আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মাহবুবউল আলম হানিফের ফাঁসি এবং অন্য তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে দলটির কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
এই রায়ে খুশি কুষ্টিয়ার নিহত জুলাই শহীদদের পরিবার। তবে রায় কার্যকরের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তারা।
তাদের দাবি, দণ্ডিত নেতারা এখনো পলাতক। সরকার তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে এসে রায় কার্যকর না করা পর্যন্ত তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। আবার যেসব পুলিশ এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে, তারা এখনো বিচারের আওতায় আসেনি—এ নিয়ে ক্ষুব্ধ পরিবারের সদস্যরা।
এ বিষয়ে জুলাই শহীদ বাবলু ফারাজীর ছেলে সুজন মাহামুদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমার বাবাসহ ছয়জনকে হত্যা করেছিল পুলিশ। আজ সে হত্যার হুকুমদাতাদের রায় ঘোষণা হয়েছে। এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। তবে যেসব পুলিশ গুলি করে মেরেছে, সে পুলিশের নাম কিন্তু এই রায়ে নেই। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, যেসব পুলিশ গুলি করে মেরেছিল তাদের যেন এই বিচারের আওতায় আনা হয়।
তিনি বলেন, যেসব আসামির রায় ঘোষণা হয়েছে তারা সবাই পলাতক। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, তাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসে দ্রুত এই রায় কার্যকর করা হোক।
রায় ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহত শহীদ আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী লাবনী আক্তার ইতি বলেন, আমার স্বামী ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া মডেল থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হন এবং সেই দিনই মারা যান। আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চেয়েছিলাম। আজ সেই রায় ঘোষণা হয়েছে। এ রায়ে আমি ও আমার সন্তানরা খুশি। তবে আমি চাই দ্রুত আমার স্বামীর হত্যাকারীদের এই রায় কার্যকর হতে। আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, দ্রুত এই আসামিদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে যেন এই রায় কার্যকর করা হয়। কেননা আজ যাদের রায় ঘোষণা হয়েছে তারা সবাই পলাতক।
আরেক জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শহীদ সুরুজ আলী বাবুর স্ত্রী ফাহিমা খাতুন বলেন, আমি আপনাদের মুখ থেকেই প্রথম আমার স্বামীর হত্যার রায়ের কথা শুনলাম। আমি চাই দ্রুত এর বিচার কার্যকর হোক। তাতেই আমরা খুশি।
তবে এই রায়ে প্রতিক্রিয়ায় জুলাই যোদ্ধা তৌকির আহমেদ বলেন, আজ যে রায় ঘোষণা হয়েছে সেটা সন্তোষজনক। তবে শুধু রায় হলেই আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা চাই এই রায় কার্যকর হোক। আমরা চাচ্ছিলাম শুধু হানিফ নয়, বাকি আসামিরাও হানিফের মতো একই রায়ে দণ্ডিত হবেন বলে আমরা আশা করেছিলাম। তারা তো কম অপরাধ করেননি। জুলাই অভ্যুত্থানে তারা নিজেদের ক্যাডার বাহিনী ও গুন্ডাবাহিনী দিয়ে ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল শেখ হাসিনার শাসনামলে। এখানে তো একজনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম এই আসামিদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে আফসোসের বিষয় হলো, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো এই আসামিদের, কিন্তু তারা পলাতক। আমার কাছে মনে হয় না বর্তমান সরকার তাদের ফিরিয়ে আনতে এবং এই রায় কার্যকর করতে পারবে। আমার কাছে মনে হয় এটা শুধু ব্রেন ওয়াশ করা একটি রায়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে। তবে সরকার যদি আসামিদের এনে রায় কার্যকর করতে পারে, তবে আমরা মনে করব আমাদের এই আন্দোলন সফল। তবে আরেকটি বিষয় হলো, এ সময় পুলিশের নামে একাধিক মামলা আছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো পুলিশের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হয়নি।
এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, আইনের শাসন দেশে বিদ্যমান। এই বিষয়ে মামলা হয়েছিল। তদন্ত সংস্থা তদন্ত করেছে, চার্জশিট দাখিল করেছে। আইনি প্রক্রিয়ায় এর অগ্রগতি হয়েছে, সাক্ষী হয়েছে, আজকের রায় হলো। এটা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি হিংসার বিষয় নয়। স্বাভাবিকভাবে আমার অনুভূতি হলো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে ঘাটতি বাংলাদেশে ছিল, আজ এই রায়ের মাধ্যমে তা পূর্ণ হলো।
তিনি আরও বলেন, এটি প্রত্যেকের জন্য শিক্ষণীয়। ফ্যাসিবাদী আচরণ করা, গণতন্ত্র নষ্ট করা, জুলুম-নির্যাতন, গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত থাকলে অথবা নির্বিচারে মানুষ হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে পার পাওয়া যায় না—বাংলাদেশে প্রচলিত এই সংস্কৃতি এতদিন ছিল। এর থেকে বেরিয়ে এসে নতুন মাত্রার যে বাংলাদেশ আমরা চাচ্ছি, সেখানে এই রায়ের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে বলে আমি মনে করি। জনমতের প্রতিফলন হয়েছে, জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়েছে। মানুষ চাচ্ছিল, কুষ্টিয়ায় প্রকাশ্যে চোখের সামনে শটগান থেকে গুলি করে মারা হলো, এর দায়িত্ব নেবে না, এ জন্য কাউকে খেসারত দিতে হবে না—এটা হতে পারে না। এই রায়ের মাধ্যমে সেটার পূর্ণতা পেল।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মাহবুবউল আলম হানিফের ফাঁসি এবং অন্য তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে দলটির কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
এই রায়ে খুশি কুষ্টিয়ার নিহত জুলাই শহীদদের পরিবার। তবে রায় কার্যকরের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তারা।
তাদের দাবি, দণ্ডিত নেতারা এখনো পলাতক। সরকার তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে এসে রায় কার্যকর না করা পর্যন্ত তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। আবার যেসব পুলিশ এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে, তারা এখনো বিচারের আওতায় আসেনি—এ নিয়ে ক্ষুব্ধ পরিবারের সদস্যরা।
এ বিষয়ে জুলাই শহীদ বাবলু ফারাজীর ছেলে সুজন মাহামুদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমার বাবাসহ ছয়জনকে হত্যা করেছিল পুলিশ। আজ সে হত্যার হুকুমদাতাদের রায় ঘোষণা হয়েছে। এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। তবে যেসব পুলিশ গুলি করে মেরেছে, সে পুলিশের নাম কিন্তু এই রায়ে নেই। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, যেসব পুলিশ গুলি করে মেরেছিল তাদের যেন এই বিচারের আওতায় আনা হয়।
তিনি বলেন, যেসব আসামির রায় ঘোষণা হয়েছে তারা সবাই পলাতক। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, তাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসে দ্রুত এই রায় কার্যকর করা হোক।
রায় ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহত শহীদ আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী লাবনী আক্তার ইতি বলেন, আমার স্বামী ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া মডেল থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হন এবং সেই দিনই মারা যান। আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চেয়েছিলাম। আজ সেই রায় ঘোষণা হয়েছে। এ রায়ে আমি ও আমার সন্তানরা খুশি। তবে আমি চাই দ্রুত আমার স্বামীর হত্যাকারীদের এই রায় কার্যকর হতে। আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, দ্রুত এই আসামিদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে যেন এই রায় কার্যকর করা হয়। কেননা আজ যাদের রায় ঘোষণা হয়েছে তারা সবাই পলাতক।
আরেক জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শহীদ সুরুজ আলী বাবুর স্ত্রী ফাহিমা খাতুন বলেন, আমি আপনাদের মুখ থেকেই প্রথম আমার স্বামীর হত্যার রায়ের কথা শুনলাম। আমি চাই দ্রুত এর বিচার কার্যকর হোক। তাতেই আমরা খুশি।
তবে এই রায়ে প্রতিক্রিয়ায় জুলাই যোদ্ধা তৌকির আহমেদ বলেন, আজ যে রায় ঘোষণা হয়েছে সেটা সন্তোষজনক। তবে শুধু রায় হলেই আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা চাই এই রায় কার্যকর হোক। আমরা চাচ্ছিলাম শুধু হানিফ নয়, বাকি আসামিরাও হানিফের মতো একই রায়ে দণ্ডিত হবেন বলে আমরা আশা করেছিলাম। তারা তো কম অপরাধ করেননি। জুলাই অভ্যুত্থানে তারা নিজেদের ক্যাডার বাহিনী ও গুন্ডাবাহিনী দিয়ে ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল শেখ হাসিনার শাসনামলে। এখানে তো একজনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম এই আসামিদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে আফসোসের বিষয় হলো, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো এই আসামিদের, কিন্তু তারা পলাতক। আমার কাছে মনে হয় না বর্তমান সরকার তাদের ফিরিয়ে আনতে এবং এই রায় কার্যকর করতে পারবে। আমার কাছে মনে হয় এটা শুধু ব্রেন ওয়াশ করা একটি রায়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে। তবে সরকার যদি আসামিদের এনে রায় কার্যকর করতে পারে, তবে আমরা মনে করব আমাদের এই আন্দোলন সফল। তবে আরেকটি বিষয় হলো, এ সময় পুলিশের নামে একাধিক মামলা আছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো পুলিশের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হয়নি।
এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, আইনের শাসন দেশে বিদ্যমান। এই বিষয়ে মামলা হয়েছিল। তদন্ত সংস্থা তদন্ত করেছে, চার্জশিট দাখিল করেছে। আইনি প্রক্রিয়ায় এর অগ্রগতি হয়েছে, সাক্ষী হয়েছে, আজকের রায় হলো। এটা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি হিংসার বিষয় নয়। স্বাভাবিকভাবে আমার অনুভূতি হলো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে ঘাটতি বাংলাদেশে ছিল, আজ এই রায়ের মাধ্যমে তা পূর্ণ হলো।
তিনি আরও বলেন, এটি প্রত্যেকের জন্য শিক্ষণীয়। ফ্যাসিবাদী আচরণ করা, গণতন্ত্র নষ্ট করা, জুলুম-নির্যাতন, গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত থাকলে অথবা নির্বিচারে মানুষ হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে পার পাওয়া যায় না—বাংলাদেশে প্রচলিত এই সংস্কৃতি এতদিন ছিল। এর থেকে বেরিয়ে এসে নতুন মাত্রার যে বাংলাদেশ আমরা চাচ্ছি, সেখানে এই রায়ের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে বলে আমি মনে করি। জনমতের প্রতিফলন হয়েছে, জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়েছে। মানুষ চাচ্ছিল, কুষ্টিয়ায় প্রকাশ্যে চোখের সামনে শটগান থেকে গুলি করে মারা হলো, এর দায়িত্ব নেবে না, এ জন্য কাউকে খেসারত দিতে হবে না—এটা হতে পারে না। এই রায়ের মাধ্যমে সেটার পূর্ণতা পেল।

আপনার মতামত লিখুন