রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি প্রধান ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে বেসরকারি ব্যাংক থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং অঙ্গনে নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল দুটি পদে নিয়োগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, নিজস্ব নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল এবং জনগণের আস্থার প্রশ্ন।
একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাই নবীন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নিজস্ব অভিজ্ঞ জনবল ও নেতৃত্বের ঘাটতি ছিল। সময়ের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলেছে, দক্ষ জনবল তৈরি করেছে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এটি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতিরই পরিচায়ক।
কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কয়েক দশক ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, যাদের রয়েছে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, বিপুল জনবল এবং ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, ট্রেজারি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সেই ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য নিজেদের মধ্য থেকে যোগ্য নির্বাহী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কি যথেষ্ট অভিজ্ঞ, সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব নেই? যদি থাকেন, তবে তাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি? আর যদি তাদের মধ্য থেকে কাউকে যোগ্য মনে করা না হয়, তাহলে এত বছর ধরে বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতির মাধ্যমে নেতৃত্বের যে কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয়?
এখানে মূল বিষয় বেসরকারি ব্যাংকের নির্বাহীদের যোগ্যতা অস্বীকার করা নয়। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্বের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই ও মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলা।
বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ নির্বাহীরা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। তাদের দক্ষতা, কর্মপদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তির পরিচিতি, পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের সুনাম কিংবা বেসরকারি ব্যাংকে সাফল্যের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তিনি নিচ্ছেন, তার কাঠামো, উদ্দেশ্য, সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার সঙ্গে তার অভিজ্ঞতার কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পরিচালনা ও বেসরকারি ব্যাংক পরিচালনার মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়ন, বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং নানা প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করতে হয়। এসব বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর ধারণা ছাড়া শুধু সাধারণ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন হতে পারে।
আমার বিবেচনায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রথমে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ, সৎ, দক্ষ ও ফলাফল অর্জনে সক্ষম নির্বাহীদের। কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের যোগ্য ব্যাংকারদেরও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং ব্যাংক পরিচালনার বাস্তব জ্ঞান এখনো দেশের ব্যাংকিং খাতের সম্পদ।
একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ নির্বাহীদের উপদেষ্টা, পরামর্শক কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত করার সুযোগও খোলা রাখা উচিত। এতে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্ব বিকাশের পথও অযথা সংকুচিত হবে না।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ব্যাংকের সংকটের দায় বা সমাধান শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর নির্ভর করে না। একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কতটা দক্ষ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্ষদে ব্যাংকিং, অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা, আইন ও প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয় থাকা দরকার। কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে ব্যাংকের জটিল পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সব সময় সম্ভব নয়।
পর্ষদ যদি কার্যকর তদারকি করতে না পারে, ঝুঁকির বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয় কিংবা ব্যবস্থাপনাকে পেশাগতভাবে কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে একজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পক্ষেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে। বিপরীতে, যোগ্য পর্ষদ, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করলে ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাই কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, শীর্ষ নির্বাহী নিয়োগে স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। সততা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ আদায়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ববর্তী কর্মস্থলে অর্জিত ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দক্ষতা ও কার্যকারিতা পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পর্ষদে বাস্তব ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে ব্যাংকভিত্তিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্কতা, মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনা, অনিয়মের জবাবদিহি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার।
চতুর্থত, প্রয়োজনে অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যাংকার ও দক্ষ বেসরকারি ব্যাংকারদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক দল গঠন করা যেতে পারে। তাদের কাজ হবে নির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধানের সুপারিশ দেওয়া এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে সহায়তা করা।
পঞ্চমত, শুধু নিয়োগ দিয়েই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। নীতিগত সহায়তা, প্রয়োজনীয় সম্পদ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ এবং নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককেও নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের আওতায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সহায়তা দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকট থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। এক দিনে খেলাপি ঋণ আদায় হবে না, দুর্বল ঋণের মান ভালো হয়ে যাবে না কিংবা দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা রাতারাতি দূর হবে না। এ জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, দৃঢ় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফলভিত্তিক তদারকি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্বে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাই না করে বাইরে থেকে নির্বাহী নিয়োগ দেওয়াও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। নিয়োগের সিদ্ধান্তের যথার্থতা বিচার করতে হবে যোগ্যতা, প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ ফলাফলের ভিত্তিতে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থায়ন এবং জনসাধারণের আর্থিক আস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনে তাই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার চিন্তা থাকা জরুরি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ, কার্যকর জবাবদিহি এবং সরকারের সমন্বিত সহায়তা। নিয়োগের মাধ্যমে কারও মর্যাদা বাড়ানো বা কমানো নয়, বরং ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব অভিজ্ঞ জনবলকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন, দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তা পূরণ এবং প্রয়োজনে বাইরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর মধ্য দিয়েই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত কে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যাংকার আর কে বেসরকারি ব্যাংকার, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জবাবদিহির সঙ্গে ব্যাংককে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবেন এবং তাকে সফল হওয়ার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক]

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি প্রধান ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে বেসরকারি ব্যাংক থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং অঙ্গনে নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল দুটি পদে নিয়োগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, নিজস্ব নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল এবং জনগণের আস্থার প্রশ্ন।
একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাই নবীন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নিজস্ব অভিজ্ঞ জনবল ও নেতৃত্বের ঘাটতি ছিল। সময়ের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলেছে, দক্ষ জনবল তৈরি করেছে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এটি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতিরই পরিচায়ক।
কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কয়েক দশক ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, যাদের রয়েছে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, বিপুল জনবল এবং ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, ট্রেজারি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সেই ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য নিজেদের মধ্য থেকে যোগ্য নির্বাহী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কি যথেষ্ট অভিজ্ঞ, সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব নেই? যদি থাকেন, তবে তাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি? আর যদি তাদের মধ্য থেকে কাউকে যোগ্য মনে করা না হয়, তাহলে এত বছর ধরে বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতির মাধ্যমে নেতৃত্বের যে কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয়?
এখানে মূল বিষয় বেসরকারি ব্যাংকের নির্বাহীদের যোগ্যতা অস্বীকার করা নয়। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্বের সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই ও মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলা।
বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ নির্বাহীরা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। তাদের দক্ষতা, কর্মপদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তির পরিচিতি, পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের সুনাম কিংবা বেসরকারি ব্যাংকে সাফল্যের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তিনি নিচ্ছেন, তার কাঠামো, উদ্দেশ্য, সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার সঙ্গে তার অভিজ্ঞতার কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পরিচালনা ও বেসরকারি ব্যাংক পরিচালনার মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়ন, বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং নানা প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করতে হয়। এসব বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর ধারণা ছাড়া শুধু সাধারণ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন হতে পারে।
আমার বিবেচনায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রথমে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ, সৎ, দক্ষ ও ফলাফল অর্জনে সক্ষম নির্বাহীদের। কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের যোগ্য ব্যাংকারদেরও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং ব্যাংক পরিচালনার বাস্তব জ্ঞান এখনো দেশের ব্যাংকিং খাতের সম্পদ।
একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ নির্বাহীদের উপদেষ্টা, পরামর্শক কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত করার সুযোগও খোলা রাখা উচিত। এতে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্ব বিকাশের পথও অযথা সংকুচিত হবে না।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ব্যাংকের সংকটের দায় বা সমাধান শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ওপর নির্ভর করে না। একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কতটা দক্ষ, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্ষদে ব্যাংকিং, অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা, আইন ও প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয় থাকা দরকার। কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে ব্যাংকের জটিল পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সব সময় সম্ভব নয়।
পর্ষদ যদি কার্যকর তদারকি করতে না পারে, ঝুঁকির বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয় কিংবা ব্যবস্থাপনাকে পেশাগতভাবে কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে একজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পক্ষেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে। বিপরীতে, যোগ্য পর্ষদ, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করলে ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাই কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, শীর্ষ নির্বাহী নিয়োগে স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। সততা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ আদায়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ববর্তী কর্মস্থলে অর্জিত ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দক্ষতা ও কার্যকারিতা পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পর্ষদে বাস্তব ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে ব্যাংকভিত্তিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্কতা, মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনা, অনিয়মের জবাবদিহি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার।
চতুর্থত, প্রয়োজনে অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যাংকার ও দক্ষ বেসরকারি ব্যাংকারদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক দল গঠন করা যেতে পারে। তাদের কাজ হবে নির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধানের সুপারিশ দেওয়া এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে সহায়তা করা।
পঞ্চমত, শুধু নিয়োগ দিয়েই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। নীতিগত সহায়তা, প্রয়োজনীয় সম্পদ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ এবং নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককেও নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের আওতায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সহায়তা দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকট থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। এক দিনে খেলাপি ঋণ আদায় হবে না, দুর্বল ঋণের মান ভালো হয়ে যাবে না কিংবা দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা রাতারাতি দূর হবে না। এ জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, দৃঢ় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফলভিত্তিক তদারকি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্বে বেসরকারি ব্যাংকার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাই না করে বাইরে থেকে নির্বাহী নিয়োগ দেওয়াও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। নিয়োগের সিদ্ধান্তের যথার্থতা বিচার করতে হবে যোগ্যতা, প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ ফলাফলের ভিত্তিতে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থায়ন এবং জনসাধারণের আর্থিক আস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনে তাই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার চিন্তা থাকা জরুরি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ, কার্যকর জবাবদিহি এবং সরকারের সমন্বিত সহায়তা। নিয়োগের মাধ্যমে কারও মর্যাদা বাড়ানো বা কমানো নয়, বরং ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিজস্ব অভিজ্ঞ জনবলকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন, দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তা পূরণ এবং প্রয়োজনে বাইরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর মধ্য দিয়েই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত কে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যাংকার আর কে বেসরকারি ব্যাংকার, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জবাবদিহির সঙ্গে ব্যাংককে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবেন এবং তাকে সফল হওয়ার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন