শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন না থাকলে তা করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং সম্প্রতি নিয়ম অমান্য করায় দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রকৃতির ওপর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষতি ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা। তাদের মতে, পর্যটনের বিকাশের জন্য রিসোর্ট নির্মাণের প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু তা পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল ধ্বংসের বিনিময়ে হতে পারে না।

আপনার মতামত লিখুন