সংবাদ

শতবর্ষী ডাকঘর : চিঠির দিন ফুরিয়েছে, রয়ে গেছে ইতিহাসের ঠিকানা


সংগ্রাম দত্ত, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
সংগ্রাম দত্ত, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩১ পিএম

শতবর্ষী ডাকঘর : চিঠির দিন ফুরিয়েছে, রয়ে গেছে ইতিহাসের ঠিকানা
ছবি : সংবাদ

একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দে চা-বাগানের শ্রমিক কলোনি থেকে বাংলো-সবখানেই তৈরি হতো কৌতূহল। কার চিঠি এসেছে, কে দূরদেশ থেকে খবর পাঠিয়েছেন, কোন পরিবারে এসেছে সুখবর, আর কার ঘরে পৌঁছেছে বিষাদের বার্তা-এসব জানতে ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকতেন অনেকে। তাঁর হাতে থাকা একটি চিঠির খাম কখনো হয়ে উঠত আনন্দের উপলক্ষ, কখনো দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, আবার কখনো মুহূর্তেই বদলে দিত একটি পরিবারের পরিবেশ।

সেই অপেক্ষার দিন এখন প্রায় ইতিহাস। মুঠোফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডেই পৌঁছে যায় দূরদেশের খবর। ই-মেইল, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের যুগে ব্যক্তিগত চিঠি লেখার অভ্যাসও হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। অথচ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট চা-বাগানের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট একটি টিনের ডাকঘর আজও নীরবে ধারণ করে আছে যোগাযোগের সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি।

নাম তার কালীঘাট ডাকঘর। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ডাকঘরের বয়স এখন ১০৩ বছর। সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ধরন ও চা-বাগানকেন্দ্রিক জনপদের চেহারা বদলালেও বদলায়নি ডাকঘরটির ঐতিহাসিক পরিচয়। শতবর্ষ পেরিয়ে আসা এই ভবন এখন শুধু ডাক আদান-প্রদানের কেন্দ্র নয়; শ্রীমঙ্গলের চা-শিল্প, ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং এ অঞ্চলের মানুষের সামাজিক জীবনের পরিবর্তনের এক নীরব সাক্ষী।

চিঠি একসময় কেবল সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম ছিল না, ছিল অনুভূতি প্রকাশেরও এক অনন্য উপায়। প্রিয়জনের হাতের লেখা কয়েকটি লাইন পড়ার জন্য মানুষ অপেক্ষা করতেন দিনের পর দিন। দূরে থাকা স্বজনের চিঠি হাতে পাওয়ার আনন্দে মিশে থাকত তাকে কাছে পাওয়ার অনুভূতি।

ফুলছড়া চা-বাগানসংলগ্ন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক নেত্রী ফাল্গুনী বন রিতার শৈশবের স্মৃতিতেও জড়িয়ে আছে চিঠি ও কালীঘাট ডাকঘর। তিনি বলেন, ‘আগে মোবাইল, টেলিফোন, ইন্টারনেট কিছুই হাতের কাছে ছিল না। চিঠিতেই ছিল যোগাযোগ। ডাকপিয়ন চিঠি নিয়ে এলে পাড়ার মানুষ তাকে ঘিরে ধরত। একটি চিঠিই কখনো একটি পরিবারের পরিবেশ বদলে দিত—কখনো হাসিতে, কখনো বিষাদে।’

কালীঘাট ডাকঘরের ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ব্রিটিশ শাসনামলের চা-শিল্পাঞ্চলের দিকে। তখন কালীঘাটসহ এ অঞ্চলের চা-বাগানগুলো ছিল ব্রিটিশ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। চা-শিল্পের প্রসার ও প্রশাসনিক কাজের বার্তা আদান-প্রদানের প্রয়োজনেই ১৯২৩ সালে এই ডাকঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন এক আনা বা দুই আনা খরচে পোস্টকার্ডের মাধ্যমে চিঠি পাঠানো যেত। প্রথম দিকে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা তাদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ডাকব্যবস্থা ব্যবহার করতেন। পরে ধীরে ধীরে বাগানে বসবাসকারী অন্য মানুষেরাও এ সেবার সঙ্গে যুক্ত হন। স্বাধীনতার পর এলাকায় মানুষের বসতি বাড়তে থাকায় ডাকঘরের কার্যক্রমও বিস্তৃত হয়।

কালীঘাট চা-বাগানের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা ডাকঘরটির বাহ্যিক চেহারায় নেই কোনো আড়ম্বর। টিনের তৈরি পুরোনো ভবনটি ধরে রেখেছে তার চেনা কাঠামো। শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল ফজল মো. আব্দুল হাই ডন জানান, বর্তমানে চা-বাগানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সরকারি চিঠিপত্র নিয়মিত এলেও ব্যক্তিগত চিঠি খুবই কম আসে। বর্তমানে এখানে একজন পোস্টমাস্টার, একজন পোস্টম্যান ও একজন রানার দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রবীণ সাংবাদিক রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী বলেন, চা-শিল্পাঞ্চলের প্রথম দিককার ডাকঘর হিসেবে এর আলাদা মর্যাদা রয়েছে। তবে আগের মতো চিঠিপত্র এখন আর আসে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক এই গুরুত্ব বিবেচনা করে ডাক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভবনটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করবে।

১৯২৩ সালে যখন কালীঘাট ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল চিঠি। ২০২৬ সালে এসে যোগাযোগের মাধ্যম আমূল বদলে গেলেও অতীতের স্মৃতিকে অপ্রয়োজনীয় করে দেয়নি। শতবর্ষ পেরোনো এই ডাকঘর তাই কেবল একটি সেবাকেন্দ্র নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের চা-শিল্পের ইতিহাস ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের এক জীবন্ত স্মারক। যোগাযোগের মাধ্যম বদলালেও মানুষের সম্পর্ক ও ইতিহাসের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না—কালীঘাট ডাকঘর ১০৩ বছর ধরে একই ঠিকানায় সেই সত্যেরই প্রমাণ দিয়ে চলেছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


শতবর্ষী ডাকঘর : চিঠির দিন ফুরিয়েছে, রয়ে গেছে ইতিহাসের ঠিকানা

প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দে চা-বাগানের শ্রমিক কলোনি থেকে বাংলো-সবখানেই তৈরি হতো কৌতূহল। কার চিঠি এসেছে, কে দূরদেশ থেকে খবর পাঠিয়েছেন, কোন পরিবারে এসেছে সুখবর, আর কার ঘরে পৌঁছেছে বিষাদের বার্তা-এসব জানতে ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকতেন অনেকে। তাঁর হাতে থাকা একটি চিঠির খাম কখনো হয়ে উঠত আনন্দের উপলক্ষ, কখনো দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, আবার কখনো মুহূর্তেই বদলে দিত একটি পরিবারের পরিবেশ।

সেই অপেক্ষার দিন এখন প্রায় ইতিহাস। মুঠোফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডেই পৌঁছে যায় দূরদেশের খবর। ই-মেইল, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের যুগে ব্যক্তিগত চিঠি লেখার অভ্যাসও হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। অথচ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট চা-বাগানের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট একটি টিনের ডাকঘর আজও নীরবে ধারণ করে আছে যোগাযোগের সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি।

নাম তার কালীঘাট ডাকঘর। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ডাকঘরের বয়স এখন ১০৩ বছর। সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ধরন ও চা-বাগানকেন্দ্রিক জনপদের চেহারা বদলালেও বদলায়নি ডাকঘরটির ঐতিহাসিক পরিচয়। শতবর্ষ পেরিয়ে আসা এই ভবন এখন শুধু ডাক আদান-প্রদানের কেন্দ্র নয়; শ্রীমঙ্গলের চা-শিল্প, ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং এ অঞ্চলের মানুষের সামাজিক জীবনের পরিবর্তনের এক নীরব সাক্ষী।

চিঠি একসময় কেবল সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম ছিল না, ছিল অনুভূতি প্রকাশেরও এক অনন্য উপায়। প্রিয়জনের হাতের লেখা কয়েকটি লাইন পড়ার জন্য মানুষ অপেক্ষা করতেন দিনের পর দিন। দূরে থাকা স্বজনের চিঠি হাতে পাওয়ার আনন্দে মিশে থাকত তাকে কাছে পাওয়ার অনুভূতি।

ফুলছড়া চা-বাগানসংলগ্ন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক নেত্রী ফাল্গুনী বন রিতার শৈশবের স্মৃতিতেও জড়িয়ে আছে চিঠি ও কালীঘাট ডাকঘর। তিনি বলেন, ‘আগে মোবাইল, টেলিফোন, ইন্টারনেট কিছুই হাতের কাছে ছিল না। চিঠিতেই ছিল যোগাযোগ। ডাকপিয়ন চিঠি নিয়ে এলে পাড়ার মানুষ তাকে ঘিরে ধরত। একটি চিঠিই কখনো একটি পরিবারের পরিবেশ বদলে দিত—কখনো হাসিতে, কখনো বিষাদে।’

কালীঘাট ডাকঘরের ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ব্রিটিশ শাসনামলের চা-শিল্পাঞ্চলের দিকে। তখন কালীঘাটসহ এ অঞ্চলের চা-বাগানগুলো ছিল ব্রিটিশ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। চা-শিল্পের প্রসার ও প্রশাসনিক কাজের বার্তা আদান-প্রদানের প্রয়োজনেই ১৯২৩ সালে এই ডাকঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন এক আনা বা দুই আনা খরচে পোস্টকার্ডের মাধ্যমে চিঠি পাঠানো যেত। প্রথম দিকে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা তাদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ডাকব্যবস্থা ব্যবহার করতেন। পরে ধীরে ধীরে বাগানে বসবাসকারী অন্য মানুষেরাও এ সেবার সঙ্গে যুক্ত হন। স্বাধীনতার পর এলাকায় মানুষের বসতি বাড়তে থাকায় ডাকঘরের কার্যক্রমও বিস্তৃত হয়।

কালীঘাট চা-বাগানের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা ডাকঘরটির বাহ্যিক চেহারায় নেই কোনো আড়ম্বর। টিনের তৈরি পুরোনো ভবনটি ধরে রেখেছে তার চেনা কাঠামো। শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল ফজল মো. আব্দুল হাই ডন জানান, বর্তমানে চা-বাগানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সরকারি চিঠিপত্র নিয়মিত এলেও ব্যক্তিগত চিঠি খুবই কম আসে। বর্তমানে এখানে একজন পোস্টমাস্টার, একজন পোস্টম্যান ও একজন রানার দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রবীণ সাংবাদিক রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী বলেন, চা-শিল্পাঞ্চলের প্রথম দিককার ডাকঘর হিসেবে এর আলাদা মর্যাদা রয়েছে। তবে আগের মতো চিঠিপত্র এখন আর আসে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক এই গুরুত্ব বিবেচনা করে ডাক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভবনটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করবে।

১৯২৩ সালে যখন কালীঘাট ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল চিঠি। ২০২৬ সালে এসে যোগাযোগের মাধ্যম আমূল বদলে গেলেও অতীতের স্মৃতিকে অপ্রয়োজনীয় করে দেয়নি। শতবর্ষ পেরোনো এই ডাকঘর তাই কেবল একটি সেবাকেন্দ্র নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের চা-শিল্পের ইতিহাস ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের এক জীবন্ত স্মারক। যোগাযোগের মাধ্যম বদলালেও মানুষের সম্পর্ক ও ইতিহাসের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না—কালীঘাট ডাকঘর ১০৩ বছর ধরে একই ঠিকানায় সেই সত্যেরই প্রমাণ দিয়ে চলেছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত