পাহাড়ের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে স্থানীয় কয়েকটি সংগঠনের ডাকা টানা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের জেরে চরম ধস নেমেছে খাগড়াছড়ি ও সাজেকের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ায় খাগড়াছড়ি শহরজুড়ে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
আয়ের পথ বন্ধ থাকায় ব্যাংক ঋণ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শত শত ব্যবসায়ী ও পর্যটনকর্মী। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাজেক ও এর সংযোগ সড়কগুলোতে এই অচলাবস্থার কারণে পর্যটন খাতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
সাজেকে যাতায়াত বন্ধ থাকায় খাগড়াছড়ি জেলা সদরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। শহরের আদালত সড়কের কাপড় ব্যবসায়ী বিকিরণ রোয়াজা জানান, তার দোকানের মূল ক্রেতাই ছিলেন পর্যটকরা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মাসের কিস্তি দিতে হয় ৩৫ হাজার টাকা। দোকানভাড়া ও কর্মচারীর বেতন বাবদ খরচ আরও ১৭ হাজার টাকা। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে বেচাকেনা একেবারেই শূন্যের কোঠায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে।”
একই চিত্র জুমলাইন মার্কেটের ‘পাহাড়িকা’ দোকানের কর্মচারী মেকি চাকমার মুখেও। তিনি জানান, সোম ও মঙ্গলবার সারা দিন দোকান খোলা রাখলেও এক টাকার পণ্যও বিক্রি হয়নি।
শাপলা চত্বর এলাকার ‘সাদামাটা’ হোটেলের মালিক দিদারুল আলম জানান, সাজেক বন্ধ থাকার কারণে তার প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। মিলনপুর এলাকার ‘গাইরিং’ হোটেলের ব্যবস্থাপক প্রান্ত ত্রিপুরা জানান, তাদের হোটেলের অর্ধেকের বেশি কক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে।
স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও ভিন্ন নয়। পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কের কর্মী মনতোষ ত্রিপুরা জানান, যেখানে আগে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ শ টিকিট বিক্রি হতো, সেখানে এখন কদাচিৎ ৪০-৫০ জন স্থানীয় দর্শনার্থী আসছেন। পর্যটকের অভাবে পার্কের ভেতরের জিপ লাইন ও জায়ান্ট সুইংয়ের মতো বিনোদন রাইডগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
বেকার ৩ হাজার শ্রমিক
সাজেক রুটে যাতায়াতকারী চাঁদের গাড়ি (জিপ), পিকআপ এবং সিএনজিচালিত মাহিন্দ্র চালকরা পড়েছেন সবচেয়ে বড় বিপাকে। পাহাড়ি পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতির তথ্যমতে, সাজেক ও খাগড়াছড়িতে প্রায় তিন হাজার পরিবহন শ্রমিক ও চালক কাজ হারিয়ে অলস সময় কাটাচ্ছেন। পর্যটন মৌসুমের শুরুতে এমন অবরোধের কারণে গাড়ি এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
টানা অবরোধের কারণে শুধু পর্যটন নয়, স্থানীয় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে। সাজেক ও এর আশপাশের পাহাড়ি জনপদে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও জরুরি ওষুধের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় একধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
উৎপাদিত কৃষিপণ্য (মিষ্টিকুমড়া, লাউ, কাঁচা শাকসবজি ইত্যাদি) সময়মতো সমতলের বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে না পেরে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকরা।
সূত্রমতে, সাজেক থেকে নির্দিষ্ট একটি সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষে ‘সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর ডাকে গত ২২ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের এই অবরোধ শুরু হয়। এর আগে গত ১১ ও ১৫ অক্টোবর কয়েক দফায় অবরোধ পালিত হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে তা কিছুদিন স্থগিত থাকলেও ২১ অক্টোবর এক বিজ্ঞপ্তিতে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেওয়া হয়।
নিরাপত্তাঝুঁকি ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্যে সাজেক থেকে ফেরার পথে উজোবাজার এলাকায় পর্যটকবাহী গাড়িবহরে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং পর্যটনশিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা রক্ষায় দ্রুত একটি স্থায়ী রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সমাধান চান স্থানীয় ব্যবসায়ী, চালক ও সাধারণ বাসিন্দারা।

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
পাহাড়ের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে স্থানীয় কয়েকটি সংগঠনের ডাকা টানা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের জেরে চরম ধস নেমেছে খাগড়াছড়ি ও সাজেকের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ায় খাগড়াছড়ি শহরজুড়ে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
আয়ের পথ বন্ধ থাকায় ব্যাংক ঋণ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শত শত ব্যবসায়ী ও পর্যটনকর্মী। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাজেক ও এর সংযোগ সড়কগুলোতে এই অচলাবস্থার কারণে পর্যটন খাতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
সাজেকে যাতায়াত বন্ধ থাকায় খাগড়াছড়ি জেলা সদরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। শহরের আদালত সড়কের কাপড় ব্যবসায়ী বিকিরণ রোয়াজা জানান, তার দোকানের মূল ক্রেতাই ছিলেন পর্যটকরা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মাসের কিস্তি দিতে হয় ৩৫ হাজার টাকা। দোকানভাড়া ও কর্মচারীর বেতন বাবদ খরচ আরও ১৭ হাজার টাকা। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে বেচাকেনা একেবারেই শূন্যের কোঠায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে।”
একই চিত্র জুমলাইন মার্কেটের ‘পাহাড়িকা’ দোকানের কর্মচারী মেকি চাকমার মুখেও। তিনি জানান, সোম ও মঙ্গলবার সারা দিন দোকান খোলা রাখলেও এক টাকার পণ্যও বিক্রি হয়নি।
শাপলা চত্বর এলাকার ‘সাদামাটা’ হোটেলের মালিক দিদারুল আলম জানান, সাজেক বন্ধ থাকার কারণে তার প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। মিলনপুর এলাকার ‘গাইরিং’ হোটেলের ব্যবস্থাপক প্রান্ত ত্রিপুরা জানান, তাদের হোটেলের অর্ধেকের বেশি কক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে।
স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও ভিন্ন নয়। পার্বত্য জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কের কর্মী মনতোষ ত্রিপুরা জানান, যেখানে আগে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ শ টিকিট বিক্রি হতো, সেখানে এখন কদাচিৎ ৪০-৫০ জন স্থানীয় দর্শনার্থী আসছেন। পর্যটকের অভাবে পার্কের ভেতরের জিপ লাইন ও জায়ান্ট সুইংয়ের মতো বিনোদন রাইডগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
বেকার ৩ হাজার শ্রমিক
সাজেক রুটে যাতায়াতকারী চাঁদের গাড়ি (জিপ), পিকআপ এবং সিএনজিচালিত মাহিন্দ্র চালকরা পড়েছেন সবচেয়ে বড় বিপাকে। পাহাড়ি পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতির তথ্যমতে, সাজেক ও খাগড়াছড়িতে প্রায় তিন হাজার পরিবহন শ্রমিক ও চালক কাজ হারিয়ে অলস সময় কাটাচ্ছেন। পর্যটন মৌসুমের শুরুতে এমন অবরোধের কারণে গাড়ি এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
টানা অবরোধের কারণে শুধু পর্যটন নয়, স্থানীয় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে। সাজেক ও এর আশপাশের পাহাড়ি জনপদে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও জরুরি ওষুধের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় একধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
উৎপাদিত কৃষিপণ্য (মিষ্টিকুমড়া, লাউ, কাঁচা শাকসবজি ইত্যাদি) সময়মতো সমতলের বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে না পেরে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকরা।
সূত্রমতে, সাজেক থেকে নির্দিষ্ট একটি সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষে ‘সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর ডাকে গত ২২ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের এই অবরোধ শুরু হয়। এর আগে গত ১১ ও ১৫ অক্টোবর কয়েক দফায় অবরোধ পালিত হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে তা কিছুদিন স্থগিত থাকলেও ২১ অক্টোবর এক বিজ্ঞপ্তিতে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেওয়া হয়।
নিরাপত্তাঝুঁকি ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্যে সাজেক থেকে ফেরার পথে উজোবাজার এলাকায় পর্যটকবাহী গাড়িবহরে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং পর্যটনশিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা রক্ষায় দ্রুত একটি স্থায়ী রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সমাধান চান স্থানীয় ব্যবসায়ী, চালক ও সাধারণ বাসিন্দারা।

আপনার মতামত লিখুন