এম আবদুল আলীমের (জ. ১৯৭৬) সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক যেসব গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে তার মধ্য থেকে পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি (২০০৮), বন্দে আলী মিয়া : কবি ও কাব্যরূপ (২০০৯), রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ (২০১০) এবং সবুজপত্র ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য (২০১৯)—এ চারটি এ নিবন্ধের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি (২০০৮) এম আবদুল আলীমের প্রথম গবেষণাগ্রন্থ। লেখক নিজে ক্ষেত্রসমীক্ষা করে লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। সমীক্ষিত অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির যাঁরা প্রত্যক্ষ ধারক-বাহক তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশেছেন। এতে লোকমানসকে অনুধাবন করা গবেষকের পক্ষে সহজ হয়েছে। ‘পাবনা অঞ্চলের বস্তুধর্মী লোকসংস্কৃতি’ শিরোনামের তৃতীয় অধ্যায়টির বিভিন্ন পর্যায় বিভাজনে কিছুটা অসংগতি লক্ষ করা গেছে। তা ছাড়া, এটি পূর্ণাঙ্গও নয়। প্রকৃতপক্ষে চতুর্থ অধ্যায়টিই এ গ্রন্থের প্রাণ—যেখানে পাবনা অঞ্চলের মৌখিক সাহিত্যের একটা পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায় এবং সে সাহিত্য-উপাদানের সমাজ-মনোস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে লেখক বিশেষ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। লোকসংস্কৃতি ও তার ভাণ্ডারিদের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধা-ভালোবাসার ছোঁয়া আমরা পাঠক হিসেবেও অনুভব করি। বিশেষ করে, চতুর্থ অধ্যায়ে লোকসাহিত্যের বিচিত্র বিষয় যখন লেখক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন। এতে উঠে আসে পাবনা অঞ্চলের সমাজ-ইতিহাসের কথা, প্রথা, আচার-বিশ্বাস ও লোকমানসের গহন-গভীরে থাকা তত্ত্বভাবনা। পরিশিষ্টে সংযোজিত লোকসাহিত্য উপাদানের নিদর্শনসমূহের সংগ্রহমূল্যও আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে।
‘বন্দে আলী মিয়া : কবি ও কাব্যরূপ’ (প্রথম প্রকাশ : ২০০৯) এম আবদুল আলীমের অন্যতম প্রধান গবেষণাগ্রন্থ। গ্রন্থের নাম থেকেই অনুমেয় একদা সমগ্র বাংলার খ্যাতিমান কবি বন্দে আলী মিয়ার কবিসত্তা ও কাব্যরূপের স্বরূপ উন্মোচনই এর উদ্দিষ্ট। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত ময়নামতীর চর কাব্যখানিই কবি বন্দে আলী মিয়াকে বাংলা কবিতার আসরে যেন স্থায়ী আসন দিয়ে দিয়েছিলো। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই কাব্য পড়ে ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন : ‘পদ্মাতীরের পাড়াগাঁয়ের এমন নিকটস্পর্শ বাংলা ভাষায় আর কোনো কবির কবিতায় পেয়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। বাংলা সাহিত্যে তুমি আপন বিশেষ স্থানটি অধিকার করতে পেরেছ বলে আমি মনে করি।’ গবেষক যেন রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্যকে শিরোধার্য করে বাংলা কবিতাঙ্গনে বন্দে আলী মিয়ার ‘বিশেষ স্থান’টি নির্ণয়ের প্রয়াস পেয়েছেন এবং বাংলার পাড়া গাঁ, পল্লিজীবন ও প্রকৃতি এবং লোকঐতিহ্যের রূপায়ণ কীভাবে কতোটুকু ঘটেছে তাঁর কবিতায়, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। বাদ যায়নি বন্দে আলী মিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সমকালচেতনা ; ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে কতোখানি কবিকে আলোড়িত করেছে, তারও অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা আছে। আছে প্রত্যেক কবির পক্ষেই অনুপেক্ষণীয় যে মানবিক আবেগ—প্রেম, তার মর্মস্পর্শী আলোচনা।
বাংলা কাব্যে বন্দে আলী মিয়ার এ স্থান নির্ণয় এবং কবি হিসেবে তাঁর স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত বিশিষ্টতা প্রমাণে লেখক পর্যাপ্ত তথ্য সন্নিবেশ এবং সমকালীন উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতার তুলনামূলক পাঠ-বিশ্লেষণের মাধ্যমেই করেছেন। কবির (বন্দে আলী মিয়ার) প্রতি গবেষকের নিছক প্রাণের টান কিংবা ভালোবাসা-আলোলাগার বশে নয়, যুক্তিতর্ক এবং কবিতার শিল্পসৌন্দর্য বিচারের মাপকাঠিতেই কবিকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসানো হয়েছে। কবিতার পাঠ-বিশ্লেষণ করে যথাযথ দৃষ্টান্ত সহযোগে গবেষক দেখিয়েছেন গ্রামীণ প্রান্তিক জনজীবনের দক্ষ রূপকার কবি বন্দে আলী মিয়া। ব্রাত্য, অখ্যাত, নিতান্ত গায়ে-গতরে খেটে খাওয়া, চির অভাবী নিরন্ন মানুষের সুখ-দুঃখ এবং আনন্দ-বেদনার কথা প্রাণঢালা দরদ দিয়ে এমন সহজ-সুন্দর ভাষায় অন্য কোনো কবি বোধ হয় লেখেন নি। বর্তমানে নিম্নবর্গের ইতিহাস, অধ্যয়ন ইত্যাদি নিয়ে তাত্ত্বিক তর্ক, লেখালেখি, গবেষণা হামেশাই হয়। বন্দে আলী মিয়া সাব-অল্টার্ন থিওরির বিষয়ে অবহিত ছিলেন কি না, আমরা জানি না; তবে একটি বিশেষ অঞ্চলের কৃষক, জেলে, তাঁতি, শিকারি, দিনমজুরসহ আরো আরো প্রান্তিক মানুষের উপস্থিতি তাঁর কবিতায় আমরা দেখতে পাই। আঞ্চলিক ইতিহাসের অনেক উপাদানও তাঁর কবিতায় ছড়িয়ে আছে। লোকমুখে প্রচলিত কথা, কাহিনি-কিংবদন্তি ও প্রসিদ্ধ স্থানের বর্ণনাও আছে। পাবনা অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ সমাজেতিহাস পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে এগুলো গবেষকদের কাজে আসবে বলেই ধারণা করি। লেখক এম আবদুল আলীম বন্দে আলী মিয়ার কবিসত্তা ও কাব্যরূপ বিচার করতে গিয়ে পরোক্ষ এমন ইংগিতও দিয়েছেন।
‘রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ’ (২০১০) এম আবদুল আলীমের উচ্চতর একাডেমিক গবেষণা অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) গ্রন্থরূপ। আমরা জানি, একাডেমিক গবেষণায় নানা তত্ত্ব-পদ্ধতির প্রয়োগ থাকে এবং গবেষণা-বিষয়টিকে সুসংহত কাঠামো বা গঠনবিন্যাসে ফেলে যথাযথ তথ্য-উপাত্ত সহযোগে যৌক্তিক পরম্পরা অক্ষুণ্ন রেখে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হয়। এ গ্রন্থে রবীন্দ্র-পরবর্তী এবং রবীন্দ্র-বিরোধী কবিদের বিচ্ছিন্নতাবোধ নিয়ে আলোচনা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে—যা আপাতদৃষ্টিতে একটি জটিল এবং দুরূহ বিষয়। শুধু দুরূহ নয়, অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতা ব্যাপারটি আরো কিছু তত্ত্ব-দর্শনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এটি তিরিশের কবিদের কলমে বেশিরভাগ সময় বিমূর্ত, ধূসর-ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন ভাবাবেগ-আক্রান্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণ কবিতা পাঠকের পক্ষে সহজে তা অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। এমন একটি জটিল-কঠিন-বিমূর্ত বিষয়কে এম আবদুল আলীম তাঁর লেখনীগুণে সংহত ও সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ গ্রন্থের গঠন-পরিকল্পনা এবং অধ্যায়বিন্যাস বেশ গোছানো এবং বিষয়ানুগ। ‘বিচ্ছিন্নতা’ (অষরবহধঃরড়হ) একটি দার্শনিক প্রতীতি বা ধারণা। এ বিষয়ে পৃথিবীবিখ্যাত সব দার্শনিকের ভাবনা-চিন্তা-মনন-উপলব্ধির বিস্তারিত উল্লেখ ও আলোচনা স্থান পেয়েছে ‘বিচ্ছিন্নতা : তত্ত্বগত অন্বীক্ষা ও সামাজিক পটভূমি’ শিরোনামের প্রথম অধ্যায়ে। এরপর দ্বিতীয় অধ্যায়ে লেখক খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন বাংলা সাহিত্যে বিচ্ছিন্নতাবোধের কোনো ঐতিহ্য বা পরম্পরা আছে কিনা। তৃতীয় থেকে সপ্তম অধ্যায় ব্যাপী রবীন্দ্র-পরবর্তী আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রধান পাঁচজন কবি—যথাক্রমে জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে এবং অমিয় চক্রবর্তীর প্রাসঙ্গিক সব কবিতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তাতে প্রতিফলিত বিচ্ছিন্নতাবোধের নানামাত্রিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রত্যেক কবির ব্যক্তিসত্তা, মেজাজ, কাব্যানুভূতির সঙ্গে মিল রেখে অধ্যায়গুলোর সুন্দর শিরোনাম দেওয়া হয়েছে। যেমন—‘জীবনানন্দ দাশ : নিজের মুদ্রাদোষে বিচ্ছিন্ন কবিপ্রাণ।’ সত্যিই তো, চলতি কথায় যাকে বলে মুখচোরা বা মুখচাপা স্বভাব—অমন স্বভাবের জন্যেই তো জীবনানন্দ জনারণ্যেও নির্জন—নির্জনতার কবি; নিজের মুদ্রাদোষেই হয়ে যান আলাদা। এমনি করে অন্য চারজন কবির বিচ্ছিন্নতাবোধ অনুধাবনে লেখক যে তাৎপর্যপূর্ণ শৈল্পিক শিরোনাম বেছে নিয়েছেন, সেটি একদিকে যেমন কবিত্বময়, অন্যদিকে সেসব কবির অন্তর্লোকের গভীরতর বার্তাবাহী। শুধু প্রধান পাঁচজন কবি নন, আরো কতিপয় কবিকে গবেষণার উদ্দিষ্ট বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করেছেন লেখক—যাকে তিনি ‘বিচ্ছিন্নতার বিক্ষিপ্ত প্রয়াস : কতিপয় কবির প্রসঙ্গ’ শিরোনামে আবদ্ধ করেছেন। গ্রন্থের উপসংহারে এম আবদুল আলীম মন্তব্য করেছেন : ‘রবীন্দ্রোত্তর কালের কবিরা নানামাত্রিক বিন্যাসে আধুনিক মানবচৈতন্যের অন্যতম প্রধান দিক বিচ্ছিন্নতার শিল্পভাষ্য নির্মাণ করেছেন।’ আমরা বলবো, গবেষক এম আবদুল আলীম তাঁর অন্যতম প্রধান ও সুসংহত এই গবেষণা-গ্রন্থে বিচ্ছিন্নতাবিলাসী কবিকুলের ‘কবিতার শিল্পমূল্য ও নান্দনিক সৌকর্য’ বিশ্লেষণে সফল হয়েছেন।
‘সবুজপত্র ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য’ (২০১৯) গ্রন্থটি মূলত বিভিন্ন সময়ে রেখা এম আবদুল আলীমের গবেষণা-প্রবন্ধের সংকলন। সবচেয়ে বৃহৎকলেবর প্রবন্ধ হলো ‘সবুজপত্র : পুনঃপাঠ-পুনর্মূল্যায়ন’ এবং এটি এ বইয়ের প্রথম অংশ। দ্বিতীয় অংশে আছে সাতটি প্রবন্ধ—যাকে ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্য’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। সাতটির মধ্যে বিষয় হিসেবে আছে চারজন কবি—মাইকেল মধুসূদন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান এবং আবদুল গনি হাজারী। দুইজন কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। আর শেষ প্রবন্ধটি মুক্তিযুদ্ধের কবিতাকেন্দ্রিক। এতে বেশ কয়েকজন কবির কবিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
চূড়ান্ত চুলচেরা বিচারে এম আবদুল আলীমের সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণায় কিছু অসংগতি, ফাঁকফোঁকড় যে খুঁজে পাওয়া যাবে না তা নয়; তবে তাঁর কাজে ফাঁকি নেই, গাফিলতি নেই— দায়সারা ভাব নেই— নেই আলস্য। তিনি নিঃসন্দেহে একজন পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান গবেষক। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণায় নিয়ত নিমগ্ন। বাংলা সাহিত্যের বিচিত্র বিষয় নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, আঞ্চলিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য চর্চায় তিনি ইতিমধ্যেই বিদ্বৎসমাজে সুপরিচিত। লোকসংস্কৃতির উপাদান সংগ্রহ ও গবেষণায় তিনি নিবেদিতপ্রাণ। দেশের বেশ কজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও কবি-সাহিত্যিকের নিয়ে সম্মাননা ও স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণায় এম আবদুল আলীমের কর্মনিষ্ঠা ও অফুরন্ত অনুসন্ধিৎসা দেশের ভাবীকালের পাঠক-গবেষক-সংস্কৃতিকর্মীদের অনুপ্রেরণায় উৎস হয়ে উঠবে বলেই প্রতীয়মান হয়।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬
এম আবদুল আলীমের (জ. ১৯৭৬) সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক যেসব গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে তার মধ্য থেকে পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি (২০০৮), বন্দে আলী মিয়া : কবি ও কাব্যরূপ (২০০৯), রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ (২০১০) এবং সবুজপত্র ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য (২০১৯)—এ চারটি এ নিবন্ধের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি (২০০৮) এম আবদুল আলীমের প্রথম গবেষণাগ্রন্থ। লেখক নিজে ক্ষেত্রসমীক্ষা করে লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। সমীক্ষিত অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির যাঁরা প্রত্যক্ষ ধারক-বাহক তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশেছেন। এতে লোকমানসকে অনুধাবন করা গবেষকের পক্ষে সহজ হয়েছে। ‘পাবনা অঞ্চলের বস্তুধর্মী লোকসংস্কৃতি’ শিরোনামের তৃতীয় অধ্যায়টির বিভিন্ন পর্যায় বিভাজনে কিছুটা অসংগতি লক্ষ করা গেছে। তা ছাড়া, এটি পূর্ণাঙ্গও নয়। প্রকৃতপক্ষে চতুর্থ অধ্যায়টিই এ গ্রন্থের প্রাণ—যেখানে পাবনা অঞ্চলের মৌখিক সাহিত্যের একটা পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায় এবং সে সাহিত্য-উপাদানের সমাজ-মনোস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে লেখক বিশেষ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। লোকসংস্কৃতি ও তার ভাণ্ডারিদের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধা-ভালোবাসার ছোঁয়া আমরা পাঠক হিসেবেও অনুভব করি। বিশেষ করে, চতুর্থ অধ্যায়ে লোকসাহিত্যের বিচিত্র বিষয় যখন লেখক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন। এতে উঠে আসে পাবনা অঞ্চলের সমাজ-ইতিহাসের কথা, প্রথা, আচার-বিশ্বাস ও লোকমানসের গহন-গভীরে থাকা তত্ত্বভাবনা। পরিশিষ্টে সংযোজিত লোকসাহিত্য উপাদানের নিদর্শনসমূহের সংগ্রহমূল্যও আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে।
‘বন্দে আলী মিয়া : কবি ও কাব্যরূপ’ (প্রথম প্রকাশ : ২০০৯) এম আবদুল আলীমের অন্যতম প্রধান গবেষণাগ্রন্থ। গ্রন্থের নাম থেকেই অনুমেয় একদা সমগ্র বাংলার খ্যাতিমান কবি বন্দে আলী মিয়ার কবিসত্তা ও কাব্যরূপের স্বরূপ উন্মোচনই এর উদ্দিষ্ট। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত ময়নামতীর চর কাব্যখানিই কবি বন্দে আলী মিয়াকে বাংলা কবিতার আসরে যেন স্থায়ী আসন দিয়ে দিয়েছিলো। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই কাব্য পড়ে ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন : ‘পদ্মাতীরের পাড়াগাঁয়ের এমন নিকটস্পর্শ বাংলা ভাষায় আর কোনো কবির কবিতায় পেয়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। বাংলা সাহিত্যে তুমি আপন বিশেষ স্থানটি অধিকার করতে পেরেছ বলে আমি মনে করি।’ গবেষক যেন রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্যকে শিরোধার্য করে বাংলা কবিতাঙ্গনে বন্দে আলী মিয়ার ‘বিশেষ স্থান’টি নির্ণয়ের প্রয়াস পেয়েছেন এবং বাংলার পাড়া গাঁ, পল্লিজীবন ও প্রকৃতি এবং লোকঐতিহ্যের রূপায়ণ কীভাবে কতোটুকু ঘটেছে তাঁর কবিতায়, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। বাদ যায়নি বন্দে আলী মিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সমকালচেতনা ; ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে কতোখানি কবিকে আলোড়িত করেছে, তারও অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা আছে। আছে প্রত্যেক কবির পক্ষেই অনুপেক্ষণীয় যে মানবিক আবেগ—প্রেম, তার মর্মস্পর্শী আলোচনা।
বাংলা কাব্যে বন্দে আলী মিয়ার এ স্থান নির্ণয় এবং কবি হিসেবে তাঁর স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত বিশিষ্টতা প্রমাণে লেখক পর্যাপ্ত তথ্য সন্নিবেশ এবং সমকালীন উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতার তুলনামূলক পাঠ-বিশ্লেষণের মাধ্যমেই করেছেন। কবির (বন্দে আলী মিয়ার) প্রতি গবেষকের নিছক প্রাণের টান কিংবা ভালোবাসা-আলোলাগার বশে নয়, যুক্তিতর্ক এবং কবিতার শিল্পসৌন্দর্য বিচারের মাপকাঠিতেই কবিকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসানো হয়েছে। কবিতার পাঠ-বিশ্লেষণ করে যথাযথ দৃষ্টান্ত সহযোগে গবেষক দেখিয়েছেন গ্রামীণ প্রান্তিক জনজীবনের দক্ষ রূপকার কবি বন্দে আলী মিয়া। ব্রাত্য, অখ্যাত, নিতান্ত গায়ে-গতরে খেটে খাওয়া, চির অভাবী নিরন্ন মানুষের সুখ-দুঃখ এবং আনন্দ-বেদনার কথা প্রাণঢালা দরদ দিয়ে এমন সহজ-সুন্দর ভাষায় অন্য কোনো কবি বোধ হয় লেখেন নি। বর্তমানে নিম্নবর্গের ইতিহাস, অধ্যয়ন ইত্যাদি নিয়ে তাত্ত্বিক তর্ক, লেখালেখি, গবেষণা হামেশাই হয়। বন্দে আলী মিয়া সাব-অল্টার্ন থিওরির বিষয়ে অবহিত ছিলেন কি না, আমরা জানি না; তবে একটি বিশেষ অঞ্চলের কৃষক, জেলে, তাঁতি, শিকারি, দিনমজুরসহ আরো আরো প্রান্তিক মানুষের উপস্থিতি তাঁর কবিতায় আমরা দেখতে পাই। আঞ্চলিক ইতিহাসের অনেক উপাদানও তাঁর কবিতায় ছড়িয়ে আছে। লোকমুখে প্রচলিত কথা, কাহিনি-কিংবদন্তি ও প্রসিদ্ধ স্থানের বর্ণনাও আছে। পাবনা অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ সমাজেতিহাস পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে এগুলো গবেষকদের কাজে আসবে বলেই ধারণা করি। লেখক এম আবদুল আলীম বন্দে আলী মিয়ার কবিসত্তা ও কাব্যরূপ বিচার করতে গিয়ে পরোক্ষ এমন ইংগিতও দিয়েছেন।
‘রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ’ (২০১০) এম আবদুল আলীমের উচ্চতর একাডেমিক গবেষণা অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) গ্রন্থরূপ। আমরা জানি, একাডেমিক গবেষণায় নানা তত্ত্ব-পদ্ধতির প্রয়োগ থাকে এবং গবেষণা-বিষয়টিকে সুসংহত কাঠামো বা গঠনবিন্যাসে ফেলে যথাযথ তথ্য-উপাত্ত সহযোগে যৌক্তিক পরম্পরা অক্ষুণ্ন রেখে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হয়। এ গ্রন্থে রবীন্দ্র-পরবর্তী এবং রবীন্দ্র-বিরোধী কবিদের বিচ্ছিন্নতাবোধ নিয়ে আলোচনা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে—যা আপাতদৃষ্টিতে একটি জটিল এবং দুরূহ বিষয়। শুধু দুরূহ নয়, অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতা ব্যাপারটি আরো কিছু তত্ত্ব-দর্শনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এটি তিরিশের কবিদের কলমে বেশিরভাগ সময় বিমূর্ত, ধূসর-ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন ভাবাবেগ-আক্রান্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণ কবিতা পাঠকের পক্ষে সহজে তা অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। এমন একটি জটিল-কঠিন-বিমূর্ত বিষয়কে এম আবদুল আলীম তাঁর লেখনীগুণে সংহত ও সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ গ্রন্থের গঠন-পরিকল্পনা এবং অধ্যায়বিন্যাস বেশ গোছানো এবং বিষয়ানুগ। ‘বিচ্ছিন্নতা’ (অষরবহধঃরড়হ) একটি দার্শনিক প্রতীতি বা ধারণা। এ বিষয়ে পৃথিবীবিখ্যাত সব দার্শনিকের ভাবনা-চিন্তা-মনন-উপলব্ধির বিস্তারিত উল্লেখ ও আলোচনা স্থান পেয়েছে ‘বিচ্ছিন্নতা : তত্ত্বগত অন্বীক্ষা ও সামাজিক পটভূমি’ শিরোনামের প্রথম অধ্যায়ে। এরপর দ্বিতীয় অধ্যায়ে লেখক খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন বাংলা সাহিত্যে বিচ্ছিন্নতাবোধের কোনো ঐতিহ্য বা পরম্পরা আছে কিনা। তৃতীয় থেকে সপ্তম অধ্যায় ব্যাপী রবীন্দ্র-পরবর্তী আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রধান পাঁচজন কবি—যথাক্রমে জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে এবং অমিয় চক্রবর্তীর প্রাসঙ্গিক সব কবিতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তাতে প্রতিফলিত বিচ্ছিন্নতাবোধের নানামাত্রিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রত্যেক কবির ব্যক্তিসত্তা, মেজাজ, কাব্যানুভূতির সঙ্গে মিল রেখে অধ্যায়গুলোর সুন্দর শিরোনাম দেওয়া হয়েছে। যেমন—‘জীবনানন্দ দাশ : নিজের মুদ্রাদোষে বিচ্ছিন্ন কবিপ্রাণ।’ সত্যিই তো, চলতি কথায় যাকে বলে মুখচোরা বা মুখচাপা স্বভাব—অমন স্বভাবের জন্যেই তো জীবনানন্দ জনারণ্যেও নির্জন—নির্জনতার কবি; নিজের মুদ্রাদোষেই হয়ে যান আলাদা। এমনি করে অন্য চারজন কবির বিচ্ছিন্নতাবোধ অনুধাবনে লেখক যে তাৎপর্যপূর্ণ শৈল্পিক শিরোনাম বেছে নিয়েছেন, সেটি একদিকে যেমন কবিত্বময়, অন্যদিকে সেসব কবির অন্তর্লোকের গভীরতর বার্তাবাহী। শুধু প্রধান পাঁচজন কবি নন, আরো কতিপয় কবিকে গবেষণার উদ্দিষ্ট বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করেছেন লেখক—যাকে তিনি ‘বিচ্ছিন্নতার বিক্ষিপ্ত প্রয়াস : কতিপয় কবির প্রসঙ্গ’ শিরোনামে আবদ্ধ করেছেন। গ্রন্থের উপসংহারে এম আবদুল আলীম মন্তব্য করেছেন : ‘রবীন্দ্রোত্তর কালের কবিরা নানামাত্রিক বিন্যাসে আধুনিক মানবচৈতন্যের অন্যতম প্রধান দিক বিচ্ছিন্নতার শিল্পভাষ্য নির্মাণ করেছেন।’ আমরা বলবো, গবেষক এম আবদুল আলীম তাঁর অন্যতম প্রধান ও সুসংহত এই গবেষণা-গ্রন্থে বিচ্ছিন্নতাবিলাসী কবিকুলের ‘কবিতার শিল্পমূল্য ও নান্দনিক সৌকর্য’ বিশ্লেষণে সফল হয়েছেন।
‘সবুজপত্র ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য’ (২০১৯) গ্রন্থটি মূলত বিভিন্ন সময়ে রেখা এম আবদুল আলীমের গবেষণা-প্রবন্ধের সংকলন। সবচেয়ে বৃহৎকলেবর প্রবন্ধ হলো ‘সবুজপত্র : পুনঃপাঠ-পুনর্মূল্যায়ন’ এবং এটি এ বইয়ের প্রথম অংশ। দ্বিতীয় অংশে আছে সাতটি প্রবন্ধ—যাকে ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্য’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। সাতটির মধ্যে বিষয় হিসেবে আছে চারজন কবি—মাইকেল মধুসূদন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান এবং আবদুল গনি হাজারী। দুইজন কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। আর শেষ প্রবন্ধটি মুক্তিযুদ্ধের কবিতাকেন্দ্রিক। এতে বেশ কয়েকজন কবির কবিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
চূড়ান্ত চুলচেরা বিচারে এম আবদুল আলীমের সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণায় কিছু অসংগতি, ফাঁকফোঁকড় যে খুঁজে পাওয়া যাবে না তা নয়; তবে তাঁর কাজে ফাঁকি নেই, গাফিলতি নেই— দায়সারা ভাব নেই— নেই আলস্য। তিনি নিঃসন্দেহে একজন পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান গবেষক। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণায় নিয়ত নিমগ্ন। বাংলা সাহিত্যের বিচিত্র বিষয় নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, আঞ্চলিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য চর্চায় তিনি ইতিমধ্যেই বিদ্বৎসমাজে সুপরিচিত। লোকসংস্কৃতির উপাদান সংগ্রহ ও গবেষণায় তিনি নিবেদিতপ্রাণ। দেশের বেশ কজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও কবি-সাহিত্যিকের নিয়ে সম্মাননা ও স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণায় এম আবদুল আলীমের কর্মনিষ্ঠা ও অফুরন্ত অনুসন্ধিৎসা দেশের ভাবীকালের পাঠক-গবেষক-সংস্কৃতিকর্মীদের অনুপ্রেরণায় উৎস হয়ে উঠবে বলেই প্রতীয়মান হয়।

আপনার মতামত লিখুন